📘 তারুণ্যের আত্নপাঠ ও সমাজ চিন্তা 📄 হতাশার দহন থেকে মুক্তি

📄 হতাশার দহন থেকে মুক্তি


ব্যক্তিগত অপারগতা ও অজ্ঞতা; অপরদিকে সামাজিক অবিচার ও অনাচার- মূলতঃ এ দু’টি কারণ মানুষকে একদিকে যেমন জীবনযুদ্ধে অসহায় ও বিপন্ন করে তোলে, অন্যদিকে সমাজের বিরুদ্ধে করে তোলে বিক্ষুব্ধ ও বিদ্রোহী। আর এখান থেকেই ধীরে ধীরে পুঞ্জীভূত হয় হতাশা আর বেদনার এক অবিচ্ছেদ্য মেঘকাব্য। যা কখনও একাকিত্বের বেদনায় মুষড়ে পড়ে গুমরে গুমরে কাঁদে আবার কখনওবা ক্ষোভের বিজলী বর্ষণে অবিরল ধারায় ঝরে পড়ে। মানুষের এই জীবনগতি প্রায় সবার ক্ষেত্রে একই রকম। তবে মূল পার্থক্য ঘটে বোধের জায়গায় এবং নীতির প্রতি অবিচলতায়। যারা ঈমানদার তারা ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাসকে নিত্য সাথী করে সাধ্যমত আদর্শের পথে নিজেকে পরিচালনা করেন। কিন্তু যারা ঈমানহীন তারা প্রায়শই এই যুদ্ধের ময়দানে নিঃশর্ত আত্মসমার্পণ করে স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন। এই দ্বৈরথের মাঝে আবহমানকাল ধরে অতিক্রান্ত হচ্ছে মানব সমাজের দৈনন্দিন জীবনাচার।

বাংলাদেশ সহ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বস্তুগত উন্নয়নের জোয়ার ক্রমবর্ধমান হ’লেও মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে Depression বা হতাশার বিস্তার কিন্তু ধীরে ধীরে বাড়ছে। কারণ আধুনিক বস্তুবাদী দুনিয়ায় মিডিয়া ও মার্কেটিং-এর সীমাহীন Hype-এ মানুষের ব্যক্তিগত প্রত্যাশার জায়গা যেই উত্তুঙ্গ হারে বাড়ছে, প্রাপ্তির জায়গা নিঃসন্দেহে সেই হারে বাড়ছে না। ফলে মানুষ দ্রুতই নিজেকে প্রতিযোগিতার ময়দানে পরাজিত এবং পশ্চাদপদ ভেবে হতোদ্যম হয়ে পড়ছে। একটা সময় হতাশার গ্রাস থেকে নিজেকে আর বের করে আনতে পারছে না। ফলে অধিকাংশ সময় নেতিবাচক সিদ্ধান্তেই সে মুক্তি খুঁজে পেতে চাচ্ছে। কেউ ক্ষণিকের মিথ্যা সুখের জন্য বেছে নিচ্ছে অনৈতিক সিদ্ধান্ত কিংবা মাদকের মত নীল দংশন। কেউবা চূড়ান্ত পর্যায়ে বেছে নিচ্ছে আত্মহননের পথ।

বাংলাদেশে কিছু আত্মহত্যার ঘটনা সবাইকে নাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে ২০২২ সালে ঢাকার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী আবু মুহসিন খান (৫৮)-এর ফেসবুক লাইভে এসে আত্মহত্যা এবং তৎপূর্ববর্তী বক্তব্যসমূহ যথেষ্ট ভাবনার খোরাক যুগিয়েছে সবাইকে। ফুটিয়ে তুলেছে দৃশ্যত চাকচিক্যপূর্ণ বর্তমান সমাজব্যবস্থার ভয়াবহ ফাঁপা দিকগুলো। জনাব আবু মুহসিনের কিছু কথা এতটাই বাস্তব ও রূঢ় সত্য, যা আমাদের সমাজ জেনেশুনেই চেপে রাখছে। যেমন- প্রথমতঃ এখান থেকে স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছে যে, মানুষ একে অপরের প্রতি দায়িত্ববোধ দিন দিন ভুলে যাচ্ছে এবং সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। শিথিল হচ্ছে পারিবারিক বন্ধন। মানুষ হয়ে পড়ছে নিঃসঙ্গ। সবকিছু থেকেও না থাকার বেদনায় জীবনে বেঁচে থাকা অর্থহীন হয়ে উঠছে অনেকের জন্যই।

পাশ্চাত্যের প্রচারণায় প্রলুব্ধ সমাজ এখন সন্তান গ্রহণে আগ্রহী নয়। ছেলে হোক, মেয়ে হোক দু’টি সন্তানই যথেষ্ট-এই শ্লোগান ছিল বাংলাদেশে আশির দশকের। আর বিংশ শতাব্দীর শ্লোগান হ’ল- ‘দু’টি সন্তানের বেশী নয়, একটি হ’লে ভালো হয়’। এমনকি ২০১২ সালে এক সন্তান নীতি গ্রহণের জন্যও প্রস্তাব উঠেছিল। এই প্রচারণার সামাজিক ক্ষতি হ’ল মানুষ এখন সন্তান নিতে এমন অনাগ্রহী হয়ে উঠেছে যে, দুইয়ের বেশী সন্তান বর্তমানে খুব কম সংখ্যক পরিবারেই রয়েছে। এই দু’একটি সন্তান আবার যখন বড় হচ্ছে খুব স্বাভাবিকভাবেই পড়াশোনা কিংবা জীবিকার তাগিদে তারা পিতা-মাতা থেকে দূর-দূরান্তে চলে যাচ্ছে। তারপর বছরে হয়তো এক-দু’বার ঈদ কিংবা বার্ষিক ছুটিতে তাদের সাথে পিতা-মাতার দেখা হয়। আর যারা বিদেশে চলে যায়, তাদের সাথে এই ব্যবধানটা আরো দীর্ঘ হয়। কখনো কয়েক বছর চলে যায়।

আর এভাবে সন্তানের অনুপস্থিতিতে একসময় প্রৌঢ়ত্বে উপনীত হওয়া পিতা-মাতা ভুগতে থাকেন নিঃসঙ্গতায়। একাকিত্বের প্রহরগুলো তাদের জন্য হয়ে ওঠে চরম যন্ত্রণার। ইন্টারনেটের বদৌলতে যোগাযোগব্যবস্থা সহজলভ্য হ’লেও কৃত্রিমতার আবরণ ছেদ করে সেই যোগাযোগ কখনও সন্তানকে পাশে পাওয়ার বিকল্প হয় না। হাযারো মানুষের ভিড়ে প্রিয়জনকে খুঁজে পেতে তাদের অব্যক্ত হৃদয় সদা ব্যাকুল থাকে।

ফলে বাহ্যতঃ সন্তানরা কে কোন দেশে থাকে বা কোথায় বড় বড় চাকুরী করে, তা নিয়ে পিতা-মাতার গর্বভরা কণ্ঠের আড়ালে যে দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে থাকে, তা অদেখাই থেকে যায়। মুখোশের আড়ালে থেকে যায় বেদনার এক অশ্রুঝরা ব্যথাতুর উপাখ্যান। এভাবে আমাদের সামাজিক সম্পর্কগুলো যেমন নড়বড়ে হচ্ছে, তেমনি আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম বেড়ে উঠছে গুরুজনদের নিবিড় স্নেহ-ভালোবাসার পবিত্র বন্ধন থেকে বঞ্চিত এক কুপমুণ্ডক পরিবেশে। এভাবে পাশ্চাত্যের মত আমাদের সামাজিক সম্পর্কগুলো শিথিল হচ্ছে। আর বিচ্ছিন্নতা ও একাকিত্বের ঘেরাটোপে বাধা পড়ছে আমাদের পৌঢ় জীবন।

অর্থ-বিত্তের ঝনঝনানি আর সামাজিক স্ট্যাটাস যে কখনই মানুষকে প্রকৃত শান্তি দিতে পারে না তার বাস্তব উদাহরণ আবু মুহসিন। তার আর্তনাদ- একা থাকা যে কী কষ্ট-যারা একা থাকেন তারাই একমাত্র বলতে পারেন বা বোঝেন। এই আর্তনাদ কেবল আবু মুহসিনের নয়, বরং বর্তমান আধুনিক ও শিক্ষিত সমাজের ঘরে ঘরে কান পাতলে আজ এই আর্তনাদ শোনা যায়। আগামীতে হয়তো আরো শোনা যাবে। যদি না তথাকথিত জনসংখ্যা বৃদ্ধির আশংকায় সন্তান গ্রহণকে নিরুৎসাহিত করার প্রকৃতিবিরুদ্ধ সিদ্ধান্ত থেকে আমরা সরে না আসি।

আশার কথা যে, চীন, জাপানসহ ইউরোপীয় দেশগুলো ইতিমধ্যে এই নীতির সামাজিক অপকারিতা বুঝতে পেরে পিছু হটেছে এবং জনসংখ্যাকে জনশক্তি হিসাবে বিবেচনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে আমাদের দেশের সরকারেরও কিছুটা বোধোদয় ঘটেছে এবং জনসংখ্যাকে জাতীয় দুর্যোগ হিসাবে প্রচারের হঠকারিতাও কমিয়ে দিয়েছে। মূলতঃ আল্লাহ্র আইন বিরোধী কোন পদক্ষেপই সমাজে প্রকৃত শান্তি আনতে পারে না। এই বোধ যত জাগ্রত হবে, ততই আমরা ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণের পথে ধাবিত হ’তে পারব ইনশাআল্লাহ।

এই সামাজিক অবক্ষয়ের অপর এক চিত্র আমরা দেখেছি গত ১০ই ফেব্রুয়ারী’২২ রাজধানীর বাড্ডাতে। এক হতভাগ্য পিতা তার ছোট সন্তানকে প্রায় সব সম্পত্তি লিখে দেয়ার পরও তার হাতে নিয়মিত শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত মারা গেছেন। এতেই শেষ হয়নি। সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে দুই সন্তানের বিবাদ-কাটাকাটিতে পিতার লাশ ২৪ ঘন্টা বাড়ির গ্যারেজে পড়ে ছিল। পরে পুলিশ এসে লাশ দাফনের ব্যবস্থা করে। দ্বীন শিক্ষার অভাব ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সঠিক চর্চা না থাকায় মানুষ কিভাবে পশুর চেয়েও অধমে পরিণত হয়, তার একটি ক্ষুদ্র উদাহরণ এই ঘটনা। সামান্য সম্পত্তির লোভে পরিবারগুলোতে জ্বলছে তুষের আগুন। ভাঙছে ভাই-বোনের সম্পর্ক, দূরত্ব তৈরী হচ্ছে পিতা-মাতার সাথে সন্তানের, নিত্য কলহ চলছে প্রতিবেশীদের মধ্যে। দ্বীনদারী আর সব জায়গায় থাকলেও সহায়-সম্পত্তির আগ্রাসী লোভ তাদের খেয়ে ফেলছে নেকড়ের মত। হিংস্র পশুর চেয়ে তারা ভয়ংকর হয়ে উঠছে সময়ে সময়ে।

দ্বিতীয়তঃ সমাজে ধর্মীয় জ্ঞানের অপপ্রয়োগও প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে এখানে। একজন ব্যক্তি যখন একই সাথে কালেমা পাঠ করে, এমনকি ওমরায় পরিহিত ইহরামের কাপড় দিয়ে কাফন দেয়ার জন্য অছিয়ত করে, আবার দ্বিধাহীন চিত্তে আত্মহননের মত মহাপাপ করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে- এখানে তার অভাবটা কিসের? আল্লাহ্ উপর বিশ্বাস বা ভরসার দুর্বলতা না-কি দ্বীন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের? মানুষ হিসাবে প্রত্যেকের জীবনে কঠিন মুহূর্ত আসতেই পারে, কিন্তু ঈমানদারদের জন্য সেটা কাটিয়ে ওঠা বিশেষ কষ্টসাধ্য নয় যদি আল্লাহ্র উপর তার পূর্ণ বিশ্বাস ও ভরসা থাকে। তাছাড়া প্রকৃতপক্ষে যারা দ্বীন বোঝেন, যাদের জীবনটা আল্লাহ্র সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত, তারা কখনও এমন অবসর খুঁজে পান না যে, একাকিত্বের বেদনায় জীবনটাকে অকেজো করে তুলবেন। বরং এই নিঃসঙ্গ সময়কে তারা আল্লাহ্ ইবাদতে নিবিষ্ট থাকার মোক্ষম উপলক্ষ হিসাবে নেন। দুনিয়াবী ব্যস্ততা থেকে মুক্ত থেকে আল্লাহ্র সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলার এই সুযোগকে বরং তারা উপহার মনে করে সানন্দেই গ্রহণ করেন। যারা মহান প্রভুর সাথে সম্পর্কের এই স্বাদ আস্বাদন করতে পারেনি, একাকী জীবন তাদের জন্য দুর্বিষহ হ’তে পারে, কিন্তু একজন প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তির নিকট তা মোটেই প্রত্যাশিত নয়। এই ঘটনায় বোঝা যায় যে, এদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্বীনের প্রতি যথেষ্ট ভালোবাসা রয়েছে, কিন্তু দ্বীন সম্পর্কে ভয়াবহ অজ্ঞতার কারণে অধিকাংশ মানুষ ডুবে আছে কুসংস্কার ও বিভ্রান্তির অতল তলে।

সর্বোপরি বর্তমান প্রেক্ষাপটে যে প্রশ্নটি বার বার আমাদের মনে ধাক্কা দিচ্ছে তা হ’ল, হাযারো ইতিবাচক দিক পেছনে ঠেলে অধিকাংশ মানুষ কেন নেতিবাচক সিদ্ধান্তকেই অগ্রাধিকার দেয়? কেন শত প্রাপ্তির মাঝেও নিজের অপ্রাপ্তিগুলোকেই বড় করে দেখে? কেন হতাশার প্রান্তসীমায় পৌঁছে অবশেষে নিজেকে নিঃশেষ করে দেয়ার মত চূড়ান্ত পরিকল্পনা পর্যন্ত করে? এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা কয়েকটি বিষয়কে সামনে আনতে পারি-

(১) আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাসের দুর্বলতা: যে ব্যক্তি তার সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস রাখে না বা আস্থা রাখে না; সে কখনই জীবনে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না ও সঠিক পথে পরিচালিত হ’তে পারে না। কেননা সে তার জীবনের মূল ভরকেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। নিঃশ্বাসে, বিশ্বাসে যার যোগ আল্লাহ্র সাথে, সঠিক পথের যাত্রী হওয়ার নছীব কেবল তারই হয় (আলে ইমরান ৩/১০১)।

(২) জীবনের মূল্য সম্পর্কে অজ্ঞতা: মানুষকে আল্লাহ খুব সংক্ষিপ্ত একটি সময় দিয়েছেন তাকে পরীক্ষা করার জন্য। একজন পরীক্ষার্থী যেমন তার পরীক্ষার মূল্য বুঝে বলে পরীক্ষার হ’লে ভালো ফলাফলের জন্য প্রাণান্ত পরিশ্রম করে, শেষ সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করে; ঠিক তেমনি এই জীবন পরীক্ষার মূল্য সম্পর্কে জ্ঞাত ব্যক্তি পার্থিব জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে গুরুত্বপূর্ণ ভেবে পরকালীন সাফল্যের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়। শুরু কিংবা মধ্যটা খারাপ গেলেও শেষটা ভাল করার জন্য যারপরনেই ইচ্ছা তাকে ব্যতিব্যস্ত রাখে। কিন্তু যে ব্যক্তি অজ্ঞ, সে শিশু, পাগল কিংবা চতুষ্পদ জন্তুর মতই উদাসীন থেকে যায়। এই পরীক্ষার হল তার জন্য কেবল সময় পার করার স্থান ছাড়া কিছু নয়। জীবনের প্রকৃত মূল্য সে জানে না, অনুধাবনো করতে পারে না। তাই এর বিনাশ সাধনেও সে কুণ্ঠাবোধ করে না।

(৩) জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে অসচেতনতা: আল্লাহ্র দাসত্বকে যে জীবনের মূল লক্ষ্য বানাতে পারেনি, সে নিঃসন্দেহে লক্ষ্যহীন কিংবা ভুল লক্ষ্যপানে ছুটে চলা ব্যক্তি (যারিয়াত ৫১/৫৬)। সে আল্লাহ্র দাসত্বের মূল অংক মেলানো ভুলে গিয়ে সর্বদা ভুল অংক মেলাতে সচেষ্ট হয়। তারপর সহসা কোন অংক মেলাতে ব্যর্থ হ’লে খুব সহজেই সে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।

(৪) ধৈর্যের অভাব: পার্থিব জীবন আমাদের পরীক্ষার জীবন। যে কোন সময় যে কোন ধরনের পরীক্ষা আমাদের উপর নেমে আসবে। কখনও সে পরীক্ষা কঠিন থেকে কঠিনতর হবে, কিন্তু কোন অবস্থাতেই হাল ছেড়ে দেয়া মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। সর্বাবস্থায় সে আল্লাহ্র উপর ভরসা রাখবে এবং ধৈর্য সহকারে সুসময়ের জন্য অপেক্ষা করবে, এটাই ঈমানের দাবী। যারা এই ধৈর্যের নীতি অবলম্বন করে না, তারা অতি সহজেই হতাশাগ্রস্ত হয়ে ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়।

(৫) আত্মকেন্দ্রিকতা: আধুনিক সমাজব্যবস্থায় প্রত্যেক মানুষ স্বতন্ত্র সত্তা (Entity) হিসাবে বসবাস করতে চায়। অর্থাৎ যে যার মত স্বাধীনভাবে চলাফেরা করবে, কেউ কারো ব্যাপারে নাক গলাবে না- এটাই আধুনিক জগতের আদর্শিক মূলনীতি। ফলে একে অপরের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া এখানে যরূরী নয়। স্বার্থপরতা, অসামাজিকতা, আত্মকেন্দ্রিকতা এই সমাজব্যবস্থার আবশ্যিক অনুষঙ্গ। তাই একে অপরের অতি কাছে থেকেও তারা একেকজন যেন বসবাস করে অবরুদ্ধ জানালার ভেতরে। ফলে ফিতরাত বা প্রকৃতিবিরোধী এই সমাজ ব্যবস্থায় মানুষ সহজেই হতাশা ও বিষণ্ণতাগ্রস্ত হচ্ছে। ফিনল্যাণ্ড, জাপানের মত দেশগুলো বিপুল সম্পদশালী হওয়া সত্ত্বেও সেসব দেশে আত্মহত্যার উচ্চহার এ কথারই সাক্ষ্য দেয়।

মুক্তির পথ: এ অবস্থা থেকে উদ্ধার পেতে চাইলে করণীয় হ’ল-

প্রথমতঃ ইতিবাচক জীবন যাপন করা: মনে রাখতে হবে, মানুষের জীবন ভালো-মন্দ, সহজ-কঠিন, ইতি আর নেতির বিচিত্র সমাহার। জীবনে কখনো ভালো সময় আসবে, কখনও মন্দ সময় আসবে এটাই জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। অতএব একজন মুমিন ব্যক্তি সর্বদা মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে তার জীবন পরিচালনা করবে। এমনভাবে যে, আনন্দের সময় সে আত্মহারা হবে না, আবার দুঃখের সময় শোকে বিবেকহারা হয়ে পড়বে না। বরং জীবনের সকল অবস্থায় কৃতজ্ঞতা ও সহনশীলতার সমাহারে ভারসাম্য বজায় রাখবে। সবকিছুকে যথাসম্ভব ইতিবাচকভাবে নেবে। যেমন ওহুদ যুদ্ধের সাময়িক পরাজয়ে মুসলমানরা যেন অধিক শোকাকুল না হয়, সেজন্য তাদের মধ্যে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির উন্মেষ ঘটাতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সান্ত্বনা সূচক বক্তব্য, ‘তোমাদেরকে যদি আঘাত লেগে থাকে, অনুরূপ আঘাত (বদর যুদ্ধে) তো তাদেরও লেগেছে এবং মানুষের মধ্যে এ (বিপদের) দিনগুলিকে পর্যায়ক্রমে অদল-বদল করে থাকি’ (আলে ইমরান ৩/১৪০)। ঈমানদারের পরিচয় দিতে গিয়ে রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘মুমিনের অবস্থা বিস্ময়কর। সকল কাজই তার জন্য কল্যাণকর। মুমিন ছাড়া অন্য কেউ এ বৈশিষ্ট্য লাভ করতে পারে না। যখন তারা কল্যাণ ও মঙ্গলের মধ্যে থাকে, তখন সে শোকরগুযার থাকে। আর যখন অসচ্ছলতা কিংবা বিপদাপদে আক্রান্ত হয়, তখন সে ধৈর্যধারণ করে। ফলে প্রতিটি অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর হয়ে যায়’ (মুসলিম হা/৭৩৯০)।

দ্বিতীয়তঃ হতাশাকে প্রশ্রয় না দেয়া: আমাদের যাপিত জীবনে সুখ-দুঃখের সাথে হতাশার যোগ খুবই ওতপ্রোত। যে কোন অপ্রত্যাশিত কথায় ও কাজে কিংবা অপ্রাপ্তির বেদনায় আমাদের মধ্যে হতাশা আসতেই পারে। কিন্তু একজন বিশ্বাসী মানুষ তা নিজের মধ্যে জিইয়ে রাখতে পারে না। তার চেষ্টা থাকে যে কোন মূল্যে তা দূরীভূত করা কিংবা ভুলে যাওয়া। কেননা আল্লাহ্র বাণী হ’ল- ‘আল্লাহ্র রহমত থেকে নিরাশ হওয়া পথভ্রষ্ট লোকদের কাজ’ (হিজর ৫৬)। কুরআনে অন্যত্র এসেছে, তোমরা আল্লাহ্ অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই অবিশ্বাসীরা ব্যতীত কেউই আল্লাহ্ করুণা থেকে নিরাশ হয় না (ইউসুফ ১২/৮৭)। আল্লাহ বলেন, এই পৃথিবীতে কিংবা তোমাদের ব্যক্তিজীবনে যে সকল বিপদাপদ আসে, তা ঘটার আগেই আমি তা কিতাবে (তাকদীরে) লিপিবদ্ধ করে রেখেছি। নিশ্চয়ই এটা আল্লাহ্ পক্ষে খুব সহজ। এটা এজন্য যে, তোমরা যা হারিয়েছ তাতে যেন তোমরা বিমর্ষ না হও এবং যা তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন তার জন্য আনন্দে উদ্বেলিত না হও। নিশ্চয়ই আল্লাহ পসন্দ করেন না কোন উদ্ধত-অহংকারীকে (হাদীদ ৫৭/২২-২৩)। সর্বাবস্থায় আল্লাহ্র সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকাই ঈমানদারের পরিচয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘সে ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ পেয়েছে যে, আল্লাহকে রব, ইসলামকে দ্বীন এবং মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে রাসূল হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট হয়েছে’ (মুসলিম হা/৫৭)।

তৃতীয়তঃ মানুষের সাথে সুসম্পর্ক রাখা: মানুষের সাথে মিশতে পারা এবং তাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখতে পারা হতাশা ও বিষণ্ণতা থেকে বেরিয়ে আসার অন্যতম কার্যকর মহৌষধ। এজন্য রাসূল (ছাঃ) আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ও সৎসঙ্গে থাকাকে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছেন। আত্মকেন্দ্রিক ও অসামাজিক মানুষ বরাবরই নিজের কষ্টের সময়গুলো মানুষের সাথে ভাগাভাগি করতে না পেরে নিদারুণ মানসিক কষ্টে আপতিত হয়। সুতরাং সমাজের ভালো মানুষদের সংস্পর্শে থাকা, সংঘবদ্ধ ও সাংগঠনিক জীবন যাপন করা মানুষের জন্য খুবই যরূরী এবং ইসলামের অন্যতম নির্দেশনা। একাকী বিচ্ছিন্ন জীবন ইসলামে কাম্য নয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, জামা’আতবদ্ধ জীবন রহমত আর বিচ্ছিন্ন জীবন হ’ল আযাব (ছহীহুল জামে’ হা/৩১০৯)। তিনি আরো বলেন, তোমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বসবাস কর। বিচ্ছিন্নতা থেকে সাবধান থাক। কেননা শয়তান বিচ্ছিন্নজনের সাথে থাকে এবং সে দু’জন (ঐক্যবদ্ধ ও সংঘবদ্ধ) মানুষ থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে। যে লোক জান্নাতের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম জায়গার ইচ্ছা পোষণ করে সে যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকে’ (তিরমিযী হা/২১৬৫)।

cuartoঃ শয়তানী কুমন্ত্রণার ব্যাপারে সতর্ক থাকা: শয়তান মানুষের চূড়ান্ত শত্রু। সে সর্বদা কুমন্ত্রণা যোগায় মানুষকে অন্যায় পথে নেয়ার জন্য। আল্লাহ বলেন, ‘শয়তান তোমাদের দারিদ্রের ভয় দেখায় এবং অশ্লীল কাজের নির্দেশ দেয়। আর আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন’ (বাক্বারাহ ২/২৬৮)। এজন্য সর্বদা শয়তানের ফেরেব থেকে সর্বদা সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক।

পঞ্চমতঃ তাক্বদীর ও তাওয়াক্কুল অবলম্বন করা: আল্লাহ্র উপর ভরসা ও তাক্বদীরে বিশ্বাস যে কোন মানুষের জন্য অফুরন্ত আত্মবিশ্বাস ও সৃদৃঢ মনোবলের খোরাক। কেননা সে জানে যে, সবকিছুর নিয়ন্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। বিশ্বাসী বান্দার একান্ত মঙ্গলের জন্যই তাঁর কর্মপরিকল্পনা। এই বিশ্বাস তাকে কখনও পথ হারাতে দেয় না। আশার প্রদীপ নিভতে দেয় না। বরং বুক ভরে প্রশান্তির নিঃশ্বাস নিয়ে সে সর্বাবস্থায় বলতে পারে- আলহামদুলিল্লাহ। সে সর্বদা বিশ্বাস রাখে- إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُসْرًا ‘নিশ্চয় কঠিনের সাথে রয়েছে সহজ, কষ্টের সাথে রয়েছে স্বস্তি’ (সূরা শারাহ ৬)। শত কষ্টের মাঝেও হাযেরা (আঃ)-এর মত প্রগাঢ় ভরসা নিয়ে তার মুখে উচ্চারিত হয়- إذن لن يضيعنا الله ‘আল্লাহ আমাদেরকে কখনই ধ্বংস করবেন না’। মহাবিপদের মুখেও বিচলিত না হয়ে মূসা (আঃ)-এর মত দৃঢ়তার সাথে বলতে পারে- كُلًّا إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ ‘কখনই না, নিশ্চয়ই আমার সাথে আমার রব রয়েছেন, অচিরেই তিনি আমাকে পথ দেখাবেন’ (শুআ’রা ৬২)। হতাশায় ডুবু ডুবু অবস্থাতেও সে রবকে ভুলে যায় না। বরং সমগ্র অন্তর ঢেলে দিয়ে মূসা (আঃ)-এর মত তাঁর সমস্ত চাওয়া-পাওয়া, বেদনা-আর্তি কেবল আল্লাহর কাছেই নিবেদন করে- رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ খَيْرٍ فَقِيرٌ ‘হে আমার রব! আমার প্রতি আপনি যা কিছু কল্যাণ নাযিল করবেন, আমি তারই মুখাপেক্ষী’ (ক্বাছাছ ২৪)। সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ্র প্রতি এই দৃঢ় ঈমান ও বিশ্বাস দুনিয়াবী যে কোন হতাশা ও অপ্রাপ্তির কষ্ট থেকে মুক্তির অব্যর্থ ঔষধ।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে দুনিয়াবী পরীক্ষার মঞ্চে সদা- সর্বদা সত্য ও ন্যায়ের উপর অবিচল রাখুন এবং যাবতীয় হতাশা থেকে মুক্ত থেকে আল্লাহ্ উপর পূর্ণ ভরসা রেখে জীবন পরিচালনার তাওফীক দিন। আমীন!

📘 তারুণ্যের আত্নপাঠ ও সমাজ চিন্তা 📄 ঝরাপাতা জীবন ও মৃত্যুর অমোঘ বাস্তবতা

📄 ঝরাপাতা জীবন ও মৃত্যুর অমোঘ বাস্তবতা


২০২১ সালের ২৬শে মার্চ আমাদের প্রিয় দ্বীনী ভাই মতীউর রহমান এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় একই সাথে হারিয়েছেন দুই বোনসহ পরিবারের পাঁচ পাঁচ জন সদস্য। পরদিন ২৭শে মার্চ রাত ১২-টা নাগাদ রংপুর, পীরগঞ্জে অনুষ্ঠিত জানাযায় শরীক হই। বেশ বড় বাড়ি মতীউর ভাইদের। একদিন আগেও ছিল প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর। নাতি-নাতনিদের আদর ভরা মিষ্টি মিষ্টি বুলি নানা-নানী, মামা-মামীদের হৃদয়ে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দিত। নিত্যদিন কত কাজ ছিল, কত পরিকল্পনা ছিল তাদের। সন্তানদের লেখাপড়া, ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষেত-খামার সবকিছু মিলিয়ে ব্যস্ত জীবন। আজ সেই ভরা বাড়িতে হঠাৎ নিস্তব্ধতা। হাহাকার শূন্যতা। জানাযায় উপস্থিত উঠোনভরা গণজমায়েত ছাপিয়ে সেই বাড়ির প্রতিটি কোণ থেকে খাঁ খাঁ মরুর বিরান সুর এসে অন্তরে শেলের মত বাঁধে। মৃত্যুর অমোঘ বাস্তবতাকে আমরা কেউ অস্বীকার করতে পারি না। মৃত্যুর চেয়ে সুনিশ্চিত আর কিছু নেই। কিন্তু তবুও সেই মৃত্যু যখন আপনজনের চিরবিদায়ের বার্তা হয়ে নিষ্ঠুরভাবে ধরা দেয়, তখন সেই বাস্তবতাকে বড় অবাস্তব বলে মনে হয়।

মহান প্রভু ধৈর্যশক্তি নামক এক মহা নে’মত না দিলে এই বিচ্ছেদ বেদনা সওয়া অথৈ পারাবার পাড়ি দেয়ার চেয়ে দুঃসাধ্য হয়ে উঠত। বাড়ির উঠোনেই নতুন চারটি কবর। আমি বেদনাতুর মতীউর ভাইকে দেখি। অব্যক্ত বেদনায় মুষড়ে পড়া তার পরিবারের সদস্যদের দিকে তাকাই। ভাবতে পারি না, কীভাবে পরিবারটি এতগুলো প্রিয়জন হারানোর কষ্ট সইবে? কোথায় এই অন্ত হীন ব্যথার উপশম খুঁজবে! প্রতিটি সকাল যে হবে তাদের জন্য এক নতুন বেদনার উপাখ্যান! এই লেখা যখন লিখছি তখন মাদারীপুরে এক স্পীড বোট দুর্ঘটনায় মুহূর্তেই ২৬ জন জলজ্যান্ত মানুষ লাশে পরিণত হ’ল। নয় বছরের শিশু মীম হারালো বাবা-মা আর ছোট দুই বোন। পরিবারে তার আর কেউ রইল না। মৃত্যুর অমোঘ বাস্তবতার কাছে আমরা কি নিদারুণ অসহায়!

প্রিয় পাঠক, মৃত্যুর এই বিভীষিকা প্রতিনিয়ত আমাদের তাড়িয়ে ফিরছে- একথা জানার বাকি না থাকলেও আমরা কি নিজেদের অত্যাসন্ন মৃত্যু নিয়ে দু’দণ্ড ভাববার অবকাশ পেয়েছি? নাকি যৌবনের তাজা রক্ত, অর্থ-বিত্ত কিংবা ক্ষমতার মোহে আরো বহুকাল কাটানোর রঙিন স্বপ্ন দেখছি! এই স্বপ্ন ফিকে হওয়ার সময় কি এখনও হয়নি! করোনাকালে কত রথি-মহারথি, বিত্তশালী, ক্ষমতাশালীদের অকস্মাৎ মৃত্যু আমরা দেখেছি। ধন-সম্পদ, পরিকল্পিত ডায়েট, সুরক্ষিত ঘরবাড়ি, পৃথিবীর সর্বোত্তম চিকিৎসাব্যবস্থাও তাদেরকে রক্ষা করতে পারেনি। দুনিয়াতে অট্টালিকার পর অট্টালিকা যার হাতে গড়া, তিনি এখন নিঃসঙ্গ মাটির বিছানায় নিজের দেহাবশেষ রক্ষায় ব্যস্ত। কেউই মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পায়নি। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যেখানেই থাক না কেন, মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই; যদিও তোমরা সুউচ্চ দুর্গে অবস্থান কর’ (সূরা নিসা ৭৮)।

তাছাড়া সময়ের হিসাব কষলে আমাদের যাপিত জীবনের স্বাভাবিক আয়ুষ্কালই বা কতটুকু? আখেরাতের তুলনায় তা এতটাই গৌণ যে, কাল কেয়ামতের ময়দানে যখন জিজ্ঞাসা করা হবে, তোমরা কতদিন ছিলে দুনিয়াতে? আমাদের জবাব হবে- একটি সকাল কিংবা একটি সন্ধ্যা (সূরা নাযি’আত ৪৬)। এই তো আমাদের জীবন! এই সময়টুকু একজন পথচারী কিংবা একজন আগন্তুকের ক্ষণিক বিশ্রামের সময়টুকুও তো নয়। রাসূল (ছাঃ) এই অমোঘ বাস্তবতার প্রতিই যেন ইঙ্গিত করেছেন, ‘তুমি দুনিয়াতে এমনভাবে কাটাও যেন তুমি একজন আগন্তুক কিংবা পথচারী’ (বুখারী হা/৬৪১৬)।

জন্ম-মৃত্যুর মধ্যবর্তী এই সময়টুকু মিলেই আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের জীবন। অতীব সংক্ষিপ্ত হ’লেও এই জীবন আমাদের জন্য অতীব মূল্যবান। কেননা জীবনের এই ক্ষণকাল সময়টুকুতে যে যতটুকু পরকালীন প্রস্তুতি নিতে পেরেছে, তার উপরই যে নির্ভর করছে তার চিরস্থায়ী তথা পরকালীন জীবনের যাবতীয় সুখ-দুঃখ। প্রতিটি মুহূর্তেই মৃত্যু আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে প্রবল গতিতে। সেই সাথে ফুরিয়ে আসছে আমাদের জীবনের ব্যাপ্তি। আমাদের অজান্তে, আমাদের অলক্ষ্যে বেজে চলেছে বেলা শেষের ঘণ্টাধ্বনি। পরীক্ষার হলে একজন ছাত্র যেমন শেষ ঘণ্টা বাজার আগে সবকিছু সাধ্যমত লিখে ফেলার প্রাণান্ত চেষ্টা চালায়, আমাদের পার্থিব জীবনের বাস্তবতা ঠিক একই রূপ। মৃত্যুই এখানে শেষ ঘণ্টা। তারপর যাবতীয় কর্মযজ্ঞ শেষ। শুরু হবে কর্মফলের পালা। আর এর ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে আমাদের জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য।

অনেকে দুনিয়াবী দুঃখ-কষ্টে পতিত হলেই জীবন সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়েন। নিজেকে নিঃশেষ করে দিতে চান। অথচ তিনি যদি জীবনের প্রকৃত গুরুত্ব ও বাস্তবতা উপলব্ধি করতেন, তাহলে এক মুহূর্তের জন্যও এই চিন্তা করতেন না। কেননা কাল কেয়ামতের ময়দানে মানুষ সবচেয়ে বেশী আফসোস করবে পার্থিব জীবনের এই মূল্যবান সময়টুকুর জন্যই। সে আফসোসে প্রাণপাত করে সেদিন বলবে, ‘হে আমার রব! আমাকে আরো কিছু কালের জন্য অবকাশ দিলে না কেন? তাহলে আমি ছাদাকা করতাম এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতাম!’ (সূরা মুনাফিকূন ১০)।

প্রিয় পাঠক, পরকালীন সম্বল অর্জনে আমাদের আলস্য, দুর্বলতা ও অসচেতনতার সবচেয়ে বড় কারণ হ’ল মৃত্যুর স্মরণ থেকে গাফেল থাকা এবং মৃত্যুপূর্ব জীবনের মূল্যটুকু সঠিকভাবে অনুধাবন করতে না পারা। এজন্য আমরা হরহামেশা নিশ্চিন্ত মনে বলি, জীবনটা একভাবে কাটিয়ে দিলেই তো হ’ল। অথচ রাসূল (ছাঃ) জীবনটাকে একটা গণীমত উল্লেখ করে বলেছেন- ‘পাঁচটি জিনিসের পূর্বে পাঁচটি জিনিসকে তোমরা গণীমত মনে কর; বার্ধক্যের পূর্বে তোমার যৌবনকে, অসুস্থতার পূর্বে তোমার সুস্থতাকে, দারিদ্রের পূর্বে তোমার স্বচ্ছলতাকে, ব্যস্ততার পূর্বে তোমার অবসরকে, মরণের পূর্বে তোমার জীবনকে’ (ছহীহুল জামে হা/১০৭৭)। মৃত্যু নামক পর্দা হঠাৎ উঠে যাওয়া মাত্রই সব কিছু সাঙ্গ হয়ে যাবে আর নতুন এক সীমাহীন জগৎ চোখের সামনে ধরা দেবে। সেদিন দুনিয়াবী জীবনের গাফিলতিকে স্মরণ করে সে প্রচণ্ড আফসোস করবে। কিন্তু তাতে বিন্দুমাত্র লাভ হবে না। আল্লাহ বলেন, তুমি এই দিবস সম্পর্কে উদাসীন ছিলে। অতঃপর আজ (বাস্তবতা দেখে) তোমার চক্ষু স্থির, প্রখর (ক্বাফ ২২)।

একথাই স্মরণ করিয়ে দিয়ে একদিন জিব্রীল এসে রাসুল (ছাঃ)-কে বললেন, হে মুহাম্মাদ! যতদিন খুশী জীবন যাপন করুন, কিন্তু মনে রাখবেন, আপনার মৃত্যু অনিবার্য; প্রিয়জনকে যত খুশী ভালোবাসুন, কিন্তু মনে রাখবেন, একদিন তাকে আপনার ছাড়তে হবে; আপনি যা ইচ্ছা করুন, কিন্তু মনে রাখবেন একদিন আপনি প্রতিফল পাবেন। জেনে রাখুন হে মুহাম্মাদ! মুমিনের মর্যাদা হ’ল রাত্রি জাগরণে এবং তার সম্মান হ’ল, অপরের মুখাপেক্ষী না হওয়ার মধ্যে (সিলসিলা ছহীহাহ হা/৮৩১)।

সুতরাং পাঠক! আমাদেরকে মৃত্যুর এই চিরন্তন বাস্তবতা সচেতনভাবে উপলব্ধি করতে হবে। পার্থিব জীবনের সর্বশেষ সীমারেখা এই মৃত্যু। আজ হোক, কাল হোক এই সীমারেখা আমাদের অতিক্রম করতেই হবে। অতএব যারা মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের মৃত্যুকে কেবল কান্না আর বেদনার উপলক্ষ্য নয়; বরং উপদেশ ও স্মারক হিসাবে গ্রহণ করে আমাদেরও প্রস্তুত হতে হবে, সেই অমোঘ বাস্তবতার কাছে নিজেকে সঁপে দেয়ার জন্য। প্রস্তুতি নিতে হবে নিজ নিজ আমলনামা সাধ্যমত ভরপুর করে চিরস্থায়ী জীবনে সফল হওয়ার জন্য। এমনভাবে যেন সেই মহাবিচারের দিনে পরম প্রশান্তির সাথে সকলকে আমরা ডেকে ডেকে বলতে পারি- ‘নাও, আমার আমলনামা দেখ, আমার রেজাল্টশীট পড়ে দেখ; আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতাম আমাকে হিসাবের মুখোমুখি হতে হবে’ (সূরা হাক্কাহ ১৯-২০)। আর সেদিন আমাদের রব আমাদের আনন্দিত চেহারা দেখে খুশী হয়ে বলবেন, ‘হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি তোমার প্রভুর নিকটে ফিরে এসো সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। অতঃপর আমার বান্দাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ কর’ (সূরা ফজর ২৭-৩০)। সেই মহাদিবসে এই মহান সৌভাগ্য লাভের জন্য আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি তো!

📘 তারুণ্যের আত্নপাঠ ও সমাজ চিন্তা 📄 একজন দাঈ ইলাল্লাহ ডা. আব্দুর রহমান আস-সুমাইত্বে্‌র কথা

📄 একজন দাঈ ইলাল্লাহ ডা. আব্দুর রহমান আস-সুমাইত্বে্‌র কথা


আব্দুর রহমান বিন হামূদ আস-সুমাইত্ব (১৯৪৭-২০১৩ খৃ.)। কুয়েতী এই চিকিৎসক সমকালীন বিশ্বে মানবসেবার এক অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জীবনের ২৯টি বছর আনুষ্ঠানিকভাবে মানবসেবার কাজে নেমে আফ্রিকার অন্ততঃ ২৯টি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল সমূহে লক্ষ লক্ষ দরিদ্র মানুষের জীবনে হাসি ফুটিয়েছেন। শুধু তাই নয়, এ সময়ে তাঁর হাত ধরে ইসলাম গ্রহণে ধন্য হয়েছে অন্ততঃ ১১ মিলিয়ন তথা ১ কোটি ১০ লক্ষ মানুষ। তাওহীদের দাওয়াত নিয়ে তিনি সশরীরে আফ্রিকার পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছেন। অসহায় মানুষের সাহায্যার্থে দিনের পর দিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন। কখনও মরুভূমিতে, কখনও গহীন বন-জঙ্গল পেরিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছুটে গিয়েছেন। আফ্রিকার সর্বোচ্চ চূড়া মাউন্ট কিলিঞ্জোমারো পর্যন্ত আরোহণ করেছেন। এসব যাত্রায় কখনও তিনি বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠীর হামলার শিকার হয়েছেন। কখনও বিদ্যুৎ-পানিবিহীন প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে প্রাণঘাতী ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। জঙ্গলে বিষাক্ত সাপ-বিচ্ছুর আক্রমণের শিকার হয়ে বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকেও রক্ষা পেয়েছেন। কোন কিছুই তাকে পিছপা করতে পারেনি। বিরামহীন কঠোর পরিশ্রমের ফলে জীবনের শেষদিকে তিনি নানা রোগে জীর্ণশীর্ণ হয়ে পড়েন। এতদসত্ত্বেও অসুস্থ শরীর নিয়ে তিনি দাওয়াতী মিশন অব্যাহত রেখেছিলেন। মৃত্যুর প্রায় বছর খানিক পূর্বে তিনি কোমায় চলে যান। সে অবস্থাতেও কখনও জ্ঞান ফিরলে তিনি একটি কথাই জিজ্ঞাসা করতেন- ‘আফ্রিকার অসহায় মানুষদের কী অবস্থা, দাওয়াতের কী অবস্থা?’

জীবনের শুরুকাল থেকেই তিনি দারিদ্র্যের কষ্টকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করতেন। তিনি যখন ছাত্র ছিলেন, তখন তীব্র গরমে রাস্তায় পাবলিক ট্রান্সপোর্টের জন্য অপেক্ষমাণ শ্রমিকদের দেখে খুব কষ্ট পান। তাদের দুর্দশা লাঘবে সেই বয়সেই তিনি বন্ধুদের নিয়ে পুরোনো গাড়ি ক্রয় করে বিনা ভাড়ায় তাদেরকে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়ার কাজ শুরু করেন। ১৯৭২ সালে তিনি বাগদাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রী লাভ করার পর ১৯৭৪ সালে লন্ডন এবং ১৯৭৮ সালে কানাডা থেকে উচ্চতর ডিগ্রী সম্পন্ন করেন। অতঃপর দেশে ফিরে চিকিৎসা পেশায় জড়িত হওয়ার পরিকল্পনা করলেও স্ত্রীর উৎসাহে অবশেষে তিনি শৈশবের স্বপ্ন তথা প্রান্তিক মানুষের সেবাকেই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসাবে নির্ধারণ করেন। কর্মক্ষেত্র হিসাবে বেছে নেন আফ্রিকাকে। হিসাববিজ্ঞানে উচ্চ ডিগ্রীধারী তাঁর স্ত্রী কেবল উৎসাহ দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া অর্থ-সম্পদ দান করে দেন এই কার্যক্রমে। কুয়েতের আয়েশী জীবন ত্যাগ করে স্বামীর সাথে মাদাগাস্কারের মানাকারা গ্রামের ছোট্ট একটি গৃহে বসবাস শুরু করেন। দুস্থ, অশিক্ষিত, সভ্যতার আলোহীন কালো মানুষদের জন্য তাঁরা কেবল বৈষয়িক সহযোগিতাই নয়, বিশুদ্ধ জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেয়ার সার্বিক ব্যবস্থা করেন।

সেখানকার মুসলিম সম্প্রদায়গুলো নামেমাত্র মুসলমান হলেও তাদের কৃষ্টি- কালচার ছিল কবর-মাযারকেন্দ্রিক শিরক ও বিদ’আতে আচ্ছন্ন। এই দৃশ্য দেখে তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হন এবং তাঁদের মধ্যে তাওহীদের বিশুদ্ধ দাওয়াত প্রচারের ব্যবস্থা করেন। তাঁর কার্যক্রম ধীরে ধীরে আফ্রিকার ২৯টি দেশে বিস্ত ার লাভ করে। তিনি সুবিধাবঞ্চিত এলাকাসমূহে একের পর এক হাসপাতাল, ইয়াতীমখানা, হিফযখানা, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করতে থাকেন। এভাবে দুর্ভিক্ষ ও অজ্ঞতার করাল গ্রাসে ডুবে থাকা আফ্রিকার কয়েক কোটি হতদরিদ্র মানুষ তাঁর মাধ্যমে নতুনভাবে বাঁচার স্বপ্ন খুঁজে পায়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের মাঝে তাঁর এই মানবিক কার্যক্রমে আকৃষ্ট হয়ে দলে দলে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে।

দুস্থ মানবতার সেবায় ময়দানে নামলেও মূলতঃ দ্বীনের দাওয়াতই পরিণত হয় তাঁর ধ্যানজ্ঞান। প্রতিটি পদক্ষেপেই যেন তিনি দ্বীন প্রচারের সুযোগ নিতেন। এমনই একদিনের ঘটনা। কোন এক গ্রামে গিয়ে মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করার পর নিজে তিনি খেতে বসে উচ্চৈঃস্বরে বললেন- ‘একমাত্র আল্লাহ, যিনি আমাদের সৃষ্টিকর্তা ও জীবন-মৃত্যুর মালিক, তিনিই তাঁর অসীম অনুগ্রহে আমাদের জন্য জীবিকার ব্যবস্থা করেছেন’। তাঁর এই ছোট্ট কথাটিই উপস্থিত মানুষদের হৃদয়ে দাগ কেটে গেল এবং সাথে সাথে তারা ইসলাম কবুল করে নিল। কখনও দেখা যেত পুরো একটি গ্রাম তাঁর সুন্দর আচরণে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে। তিনি বলতেন, যদিও আমার ইসলাম প্রচারের অভিজ্ঞতা ২৫/২৬ বছরের বেশী নয়, তবুও আমি বলব মানুষের প্রতি সুন্দর আচরণই দাওয়াতের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য হ’ল, যখন আমি দেখি কারো শাহাদাত আঙ্গুলি প্রথমবারের মত আকাশমুখী হয়ে আল্লাহ্ একত্বের সাক্ষ্য দিচ্ছে’।

ব্যক্তিজীবনে তিনি কখনও বিশ্রামের কথা ভাবেননি। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কোথায় থামতে চান? তিনি বলেন, ‘মৃত্যু না আসা পর্যন্ত আমার বিরতি নেয়ার কোন সুযোগ নেই। কেননা হিসাবের দিনটি খুব কঠিন। তোমরা জানো না আব্দুর রহমান কত বড় পাপিষ্ঠ। আমি কিভাবে অবসর নেব যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ হেদায়াতের দাওয়াত পেতে উন্মুখ হয়ে আছে? কিভাবে আমি বসে থাকতে পারি, যখন এই নওমুসলিম সন্তানদেরকে পুনরায় দ্বীন থেকে দূরে সরানোর জন্য ইসলাম বিরোধীরা তৎপর রয়েছে?’

২০১৩ সালে এই মহান দাঈ ইলাল্লাহ চিরবিদায় গ্রহণ করেন। স্বীয় কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ ‘বাদশাহ ফায়ছাল পুরস্কার’ সহ বহু পুরস্কার লাভ করেছেন। তবে সেসব পুরস্কার থেকে প্রাপ্ত সকল অর্থ মানবতার সেবায় দান করে দিয়েছেন। মানুষকে সর্বদা মানবতার কল্যাণে অগ্রগামী হওয়ার জন্য উৎসাহিত করে বলতেন, ‘আমাদের প্রত্যেকেরই একটি মিশন থাকা উচিৎ, যা হবে এই পৃথিবীকে অধিকতর উত্তম পৃথিবী হিসাবে রেখে যাওয়ার মিশন’। তিনি বলতেন, ‘তোমাদের সবাইকে আফ্রিকায় গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দিতে হবে তা নয়; কিন্তু কখনও নিজ গৃহে ও নিজ সমাজে দাওয়াত দেয়া বন্ধ করো না। মানুষের সামনে নিজেকে উদাহরণ হিসাবে উপস্থাপন কর। যেন মানুষ তোমাকে দেখে কল্যাণের পথে উৎসাহিত হয়’।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের মুসলিম তরুণরা কেবল মাদার তেরেসাদের কথাই জানে। অথচ তাদের প্রকৃত রোল মডেলরা দৃশ্যপটের আড়ালেই থেকে যান। ডা. আব্দুর রহমান সুমাইতের মত নিষ্ঠাবান মহান দাঈ’র কথা আমরা ক’জনই বা জানি! অথচ তাঁদেরই কিনা হওয়ার কথা ছিল তরুণদের প্রেরণাবাতি! আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই মহান মানবসেবী দাঈকে জান্নাতুল ফেরদাউস নছীব করুন এবং তরুণদেরকে তাঁর মত দাঈদের পদাঙ্ক অনুসরণে দ্বীনের প্রকৃত খাদেম হিসাবে গড়ে ওঠার তাওফীক দান করুন- আমীন!

📘 তারুণ্যের আত্নপাঠ ও সমাজ চিন্তা 📄 দ্বীনের পথে আমূল পরিবর্তিত এক পথিক আলী বানাত

📄 দ্বীনের পথে আমূল পরিবর্তিত এক পথিক আলী বানাত


অস্ট্রেলিয়ার এক ফিলিস্তিনী বংশোদ্ভূত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণকারী যুবক আলী বানাত (১৯৮২-২০১৮খ্রি.) ছিলেন সমসাময়িক পৃথিবীর আর দশজন বিত্তশালীর মতই ভোগবিলাসী জীবনে গা ভাসানো যুবক। মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও ইসলামের কোন প্রভাব ছিল না তাঁর জীবনে। পেশায় ছিলেন ইলেক্ট্রিশিয়ান। মাত্র ২১ বছর বয়স থেকেই সিডনীতে দুটি সফল ব্যবসা পরিচালনা করতেন। ফলে স্বল্প বয়সে বিপুল বিত্ত-বৈভব তাকে বিলাসী জীবনে অভ্যস্ত করে তোলে। প্রায় ৫০ কোটি টাকা মূল্যের ফেরারী স্পাইডার কার, ৪৮ লক্ষ টাকা মূল্যের ব্রেসলেট, দামী ব্র্যান্ডের অসংখ্য জুতা ও সানগ্লাস ছিল তাঁর জীবনের নিত্যসঙ্গী।

কিন্তু হঠাৎই ২০১৫ সালের মাঝামাঝি তাঁর শরীরে ক্যান্সার ধরা পড়ল। চিকিৎসকরা জানালেন ক্যান্সার যে পর্যায়ে ধরা পড়েছে, তাতে আরোগ্যের কোন সম্ভাবনা নেই। উপরন্তু তাঁর আয়ু রয়েছে বড় জোর সাত মাস। আলী বানাতের জীবনে এই ঘটনা এক বিরাট ধাক্কা হয়ে এল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় আলী বানাতের পরিবর্তিত জীবনের শুরু হল এখান থেকেই। তিনি সহসাই উপলব্ধি করলেন, তাঁর এতদিনের যাপিত জীবন ছিল পুরোটাই মিছে মায়ার পিছনে ছোটা। জীবনের প্রকৃত মর্ম তাঁর চোখে বড় স্পষ্ট হয়ে ধরা দিল। তিনি মৃত্যুর প্রস্তুতিস্বরূপ গোরস্থানে গোরস্থানে গিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ সহযাত্রীদের একান্ত সান্নিধ্যে সময় কাটাতে লাগলেন। নিজের সমস্ত সম্পদ অসহায় মানুষের সেবায় দান করতে মনস্থ করলেন। মৃত্যুর পূর্বে প্রতিটি সময় ও ক্ষণ তাঁর নিকট পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদে পরিণত হল।

তিনি তাঁর সমস্ত ব্যবসা গুটিয়ে নিলেন এবং আফ্রিকার দারিদ্রপীড়িত দেশসমূহে বিতরণের জন্য তাঁর যাবতীয় সম্পদ প্রেরণ করলেন। গঠন করলেন দাতব্য সংস্থা মুসলিমস্ এ্যারাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড। নিজে সশরীরে উপস্থিত থেকে টোগো, ঘানা ও বুর্কিনা ফাসোসহ আফ্রিকার অন্যান্য দেশসমূহে দাতব্য কার্যক্রম পরিচালনা করলেন। চিকিৎসকগণ তাঁকে ৭ মাস সময় দিয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাঁকে আরও ৩টি বছর জীবন দিলেন।

তিনি বলেন, এক বন্ধুর পরামর্শে আমি ব্যথা উপশমের জন্য একটি উচ্চমাত্রার ঔষধ গ্রহণ করি। ঔষধটির ধাক্কা এত অধিক ছিল যে, আমি মৃত্যুর মুখোমুখি উপনীত হলাম। আমি অনুভব করতে লাগলাম আমি সম্পূর্ণ এক ভিন্ন অচেনা জগতে রয়েছি। আল্লাহ্র কসম আমি এমন কিছু দেখেছিলাম, যা পূর্বে কখনও দেখিনি। আমার পরিবার আমার পাশে ছিল, আর আমি বলছিলাম, হে আল্লাহ! আমাকে তুলে নাও। আমি খুব সুন্দর কিছু দৃশ্য দেখছিলাম। আমি কেবলই চাচ্ছিলাম সেখানে যেতে। কিন্তু পরদিন যখন আমি জাগ্রত হলাম, তখন খুব হতাশ হলাম যে আল্লাহ আমাকে নেননি। অশ্রুসজল চোখে বলেন তিনি।

তিনি বলেন, ক্যান্সার আমার জীবনে ছিল আল্লাহ্ পক্ষ থেকে উপহার। কেননা ক্যান্সারের মাধ্যমে আল্লাহ আমাকে পরিবর্তনের সুযোগ দিয়েছেন। ক্যান্সারের কারণেই আমি পরকালের প্রস্তুতি নিতে পেরেছি। তিনি সবকিছুই একে একে দান করে দেন। এমনকি বিদেশে গেলে নিজের পরণের পোষাকটুকু ছাড়া সবকিছু বিলিয়ে দিতেন। কেননা তিনি চেষ্টা করতেন এমন অবস্থায় পৃথিবী ছাড়তে যখন তাঁর নিকট আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। দাতব্য সংস্থা গঠনের পিছনে তাঁর এই উদ্দেশ্যই ক্রিয়াশীল ছিল। তিনি বলতেন, তোমার অর্জিত সম্পদ তোমার সাথে কবরে যাবে না। কেবল সেটুকুই যাবে যা তুমি ছাদাক্বা করবে। এটিই একমাত্র বস্তু যা তোমাকে গন্তব্যে পৌঁছানোর পূর্বে কবরে অবস্থানরত সময়ে তোমাকে সাহায্য করবে। তোমার বাবা-মা, পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব কেউ সেখানে থাকবে না। থাকবে কেবল তোমার কর্ম।

তিনি জাগতিক সুখের পিছনে ছুটে চলা মানুষদের লক্ষ্য করে বলেন, যখন কেউ জানবে যে, পৃথিবীতে তাঁর অবস্থানকাল আর বেশী দিন নয়, তখন আল্লাহ্র কসম পার্থিব কোন বস্তুর প্রতি আকর্ষণবোধ করা তাঁর জীবনের সবচেয়ে অগুরুত্বপূর্ণ কাজে পরিণত হবে। প্রকৃতপক্ষে আমাদের দৈনন্দিন জীবন এমন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই পরিচালনা করা উচিৎ। যারা জাগতিক লক্ষ্যে জীবন পরিচালনা করে, তারা নিঃসন্দেহে ভুল লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে। যখন কেউ অসুস্থ হয়, কিংবা নিশ্চিত হয় যে, সে আর বেশীদিন বাঁচবে না, তখনই সে উপলব্ধি করতে পারে যে, প্রকৃতই এসব জাগতিক বস্তুর কোন মূল্য নেই।

তিনি সকলের উদ্দেশ্যে বলেন, দয়া করে প্রত্যেকেই জীবনের একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করুন। জীবনের জন্য একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করুন। মানুষের উপকারার্থে কোন প্রকল্প হাতে নিন। যদি নিজে না পারেন তবে অন্য কারও প্রকল্পে অংশগ্রহণ করুন। কেবল কিছু একটা করার চেষ্টা করুন। কেননা আল্লাহর কসম, কিয়ামতের দিন আপনি ভীষণভাবে এগুলোর প্রয়োজন বোধ করবেন।

গত ২৯শে মে ২০১৮ বৃহস্পতিবার সিডনীর একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুপথযাত্রী অবস্থায় তাঁর রেখে যাওয়া ভিডিওবার্তা সারাবিশ্বের মানুষকে আলোড়িত করেছে। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউসে স্থান দিয়ে সম্মানিত করুন। আমীন!

এই তরতাজা আধুনিক যুবকের পরিবর্তনের মর্মস্পর্শী গল্প আমাদের জন্য অনেক মূল্যবান শিক্ষা রেখে গেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হল সর্বাবস্থায় আল্লাহর উপর ভরসা রাখা এবং জীবনের কঠিন প্রতিকূল মুহূর্তেও ধৈর্যহারা না হওয়া। কেননা তিনি যা করেন, বান্দার মঙ্গলের জন্যই করেন। কঠিন রোগাক্রান্ত অবস্থাও হয়ত আলী বানাতের মত মহান প্রভুর প্রতি প্রত্যাবর্তনের এক অনন্য গল্প হতে পারে। এছাড়া আলী বানাতের জীবন আমাদেরকে কিছু প্রশ্নের সম্মুখীন করে। যেমন- আমরা কি আলী বানাতের মত পরকালীন জীবনকে নিরাপদ করার জন্য বিশেষ কোন উদ্যোগ নিয়েছি? অথচ আমাদের মৃত্যুক্ষণ যে কোন সময় উপস্থিত হতে পারে?

দ্বিতীয়ত: আমরা যখন নিজেদের ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত এবং ভবিষ্যৎ ভাবনায় উদ্বিগ্ন, তখন তাতে পরকালীন প্রাপ্তির ভাবনা যুক্ত থাকছে তো? জীবনের মৌলিক উদ্দেশ্য গৌণ হয়ে পড়ছে না তো?

তৃতীয়ত: মৃত্যুর পর আমরা কী রেখে যাচ্ছি? মানুষ আমাকে নিয়ে কি ভাবছে? মানুষের কল্যাণে আমি কতটুকু করে যেতে পারলাম? মানুষের জীবনে কতটুকু ইতিবাচক প্রভাব রেখে যেতে পারলাম? বিশেষ করে আল্লাহ আমাদের প্রত্যেককে কিছু না কিছু করার ক্ষমতা দিয়েছেন, সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে আমরা পৃথিবীবাসীকে কতটুকু দিতে পারলাম? এই ভাবনাগুলো যদি নিজেদের জীবনে জাগ্রত করতে পারি, তবে আমাদের জীবন মহান প্রভুর প্রতি আত্মসমর্পিত এবং একক লক্ষ্যে নিবেদিত এক আলোকিত ও মনুষ্যত্বপূর্ণ জীবনের অধিকারী হতে পারব ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন!

ফন্ট সাইজ
15px
17px