📄 তাসাউফের সঠিক রূপরেখা
তাসাওউফের প্রকৃত রূপরেখা নীতি-চরিত্র ও অভ্যন্তরীণ আমলের সংশোধন। এর জন্য সুন্নাতের অনুসারী সঠিক ইলমের ধারক এবং সঠিক আকীদায় বিশ্বাসী ব্যক্তিকে নিজের অনুসরণীয় বানানো জরুরী। যিনি কোনো মুরুব্বীর মাধ্যমে নিজের তারবিয়াত করিয়েছেন। তার কাছে গিয়ে বলবে যে, আমি আপনার দিকনির্দেশনা চাই। তিনি তাকে দিকনির্দেশনা দান করবেন। যেমন সাহাবায়ে কেরাম রাযি. হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিজেদের মুরুব্বী বানিয়েছিলেন। তাঁর তারবিয়াত গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর মাধ্যমে নিজেদের আমল-আখলাক সংশোধন করেছিলেন। তাঁর আনুগত্য করেছিলেন। এ রূপরেখা পরিপূর্ণ সঠিক। এ পীর-মুরীদী বিশুদ্ধ এবং কুরআন-হাদীস ভিত্তিক। কুরআন-হাদীসের বিভিন্ন জায়গায় উত্তম চরিত্র গ্রহণের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। একহাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَيْمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ
📄 হযরত ওমর ফারুক রাযি.-কে জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান
'আমাকে মানুষের আখলাককে পরিশুদ্ধ করা এবং সেগুলোকে পরিপূর্ণতা দান করার জন্য প্রেরণ করা হয়েছে।”
সাহাবায়ে কেরام রাযি. নিজেদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে ন্যস্ত করেছিলেন যে, আপনি যেভাবে বলবেন আমরা সেভাবে আমল করবো। আমাদের মন চাক বা না চাক, আমাদের যুক্তি-বুদ্ধিতে ধরুক বা না ধরুক, আপনি যা কিছু বলবেন সে অনুপাতে আমরা আমল করবো। এর ফলে আল্লাহ তা'আলা সাহাবায়ে কেরাম রাযি.-এর আখলাককে এমন পরিচ্ছন্ন ও উজ্জ্বল করেন যে, তাঁদের পরে পৃথিবীর বুকে এবং আসমানের নিচে এমন উত্তম চরিত্রের লোক আর সৃষ্টি হয়নি। সাহাবায়ে কেরাম রাযি. কখনোই নিজেদের নফসের ব্যাপারে গাফেল হতেন না। তাঁরা হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তারবিয়াত লাভ করেছিলেন এবং তাঁর সোহবত তাঁদেরকে নিখাদ বানিয়েছিলো, কিন্তু এতদসত্ত্বেও সবসময় এই আশঙ্কা করতেন যে, আমরা সঠিক পথ থেকে আবার বিচ্যুত হয়ে না যাই।
হযরত ওমর ফারুক রাযি.- যাঁর সম্পর্কে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
لَوْ كَانَ بَعْدِي نَبِيًّا لَكَانَ عُمَرُ
'আমার পরে যদি কেউ নবী হতো তাহলে ওমর নবী হতো।২
যিনি নিজ কানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন, ওমর জান্নাতে যাবে। যিনি সরাসরি হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন, হে ওমর! আমি যখন মেরাজে যাই এবং জান্নাতে ভ্রমণ করি তখন জান্নাতে একটি জমকালো মহল দেখতে পাই। আমি জিজ্ঞাসা করি এ মহলটি কার? আমাকে বলা হয় যে, এটা ওমর ইবনে খাত্তাবের মহল। আমার মন চাইলো মহলের ভিতরে প্রবেশ করে দেখি। কিন্তু
টিকাঃ
১. কানযুল উম্মাল, খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা-৩৪, হাদীস নং ৫২১৭, জামউল জাওয়ামে' সূয়ূতী কৃত, খণ্ড-১, হাদীস নং ৩০০০, সুনানে বাইহাকী, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-৪৭২, হাদীস নং ২১৩০১, জামেউল আহাদীস, খণ্ড-৯, পৃষ্ঠা-৪৮৬, হাদীন নং ৮৮৯২, আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদদ্বীন, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-২৮৪, আদদুরারুল মুনতাশিরাহ, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৮
২. সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩৬১৯, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৬৭৬৪
📄 হযরত ওমর ফারুক রাযি.-এর আখেরাতের ভয়
তোমার আত্মমর্যাদাবোধের কথা স্মরণ হওয়ায় তোমার অনুমতি ছাড়া আমি তোমার ঘরে প্রবেশ করিনি। হযরত ওমর রাযি. এ কথা শুনে কেঁদে ফেললেন এবং বললেন,
أَوْ عَلَيْكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَغَارُ
'হে আল্লাহর রাসূল! আপনার ব্যাপারেও কি আমি আত্মমর্যাদাবোধ দেখাবো?'
এসব সত্ত্বেও হযরত ওমর ফারুক রাযি.-এর অবস্থা এই ছিলো যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকাল হলে তিনি হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান রাযি.-এর নিকট গমন করলেন। হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান রাযি.-কে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুনাফিকদের তালিকা বলেছিলেন যে, মদীনায় অমুক অমুক ব্যক্তি মুনাফিক। হযরত ওমর রাযি. তাঁর নিকট গেলেন এবং কসম দিয়ে বললেন, আল্লাহর ওয়াস্তে বলুন! হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুনাফিকদের যেই তালিকা আপনাকে বলেছেন তার মধ্যে আমার নাম নেই তো?'
হযরত ওমর ফারুক রাযি.-এর এই ভয় এ কারণে হয়েছিলো যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামানায় তো নিঃসন্দেহে আমার অবস্থা ঠিক ছিলো, যে কারণে তিনি আমাকে সুসংবাদ দিয়েছেন। কিন্তু পরবর্তীতে আমার অবস্থা খারাপ হয়ে গেলো কি না। পরবর্তীতে আমার আখলাক নষ্ট হয়ে গেলো কি না, এজন্য আমার ভয়। এঁরা ছিলেন সাহাবায়ে কেরাম! সবসময় তাঁদের এ ভয় লেগেই ছিলো যে, আমাদের আমল-আখলাকের মধ্যে ত্রুটি চলে না আসে।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৪০৩, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৪০৮, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীন নং ১০৪, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৮১১৫
২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড-৫, পৃষ্ঠা-১৯
📄 হযরত ওমর ফারুক রাযি.-এর নালা ভাঙ্গার ঘটনা
একবার হযরত ওমর ফারুক রাযি. মসজিদে নববীর মধ্যে তাশরীফ আনলেন। বৃষ্টি হচ্ছিলো। তিনি দেখলেন এক ব্যক্তির বাড়ির নালা (পানি নির্গমনী পাইপ) দিয়ে মসজিদে নববীর আঙ্গিনায় পানি পড়ছে। তিনি বললেন, বাড়ির নালা দিয়ে মসজিদের মধ্যে পানি পড়া উচিত নয়। মসজিদ এ জন্য নয় যে, মানুষ তার মধ্যে নিজের বাড়ির নালা (পানি নির্গমনী পাইপ) দিয়ে পানি ফেলবে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন এটা কার ঘর? লোকেরা বললো, এটা হযরত আব্বাস রাযি.-এর ঘর। তিনি ছিলেন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা। হযরত ওমর রাযি. বললেন, এটা ঠিক নয়। মসজিদ কারো জায়গীর হতে পারে না। তার মধ্যে ঘরের নালা (পানি নির্গমনী পাইপ) দিয়ে পানি ফেলা ঠিক নয়। একথা বলে তিনি নালাটি ভেঙ্গে ফেললেন।