📄 আয়া সোফিয়ায় আযানের সুর...
ইতিহাসের প্রতি সবসময় বিশেষ একটা আকর্ষণহেতু আয়া সোফিয়া নামটির সাথে পরিচয় আশৈশবকাল থেকেই। প্রথম কবে আয়া সোফিয়ার চিত্রপট দেখেছিলাম মনে নেই। তবে যেদিন থেকে দেখেছি, সেদিন থেকে কখনই সেটিকে মসজিদভিন্ন অন্য কিছু ভাবতে পারিনি। চারকোণে মিনার থাকা সত্ত্বেও ওটা যে মসজিদ নয়; বরং জাদুঘর, সেটা জানা হয়েছে বেশী দিন হয়নি। এই না জানাটা কেবল আমার ইতিহাস অজ্ঞতা, নাকি বাস্তবতার দাবী; তা-ই বোধ হয় এখন পরিষ্কার হওয়ার সময় হ’ল। গৌরবময় ওছমানীয় খেলাফতের প্রাণকেন্দ্রে মসজিদ না থেকে গীর্জা থাকবে, সেটা বোধহয় ইতিহাস মেনে নেয়নি। তাইতো দীর্ঘ ৮৬ বছর জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের অর্গল ছিন্ন করে ইতিহাস আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। প্রতীক্ষার অন্তহীন প্রহর পেরিয়ে মর্মভেদী আযানের সূর ফের ভেসে এল আয়া সোফিয়ার সুউচ্চ মিনারচূড়া থেকে। সুশীতল হৃদয়ে, অশ্রুসজল নেত্রে বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান তাকিয়ে রইল সেই মিনারের পানে। অবাক বিস্ময়ে শতাব্দীর মিনার বেয়ে ইথারে ভাসমান সেই তরঙ্গমালা মুহূর্তেই বুভুক্ষ বিশ্বমুসলিমের হৃদয়জগতকে অদ্ভুত আবেশে আন্দোলিত করে তুলল। আহা, কি মধুর সে অনুভূতি! তাওহীদের এমন বিজয়দৃশ্য দেখার মত আনন্দময় অভিজ্ঞতা মুমিনের যিন্দেগীতে আর কী হ’তে পারে!
আজ থেকে দেড় হাযার বছর পূর্বে ৫৩৭ খৃষ্টাব্দে তৎকালীন বিশ্ব পরাশক্তি বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজা জাস্টিনিয়ান (৪৮২-৫৬৫ খৃ.) কনস্টান্টিনোপল শহরের গোল্ডেন হর্ণে আয়া সোফিয়া (যার অর্থ পবিত্র জ্ঞান) গীর্জা নির্মাণ করেন, যেটি পরবর্তী কয়েকশ’ বছর যাবৎ বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থোডক্স গীর্জা ছিল। ১৪৫৩ সালে ওছমানীয় সুলতান মুহাম্মাদ আল-ফাতেহ রোমান সাম্রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র কনস্টান্টিনোপল জয় করে শহরটির নাম রাখেন ইসলামবুল বা ইসলামের শহর (মোস্তফা কামাল কর্তৃক পরিবর্তিত নাম ইস্তাম্বুল)। সেই সাথে এই সাম্রাজ্যের ধর্মীয় প্রতীক আয়া সোফিয়া গীর্জাকে ব্যক্তিগত অর্থায়নে খৃষ্টানদের কাছ থেকে ক্রয় করে নেন এবং স্থাপনাটিকে মসজিদে রূপান্তরিত করেন। ১৪৫৩ সালের ১লা জুন সর্বপ্রথম জুম’আর ছালাতের মাধ্যমে মসজিদটির উদ্বোধন হয়। সেই থেকে টানা ১৯৩১ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত ৪৭৮ বছর এটি মসজিদ হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। অতঃপর ১৯৩৪ সালে তুরস্ককে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে পাশ্চাত্যের তল্পীবাহক মোস্তফা কামাল মসজিদটিকে অন্যায়ভাবে জাদুঘরে পরিণত করেন। অতঃপর বহু ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে ১০ই জুলাই ২০২০ তুরস্কের সর্বোচ্চ আদালতের রায় মোতাবেক তুর্কী প্রেসিডেন্ট এরদোগান আয়া সোফিয়াকে পুনরায় মসজিদে রূপান্তরের নির্দেশ দেন। অতঃপর ২৪শে জুলাই জুম’আর ছালাতের মাধ্যমে দীর্ঘ ৮৬ বছর পর আয়া সোফিয়া মসজিদ হিসাবে তার মর্যাদা ফিরে পায়। ইস্তাম্বুল শহরের অলি-গলিতে লক্ষ লক্ষ মুছল্লীর উপস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট এরদোগান সূরা ফাতিহা ও সূরা বাক্বারার ১ম রুকু পাঠ করেন। অতঃপর জুমআর খুৎবা প্রদানকালে তুর্কী ধর্মমন্ত্রী ড. আলী এরবাশ দৃঢ়তার সাথে বলেন, আজকের পর তুর্কী জাতির অন্তরে ব্যথা-বেদনায় রূপ নেয়া আয়া সোফিয়ার প্রতি আক্ষেপ দূর হবে!... আয়া সোফিয়া মহান আল্লাহ্র দাসত্ব ও তাঁর কাছে নিঃশর্ত আনুগত্যের অন্যতম নিদর্শন!... আয়া সোফিয়া কেবল তুর্কী জাতির সম্পদ নয়; বরং গোটা মুসলিম উম্মাহ্র সম্পদ।... আয়া সোফিয়ায় আযানের সুর ধ্বনিত হওয়ার মধ্য দিয়ে বায়তুল মুক্বাদ্দাসসহ পৃথিবীর অন্যান্য ‘ব্যথিত’ মসজিদগুলো ও সেখানকার অধিবাসীদের অন্তরাত্মা কিছুটা হ’লেও শান্তি পাবে।
আয়া সোফিয়ার মসজিদে রূপান্তরিত হওয়া কোন সাধারণ ঘটনা নয়। সুদীর্ঘ পাঁচ শতাধিক বছর ইসলামী খেলাফতের গৌরব বহন করার পর তুরস্কের উপর তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের নামে যে নির্মমতা ও আগ্রাসনের মাধ্যমে ধর্মহীনতাকে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল, তা বলতে গেলে তুলনারহিত। এই সেই তুরস্ক যেখানে ইসলামের সর্বশেষ চিহ্নটুকুও মুছে দিতে এক সময় আরবীতে আযান নিষিদ্ধ ছিল, আরবী বর্ণমালা নিষিদ্ধ ছিল। নিষিদ্ধ ছিল কুরআন শিক্ষা, ধর্মীয় শিক্ষা, দাড়ি রাখা, শিক্ষাঙ্গনে নারীদের হিজাব পরা এমনকি হিজরী ক্যালেণ্ডার পর্যন্ত। সেই সাথে ইসলামে যা যা নিষিদ্ধ তার সবকিছু জোর করে পশ্চিম থেকে আমদানী করা হয়েছিল, ইসলামের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি সমূলে মিটিয়ে ফেলার জন্য। পশ্চিমা অপসংস্কৃতির অবাধ প্রচলন ঘটানো হয়েছিল তুরস্কের লোকালয় ও নগরে। এমনকি আরবীতে আযানের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দায়ে তুরস্কের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আদনান মেন্দারিস তুর্কী সেনাবাহিনীর হাতে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন ১৯৬০ সালে। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের এই ভয়াল আগ্রাসী রূপ তুরস্কের সমাজব্যবস্থা থেকে ইসলামকে মিটিয়ে ফেলার যে নিপীড়নমূলক আয়োজন করেছিল, তা ছিল গোটা ইসলামী বিশ্বের জন্য অবমাননাকর। ফলে একদিকে ইসলামী খেলাফত হারানো, অপরদিকে খেলাফতের প্রাণকেন্দ্র থেকে ইসলামের সর্বাত্মক উচ্ছেদ কার্যক্রম বিশ্ব মুসলিমের হৃদয়ে এক গভীর বেদনার শেল বিদ্ধ করে রেখেছে বিগত এক শতাব্দীকাল ব্যাপী। আয়া সোফিয়ায় আযানের জান্নাতী সুর সেই শতবর্ষের বেদনার ক্ষতে এক অনাবিল প্রশান্তির প্রলেপ।
সন্দেহ নেই, আয়া সোফিয়ার মসজিদে প্রত্যাবর্তন আধুনিক তুরষ্কের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এক নবযুগের পূর্বাভাস। এক ইতিবাচক পরিবর্তনের পটভূমিকা। স্বভাবতই সেক্যুলার পশ্চিমা বিশ্ব ও তাদের দোসররা এই সিদ্ধান্তের সমালোচনায় মুখর হয়েছে। যে গ্রীসে ১০ হাযার মসজিদ গীর্জায় রূপান্তরিত করা হয়েছে, তারাও জোর গলায় এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে। স্বয়ং পোপ ফ্রান্সিস এতে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। সেই সাথে বিস্ময়করভাবে অনেক ইসলামপন্থীও এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের সমালোচনার বিষয়বস্তু মূলতঃ ধর্মতাত্ত্বিক, রাজনৈতিক; আর সেই সাথে যোগ হয়েছে পক্ষপাতদুষ্টতা। অস্বীকারের সুযোগ নেই যে, সমালোচনাগুলো অনেকটাই যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু কিছু সময় থাকে যখন দ্বিমত করার বিষয়গুলো পিছনে রাখতে হয়। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে অগ্রাধিকারের তারতম্য ঘটে। কেবল তত্ত্ব কথা দিয়ে পৃথিবী চলে না, মাথায় রাখতে হয় বাস্তব প্রেক্ষাপটও। সেই বিচার- বিশ্লেষণের যোগ্যতা ও দূরদর্শিতা না থাকলে আমাদের প্রাপ্তিগুলো সব অপ্রাপ্তিতে পরিণত হবে। মধ্যযুগে তাতারদের হাতে মুসলমানদের বাগদাদ হারানোর ইতিহাস কার না জানা আছে?
সুতরাং আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে যে, সমালোচনার নামে আমাদের জটিলতাগুলো যেন কুটিলতায় রূপ না নেয়, অর্জনগুলো যেন শেষাবধি ব্যর্থতায় পর্যবসিত না হয়। বরং আমরা আশাবাদী যে, আয়া সোফিয়ার আযানের ধ্বনি সুদূরপ্রসারী প্রেরণার বাতিঘর হয়ে এক সময় তুরস্কের সমাজব্যবস্থাকে পূর্ণাঙ্গ ইসলামের পথে নিয়ে আসবে ইনশাআল্লাহ। ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ইসলামের সঠিক বার্তা তথা তাওহীদ ও সুন্নাতের আলোকধারা মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র বিকশিত হবে। আমাদের তরুণ ও যুবসমাজকে সর্বদা সত্য ও ন্যায়ের উপর দৃঢ়চিত্ত হয়ে দণ্ডায়মান থাকার উৎসাহ যোগাবে। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন- আমীন!
📄 ইসলামী রাজনীতির গতি-প্রকৃতি
প্রচলিত গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থা। একটি দল সেখানে নিরংকুশ বিজয় লাভ করে, আর হেরে যায় অপর দলগুলি। একদলের মতে, এতে জিতেছে জনগণ, উন্নয়ন এবং স্থিতিশীলতা। অপর দলের মতে, এতে জয় হয়েছে যুলুম-অন্যায়, অসততা আর প্রহসনের। কোন ভাষ্যটি নৈতিক দিক দিয়ে সঠিক বা বেঠিক সে প্রসঙ্গে আমরা যাব না। বিষয়টি সকলেরই কম-বেশী বোধগম্য। আমরা কেবল সেই দিকটি অবলোকন করতে চাই যে, নির্বাচন এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে এ দেশের ইসলামী ঘরানায় গণতন্ত্রকেন্দ্রিক ধ্যান-ধারণার স্বরূপ কেমন এবং এর আলোকে আমাদের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত ও গন্তব্য কী হওয়া উচিৎ।
আমরা আগেই জানি গণতন্ত্রের ধারণা বিস্তৃতি লাভের পর থেকে সকল দেশেই ইসলামী ঘরানার মধ্যে গণতন্ত্র নিয়ে একটা টানাপোড়েন আছে, যেমনটি ছিল সমাজতন্ত্রের বিকাশকালে। একসময় ‘ইসলামী সমাজতন্ত্র’ নিয়ে ব্যাপক চিন্তা-গবেষণা শুরু হ’লেও সমাজতন্ত্রের অস্তিত্ব হারানোর সাথে সাথে তার বিদায় ঘটেছে। তারপর থেকে শুরু হয়েছে ‘ইসলামী গণতন্ত্র’ নিয়ে একইরূপ আলোচনা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা। একদল বিষয়টি চিন্তা ও দর্শনগত দিক থেকে দেখা শুরু করলেন তো অপরদল সেটিকে ব্যবহারিক দিক থেকে একনায়কতন্ত্র বিরোধী ব্যবস্থা হিসাবে দেখতে লাগলেন। এভাবেই ইসলামপন্থীদের মধ্যে সুস্পষ্ট দু’টি ধারা তৈরী হ’ল। যাদের একদল গণতন্ত্রের ঘোর বিরোধী, অপরদল ঘোরতর না হ’লেও জোরালো সমর্থক।
যারা গণতন্ত্র বিরোধী তারা সুস্পষ্টভাবে গণতন্ত্রকে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক ব্যবস্থা হিসাবে দেখেন। কেননা গণতন্ত্রের নৈতিক ভিত্তি হ’ল ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, যা সুনির্দিষ্ট কোন ধর্ম বা আদর্শের সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেয় না। জনগণের স্বাধীন ইচ্ছাই সেখানে সবকিছু। অপরদিকে ইসলাম নিরংকুশ তাওহীদবাদী ধর্ম হিসাবে এক আল্লাহ্র সার্বভৌমত্বকামী। ফলে উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষ অবশ্যম্ভাবী। আবার যারা গণতন্ত্রকে সমর্থন করেন, তারা মূলতঃ গণতন্ত্রকে আদর্শবাদী জায়গা থেকে না দেখে একনায়কতন্ত্রবিরোধী ব্যবস্থা হিসাবে দেখেন। এদের কেউবা ‘ইসলামী গণতন্ত্র’ নামে একটি নয়া প্রকল্প উপস্থাপন করেন। তারা মনে করেন একক রাজার শাসনের বিপরীতে জনগণের মতামতভিত্তিক শাসনব্যবস্থাই হ’ল গণতন্ত্র, যা ভোট বা নির্বাচনের মাধ্যমে অনূদিত হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য থেকেই প্রধানতঃ গণতন্ত্র সম্পর্কে ইসলামপন্থীদের দ্বিধাবিভক্তির জন্ম।
এ কথা সুবিদিত যে, আধুনিক পৃথিবীতে মোটাদাগে মূলতঃ দুই ধারার রাষ্ট্রপরিচালনা নীতি দেখা যায়। একটি একনায়কতন্ত্র, অপরটি গণতন্ত্র। পৃথিবীর শুরুকাল থেকেই একনায়কতন্ত্র তথা রাজতন্ত্র বা স্বৈরতন্ত্রই রাষ্ট্র পরিচালনা করে এসেছে। আর গণতন্ত্র তথা আম জনগণের মতামতভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যবস্থা আধুনিক যুগের আবিষ্কার। এখন উক্ত দু’টি রাষ্ট্রপরিচালনা ব্যবস্থাকে সামনে রেখে যদি ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা বিশ্লেষণ করতে চাই, তবে প্রথমতঃ আমরা লক্ষ্য করব যে, একটি রাষ্ট্রে শাসক কেমন চরিত্রের হবেন এবং কিভাবে ও কোন নীতিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন, সে বিষয়ে ইসলাম বিস্তারিত দিক-নির্দেশনা দিয়েছে। যেমন ইসলাম বলেছে নেতৃত্ব চেয়ে নেয়া যাবে না এবং নেতৃত্বের কামনাও করা যাবে না। বলেছে আদল ও ইনছাফের কথা, শান্তি ও ন্যায়বিচারের কথা। বলেছে যুলুম ও অবিচার হ’তে বিরত থাকার কথা। সর্বোপরি একটি সমাজকে কিভাবে ইসলামের আলোকে পূর্ণাঙ্গভাবে ঢেলে সাজাতে হবে, শাসননীতি কেমন হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
কিন্তু একজন শাসক ঠিক কোন পদ্ধতিতে নির্বাচিত হবেন এমন সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ইসলাম নির্ধারণ করে দেয়নি। যার প্রমাণ হ’ল- রাসূল (ছাঃ) যখন মারা গেলেন, তখন তিনি কাউকে পরবর্তী শাসক হিসাবে নির্ধারণ করে যাননি, যদিও ইঙ্গিত প্রদান করেছিলেন। আবুবকর (রাঃ) সরাসরি তাঁর পরবর্তী উত্তরসূরীর নাম ঘোষণা করে গিয়েছেন। আবার ওমর (রাঃ) নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য একটি কমিটি গঠন করেছিলেন। পরবর্তী দুই খলীফা ওছমান (রাঃ) ও আলী (রাঃ) তো আকস্মিকভাবে নিহত হওয়ার কারণে এ বিষয়ে কোন নির্দেশনা দেওয়ারই সুযোগ পাননি। পরবর্তীকালে উমাইয়া শাসকরাও বিভিন্ন উপায়ে নেতৃত্ব নির্বাচন করেন। সুতরাং এ কথা বলা যায় যে, ইসলাম শাসক নির্বাচনের বিষয়টিকে মুসলিম উম্মাহ্র ইজতিহাদের উপর ছেড়ে দিয়েছে। এর ভিত্তিতে পরবর্তী মুসলিম বিদ্বানগণ যেমন ইমাম মাওয়ার্দী (৪৫০হি.), ইমাম আল-জুওয়াইনী (মৃ. ৪৭৮হি.), ইমাম নববী (মৃ. ৬৭৬হি.) প্রমুখ ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আকুদ’ তথা পরামর্শ পরিষদ (আধুনিক পরিভাষায় নির্বাচন কমিশন) গঠনের কথা বলেছেন, যে পরিষদ উপস্থিত জনগণের মধ্য থেকে দ্বীনদারী ও সক্ষমতার ভিত্তিতে সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তিকে নেতৃত্বের জন্য বেছে নেবেন। আর নিঃসন্দেহে এটিই সর্বোত্তম নির্বাচন ব্যবস্থা। তবে মোদ্দাকথা হ’ল, যে কোন ন্যায়ানুগ উপায়ে শাসক নির্বাচিত হোক না কেন, ইসলামের মূল বিবেচ্য বিষয় হ’ল শাসক কেমন হবে এবং কিভাবে তিনি রাষ্ট্র চালাবেন। আর এজন্য নির্ধারণ করে দিয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনার সুনির্দিষ্ট মূলনীতিসমূহ। ফলে কোন মুসলিম শাসক যেভাবেই নির্বাচিত হৌন না কেন, তাকে অবশ্যই ইসলামী আইনের প্রতি বিশ্বাসী হ’তে হবে এবং ইসলামী বিধি-বিধান মোতাবেক সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে- এটাই ইসলামের দাবী।
এখন প্রশ্ন হ’ল, প্রচলিত এই দুই ধারার নেতৃত্ব নির্বাচন ব্যবস্থার মধ্যে একনায়কতন্ত্রের ব্যাপারে মুসলিম বিদ্বানগণ তেমন আপত্তি না তুললেও তাঁদের অধিকাংশই কেন প্রায় একবাক্যে গণতন্ত্রকে নাকচ করেন? এর কারণ হ’ল, গণতন্ত্র নিছক একটি নেতৃত্ব নির্বাচন ব্যবস্থা নয়, বরং এটি একটি মতবাদ বা আদর্শের নাম। শুধু তাই নয়, গণতন্ত্র আল্লাহ্র সার্বভৌমত্বের পরিবর্তে মানবীয় সার্বভৌমত্বকে যেভাবে সর্বেসর্বা ঘোষণা করে এবং যেভাবে মানবীয় স্বেচ্ছাচারিতাকে নিরংকুশ প্রাধান্য দেয়, তা নিঃসন্দেহে কুফরীর পর্যায়ভুক্ত। কেননা তাতে আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাসের কোন স্থান নেই। স্থান নেই কোন শাশ্বত বিধানের। ধর্ম সেখানে কেবলমাত্র মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়। ফলে গণতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের কাছে এক পরম পূজনীয় ধর্ম। এ কারণেই কথায় কথায় তারা Democratic Values তথা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কথা বলে। আর এর বিপরীতে একনায়কতন্ত্র কেবলই একটি একচ্ছত্র কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা। এটি কোন আদর্শ বা মতবাদের নাম নয়। এজন্য গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কথা জোরেশোরে প্রচারিত হ’লেও কোথাও একনায়কতান্ত্রিক মূল্যবোধ বলে কিছু দেখা যায় না। আবার গণতন্ত্রে অধিকাংশের রায় চূড়ান্ত হওয়ায় এতে ব্যক্তিবিশেষের মত গুরুত্ব পায় না, তা যতই সত্য ও মূল্যবান হোক না কেন। কিন্তু একনায়কতন্ত্র বা রাজতন্ত্রে শাসকের হাতে এই ক্ষমতা থাকে এবং তিনি চাইলে নিজস্ব ক্ষমতাবলে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন করতেও পারেন। এমনকি শাসক আল্লাহভীরু হ’লে তার মাধ্যমে পুরোপুরি ইসলামী শাসনব্যবস্থা কায়েম হ’তে পারে। যা কিনা গণতন্ত্রের মাধ্যমে কখনই সম্ভব নয়। এমনকি শাসক ও জনগণ চাইলেও না। কেননা আদর্শ ও চরিত্রগতভাবে গণতন্ত্র সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ এবং পুঁজিবাদী। ফলে জনগণের এমন কিছু চাওয়ারই অধিকার নেই, যা গণতান্ত্রিক আদর্শের সাথে খাপ খায় না।
ফলে যারা নিজেদের তাওহীদবাদী মুসলিম বলে দাবী করেন এবং ইসলামী জীবন-বিধান অনুযায়ী নিজের সমগ্র জীবনকে ঢেলে সাজাতে চান, যারা ইহকালীন ও পরকালীন জীবনে সার্বিক কল্যাণের প্রত্যাশী; তাদের জন্য গণতন্ত্র নিছক আল্লাহদ্রোহী, আত্মপূজারী ও প্রতারণাপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। সূদভিত্তিক পুঁজিবাদী অর্থনীতির মত তার বহিরাঙ্গ যতই সুশোভিত হোক না কেন, ইসলামের সাথে তা কখনই একীভূত করা যায় না। আর এভাবেই গণতন্ত্রকে আদর্শিকভাবে সমর্থনের তো প্রশ্নই আসে না, এমনকি যদি সাদা চোখে নেতৃত্ব নির্বাচন ব্যবস্থা হিসাবেও ধরা হয়, তবুও তা গ্রহণযোগ্য মনে করার সুযোগ নেই। কেননা তাতে রয়েছে বাতিল ও জাহেলিয়াতের সাথে নিরেট আপোষকামিতা। রয়েছে ইসলামবিরোধী আদর্শ ও সংস্কৃতির কাছে বেশরম আত্মসমর্পণ। কোন আল্লাহভীরু ও সৎ মানুষের পক্ষে এই নির্বাচনের পথে হাঁটা সম্ভব নয়। আর যেহেতু ইসলামে নেতৃত্ব চেয়ে নেয়ার সুযোগ নেই, সেহেতু এ পথ ইসলামের পথই নয়। অতএব এই গোটা ব্যবস্থাপনার সাথে কোন নিষ্ঠাবান ঈমানদার ব্যক্তি সম্পর্ক রাখতে পারে না। মিসর, তিউনিসিয়া ও তুরস্কের অভিজ্ঞতা আমাদেরকে তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। সুতরাং যে সকল ইসলামপন্থী রাজনীতিবিদ গণতন্ত্র ও নির্বাচন কায়েমের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, তারা নিজেরা যেমন বিভ্রান্ত হয়েছেন, তেমনি তাদের সমর্থকদেরও নিঃসন্দেহে বিভ্রান্ত করছেন।
মূলতঃ গণতন্ত্র সাধারণ জনগণকে ক্ষমতার মোহে ভুলানো এক পুঁজিবাদী প্রতারণা বৈ কিছুই নয়। যাতে রয়েছে ভয়ানক শুভংকরের ফাঁকি। এই পথ ধরে কখনই ইসলামের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠাদান সম্ভব নয়। আহলেহাদীছ ওলামায়ে কেরাম এ বিষয়ে জাতিকে বহু আগে থেকেই সতর্ক করে আসছেন। অনেক ইসলামপন্থী ‘মন্দের ভালো’ নামে এক আপোষকামী নীতি প্রচারের চেষ্টা করেছিলেন, যার অসারতা ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। নীতি-আদর্শের প্রশ্নে হক ও বাতিলের সাথে কখনও আপোষ হয় না, আপোষ করা যায় না। সুতরাং আমরা আশা রাখি, আগামীর কাণ্ডারী যুবসমাজ এ বিষয়টি গভীরভাবে চিন্তা করবেন। সর্বোপরি নবী-রাসূলদের দেখানো পদ্ধতি তথা সর্বাত্মক সমাজ সংস্কারের আন্দোলন ব্যতিরেকে ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার ভিন্ন কোন পন্থা নেই এবং ভাড়াটে বা আমদানীকৃত কোন তন্ত্র-মন্ত্র ইসলামের কোনই উপকারে আসবে না। এই জ্বলন্ত সত্যটি আমাদের অনুধাবন করতে হবে।
বর্তমানে যুবসমাজের জন্য ফিৎনার একটি বড় উপলক্ষ হ’ল এই গণতান্ত্রিক ক্ষমতার রাজনীতি। কত শত মানুষ যে এতে অংশগ্রহণ করে অনৈতিক পথ অবলম্বন করছে এবং বেঘোরে জান-মাল ও ইয্যত হারাচ্ছে, তার কোন ইয়ত্তা নেই। একজন দ্বীনদার ও জান্নাতপিয়াসী যুবক কখনও নিজের মূল্যবান জীবন ও সময়কে এমন ধ্বংসাত্মক পথে বিলিয়ে দিতে পারে না। মুমিন অবশ্যই সমাজ ও রাজনীতি সচেতন হবে, কিন্তু মুমিনের প্রকৃত সংগ্রাম হ’ল আক্বীদা ও বিশ্বাসের সংগ্রাম। অতএব যে রাজনীতি তার আক্বীদায় আঘাত হানে, তার বিশ্বাসের ভিত্তিকে চুরমার করে দেয়, যে রাজনীতি আল্লাহ্ সার্বভৌমত্বের পরিবর্তে মানুষের সার্বভৌমত্বের শ্লোগান দেয়, যে রাজনীতি আল্লাহ্র বিধান বাদ দিয়ে মানুষের মনগড়া বিধান দিয়ে মানুষের উপর যুলুম করে, যে রাজনীতি কেবল ক্ষমতামুখী, যে রাজনীতি সমাজে অশান্তি, ধ্বংস ও বিশৃঙ্খলা ডেকে আনে; তাতে অংশগ্রহণের কোনই সুযোগ আমাদের নেই। বরং সে রাজনীতির সংস্কার সাধন করাই হ’ল প্রকৃত ইসলামী রাজনীতি। এই অশুভ ক্ষমতার রাজনীতিকে পরিবর্তনের জন্য প্রচেষ্টা ও অহীর বিধানের আলোকে সমাজ সংস্কারের সংগ্রামই হ’ল এ যুগে মুমিনের প্রকৃত সংগ্রাম। অতএব যুবসম্প্রদায়কে এই ফিৎনার ব্যাপারে অত্যন্ত সজাগ থাকতে হবে।
নির্বাচনে কে জয়লাভ করবে বা না করবে; কাকে সমর্থন করতে হবে বা করতে হবে না তা আমাদের বিবেচ্য বিষয় নয়; বরং আমাদের বিবেচ্য হবে, কিভাবে সমাজের শাসক ও শাসিত প্রত্যেক মানুষকে আল্লাহ্র পথে ফিরিয়ে আনা যায়। কিভাবে আল্লাহ্ বিধানকে সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত করা যায়। একজন নীতিনির্ধারক হিসাবে শাসকও আমাদের এই দাওয়াতের বাইরে নয়; বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সুতরাং জান্নাতপিয়াসী যুবসমাজকে জীবনের মহৎ আদর্শ ও লক্ষ্যকে সর্বাগ্রে রেখে পথ চলতে হবে। কখনও শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে না বা সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া যাবে না; বরং শাসককে নছীহত করা বা সদুপদেশ দেওয়াই হ’ল ইসলামের কর্মনীতি। রাসূল (ছাঃ) বলেন, তিনটি বৈশিষ্ট্য থাকলে একজন মুমিনের অন্তর কখনও প্রতারিত বা পথভ্রষ্ট হয় না- (১) সকল কর্ম কেবল আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে হওয়া (২) শাসকদের সদুপদেশ দেয়া (৩) জামা’আতকে আঁকড়ে থাকা (ইবনু মাজাহ হা/২৩০, ছহীহাহ হা/৪০৩)। ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, ‘এই তিনটি বিষয় দ্বীন পালনের জন্য অন্যতম মূলনীতি। কেননা এতে আল্লাহ্র হক ও বান্দার হক আদায় এবং একাধারে দুনিয়া ও আখেরাতে সার্বিক কল্যাণ লাভের পথনির্দেশ করা হয়েছে’ (মাজমূ’উল ফাতাওয়া ১/১৮)।
অতএব আসুন! আমরা প্রচলিত গণতান্ত্রিক ক্ষমতার রাজনীতি নয়; ইসলামের আদর্শিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য নবী-রাসূলের পদ্ধতি তথা সমাজ সংস্কারের ময়দানে ঝাপিয়ে পড়ি। আল্লাহ আমাদেরকে যাবতীয় ফিৎনা থেকে রক্ষা করুন এবং কুফর ও নিফাকমুক্ত ঈমান সহকারে আল্লাহ্র দরবারে উপস্থিত হওয়ার তাওফীক দান করুন- আমীন!
📄 সংঘবদ্ধ জীবন রহমতের জীবন
মানুষের স্বাভাবিক ফিতরাতী প্রবণতা হ’ল সংঘবদ্ধতা। ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক, জ্ঞাতসারে হোক বা অজ্ঞাতে হোক, কেউ কখনও বিচ্ছিন্ন ও একাকী জীবন যাপন করতে পারে না। তার কারণ মানুষ স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, বরং পরনির্ভর। অপরের সহযোগিতা ব্যতীত কোন ব্যক্তির পক্ষে এক পা-ও চলা সম্ভব নয়। সুতরাং তাদেরকে স্রষ্টার বেঁধে দেয়া এক অমোঘ নিয়মে সংঘবদ্ধ হ’তেই হয়। এই নিয়ম দেশ-কাল-পাত্র ভেদে নানা রূপে নানা মাত্রায় প্রতিভাত হয়। ভৌগলিক অবস্থান, আচার, ভাষা, বর্ণ প্রভৃতি বৈশিষ্ট্য ও মিল-অমিলের দিক থেকে মানুষের পারস্পরিক এই সম্পর্ক ও সংঘবদ্ধতা আনুষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। কখনও তা শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মোহনায় উপনীত হয়। যেমন একই বর্ণ ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী মানুষের মধ্যেও যারা সৎজীবন যাপনের প্রত্যাশী, তারা সর্বদা সৎসঙ্গ খোঁজেন; আবার যারা অসৎজীবন যাপনকারী তারা অনুরূপ সহযোগীর অনুসন্ধানে থাকেন। অর্থাৎ যে যেভাবে জীবনটাকে সাজাতে চান, যে যেমন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন তেমনিভাবে জীবনসাথী নির্বাচন করে থাকেন। এভাবে সংঘবদ্ধতা ছোট-বড় বিভিন্ন পরিসরে প্রকাশিত হয়ে থাকে। এটিই জগতের স্বাভাবিক নিয়ম। এর বিশেষ কোন ব্যত্যয় নেই। আধুনিককালে সংগঠন হ’ল এই প্রাকৃতিক নিয়মেরই অধীন একটি বৃহত্তর ও সুশৃংখল সামাজিক কাঠামো, যা সমমনা মানুষের মাঝে যুথবদ্ধতা তৈরী করে এবং ঐক্যের সূত্র ধরে রাখে।
জগতের অমোঘ নিয়মের পাশাপাশি সংঘবদ্ধতা এমন এক কার্যকরী দুনিয়াবী শক্তি, যা মানুষকে জীবন পরিচালনার পথ সুগম করে, শত্রুর বাঁধা মোকাবিলার শক্তি যোগায় এবং যাবতীয় বিপদাপদে সুদৃঢ় রাখে। এজন্য ইসলামী জীবনাদর্শে মুমিন সমাজকে বার বার ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে এবং ঐক্যবদ্ধ না থাকার নেতিবাচক ফলশ্রুতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। সুতরাং যারা হকের ওপর দৃঢ়চিত্ত থাকতে চান এবং দ্বীনের প্রচার ও প্রসারে দৃঢ় ভূমিকা রাখতে চান, তাদের জন্য সংঘবদ্ধ জীবন যাপনের কোন বিকল্প নেই। আর এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই বিগত শতাব্দী থেকে সাংগঠনিকভাবে ইসলামের দাওয়াত শুরু হয়েছে। এই দাওয়াতের বরকতপূর্ণ ফলস্বরূপ কর্মীদের ঘামঝরা প্রচেষ্টা এবং বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে অহি-র বিধানের প্রতি আত্মসমর্পণের আহ্বান- ‘আসুন! পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে জীবন গড়ি’, ‘সকল বিধান বাতিল কর, অহি-র বিধান কামনা কর’। আহলেহাদীছ আন্দোলন আজ যে মযবৃত শিকড় বিস্তার করেছে এ দেশের আনাচে-কানাচে, তার পেছনে এক অমূল্য অবদান রেখেছে এই সংঘবদ্ধ দাওয়াতের বরকতময় বারিসিঞ্চন। ফালিল্লাহিল হামদ। সুতরাং আহলেহাদীছ আন্দোলনের প্রচার ও প্রসারে এই সাংগঠনিক ও জামা’আতবদ্ধ দাওয়াত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে, তাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।
অধূনা যারা সংঘবদ্ধ দাওয়াতের সাথে আত্মবিরোধ অনুভব করেন এবং তাতে সবকিছু ছাপিয়ে দলীয় সংকীর্ণতার আভাস আবিষ্কার করেন, তারা হয় বাস্তব জগত সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান রাখেন না অথবা নিছক স্বার্থদুষ্টতার প্রভাবে প্রভাবিত। নতুবা কোন সচেতন ও সুস্থ জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষে এমন স্থূল ধারণা পোষণ করা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। ততোধিক বিস্ময়কর হ’ল, জগতের অন্য কোন সাংগঠনিক কাঠামোকে নাকচ না করে কেবল নাকচ করেন আহলেহাদীছ জামা’আতের সংঘবদ্ধতাকে। পৃথিবীর সকল সমাজে নেতৃত্বের প্রয়োজন, সুশৃংখল কর্মসূচির প্রয়োজন, একনিষ্ঠ কর্মীর প্রয়োজন; কেবল প্রয়োজন নেই আহলেহাদীছ জামা’আতের! তাহ’লে সমাজ গড়ার কাজে নেতৃত্ব কিভাবে তৈরী হবে? কোন পদ্ধতিতে মানুষ ঐক্যবদ্ধ হবে? বৃহত্তর কর্মসূচী কিভাবে বাস্তবায়িত হবে? জাতীয় জীবনের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য কিভাবে অর্জিত হবে? বিশেষতঃ বাতিল যেখানে সংঘবদ্ধ, সেখানে তাদের বিরুদ্ধে অসংঘবদ্ধ, শৃংখলাহীন সংগ্রাম কখনও কি সফল হ’তে পারে?
আমরা মনে করি এই নেতিবাদী চিন্তাধারার জন্ম এক ধরনের পরাজিত অথবা জাগতিক ভোগসর্বস্ব বিলাসী মন-মানসিকতা থেকে। শুধু তা-ই নয়, এই মানসিকতা যেন পশ্চিমা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদেরই ভিন্নতর রূপ, যেখানে ব্যক্তি অপরের প্রতি দায়-দায়িত্বহীনভাবে কেবল নিজের স্বার্থে এবং আপনার মর্জি মাফিক চলতে পারার স্বাধীনতাকেই জীবনের পরমার্থ মনে করা হয়। অথচ এই দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামী জীবনব্যবস্থার মৌলিক রূপরেখার সম্পূর্ণ বিপরীত। ইসলাম যেখানে সর্বদা ঐক্যের ধারণাকে প্রণোদনা দেয়, সেখানে এরূপ আত্মকেন্দ্রিকতা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার কোন ধারণা স্থানই পেতে পারে না।
অতএব সচেতন যুবক ভাইদের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে, যেখানেই থাকুন জামা’আতবদ্ধ ও সংঘবদ্ধ থাকার চেষ্টা করুন। নতুবা বাতিলের সর্বপ্নাবী ও সাঁড়াশী আক্রমণে আমাদের ঈমান ও আমল যে কোন মুহূর্তে আক্রান্ত হ’তে পারে। সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমেই কেবল সম্ভব বাতিলের বিরুদ্ধে হককে বিজয়ী করা। এজন্য আল্লাহ ঈমানদারদের সীসাঢালা প্রাচীরের মত ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছেন (ছফ ৬১/৪)।
সাংগঠনিক জীবন আমাদেরকে এমন একটি দ্বীনী বন্ধুত্বের সার্কেল প্রদান করে, যার মাধ্যমে একে অপরকে হকের প্রতি আহ্বান করা যায় এবং বিপদাপদে পাশাপাশি থাকার প্রতিজ্ঞা গড়ে তোলা যায়। সাংগঠনিক জীবন এমন এক শক্তি যা আমাদেরকে সহজে বাতিলের স্রোতে হারিয়ে যেতে দেয় না, বরং ব্যক্তির মধ্যে এমন ইস্তিকামাত ও দৃঢ়তা তৈরী করে যা তাকে দ্বীনের পথ থেকে সাধারণত বিচ্যুত হ’তে দেয় না। সাংগঠনিক জীবন আমাদের শৃংখলা শেখায়, স্বেচ্ছাচারিতার পথ রুদ্ধ করে দেয়, অপরের কল্যাণের জন্য ভাবতে শেখায়, আত্মকেন্দ্রিক না করে বহুকেন্দ্রিক করে, সমগ্র জাতি ও মুসলিম উম্মাহ্র প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরী করে। সর্বোপরি সংগঠন সেই দুনিয়াবী শক্তির অংশ, যা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বাতিলের বিরুদ্ধে সর্বদা প্রস্তুত রাখতে বলেছেন (আনফাল ৮/৬০)। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সকল ভাইকে তাঁর দ্বীনের পথে যোগ্য খাদেম হিসাবে কবুল করে নিন এবং ঐক্যবদ্ধভাবে ছহীহ দ্বীনের প্রচার ও প্রসারে সর্বাত্মক ভূমিকা রাখার তাওফীক দান করুন- আমীন!
📄 ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও সংগঠন বিরোধিতা
আধুনিক পশ্চিমা দর্শনে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ। এই মতবাদ মানুষের ব্যক্তিসত্তাকে সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করে এবং প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে একচ্ছত্রভাবে স্বীকৃতি প্রদান করে। এর একটি সাধারণ ফলাফল হ’ল এমন যে, ব্যক্তি কেবল নিজেকে নিয়ে ভাবতে শেখে এবং সমাজের প্রতি দায়বোধ থেকে মুক্ত থাকে। যাকে এক কথায় বলা যায় নির্ভেজাল আত্মকেন্দ্রিকতা। এই মতবাদে অবাধ ব্যক্তিস্বাধীনতার যে সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে এবং স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতার যে পোক্ত ধারণা রোপণ করা হয়েছে, তা একটি আদর্শবাদী ও নৈতিকতাসম্পন্ন সমাজের জন্য উপযোগী নয়। বিশেষ করে মুসলিম সমাজে তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। কেননা ইসলামে মানুষের পারস্পরিক বন্ধন অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এতে সর্বদা দায়িত্বশীলতা ও সামাজিকতাবোধকে তাৎপর্যপূর্ণভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। প্রত্যেকেই এখানে পরস্পরের প্রতি কিছু অধিকার ও দায়বোধের নিগড়ে আবদ্ধ, যেখানে স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতার কোন জায়গা নেই। আর এভাবেই ইসলাম মানবিক মানুষের জন্য অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা।
বলা বাহুল্য যে, মানুষের স্বভাবধর্ম হ’ল সামাজিকতা ও সংঘবদ্ধতা। ইসলাম এই স্বভাবধর্মকে লালন করার জন্য মুসলিম সমাজকে প্রতিনিয়ত প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। ইসলামের বুনিয়াদী ইবাদতসমূহ তথা ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ, যাকাত সবই যেন মানুষকে সংঘবদ্ধতা ও পরার্থপরতার প্রতি একেকটি বলিষ্ঠ আহ্বান। এজন্যই একজন মুসলমান কখনও সমাজবিচ্ছিন্ন হ’তে পারে না। সামাজিক দায়মুক্তও সে হ’তে পারে না। ফলে ইসলামও ব্যক্তিস্বাধীনতাকে স্বীকার করে বটে; কিন্তু পশ্চিমাদের দায়মুক্ত ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ইসলামের দায়িত্বশীল ব্যক্তিস্বাধীনতার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে।
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও আত্মকেন্দ্রিকতার এই দর্শন নিয়ে আমাদের এই আলোচনার হেতু হ’ল সাম্প্রতিক সময়ে একদল ওলামায়ে কেরাম এবং সাধারণ মুসলমানদের মাঝে ইসলামী দল ও সংগঠন সম্পর্কে অগভীর কিছু চিন্তাধারার আবির্ভাব। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে এমন চিন্তাধারা বিশেষ অপ্রত্যাশিত নয়। কিন্তু যারা বিদ্বান ও বোদ্ধা হিসাবে সর্বমহলে সুপরিচিত তারা যখন এ বিষয়ে খাপছাড়া মন্তব্য করেন এবং দায়িত্বহীনভাবে ইসলামী দল ও সংগঠনকে সরাসরি ফিৎনা হিসাবে অভিহিত করেন, তখন সত্যিই গভীর হতাশা ও আফসোসের সৃষ্টি হয়। ইসলামের চিরন্তন সংঘবদ্ধতার ধারণার বিপরীতে তারা যে খোঁড়া বক্তব্য ও যুক্তি পেশ করেছেন তা নিছক নতুন মোড়কে পশ্চিমী ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের বহিঃপ্রকাশ। তাদের এই অবিবেচনাপ্রসূত ফৎওয়া প্রদান থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, আপন গণ্ডি ছাড়িয়ে তারা খুব কমই দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে পারেন। ফলে কোন সংঘবদ্ধ সংগ্রাম বা আন্দোলনকে তার স্বীয় অবস্থান থেকে কখনই মূল্যায়ন করতে পারেন না। সত্যের পক্ষে সংগ্রামরত যেসব বিখ্যাত আন্দোলনের মাধ্যমে ইসলামের জিহাদী চেতনা জাগরুক রয়েছে সারাবিশ্বে এবং বিগত কয়েক শতাব্দীতে যে পদ্ধতিতে দ্বীনের দাওয়াতের প্রচার ও প্রসার হচ্ছে, তাকে এক লহমায় ফিৎনার কারণ বলে যারা আখ্যায়িত করতে পারেন, তারা দ্বীনদারিতায় অগ্রগামী হ’লেও সমাজ ও সভ্যতার ইতিহাস সম্পর্কে নিঃসন্দেহে অগভীর চিন্তাধারার অধিকারী।
নিছক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে কিংবা স্বার্থদুষ্ট হয়ে তারা যেভাবে পশ্চিমাদের মত আত্মকেন্দ্রিকতায় আবদ্ধ থাকাকে প্রাধান্য দেন, তাতে না থাকে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, না থাকে সমাজ সংস্কারের আকুতি, আর না থাকে ইতিহাসের আহ্বান শোনার মত দূরদর্শিতা। বরং সমাজ থেকে নিজেকে সযত্নে বাঁচিয়ে রাখার আত্মতৃপ্তিই যেন তাতে ঝরে পড়ে। একজন মুখলিছ দাঈ ইলাল্লাহ্র জন্য যেটা কখনই কাম্য নয়।
পাণ্ডিত্যের একটি রোগ হ’ল সুশীলতা। সুশীলতা তখনই রোগ হয়ে যায়, যখন তা ব্যক্তিস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয় এবং ঝুঁকিহীনতাকে পসন্দ করে। নিজেকে নিরাপদ জায়গায় রেখে সমাজ ও মানুষের উপর দায়িত্বহীনভাবে মতামত ব্যক্ত করে। সত্যকে সত্য ও মিথ্যাকে মিথ্যা বলার মত সৎসাহস দেখাতে ভয় পায়। নিজের ভীরুতা, কাপুরুষতা এবং অক্ষমতাকে আড়াল করতে অন্যায্য পাণ্ডিত্য ও বিতর্কের আশ্রয় নেয়। আমাদের কিছু প্রাজ্ঞ ওলামায়ে কেরামও সম্ভবতঃ অনুরূপ রোগেই আক্রান্ত হয়েছেন।
পৃথিবীর কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজই সংঘবদ্ধ হওয়া ছাড়া এককভাবে করা সম্ভব নয়। একক কোন ব্যক্তির পক্ষে একটি সভ্যতা গড়ে তোলা কখনও সম্ভব নয়। পৃথিবীতে যত সভ্যতা গড়ে উঠেছে, যত সংগ্রাম ও বিপ্লবের ইতিহাস রচিত হয়েছে সবকিছুর পিছনে ছিল একদল সুসংগঠিত মানুষের সংঘবদ্ধ প্রয়াস। সংগঠন হ’ল এই সংঘবদ্ধ প্রয়াসেরই আধুনিক নাম মাত্র। এটা যারা না বোঝেন কিংবা উৎকট স্বার্থবাদিতাদুষ্ট হয়ে এর বিরুদ্ধে প্রগলভ কথাবার্তা বলেন, তারাই কেবল রাসূল (ছাঃ)-এর সংগঠনের নাম কি ছিল কিংবা ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) কোন সংগঠন করতেন- এই ধরনের অতীব শিশুতোষ প্রশ্ন করতে পারেন। এ যেন ঠিক সেই বিদ’আতীদের মতই মন্তব্য যারা বলে থাকেন, মুনাজাত যদি বিদ’আত হয়, তবে ফ্যান-লাইটও তো বিদ’আত। কেননা এগুলো রাসূল (ছাঃ)-এর যুগে ছিল না। রাসূল (ছাঃ)-এর যুগে নিঃসন্দেহে প্রচলিত আকার ও কাঠামোযুক্ত সংগঠন ছিল না, কিন্তু সংঘবদ্ধতা ছিল। যেমনভাবে প্রচলিত নিয়মের মাদ্রাসা শিক্ষা কাঠামো ছিল না, কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থা ছিল। যুগের প্রয়োজনে শরী’আতের মূলনীতি ঠিক রেখে যে কোন কিছুর রূপ-কাঠামো বদল হবে এটাই স্বাভাবিক। এতে অস্পষ্টতার কিছু নেই।
আধুনিক যুগে আরব বিশ্বের ওলামায়ে কেরাম দল ও সংগঠন বিষয়ে যে সকল ফৎওয়া দিয়েছেন, তা কেবল তাদের স্ব স্ব দেশ ও সমাজের জন্য প্রযোজ্য। সে সকল ফৎওয়াসমূহ একত্রিত করে যারা তাদেরকে বিতর্কিত করতে চান এবং অন্যদেরকে বিভ্রান্ত করতে চান, তারা নিঃসন্দেহে কোন সদুদ্দেশ্য পোষণ করেন না। কেননা তাঁরা মূলতঃ হিযবিয়্যাত বা দলাদলির সাথে যুক্ত ভ্রান্ত সংগঠনগুলোকে উদ্দেশ্য করেছেন। যারা কিনা নিজ সংগঠন বা ঘরানার বাইরে অন্য সকলকে পথভ্রষ্ট মনে করে। কোন হকপন্থী সংগঠনকে তারা উদ্দেশ্য করেননি। বরং তার প্রশ্নই আসে না।
তারা রাসূল (ছাঃ)-এর জামা’আতবদ্ধতার হাদীছগুলোকে কেবল একক ইমামভিত্তিক রাষ্ট্রীয় জামা’আতের সাথে প্রযুক্ত করেন, যা কিনা স্পষ্টতঃই দলীলবিহীন এবং মানহাজ ও যুক্তিবিরোধী। কেননা প্রথমতঃ ইসলাম জামা’আতবদ্ধ হওয়ার জন্য কখনও রাষ্ট্রক্ষমতাকে অপরিহার্য করেনি। যদি করত, তবে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনই আমাদের প্রধান কর্তব্য হয়ে দাঁড়াত। অথচ শরঈ দৃষ্টিকোন থেকে তা সঠিক নয়। বরং রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জন করাকে আবশ্যকীয় এবং দ্বীনের প্রধান উছুল মনে করা বর্তমান যুগের শী’আ, ইখওয়ানী, খারেজীপন্থী প্রমুখদের প্রধান ভ্রান্ত আক্বীদা। দ্বিতীয়তঃ একথা সবারই জানা যে, একক জামা’আত কাম্য হ’লেও আজকের যুগে বিশ্বজুড়ে একক জামা’আত থাকার কোন সুযোগ নেই। বরং সেই যুগের তো অবসান হয়েছে ওছমান (রাঃ)-এর মৃত্যুর পর থেকেই। কিন্তু তাই বলে কি জামা’আতবদ্ধতার হুকুম সমূলে তিরোহিত হয়ে যায়? রাসূল (ছাঃ) কোন সফরে তিনজন একত্রিত হ’লেও যেখানে একজন আমীর নিয়োগ করতে বলেছেন, সেখানে ইসলামে সংঘবদ্ধতার রূপ ও প্রকৃতি অনুধাবনে মোটেও কষ্ট হওয়ার কথা নয়। শায়খ উছায়মীন যথার্থই বলেন, ‘কিছু মানুষ মনে করেন যে, আজকের দিনে মুসলমানদের কোন ইমামও নেই, বায়’আতও নেই। জানি না তারা কি চান যে, মানুষ বিশংখলভাবে চলুক এবং তাদের কোন নেতা না থাকুক? নাকি তারা চান যে এটা বলা হোক- প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজের আমীর বা নেতা? (ইবনুল উছায়মীন, আশ-শারহুল মুমতি’ ৮/৯)।
মোদ্দাকথা হ’ল, ইসলামী সমাজ কখনও নেতৃত্ববিহীন চলতে পারে না। সর্বযুগে, সর্বাবস্থায় এবং সর্বক্ষেত্রে নেতৃত্ব আবশ্যক। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত থাক বা না থাক নেতৃত্ব থাকবেই। বর্তমানে ইসলামী দল ও সংগঠনগুলো বিশ্বব্যাপী মুসলিম সমাজকে দ্বীনের পথে পরিচালনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বিশেষ করে ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্বে যেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মপালনে কোন উৎসাহ প্রদান করা হয় না, সেখানে এই ধরনের জামা’আতের কোনই বিকল্প নেই। নিঃসন্দেহে একক রাষ্ট্রীয় জামা’আত সর্বোত্তম এবং শৃংখলাসাধনে সবচেয়ে ফলপ্রসূ। কিন্তু বর্তমান যুগে সেটা সম্ভব হয়নি বলেই তো ইসলামী খেলাফত আজ ৫৭টি রাষ্ট্রে বিভক্ত। আবার একই বাস্তবতায় একই স্থানে প্রয়োজনের খাতিরে একাধিক জামা’আতও হয়ে গেছে। এটাও নিন্দনীয় নয় যদি পারস্পরিক সহাবস্থান থাকে। সেমতাবস্থায় সাধারণ মানুষ সাধ্যমত তাক্বওয়া ও দ্বীনদারীর ভিত্তিতে সর্বাধিক উপযুক্ত জামা’আত খুঁজে নিবে।
সর্বোপরি আলেমদের মধ্যে কেউ তাঁদের ব্যক্তিগত ইজতিহাদী মত পেশ করতেই পারেন। এর ভিত্তিতে তারা কোন সংগঠনের অংশ নাও হ’তে পারেন। কিন্তু তাই বলে যারা সংঘবদ্ধ আন্দোলন পরিচালনা করছে, তাদের বিরুদ্ধাচরণ করা এবং কুরআন-হাদীছকে নিজের মত করে ব্যাখ্যা করা কি তাদের জন্য মোটেও সঙ্গত? উপরন্তু এটা কি দ্বীনের কাজকে বাঁধাগ্রস্ত করার শামিল নয় (নিসা ৬১)? যদি তা-ই হয়, তবে সেক্ষেত্রে তাদের এই বিরোধী অবস্থান কতটা ভয়ংকর অপরাধের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে, সেটা কি তারা ভেবে দেখবেন?
সর্বোপরি কারো আপত্তি ও পিছুটানের কারণে সমাজের বহমান কোন স্রোত থেমে থাকবে না। আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে পরিচালনার দায়িত্ব যে কাউকে দিয়ে, যেভাবে খুশী পালন করিয়ে নেবেনই। তাতে আমরা যুক্ত হব কি না, সেটাই হ’ল আমাদের সিদ্ধান্ত। সবাই যে সামনের সারির মুজাহিদ হবেন, একথা মোটেও সত্য নয়। কেউ না কেউ পেছনের সারিতে থাকতে চাইবেন, এটাই স্বাভাবিক। দিন শেষে যার যার আপন হিসাবই মুখ্য। নিজেকে দুনিয়া ও আখেরাতে সর্বোচ্চ সফলদের কাতারে নিতে পারলাম কিনা সেটিই আমাদের মূল বিবেচ্য। আমাদের প্রতিটি কথা, প্রতিটি চিন্তা পরকালীন নিক্তিতে মাপা হবে, সেটিই মহাসত্য। এই মহাসত্যকে বুকে ধারণ করার মত দৃঢ়চিত্ততা, সৎসাহস, স্বচ্ছ অন্তর যেন আমরা অর্জন করতে পারি, এটাই হোক আমাদের সাধনা। সচেতন যুবসমাজের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে, সমাজ সংস্কারের মঞ্চে আমাদের দৃঢ় সংকল্পবদ্ধতা যেন কোন অবস্থাতেই হীনবল ও ভঙ্গুর না হয়। শয়তানের ওয়াসওয়াসা যেন আমাদেরকে দুর্বলচিত্ত ও কাপুরুষ না বানিয়ে দেয়। আল্লাহ আমাদের সকলকে তাওফীক দান করুন এবং দ্বীনের প্রকৃত খাদেম হিসাবে পরিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে আল্লাহ্র দরবারে উপস্থিত হওয়ার তাওফীক দান করুন- আমীন!