📄 হযরত ওমর ফারুক রাযি.-এর আখেরাতের ভয়
তোমার আত্মমর্যাদাবোধের কথা স্মরণ হওয়ায় তোমার অনুমতি ছাড়া আমি তোমার ঘরে প্রবেশ করিনি। হযরত ওমর রাযি. এ কথা শুনে কেঁদে ফেললেন এবং বললেন,
أَوْ عَلَيْكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَغَارُ
'হে আল্লাহর রাসূল! আপনার ব্যাপারেও কি আমি আত্মমর্যাদাবোধ দেখাবো?'
এসব সত্ত্বেও হযরত ওমর ফারুক রাযি.-এর অবস্থা এই ছিলো যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকাল হলে তিনি হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান রাযি.-এর নিকট গমন করলেন। হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান রাযি.-কে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুনাফিকদের তালিকা বলেছিলেন যে, মদীনায় অমুক অমুক ব্যক্তি মুনাফিক। হযরত ওমর রাযি. তাঁর নিকট গেলেন এবং কসম দিয়ে বললেন, আল্লাহর ওয়াস্তে বলুন! হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুনাফিকদের যেই তালিকা আপনাকে বলেছেন তার মধ্যে আমার নাম নেই তো?'
হযরত ওমর ফারুক রাযি.-এর এই ভয় এ কারণে হয়েছিলো যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামানায় তো নিঃসন্দেহে আমার অবস্থা ঠিক ছিলো, যে কারণে তিনি আমাকে সুসংবাদ দিয়েছেন। কিন্তু পরবর্তীতে আমার অবস্থা খারাপ হয়ে গেলো কি না। পরবর্তীতে আমার আখলাক নষ্ট হয়ে গেলো কি না, এজন্য আমার ভয়। এঁরা ছিলেন সাহাবায়ে কেরাম! সবসময় তাঁদের এ ভয় লেগেই ছিলো যে, আমাদের আমল-আখলাকের মধ্যে ত্রুটি চলে না আসে।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৪০৩, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৪০৮, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীন নং ১০৪, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৮১১৫
২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড-৫, পৃষ্ঠা-১৯
📄 হযরত ওমর ফারুক রাযি.-এর নালা ভাঙ্গার ঘটনা
একবার হযরত ওমর ফারুক রাযি. মসজিদে নববীর মধ্যে তাশরীফ আনলেন। বৃষ্টি হচ্ছিলো। তিনি দেখলেন এক ব্যক্তির বাড়ির নালা (পানি নির্গমনী পাইপ) দিয়ে মসজিদে নববীর আঙ্গিনায় পানি পড়ছে। তিনি বললেন, বাড়ির নালা দিয়ে মসজিদের মধ্যে পানি পড়া উচিত নয়। মসজিদ এ জন্য নয় যে, মানুষ তার মধ্যে নিজের বাড়ির নালা (পানি নির্গমনী পাইপ) দিয়ে পানি ফেলবে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন এটা কার ঘর? লোকেরা বললো, এটা হযরত আব্বাস রাযি.-এর ঘর। তিনি ছিলেন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা। হযরত ওমর রাযি. বললেন, এটা ঠিক নয়। মসজিদ কারো জায়গীর হতে পারে না। তার মধ্যে ঘরের নালা (পানি নির্গমনী পাইপ) দিয়ে পানি ফেলা ঠিক নয়। একথা বলে তিনি নালাটি ভেঙ্গে ফেললেন।
📄 আমার পিঠের উপর উঠে নালা ঠিক করুন
এরপর হযরত আব্বাস রাযি. তাশরীফ আনলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, আমীরুল মুমিনীন! এই নালা আপনি কেন ভেঙ্গেছেন?
হযরত ওমর রাযি. বললেন, মসজিদে নববী ওয়াকফকৃত সম্পদ। আল্লাহ তা'আলার ঘর। আর এই নালা (পানি নির্গমনী পাইপ) আপনার ব্যক্তিগত ঘরের। মসজিদের মধ্যে এটা পড়ার প্রশ্নই ওঠে না। এই নালা লাগানো জায়েয ছিলো না, এজন্য আমি ভেঙ্গেছি।
হযরত আব্বাস রাযি. বললেন, আমীরুল মু'মিনীন! আপনার জানা নেই যে, এই নালা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুমতিক্রমে লাগিয়েছিলাম। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুমতিক্রমে লাগানো নালা আপনি ভেঙ্গে দিয়েছেন।
এ কথা শুনে হযরত ওমর ফারুক রাযি. হতভম্ব হয়ে গেলেন এবং বললেন, হে আব্বাস! বাস্তবকই কি হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুমতি দিয়েছিলেন?
হযরত আব্বাস রাযি. বললেন, হ্যাঁ, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুমতি দিয়েছিলেন।
হযরত ওমর ফারুক রাযি. বললেন, আমি আপনার সামনে হাত জোড় করে বলছি, আল্লাহর ওয়াস্তে এ কাজটি করুন। আমি এখানে ঝুঁকে দাঁড়াচ্ছি, আপনি আমার পিঠের উপর দাঁড়িয়ে এখনই এই নালা ঠিক করুন।
হযরত আব্বাস রাযি. বললেন, আপনি ক্ষান্ত হোন। আপনি অনুমতি দিয়েছেন ব্যাপার চুকে গেছে। আমি নালা লাগিয়ে নেবো।
হযরত ওমর রাযি. বললেন, কেউ আমার পিঠের উপর দাঁড়িয়ে এই নালা না লাগানো পর্যন্ত আমি শান্তি পাবো না। খাত্তাবের ছেলের এই দুঃসাহস হলো কি করে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুমতি দেওয়া নালার মধ্যে হস্তক্ষেপ করেছে এবং তা ভেঙ্গে ফেলেছে। সুতরাং হযরত ওমর রাযি. তাঁকে নিজের পিঠে আরোহণ করিয়ে ঐ নালা ঠিক করান।'
এমনটি কেন করেছেন? এজন্য করেছেন, যেন অন্তরে এই চিন্তা না জাগে যে, এখন আমি শাসক হয়েছি। আমার হুকুম কার্যকর হয়। আমি এখন ফেরাউন হয়েছি, তাই যা ইচ্ছা তাই করবো। এ কাজের মাধ্যমে এই চিন্তাকে ধ্বংস করেছেন। নিজের নফসের ইসলাহ করেছেন। তাঁরা সবসময় নিজেদের আখলাক সঠিক রাখার ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতেন।
📄 হযরত আবু হুরায়রা রাযি.-এর আত্মশুদ্ধি
হযরত আবু হুরায়রা রাযি. একজন প্রসিদ্ধ সাহাবী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসংখ্য হাদীস তিনি বর্ণনা করেছেন। শিক্ষিত সাহাবী ছিলেন। সূফী মনের বুযুর্গ ব্যক্তি ছিলেন। একবার তাঁকে বাহরাইনের গভর্নর বানানো হয়। দিনে তিনি শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করতেন, আর সন্ধ্যায় মাথায় লাকড়ির বোঝা নিয়ে বাজারের মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করে লাকড়ি বিক্রি করতেন।
এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলো, এ কাজ কেন করছেন? তিনি বললেন, আমার নফস খুবই দুষ্ট। আমার ভয় হয় শাসক হওয়ার ফলে আমার অন্তরে আবার অহংকার চলে না আসে। এজন্য আমি আমার নফসকে নিজের বাস্তব অবস্থা বারবার দেখাই যে, তোমার বাস্তবতা এই।
টিকাঃ
১. তবাকাত ইবনে সা'আদ, খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা-১২, কানযুল উম্মাল, খণ্ড-৭, পৃষ্ঠা-৬৬, মাজমাউয যাওয়ায়েদ, খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা-২০৬, হায়াতুস সাহাবা, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-৪২৪