📘 তারুণ্যের আত্নপাঠ ও সমাজ চিন্তা 📄 ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও সংগঠন বিরোধিতা

📄 ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও সংগঠন বিরোধিতা


আধুনিক পশ্চিমা দর্শনে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ। এই মতবাদ মানুষের ব্যক্তিসত্তাকে সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করে এবং প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে একচ্ছত্রভাবে স্বীকৃতি প্রদান করে। এর একটি সাধারণ ফলাফল হ’ল এমন যে, ব্যক্তি কেবল নিজেকে নিয়ে ভাবতে শেখে এবং সমাজের প্রতি দায়বোধ থেকে মুক্ত থাকে। যাকে এক কথায় বলা যায় নির্ভেজাল আত্মকেন্দ্রিকতা। এই মতবাদে অবাধ ব্যক্তিস্বাধীনতার যে সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে এবং স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতার যে পোক্ত ধারণা রোপণ করা হয়েছে, তা একটি আদর্শবাদী ও নৈতিকতাসম্পন্ন সমাজের জন্য উপযোগী নয়। বিশেষ করে মুসলিম সমাজে তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। কেননা ইসলামে মানুষের পারস্পরিক বন্ধন অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এতে সর্বদা দায়িত্বশীলতা ও সামাজিকতাবোধকে তাৎপর্যপূর্ণভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। প্রত্যেকেই এখানে পরস্পরের প্রতি কিছু অধিকার ও দায়বোধের নিগড়ে আবদ্ধ, যেখানে স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতার কোন জায়গা নেই। আর এভাবেই ইসলাম মানবিক মানুষের জন্য অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা।

বলা বাহুল্য যে, মানুষের স্বভাবধর্ম হ’ল সামাজিকতা ও সংঘবদ্ধতা। ইসলাম এই স্বভাবধর্মকে লালন করার জন্য মুসলিম সমাজকে প্রতিনিয়ত প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। ইসলামের বুনিয়াদী ইবাদতসমূহ তথা ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ, যাকাত সবই যেন মানুষকে সংঘবদ্ধতা ও পরার্থপরতার প্রতি একেকটি বলিষ্ঠ আহ্বান। এজন্যই একজন মুসলমান কখনও সমাজবিচ্ছিন্ন হ’তে পারে না। সামাজিক দায়মুক্তও সে হ’তে পারে না। ফলে ইসলামও ব্যক্তিস্বাধীনতাকে স্বীকার করে বটে; কিন্তু পশ্চিমাদের দায়মুক্ত ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ইসলামের দায়িত্বশীল ব্যক্তিস্বাধীনতার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে।

ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও আত্মকেন্দ্রিকতার এই দর্শন নিয়ে আমাদের এই আলোচনার হেতু হ’ল সাম্প্রতিক সময়ে একদল ওলামায়ে কেরাম এবং সাধারণ মুসলমানদের মাঝে ইসলামী দল ও সংগঠন সম্পর্কে অগভীর কিছু চিন্তাধারার আবির্ভাব। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে এমন চিন্তাধারা বিশেষ অপ্রত্যাশিত নয়। কিন্তু যারা বিদ্বান ও বোদ্ধা হিসাবে সর্বমহলে সুপরিচিত তারা যখন এ বিষয়ে খাপছাড়া মন্তব্য করেন এবং দায়িত্বহীনভাবে ইসলামী দল ও সংগঠনকে সরাসরি ফিৎনা হিসাবে অভিহিত করেন, তখন সত্যিই গভীর হতাশা ও আফসোসের সৃষ্টি হয়। ইসলামের চিরন্তন সংঘবদ্ধতার ধারণার বিপরীতে তারা যে খোঁড়া বক্তব্য ও যুক্তি পেশ করেছেন তা নিছক নতুন মোড়কে পশ্চিমী ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের বহিঃপ্রকাশ। তাদের এই অবিবেচনাপ্রসূত ফৎওয়া প্রদান থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, আপন গণ্ডি ছাড়িয়ে তারা খুব কমই দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে পারেন। ফলে কোন সংঘবদ্ধ সংগ্রাম বা আন্দোলনকে তার স্বীয় অবস্থান থেকে কখনই মূল্যায়ন করতে পারেন না। সত্যের পক্ষে সংগ্রামরত যেসব বিখ্যাত আন্দোলনের মাধ্যমে ইসলামের জিহাদী চেতনা জাগরুক রয়েছে সারাবিশ্বে এবং বিগত কয়েক শতাব্দীতে যে পদ্ধতিতে দ্বীনের দাওয়াতের প্রচার ও প্রসার হচ্ছে, তাকে এক লহমায় ফিৎনার কারণ বলে যারা আখ্যায়িত করতে পারেন, তারা দ্বীনদারিতায় অগ্রগামী হ’লেও সমাজ ও সভ্যতার ইতিহাস সম্পর্কে নিঃসন্দেহে অগভীর চিন্তাধারার অধিকারী।

নিছক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে কিংবা স্বার্থদুষ্ট হয়ে তারা যেভাবে পশ্চিমাদের মত আত্মকেন্দ্রিকতায় আবদ্ধ থাকাকে প্রাধান্য দেন, তাতে না থাকে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, না থাকে সমাজ সংস্কারের আকুতি, আর না থাকে ইতিহাসের আহ্বান শোনার মত দূরদর্শিতা। বরং সমাজ থেকে নিজেকে সযত্নে বাঁচিয়ে রাখার আত্মতৃপ্তিই যেন তাতে ঝরে পড়ে। একজন মুখলিছ দাঈ ইলাল্লাহ্র জন্য যেটা কখনই কাম্য নয়।

পাণ্ডিত্যের একটি রোগ হ’ল সুশীলতা। সুশীলতা তখনই রোগ হয়ে যায়, যখন তা ব্যক্তিস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয় এবং ঝুঁকিহীনতাকে পসন্দ করে। নিজেকে নিরাপদ জায়গায় রেখে সমাজ ও মানুষের উপর দায়িত্বহীনভাবে মতামত ব্যক্ত করে। সত্যকে সত্য ও মিথ্যাকে মিথ্যা বলার মত সৎসাহস দেখাতে ভয় পায়। নিজের ভীরুতা, কাপুরুষতা এবং অক্ষমতাকে আড়াল করতে অন্যায্য পাণ্ডিত্য ও বিতর্কের আশ্রয় নেয়। আমাদের কিছু প্রাজ্ঞ ওলামায়ে কেরামও সম্ভবতঃ অনুরূপ রোগেই আক্রান্ত হয়েছেন।

পৃথিবীর কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজই সংঘবদ্ধ হওয়া ছাড়া এককভাবে করা সম্ভব নয়। একক কোন ব্যক্তির পক্ষে একটি সভ্যতা গড়ে তোলা কখনও সম্ভব নয়। পৃথিবীতে যত সভ্যতা গড়ে উঠেছে, যত সংগ্রাম ও বিপ্লবের ইতিহাস রচিত হয়েছে সবকিছুর পিছনে ছিল একদল সুসংগঠিত মানুষের সংঘবদ্ধ প্রয়াস। সংগঠন হ’ল এই সংঘবদ্ধ প্রয়াসেরই আধুনিক নাম মাত্র। এটা যারা না বোঝেন কিংবা উৎকট স্বার্থবাদিতাদুষ্ট হয়ে এর বিরুদ্ধে প্রগলভ কথাবার্তা বলেন, তারাই কেবল রাসূল (ছাঃ)-এর সংগঠনের নাম কি ছিল কিংবা ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) কোন সংগঠন করতেন- এই ধরনের অতীব শিশুতোষ প্রশ্ন করতে পারেন। এ যেন ঠিক সেই বিদ’আতীদের মতই মন্তব্য যারা বলে থাকেন, মুনাজাত যদি বিদ’আত হয়, তবে ফ্যান-লাইটও তো বিদ’আত। কেননা এগুলো রাসূল (ছাঃ)-এর যুগে ছিল না। রাসূল (ছাঃ)-এর যুগে নিঃসন্দেহে প্রচলিত আকার ও কাঠামোযুক্ত সংগঠন ছিল না, কিন্তু সংঘবদ্ধতা ছিল। যেমনভাবে প্রচলিত নিয়মের মাদ্রাসা শিক্ষা কাঠামো ছিল না, কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থা ছিল। যুগের প্রয়োজনে শরী’আতের মূলনীতি ঠিক রেখে যে কোন কিছুর রূপ-কাঠামো বদল হবে এটাই স্বাভাবিক। এতে অস্পষ্টতার কিছু নেই।

আধুনিক যুগে আরব বিশ্বের ওলামায়ে কেরাম দল ও সংগঠন বিষয়ে যে সকল ফৎওয়া দিয়েছেন, তা কেবল তাদের স্ব স্ব দেশ ও সমাজের জন্য প্রযোজ্য। সে সকল ফৎওয়াসমূহ একত্রিত করে যারা তাদেরকে বিতর্কিত করতে চান এবং অন্যদেরকে বিভ্রান্ত করতে চান, তারা নিঃসন্দেহে কোন সদুদ্দেশ্য পোষণ করেন না। কেননা তাঁরা মূলতঃ হিযবিয়্যাত বা দলাদলির সাথে যুক্ত ভ্রান্ত সংগঠনগুলোকে উদ্দেশ্য করেছেন। যারা কিনা নিজ সংগঠন বা ঘরানার বাইরে অন্য সকলকে পথভ্রষ্ট মনে করে। কোন হকপন্থী সংগঠনকে তারা উদ্দেশ্য করেননি। বরং তার প্রশ্নই আসে না।

তারা রাসূল (ছাঃ)-এর জামা’আতবদ্ধতার হাদীছগুলোকে কেবল একক ইমামভিত্তিক রাষ্ট্রীয় জামা’আতের সাথে প্রযুক্ত করেন, যা কিনা স্পষ্টতঃই দলীলবিহীন এবং মানহাজ ও যুক্তিবিরোধী। কেননা প্রথমতঃ ইসলাম জামা’আতবদ্ধ হওয়ার জন্য কখনও রাষ্ট্রক্ষমতাকে অপরিহার্য করেনি। যদি করত, তবে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনই আমাদের প্রধান কর্তব্য হয়ে দাঁড়াত। অথচ শরঈ দৃষ্টিকোন থেকে তা সঠিক নয়। বরং রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জন করাকে আবশ্যকীয় এবং দ্বীনের প্রধান উছুল মনে করা বর্তমান যুগের শী’আ, ইখওয়ানী, খারেজীপন্থী প্রমুখদের প্রধান ভ্রান্ত আক্বীদা। দ্বিতীয়তঃ একথা সবারই জানা যে, একক জামা’আত কাম্য হ’লেও আজকের যুগে বিশ্বজুড়ে একক জামা’আত থাকার কোন সুযোগ নেই। বরং সেই যুগের তো অবসান হয়েছে ওছমান (রাঃ)-এর মৃত্যুর পর থেকেই। কিন্তু তাই বলে কি জামা’আতবদ্ধতার হুকুম সমূলে তিরোহিত হয়ে যায়? রাসূল (ছাঃ) কোন সফরে তিনজন একত্রিত হ’লেও যেখানে একজন আমীর নিয়োগ করতে বলেছেন, সেখানে ইসলামে সংঘবদ্ধতার রূপ ও প্রকৃতি অনুধাবনে মোটেও কষ্ট হওয়ার কথা নয়। শায়খ উছায়মীন যথার্থই বলেন, ‘কিছু মানুষ মনে করেন যে, আজকের দিনে মুসলমানদের কোন ইমামও নেই, বায়’আতও নেই। জানি না তারা কি চান যে, মানুষ বিশংখলভাবে চলুক এবং তাদের কোন নেতা না থাকুক? নাকি তারা চান যে এটা বলা হোক- প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজের আমীর বা নেতা? (ইবনুল উছায়মীন, আশ-শারহুল মুমতি’ ৮/৯)।

মোদ্দাকথা হ’ল, ইসলামী সমাজ কখনও নেতৃত্ববিহীন চলতে পারে না। সর্বযুগে, সর্বাবস্থায় এবং সর্বক্ষেত্রে নেতৃত্ব আবশ্যক। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত থাক বা না থাক নেতৃত্ব থাকবেই। বর্তমানে ইসলামী দল ও সংগঠনগুলো বিশ্বব্যাপী মুসলিম সমাজকে দ্বীনের পথে পরিচালনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বিশেষ করে ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্বে যেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মপালনে কোন উৎসাহ প্রদান করা হয় না, সেখানে এই ধরনের জামা’আতের কোনই বিকল্প নেই। নিঃসন্দেহে একক রাষ্ট্রীয় জামা’আত সর্বোত্তম এবং শৃংখলাসাধনে সবচেয়ে ফলপ্রসূ। কিন্তু বর্তমান যুগে সেটা সম্ভব হয়নি বলেই তো ইসলামী খেলাফত আজ ৫৭টি রাষ্ট্রে বিভক্ত। আবার একই বাস্তবতায় একই স্থানে প্রয়োজনের খাতিরে একাধিক জামা’আতও হয়ে গেছে। এটাও নিন্দনীয় নয় যদি পারস্পরিক সহাবস্থান থাকে। সেমতাবস্থায় সাধারণ মানুষ সাধ্যমত তাক্বওয়া ও দ্বীনদারীর ভিত্তিতে সর্বাধিক উপযুক্ত জামা’আত খুঁজে নিবে।

সর্বোপরি আলেমদের মধ্যে কেউ তাঁদের ব্যক্তিগত ইজতিহাদী মত পেশ করতেই পারেন। এর ভিত্তিতে তারা কোন সংগঠনের অংশ নাও হ’তে পারেন। কিন্তু তাই বলে যারা সংঘবদ্ধ আন্দোলন পরিচালনা করছে, তাদের বিরুদ্ধাচরণ করা এবং কুরআন-হাদীছকে নিজের মত করে ব্যাখ্যা করা কি তাদের জন্য মোটেও সঙ্গত? উপরন্তু এটা কি দ্বীনের কাজকে বাঁধাগ্রস্ত করার শামিল নয় (নিসা ৬১)? যদি তা-ই হয়, তবে সেক্ষেত্রে তাদের এই বিরোধী অবস্থান কতটা ভয়ংকর অপরাধের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে, সেটা কি তারা ভেবে দেখবেন?

সর্বোপরি কারো আপত্তি ও পিছুটানের কারণে সমাজের বহমান কোন স্রোত থেমে থাকবে না। আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে পরিচালনার দায়িত্ব যে কাউকে দিয়ে, যেভাবে খুশী পালন করিয়ে নেবেনই। তাতে আমরা যুক্ত হব কি না, সেটাই হ’ল আমাদের সিদ্ধান্ত। সবাই যে সামনের সারির মুজাহিদ হবেন, একথা মোটেও সত্য নয়। কেউ না কেউ পেছনের সারিতে থাকতে চাইবেন, এটাই স্বাভাবিক। দিন শেষে যার যার আপন হিসাবই মুখ্য। নিজেকে দুনিয়া ও আখেরাতে সর্বোচ্চ সফলদের কাতারে নিতে পারলাম কিনা সেটিই আমাদের মূল বিবেচ্য। আমাদের প্রতিটি কথা, প্রতিটি চিন্তা পরকালীন নিক্তিতে মাপা হবে, সেটিই মহাসত্য। এই মহাসত্যকে বুকে ধারণ করার মত দৃঢ়চিত্ততা, সৎসাহস, স্বচ্ছ অন্তর যেন আমরা অর্জন করতে পারি, এটাই হোক আমাদের সাধনা। সচেতন যুবসমাজের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে, সমাজ সংস্কারের মঞ্চে আমাদের দৃঢ় সংকল্পবদ্ধতা যেন কোন অবস্থাতেই হীনবল ও ভঙ্গুর না হয়। শয়তানের ওয়াসওয়াসা যেন আমাদেরকে দুর্বলচিত্ত ও কাপুরুষ না বানিয়ে দেয়। আল্লাহ আমাদের সকলকে তাওফীক দান করুন এবং দ্বীনের প্রকৃত খাদেম হিসাবে পরিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে আল্লাহ্র দরবারে উপস্থিত হওয়ার তাওফীক দান করুন- আমীন!

📘 তারুণ্যের আত্নপাঠ ও সমাজ চিন্তা 📄 সমাজ সংস্কার ও আমাদের সংগ্রাম

📄 সমাজ সংস্কার ও আমাদের সংগ্রাম


মানবজাতি পৃথিবীর শুরুকাল থেকে যে প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হয়েছে, তা খুব একটা ব্যতিক্রম ছাড়া একটা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলেছে। আর তা হ’ল সমাজের একদল মানুষ মন্দ, অকল্যাণ ও অসত্যের পথে প্রলুব্ধ হয়। অপর এক দল মানুষ এই পথভ্রষ্টদেরকে সুপথ প্রদর্শন করে যায়, যদিও এই দলটি সংখ্যায় অতি স্বল্প। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যুগে যুগে নবী-রাসূলগণকে এই সুপথপ্রদর্শনের দায়িত্ব দিয়েই প্রেরণ করেছিলেন। আল্লাহ বলেন, ‘আর প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য পথপ্রদর্শক রয়েছে’ (রা’দ ১৩/৭)। কোন সমাজে যদি এমন সংস্কারক দল না থাকে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মতো শক্তি না থাকে, তবে সে সমাজ নিঃসন্দেহে পতনোন্মুখ হবে।

এজন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুমিনদেরকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিৎ, যারা মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে এবং সৎ কাজের নির্দেশ দেবে ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই প্রকৃত সফলকাম’ (আলে ইমরান ৩/১০৪)। আমরা ব্যক্তিগতভাবে যতই সৎ বা ন্যায়নিষ্ঠ হই না কেন, যদি অপরকে সৎ বা ন্যায়নিষ্ঠ বানানোর প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ না করি, তবে সমাজে প্রকৃতার্থে সংস্কার আসে না। এজন্য আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না; যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে’ (রা’দ ১৩/১১)।

সমাজ সংশোধনের এই প্রচেষ্টা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যা কোন না কোন ভাবে চলমান থাকবেই এবং আল্লাহ কাউকে না কাউকে দিয়ে তা করিয়ে নেবেনই। তবে একজন দায়িত্বশীল ও জান্নাতপিয়াসী মুমিনের অবশ্য কর্তব্য হ’ল এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকা। কেননা ঈমান শুধু মুখে দাবী করার বিষয় নয়, বরং তার ছাপ বা দলীলও থাকতে হয়। কেউ ঈমানের দাবীদার হ’লে তাকে বাস্তব জীবনে সেই দাবীর পক্ষে দলীলও পেশ করতে হবে। এজন্য আল্লাহ বলেন, তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে; যতক্ষণ না তোমাদের মধ্যে কে জিহাদ তথা আল্লাহ্ পথে সংগ্রাম করেছে এবং কে ধৈর্যশীল তা না জানছেন? (আলে-ইমরান ৩/১৪২)। যদি সুযোগ ও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আমরা স্বীয় দায়িত্ব পালনে অবহেলা প্রদর্শন করি, তবে তা নিঃসন্দেহে আল্লাহকে ক্রুদ্ধ করবে। আল্লাহ হুঁশিয়ারী বাণী উচ্চারণ করে বলেন, ‘যদি তোমরা বিমুখ হয়, তাহ’লে তিনি অন্য জাতিকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন; অতঃপর তারা তোমাদের মত হবে না (মুহাম্মাদ ৪৭/৩৮)। এর মাধ্যমে আল্লাহ আমাদেরকে নিরন্তর ঈমানের পরীক্ষার মধ্যে রেখেছেন যে কারা আমরা প্রকৃত বিশ্বাসী আর কারা কপট। আল্লাহ বলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব যতক্ষণ না আমি তোমাদের মধ্যে মুজাহিদ ও ধৈর্যশীলদের জেনে নিই এবং আমি তোমাদের কর্মকাণ্ড পরীক্ষা করি (মুহাম্মাদ ৪৭/৩১)। এই পরীক্ষায় যে যত বেশী অগ্রগামী হ’তে পারবে, সে ততবেশী সফল হবে এবং আল্লাহ্র নৈকট্যশীল বান্দাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে (আন’আম ৬/১৩২)।

আজ মুসলিম উম্মাহ যে বিপর্যয় ও অধঃপতনের মধ্যে অতিক্রম করছে তার পিছনে একটি বৃহত্তম কারণ হ’ল মুসলিম সমাজের সংস্কার চেতনা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের মানসিকতা হারিয়ে ফেলা। অজ্ঞতা, কুসংস্কারচ্ছন্নতা, দুনিয়ার প্রতি আসক্তি, মাল ও মর্যাদার লোভ তাদেরকে এমনভাবে গ্রাস করে ফেলেছে যে, উম্মাহ্র প্রতি দায়বোধ, মানবতার জন্য বৃহত্তর কল্যাণচিন্তা, আত্মমর্যাদাবোধ, সর্বোপরি আল্লাহ্র দ্বীনকে আল্লাহ্র যমীনে বিজয়ী করার সদিচ্ছা, দৃঢ়চিত্ততা- সবকিছুই হারিয়ে ফেলেছে তারা। রাসূল (ছাঃ) এ সম্পর্কে বহু পূর্বেই আমাদেরকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘যখন তোমরা ‘ঈনা তথা প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বাকিতে অধিক মূল্যে ক্রয়-বিক্রয় করবে, গরুর লেজ ধারণ করবে এবং কৃষিকাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকবে (তথা দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে) এবং জিহাদ তথা আল্লাহ্র রাস্তায় সংগ্রামকে পরিত্যাগ করবে, তখন আল্লাহ তোমাদের উপর লাঞ্ছনা ও অবমাননাকর অবস্থা চাপিয়ে দেবেন। আর ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি এই লাঞ্ছনা ও অপমান দূরীভূত করবেন না যতক্ষণ না তোমরা পুনরায় দ্বীনের প্রতি ফিরে আস’ (আবুদাউদ হা/৩৪৬২, সনদ ছহীহ)।

সুতরাং সচেতন ও ঈমানদার যুবসমাজের প্রতি আমাদের বিনীত আহ্বান থাকবে, মুসলিম উম্মাহ্র এই অধঃপতিত ও লাঞ্ছনাকর অবস্থাকে মূল্যায়ন করা এবং নিশ্চেষ্ট না থেকে নিজেদের কর্তব্য-করণীয় নির্ধারণ করা। যদি প্রকৃতই আমরা মুসলিম উম্মাহ্র প্রতি আমাদের দায় পূরণ করতে চাই এবং আল্লাহ্র নৈকট্যশীল বান্দাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হ’তে চাই, তাহ’লে অবশ্যই খালেছ অন্ত রে আল্লাহ্ পথে সংগ্রামের পথকে বেছে নেয়া ছাড়া আমাদের বিকল্প কোন পথ নেই। ইসলামের বিজয় নিহিত রয়েছে এ পথেই।

মনে রাখতে হবে, এ সংগ্রামের পথ মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ নয়। বরং নানামুখী হাযারো বাধা আমাদেরকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করবে। শয়তানী চক্রান্ত আমাদেরকে কখনো দিশেহারা করে তুলবে। হয়তবা অনেকেই হতাশাগ্রস্ত হয়ে হাল ছেড়ে দেবে, গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়ে হারিয়ে যাবে কিংবা দুনিয়ার মোহে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়বে। তবুও প্রকৃত সত্যসেবী একদল লোক দৃঢ়চিত্তভাবে দাঁতে দাঁত চেপে হককে বিজয়ী করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাবে। আর চূড়ান্ত বিচারে দুনিয়া ও আখেরাতে সফলকাম তারাই। আল্লাহ আমাদেরকে দ্বীনের এই মহত্তম সংগ্রামের পথে অবিচল রাখুন এবং সমাজ সংস্কারের আন্দোলনে যথাসাধ্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করার তাওফীক দান করুন- আমীন!

📘 তারুণ্যের আত্নপাঠ ও সমাজ চিন্তা 📄 যেতে হবে বহুদূর!

📄 যেতে হবে বহুদূর!


বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের ইসলামী ঘরানায় এক ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তনের জোয়ার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘকাল সামাজিক প্রেক্ষাপটে আপাত পিছিয়ে পড়ে থাকা ধর্মীয় অঙ্গনের মানুষগুলো নতুন করে যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছেন। সমাজ থেকে সযত্নে গাঁ বাঁচিয়ে চলাকে যে সকল ওলামায়ে কেরাম এক সময় তাক্বওয়া ও মুক্তির পথ মনে করতেন, তারা এখন দেদার সমাজ সম্পৃক্ত কাজে যুক্ত হচ্ছেন। মিডিয়া, সামাজিক ও দাতব্য কর্মকাণ্ড, প্রকাশনা প্রভৃতি অঙ্গনে তাদের সরব উপস্থিতি এক নতুন জাগরণের আভাস দিচ্ছে। ফলে যারা এক সময় ধর্মচর্চায় যুক্ত মানুষগুলোর প্রতি নাক সিটকানোর ভাব দেখাতেন, কুপমণ্ডুকতার দায়ে তাদেরকে কথায় কথায় হেয় করতে চাইতেন, তাদের মাঝে হঠাৎ ধর্মীয় ঘরানার প্রতি কিছুটা হ’লেও সুনজর লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এই জাগরণের ভবিষ্যৎ এখনই অনুমান করা কঠিন, তবে নিঃসন্দেহে তা আশাব্যঞ্জকই বলতে হবে। আর তা এই কারণে যে, এই ধর্মীয় গণজাগরণে যে জিনিসটি ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে, তা হ’ল সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্ম সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি হওয়া। তাদের মধ্যে সত্য জানার আগ্রহটা আগের তুলনায় এখন অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। এদেশে ধর্মের নামে হাযারো কুসংস্কার যে শত শত বছর ধরে চেপে বসে আছে এবং কুরআন-হাদীছের ইসলাম আর প্রচলিত রেওয়াজী ইসলাম যে এক নয়, তা বহু মানুষের উপলব্ধিতে আসতে শুরু করেছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বরং সম্প্রতি পাকিস্তান, শ্রীলংকা, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া সফরেও প্রায় একই দৃশ্য দেখেছি। মানুষ এখন উন্মুখ হয়ে আছে সত্যিকার ইসলামের পতাকাবাহকদের জন্য। এক মরুভূমিসম তৃষ্ণা নিয়ে তাদের হৃদয় অপেক্ষা করছে নতুন দিনের অশ্বারোহীদের জন্য। যারা মানুষকে ইসলামের সরল ও সঠিক পথের দিকে ডাকবে, জাহেলিয়াতের ঘোর অমানিশাকে ছিন্ন করে হকের দৃপ্ত প্রদীপ জ্বালাবে।

এই প্রেক্ষাপটে ইসলামী আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ার কাজে যারা সম্পৃক্ত রয়েছেন, তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হ’ল, এই জাগরণকে সঠিক পথে পরিচালিত করা এবং এদেশের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মীয় অঙ্গন, সমাজ ও রাজনীতিতে অর্থবহ পরিবর্তনের জন্য দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে আসা। আর এজন্য প্রয়োজন ময়দানে একদল সত্যসেবী মানুষের সক্রিয় পদচারণা এবং ধৈর্য, বিচক্ষণতা ও অবিচলতার সাথে পরিস্থিতির মুকাবিলা করা। তাদের দায়িত্বশীলতা এবং দৃঢ়পদ ভূমিকার উপরই নির্ভর করছে এই জাগরণের ভবিষ্যৎ।

লক্ষণীয় বিষয় হ’ল, এই জাগরণে সবচেয়ে বড় নিয়ামক শক্তি যেমন আলেম সমাজ, তেমনি সবচেয়ে বড় বাধাও হ’ল আলেম সমাজ। তাদের সঠিক ভূমিকার কারণে সমাজ যেমন ব্যাপকভাবে উপকৃত হ’তে পারে, তেমনি তাদের অনৈতিক ভূমিকার কারণে এই জাগরণ আবার অচিরেই বিপর্যস্ত হয়ে নিভে যেতে পারে। এজন্য একদিকে আলেম সমাজকে যেমন অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, তেমনি সাধারণ জনগণকেও বিশেষভাবে নযর রাখতে হবে, যেন কিছু আলেমের পদস্খলনের কারণে সমগ্র সমাজ পদস্খলিত না হয়। ওমর বিন খাত্ত্বাব (রাঃ) বলেন, দ্বীন ইসলামকে ধ্বংস করে তিনটি জিনিস- (১) আলেমদের পদস্খলন, (২) কুরআন নিয়ে মুনাফিকদের বিতর্ক, (৩) নেতাদের পথভ্রষ্ট হওয়া (জামে’উ বায়ানিল ইলম হা/১৮৬৭)। এর ব্যাখ্যায় সাধারণ মানুষের করণীয় সম্পর্কে মু’আয বিন জাবাল (রাঃ) বলেন, আলেমদের ব্যাপারে দু’টি পন্থা অবলম্বন করবে। যদি তারা সঠিক পথে থাকেন, তবে তাদের অন্ধভাবে অনুসরণ করবে না। আর যদি তারা ফিৎনায় নিপতিত হন, তবে তাদের থেকে ধৈর্যহারা হয়ে ছিটকে যাবে না। কেননা মুমিন ফিৎনায় পতিত হ’লে তওবা করে (অর্থাৎ তাদের প্রতি সুধারণা রেখে তাদের তওবার অপেক্ষায় থাকবে) (জামে’উ বায়ানিল ইলম হা/১৮৭২)। এভাবে পারস্পরিক দায়িত্বশীল ও সহমর্মী ভূমিকার মাধ্যমেই দ্বীনের এই পবিত্র জাগরণ সঠিক গন্তব্যপানে এগিয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। এই সুধারণা ও আশাবাদ আমরা আন্তরিকভাবে পোষণ করি।

আলহামদুলিল্লাহ এই দ্বীনী গণজাগরণেরই প্রতিনিধি হিসাবে আল্লাহর অশেষ রহমতে এদেশের বুকে আহলেহাদীছ আন্দোলন এই গণজাগরণের প্রতিনিধি হিসাবে এদেশের বুকে হকের আওয়ায বুলন্দ করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। আহলেহাদীছ সংগঠনগুলোর নানামুখী তৎপরতার মাধ্যমে এদেশের গণমানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে বিশুদ্ধ ইসলামী আক্বীদা ও আমলের বার্তা। পৌঁছে যাচ্ছে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের দিকে প্রত্যাবর্তনের বার্তা, ন্যায় ও ইনছাফের বার্তা। সর্বোপরি ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় জীবন পর্যন্ত জীবনের সবগুলো ক্ষেত্রকে অহি-র আলোয় ঢেলে সাজানোর বার্তা। এদেশের ধর্মীয় অঙ্গন থেকে শিরক-বিদ’আতকে উৎখাত করে তাওহীদ ও ছহীহ সুন্নাহ্হ্ কার্যকর চাষাবাদ এবং সমাজ ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গন থেকে সকল প্রকার বিজাতীয় মতবাদকে উৎখাত করে ইসলামের সাম্য ও ন্যায়বিচারকে প্রতিষ্ঠাদানের সুস্পষ্ট ও বলিষ্ঠ লক্ষ্যকে সামনে রেখে এই আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে সর্বত্র।

সুতরাং যুবসমাজের প্রতি আমাদের আহ্বান- আসুন! আমরা সম্মিলিতভাবে এই আন্দোলনের বার্তাকে দেশের প্রতিটি কোণায় কোণায় পৌঁছে দেয়ার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করি। ধৈর্য, সাহস ও আত্মবিশ্বাসের সাথে এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হই। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহ.), ইমাম ইবনু তায়মিয়া (রহ.), ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহ্হাব (রহ.), শাহ ইসমাঈল শহীদ (রহ.), সাইয়েদ নিছার আলী তিতুমীর (রহ.) প্রমুখের রেখে যাওয়া সেই সমাজ সংস্কার আন্দোলনের এই ধারাবাহিক উত্তরাধিকারকে আমাদের এগিয়ে নিতেই হবে। আমাদের মধ্যে হাযারো ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকবে, মতভেদ থাকবে, চলার পথে থাকবে অসংখ্য বাধা ও বিপদ। কিন্তু তাই বলে যে বিশুদ্ধ ঈমান-আক্বীদা ও আমলের আহ্বান আমাদেরকে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাতছানি দেখিয়েছে, তা আমরা কখনও হাতছাড়া করতে পারি না। যত বাধাই আসুক না কেন, সকল বাধার প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে সত্য সূর্যের আলো আমরা সর্বত্র ছড়িয়ে দেবই। জান্নাতের পথে ছুটে চলার এই মিছিলকে আমরা বেগবান করবই। জাহেলিয়াতের তিমিরে ডুবে থাকা মানুষকে আলোর পথ দেখাবই।

উদয়ের পথে শুনি কার বাণী/ ভয় নাই ওরে ভয় নাই
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান/ক্ষয় না তার ক্ষয় নাই।

ঐ শুনুন আল্লাহ্ বাণী- ‘তোমরা হীনবল হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না, তোমরাই তো বিজয়ী, যদি তোমরা মুমিন হও’ (আলে ইমরান ৩/১৩৯)। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফীক দান করুন- আমীন!

📘 তারুণ্যের আত্নপাঠ ও সমাজ চিন্তা 📄 অহি-র আলোয় উদ্ভাসিত হোক বাংলার প্রতিটি ঘর

📄 অহি-র আলোয় উদ্ভাসিত হোক বাংলার প্রতিটি ঘর


ক্বিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীর প্রতিটি ঘরে ঘরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে যাবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, এ যমীনের উপর এমন কোন মাটি কিংবা পশমের ঘর (তাঁবু) বাকী থাকবে না, যে ঘরে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইসলামের বাণী পৌঁছিয়ে দেবেন না। সম্মানীর ঘরে সম্মানের সাথে; আর লাঞ্ছিতের ঘরে লাঞ্ছনার সাথে তা পৌঁছাবেন। এদের মধ্যে কাউকে আল্লাহ তা’আলা সম্মানিত করবেন এবং (স্বেচ্ছায়) ইসলাম কবূলের জন্য উপযুক্ত করে দেবেন। আবার কাউকে লাঞ্ছিত করবেন এবং তারা বাধ্য হয়ে এই দ্বীনের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করবে (অর্থাৎ সকল দ্বীনের উপর ইসলাম বিজয়ী হবে) (আহমাদ, মিশকাত হা/৪২)।

এই হাদীছের প্রেরণাকে সামনে রেখে আমরা যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি তা হ’ল- ‘অহি-র আলোয় উদ্ভাসিত হোক বাংলার প্রতিটি ঘর’। অর্থাৎ আমরা চাই বাংলার যমীনে প্রতিটি গৃহে, প্রতিটি ঘরে অহি-র বার্তা পৌঁছে যাক সগৌরবে। ধনী হোক, গরীব হোক; শিক্ষিত হোক কিংবা অশিক্ষিত- কেউ যেন এই মহান দাওয়াত থেকে বঞ্চিত না হয়। প্রত্যেকের কাছে যেন এই বার্তা পৌঁছে যায় যে, ইসলাম হ’ল তাওহীদ তথা এক আল্লাহর সার্বভৌমত্বের নাম। এতে কোন শরীকানা নেই। হোক তা সৃষ্টি পরিচালনায় কিংবা মানব সমাজের দৈনন্দিন ইবাদত-বন্দেগী, কার্যবিধিতে। রব হিসাবে, ইলাহ হিসাবে, নামে-বৈশিষ্ট্যে-গুণাবলীতে সর্বত্র তাঁর এক ও একক অবস্থান। তাতে না আছে বিন্দুমাত্র ক্ষান্তি ঘটানোর কোন অবকাশ; আর না আছে অংশীদারিত্ব দাবী করার মত কোন ধৃষ্টতার সুযোগ। মহান প্রভুর স্পষ্ট ঘোষণা- জেনে রেখ, সৃজন ও আদেশ তাঁরই। তিনি মহিমাময় বিশ্ব প্রতিপালক (আ’রাফ ৭/৫৪)।

সুতরাং যাবতীয় সিজদা-আরাধনা, কামনা-বাসনা, আশা-ভরসা, ভক্তি-অনুরক্তি কেবল তাঁর কাছেই নিবেদিত হ’তে হবে। মান্য করতে হবে কেবল তাঁরই দেয়া বিধি-বিধান, তাঁরই প্রেরিত প্রত্যাদেশ-নির্দেশনা। এর ব্যত্যয় ঘটানোর কোন সুযোগ নেই। মহান রবের এই একচ্ছত্র আধিপত্য মেনে নেয়া ও তাঁর ইচ্ছার কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্যেই নিহিত রয়েছে বান্দার সফলতা ও মুক্তির চাবিকাঠি। আর এর বিপরীতে স্রষ্টার আধিপত্যে সামান্যতম বিঘ্ন ঘটায় এমন যা কিছু রয়েছে, তা-ই শিরকের প্রতিভূ, তা-ই পরিত্যাজ্য। তাতেই রয়েছে যাবতীয় অশান্তি আর ধ্বংসের সুলুক।

দ্বিতীয়তঃ পার্থিব জীবনে আমাদের একমাত্র চলার পথ রাসূল (ছাঃ) আনীত রবের প্রত্যাদেশ আর তাঁর প্রদর্শিত সুন্নাত। আমাদের যাবতীয় ইবাদত-আমল, আইন-সংবিধান, আচার-বিধি, সাহিত্য-সংস্কৃতি, লাইফস্টাইল-সবই পালিত হবে কুরআন ও সুন্নাহ বর্ণিত পন্থায়। এতেই রয়েছে যাবতীয় কল্যাণের দিশা, মানবীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের সঠিক পরিচর্যা। এর বিপরীতে যত পথ ও মত, যত বুযুর্গ ও আকাবির, যত মান্য ও শ্রদ্ধেয়- সবই অগ্রহণযোগ্য, মানবতা বিধ্বংসী ও অকল্যাণের দিশারী। তা আপাতঃদৃষ্টিতে যতই গ্রহণযোগ্য ও শ্রুতিমধুর মনে হোক না কেন। সুতরাং নির্ভেজাল তাওহীদের বিশ্বাস এবং পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ্ পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের নামই হ’ল ইসলাম। এর বাইরে ইসলামের নামে যত পথ ও মতের দিকে আহ্বান করা হোক না কেন, তা কখনই প্রকৃত ইসলাম নয়; বরং ইসলামের নামে মিথ্যাচার ও প্রতারণা। এই বার্তাটুকুই আমরা এদেশের সকল মুসলমানের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে চাই। আমরা জানাতে চাই- ‘আসুন! পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে জীবন গড়ি’। ‘সকল বিধান বাতিল কর অহি-র বিধান কায়েম কর’। কতজন এই দাওয়াত গ্রহণ করল- তা আমাদের বিবেচ্য নয়; বরং কতজনের কাছে এই দাওয়াত পৌঁছানো গেল সেটাই মূল বিবেচ্য।

আল্লাহর পথে দাঈ হিসাবে যারা কাজ করবেন, তাদের উদ্দেশ্যে আমাদের উদাত্ত আহ্বান হ’ল, যাবতীয় ষড়যন্ত্র-বিভ্রান্তি, অলসতা-বিলাসিতা, হিংসা-বিদ্বেষ দু’পায়ে দলে যার যতটুকু জ্ঞান, যোগ্যতা ও ক্ষমতা আছে সবটুকু ব্যয় করে সাধ্যমত মানুষের কাছে হকের দাওয়াত তুলে ধরুন। স্মরণ করুন আল্লাহ্ বাণী- ‘আর তার চেয়ে কার কথা উত্তম যে আল্লাহ্ দিকে আহ্বান জানায় এবং সৎকাজ করে। আর বলে, আমি তো আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)’ (হা-মীম সাজদাহ ৪১/৩৩)। অন্তরে জাগ্রত রাখুন রাসূল (ছাঃ)-এর সেই চিরন্তন প্রেরণাবাণী- ‘আল্লাহ্র কসম! তোমার দ্বারা যদি একটি মানুষও হেদায়াত লাভ করে, তা হবে তোমার জন্য (আরবের মূল্যবান সম্পদ) লাল উট লাভের চেয়ে উত্তম’ (বুখারী হা/৩৭০১; মুসলিম হা/২৪০৬)। সেই সাথে এই মহান দায়িত্ব পালনের জন্য বিশেষ কিছু গুণাবলীর অধিকারী হ’তে হবে। যেমন-

(১) লক্ষ্যের দৃঢ়তা এবং হকের উপর সদা ইস্তিকামাত বা অবিচল থাকা। লক্ষ্যহীন ও দুর্বলচিত্ত মানুষ কখনও হকের দাওয়াত প্রচারের জন্য উপযুক্ত নয়। যিনি দাঈ হবেন, তাকে অবশ্যই লক্ষ্য সচেতন হ’তে হবে, সাহসী হ’তে হবে, আত্মবিশ্বাসী হ’তে হবে। কোন দুনিয়াবী স্বার্থে ও প্রলোভনে হক থেকে তার অবস্থান বিন্দুমাত্র নড়চড় হবে না। বাতিলের চাকচিক্য দেখে তিনি প্রতারিত হবেন না। বিপদ কিংবা সমস্যার ঘনঘটা তাকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করবে না।

(২) নৈতিক চরিত্রের অধিকারী হওয়া। চারিত্রিক পবিত্রতা একজন দাঈর অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। যে ব্যক্তি পাপ ও অন্যায় কাজ থেকে বাঁচার চেষ্টা করে না, কুপ্রবৃত্তিকে দমনে সতর্ক থাকে না, তাক্বওয়া অবলম্বন করা না, সে ব্যক্তি খুব সহজেই শয়তানের ফাঁদে আটকা পড়ে যায়। সুতরাং দাঈকে অবশ্যই দৃঢ় নৈতিক চরিত্রের অধিকারী হ’তে হবে। শয়তানের হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য সদা সতর্ক প্রহরীর ভূমিকা পালন করতে হবে। যেখানে অনৈতিকতার হাতছানি, যেখানে পাপের সম্ভাবনা, সেখান থেকে নিজেকে যোজন যোজন দূরে রাখতে হবে।

(৩) সততা ও আমানতদারিতা। এই গুণে গুণান্বিত ব্যক্তি পৃথিবীর সর্বত্রই সফল। যার মধ্যে উক্ত গুণাবলীর প্রভাব যত বেশী, সে লক্ষ্য অর্জনে তত বেশী সফল। সুতরাং দাঈর জন্য সর্বাবস্থায় কথায় ও কর্মে সৎ, নীতিবান, আমানতদার ও ন্যায়পরায়ণ থাকা অপরিহার্য।

(৪) ধৈর্য। বিপদসংকুল পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত নানা মাত্রার প্রতিকূল পরিবেশ আমাদেরকে সদা আচ্ছন্ন করে। হতাশা, কষ্ট, ভয়-ভীতি আঁকড়ে ধরে। উর্ধ্বতনদের বাধা এবং অধীনস্থদের অবাধ্যতার মুখোমুখি হ’তে হয়। এমতাবস্থায় আমাদের রক্ষাকবচ হ’ল ধৈর্য। ধৈর্যশীলতার একমাত্র পরিণাম সফলতা। সুতরাং একজন দাঈকে সমাজ সংস্কারের ময়দানে ধৈর্যশীলতার মূর্ত প্রতীক হ’তে হবে।

(৫) সদাচরণ। দাঈ যত জ্ঞানী বা পরহেযগার হোক না কেন, তার মুখের ভাষা ও আচরণ যদি হয় অসংযত, যদি তার অন্তর হয় অপরের প্রতি শুভকামনাহীন ও বিদ্বেষপরায়ণ; তার পক্ষে দাওয়াতী ময়দানে নামাই অর্থহীন। দাঈকে অবশ্যই সদাচরণ রপ্ত করতে হবে। মানুষের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার মত উত্তম গুণাবলীসম্পন্ন হ’তে হবে।

পরিশেষে প্রাণপ্রিয় যুবক ভাইদের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে, অহীভিত্তিক বিশুদ্ধ ইসলামের বার্তাকে সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়ার মিশনকে যেন আমরা আমাদের জীবনের মহোত্তম লক্ষ্য বানিয়ে নেই এবং এই মহান সংস্কার আন্দোলনের যোগ্য কর্মী হিসাবে নিজেদের গড়ে তুলি। আমাদের সমাজ ও আমাদের পরিপার্শ্বকে আল্লাহ্র বিধান অনুযায়ী পরিচালনার জন্য সর্বাত্মক ভূমিকা গ্রহণ করি। বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে যেন পৌঁছে যায় হকের আওয়ায। বাংলার যমীন যেন একদিন পরিণত হয় বিশুদ্ধ দ্বীনের এক উর্বর চারণক্ষেত্রে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে সেই তাওফীক দান করুন এবং আমাদের সকলকে তাঁর দ্বীনের মর্দে মুজাহিদ হিসাবে কবুল করে নিন। পরজীবনে জান্নাতের চিরশান্তির আবাসস্থলের অধিকারী হওয়ার তাওফীক দিন- আমীন!

ফন্ট সাইজ
15px
17px