📘 তাসাওউফ ও আত্মশুদ্ধি আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, পথ পদ্ধতি 📄 হযরত থানভী রহ.-এর একটি ঘটনা

📄 হযরত থানভী রহ.-এর একটি ঘটনা


আমার শাইখ হযরত ডাক্তার আব্দুল হাই ছাহেব রহ. থেকে শোনা একটি ঘটনা স্মরণ হলো। তিনি বলেন, একবার হাকীমুল উম্মাত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী ছাহেব রহ. দিল্লীর মসজিদের মিম্বরে বসে ওয়ায করছিলেন। অনেক বড়ো মজমা সামনে উপবিষ্ট ছিলো। ওয়াযের মধ্যে তিনি বললেন, আজকে আমি আপনাদেরকে এমন একটি কথা বলছি, যা আমার নিকটেই শুনবেন, অন্য কারো নিকটে পাবেন না। এ কথা আমি 'তাহদীসে নেয়ামত' হিসেবে বলছি যে, এই ইলম আল্লাহ তা'আলা আমাকেই দান করেছেন। এ কথা বলার পর মুহূর্তের জন্য তিনি চুপ হয়ে গেলেন। তারপর বললেন, আস্তাগফিরুল্লাহ! আস্তাগফিরুল্লাহ! আস্তাগফিরুল্লাহ! আমি বলেছি যে, এ কথা আমার নিকটেই শুনবেন, অন্য কারো কাছে শুনতে পাবেন না, এটা তো দাবি ও অহমিকা। আমি নিজের বড়ত্ব বর্ণনা করে আবার একে নেয়ামতের বর্ণনা নাম দিয়েছি। এজন্য আমি ইস্তিগফার করছি। আস্তাগফিরুল্লাহ! আস্তাগফিরুল্লাহ! আস্তাগফিরুল্লাহ! একে তো আমি নিজের বড়ত্ব বর্ণনা করেছি, উপরন্তু এই বড়ত্বকে নেয়ামতের বর্ণনার পর্দায় লুকানোর চেষ্টা করেছি। আর নিয়ম হলো, গোপন গোনাহের তাওবা গোপনে এবং প্রকাশ্য গোনাহের তাওবা প্রকাশ্যে করা উচিত। যেহেতু এই গোনাহ আমি প্রকাশ্যে করেছি তাই প্রকাশ্যে তাওবা করছি যে, এভাবে বলা আমার ভুল হয়েছে। এই ভুলের জন্য ইস্তিগফার করছি। আস্তাগফিরুল্লাহ! আস্তাগফিরুল্লাহ! আস্তাগফিরুল্লাহ! ঠিক ওয়াযের মাঝখানে তিনি এই কাজ করলেন। অন্য কেউ এমন করে দেখাক! এ কাজ সে-ই করতে পারে যে নিজেকে মিটিয়েছে, নিজেকে বিলীন করেছে এবং নফসের সূক্ষ্ম চাল সম্পর্কে অবগত হতে পেরেছে। নিজের নফসের উপর নজরদারি করে থাকে। সবসময় তার হিসাব নিতে থাকে। আপনি নিজে যদি দেখতে যান যে, যে কথা আমি বলছি, তা বড়ত্ব হিসাবে বলছি, নাকি নেয়ামতের বর্ণনা হিসাবে, তাহলে মনে রাখবেন, এতোদুভয়ের মধ্যে পার্থক্য করা বড়ো কঠিন কাজ। এটা চেনা সবার কাজ নয়।

📘 তাসাওউফ ও আত্মশুদ্ধি আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, পথ পদ্ধতি 📄 বিনয় ও নিজেকে অবমাননা করার মধ্যে পার্থক্য

📄 বিনয় ও নিজেকে অবমাননা করার মধ্যে পার্থক্য


এমনিভাবে বিনয় অত্যন্ত উৎকৃষ্ট একটি জিনিস। উঁচু স্তরের একটি গুণ। কাঙ্খিত বস্তু। আরেকটি বিষয় হলো অন্যের সামনে নিজেকে লাঞ্ছিত করা। এটা হারাম। আল্লাহ তা'আলা নিজের সম্মানকে ওয়াজিব করেছেন। নিজেকে লাঞ্ছিত করা উচিত নয়। কিন্তু কোনটা বিনয় আর কোনটা নিজেকে অপমান করা, এই দুই জিনিসের মধ্যে পার্থক্য করা সবার সাধ্যভুক্ত নয়।

📘 তাসাওউফ ও আত্মশুদ্ধি আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, পথ পদ্ধতি 📄 হযরত থানভী রহ.-এর একটি ঘটনা

📄 হযরত থানভী রহ.-এর একটি ঘটনা


এই পার্থক্য সম্পর্কে হযরত থানভী রহ. নিজের ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, আমি একবার রেল গাড়িতে সফর করছিলাম। গাড়িতে আমার কাছে কিছু গ্রাম্য লোকও বসা ছিলো। যাত্রা পথে খাবার খাওয়ার সময় হলে ঐ গ্রাম্য লোকগুলো তাদের সাথে আনা সালুন-রুটি বের করে আমাকে দাওয়াত দিয়ে বললো, হযরতজী কিছু গু-মুত আমাদের সাথেও খাও। তারা এই খাবারকে বিনয়বশত গু-মুত নাম দিয়েছে! বাহ্যিকভাবে তো এটা বিনয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা আল্লাহপ্রদত্ত রিযিকের অবমূল্যায়ন। আল্লাহপ্রদত্ত রিযিককে গু-মুত নাম দিয়ে অন্যকে খাবার খাওয়ার দাওয়াত দেওয়া বিনয় নয়, বরং আল্লাহ তা'আলার নেয়ামতের অবমূল্যায়ন, অকৃতজ্ঞতা ও অবমাননা।
মোটকথা, কখনো বিনয়ের প্রান্ত আত্ম-অবমাননার সঙ্গে গিয়ে যুক্ত হয়, আর কখনো যুক্ত হয় অকৃতজ্ঞতার সাথে। এখন কি পরিমাণ বিনয় অবলম্বন করবে আর কি পরিমাণ করবে না, কোথায় বিনয় হচ্ছে আর কোথায় অবমূল্যায়ন হচ্ছে, কোথায় বিনয় হচ্ছে আর কোথায় আত্ম-অবমাননা হচ্ছে, এগুলোর মাঝে পার্থক্য করা সবার কাজ নয়। কোনো শাইখের নিকট তারবিয়াত গ্রহণ করা ছাড়া এটা লাভ হয় না।
শুধু কিতাব পড়িয়ে দেওয়ার দ্বারা এটা লাভ হয় না। কিতাবের মধ্যে পড়ে কোনো জিনিসের পরিপূর্ণ সংজ্ঞা জানবে তারপর নিজেই তার শর্ত শারায়েত বের করবে তা হয় না। মনে রাখবেন! এটা এ ধরনের কাজ নয়। বরং হাতে-কলমে দীক্ষার মাধ্যমে এটা লাভ হয়। যখন মানুষ কোনো শাইখকে একাধারে দেখতে থাকে, তার কর্মপদ্ধতি প্রত্যক্ষ করতে থাকে, নিজের অবস্থা জানিয়ে তার থেকে দিকনির্দেশনা নিতে থাকে, তখন তার মধ্যে এই জ্ঞান ও অনুভূতি জাগ্রত হয় যে, আমল ও আখলাকের এই স্তর অর্জনযোগ্য এবং এই স্তর বর্জনযোগ্য।

📘 তাসাওউফ ও আত্মশুদ্ধি আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, পথ পদ্ধতি 📄 সুগন্ধির দৃষ্টান্ত

📄 সুগন্ধির দৃষ্টান্ত


আমি এর দৃষ্টান্ত দিয়ে থাকি যে, বড়ো থেকে বড়ো কোনো দার্শনিক ও যুক্তিবাদীকে যদি বলা হয় যে, তুমি এই গোলাপ ফুলের ঘ্রাণের এমন পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞা দাও, যার ফলে চামেলী ফুলের ঘ্রাণ থেকে তাকে পার্থক্য করা যাবে। গোলাপ ফুল থেকেও ঘ্রাণ আসছে এবং চামেলী ফুল থেকেও ঘ্রাণ আসছে। এবার বড়ো থেকে বড়ো কোনো ভাষাবিদ ও কবি সাহিত্যিককে ডেকে বলুন যে, গোলাপ ও চামেলীর ঘ্রাণের পার্থক্য বর্ণনা করুন। বলুন! কেউ পার্থক্য বর্ণনা করতে পারবে কি? কখনোই পারবে না। এই পার্থক্য জানার একমাত্র রাস্তা হলো, প্রশ্নকারীকে বলা হবে, তুমি এই গোলাপ ফুলের ঘ্রাণ শোঁকো, আর এই চামেলী ফুলের ঘ্রাণ শোঁকো। তাহলেই বুঝতে পারবে গোলাপ ফুলের ঘ্রাণ কেমন হয়, আর চামেলী ফুলের ঘ্রাণ কেমন হয়। এ ছাড়া এতোদুভয়ের পার্থক্য বোঝার আর কোনো পথ নেই।

ফন্ট সাইজ
15px
17px