📄 করোনাকাল আমাদের কী শেখালো?
৩১শে ডিসেম্বর ২০১৯। চীনের উহান থেকে এক ভাইরাসের অপ্রতিরোধ্য যাত্রা শুরু হ’ল। নানা জল্পনা-কল্পনার এক ঘোরলাগা প্রহর অতিক্রান্ত হ’তে না হ’তেই বিশ্ববাসী দেখতে পেল এক অদৃশ্য মহাশত্রুর হাতে কিভাবে একে একে পর্যুদস্ত হচ্ছে বিশ্বের বাঘা বাঘা শক্তিধর দেশগুলো। এ এক অকল্পনীয় দৃশ্য। অর্থ-বিত্ত, ক্ষমতা কোন কিছুই এই শত্রুর মোকাবিলায় কাজে আসছে না। পারমানবিক অস্ত্রেরও ক্ষমতা নেই এই সূক্ষ্ম, চোখে না দেখা শত্রুকে ঠেকাবার। ক্ষমতার গর্বে, বিত্তের অহংকারে স্ফীত হয়ে যেসব দেশ বিশ্বব্যাপী অন্যায়ভাবে ছড়ি ঘোরাতো, তারা আজ অসহায় হয়ে দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে ছুটছে একটুখানি আশ্রয়ের আশায়। এ এমন এক শত্রু যার ভয়ে ভীত হয়ে সারাবিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ আজ গৃহবন্দী। আসমানে বিমান উড়ে না, যমীনে গাড়ি-ঘোড়া চলে না। রাস্তার মোড়ে জটলা নেই। খেলার মাঠে শিশু-কিশোরদের কোলাহল নেই। হাসপাতাল রোগীশূন্য। আদালত আসামীশূন্য। রাস্তাঘাট জনশূন্য। হাট-বাজার ক্রেতা-বিক্রেতাশূন্য। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা শিক্ষক-শিক্ষার্থীশূন্য। স্টেশন-বিমানবন্দর যাত্রীশূন্য। কল-কারখানা শ্রমিকশূন্য। মসজিদ মুছল্লীশূন্য। হারামাইন হাজীশূন্য। সিনেমা হল, রেস্তোরাঁ, পার্ক, স্টেডিয়াম, পর্যটনকেন্দ্র কোথাও কেউ নেই। ভারত, কাশ্মীর, মিয়ানমার, ফিলিস্তীন, সিরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়া, আফগানিস্তানে প্রতিনিয়ত যারা নিত্যনতুন অস্ত্রের পরীক্ষায় ব্যস্ত ছিল, লাখো-কোটি নিরীহ আদম সন্তানের প্রাণ সংহার করে জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি ঠেকানোর দায়িত্ব নিয়েছিল, তারা আজ কোথায় যেন কঠোর নীরবতার সাথে আত্মগোপনে গেছে।
এ এমন এক ভয়ংকর গোপন আততায়ী যার হিম আতংকে অসুস্থ রোগীর যত্নে কেউ এগিয়ে আসে না। একান্ত আপনজনরাও বাড়িতে জায়গা দিতে চায় না। হাসপাতালে নিলেও খোঁজ নেয় না। মৃত্যু হ’লেও দাফন করে না। জানাযা হ’লেও উপস্থিত থাকে না। পবিত্র রামাযান মাস জুড়ে মুসলিম দেশগুলোতে চিরাচরিত সেই পারস্পরিক সৌহার্দের পবিত্র দৃশ্যগুলো অনুপস্থিত। নেই ইফতারের কোন উৎসবমুখর আয়োজন, নেই তারাবীতে মুছল্লীদের সারি। দেখা হ’লে নেই সহজাত মুছাফাহা কিংবা কোলাকুলির দৃশ্য। কি ডাক্তার, কি সাধারণ মানুষ; কি নারী, কি পুরুষ; কি মধ্যযুগীয় পশ্চাদপদ, কি আধুনিক; সবার মুখে মাস্ক আর হাতে গ্লাভস। যে হিজাব আর নেকাব পরার জন্য মুসলিম নারীদের হেনস্থার শিকার হ’তে হ’ত, আজ তা পরিধান না করলেই হয় জরিমানা। পারিবারিক মিলনমেলা বন্ধ। বিবাহ-শাদী, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান, সভা-সমাবেশ সবকিছু বন্ধ। অজানা আতংকে জগতজুড়ে কর্মচঞ্চল মানুষগুলো আজ স্রেফ ঘরবন্দী। কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন আর লকডাউনের ঘেরাটোপে গোটা মানব সমাজ নিমজ্জিত এক সীমাহীন স্থবিরতায়। এই দৃশ্যপটে ধনী-গরীব, আমীর- ফকীর কোন বাছ-বিচার নেই। সমগ্র বনু আদম আজ এক কাতারে।
প্রিয় পাঠক! ২০২০ সালের প্রথম সূর্য যেদিন উদিত হয়েছিল, সেদিন কারো মনে ঘুণাক্ষরেও কি এমন চিন্তার উদ্রেক হয়েছিল? সেদিন কেউ কল্পনা করেনি পৃথিবীর এমনরূপ কখনও দেখতে হবে। আবার করোনা পরবর্তী পৃথিবীর রূপ কেমন হবে তা নিয়েও তারা ছিল চরম দ্বিধান্বিত। পৃথিবী কি আবার আগের রূপে ফিরে যাবে, নাকি নতুন রূপে নিজেকে সাজিয়ে নেবে? বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি কোন দিকে মোড় নেবে? এক অন্তহীন জিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল গোটা মানবসমাজ। সবাই অধীর অপেক্ষায় ছিল যাবতীয় শংকা আর উদ্বিগ্নতা কাটিয়ে কবে ফিরবে সুদিন। পৃথিবী আবার কবে ফিরবে তার আপন চেহারায়। দেখতে দেখতে করোনাকালের মৃত্যুমুখর সেই ধুসর দিনগুলো অতিক্রান্ত হয়ে গেল। মৃত্যুর মিছিলে ইতিমধ্যে যোগদান করেছে কোটিখানেক বনু আদম। আক্রান্ত হয়েছে প্রায় শত কোটি মানুষ। এই তো কিছুদিন আগেই চারিদিকে ছিল হতাশার গভীর অমানিশা। অনিশ্চয়তায় ডুবে ছিল ভবিষ্যতের সকল ভাবনা।
করোনার এই মহাবিপদকাল আমাদের চোখ খুলে দেখিয়ে দিয়েছে পৃথিবীর অমোঘ বাস্তবতা। মানবতার এই চরম দুঃসময় মানুষের ভেতরটা একদম নগ্ন করে প্রকাশ করে দিয়েছে। বিপদে পড়লে যে কেউ কারো নয়, তার চাক্ষুষ প্রমাণ আমরা নিত্যই দেখেছি করোনার সেই দুর্যোগকালে। আতঙ্কের মধ্যে পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, স্বামী-স্ত্রী, পিতামাতা-সন্তান সব সম্পর্কগুলো কেমন মিথ্যা হয়ে যায়। মানুষ অমানুষ হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়মিত বুলেটিনে প্রতিনিয়ত জনসাধারণকে মানবিক আচরণ বজায় রাখার পরামর্শ দেয়া হচ্ছিল। অবশ্য এর বিপরীতপীঠে এমন অনেক দৃষ্টান্ত মিলেছে যেখানে মানবিক দায়বদ্ধতা নিয়ে মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, যা মানুষের মনে আস্থা ও প্রশান্তির অনাবিল সুবাতাস যুগিয়েছে। মানবসভ্যতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এই মহানুভব মানুষগুলো। এভাবে কখনও মানবতার মর্মন্তুদ পরাজয়, কখনও মহোত্তম বিজয়ের দোলাচলে যাপিত হয়েছে আমাদের করোনাকালের নিত্যদিন।
করোনাকালে আমাদেরকে সবচেয়ে ভাবিত করেছিল মানবতার পরাজয়ের সকরুণ দৃশ্যগুলো। শিক্ষা-দীক্ষা, সমাজ-সভ্যতা, আধুনিকতা কোন কিছুই আমাদের ভেতরকার পাশবিকতাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। মানুষ যে বিপদের সময় তার সর্বাধিক প্রিয় মানুষগুলোকেও এভাবে অবহেলায়, অনাদরে ছুঁড়ে ফেলতে পারে, তা করোনা না এলে হয়ত জানা হ’ত না। যে দৃশ্যগুলো কেবল কঠিন ক্বিয়ামত দিবসের কথা ভেবে আমরা কল্পনা করতাম, কারোনাকালে দেখা গেছে তার চাক্ষুষ বাস্তবতা। সুবহানাল্লাহ! ক্বিয়ামত দিবস সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ভাষ্য- ‘সেদিন মানুষ পলায়ন করবে নিজের ভাইয়ের কাছ থেকে, নিজের মাতা-পিতার কাছ থেকে, স্ত্রী ও সন্তান থেকে। সেদিন প্রত্যেকেরই এমন গুরুতর বিপদ থাকবে যা নিয়ে সে ব্যতিব্যস্ত থাকবে’ (আবাসা ৮০/৩৪-৩৭)। সে এতটাই দুশ্চিন্তামগ্ন থাকবে যে, নিজের সবচেয়ে নিকটতম আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধব থেকেও অমুখাপেক্ষী ও বেপরোয়া হয়ে যাবে। কেউ কারো প্রতি ভ্রূক্ষেপ করার মত অবস্থায় থাকবে না। যে মানুষ আখেরাতের তুলনায় অতীব তুচ্ছ বিপদে এভাবে পরম আত্মজনকে ছেড়ে যেতে পারে, ক্বিয়ামতের ভয়াবহ বিপদকালে তার অবস্থা কী হ’তে পারে তা বলাই বাহুল্য। ক্বিয়ামতের সেই ভয়াবহ দৃশ্যপটের বাস্তবতা আমরা তাই প্রতিনিয়তই অনুভব করেছি।
আমরা দেখেছি করোনায় আক্রান্ত শিশু সন্তানকে রংপুর মেডিকেল থেকে ঢাকায় ট্রান্সফারের পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। কিন্তু মেডিকেল থেকে স্ট্রেচারে এ্যাম্বুলেন্সে তুলতে হবে, এটুকুর জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় সন্দেহভাজন মৃত ব্যক্তিকে গোসল করানোর দায়ে একজন হাফেযকে মারধর করেছে স্থানীয় জনগণ। সিরাজগঞ্জের সন্দেহভাজন করোনা উপসর্গের রোগী বহনের দায়ে নৌকায় দেয়া হয়েছে আগুন আর মাঝিকে পিটুনি। জামালপুরে জনৈক ব্যক্তি করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে তার পরিবারের লোকজন ঢাকা থেকে নিজ যেলায় লাশ নিয়ে এলে এলাকাবাসী দাফনে বাধা দেয়। পরে ঢাকা থেকে একটি বেসরকারী সংস্থার স্বেচ্ছাসেবক দল এসে সেই ব্যক্তির কবর খোঁড়ে এবং জানাযা পড়ায়। এখানেই শেষ নয়, সেই ব্যক্তির দাফনের পর তার স্ত্রী ও সন্তানকে গ্রামবাসী তালা দিয়ে আটকে রাখে। কোন আত্মীয়-স্বজনকে তার বাড়ির ত্রিসীমানায় আসতে দেয়নি। মৃত ব্যক্তির বাড়িতে খাবার দেয়ার নিয়ম প্রতিবেশীদের। সেই সুযোগও দেয়া হয়নি। অনাহারী সেই পরিবারটি প্রতিবেশী কয়েকজনকে বাজার করে দেয়ার অনুরোধ করলে, তখন তাদেরকেও হুমকি দেয়া হয়ে যে, কেউ বাজার করে দিলে তাদেরকেও ঘরে তালা মেরে দেয়া হবে। অবশেষে স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে এর সুরাহা হয় বটে; কিন্তু পরিবারটিকে একঘরেই করে রাখা হয়। তাদের করোনা রিপোর্ট নেগেটিভ এলেও গ্রামবাসী তা বিশ্বাস করেনি। পরিবারের কর্মক্ষম মানুষটির মৃত্যুবরণে তাদের শোকাহত হওয়ারও অধিকার ছিল না। মানুষ তাদের সান্ত্বনা দেয়া তো দূরের কথা, কেউ তাদের সাথে কথাও বলেনি। এই পরিবারগুলো জানে না মানুষ কি আগে থেকে এরকম অমানবিকই ছিল, নাকি করোনাই তাদের এমন অমানবিক বানিয়েছিল।
ফেনীর সোনাগাজীতে অবতারণা হয় আরো বীভৎস দৃশ্যের। জনৈক সাহাবুদ্দীন (৫৫) চট্টগ্রাম থেকে করোনার উপসর্গ নিয়ে গ্রামে ফিরেন। কয়েক দিন পর হাসপাতালে নমুনা দিয়ে দুপুরে বাড়ী ফেরার পর পরিবারের লোকজন তাকে একটি ঘরে একা রেখে বাহির থেকে দরজায় ছিটিকিনি লাগিয়ে রাখে। দেয়া হয়নি দুপুরের খাবার। বিকেলে তার শ্বাসকষ্ট ও কাশি বেড়ে যায়। এসময় তিনি চিৎকার করে খাবার চাইলেও কেউ দেয়নি। পানি চেয়েও পায়নি। বাড়িতে ছিল তার স্ত্রী, তিন কন্যা, তিন জামাতা ও ছোট ছেলে। ছেলেটি বাবার সাহায্যে এগিয়ে যেতে চাইলে বোনেরা বাধা দেয়। এভাবে ঘরবন্দী অবস্থায় চিৎকার করতে করতে রাত ১০টার দিকে তার মৃত্যু ঘটে। অবশেষে ছোট ছেলের চিৎকার শুনে রাত একটার দিকে স্থানীয় চেয়ারম্যান এগিয়ে আসেন এবং দাফনের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু দাফনের জন্য স্থানীয় মসজিদের খাটিয়া দিতে অস্বীকার করা হয়। এমনকি কবর খোঁড়ার জন্য কোদালও দেয়নি কেউ।
গাজীপুরের এক মাকে তার নিজ সন্তানরা করোনা আক্রান্ত সন্দেহে গাড়িতে করে এনে টাঙ্গাইলের শফিপুরের জঙ্গলে ফেলে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে প্রশাসন তাকে উদ্ধার করে এবং সেই মায়ের করোনা টেস্ট নেগেটিভ এসেছিল। অন্যদিকে এক পিতা-মাতা তাদের চৌদ্দ বছরের সন্তানকে কিছু টাকা, পানি আর পাউরুটি দিয়ে রাতের আঁধারে বাঁশঝাড়ে ফেলে পালায় চট্টগ্রামের লোহাগড়ায়। ফজরের পর এক বৃদ্ধাকে মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরানো অবস্থায় দেখতে পেলে তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। দুনিয়াতে পিতা-মাতাই মানুষের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল। তারাই যদি সন্তানকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে পালিয়ে যেতে পারে, তবে পরিস্থিতি কতটা অমানবিক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে তা কল্পনা করা যায়? অনুরূপভাবে বগুড়ায় ৬৫ বছরের এক বৃদ্ধকে করোনা সন্দেহে তার স্ত্রী বাড়ি থেকে বের করে দেয় বৃষ্টিভেজা রাতে। বৃদ্ধের ছেলে-মেয়েরা নীরবে সে দৃশ্য দেখলেও তাদের অন্তরে মায়া হয়নি। পরে পুলিশ তাকে রাস্তা থেকে উদ্ধার করে।
এছাড়া এই হাসপাতাল সেই হাসপাতাল ঘুরে চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন এমন রোগীর সংখ্যা অগণিত। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীকে ভাড়াটিয়ারা বাড়িতে ঢুকতে দিতে চাইছেন না বা বাড়ি ছাড়ার জন্য নোটিশ দিয়েছেন এমন উদাহরণের তো কোন অভাব নেই। এমনকি এক স্বাস্থ্যকর্মীর বাড়িতে সারারাত ঢিল ছুঁড়ে তার পরিবারকে বাড়ি ছাড়া করার চেষ্টা চালিয়েছিল তার প্রতিবেশীরা। হাসপাতালে বাবার লাশ রেখে ছেলেরা পালিয়েছে, রাতের গভীরে নাম-পরিচয়হীন লাশ রাস্তায় পড়ে থাকছে, জানাযা-দাফনের জন্য পরিবারের কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না, এমন খবর পাওয়া গেছে হরহামেশাই। এছাড়া খবরের বাইরেও রয়েছে এমন বহু খবর।
মানবতার এমনতরো করুণ বিপর্যয়দৃশ্য দেখার পাশাপাশি আমরা দেখেছি নিজের জীবন বিপন্ন করে ডাক্তার, পুলিশসহ বিভিন্ন স্তরের দায়িত্বশীল ও সাধারণ মানুষ কিভাবে মানুষের কল্যাণে এগিয়ে এসেছিল। আমাদের চোখ অশ্রুসজল হয়েছে যখন আমরা দেখেছি শেরপুরের ঝিনাইগাতি উপজেলার অশীতিপর বৃদ্ধ ভিক্ষুক নাযীমুদ্দীন নিজের বাড়ি বানানোর জন্য জমানো দশ হাযার টাকা করোনায় কর্মহীন হয়ে পড়া দরিদ্র মানুষের সেবায় দান করেছেন। আমাদের উজ্জীবিত করেছিল নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খোরশেদ ও তার বাহিনী কর্তৃক শতাধিক লাশ দাফনের কাহিনী, যে লাশগুলো তাদের আত্মীয়-স্বজনরা পর্যন্ত দাফন করতে রাযী হয়নি করোনার ভয়ে। দেশের প্রতিটি প্রান্তে গোচরে-অগোচরে অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এবং হৃদয়বান ব্যক্তিরা সাধ্যমত অভাবী মানুষের দুয়ারে খাদ্য ও অন্যান্য সহযোগিতা পৌঁছে দিয়েছেন। মানুষ মানুষের জন্য-এই মহানব্রতকে অক্ষুণ্ণ রেখে এবং আল্লাহ্র সন্তুষ্টির লক্ষ্যে এভাবে বহু মানুষ যাবতীয় বিপদাপদকে তুচ্ছ করে সমাজসেবার ময়দানে তৎপর ছিলেন মাশাআল্লাহ। আমরা তাদের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও কৃতজ্ঞতা। আল্লাহ তাদের এই মহান খেদমত কবুল করুন- আমীন!
করোনাকালের বিপর্যয়কালে মানবতার জয়-পরাজয়ের যে চাক্ষুষ দৃশ্য আমাদের সামনে প্রতিভাত হয়েছে তা নিশ্চয়ই বর্তমান প্রজন্মের হৃদয়কন্দরে গভীর চিন্তার খোরাক যোগাবে। এই প্রজন্ম যুদ্ধ দেখেনি, সামষ্টিক কোন সংগ্রামের দৃশ্য দেখেনি, কিন্তু দেখেছে করোনা মহামারীতে বিপর্যস্ত বিশ্ব। এ এমন এক ক্রান্তিকাল, যুগান্তরের ইতিহাসে যার কোন তুলনা নেই। দৃশ্যমান কোন শত্রু ছাড়াই যে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রান্ত এভাবে অজানা আতংকে স্থবির ও নিস্তব্ধ হ’তে পারে, তার কোন উদাহরণ আমাদের জানা নেই। একটি বিশ্বযুদ্ধও বোধহয় এতটা প্রলয়ংকরী হ’তে পারত না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য উন্নতির এই যুগে এই অচিন্তনীয় ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে, মানবজাতি প্রকৃতই কতটা অসহায়, কতটা পরমুখাপেক্ষী। কেবল স্বাস্থ্যব্যবস্থাই নয়, গোটা বিশ্বব্যবস্থাই যেন ওলট-পালট হয়ে গেছে সামান্য অদৃশ্য অণুজীব মোকাবিলার অবিশ্বাস্য ব্যর্থতায়।
এই ব্যর্থতা নিশ্চয়ই বিশ্ব মানবসমাজকে আপন সীমাবদ্ধতাকে নতুনভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ দেবে। সীমালংঘনের পর সীমালংঘন করে যারা নিত্যই তৃপ্তির ঢেকুর তুলছিল, তারা তাদের পরিণতির কথা নিশ্চয়ই ভাববে। যারা অর্থ-বিত্ত আর ক্ষমতার মিথ্যা মোহে জীবনপাত করে চলেছিল, তারা জীবনের উল্টো পীঠ থেকে নিশ্চয়ই শিক্ষা নেবে। অন্যায়-অবিচার ছিল যাদের দৈনন্দিন বিনোদনের অংশ, এই রূঢ় অভিঘাত তাদের মাঝে নতুন জীবনবোধের উন্মেষ ঘটাবে। আর এই মহৎ উপলব্ধি থেকেই হয়ত জন্ম নেবে মানবতাবোধের নয়া সবক। যে সবক মানুষকে মানুষের প্রতি অধিকতর সহমর্মী করে তুলবে। অর্থহীন হিংসা-হানাহানির পথ ছেড়ে অর্থপূর্ণ মানবিক জীবনের পথে পরিচালিত করবে। আর এই পথ ধরেই তারা একদিন মহান স্রষ্টার প্রতি আত্মসমর্পণের চিরন্তন বার্তাকে প্রাণ উজাড় করে স্বাগত জানিয়ে ধন্য হবে। এটাই হোক আমাদের সর্বাঙ্গীন কামনা।
করোনাকাল আমাদেরকে দিয়েছে বহু নতুন ভাবনার উপলক্ষ। ২০০১ সালের নাইন ইলেভেন যেমন বিশ্বব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সূচিত করেছিল, ২০২০ সালের করোনা ভাইরাস হয়ত তার চেয়ে বড় পরিবর্তন এনেছে। যার নেতিবাচক দিকগুলোর মধ্যে অন্যতম হ’ল- মানুষ হয়ত দিনে দিনে আরো অসামাজিক, সন্দেহবাতিকগ্রস্ত, প্রযুক্তিনির্ভর জীব হয়ে পড়বে। আর রাষ্ট্রগুলো হয়ে পড়বে আরও বেশী জাতীয়তাবাদী ও আত্মকেন্দ্রিক। ফলে মানুষে মানুষের স্বাভাবিক সম্পর্কগুলো হয়ে পড়বে শিথিল, উষ্ণতাহীন এবং নিরেট স্বার্থপ্রণোদিত। অপরদিকে ইতিবাচক দিকগুলো হ’ল, মানুষ হয়ত অর্থ আর ক্ষমতার মোহের পিছনে ছোটা থেকে কিছুটা হ’লেও পিছপা হবে। কেননা বিপদ যখন ঘনিয়ে আসে, তখন অর্থ আর ক্ষমতা যে কোনই কাজে আসে না, তা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে করোনা। ফলে অন্যায়, পাপাচার, হিংস্রতা, অর্থ ও ক্ষমতার প্রতি লোলুপতা, অন্যের বিনাশকামিতার মত ধ্বংসাত্মক চিন্তা থেকে মানুষ বেরিয়ে এসে আরও মানবিক হওয়ার কথা ভাববে। সেই সাথে জীবন-জীবিকার ইঁদুর দৌড়ে পরিবার-পরিজনকে ভুলতে বসা মানুষ নিজেকে নিয়ে, পরিবার ও সমাজকে নিয়ে ভাবার সুযোগ পাবে। আর এভাবেই হয়ত জন্ম নেবে আগামীর পৃথিবীকে নতুনভাবে গড়ে তোলার জন্য পরিচ্ছন্ন ও ইতিবাচক চিন্তাধারার। মানবসভ্যতার পুনর্বিনিমাণে যার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
সর্বোপরি করোনা ভাইরাস নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, পৃথিবীর পরিচালনায় একজন মহান সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন, যার সামান্য ইশারায় সবকিছু নিমিষে পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে। আসমান-যমীনের যিনি একচ্ছত্র মালিক, ফিরে যেতে হবে কেবল তাঁরই কাছে। করোনা আমাদের শিখিয়েছে, আমরা যতই নিজেদের বড় মনে করি, ক্ষমতাধর মনে করি, আইনের ঊর্ধ্বে মনে করি, আসল ক্ষমতার মালিক আল্লাহ। করোনা আমাদের শিখিয়েছে বস্তুগত উপকরণে আমরা যতই সমৃদ্ধ হই না কেন, কোন কিছুই আমাদেরকে রক্ষার জন্য যথেষ্ট নয়, কোন কিছু দিয়েই মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখা যায় না, একমাত্র আল্লাহ্র ইচ্ছা ব্যতীত।
অতএব সেই মহাশক্তিধর সত্তার কাছে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণই আমাদের জীবনের পরমার্থ। বস্তুতঃ পৃথিবী ভাঙ্গা-গড়ার এই পরীক্ষা আল্লাহ এজন্যই নিয়ে থাকেন, যেন মানুষ তাঁর দিকে ফিরে আসে এবং তাঁর প্রতি আত্মসমর্পণ করে। অতএব আসুন আমরা তাঁরই কাছে পূর্ণাঙ্গভাবে আত্মসমার্পণ করি। তবেই আমরা দুনিয়া ও আখেরাতে সফলদের কাতারে অন্তর্ভুক্ত হতে পারব ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ বলেন, ‘(হে মুহাম্মাদ!) তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও, যারা তাদের উপর কোন বিপদ এলে বলে, নিশ্চয়ই আমরা তো আল্লাহ্ই এবং নিশ্চিতভাবে তাঁর দিকেই আমরা ফিরে যাব’ (বাক্বারাহ ২/১৫৬)। আল্লাহ আমাদেরকে এই পরীক্ষা থেকে উত্তরণের তাওফীক দান করুন এবং আমাদের সকল ভুল-ত্রুটি মাফ করে দিন। রোজ হাশরের কঠিনতম ময়দানে আমাদের সবাইকে তাঁর সফল বান্দাদের কাতারভুক্ত করুন এবং তাঁর জান্নাতুল ফেরদাউসের কল্পনাতীত নে’মত সাম্রাজ্যের অধিকারী হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন!
📄 নারীর প্রতি অশুভ দৃষ্টিভঙ্গি
মানুষ পাশবিকতার চরমতম পর্যায়ে না পৌঁছালে তার পক্ষে ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের মত বর্বরতার জন্ম দেয়া অসম্ভব। অথচ এই অচিন্তনীয় ঘটনাই এখন বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকার নিত্য-নৈমিত্তিক খবর। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে করোনা মহামারীর ভয়াবহ বিপর্যয় ও লকডাউনের মত কার্যত কার্ফু পরিস্থিতির মধ্যে মাত্র নয় মাসে ৯৭৫টি ধর্ষণের ঘটনা পুলিশী রেকর্ডের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে গণধর্ষণের মত ভয়ংকর অপরাধ ছিল ২০৮টি। এদের মধ্যে ৪৩ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। আর লজ্জায়-অপমানে আত্মহত্যা করেছে আরো ১২ জন নারী। এগুলো শুধু রেকর্ডভুক্ত ঘটনা। প্রকৃত সংখ্যা যে কয়েকগুণ বেশী তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কেননা এ ধরনের ঘটনার মাত্র ২০ শতাংশই প্রকাশ পায়। মান-সম্মানের ভয়ে লোকলজ্জায় বাকী ঘটনাগুলো অপ্রকাশিত থাকে। এর বাইরে করোনাকালীন পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়ে নিহত হয়েছে আরো ২৭৯ জন নারী। আর নির্যাতনে আত্মহত্যা করেছে ৭৪ জন নারী।
উপরোক্ত তথ্যগুলো থেকে কিছুটা হ’লেও আঁচ করা যায়, আমাদের সমাজ নারীদের নিরাপত্তা দিতে কতটা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে এবং কিভাবে এ সমাজে নারীরা মর্মান্তিক নির্যাতন ও নিগ্রহের শিকার হচ্ছে। অথচ দেশবিধায়কগণ দাবী করেন, দেশের আইন-কানুন ও সমাজব্যবস্থা নাকি নারীবান্ধব করে গড়ে তোলা হয়েছে! বস্তুতঃ প্রচলিত এই নারীবান্ধব সমাজ গড়ার শ্লোগান যে নারীকে কতটা অরক্ষিত ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ফেলে দিয়েছে, তা আমাদের দায়িত্বশীলগণ যতদিন পর্যন্ত উপলব্ধি না করবেন, ততদিন নারীর জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ার দাবী অবান্তরই প্রতীয়মান হবে।
সচেতন পাঠক! নারী নির্যাতন কেন হয়? বাংলাদেশের মত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে কেন এক শ্রেণীর বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ ধর্ষণের মত বর্বরতায় লিপ্ত হচ্ছে? কেন ধর্ষণের পরিসংখ্যানে বাংলাদেশ মুসলিম দেশগুলির মধ্যে প্রথম? এই ধর্ষণ মনোবৃত্তির মূল উৎস কোথায়? এই প্রশ্নগুলির উত্তর আমাদের খোঁজা দরকার। এ বিষয়ে আমাদের বক্তব্য হ’ল- ধর্ষণ যখন মহামারীর আকার ধারণ করে তখন তা কেবল ব্যক্তিগত অপরাধ থাকে না, বরং সেই অপরাধের দায় সমগ্র সমাজের উপর পড়ে। যেই সমাজে মানবিক মূল্যবোধের চর্চা নেই, নৈতিক শিক্ষার বাস্তবায়ন নেই, আইনের শাসন নেই, সেই সমাজে এই ধরনের অপরাধ যে ধারাবাহিক চলতেই থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। তাহ’লে কি আমাদের সামাজিক পরিমণ্ডলই এই ধর্ষক উৎপাদনের উর্বর রসদ যোগান দিচ্ছে? আসুন! বিষয়টি যাচাইয়ের চেষ্টা করি।
প্রথমতঃ চিন্তাশীল ব্যক্তি মাত্রই স্বীকার করবেন যে, বর্তমানে ধর্ষণ মনোবৃত্তি তৈরীতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে মিডিয়া। পত্র-পত্রিকা ও সিনেমা-টিভিতে নারীকে যেভাবে অশালীনভাবে উপস্থাপন করা হয়, তাতে নিঃসন্দেহে বলা যায়, যুবসমাজের মধ্যে বিকৃত মানসিকতা ঢুকিয়ে দেয়ার প্রাথমিক কাজটি মূলতঃ মিডিয়াই নিয়মিতভাবে আঞ্জাম দিচ্ছে। আর এর সাথে আরো ভয়ংকরভাবে যুক্ত হয়েছে অবাধ আকাশ সংস্কৃতির নীল দংশন, যার বিষাক্ত ছোবলে একশ্রেণীর যুবসমাজের মন-মস্তিষ্ক পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে ফেলেছে। সুতরাং আইন যতই কঠোর করা হোক না কেন, যদি মিডিয়ার এই জঘন্য উৎসমুখ বন্ধ না করা যায়, তবে কখনই সুস্থ ও নিরাপদ সমাজব্যবস্থা কামনা করা সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়তঃ নাটক, সিনেমা, বিজ্ঞাপন সবকিছুর মূল উদ্দেশ্য যেন একটিই- নারী-পুরুষের অনৈতিক সম্পর্ককে উৎসাহিত করা। নারী-পুরুষ বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ককে সেখানে এত স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন তা কোন অপরাধের সংজ্ঞাতেই পড়ে না। ফলে যেনা-ব্যভিচারের বিস্তার দিন দিন বাড়ছে। নারী-পুরুষ সহজেই তাদের ইয্যত-আব্রু বিকিয়ে দিচ্ছে। এর বিপরীতে বিবাহ তথা বৈধ সম্পর্ককে দিন দিন করা হচ্ছে কঠিন থেকে কঠিনতর। পরিবার থেকে যেমন দ্রুত বিবাহকে উৎসাহ দেয়া হয় না, তেমনি সমাজও দ্রুত বিবাহকে অস্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখে। ফলে একদিকে নারী-পুরুষের বৈধ সম্পর্কের পথ কঠিন হয়ে যাচ্ছে, অপরদিকে সহজসাধ্য হচ্ছে অনৈতিক সম্পর্ক, যেনা-ব্যভিচার।
তৃতীয়তঃ নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও সহশিক্ষা অনৈতিকতা বিস্তৃতির অন্যতম কারণ। নারী শিক্ষা, নারী উন্নয়ন, লিঙ্গ বিদ্বেষ ও বৈষম্য দূরীকরণ তথা নারীর কর্মসংস্থানের নামে বর্তমানে যে প্রোপাগাণ্ডা চলছে, তার একটিই উদ্দেশ্য নারীদেরকে ক্ষমতায়নের প্রলোভন দেখিয়ে ঘর থেকে বের করে জীবন-জীবিকার কঠিন ময়দানে নামিয়ে দেয়া। তাতে সমস্যা ছিল না, যদি তাদের জন্য স্বতন্ত্র ও নিরাপদ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়া হ’ত। কিন্তু তাদেরকে পুরুষের সাথে প্রতিযোগিতায় লাগিয়ে দিয়ে রীতিমত যুদ্ধে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। অপরদিকে সহশিক্ষার নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পবিত্র অঙ্গনে তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতীদেরকে অবাধ মেলামেশার সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। নৈতিকতার মহা পরীক্ষায় সেখানে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হ’তে পারে না। ফলে মানবীয় প্রবৃত্তির দুর্বলতম অংশের কাছে পরাজিত হয়ে অতি সহজে তারা অনৈতিকতার পথে পা বাড়াচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে পাপ-পঙ্কিলতার মহাসাগরে। এদেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন যেন ইভটিজিং, যেনা-ব্যভিচার ও অবাধ যৌনাচারের অনুশীলনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। জোড়ায় জোড়ায় অন্তরঙ্গভাবে বসে থাকা নর-নারীর প্রকাশ্য অপকর্মে শয়তানও বোধহয় লজ্জিত হয়। অথচ ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে নীরবে আমরা তা হযম করে চলেছি অহর্নিশ।
চতুর্থতঃ পথেঘাটে নারীর পর্দাহীন এবং অশালীন চলাফেরা নিঃসন্দেহে ধর্ষকদের কুপ্রবৃত্তি তৈরীতে বড় ভূমিকা রাখছে। নৈতিক মূল্যবোধ, লজ্জাশীলতা ও ইসলামের দেয়া নীতিমালাকে অবজ্ঞা করে একজন নারী যখন অশালীন পোষাকে ঘর থেকে বের হয়, তখন সে যেন সমাজের কুরুচিশীল কীটগুলোকে অনৈতিকতার দিকে প্রচ্ছন্ন আহ্বান জানায়। সুতরাং নারীবাদীরা ধর্ষণের পিছনে পর্দাহীনতার পরোক্ষ দায় যতই আড়ালের চেষ্টা করুক না কেন, যতদিন নারী স্বেচ্ছাচারী ও পর্দাহীন থাকবে, ততদিন নারীর প্রতি সহিংসতা বিদূরিত হওয়া অসম্ভব।
পঞ্চমতঃ যদিও সরকার ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছে, কিন্তু সেই আইনের বাস্তবায়ন না হওয়া এবং প্রচলিত বৃটিশ বিচারব্যবস্থার সীমাহীন দুর্বলতাও নারী নির্যাতন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। ২০০১ থেকে ২০২০ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত নারী নির্যাতন মামলা সমূহ পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ পর্যন্ত আদালতে মাত্র ৩.৫৬% মামলার রায় হয়েছে। আর উচ্চ আদালতের জটিলতা কাটিয়ে মাত্র ০.৩৭% মামলায় দণ্ডাদেশ কার্যকর হয়েছে। শুধু তাই নয়, পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৬টি জেলায় ধর্ষণের অভিযোগে ৪৩৭২টি মামলা হয়েছে। কিন্তু দোষী সাব্যস্ত করা গেছে মাত্র ৫ জনকে। অর্থাৎ মুখে মুখে আইনের বুলি কপচানো হ’লেও বাস্তবে এসব মামলা ও আইনী ব্যবস্থা কেবল প্রহসন ছাড়া কিছু নয়। শুধু তাই নয়, অর্থ ও ক্ষমতার দাপটে প্রকৃত দোষীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে আড়ালে থেকে যায়। বিপদগ্রস্ত হয় নির্দোষীরা। সুতরাং নারী নির্যাতন প্রতিরোধ করতে গেলে প্রচলিত এই বিচারব্যবস্থার আশু পরিবর্তন কিংবা সংস্কারের কোন বিকল্প নেই। ইসলামের কঠোর বিচারব্যবস্থা যদি চালু করা যেত, তবে নিঃসন্দেহে নারীর প্রতি সহিংসতার হার বহুলাংশেই নিবারণ করা সম্ভব হ’ত।
সর্বোপরি নারীদের প্রতি আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতেই বিরাট ত্রুটি রয়ে গেছে। আমাদের পরিবারে ও সমাজে ইসলামের নৈতিক শিক্ষার চর্চা না থাকায় নারীদেরকে একদল মানুষ ভোগ্যপণ্য মনে করে যথেচ্ছ ব্যবহার করছে। অপরদল নিছক সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র মনে করে। অথচ পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সুষ্ঠু সমাজ গঠনে তাদের ভূমিকাও অপরিসীম। তারা কখনও আমাদের মা, কখনও বোন, কখনও স্ত্রী, কখনও কন্যা। একশ্রেণীর বিপথগামী নারীদের কারণে নারীদের প্রতি আমাদের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হ’তে পারে না। সুতরাং পরিবার ও সমাজে নারীর যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। সেই সাথে শারঈ পর্দা, দৃষ্টির হেফাযতসহ তাদের প্রতি ইসলামের নির্দেশিত হকগুলো আদায় করতে হবে। পরিবার ও সমাজে এই আদর্শিক মূল্যবোধের চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। নতুবা শুধু আইন দিয়ে নারী নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব নয়।
যুবসমাজের প্রতি আহ্বান, একজন পুরুষ যদি নারী নিজের মা-বোনের আসনে রাখে, তবে তাদের প্রতি অসংগত বা অভব্য আচরণের কোন প্রশ্নই আসতে পারে না। সুতরাং নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধকে শক্তিশালী করুন। আল্লাহকে ভয় করুন। নিজের ব্যক্তিত্বের সুরক্ষা ও চারিত্রিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ রাখতে চাইলে অবশ্যই নারীদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধার দৃষ্টিভঙ্গি রাখতে হবে। যদি তা না থাকে, তবে যেকোন সময় চারিত্রিক অধঃপতন নেমে আসবে। অতএব আসুন নিজেরা সর্বতোভাবে পবিত্র থাকি এবং নিজেদের ব্যক্তিত্বে সুস্থ চিন্তা ও ইসলামী মূল্যবোধের বিকাশ ঘটাই। সেই সাথে সমাজকেও পবিত্র রাখার জন্য সার্বিক প্রচেষ্টা গ্রহণ করি। প্রচলিত কিশোর গ্যাং কালচার, বয়ফ্রেণ্ড-গার্লফ্রেণ্ড কালচার, বখাটেপনা, ইভটিজিং, যেনা-ব্যভিচার ও পর্দাহীনতা প্রভৃতি সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চারকণ্ঠ হই। এভাবে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যদি আমরা একটি সচেতন, জাগ্রত ও আল্লাহভীরু প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারি, তাহ’লে এসব অপরাধ সামাজিকভাবেই দমন হবে ইনশাআল্লাহ।
সরকারের প্রতিও আমাদের আহ্বান থাকবে- কেবল ধর্ষণের বিরুদ্ধে কেতাবী আইন নয়; বরং বাস্তবতার ময়দানে এই জঘন্য পাপাচারের উৎসমুখগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে এবং তা সমাধানের জন্য সর্বাত্মক ও বাস্তবমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। অপরাধী ও পাপীষ্ঠদের সহযোগী, যুলুম ও প্রতারণায় ভরপুর বৃটিশ আইনের পরিবর্তে স্বচ্ছ, মানবিক ও ন্যায়বিচারপূর্ণ ইসলামী আইন ও বিচারব্যবস্থা চালু করতে হবে। আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন এবং আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে যাবতীয় অন্যায় ও অনৈতিকতার বিরুদ্ধে ইসলামের রূপরেখা মেনে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণের তাওফীক দান করুন- আমীন!