📘 তারুণ্যের আত্নপাঠ ও সমাজ চিন্তা 📄 সমাজ সংস্কার ও আমাদের সংগ্রাম

📄 সমাজ সংস্কার ও আমাদের সংগ্রাম


মানবজাতি পৃথিবীর শুরুকাল থেকে যে প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হয়েছে, তা খুব একটা ব্যতিক্রম ছাড়া একটা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলেছে। আর তা হ’ল সমাজের একদল মানুষ মন্দ, অকল্যাণ ও অসত্যের পথে প্রলুব্ধ হয়। অপর এক দল মানুষ এই পথভ্রষ্টদেরকে সুপথ প্রদর্শন করে যায়, যদিও এই দলটি সংখ্যায় অতি স্বল্প। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যুগে যুগে নবী-রাসূলগণকে এই সুপথপ্রদর্শনের দায়িত্ব দিয়েই প্রেরণ করেছিলেন। আল্লাহ বলেন, ‘আর প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য পথপ্রদর্শক রয়েছে’ (রা’দ ১৩/৭)। কোন সমাজে যদি এমন সংস্কারক দল না থাকে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মতো শক্তি না থাকে, তবে সে সমাজ নিঃসন্দেহে পতনোন্মুখ হবে।

এজন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুমিনদেরকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিৎ, যারা মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে এবং সৎ কাজের নির্দেশ দেবে ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই প্রকৃত সফলকাম’ (আলে ইমরান ৩/১০৪)। আমরা ব্যক্তিগতভাবে যতই সৎ বা ন্যায়নিষ্ঠ হই না কেন, যদি অপরকে সৎ বা ন্যায়নিষ্ঠ বানানোর প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ না করি, তবে সমাজে প্রকৃতার্থে সংস্কার আসে না। এজন্য আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না; যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে’ (রা’দ ১৩/১১)।

সমাজ সংশোধনের এই প্রচেষ্টা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যা কোন না কোন ভাবে চলমান থাকবেই এবং আল্লাহ কাউকে না কাউকে দিয়ে তা করিয়ে নেবেনই। তবে একজন দায়িত্বশীল ও জান্নাতপিয়াসী মুমিনের অবশ্য কর্তব্য হ’ল এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকা। কেননা ঈমান শুধু মুখে দাবী করার বিষয় নয়, বরং তার ছাপ বা দলীলও থাকতে হয়। কেউ ঈমানের দাবীদার হ’লে তাকে বাস্তব জীবনে সেই দাবীর পক্ষে দলীলও পেশ করতে হবে। এজন্য আল্লাহ বলেন, তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে; যতক্ষণ না তোমাদের মধ্যে কে জিহাদ তথা আল্লাহ্ পথে সংগ্রাম করেছে এবং কে ধৈর্যশীল তা না জানছেন? (আলে-ইমরান ৩/১৪২)। যদি সুযোগ ও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আমরা স্বীয় দায়িত্ব পালনে অবহেলা প্রদর্শন করি, তবে তা নিঃসন্দেহে আল্লাহকে ক্রুদ্ধ করবে। আল্লাহ হুঁশিয়ারী বাণী উচ্চারণ করে বলেন, ‘যদি তোমরা বিমুখ হয়, তাহ’লে তিনি অন্য জাতিকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন; অতঃপর তারা তোমাদের মত হবে না (মুহাম্মাদ ৪৭/৩৮)। এর মাধ্যমে আল্লাহ আমাদেরকে নিরন্তর ঈমানের পরীক্ষার মধ্যে রেখেছেন যে কারা আমরা প্রকৃত বিশ্বাসী আর কারা কপট। আল্লাহ বলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব যতক্ষণ না আমি তোমাদের মধ্যে মুজাহিদ ও ধৈর্যশীলদের জেনে নিই এবং আমি তোমাদের কর্মকাণ্ড পরীক্ষা করি (মুহাম্মাদ ৪৭/৩১)। এই পরীক্ষায় যে যত বেশী অগ্রগামী হ’তে পারবে, সে ততবেশী সফল হবে এবং আল্লাহ্র নৈকট্যশীল বান্দাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে (আন’আম ৬/১৩২)।

আজ মুসলিম উম্মাহ যে বিপর্যয় ও অধঃপতনের মধ্যে অতিক্রম করছে তার পিছনে একটি বৃহত্তম কারণ হ’ল মুসলিম সমাজের সংস্কার চেতনা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের মানসিকতা হারিয়ে ফেলা। অজ্ঞতা, কুসংস্কারচ্ছন্নতা, দুনিয়ার প্রতি আসক্তি, মাল ও মর্যাদার লোভ তাদেরকে এমনভাবে গ্রাস করে ফেলেছে যে, উম্মাহ্র প্রতি দায়বোধ, মানবতার জন্য বৃহত্তর কল্যাণচিন্তা, আত্মমর্যাদাবোধ, সর্বোপরি আল্লাহ্র দ্বীনকে আল্লাহ্র যমীনে বিজয়ী করার সদিচ্ছা, দৃঢ়চিত্ততা- সবকিছুই হারিয়ে ফেলেছে তারা। রাসূল (ছাঃ) এ সম্পর্কে বহু পূর্বেই আমাদেরকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘যখন তোমরা ‘ঈনা তথা প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বাকিতে অধিক মূল্যে ক্রয়-বিক্রয় করবে, গরুর লেজ ধারণ করবে এবং কৃষিকাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকবে (তথা দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে) এবং জিহাদ তথা আল্লাহ্র রাস্তায় সংগ্রামকে পরিত্যাগ করবে, তখন আল্লাহ তোমাদের উপর লাঞ্ছনা ও অবমাননাকর অবস্থা চাপিয়ে দেবেন। আর ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি এই লাঞ্ছনা ও অপমান দূরীভূত করবেন না যতক্ষণ না তোমরা পুনরায় দ্বীনের প্রতি ফিরে আস’ (আবুদাউদ হা/৩৪৬২, সনদ ছহীহ)।

সুতরাং সচেতন ও ঈমানদার যুবসমাজের প্রতি আমাদের বিনীত আহ্বান থাকবে, মুসলিম উম্মাহ্র এই অধঃপতিত ও লাঞ্ছনাকর অবস্থাকে মূল্যায়ন করা এবং নিশ্চেষ্ট না থেকে নিজেদের কর্তব্য-করণীয় নির্ধারণ করা। যদি প্রকৃতই আমরা মুসলিম উম্মাহ্র প্রতি আমাদের দায় পূরণ করতে চাই এবং আল্লাহ্র নৈকট্যশীল বান্দাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হ’তে চাই, তাহ’লে অবশ্যই খালেছ অন্ত রে আল্লাহ্ পথে সংগ্রামের পথকে বেছে নেয়া ছাড়া আমাদের বিকল্প কোন পথ নেই। ইসলামের বিজয় নিহিত রয়েছে এ পথেই।

মনে রাখতে হবে, এ সংগ্রামের পথ মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ নয়। বরং নানামুখী হাযারো বাধা আমাদেরকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করবে। শয়তানী চক্রান্ত আমাদেরকে কখনো দিশেহারা করে তুলবে। হয়তবা অনেকেই হতাশাগ্রস্ত হয়ে হাল ছেড়ে দেবে, গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়ে হারিয়ে যাবে কিংবা দুনিয়ার মোহে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়বে। তবুও প্রকৃত সত্যসেবী একদল লোক দৃঢ়চিত্তভাবে দাঁতে দাঁত চেপে হককে বিজয়ী করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাবে। আর চূড়ান্ত বিচারে দুনিয়া ও আখেরাতে সফলকাম তারাই। আল্লাহ আমাদেরকে দ্বীনের এই মহত্তম সংগ্রামের পথে অবিচল রাখুন এবং সমাজ সংস্কারের আন্দোলনে যথাসাধ্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করার তাওফীক দান করুন- আমীন!

📘 তারুণ্যের আত্নপাঠ ও সমাজ চিন্তা 📄 যেতে হবে বহুদূর!

📄 যেতে হবে বহুদূর!


বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের ইসলামী ঘরানায় এক ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তনের জোয়ার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘকাল সামাজিক প্রেক্ষাপটে আপাত পিছিয়ে পড়ে থাকা ধর্মীয় অঙ্গনের মানুষগুলো নতুন করে যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছেন। সমাজ থেকে সযত্নে গাঁ বাঁচিয়ে চলাকে যে সকল ওলামায়ে কেরাম এক সময় তাক্বওয়া ও মুক্তির পথ মনে করতেন, তারা এখন দেদার সমাজ সম্পৃক্ত কাজে যুক্ত হচ্ছেন। মিডিয়া, সামাজিক ও দাতব্য কর্মকাণ্ড, প্রকাশনা প্রভৃতি অঙ্গনে তাদের সরব উপস্থিতি এক নতুন জাগরণের আভাস দিচ্ছে। ফলে যারা এক সময় ধর্মচর্চায় যুক্ত মানুষগুলোর প্রতি নাক সিটকানোর ভাব দেখাতেন, কুপমণ্ডুকতার দায়ে তাদেরকে কথায় কথায় হেয় করতে চাইতেন, তাদের মাঝে হঠাৎ ধর্মীয় ঘরানার প্রতি কিছুটা হ’লেও সুনজর লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এই জাগরণের ভবিষ্যৎ এখনই অনুমান করা কঠিন, তবে নিঃসন্দেহে তা আশাব্যঞ্জকই বলতে হবে। আর তা এই কারণে যে, এই ধর্মীয় গণজাগরণে যে জিনিসটি ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে, তা হ’ল সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্ম সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি হওয়া। তাদের মধ্যে সত্য জানার আগ্রহটা আগের তুলনায় এখন অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। এদেশে ধর্মের নামে হাযারো কুসংস্কার যে শত শত বছর ধরে চেপে বসে আছে এবং কুরআন-হাদীছের ইসলাম আর প্রচলিত রেওয়াজী ইসলাম যে এক নয়, তা বহু মানুষের উপলব্ধিতে আসতে শুরু করেছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বরং সম্প্রতি পাকিস্তান, শ্রীলংকা, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া সফরেও প্রায় একই দৃশ্য দেখেছি। মানুষ এখন উন্মুখ হয়ে আছে সত্যিকার ইসলামের পতাকাবাহকদের জন্য। এক মরুভূমিসম তৃষ্ণা নিয়ে তাদের হৃদয় অপেক্ষা করছে নতুন দিনের অশ্বারোহীদের জন্য। যারা মানুষকে ইসলামের সরল ও সঠিক পথের দিকে ডাকবে, জাহেলিয়াতের ঘোর অমানিশাকে ছিন্ন করে হকের দৃপ্ত প্রদীপ জ্বালাবে।

এই প্রেক্ষাপটে ইসলামী আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ার কাজে যারা সম্পৃক্ত রয়েছেন, তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হ’ল, এই জাগরণকে সঠিক পথে পরিচালিত করা এবং এদেশের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মীয় অঙ্গন, সমাজ ও রাজনীতিতে অর্থবহ পরিবর্তনের জন্য দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে আসা। আর এজন্য প্রয়োজন ময়দানে একদল সত্যসেবী মানুষের সক্রিয় পদচারণা এবং ধৈর্য, বিচক্ষণতা ও অবিচলতার সাথে পরিস্থিতির মুকাবিলা করা। তাদের দায়িত্বশীলতা এবং দৃঢ়পদ ভূমিকার উপরই নির্ভর করছে এই জাগরণের ভবিষ্যৎ।

লক্ষণীয় বিষয় হ’ল, এই জাগরণে সবচেয়ে বড় নিয়ামক শক্তি যেমন আলেম সমাজ, তেমনি সবচেয়ে বড় বাধাও হ’ল আলেম সমাজ। তাদের সঠিক ভূমিকার কারণে সমাজ যেমন ব্যাপকভাবে উপকৃত হ’তে পারে, তেমনি তাদের অনৈতিক ভূমিকার কারণে এই জাগরণ আবার অচিরেই বিপর্যস্ত হয়ে নিভে যেতে পারে। এজন্য একদিকে আলেম সমাজকে যেমন অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, তেমনি সাধারণ জনগণকেও বিশেষভাবে নযর রাখতে হবে, যেন কিছু আলেমের পদস্খলনের কারণে সমগ্র সমাজ পদস্খলিত না হয়। ওমর বিন খাত্ত্বাব (রাঃ) বলেন, দ্বীন ইসলামকে ধ্বংস করে তিনটি জিনিস- (১) আলেমদের পদস্খলন, (২) কুরআন নিয়ে মুনাফিকদের বিতর্ক, (৩) নেতাদের পথভ্রষ্ট হওয়া (জামে’উ বায়ানিল ইলম হা/১৮৬৭)। এর ব্যাখ্যায় সাধারণ মানুষের করণীয় সম্পর্কে মু’আয বিন জাবাল (রাঃ) বলেন, আলেমদের ব্যাপারে দু’টি পন্থা অবলম্বন করবে। যদি তারা সঠিক পথে থাকেন, তবে তাদের অন্ধভাবে অনুসরণ করবে না। আর যদি তারা ফিৎনায় নিপতিত হন, তবে তাদের থেকে ধৈর্যহারা হয়ে ছিটকে যাবে না। কেননা মুমিন ফিৎনায় পতিত হ’লে তওবা করে (অর্থাৎ তাদের প্রতি সুধারণা রেখে তাদের তওবার অপেক্ষায় থাকবে) (জামে’উ বায়ানিল ইলম হা/১৮৭২)। এভাবে পারস্পরিক দায়িত্বশীল ও সহমর্মী ভূমিকার মাধ্যমেই দ্বীনের এই পবিত্র জাগরণ সঠিক গন্তব্যপানে এগিয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। এই সুধারণা ও আশাবাদ আমরা আন্তরিকভাবে পোষণ করি।

আলহামদুলিল্লাহ এই দ্বীনী গণজাগরণেরই প্রতিনিধি হিসাবে আল্লাহর অশেষ রহমতে এদেশের বুকে আহলেহাদীছ আন্দোলন এই গণজাগরণের প্রতিনিধি হিসাবে এদেশের বুকে হকের আওয়ায বুলন্দ করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। আহলেহাদীছ সংগঠনগুলোর নানামুখী তৎপরতার মাধ্যমে এদেশের গণমানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে বিশুদ্ধ ইসলামী আক্বীদা ও আমলের বার্তা। পৌঁছে যাচ্ছে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের দিকে প্রত্যাবর্তনের বার্তা, ন্যায় ও ইনছাফের বার্তা। সর্বোপরি ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় জীবন পর্যন্ত জীবনের সবগুলো ক্ষেত্রকে অহি-র আলোয় ঢেলে সাজানোর বার্তা। এদেশের ধর্মীয় অঙ্গন থেকে শিরক-বিদ’আতকে উৎখাত করে তাওহীদ ও ছহীহ সুন্নাহ্হ্ কার্যকর চাষাবাদ এবং সমাজ ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গন থেকে সকল প্রকার বিজাতীয় মতবাদকে উৎখাত করে ইসলামের সাম্য ও ন্যায়বিচারকে প্রতিষ্ঠাদানের সুস্পষ্ট ও বলিষ্ঠ লক্ষ্যকে সামনে রেখে এই আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে সর্বত্র।

সুতরাং যুবসমাজের প্রতি আমাদের আহ্বান- আসুন! আমরা সম্মিলিতভাবে এই আন্দোলনের বার্তাকে দেশের প্রতিটি কোণায় কোণায় পৌঁছে দেয়ার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করি। ধৈর্য, সাহস ও আত্মবিশ্বাসের সাথে এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হই। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহ.), ইমাম ইবনু তায়মিয়া (রহ.), ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহ্হাব (রহ.), শাহ ইসমাঈল শহীদ (রহ.), সাইয়েদ নিছার আলী তিতুমীর (রহ.) প্রমুখের রেখে যাওয়া সেই সমাজ সংস্কার আন্দোলনের এই ধারাবাহিক উত্তরাধিকারকে আমাদের এগিয়ে নিতেই হবে। আমাদের মধ্যে হাযারো ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকবে, মতভেদ থাকবে, চলার পথে থাকবে অসংখ্য বাধা ও বিপদ। কিন্তু তাই বলে যে বিশুদ্ধ ঈমান-আক্বীদা ও আমলের আহ্বান আমাদেরকে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাতছানি দেখিয়েছে, তা আমরা কখনও হাতছাড়া করতে পারি না। যত বাধাই আসুক না কেন, সকল বাধার প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে সত্য সূর্যের আলো আমরা সর্বত্র ছড়িয়ে দেবই। জান্নাতের পথে ছুটে চলার এই মিছিলকে আমরা বেগবান করবই। জাহেলিয়াতের তিমিরে ডুবে থাকা মানুষকে আলোর পথ দেখাবই।

উদয়ের পথে শুনি কার বাণী/ ভয় নাই ওরে ভয় নাই
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান/ক্ষয় না তার ক্ষয় নাই।

ঐ শুনুন আল্লাহ্ বাণী- ‘তোমরা হীনবল হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না, তোমরাই তো বিজয়ী, যদি তোমরা মুমিন হও’ (আলে ইমরান ৩/১৩৯)। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফীক দান করুন- আমীন!

📘 তারুণ্যের আত্নপাঠ ও সমাজ চিন্তা 📄 অহি-র আলোয় উদ্ভাসিত হোক বাংলার প্রতিটি ঘর

📄 অহি-র আলোয় উদ্ভাসিত হোক বাংলার প্রতিটি ঘর


ক্বিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীর প্রতিটি ঘরে ঘরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে যাবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, এ যমীনের উপর এমন কোন মাটি কিংবা পশমের ঘর (তাঁবু) বাকী থাকবে না, যে ঘরে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইসলামের বাণী পৌঁছিয়ে দেবেন না। সম্মানীর ঘরে সম্মানের সাথে; আর লাঞ্ছিতের ঘরে লাঞ্ছনার সাথে তা পৌঁছাবেন। এদের মধ্যে কাউকে আল্লাহ তা’আলা সম্মানিত করবেন এবং (স্বেচ্ছায়) ইসলাম কবূলের জন্য উপযুক্ত করে দেবেন। আবার কাউকে লাঞ্ছিত করবেন এবং তারা বাধ্য হয়ে এই দ্বীনের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করবে (অর্থাৎ সকল দ্বীনের উপর ইসলাম বিজয়ী হবে) (আহমাদ, মিশকাত হা/৪২)।

এই হাদীছের প্রেরণাকে সামনে রেখে আমরা যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি তা হ’ল- ‘অহি-র আলোয় উদ্ভাসিত হোক বাংলার প্রতিটি ঘর’। অর্থাৎ আমরা চাই বাংলার যমীনে প্রতিটি গৃহে, প্রতিটি ঘরে অহি-র বার্তা পৌঁছে যাক সগৌরবে। ধনী হোক, গরীব হোক; শিক্ষিত হোক কিংবা অশিক্ষিত- কেউ যেন এই মহান দাওয়াত থেকে বঞ্চিত না হয়। প্রত্যেকের কাছে যেন এই বার্তা পৌঁছে যায় যে, ইসলাম হ’ল তাওহীদ তথা এক আল্লাহর সার্বভৌমত্বের নাম। এতে কোন শরীকানা নেই। হোক তা সৃষ্টি পরিচালনায় কিংবা মানব সমাজের দৈনন্দিন ইবাদত-বন্দেগী, কার্যবিধিতে। রব হিসাবে, ইলাহ হিসাবে, নামে-বৈশিষ্ট্যে-গুণাবলীতে সর্বত্র তাঁর এক ও একক অবস্থান। তাতে না আছে বিন্দুমাত্র ক্ষান্তি ঘটানোর কোন অবকাশ; আর না আছে অংশীদারিত্ব দাবী করার মত কোন ধৃষ্টতার সুযোগ। মহান প্রভুর স্পষ্ট ঘোষণা- জেনে রেখ, সৃজন ও আদেশ তাঁরই। তিনি মহিমাময় বিশ্ব প্রতিপালক (আ’রাফ ৭/৫৪)।

সুতরাং যাবতীয় সিজদা-আরাধনা, কামনা-বাসনা, আশা-ভরসা, ভক্তি-অনুরক্তি কেবল তাঁর কাছেই নিবেদিত হ’তে হবে। মান্য করতে হবে কেবল তাঁরই দেয়া বিধি-বিধান, তাঁরই প্রেরিত প্রত্যাদেশ-নির্দেশনা। এর ব্যত্যয় ঘটানোর কোন সুযোগ নেই। মহান রবের এই একচ্ছত্র আধিপত্য মেনে নেয়া ও তাঁর ইচ্ছার কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্যেই নিহিত রয়েছে বান্দার সফলতা ও মুক্তির চাবিকাঠি। আর এর বিপরীতে স্রষ্টার আধিপত্যে সামান্যতম বিঘ্ন ঘটায় এমন যা কিছু রয়েছে, তা-ই শিরকের প্রতিভূ, তা-ই পরিত্যাজ্য। তাতেই রয়েছে যাবতীয় অশান্তি আর ধ্বংসের সুলুক।

দ্বিতীয়তঃ পার্থিব জীবনে আমাদের একমাত্র চলার পথ রাসূল (ছাঃ) আনীত রবের প্রত্যাদেশ আর তাঁর প্রদর্শিত সুন্নাত। আমাদের যাবতীয় ইবাদত-আমল, আইন-সংবিধান, আচার-বিধি, সাহিত্য-সংস্কৃতি, লাইফস্টাইল-সবই পালিত হবে কুরআন ও সুন্নাহ বর্ণিত পন্থায়। এতেই রয়েছে যাবতীয় কল্যাণের দিশা, মানবীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের সঠিক পরিচর্যা। এর বিপরীতে যত পথ ও মত, যত বুযুর্গ ও আকাবির, যত মান্য ও শ্রদ্ধেয়- সবই অগ্রহণযোগ্য, মানবতা বিধ্বংসী ও অকল্যাণের দিশারী। তা আপাতঃদৃষ্টিতে যতই গ্রহণযোগ্য ও শ্রুতিমধুর মনে হোক না কেন। সুতরাং নির্ভেজাল তাওহীদের বিশ্বাস এবং পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ্ পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের নামই হ’ল ইসলাম। এর বাইরে ইসলামের নামে যত পথ ও মতের দিকে আহ্বান করা হোক না কেন, তা কখনই প্রকৃত ইসলাম নয়; বরং ইসলামের নামে মিথ্যাচার ও প্রতারণা। এই বার্তাটুকুই আমরা এদেশের সকল মুসলমানের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে চাই। আমরা জানাতে চাই- ‘আসুন! পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে জীবন গড়ি’। ‘সকল বিধান বাতিল কর অহি-র বিধান কায়েম কর’। কতজন এই দাওয়াত গ্রহণ করল- তা আমাদের বিবেচ্য নয়; বরং কতজনের কাছে এই দাওয়াত পৌঁছানো গেল সেটাই মূল বিবেচ্য।

আল্লাহর পথে দাঈ হিসাবে যারা কাজ করবেন, তাদের উদ্দেশ্যে আমাদের উদাত্ত আহ্বান হ’ল, যাবতীয় ষড়যন্ত্র-বিভ্রান্তি, অলসতা-বিলাসিতা, হিংসা-বিদ্বেষ দু’পায়ে দলে যার যতটুকু জ্ঞান, যোগ্যতা ও ক্ষমতা আছে সবটুকু ব্যয় করে সাধ্যমত মানুষের কাছে হকের দাওয়াত তুলে ধরুন। স্মরণ করুন আল্লাহ্ বাণী- ‘আর তার চেয়ে কার কথা উত্তম যে আল্লাহ্ দিকে আহ্বান জানায় এবং সৎকাজ করে। আর বলে, আমি তো আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)’ (হা-মীম সাজদাহ ৪১/৩৩)। অন্তরে জাগ্রত রাখুন রাসূল (ছাঃ)-এর সেই চিরন্তন প্রেরণাবাণী- ‘আল্লাহ্র কসম! তোমার দ্বারা যদি একটি মানুষও হেদায়াত লাভ করে, তা হবে তোমার জন্য (আরবের মূল্যবান সম্পদ) লাল উট লাভের চেয়ে উত্তম’ (বুখারী হা/৩৭০১; মুসলিম হা/২৪০৬)। সেই সাথে এই মহান দায়িত্ব পালনের জন্য বিশেষ কিছু গুণাবলীর অধিকারী হ’তে হবে। যেমন-

(১) লক্ষ্যের দৃঢ়তা এবং হকের উপর সদা ইস্তিকামাত বা অবিচল থাকা। লক্ষ্যহীন ও দুর্বলচিত্ত মানুষ কখনও হকের দাওয়াত প্রচারের জন্য উপযুক্ত নয়। যিনি দাঈ হবেন, তাকে অবশ্যই লক্ষ্য সচেতন হ’তে হবে, সাহসী হ’তে হবে, আত্মবিশ্বাসী হ’তে হবে। কোন দুনিয়াবী স্বার্থে ও প্রলোভনে হক থেকে তার অবস্থান বিন্দুমাত্র নড়চড় হবে না। বাতিলের চাকচিক্য দেখে তিনি প্রতারিত হবেন না। বিপদ কিংবা সমস্যার ঘনঘটা তাকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করবে না।

(২) নৈতিক চরিত্রের অধিকারী হওয়া। চারিত্রিক পবিত্রতা একজন দাঈর অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। যে ব্যক্তি পাপ ও অন্যায় কাজ থেকে বাঁচার চেষ্টা করে না, কুপ্রবৃত্তিকে দমনে সতর্ক থাকে না, তাক্বওয়া অবলম্বন করা না, সে ব্যক্তি খুব সহজেই শয়তানের ফাঁদে আটকা পড়ে যায়। সুতরাং দাঈকে অবশ্যই দৃঢ় নৈতিক চরিত্রের অধিকারী হ’তে হবে। শয়তানের হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য সদা সতর্ক প্রহরীর ভূমিকা পালন করতে হবে। যেখানে অনৈতিকতার হাতছানি, যেখানে পাপের সম্ভাবনা, সেখান থেকে নিজেকে যোজন যোজন দূরে রাখতে হবে।

(৩) সততা ও আমানতদারিতা। এই গুণে গুণান্বিত ব্যক্তি পৃথিবীর সর্বত্রই সফল। যার মধ্যে উক্ত গুণাবলীর প্রভাব যত বেশী, সে লক্ষ্য অর্জনে তত বেশী সফল। সুতরাং দাঈর জন্য সর্বাবস্থায় কথায় ও কর্মে সৎ, নীতিবান, আমানতদার ও ন্যায়পরায়ণ থাকা অপরিহার্য।

(৪) ধৈর্য। বিপদসংকুল পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত নানা মাত্রার প্রতিকূল পরিবেশ আমাদেরকে সদা আচ্ছন্ন করে। হতাশা, কষ্ট, ভয়-ভীতি আঁকড়ে ধরে। উর্ধ্বতনদের বাধা এবং অধীনস্থদের অবাধ্যতার মুখোমুখি হ’তে হয়। এমতাবস্থায় আমাদের রক্ষাকবচ হ’ল ধৈর্য। ধৈর্যশীলতার একমাত্র পরিণাম সফলতা। সুতরাং একজন দাঈকে সমাজ সংস্কারের ময়দানে ধৈর্যশীলতার মূর্ত প্রতীক হ’তে হবে।

(৫) সদাচরণ। দাঈ যত জ্ঞানী বা পরহেযগার হোক না কেন, তার মুখের ভাষা ও আচরণ যদি হয় অসংযত, যদি তার অন্তর হয় অপরের প্রতি শুভকামনাহীন ও বিদ্বেষপরায়ণ; তার পক্ষে দাওয়াতী ময়দানে নামাই অর্থহীন। দাঈকে অবশ্যই সদাচরণ রপ্ত করতে হবে। মানুষের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার মত উত্তম গুণাবলীসম্পন্ন হ’তে হবে।

পরিশেষে প্রাণপ্রিয় যুবক ভাইদের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে, অহীভিত্তিক বিশুদ্ধ ইসলামের বার্তাকে সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়ার মিশনকে যেন আমরা আমাদের জীবনের মহোত্তম লক্ষ্য বানিয়ে নেই এবং এই মহান সংস্কার আন্দোলনের যোগ্য কর্মী হিসাবে নিজেদের গড়ে তুলি। আমাদের সমাজ ও আমাদের পরিপার্শ্বকে আল্লাহ্র বিধান অনুযায়ী পরিচালনার জন্য সর্বাত্মক ভূমিকা গ্রহণ করি। বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে যেন পৌঁছে যায় হকের আওয়ায। বাংলার যমীন যেন একদিন পরিণত হয় বিশুদ্ধ দ্বীনের এক উর্বর চারণক্ষেত্রে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে সেই তাওফীক দান করুন এবং আমাদের সকলকে তাঁর দ্বীনের মর্দে মুজাহিদ হিসাবে কবুল করে নিন। পরজীবনে জান্নাতের চিরশান্তির আবাসস্থলের অধিকারী হওয়ার তাওফীক দিন- আমীন!

📘 তারুণ্যের আত্নপাঠ ও সমাজ চিন্তা 📄 বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কবে হবে প্রকৃত বিদ্যার আলয়?

📄 বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কবে হবে প্রকৃত বিদ্যার আলয়?


বিগত ৮০-এর দশক থেকে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্ররাজনীতির বিষফল হিসাবে ক্যাম্পাসগুলো পড়ালেখার পরিবর্তে সন্ত্রাসের উর্বর লালনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। জ্ঞানের প্রাণকেন্দ্রে জ্ঞানবিমুখ কর্মকাণ্ড নিয়মিত দেখতে দেখতে এ জাতির বিস্মিত হওয়ার শক্তিও বোধহয় এখন নিঃশেষ হয়ে গেছে। ভাবতে অবাক লাগে দেশের কর্ণধার হিসাবে যারা দায়িত্ব পালন করছেন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনসহ সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলো যারা দেখভাল করছেন, তারা বছরের পর বছর জাতিগত অধঃপতনের এই নিকৃষ্টতম দৃশ্য কিভাবে সহ্য করছেন! সর্বোচ্চ মেধার লালনকেন্দ্র হিসাবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে প্রধান নিয়ামক শক্তি হওয়ার কথা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের। হওয়ার কথা ছিল জাতীয় গুরুত্বের শীর্ষ কেন্দ্র। শিক্ষা ও গবেষণার প্রাচুর্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হওয়ার কথা ছিল জ্ঞানের একেকটি খনি। অথচ তথাকথিত রাজনীতির বিষবাষ্প ঢুকে গোটা ব্যবস্থাপনা এমনভাবে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে যে, বিশ্ববিদ্যালয় এখন যাবতীয় অন্যায়, দুর্নীতি, কুশিক্ষা আর অনৈতিকতার অবাধ অনুশীলনকেন্দ্র বললে অত্যুক্তি হয় না।

ফলশ্রুতিতে বিশ্ববিদ্যালয় এখন আর জ্ঞানকেন্দ্র নয়, বরং নিছক সার্টিফিকেট বিতরণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। যে ছাত্রটি উদয়াস্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করে মেধার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় পা দিয়েছিল, সে এখন আর জ্ঞানার্জনে নয়; বরং ব্যস্ত ছাত্ররাজনীতির নামে আধিপত্য বিস্তার আর টেন্ডারবাজির প্রতিযোগিতায়। দুর্নীতির বাস্তব দীক্ষা তারা গ্রহণ করা শুরু করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই নামক দানবদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে। গণরুম কালচার, টর্চার সেল, র‍্যাগিং ইত্যাদি ভয়ংকর ও অবিশ্বাস্য অপরাধকর্মের সাথে তাদের পরিচয় ঘটছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই। এর সাথে রয়েছে কথায় কথায় আন্দোলন, মিছিল-মিটিং, ভাঙচুর আর শিক্ষকদের সাথে বেয়াদবির সংস্কৃতি। আর এভাবেই অধঃপতনের অতলে তলিয়ে যাচ্ছে জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধাররা।

অপরদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকমণ্ডলী সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত অংশ হওয়া সত্ত্বেও প্রচলিত ক্ষমতা ও স্বার্থবাদিতার রাজনীতিতে জড়িয়ে তাদের একটা বড় অংশই হারিয়ে ফেলেছেন নীতি-নৈতিকতা। যারা সমাজ ও জাতির আদর্শ হওয়ার কথা ছিল, তারা নিজেরাই যখন আদর্শহীনতার স্রোতে গা ভাসান, তখন কার কাছে ছাত্ররা নৈতিক মূল্যবোধ ও আদর্শ শিখবে?

এখন তো অনৈতিকতার প্রথম পাঠটাই যে শুরু হচ্ছে শিক্ষক নিয়োগদান পর্ব থেকে। যেভাবে বর্তমানে জাতির সর্বোচ্চ শিক্ষালয়ে বিশেষ কোন যোগ্যতা ছাড়াই স্রেফ লবিং-গ্রুপিং-দুর্নীতির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, তা কোন সভ্য সমাজে কল্পনাও করা যায় না। এমনকি প্রতিবেশী ভারত, পাকিšত্মানের মত দেশেও এমন দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না। শিক্ষকতার প্রধান শর্ত হওয়ার কথা ছিল শিক্ষা ও গবেষণার সাথে ওতপ্রোত সম্পৃক্ততা। অথচ এর পরিবর্তে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততাই এখন নিয়োগের ক্ষেত্রে একচ্ছত্র প্রাধান্য পাচ্ছে। ফলে ছাত্রদেরকে সুনাগরিক হওয়া এবং জ্ঞানার্জনে ও গবেষণায় উৎসাহিত করার জন্য ন্যূনতম যে নৈতিক বল ও যোগ্যতা প্রয়োজন, সেটুকু আজ শিক্ষকদের কাছে পাওয়া দুষ্কর। বরং মেধাহীনতা, দুর্নীতির দৌরাত্ম্যে শিক্ষকতা পেশাই হারিয়ে ফেলেছে তার চিরন্তন মর্যাদা।

আমরা জানি, সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ হ’ল, পাঠদান ও জ্ঞানচর্চার সাথে সাথে নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি করা। আরও খোলাসা করে বললে গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান উৎপাদন, বিভিন্ন প্রকাশনার মাধ্যমে সেই জ্ঞান সংরক্ষণ এবং পাঠদানের মাধ্যমে জ্ঞান বিতরণ। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সাধারণভাবে নতুন কোন জ্ঞান উৎপাদনের পদক্ষেপ দেখা যায় কি? অভিজ্ঞমহল জানেন যে, এমন দৃষ্টান্ত বিরল। ফলে মাধ্যমিক শ্রেণীর মত উচ্চতর শ্রেণীর শিক্ষার্থীরাও পুরানো জ্ঞানই অন্ধভাবে গলধঃকরণ করে আসছে। পরীক্ষার খাতায় মুখস্থনির্ভর জ্ঞান উপস্থাপন করা এবং দিনশেষে ভাল মার্কস পাওয়াতেই তারা সার্থকতা খোঁজে। শিক্ষকরা ছাত্রদের নতুন জ্ঞান আহরণ বা সৃষ্টিতে উৎসাহিত করেন না। তাদেরকে জ্ঞানের প্রয়োগক্ষেত্র দেখিয়ে দেন না। বিভাগগুলোতে বিষয়ভিত্তিক সেমিনার- সিম্পোজিয়ামের কোন আয়োজন দেখা যায় না। এমনকি শিক্ষার্থীরা লাইব্রেরীতে পর্যন্ত যেতে আগ্রহী নয়। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এমন অনেক ছাত্র পেয়েছি, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীতে গিয়ে কখনো একটি বইও ছুঁয়ে দেখেনি। অর্থাৎ সৃষ্টিশীল জ্ঞানার্জনের জন্য যে পরিবেশ- পারিপার্শ্বিকতা প্রয়োজন, তার ছিঁটেফোটাও নেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। এক অজানা গৎবাঁধা সিস্টেমের জালে সবাই যেন বন্দী।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সবচেয়ে বড় যে সংকট তা হ’ল গবেষণার সংস্কৃতি না থাকা। গবেষণা কী জিনিস তা মাস্টার্সে গিয়েও অধিকাংশ ছাত্র জানে না। অথচ মেধার সঠিক পরিচর্যা, দক্ষ মানুষ তৈরী করা, সর্বোপরি জাতীয় উন্নতির জন্য গবেষণার কোন বিকল্প নেই। উন্নত বিশ্বের দেশগুলো বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা খাতে সবচেয়ে বেশী অর্থ খরচ করছে। সরকারী-বেসরকারী বহু প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা গবেষণায় পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে। ফলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে তারা দিন দিন উন্নতির শিখরে আরোহণ করছে। কিন্তু আমাদের দেশে ছাত্ররা অনার্স পর্যায়ে গবেষণার চিন্তাই করতে পারে না। আর মাস্টার্স বা পিএইচডি পর্যায়েও তারা যে গবেষণা করেন, তা উন্নত বিশ্বের গবেষণার তুলনায় পদ্ধতিগতভাবে শিশুতুল্য। গবেষণার সার্বজনীন মান রক্ষায় যত্নবান না থাকায় এসব গবেষণায় মৌলিকত্ব প্রায়ই থাকে না। ফলে গবেষণার মূল বিষয়টি তাদের নিকটে অনাস্বাদিতই থেকে যাচ্ছে। কেউ যখন দেশের বাইরে গিয়ে উন্নত বিশ্বের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় যুক্ত হয়, তখনই কেবল নিজ দেশের গবেষণা সংস্কৃতির দৈন্য অনুভব করতে পারে। কিন্তু তখন আফসোস ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। কেবলই মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের মূল্যবান সময়টা কিভাবেই না নষ্ট হয়ে গেছে।

বিস্ময়ের ব্যাপার হ’ল বাংলাদেশে গবেষণা সংস্কৃতি এতই দুর্বল যে, গবেষণার জন্য সরকারী যে যৎসামান্য বরাদ্দ রয়েছে তা-ও অব্যয়িত থেকে যাচ্ছে প্রকৃত গবেষকের অভাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৭-২০১৮ সনে গবেষণার জন্য বরাদ্দ দেয়া হয় ১৪ কোটি টাকা। কিন্তু বছরান্তে দেখা গেছে তা থেকে মাত্র ৮ কোটি ৪২ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়েছে। ইউজিসিতে ২০১৭ সালে ১০০টি পিএইচ.ডি ফেলোশীপ থাকলেও মাত্র ৫৮ জন শিক্ষক তা গ্রহণ করেন। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থাও তথৈবচ। ফলে বিপুল সংখ্যক মেধার অপচয় হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

অনুরূপভাবে ধর্ম ও নৈতিকতার শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দিন দিন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। যতটুকু রয়েছে তা-ও কেবল বইয়ের দুই মলাটের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে বাস্তবতার ময়দানে শিক্ষকসমাজ হোক কিংবা ছাত্রসমাজ, সকলেরই নৈতিকতার বন্ধন অত্যন্ত শিথিল ও নড়বড়ে। সামান্য স্বার্থের টানে মুহূর্তেই তারা মাকড়সার জালের মত এই নৈতিকতার বন্ধন ছিন্ন করতে একটুও দ্বিধাবোধ করে না। আর এভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিদ্যার আলয় না হয়ে দূর্নীতি, অপশিক্ষা, মেধার অপচয়, স্বার্থদুষ্টতা আর সীমাহীন নৈতিক ও চারিত্রিক অধঃপতনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

এই নাভিশ্বাস অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে গেলে সবার আগে ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতির করালগ্রাস থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রক্ষা করতে হবে। একশ্রেণীর সুশীল ব্যক্তি ৫২, ৬৯, ৭১, ৯০-এর উদাহরণ টেনে ছাত্ররাজনীতির পক্ষে বুলি কপচান। তারা কি জানেন না সেই আন্দোলনগুলো মূলতঃ ছাত্ররাজনীতির অবদান নয়, বরং সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে গড়ে ওঠা সহজাত আন্দোলন? প্রয়োজনে আবারও ছাত্রসমাজ জেগে উঠবে যেভাবে সাম্প্রতিক কালে কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ক্ষেত্রে ঘটেছে। এজন্য লেজুড়ভিত্তিক ছাত্ররাজনীতির কোন প্রয়োজনীয়তা আছে কি? যে রাজনীতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে স্বাধীনতার পর থেকে ছাত্ররাজনীতির বলি হয়ে ইতিমধ্যে প্রায় ২০০ ছাত্র-ছাত্রী নিহত হয়েছে, সেই রাজনীতির হাতে ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ তো দূরের কথা, কারও প্রাণটাও তো নিরাপদ নয়। বাংলাদেশের বাইরে পৃথিবীর এমন একটি রাষ্ট্র পাওয়া যাবে না, যেখানে এই তথাকথিত ছাত্ররাজনীতির নিকৃষ্ট চর্চা রয়েছে।

সুতরাং যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রকৃতই জ্ঞানকাননে পরিণত করতে হয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হোক। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হোক। শিক্ষক-ছাত্র সবার মাঝে জ্ঞান আহরণ ও গবেষণার সংস্কৃতি যেন গড়ে ওঠে এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরী হয়, এ ব্যাপারে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর উপযুক্ত ভূমিকা পালন করা এখন সময়ের দাবী। সার্টিফিকেট বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান না হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিদ্যার প্রকৃত আলয় হোক, ক্ষমতা আর সন্ত্রাসনির্ভর ছাত্ররাজনীতির কেন্দ্র না হয়ে সুস্থ সংস্কৃতি ও নৈতিকতার বিকাশকেন্দ্র হোক, অবৈধ প্রেমকানন না হয়ে সুরোভিত জ্ঞানকানন হোক- এটাই আজ দেশের প্রতিটি সচেতন, জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থীর হৃদয়ের গভীরতম প্রত্যাশা। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন!

ফন্ট সাইজ
15px
17px