📄 যেতে হবে বহুদূর!
বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের ইসলামী ঘরানায় এক ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তনের জোয়ার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘকাল সামাজিক প্রেক্ষাপটে আপাত পিছিয়ে পড়ে থাকা ধর্মীয় অঙ্গনের মানুষগুলো নতুন করে যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছেন। সমাজ থেকে সযত্নে গাঁ বাঁচিয়ে চলাকে যে সকল ওলামায়ে কেরাম এক সময় তাক্বওয়া ও মুক্তির পথ মনে করতেন, তারা এখন দেদার সমাজ সম্পৃক্ত কাজে যুক্ত হচ্ছেন। মিডিয়া, সামাজিক ও দাতব্য কর্মকাণ্ড, প্রকাশনা প্রভৃতি অঙ্গনে তাদের সরব উপস্থিতি এক নতুন জাগরণের আভাস দিচ্ছে। ফলে যারা এক সময় ধর্মচর্চায় যুক্ত মানুষগুলোর প্রতি নাক সিটকানোর ভাব দেখাতেন, কুপমণ্ডুকতার দায়ে তাদেরকে কথায় কথায় হেয় করতে চাইতেন, তাদের মাঝে হঠাৎ ধর্মীয় ঘরানার প্রতি কিছুটা হ’লেও সুনজর লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এই জাগরণের ভবিষ্যৎ এখনই অনুমান করা কঠিন, তবে নিঃসন্দেহে তা আশাব্যঞ্জকই বলতে হবে। আর তা এই কারণে যে, এই ধর্মীয় গণজাগরণে যে জিনিসটি ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে, তা হ’ল সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্ম সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি হওয়া। তাদের মধ্যে সত্য জানার আগ্রহটা আগের তুলনায় এখন অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। এদেশে ধর্মের নামে হাযারো কুসংস্কার যে শত শত বছর ধরে চেপে বসে আছে এবং কুরআন-হাদীছের ইসলাম আর প্রচলিত রেওয়াজী ইসলাম যে এক নয়, তা বহু মানুষের উপলব্ধিতে আসতে শুরু করেছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বরং সম্প্রতি পাকিস্তান, শ্রীলংকা, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া সফরেও প্রায় একই দৃশ্য দেখেছি। মানুষ এখন উন্মুখ হয়ে আছে সত্যিকার ইসলামের পতাকাবাহকদের জন্য। এক মরুভূমিসম তৃষ্ণা নিয়ে তাদের হৃদয় অপেক্ষা করছে নতুন দিনের অশ্বারোহীদের জন্য। যারা মানুষকে ইসলামের সরল ও সঠিক পথের দিকে ডাকবে, জাহেলিয়াতের ঘোর অমানিশাকে ছিন্ন করে হকের দৃপ্ত প্রদীপ জ্বালাবে।
এই প্রেক্ষাপটে ইসলামী আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ার কাজে যারা সম্পৃক্ত রয়েছেন, তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হ’ল, এই জাগরণকে সঠিক পথে পরিচালিত করা এবং এদেশের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মীয় অঙ্গন, সমাজ ও রাজনীতিতে অর্থবহ পরিবর্তনের জন্য দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে আসা। আর এজন্য প্রয়োজন ময়দানে একদল সত্যসেবী মানুষের সক্রিয় পদচারণা এবং ধৈর্য, বিচক্ষণতা ও অবিচলতার সাথে পরিস্থিতির মুকাবিলা করা। তাদের দায়িত্বশীলতা এবং দৃঢ়পদ ভূমিকার উপরই নির্ভর করছে এই জাগরণের ভবিষ্যৎ।
লক্ষণীয় বিষয় হ’ল, এই জাগরণে সবচেয়ে বড় নিয়ামক শক্তি যেমন আলেম সমাজ, তেমনি সবচেয়ে বড় বাধাও হ’ল আলেম সমাজ। তাদের সঠিক ভূমিকার কারণে সমাজ যেমন ব্যাপকভাবে উপকৃত হ’তে পারে, তেমনি তাদের অনৈতিক ভূমিকার কারণে এই জাগরণ আবার অচিরেই বিপর্যস্ত হয়ে নিভে যেতে পারে। এজন্য একদিকে আলেম সমাজকে যেমন অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, তেমনি সাধারণ জনগণকেও বিশেষভাবে নযর রাখতে হবে, যেন কিছু আলেমের পদস্খলনের কারণে সমগ্র সমাজ পদস্খলিত না হয়। ওমর বিন খাত্ত্বাব (রাঃ) বলেন, দ্বীন ইসলামকে ধ্বংস করে তিনটি জিনিস- (১) আলেমদের পদস্খলন, (২) কুরআন নিয়ে মুনাফিকদের বিতর্ক, (৩) নেতাদের পথভ্রষ্ট হওয়া (জামে’উ বায়ানিল ইলম হা/১৮৬৭)। এর ব্যাখ্যায় সাধারণ মানুষের করণীয় সম্পর্কে মু’আয বিন জাবাল (রাঃ) বলেন, আলেমদের ব্যাপারে দু’টি পন্থা অবলম্বন করবে। যদি তারা সঠিক পথে থাকেন, তবে তাদের অন্ধভাবে অনুসরণ করবে না। আর যদি তারা ফিৎনায় নিপতিত হন, তবে তাদের থেকে ধৈর্যহারা হয়ে ছিটকে যাবে না। কেননা মুমিন ফিৎনায় পতিত হ’লে তওবা করে (অর্থাৎ তাদের প্রতি সুধারণা রেখে তাদের তওবার অপেক্ষায় থাকবে) (জামে’উ বায়ানিল ইলম হা/১৮৭২)। এভাবে পারস্পরিক দায়িত্বশীল ও সহমর্মী ভূমিকার মাধ্যমেই দ্বীনের এই পবিত্র জাগরণ সঠিক গন্তব্যপানে এগিয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। এই সুধারণা ও আশাবাদ আমরা আন্তরিকভাবে পোষণ করি।
আলহামদুলিল্লাহ এই দ্বীনী গণজাগরণেরই প্রতিনিধি হিসাবে আল্লাহর অশেষ রহমতে এদেশের বুকে আহলেহাদীছ আন্দোলন এই গণজাগরণের প্রতিনিধি হিসাবে এদেশের বুকে হকের আওয়ায বুলন্দ করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। আহলেহাদীছ সংগঠনগুলোর নানামুখী তৎপরতার মাধ্যমে এদেশের গণমানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে বিশুদ্ধ ইসলামী আক্বীদা ও আমলের বার্তা। পৌঁছে যাচ্ছে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের দিকে প্রত্যাবর্তনের বার্তা, ন্যায় ও ইনছাফের বার্তা। সর্বোপরি ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় জীবন পর্যন্ত জীবনের সবগুলো ক্ষেত্রকে অহি-র আলোয় ঢেলে সাজানোর বার্তা। এদেশের ধর্মীয় অঙ্গন থেকে শিরক-বিদ’আতকে উৎখাত করে তাওহীদ ও ছহীহ সুন্নাহ্হ্ কার্যকর চাষাবাদ এবং সমাজ ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গন থেকে সকল প্রকার বিজাতীয় মতবাদকে উৎখাত করে ইসলামের সাম্য ও ন্যায়বিচারকে প্রতিষ্ঠাদানের সুস্পষ্ট ও বলিষ্ঠ লক্ষ্যকে সামনে রেখে এই আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে সর্বত্র।
সুতরাং যুবসমাজের প্রতি আমাদের আহ্বান- আসুন! আমরা সম্মিলিতভাবে এই আন্দোলনের বার্তাকে দেশের প্রতিটি কোণায় কোণায় পৌঁছে দেয়ার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করি। ধৈর্য, সাহস ও আত্মবিশ্বাসের সাথে এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হই। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহ.), ইমাম ইবনু তায়মিয়া (রহ.), ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহ্হাব (রহ.), শাহ ইসমাঈল শহীদ (রহ.), সাইয়েদ নিছার আলী তিতুমীর (রহ.) প্রমুখের রেখে যাওয়া সেই সমাজ সংস্কার আন্দোলনের এই ধারাবাহিক উত্তরাধিকারকে আমাদের এগিয়ে নিতেই হবে। আমাদের মধ্যে হাযারো ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকবে, মতভেদ থাকবে, চলার পথে থাকবে অসংখ্য বাধা ও বিপদ। কিন্তু তাই বলে যে বিশুদ্ধ ঈমান-আক্বীদা ও আমলের আহ্বান আমাদেরকে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাতছানি দেখিয়েছে, তা আমরা কখনও হাতছাড়া করতে পারি না। যত বাধাই আসুক না কেন, সকল বাধার প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে সত্য সূর্যের আলো আমরা সর্বত্র ছড়িয়ে দেবই। জান্নাতের পথে ছুটে চলার এই মিছিলকে আমরা বেগবান করবই। জাহেলিয়াতের তিমিরে ডুবে থাকা মানুষকে আলোর পথ দেখাবই।
উদয়ের পথে শুনি কার বাণী/ ভয় নাই ওরে ভয় নাই
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান/ক্ষয় না তার ক্ষয় নাই।
ঐ শুনুন আল্লাহ্ বাণী- ‘তোমরা হীনবল হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না, তোমরাই তো বিজয়ী, যদি তোমরা মুমিন হও’ (আলে ইমরান ৩/১৩৯)। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফীক দান করুন- আমীন!
📄 অহি-র আলোয় উদ্ভাসিত হোক বাংলার প্রতিটি ঘর
ক্বিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীর প্রতিটি ঘরে ঘরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে যাবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, এ যমীনের উপর এমন কোন মাটি কিংবা পশমের ঘর (তাঁবু) বাকী থাকবে না, যে ঘরে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইসলামের বাণী পৌঁছিয়ে দেবেন না। সম্মানীর ঘরে সম্মানের সাথে; আর লাঞ্ছিতের ঘরে লাঞ্ছনার সাথে তা পৌঁছাবেন। এদের মধ্যে কাউকে আল্লাহ তা’আলা সম্মানিত করবেন এবং (স্বেচ্ছায়) ইসলাম কবূলের জন্য উপযুক্ত করে দেবেন। আবার কাউকে লাঞ্ছিত করবেন এবং তারা বাধ্য হয়ে এই দ্বীনের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করবে (অর্থাৎ সকল দ্বীনের উপর ইসলাম বিজয়ী হবে) (আহমাদ, মিশকাত হা/৪২)।
এই হাদীছের প্রেরণাকে সামনে রেখে আমরা যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি তা হ’ল- ‘অহি-র আলোয় উদ্ভাসিত হোক বাংলার প্রতিটি ঘর’। অর্থাৎ আমরা চাই বাংলার যমীনে প্রতিটি গৃহে, প্রতিটি ঘরে অহি-র বার্তা পৌঁছে যাক সগৌরবে। ধনী হোক, গরীব হোক; শিক্ষিত হোক কিংবা অশিক্ষিত- কেউ যেন এই মহান দাওয়াত থেকে বঞ্চিত না হয়। প্রত্যেকের কাছে যেন এই বার্তা পৌঁছে যায় যে, ইসলাম হ’ল তাওহীদ তথা এক আল্লাহর সার্বভৌমত্বের নাম। এতে কোন শরীকানা নেই। হোক তা সৃষ্টি পরিচালনায় কিংবা মানব সমাজের দৈনন্দিন ইবাদত-বন্দেগী, কার্যবিধিতে। রব হিসাবে, ইলাহ হিসাবে, নামে-বৈশিষ্ট্যে-গুণাবলীতে সর্বত্র তাঁর এক ও একক অবস্থান। তাতে না আছে বিন্দুমাত্র ক্ষান্তি ঘটানোর কোন অবকাশ; আর না আছে অংশীদারিত্ব দাবী করার মত কোন ধৃষ্টতার সুযোগ। মহান প্রভুর স্পষ্ট ঘোষণা- জেনে রেখ, সৃজন ও আদেশ তাঁরই। তিনি মহিমাময় বিশ্ব প্রতিপালক (আ’রাফ ৭/৫৪)।
সুতরাং যাবতীয় সিজদা-আরাধনা, কামনা-বাসনা, আশা-ভরসা, ভক্তি-অনুরক্তি কেবল তাঁর কাছেই নিবেদিত হ’তে হবে। মান্য করতে হবে কেবল তাঁরই দেয়া বিধি-বিধান, তাঁরই প্রেরিত প্রত্যাদেশ-নির্দেশনা। এর ব্যত্যয় ঘটানোর কোন সুযোগ নেই। মহান রবের এই একচ্ছত্র আধিপত্য মেনে নেয়া ও তাঁর ইচ্ছার কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্যেই নিহিত রয়েছে বান্দার সফলতা ও মুক্তির চাবিকাঠি। আর এর বিপরীতে স্রষ্টার আধিপত্যে সামান্যতম বিঘ্ন ঘটায় এমন যা কিছু রয়েছে, তা-ই শিরকের প্রতিভূ, তা-ই পরিত্যাজ্য। তাতেই রয়েছে যাবতীয় অশান্তি আর ধ্বংসের সুলুক।
দ্বিতীয়তঃ পার্থিব জীবনে আমাদের একমাত্র চলার পথ রাসূল (ছাঃ) আনীত রবের প্রত্যাদেশ আর তাঁর প্রদর্শিত সুন্নাত। আমাদের যাবতীয় ইবাদত-আমল, আইন-সংবিধান, আচার-বিধি, সাহিত্য-সংস্কৃতি, লাইফস্টাইল-সবই পালিত হবে কুরআন ও সুন্নাহ বর্ণিত পন্থায়। এতেই রয়েছে যাবতীয় কল্যাণের দিশা, মানবীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের সঠিক পরিচর্যা। এর বিপরীতে যত পথ ও মত, যত বুযুর্গ ও আকাবির, যত মান্য ও শ্রদ্ধেয়- সবই অগ্রহণযোগ্য, মানবতা বিধ্বংসী ও অকল্যাণের দিশারী। তা আপাতঃদৃষ্টিতে যতই গ্রহণযোগ্য ও শ্রুতিমধুর মনে হোক না কেন। সুতরাং নির্ভেজাল তাওহীদের বিশ্বাস এবং পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ্ পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের নামই হ’ল ইসলাম। এর বাইরে ইসলামের নামে যত পথ ও মতের দিকে আহ্বান করা হোক না কেন, তা কখনই প্রকৃত ইসলাম নয়; বরং ইসলামের নামে মিথ্যাচার ও প্রতারণা। এই বার্তাটুকুই আমরা এদেশের সকল মুসলমানের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে চাই। আমরা জানাতে চাই- ‘আসুন! পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে জীবন গড়ি’। ‘সকল বিধান বাতিল কর অহি-র বিধান কায়েম কর’। কতজন এই দাওয়াত গ্রহণ করল- তা আমাদের বিবেচ্য নয়; বরং কতজনের কাছে এই দাওয়াত পৌঁছানো গেল সেটাই মূল বিবেচ্য।
আল্লাহর পথে দাঈ হিসাবে যারা কাজ করবেন, তাদের উদ্দেশ্যে আমাদের উদাত্ত আহ্বান হ’ল, যাবতীয় ষড়যন্ত্র-বিভ্রান্তি, অলসতা-বিলাসিতা, হিংসা-বিদ্বেষ দু’পায়ে দলে যার যতটুকু জ্ঞান, যোগ্যতা ও ক্ষমতা আছে সবটুকু ব্যয় করে সাধ্যমত মানুষের কাছে হকের দাওয়াত তুলে ধরুন। স্মরণ করুন আল্লাহ্ বাণী- ‘আর তার চেয়ে কার কথা উত্তম যে আল্লাহ্ দিকে আহ্বান জানায় এবং সৎকাজ করে। আর বলে, আমি তো আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)’ (হা-মীম সাজদাহ ৪১/৩৩)। অন্তরে জাগ্রত রাখুন রাসূল (ছাঃ)-এর সেই চিরন্তন প্রেরণাবাণী- ‘আল্লাহ্র কসম! তোমার দ্বারা যদি একটি মানুষও হেদায়াত লাভ করে, তা হবে তোমার জন্য (আরবের মূল্যবান সম্পদ) লাল উট লাভের চেয়ে উত্তম’ (বুখারী হা/৩৭০১; মুসলিম হা/২৪০৬)। সেই সাথে এই মহান দায়িত্ব পালনের জন্য বিশেষ কিছু গুণাবলীর অধিকারী হ’তে হবে। যেমন-
(১) লক্ষ্যের দৃঢ়তা এবং হকের উপর সদা ইস্তিকামাত বা অবিচল থাকা। লক্ষ্যহীন ও দুর্বলচিত্ত মানুষ কখনও হকের দাওয়াত প্রচারের জন্য উপযুক্ত নয়। যিনি দাঈ হবেন, তাকে অবশ্যই লক্ষ্য সচেতন হ’তে হবে, সাহসী হ’তে হবে, আত্মবিশ্বাসী হ’তে হবে। কোন দুনিয়াবী স্বার্থে ও প্রলোভনে হক থেকে তার অবস্থান বিন্দুমাত্র নড়চড় হবে না। বাতিলের চাকচিক্য দেখে তিনি প্রতারিত হবেন না। বিপদ কিংবা সমস্যার ঘনঘটা তাকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করবে না।
(২) নৈতিক চরিত্রের অধিকারী হওয়া। চারিত্রিক পবিত্রতা একজন দাঈর অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। যে ব্যক্তি পাপ ও অন্যায় কাজ থেকে বাঁচার চেষ্টা করে না, কুপ্রবৃত্তিকে দমনে সতর্ক থাকে না, তাক্বওয়া অবলম্বন করা না, সে ব্যক্তি খুব সহজেই শয়তানের ফাঁদে আটকা পড়ে যায়। সুতরাং দাঈকে অবশ্যই দৃঢ় নৈতিক চরিত্রের অধিকারী হ’তে হবে। শয়তানের হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য সদা সতর্ক প্রহরীর ভূমিকা পালন করতে হবে। যেখানে অনৈতিকতার হাতছানি, যেখানে পাপের সম্ভাবনা, সেখান থেকে নিজেকে যোজন যোজন দূরে রাখতে হবে।
(৩) সততা ও আমানতদারিতা। এই গুণে গুণান্বিত ব্যক্তি পৃথিবীর সর্বত্রই সফল। যার মধ্যে উক্ত গুণাবলীর প্রভাব যত বেশী, সে লক্ষ্য অর্জনে তত বেশী সফল। সুতরাং দাঈর জন্য সর্বাবস্থায় কথায় ও কর্মে সৎ, নীতিবান, আমানতদার ও ন্যায়পরায়ণ থাকা অপরিহার্য।
(৪) ধৈর্য। বিপদসংকুল পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত নানা মাত্রার প্রতিকূল পরিবেশ আমাদেরকে সদা আচ্ছন্ন করে। হতাশা, কষ্ট, ভয়-ভীতি আঁকড়ে ধরে। উর্ধ্বতনদের বাধা এবং অধীনস্থদের অবাধ্যতার মুখোমুখি হ’তে হয়। এমতাবস্থায় আমাদের রক্ষাকবচ হ’ল ধৈর্য। ধৈর্যশীলতার একমাত্র পরিণাম সফলতা। সুতরাং একজন দাঈকে সমাজ সংস্কারের ময়দানে ধৈর্যশীলতার মূর্ত প্রতীক হ’তে হবে।
(৫) সদাচরণ। দাঈ যত জ্ঞানী বা পরহেযগার হোক না কেন, তার মুখের ভাষা ও আচরণ যদি হয় অসংযত, যদি তার অন্তর হয় অপরের প্রতি শুভকামনাহীন ও বিদ্বেষপরায়ণ; তার পক্ষে দাওয়াতী ময়দানে নামাই অর্থহীন। দাঈকে অবশ্যই সদাচরণ রপ্ত করতে হবে। মানুষের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার মত উত্তম গুণাবলীসম্পন্ন হ’তে হবে।
পরিশেষে প্রাণপ্রিয় যুবক ভাইদের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে, অহীভিত্তিক বিশুদ্ধ ইসলামের বার্তাকে সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়ার মিশনকে যেন আমরা আমাদের জীবনের মহোত্তম লক্ষ্য বানিয়ে নেই এবং এই মহান সংস্কার আন্দোলনের যোগ্য কর্মী হিসাবে নিজেদের গড়ে তুলি। আমাদের সমাজ ও আমাদের পরিপার্শ্বকে আল্লাহ্র বিধান অনুযায়ী পরিচালনার জন্য সর্বাত্মক ভূমিকা গ্রহণ করি। বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে যেন পৌঁছে যায় হকের আওয়ায। বাংলার যমীন যেন একদিন পরিণত হয় বিশুদ্ধ দ্বীনের এক উর্বর চারণক্ষেত্রে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে সেই তাওফীক দান করুন এবং আমাদের সকলকে তাঁর দ্বীনের মর্দে মুজাহিদ হিসাবে কবুল করে নিন। পরজীবনে জান্নাতের চিরশান্তির আবাসস্থলের অধিকারী হওয়ার তাওফীক দিন- আমীন!
📄 বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কবে হবে প্রকৃত বিদ্যার আলয়?
বিগত ৮০-এর দশক থেকে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্ররাজনীতির বিষফল হিসাবে ক্যাম্পাসগুলো পড়ালেখার পরিবর্তে সন্ত্রাসের উর্বর লালনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। জ্ঞানের প্রাণকেন্দ্রে জ্ঞানবিমুখ কর্মকাণ্ড নিয়মিত দেখতে দেখতে এ জাতির বিস্মিত হওয়ার শক্তিও বোধহয় এখন নিঃশেষ হয়ে গেছে। ভাবতে অবাক লাগে দেশের কর্ণধার হিসাবে যারা দায়িত্ব পালন করছেন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনসহ সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলো যারা দেখভাল করছেন, তারা বছরের পর বছর জাতিগত অধঃপতনের এই নিকৃষ্টতম দৃশ্য কিভাবে সহ্য করছেন! সর্বোচ্চ মেধার লালনকেন্দ্র হিসাবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে প্রধান নিয়ামক শক্তি হওয়ার কথা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের। হওয়ার কথা ছিল জাতীয় গুরুত্বের শীর্ষ কেন্দ্র। শিক্ষা ও গবেষণার প্রাচুর্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হওয়ার কথা ছিল জ্ঞানের একেকটি খনি। অথচ তথাকথিত রাজনীতির বিষবাষ্প ঢুকে গোটা ব্যবস্থাপনা এমনভাবে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে যে, বিশ্ববিদ্যালয় এখন যাবতীয় অন্যায়, দুর্নীতি, কুশিক্ষা আর অনৈতিকতার অবাধ অনুশীলনকেন্দ্র বললে অত্যুক্তি হয় না।
ফলশ্রুতিতে বিশ্ববিদ্যালয় এখন আর জ্ঞানকেন্দ্র নয়, বরং নিছক সার্টিফিকেট বিতরণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। যে ছাত্রটি উদয়াস্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করে মেধার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় পা দিয়েছিল, সে এখন আর জ্ঞানার্জনে নয়; বরং ব্যস্ত ছাত্ররাজনীতির নামে আধিপত্য বিস্তার আর টেন্ডারবাজির প্রতিযোগিতায়। দুর্নীতির বাস্তব দীক্ষা তারা গ্রহণ করা শুরু করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই নামক দানবদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে। গণরুম কালচার, টর্চার সেল, র্যাগিং ইত্যাদি ভয়ংকর ও অবিশ্বাস্য অপরাধকর্মের সাথে তাদের পরিচয় ঘটছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই। এর সাথে রয়েছে কথায় কথায় আন্দোলন, মিছিল-মিটিং, ভাঙচুর আর শিক্ষকদের সাথে বেয়াদবির সংস্কৃতি। আর এভাবেই অধঃপতনের অতলে তলিয়ে যাচ্ছে জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধাররা।
অপরদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকমণ্ডলী সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত অংশ হওয়া সত্ত্বেও প্রচলিত ক্ষমতা ও স্বার্থবাদিতার রাজনীতিতে জড়িয়ে তাদের একটা বড় অংশই হারিয়ে ফেলেছেন নীতি-নৈতিকতা। যারা সমাজ ও জাতির আদর্শ হওয়ার কথা ছিল, তারা নিজেরাই যখন আদর্শহীনতার স্রোতে গা ভাসান, তখন কার কাছে ছাত্ররা নৈতিক মূল্যবোধ ও আদর্শ শিখবে?
এখন তো অনৈতিকতার প্রথম পাঠটাই যে শুরু হচ্ছে শিক্ষক নিয়োগদান পর্ব থেকে। যেভাবে বর্তমানে জাতির সর্বোচ্চ শিক্ষালয়ে বিশেষ কোন যোগ্যতা ছাড়াই স্রেফ লবিং-গ্রুপিং-দুর্নীতির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, তা কোন সভ্য সমাজে কল্পনাও করা যায় না। এমনকি প্রতিবেশী ভারত, পাকিšত্মানের মত দেশেও এমন দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না। শিক্ষকতার প্রধান শর্ত হওয়ার কথা ছিল শিক্ষা ও গবেষণার সাথে ওতপ্রোত সম্পৃক্ততা। অথচ এর পরিবর্তে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততাই এখন নিয়োগের ক্ষেত্রে একচ্ছত্র প্রাধান্য পাচ্ছে। ফলে ছাত্রদেরকে সুনাগরিক হওয়া এবং জ্ঞানার্জনে ও গবেষণায় উৎসাহিত করার জন্য ন্যূনতম যে নৈতিক বল ও যোগ্যতা প্রয়োজন, সেটুকু আজ শিক্ষকদের কাছে পাওয়া দুষ্কর। বরং মেধাহীনতা, দুর্নীতির দৌরাত্ম্যে শিক্ষকতা পেশাই হারিয়ে ফেলেছে তার চিরন্তন মর্যাদা।
আমরা জানি, সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ হ’ল, পাঠদান ও জ্ঞানচর্চার সাথে সাথে নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি করা। আরও খোলাসা করে বললে গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান উৎপাদন, বিভিন্ন প্রকাশনার মাধ্যমে সেই জ্ঞান সংরক্ষণ এবং পাঠদানের মাধ্যমে জ্ঞান বিতরণ। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সাধারণভাবে নতুন কোন জ্ঞান উৎপাদনের পদক্ষেপ দেখা যায় কি? অভিজ্ঞমহল জানেন যে, এমন দৃষ্টান্ত বিরল। ফলে মাধ্যমিক শ্রেণীর মত উচ্চতর শ্রেণীর শিক্ষার্থীরাও পুরানো জ্ঞানই অন্ধভাবে গলধঃকরণ করে আসছে। পরীক্ষার খাতায় মুখস্থনির্ভর জ্ঞান উপস্থাপন করা এবং দিনশেষে ভাল মার্কস পাওয়াতেই তারা সার্থকতা খোঁজে। শিক্ষকরা ছাত্রদের নতুন জ্ঞান আহরণ বা সৃষ্টিতে উৎসাহিত করেন না। তাদেরকে জ্ঞানের প্রয়োগক্ষেত্র দেখিয়ে দেন না। বিভাগগুলোতে বিষয়ভিত্তিক সেমিনার- সিম্পোজিয়ামের কোন আয়োজন দেখা যায় না। এমনকি শিক্ষার্থীরা লাইব্রেরীতে পর্যন্ত যেতে আগ্রহী নয়। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এমন অনেক ছাত্র পেয়েছি, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীতে গিয়ে কখনো একটি বইও ছুঁয়ে দেখেনি। অর্থাৎ সৃষ্টিশীল জ্ঞানার্জনের জন্য যে পরিবেশ- পারিপার্শ্বিকতা প্রয়োজন, তার ছিঁটেফোটাও নেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। এক অজানা গৎবাঁধা সিস্টেমের জালে সবাই যেন বন্দী।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সবচেয়ে বড় যে সংকট তা হ’ল গবেষণার সংস্কৃতি না থাকা। গবেষণা কী জিনিস তা মাস্টার্সে গিয়েও অধিকাংশ ছাত্র জানে না। অথচ মেধার সঠিক পরিচর্যা, দক্ষ মানুষ তৈরী করা, সর্বোপরি জাতীয় উন্নতির জন্য গবেষণার কোন বিকল্প নেই। উন্নত বিশ্বের দেশগুলো বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা খাতে সবচেয়ে বেশী অর্থ খরচ করছে। সরকারী-বেসরকারী বহু প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা গবেষণায় পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে। ফলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে তারা দিন দিন উন্নতির শিখরে আরোহণ করছে। কিন্তু আমাদের দেশে ছাত্ররা অনার্স পর্যায়ে গবেষণার চিন্তাই করতে পারে না। আর মাস্টার্স বা পিএইচডি পর্যায়েও তারা যে গবেষণা করেন, তা উন্নত বিশ্বের গবেষণার তুলনায় পদ্ধতিগতভাবে শিশুতুল্য। গবেষণার সার্বজনীন মান রক্ষায় যত্নবান না থাকায় এসব গবেষণায় মৌলিকত্ব প্রায়ই থাকে না। ফলে গবেষণার মূল বিষয়টি তাদের নিকটে অনাস্বাদিতই থেকে যাচ্ছে। কেউ যখন দেশের বাইরে গিয়ে উন্নত বিশ্বের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় যুক্ত হয়, তখনই কেবল নিজ দেশের গবেষণা সংস্কৃতির দৈন্য অনুভব করতে পারে। কিন্তু তখন আফসোস ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। কেবলই মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের মূল্যবান সময়টা কিভাবেই না নষ্ট হয়ে গেছে।
বিস্ময়ের ব্যাপার হ’ল বাংলাদেশে গবেষণা সংস্কৃতি এতই দুর্বল যে, গবেষণার জন্য সরকারী যে যৎসামান্য বরাদ্দ রয়েছে তা-ও অব্যয়িত থেকে যাচ্ছে প্রকৃত গবেষকের অভাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৭-২০১৮ সনে গবেষণার জন্য বরাদ্দ দেয়া হয় ১৪ কোটি টাকা। কিন্তু বছরান্তে দেখা গেছে তা থেকে মাত্র ৮ কোটি ৪২ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়েছে। ইউজিসিতে ২০১৭ সালে ১০০টি পিএইচ.ডি ফেলোশীপ থাকলেও মাত্র ৫৮ জন শিক্ষক তা গ্রহণ করেন। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থাও তথৈবচ। ফলে বিপুল সংখ্যক মেধার অপচয় হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
অনুরূপভাবে ধর্ম ও নৈতিকতার শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দিন দিন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। যতটুকু রয়েছে তা-ও কেবল বইয়ের দুই মলাটের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে বাস্তবতার ময়দানে শিক্ষকসমাজ হোক কিংবা ছাত্রসমাজ, সকলেরই নৈতিকতার বন্ধন অত্যন্ত শিথিল ও নড়বড়ে। সামান্য স্বার্থের টানে মুহূর্তেই তারা মাকড়সার জালের মত এই নৈতিকতার বন্ধন ছিন্ন করতে একটুও দ্বিধাবোধ করে না। আর এভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিদ্যার আলয় না হয়ে দূর্নীতি, অপশিক্ষা, মেধার অপচয়, স্বার্থদুষ্টতা আর সীমাহীন নৈতিক ও চারিত্রিক অধঃপতনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
এই নাভিশ্বাস অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে গেলে সবার আগে ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতির করালগ্রাস থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রক্ষা করতে হবে। একশ্রেণীর সুশীল ব্যক্তি ৫২, ৬৯, ৭১, ৯০-এর উদাহরণ টেনে ছাত্ররাজনীতির পক্ষে বুলি কপচান। তারা কি জানেন না সেই আন্দোলনগুলো মূলতঃ ছাত্ররাজনীতির অবদান নয়, বরং সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে গড়ে ওঠা সহজাত আন্দোলন? প্রয়োজনে আবারও ছাত্রসমাজ জেগে উঠবে যেভাবে সাম্প্রতিক কালে কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ক্ষেত্রে ঘটেছে। এজন্য লেজুড়ভিত্তিক ছাত্ররাজনীতির কোন প্রয়োজনীয়তা আছে কি? যে রাজনীতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে স্বাধীনতার পর থেকে ছাত্ররাজনীতির বলি হয়ে ইতিমধ্যে প্রায় ২০০ ছাত্র-ছাত্রী নিহত হয়েছে, সেই রাজনীতির হাতে ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ তো দূরের কথা, কারও প্রাণটাও তো নিরাপদ নয়। বাংলাদেশের বাইরে পৃথিবীর এমন একটি রাষ্ট্র পাওয়া যাবে না, যেখানে এই তথাকথিত ছাত্ররাজনীতির নিকৃষ্ট চর্চা রয়েছে।
সুতরাং যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রকৃতই জ্ঞানকাননে পরিণত করতে হয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হোক। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হোক। শিক্ষক-ছাত্র সবার মাঝে জ্ঞান আহরণ ও গবেষণার সংস্কৃতি যেন গড়ে ওঠে এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরী হয়, এ ব্যাপারে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর উপযুক্ত ভূমিকা পালন করা এখন সময়ের দাবী। সার্টিফিকেট বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান না হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিদ্যার প্রকৃত আলয় হোক, ক্ষমতা আর সন্ত্রাসনির্ভর ছাত্ররাজনীতির কেন্দ্র না হয়ে সুস্থ সংস্কৃতি ও নৈতিকতার বিকাশকেন্দ্র হোক, অবৈধ প্রেমকানন না হয়ে সুরোভিত জ্ঞানকানন হোক- এটাই আজ দেশের প্রতিটি সচেতন, জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থীর হৃদয়ের গভীরতম প্রত্যাশা। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন!
📄 করোনাকাল আমাদের কী শেখালো?
৩১শে ডিসেম্বর ২০১৯। চীনের উহান থেকে এক ভাইরাসের অপ্রতিরোধ্য যাত্রা শুরু হ’ল। নানা জল্পনা-কল্পনার এক ঘোরলাগা প্রহর অতিক্রান্ত হ’তে না হ’তেই বিশ্ববাসী দেখতে পেল এক অদৃশ্য মহাশত্রুর হাতে কিভাবে একে একে পর্যুদস্ত হচ্ছে বিশ্বের বাঘা বাঘা শক্তিধর দেশগুলো। এ এক অকল্পনীয় দৃশ্য। অর্থ-বিত্ত, ক্ষমতা কোন কিছুই এই শত্রুর মোকাবিলায় কাজে আসছে না। পারমানবিক অস্ত্রেরও ক্ষমতা নেই এই সূক্ষ্ম, চোখে না দেখা শত্রুকে ঠেকাবার। ক্ষমতার গর্বে, বিত্তের অহংকারে স্ফীত হয়ে যেসব দেশ বিশ্বব্যাপী অন্যায়ভাবে ছড়ি ঘোরাতো, তারা আজ অসহায় হয়ে দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে ছুটছে একটুখানি আশ্রয়ের আশায়। এ এমন এক শত্রু যার ভয়ে ভীত হয়ে সারাবিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ আজ গৃহবন্দী। আসমানে বিমান উড়ে না, যমীনে গাড়ি-ঘোড়া চলে না। রাস্তার মোড়ে জটলা নেই। খেলার মাঠে শিশু-কিশোরদের কোলাহল নেই। হাসপাতাল রোগীশূন্য। আদালত আসামীশূন্য। রাস্তাঘাট জনশূন্য। হাট-বাজার ক্রেতা-বিক্রেতাশূন্য। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা শিক্ষক-শিক্ষার্থীশূন্য। স্টেশন-বিমানবন্দর যাত্রীশূন্য। কল-কারখানা শ্রমিকশূন্য। মসজিদ মুছল্লীশূন্য। হারামাইন হাজীশূন্য। সিনেমা হল, রেস্তোরাঁ, পার্ক, স্টেডিয়াম, পর্যটনকেন্দ্র কোথাও কেউ নেই। ভারত, কাশ্মীর, মিয়ানমার, ফিলিস্তীন, সিরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়া, আফগানিস্তানে প্রতিনিয়ত যারা নিত্যনতুন অস্ত্রের পরীক্ষায় ব্যস্ত ছিল, লাখো-কোটি নিরীহ আদম সন্তানের প্রাণ সংহার করে জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি ঠেকানোর দায়িত্ব নিয়েছিল, তারা আজ কোথায় যেন কঠোর নীরবতার সাথে আত্মগোপনে গেছে।
এ এমন এক ভয়ংকর গোপন আততায়ী যার হিম আতংকে অসুস্থ রোগীর যত্নে কেউ এগিয়ে আসে না। একান্ত আপনজনরাও বাড়িতে জায়গা দিতে চায় না। হাসপাতালে নিলেও খোঁজ নেয় না। মৃত্যু হ’লেও দাফন করে না। জানাযা হ’লেও উপস্থিত থাকে না। পবিত্র রামাযান মাস জুড়ে মুসলিম দেশগুলোতে চিরাচরিত সেই পারস্পরিক সৌহার্দের পবিত্র দৃশ্যগুলো অনুপস্থিত। নেই ইফতারের কোন উৎসবমুখর আয়োজন, নেই তারাবীতে মুছল্লীদের সারি। দেখা হ’লে নেই সহজাত মুছাফাহা কিংবা কোলাকুলির দৃশ্য। কি ডাক্তার, কি সাধারণ মানুষ; কি নারী, কি পুরুষ; কি মধ্যযুগীয় পশ্চাদপদ, কি আধুনিক; সবার মুখে মাস্ক আর হাতে গ্লাভস। যে হিজাব আর নেকাব পরার জন্য মুসলিম নারীদের হেনস্থার শিকার হ’তে হ’ত, আজ তা পরিধান না করলেই হয় জরিমানা। পারিবারিক মিলনমেলা বন্ধ। বিবাহ-শাদী, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান, সভা-সমাবেশ সবকিছু বন্ধ। অজানা আতংকে জগতজুড়ে কর্মচঞ্চল মানুষগুলো আজ স্রেফ ঘরবন্দী। কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন আর লকডাউনের ঘেরাটোপে গোটা মানব সমাজ নিমজ্জিত এক সীমাহীন স্থবিরতায়। এই দৃশ্যপটে ধনী-গরীব, আমীর- ফকীর কোন বাছ-বিচার নেই। সমগ্র বনু আদম আজ এক কাতারে।
প্রিয় পাঠক! ২০২০ সালের প্রথম সূর্য যেদিন উদিত হয়েছিল, সেদিন কারো মনে ঘুণাক্ষরেও কি এমন চিন্তার উদ্রেক হয়েছিল? সেদিন কেউ কল্পনা করেনি পৃথিবীর এমনরূপ কখনও দেখতে হবে। আবার করোনা পরবর্তী পৃথিবীর রূপ কেমন হবে তা নিয়েও তারা ছিল চরম দ্বিধান্বিত। পৃথিবী কি আবার আগের রূপে ফিরে যাবে, নাকি নতুন রূপে নিজেকে সাজিয়ে নেবে? বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি কোন দিকে মোড় নেবে? এক অন্তহীন জিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল গোটা মানবসমাজ। সবাই অধীর অপেক্ষায় ছিল যাবতীয় শংকা আর উদ্বিগ্নতা কাটিয়ে কবে ফিরবে সুদিন। পৃথিবী আবার কবে ফিরবে তার আপন চেহারায়। দেখতে দেখতে করোনাকালের মৃত্যুমুখর সেই ধুসর দিনগুলো অতিক্রান্ত হয়ে গেল। মৃত্যুর মিছিলে ইতিমধ্যে যোগদান করেছে কোটিখানেক বনু আদম। আক্রান্ত হয়েছে প্রায় শত কোটি মানুষ। এই তো কিছুদিন আগেই চারিদিকে ছিল হতাশার গভীর অমানিশা। অনিশ্চয়তায় ডুবে ছিল ভবিষ্যতের সকল ভাবনা।
করোনার এই মহাবিপদকাল আমাদের চোখ খুলে দেখিয়ে দিয়েছে পৃথিবীর অমোঘ বাস্তবতা। মানবতার এই চরম দুঃসময় মানুষের ভেতরটা একদম নগ্ন করে প্রকাশ করে দিয়েছে। বিপদে পড়লে যে কেউ কারো নয়, তার চাক্ষুষ প্রমাণ আমরা নিত্যই দেখেছি করোনার সেই দুর্যোগকালে। আতঙ্কের মধ্যে পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, স্বামী-স্ত্রী, পিতামাতা-সন্তান সব সম্পর্কগুলো কেমন মিথ্যা হয়ে যায়। মানুষ অমানুষ হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়মিত বুলেটিনে প্রতিনিয়ত জনসাধারণকে মানবিক আচরণ বজায় রাখার পরামর্শ দেয়া হচ্ছিল। অবশ্য এর বিপরীতপীঠে এমন অনেক দৃষ্টান্ত মিলেছে যেখানে মানবিক দায়বদ্ধতা নিয়ে মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, যা মানুষের মনে আস্থা ও প্রশান্তির অনাবিল সুবাতাস যুগিয়েছে। মানবসভ্যতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এই মহানুভব মানুষগুলো। এভাবে কখনও মানবতার মর্মন্তুদ পরাজয়, কখনও মহোত্তম বিজয়ের দোলাচলে যাপিত হয়েছে আমাদের করোনাকালের নিত্যদিন।
করোনাকালে আমাদেরকে সবচেয়ে ভাবিত করেছিল মানবতার পরাজয়ের সকরুণ দৃশ্যগুলো। শিক্ষা-দীক্ষা, সমাজ-সভ্যতা, আধুনিকতা কোন কিছুই আমাদের ভেতরকার পাশবিকতাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। মানুষ যে বিপদের সময় তার সর্বাধিক প্রিয় মানুষগুলোকেও এভাবে অবহেলায়, অনাদরে ছুঁড়ে ফেলতে পারে, তা করোনা না এলে হয়ত জানা হ’ত না। যে দৃশ্যগুলো কেবল কঠিন ক্বিয়ামত দিবসের কথা ভেবে আমরা কল্পনা করতাম, কারোনাকালে দেখা গেছে তার চাক্ষুষ বাস্তবতা। সুবহানাল্লাহ! ক্বিয়ামত দিবস সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ভাষ্য- ‘সেদিন মানুষ পলায়ন করবে নিজের ভাইয়ের কাছ থেকে, নিজের মাতা-পিতার কাছ থেকে, স্ত্রী ও সন্তান থেকে। সেদিন প্রত্যেকেরই এমন গুরুতর বিপদ থাকবে যা নিয়ে সে ব্যতিব্যস্ত থাকবে’ (আবাসা ৮০/৩৪-৩৭)। সে এতটাই দুশ্চিন্তামগ্ন থাকবে যে, নিজের সবচেয়ে নিকটতম আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধব থেকেও অমুখাপেক্ষী ও বেপরোয়া হয়ে যাবে। কেউ কারো প্রতি ভ্রূক্ষেপ করার মত অবস্থায় থাকবে না। যে মানুষ আখেরাতের তুলনায় অতীব তুচ্ছ বিপদে এভাবে পরম আত্মজনকে ছেড়ে যেতে পারে, ক্বিয়ামতের ভয়াবহ বিপদকালে তার অবস্থা কী হ’তে পারে তা বলাই বাহুল্য। ক্বিয়ামতের সেই ভয়াবহ দৃশ্যপটের বাস্তবতা আমরা তাই প্রতিনিয়তই অনুভব করেছি।
আমরা দেখেছি করোনায় আক্রান্ত শিশু সন্তানকে রংপুর মেডিকেল থেকে ঢাকায় ট্রান্সফারের পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। কিন্তু মেডিকেল থেকে স্ট্রেচারে এ্যাম্বুলেন্সে তুলতে হবে, এটুকুর জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় সন্দেহভাজন মৃত ব্যক্তিকে গোসল করানোর দায়ে একজন হাফেযকে মারধর করেছে স্থানীয় জনগণ। সিরাজগঞ্জের সন্দেহভাজন করোনা উপসর্গের রোগী বহনের দায়ে নৌকায় দেয়া হয়েছে আগুন আর মাঝিকে পিটুনি। জামালপুরে জনৈক ব্যক্তি করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে তার পরিবারের লোকজন ঢাকা থেকে নিজ যেলায় লাশ নিয়ে এলে এলাকাবাসী দাফনে বাধা দেয়। পরে ঢাকা থেকে একটি বেসরকারী সংস্থার স্বেচ্ছাসেবক দল এসে সেই ব্যক্তির কবর খোঁড়ে এবং জানাযা পড়ায়। এখানেই শেষ নয়, সেই ব্যক্তির দাফনের পর তার স্ত্রী ও সন্তানকে গ্রামবাসী তালা দিয়ে আটকে রাখে। কোন আত্মীয়-স্বজনকে তার বাড়ির ত্রিসীমানায় আসতে দেয়নি। মৃত ব্যক্তির বাড়িতে খাবার দেয়ার নিয়ম প্রতিবেশীদের। সেই সুযোগও দেয়া হয়নি। অনাহারী সেই পরিবারটি প্রতিবেশী কয়েকজনকে বাজার করে দেয়ার অনুরোধ করলে, তখন তাদেরকেও হুমকি দেয়া হয়ে যে, কেউ বাজার করে দিলে তাদেরকেও ঘরে তালা মেরে দেয়া হবে। অবশেষে স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে এর সুরাহা হয় বটে; কিন্তু পরিবারটিকে একঘরেই করে রাখা হয়। তাদের করোনা রিপোর্ট নেগেটিভ এলেও গ্রামবাসী তা বিশ্বাস করেনি। পরিবারের কর্মক্ষম মানুষটির মৃত্যুবরণে তাদের শোকাহত হওয়ারও অধিকার ছিল না। মানুষ তাদের সান্ত্বনা দেয়া তো দূরের কথা, কেউ তাদের সাথে কথাও বলেনি। এই পরিবারগুলো জানে না মানুষ কি আগে থেকে এরকম অমানবিকই ছিল, নাকি করোনাই তাদের এমন অমানবিক বানিয়েছিল।
ফেনীর সোনাগাজীতে অবতারণা হয় আরো বীভৎস দৃশ্যের। জনৈক সাহাবুদ্দীন (৫৫) চট্টগ্রাম থেকে করোনার উপসর্গ নিয়ে গ্রামে ফিরেন। কয়েক দিন পর হাসপাতালে নমুনা দিয়ে দুপুরে বাড়ী ফেরার পর পরিবারের লোকজন তাকে একটি ঘরে একা রেখে বাহির থেকে দরজায় ছিটিকিনি লাগিয়ে রাখে। দেয়া হয়নি দুপুরের খাবার। বিকেলে তার শ্বাসকষ্ট ও কাশি বেড়ে যায়। এসময় তিনি চিৎকার করে খাবার চাইলেও কেউ দেয়নি। পানি চেয়েও পায়নি। বাড়িতে ছিল তার স্ত্রী, তিন কন্যা, তিন জামাতা ও ছোট ছেলে। ছেলেটি বাবার সাহায্যে এগিয়ে যেতে চাইলে বোনেরা বাধা দেয়। এভাবে ঘরবন্দী অবস্থায় চিৎকার করতে করতে রাত ১০টার দিকে তার মৃত্যু ঘটে। অবশেষে ছোট ছেলের চিৎকার শুনে রাত একটার দিকে স্থানীয় চেয়ারম্যান এগিয়ে আসেন এবং দাফনের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু দাফনের জন্য স্থানীয় মসজিদের খাটিয়া দিতে অস্বীকার করা হয়। এমনকি কবর খোঁড়ার জন্য কোদালও দেয়নি কেউ।
গাজীপুরের এক মাকে তার নিজ সন্তানরা করোনা আক্রান্ত সন্দেহে গাড়িতে করে এনে টাঙ্গাইলের শফিপুরের জঙ্গলে ফেলে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে প্রশাসন তাকে উদ্ধার করে এবং সেই মায়ের করোনা টেস্ট নেগেটিভ এসেছিল। অন্যদিকে এক পিতা-মাতা তাদের চৌদ্দ বছরের সন্তানকে কিছু টাকা, পানি আর পাউরুটি দিয়ে রাতের আঁধারে বাঁশঝাড়ে ফেলে পালায় চট্টগ্রামের লোহাগড়ায়। ফজরের পর এক বৃদ্ধাকে মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরানো অবস্থায় দেখতে পেলে তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। দুনিয়াতে পিতা-মাতাই মানুষের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল। তারাই যদি সন্তানকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে পালিয়ে যেতে পারে, তবে পরিস্থিতি কতটা অমানবিক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে তা কল্পনা করা যায়? অনুরূপভাবে বগুড়ায় ৬৫ বছরের এক বৃদ্ধকে করোনা সন্দেহে তার স্ত্রী বাড়ি থেকে বের করে দেয় বৃষ্টিভেজা রাতে। বৃদ্ধের ছেলে-মেয়েরা নীরবে সে দৃশ্য দেখলেও তাদের অন্তরে মায়া হয়নি। পরে পুলিশ তাকে রাস্তা থেকে উদ্ধার করে।
এছাড়া এই হাসপাতাল সেই হাসপাতাল ঘুরে চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন এমন রোগীর সংখ্যা অগণিত। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীকে ভাড়াটিয়ারা বাড়িতে ঢুকতে দিতে চাইছেন না বা বাড়ি ছাড়ার জন্য নোটিশ দিয়েছেন এমন উদাহরণের তো কোন অভাব নেই। এমনকি এক স্বাস্থ্যকর্মীর বাড়িতে সারারাত ঢিল ছুঁড়ে তার পরিবারকে বাড়ি ছাড়া করার চেষ্টা চালিয়েছিল তার প্রতিবেশীরা। হাসপাতালে বাবার লাশ রেখে ছেলেরা পালিয়েছে, রাতের গভীরে নাম-পরিচয়হীন লাশ রাস্তায় পড়ে থাকছে, জানাযা-দাফনের জন্য পরিবারের কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না, এমন খবর পাওয়া গেছে হরহামেশাই। এছাড়া খবরের বাইরেও রয়েছে এমন বহু খবর।
মানবতার এমনতরো করুণ বিপর্যয়দৃশ্য দেখার পাশাপাশি আমরা দেখেছি নিজের জীবন বিপন্ন করে ডাক্তার, পুলিশসহ বিভিন্ন স্তরের দায়িত্বশীল ও সাধারণ মানুষ কিভাবে মানুষের কল্যাণে এগিয়ে এসেছিল। আমাদের চোখ অশ্রুসজল হয়েছে যখন আমরা দেখেছি শেরপুরের ঝিনাইগাতি উপজেলার অশীতিপর বৃদ্ধ ভিক্ষুক নাযীমুদ্দীন নিজের বাড়ি বানানোর জন্য জমানো দশ হাযার টাকা করোনায় কর্মহীন হয়ে পড়া দরিদ্র মানুষের সেবায় দান করেছেন। আমাদের উজ্জীবিত করেছিল নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খোরশেদ ও তার বাহিনী কর্তৃক শতাধিক লাশ দাফনের কাহিনী, যে লাশগুলো তাদের আত্মীয়-স্বজনরা পর্যন্ত দাফন করতে রাযী হয়নি করোনার ভয়ে। দেশের প্রতিটি প্রান্তে গোচরে-অগোচরে অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এবং হৃদয়বান ব্যক্তিরা সাধ্যমত অভাবী মানুষের দুয়ারে খাদ্য ও অন্যান্য সহযোগিতা পৌঁছে দিয়েছেন। মানুষ মানুষের জন্য-এই মহানব্রতকে অক্ষুণ্ণ রেখে এবং আল্লাহ্র সন্তুষ্টির লক্ষ্যে এভাবে বহু মানুষ যাবতীয় বিপদাপদকে তুচ্ছ করে সমাজসেবার ময়দানে তৎপর ছিলেন মাশাআল্লাহ। আমরা তাদের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও কৃতজ্ঞতা। আল্লাহ তাদের এই মহান খেদমত কবুল করুন- আমীন!
করোনাকালের বিপর্যয়কালে মানবতার জয়-পরাজয়ের যে চাক্ষুষ দৃশ্য আমাদের সামনে প্রতিভাত হয়েছে তা নিশ্চয়ই বর্তমান প্রজন্মের হৃদয়কন্দরে গভীর চিন্তার খোরাক যোগাবে। এই প্রজন্ম যুদ্ধ দেখেনি, সামষ্টিক কোন সংগ্রামের দৃশ্য দেখেনি, কিন্তু দেখেছে করোনা মহামারীতে বিপর্যস্ত বিশ্ব। এ এমন এক ক্রান্তিকাল, যুগান্তরের ইতিহাসে যার কোন তুলনা নেই। দৃশ্যমান কোন শত্রু ছাড়াই যে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রান্ত এভাবে অজানা আতংকে স্থবির ও নিস্তব্ধ হ’তে পারে, তার কোন উদাহরণ আমাদের জানা নেই। একটি বিশ্বযুদ্ধও বোধহয় এতটা প্রলয়ংকরী হ’তে পারত না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য উন্নতির এই যুগে এই অচিন্তনীয় ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে, মানবজাতি প্রকৃতই কতটা অসহায়, কতটা পরমুখাপেক্ষী। কেবল স্বাস্থ্যব্যবস্থাই নয়, গোটা বিশ্বব্যবস্থাই যেন ওলট-পালট হয়ে গেছে সামান্য অদৃশ্য অণুজীব মোকাবিলার অবিশ্বাস্য ব্যর্থতায়।
এই ব্যর্থতা নিশ্চয়ই বিশ্ব মানবসমাজকে আপন সীমাবদ্ধতাকে নতুনভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ দেবে। সীমালংঘনের পর সীমালংঘন করে যারা নিত্যই তৃপ্তির ঢেকুর তুলছিল, তারা তাদের পরিণতির কথা নিশ্চয়ই ভাববে। যারা অর্থ-বিত্ত আর ক্ষমতার মিথ্যা মোহে জীবনপাত করে চলেছিল, তারা জীবনের উল্টো পীঠ থেকে নিশ্চয়ই শিক্ষা নেবে। অন্যায়-অবিচার ছিল যাদের দৈনন্দিন বিনোদনের অংশ, এই রূঢ় অভিঘাত তাদের মাঝে নতুন জীবনবোধের উন্মেষ ঘটাবে। আর এই মহৎ উপলব্ধি থেকেই হয়ত জন্ম নেবে মানবতাবোধের নয়া সবক। যে সবক মানুষকে মানুষের প্রতি অধিকতর সহমর্মী করে তুলবে। অর্থহীন হিংসা-হানাহানির পথ ছেড়ে অর্থপূর্ণ মানবিক জীবনের পথে পরিচালিত করবে। আর এই পথ ধরেই তারা একদিন মহান স্রষ্টার প্রতি আত্মসমর্পণের চিরন্তন বার্তাকে প্রাণ উজাড় করে স্বাগত জানিয়ে ধন্য হবে। এটাই হোক আমাদের সর্বাঙ্গীন কামনা।
করোনাকাল আমাদেরকে দিয়েছে বহু নতুন ভাবনার উপলক্ষ। ২০০১ সালের নাইন ইলেভেন যেমন বিশ্বব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সূচিত করেছিল, ২০২০ সালের করোনা ভাইরাস হয়ত তার চেয়ে বড় পরিবর্তন এনেছে। যার নেতিবাচক দিকগুলোর মধ্যে অন্যতম হ’ল- মানুষ হয়ত দিনে দিনে আরো অসামাজিক, সন্দেহবাতিকগ্রস্ত, প্রযুক্তিনির্ভর জীব হয়ে পড়বে। আর রাষ্ট্রগুলো হয়ে পড়বে আরও বেশী জাতীয়তাবাদী ও আত্মকেন্দ্রিক। ফলে মানুষে মানুষের স্বাভাবিক সম্পর্কগুলো হয়ে পড়বে শিথিল, উষ্ণতাহীন এবং নিরেট স্বার্থপ্রণোদিত। অপরদিকে ইতিবাচক দিকগুলো হ’ল, মানুষ হয়ত অর্থ আর ক্ষমতার মোহের পিছনে ছোটা থেকে কিছুটা হ’লেও পিছপা হবে। কেননা বিপদ যখন ঘনিয়ে আসে, তখন অর্থ আর ক্ষমতা যে কোনই কাজে আসে না, তা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে করোনা। ফলে অন্যায়, পাপাচার, হিংস্রতা, অর্থ ও ক্ষমতার প্রতি লোলুপতা, অন্যের বিনাশকামিতার মত ধ্বংসাত্মক চিন্তা থেকে মানুষ বেরিয়ে এসে আরও মানবিক হওয়ার কথা ভাববে। সেই সাথে জীবন-জীবিকার ইঁদুর দৌড়ে পরিবার-পরিজনকে ভুলতে বসা মানুষ নিজেকে নিয়ে, পরিবার ও সমাজকে নিয়ে ভাবার সুযোগ পাবে। আর এভাবেই হয়ত জন্ম নেবে আগামীর পৃথিবীকে নতুনভাবে গড়ে তোলার জন্য পরিচ্ছন্ন ও ইতিবাচক চিন্তাধারার। মানবসভ্যতার পুনর্বিনিমাণে যার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
সর্বোপরি করোনা ভাইরাস নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, পৃথিবীর পরিচালনায় একজন মহান সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন, যার সামান্য ইশারায় সবকিছু নিমিষে পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে। আসমান-যমীনের যিনি একচ্ছত্র মালিক, ফিরে যেতে হবে কেবল তাঁরই কাছে। করোনা আমাদের শিখিয়েছে, আমরা যতই নিজেদের বড় মনে করি, ক্ষমতাধর মনে করি, আইনের ঊর্ধ্বে মনে করি, আসল ক্ষমতার মালিক আল্লাহ। করোনা আমাদের শিখিয়েছে বস্তুগত উপকরণে আমরা যতই সমৃদ্ধ হই না কেন, কোন কিছুই আমাদেরকে রক্ষার জন্য যথেষ্ট নয়, কোন কিছু দিয়েই মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখা যায় না, একমাত্র আল্লাহ্র ইচ্ছা ব্যতীত।
অতএব সেই মহাশক্তিধর সত্তার কাছে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণই আমাদের জীবনের পরমার্থ। বস্তুতঃ পৃথিবী ভাঙ্গা-গড়ার এই পরীক্ষা আল্লাহ এজন্যই নিয়ে থাকেন, যেন মানুষ তাঁর দিকে ফিরে আসে এবং তাঁর প্রতি আত্মসমর্পণ করে। অতএব আসুন আমরা তাঁরই কাছে পূর্ণাঙ্গভাবে আত্মসমার্পণ করি। তবেই আমরা দুনিয়া ও আখেরাতে সফলদের কাতারে অন্তর্ভুক্ত হতে পারব ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ বলেন, ‘(হে মুহাম্মাদ!) তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও, যারা তাদের উপর কোন বিপদ এলে বলে, নিশ্চয়ই আমরা তো আল্লাহ্ই এবং নিশ্চিতভাবে তাঁর দিকেই আমরা ফিরে যাব’ (বাক্বারাহ ২/১৫৬)। আল্লাহ আমাদেরকে এই পরীক্ষা থেকে উত্তরণের তাওফীক দান করুন এবং আমাদের সকল ভুল-ত্রুটি মাফ করে দিন। রোজ হাশরের কঠিনতম ময়দানে আমাদের সবাইকে তাঁর সফল বান্দাদের কাতারভুক্ত করুন এবং তাঁর জান্নাতুল ফেরদাউসের কল্পনাতীত নে’মত সাম্রাজ্যের অধিকারী হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন!