📘 তারুণ্যের আত্নপাঠ ও সমাজ চিন্তা 📄 মতভেদ নিরসন

📄 মতভেদ নিরসন


মতভেদ এমন একটি বিষয়, যা মানবজাতির সৃষ্টিগত স্বভাবের অন্তর্ভুক্ত। নানা মুনির নানা মত- প্রবাদটির মত আমাদের জীবনের প্রতিটি ধাপে মতপার্থক্য এক অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। এই নানান মতের রহস্য ও পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ কুরআনে এভাবে বর্ণনা করেছেন- ‘আল্লাহ চাইলে তোমাদের সবাইকে এক দলভুক্ত করে দিতেন। কিন্তু তিনি চান তোমাদেরকে যে বিধানসমূহ দিয়েছেন, তাতে তোমাদের পরীক্ষা নিতে। অতএব তোমরা আল্লাহ্ আনুগত্যপূর্ণ কর্মসমূহে প্রতিযোগিতা কর। (মনে রেখ) আল্লাহ্র নিকটে তোমাদের সকলের প্রত্যাবর্তন স্থল। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে অবহিত করবেন যেসব বিষয়ে তোমরা মতভেদ করতে’ (মায়েদা ৫/৪৮)। অন্য আয়াতে এসেছে, ‘আপনার রব চাইলে সকল মানুষকে এক জাতি করতে পারতেন। কিন্তু তারা সদা মতভেদ করতেই থাকবে। তবে তারা নয়, যাদের প্রতি আপনার রব অনুগ্রহ করেছেন এবং তাদেরকে এজন্যই সৃষ্টি করেছেন’ (হৃদ ১১/১১৮-১৯)। মানুষের বিবেক-বুদ্ধি, আবেগ-অনুভূতি, চর্চা-অভিজ্ঞতার আলোকে জ্ঞান-বুদ্ধির তারতম্য ঘটে। নিত্য-নতুন ভাবের উদয় হয়। সুতরাং মানবসমাজে মতভেদ থাকবেই। বরং মতের এই বিভিন্নতা আল্লাহ্ অসীম কুদরতের বহিঃপ্রকাশ। নইলে মানবজীবনধারা আমাদের চোখে এতটা বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে ধরা দিত না।

মতভেদ ও মতপার্থক্যের এই স্বভাবজাত বিষয়টি যখন আমরা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, তখন লক্ষ্য করি আমাদের অধিকাংশই এ ব্যাপারে যথেষ্ট অস্পষ্টতা এবং বিভ্রান্তির মধ্যে নিমজ্জিত। একদল মনে করেন মতপার্থক্যই ইসলামের সৌন্দর্য। সুতরাং যত মত তত পথ। যে যে পথেই চলুক না কেন, শেষ ঠিকানা আরাধ্য সত্তার সান্নিধ্য। আর অপর দল মনে করেন, ইসলামে কোন প্রকার মতপার্থক্যের স্থান নেই। সুতরাং ভিন্নমত মানেই ভ্রষ্টতার পথ, বিভ্রান্তির পথ। অথচ সত্য লুকিয়ে আছে এতদুভয়ের মধ্যখানে।

মতভেদের ক্ষেত্রে ইসলামের অবস্থান হ’ল- কোন বিষয়ে মতভেদ থাকা অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু যথাসাধ্য তার নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করতে হবে। আর যদি নিষ্পত্তি করা একান্ত সম্ভব না হয়, তবে তা নিয়ে বাড়াবাড়ি কাম্য নয়; বরং সহনশীলতার সাথে তা সমাধা করতে হবে। এক্ষেত্রে নীতিমালা হ’ল-

প্রথমতঃ কুরআন ও সুন্নাহ্র প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে মতভেদের নিষ্পত্তি করতে হবে। আল্লাহ বলেন- ‘আর যদি কোন বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটে, সে বিষয়টি আল্লাহ এবং রাসূল (কুরআন ও সুন্নাহ)-এর দিকে ফিরিয়ে দাও। এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে সর্বোত্তম’ (নিসা ৪/৫৯)।

দ্বিতীয়তঃ কোন বিষয়ে নিশ্চিত জ্ঞান বা দলীল পাওয়া গেলে সে বিষয়ে মতভেদ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা তাদের নিকট সুস্পষ্ট প্রমাণ আসার পরও বিভক্ত হয়েছে এবং নিজেদের মধ্যে মতভেদ করেছে। আর তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি’ (আলে ইমরান ৩/১০৫)।

তৃতীয়তঃ মতভেদ করে পরস্পরের মধ্যে অনৈক্য ও বিভক্তি সৃষ্টি করা যাবে না। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সকলে আল্লাহ্র রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না’ (আলে ইমরান ৩/১০৩)।

চতুর্থতঃ কোন বিষয়ে স্পষ্ট দলীল না পেলে যদি মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়, তবে তার স্বীকৃতি দিতে ইসলাম নিষেধ করেনি। যেমন ইজতিহাদী মাসআলাগত বিষয়। কেননা মানুষ অসীম জ্ঞানের অধিকারী নয়। তাই তার অজ্ঞতা ও স্বল্পজ্ঞান থেকে জন্ম নিতে পারে ভিন্নমত। এজন্য রাসূল (ছাঃ) বলেন, যখন কোন বিচারক ইজতিহাদ করে এবং সঠিক মতে উপনীত হয়, তখন তাঁর জন্য রয়েছে দু’টি পুরষ্কার। আর যদি সে ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, তবে তার জন্য রয়েছে একটি পুরষ্কার (কেননা সে সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য চেষ্টা চালিয়েছে) (বুখারী হা/৭৩৫২; মিশকাত হা/৩৭৩২)। অনুরূপভাবে বনু কুরায়যায় আছরের ছালাত আদায় সম্পর্কে ছাহাবীদের মতভেদ থেকেও বুঝা যায় যে, সব মতভেদ বাতিলযোগ্য নয় (বুখারী হা/৯৪৬; মুসলিম হা/১৭৭০)। এবং ছাহাবীদের মধ্যেও মতভেদ ছিল। সুতরাং অসঙ্গত মতপার্থক্য যেমন ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়; তেমনিভাবে মতপার্থক্য মানেই যে নিন্দনীয়, তা নয়।

বর্তমান যুগে সচরাচর যে চিত্রটি আমাদের খুব পরিচিত তা হ’ল, ছোটখাটো কোন বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দিলেও আলেম সমাজ ও ধর্মীয় মহলে দেখা দেয় পারস্পরিক দূরত্ব এবং কাদা ছোঁড়াছুড়ির অধৈর্য ও কদর্য প্রতিযোগিতা। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে তো বিষয়টি প্রায় মহামারির আকার ধারণ করেছে। অনেক সময় এই বাকযুদ্ধ এমন পর্যায়ে চলে যায় যে, মনে হয় কেবল খুনোখুনিটা বাকি। এর পিছনে মূল যে কারণটি নিহিত, তা হ’ল- মতপার্থক্যের প্রকৃতি না বুঝা এবং কোন মতপার্থক্য গ্রহণযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তাকে মতবিরোধের হাতিয়ার বানিয়ে নিজেদের মধ্যে অনৈক্য ও বিভক্তি সৃষ্টি করা। অথচ অন্তরে ইখলাছ ও তাক্বওয়ার যথাযথ চর্চা থাকলে এবং উপরোক্ত মূলনীতিগুলো মনে রাখলে এধরনের মতবিরোধ সহজেই এড়ানো যেত। নিম্নে আমরা আরো কয়েকটি আচরণ ও পদ্ধতিগত মূলনীতি উল্লেখ করতে চাই, যেগুলো আমাদের মধ্যকার এই অনৈক্য দূরীকরণে ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন:

(১) ধৈর্য, সহনশীলতা ও পরমতসহিষ্ণুতা অবলম্বন করা: এই শিষ্টাচার অনুসরণ করা মতভেদ দূরীকরণে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। আমাদের মনে রাখা ভাল যে, ভিন্নমত মানেই ভুল মত নয়। বরং বাহ্যদৃষ্টিতে কোন সময় একটি মতকে সঠিক মনে হলেও এমনও হ’তে পারে যে, ভিন্ন মতই সঠিক। মূসা (আঃ) ও খিযির (আঃ)-এর ঘটনা এক্ষেত্রে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় (কাহফ ৬০-৮২)। ইবনে তায়মিয়া বলেন, আমাদের যুগে যত নতুন নতুন ঘটনাবলী ও একের পর এক ফিতনাসমূহ বিস্তৃত হচ্ছে তার পিছনে মৌলিক দুটি কারণ- (১) জ্ঞানের স্বল্পতা। (২) ধৈর্য ও সহনশীলতার ঘাটতি’। তিনি বলেন, عامة الفتن التي وقعت من أعظم أسبابها قلة الصبر؛ إذ الفتنة لها سببان: إما ضعف العلم، وإما ضعف الصبر، فإن الجهل والظلم أصل الشر، وفاعل الشر إنما يفعله لجهله بأنه شر، وتكون نفسه تريده فبالعلم يزول الجهل، وبالصبر يحبس الهوى والشهوة فتزول تلك الفতنة ‘মৌলিকভাবে ফিত্না যেসব কারণে হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হ’ল সহনশীলতার অভাব। যদিও ফিৎনার পিছনে দু’টি কারণ ক্রিয়াশীল। হয় তা জ্ঞানের কমতি, নতুবা ধৈর্যের ঘাটতি। অজ্ঞতা ও যুলুম সকল অকল্যাণের মূল। যে পাপ করে বা অন্যায় করে, সে মূলতঃ অজ্ঞতার কারণে এবং নিজের খাহেশাতের কারণেই তা করে। জ্ঞানের মাধ্যমে অজ্ঞতা দূর হয় আর ছবর বা সহনশীলতার মাধ্যমে খাহেশাত, স্বেচ্ছাচারিতা, কুপ্রবৃত্তির নিবারণ হয়। ফলে ফিৎনা দূরীভূত হয়’ (আল-মুসতাদরাক আলা মাজমূঈল ফাতাওয়া ৫/১২৭)।

(২) সর্বদা পরামর্শ ও আলোচনার দুয়ার খোলা রাখা: যে কোন সমস্যা সমাধানের সর্বোত্তম পদ্ধতি হ’ল ভিন্ন মতাবলম্বীর সাথে আন্তরিকতা ও সত্যনিষ্ঠার সাথে আলোচনা করা। যদি সদিচ্ছা নিয়ে পর্যালোচনার দুয়ার উন্মুক্ত রাখা হয়, তবে যে কোন জটিল বিষয়ের সমাধানও সহজ হয়ে যায়। এজন্য সর্বোত্তম পন্থায় আলোচনা-পর্যালোচনার পথ খোলা রাখতে হবে (আলে ইমরান ৩/১৫৯; নাহল ১৬/১২৫)। আল্লাহ বলেন, ‘আর আমার বান্দাদেরকে বল, তারা যেন এমন কথা বলে- যা উত্তম। নিশ্চয় শয়তান তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির জন্য উস্কানী দেয়; নিশ্চয় শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু’ (বনু ইস্রাঈল ১৭/৫৩)।

(৩) অধিকতর শক্তিশালী দলীলকে প্রাধান্য দেয়া : শরী‘আতের কোন বিষয়ে উভয় মতের স্বপক্ষে যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য দলীল উপস্থিত থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে উভয়ের মধ্যে অধিকতর শক্তিশালী মতটিকে প্রাধান্য দেয়া উচিৎ। আল্লাহ বলেন, ‘যারা মনোযোগ দিয়ে কথা শোনে, অতঃপর তার মধ্যে যেটা উত্তম সেটার অনুসরণ করে, তাদেরকে আল্লাহ সুপথে পরিচালিত করেন এবং তারাই হ’ল জ্ঞানী’ (যুমার ৩৯/১৮)।

(৪) ব্যক্তিস্বার্থ বা কারো প্রতি বিদ্বেষভাব দ্বারা প্রভাবিত না হওয়া : আমাদের সমাজে মতবিরোধ সৃষ্টি হওয়ার অন্যতম কারণ হ’ল ব্যক্তিস্বার্থ দ্বারা তাড়িত হওয়া এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করা। সমাজে অধিকাংশ মতভেদ বিষাক্ত আকার ধারণ করে মূলতঃ স্বার্থপরদের কারণে, যারা যে কোন মূল্যে ব্যক্তিস্বার্থকে চরিতার্থ করতে চায়। যে কোন মতবিরোধ নিরসনের পূর্বশর্ত হ’ল এই মহা ব্যাধি থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা (নিসা ৪/১৩৫; মায়েদা ৫/৮; শূরা ৪২/৪০)।

(৫) বৃহত্তর ও সামগ্রিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া : বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনের জন্য অনেক সময় ক্ষুদ্রতর বিষয়গুলো ত্যাগ করতে হয় কিংবা এড়িয়ে যেতে হয়। এটা দুর্বলতা নয় বরং দূরদর্শিতার পরিচায়ক। মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইসহ খারেজী যুল-খুয়াইছিরার সাথে রাসূল (ছাঃ)-এর আচরণ এই দূরদর্শিতারই সাক্ষ্য দেয়। রাসূল (ছাঃ) চাইলে তাদেরকে হত্যা করতে পারতেন। কিন্তু তা না করে তিনি ছাহাবীদের বললেন, ‘তাকে ছেড়ে দাও, ভবিষ্যতে কেউ যেন না বলতে পারে যে, মুহাম্মাদ তাঁর সাথীদের হত্যা করেন’ (বুখারী হা/৪৯০৫)। হোদায়বিয়ার সন্ধি কিংবা মক্কা বিজয়কালে রাসূল (ছাঃ)-এর ভূমিকা এই মূলনীতির জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত।

(৬) আত্ম-অহংকারে লিপ্ত না হওয়া: অনেক সময় জ্ঞানী হিসাবে পরিচিত ব্যক্তিরাও নিজেদের অহংবোধ ধরে রাখতে গিয়ে স্বীয় মতের বাইরে ভিন্ন কোন মতকে সামান্য অবকাশও দিতে চান না। বরং অন্যায় যিদ ও হঠকারিতার মধ্যে ডুবে যান। অথচ দ্বীনের স্বার্থে অন্যের জ্ঞানকেও স্বীকৃতি দেয়ার উদারতা রাখতে পারলে বহু মতভেদপূর্ণ বিষয় সহজেই সমাধান করা সম্ভব হয়। মনে রাখা ভাল যে, নিজের বিজ্ঞতাকে সর্বেসর্বা ভাবার চেয়ে বড় অজ্ঞতা আর নেই। আল্লাহ্র বাণী আমাদের জন্য অনেক বড় নছীহত- ‘প্রত্যেক জ্ঞানীর উপর অধিক জ্ঞানী আছে’ (ইউসুফ ১২/৭৬)।

(৭) সর্বদা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি রুজু থাকা: কেননা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ) ব্যতীত পৃথিবীর কারো বক্তব্যই শতভাগ গ্রহণীয় নয়। ব্যক্তি যত জ্ঞানী ও যত বড় ইমাম বা নেতা হোন না কেন, যত বড় আকাবির-বুযুর্গ হোন না কেন, তার কথা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথার বিপরীত হ’লে তা সর্বতোভাবে বর্জনীয় (আন’আম ৬/১৫৩; আ’রাফ ৭/৩; নূর ২৪/৫১)। কোন দূরতম ব্যাখ্যা দিয়ে কুরআন ও ছহীহ হাদীছকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

(৮) আত্মসংশোধনকে হীনতা মনে না করা: কারণ ইছলাহ বা সংশোধনই ঈমানদারদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যত নেককার ব্যক্তিই হোক, কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নয় (ইউসুফ ১২/৫৩; নাজম ৫৩/৩২)। সুতরাং ভুলের উপর টিকে থাকায় কোন কৃতিত্ব নেই; বরং আত্মসংশোধনেই রয়েছে সফলতা। আল্লাহ বলেন, ‘যারা তাক্বওয়া অবলম্বন করে এবং নিজেদের সংশোধন করে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তান্বিতও হবে না’ (আ’রাফ ৭/৩৫)।

(৯) অপরের কল্যাণকামী হওয়া: মানবতার বৃহত্তর কল্যাণচিন্তা যার মনে বিরাজ করে, মতবিরোধে লিপ্ত হওয়া তার জন্য প্রায় অসম্ভবই। বরং সংশোধন ও সংস্কারের প্রবল আকুতি উল্টো তাকে মতবিরোধ নিষ্পত্তির জন্য তাড়িত করে। তার ভাবনা জুড়ে প্রতিধ্বনিত থাকে আল্লাহ্ বাণী- মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই। সুতরাং তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপোষ মীমাংসা করে দাও। আর তাক্বওয়া অবলম্বন কর। যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হ’তে পার (হুজুরাত ৪৯/১০)। এমনকি অমুসলিমের প্রতিও সে থাকে দয়ার্দ্রচিত্ত (মুমতাহিনা ৮)। মানুষকে ক্ষমা করা, ছাড় দেয়া, সহমর্মিতা প্রকাশ করা ইত্যাদি হয় তার নিত্য বৈশিষ্ট্য (আলে ইমরান ৩/১৩৪; নূর ২৪/২২)। কোন অবস্থাতেই সে অন্যের সম্মানহানির চিন্তা করতে পারে না। কখনই মিথ্যা ও শঠতার আশ্রয় নিতে পারে না। রাসূল (ছাঃ) বলেন, একজন মুসলিমের জন্য অন্য মুসলিমের সম্পদ, সম্মান ও জীবনের উপর হস্তক্ষেপ করা হারাম। কোন ব্যক্তির মন্দ হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ মনে করবে (মুসলিম হা/২৫৬৪)। তিনি আরো বলেন, ‘দ্বীন হ’ল কল্যাণকামিতার নাম’ (মুসলিম হা/৫৫)।

(১০) মধ্যপন্থা অবলম্বন করা: একজন মুসলমানের জীবন হবে ভারসাম্যপূর্ণ। অতি অনুরাগ কিংবা অতি বিরাগ তাকে কখনই বিভ্রান্ত বা লক্ষ্যচ্যুত করবে না। কোন অবস্থাতেই সে চরমপন্থা অবলম্বন করবে না। বাড়াবাড়ি করবে না। বরং সাধ্যমত মধ্যপন্থা অবলম্বনের মাধ্যমে সমঝোতার পথ খোলা রাখবে (বাক্বারাহ ২/১৪৩; ফুরক্বান ২৫/৬৭)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, তোমরা সহজ পন্থা অবলম্বন করা, কঠিন পন্থা অবলম্বন করো না। মানুষকে সুসংবাদ দাও, দূরে ঠেলে দিও না (বুখারী হা/৬৯; মুসলিম হা/১৭৩২)।

বর্তমান যুগে আলহামদুলিল্লাহ দ্বীনের দাওয়াতের ময়দান যেমন প্রসারিত হচ্ছে, তেমনি এর বিপরীতে আলেম-ওলামা ও ধর্মীয় দল-উপদলের মধ্যে বাড়ছে পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ ও কলহ-বিবাদ। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে ধার্মিক তরুণদের একটা বড় অংশ একে অপরের বিরুদ্ধে জবাব-পাল্টা জবাব, রদ-পাল্টা রদে মহা ব্যস্ত। কারো বিরুদ্ধে সামান্য ত্রুটি পাওয়া মাত্রই তার বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগা, সম্মানহানি করা এগুলো এখন স্বাভাবিক কালচারে পরিণত হয়েছে। কোন বিষয়ে স্বচ্ছ জ্ঞান কিংবা প্রকৃত তথ্য না জানা থাকলেও তারা বড় বড় মন্তব্য, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যপূর্ণ বক্রোক্তি করতে দ্বিধা করছে না। ফলে মতভেদের বিষবাষ্প বাড়ছে বৈ কমছে না।

এর ফলে ক্ষতি হচ্ছে আমাদের দ্বীনদারিতার। হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের ইখলাছ। বিনষ্ট হচ্ছে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির পরিবেশ। বিপথগামী হচ্ছে আমাদের সমাজ। সর্বোপরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর সার্বিক অগ্রযাত্রা। আল্লাহ বলেন, ‘আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর ও নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ করো না। করলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি ও প্রতিপত্তি হারিয়ে ফেলবে। আর তোমরা ধৈর্য ধারণ কর; নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে থাকেন’ (আনফাল ৮/৪৬)। সুতরাং যদি আমরা আল্লাহ্ প্রকৃত আনুগত্যশীল বান্দা হ’তে চাই, আমাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনকে ইসলামী সংস্কৃতির সুসভ্য বাতাবরণে সাজাতে চাই, ঐক্য ও সংহতির সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে চাই এবং মুসলিম উম্মাহকে বিজয়ী শক্তি হিসাবে দেখতে চাই, তবে আমাদেরকে অবশ্যই মতবিরোধের এই অশুভ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ধৈর্য, সহনশীলতা ও পরমতসহিষ্ণুতার কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেদেরকে পরিশুদ্ধ করতে হবে। পারস্পরিক সমঝোতার পথ খুঁজে নেয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে হবে। অনাকাংখিত কারণে আমাদের মধ্যে শয়তান যেন কোনরূপ বিভেদের দরজা খুলতে না পারে, সে ব্যাপারে আমাদের সদা সতর্ক থাকতে হবে। আর এর মাঝেই নিহিত রয়েছে আমাদের দুনিয়াবী ও পরকালীন সাফল্য ও মর্যাদা। আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন। আমীন!

📘 তারুণ্যের আত্নপাঠ ও সমাজ চিন্তা 📄 তারুণ্যের আখলাকী নৈরাজ্য

📄 তারুণ্যের আখলাকী নৈরাজ্য


তরুণ সমাজের একটি অংশ যখন বস্তুবাদের রঙিন নেশায় মত্ত হয়ে দুনিয়ার পিছনে অন্ধের মত ছুটছে, পুঁজিবাদের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মরণ প্রতিযোগিতায় নেমেছে, ঠিক তখনই দ্বীনদার তরুণদের অপর একটি অংশ বস্তুবাদের নয়া টোপ গিলে দ্বীনকে বিক্রি করে, আখেরাতমুখিতাকে একপাশে রেখে অন্ধের মত দুনিয়ার পিছনে ঘুরছে। এ যেন এক নয়া ঈমানী বস্তুবাদ। দ্বীনদারিতার পোষাকে এই ঈমানী বস্তুবাদীদের প্রধান আলামত হ’ল ইখলাছহীনতা এবং আখলাকহীনতা। শয়তান যখন তাদের দ্বীনের পোষাক খুলতে পারেনি, তখন ইখলাছ আর আখলাকের ছিদ্র দিয়ে ঈমান ছিনতাইয়ের সুযোগ গ্রহণ করেছে। সরাসরি ঈমান হরণ করতে না পেরে বান্দার আখলাকী বর্মে আঘাত হেনে সঙ্গোপনে ঈমান হরণের আয়োজন করেছে। আর শয়তানের এই সূক্ষ্ম ফাঁদগুলো এমনই ধ্বংসাত্মক যে, যা থেকে নিজেকে রক্ষা করা তরুণদের জন্য যেন এক কঠিনতম যুদ্ধের শামিল। বাহ্যিক লেবাস-পোষাক, এমনকি ইলম ও আমলের প্রাচুর্য দিয়েও তা যেন ঠেকানো যাচ্ছে না। প্রাণান্ত চেষ্টা করতে করতে একসময় তারা রণে ভঙ্গ দিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে। দ্বীনদারিতা, আল্লাহভীতি, জীবনের মহৎ লক্ষ্য, আখেরাতে মুক্তির তীব্র ইচ্ছা কোন কিছুই তাকে আগলে রাখতে পারছে না। নিমিষে হারিয়ে যাচ্ছে ঈমানী বস্তুবাদের চোরাস্রোতে। তরুণ সমাজের এই আখলাকী নৈরাজ্যের চিত্রগুলো দিনে দিনে ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর হচ্ছে। নিম্নে তার কিছু চিত্র তুলে ধরা হ’ল।

(ক) ভাইরাল হওয়ার আকাঙ্খা : বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে পরিচিতি পাওয়াটা খুব সহজ। সেজন্য ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক যেকোনভাবে ভাইরাল হওয়ার নেশা তরুণদের মধ্যে উন্মাদনা ছড়িয়েছে। মাল ও মর্যাদার লোভ এর সাথে যুক্ত হয়ে পুরো পরিবেশটা এখন ইখলাছ ও আত্মমর্যাদাহীন প্রদর্শনীতে গম গম করছে। যে যা নয়, তার চেয়ে বেশী প্রদর্শনের ইচ্ছা ও চেষ্টা আর কথায় কথায় আমিত্বের প্রতিষ্ঠার বিপুল আগ্রহ নিয়ে আত্মপ্রচারের ফুলঝুরি চলছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে। পড়াশোনা কিছু দূর যেতে না যেতেই শায়খ, মুফতী বনে যাওয়া বকওয়াস তরুণদের ভিড়ে প্রকৃত আলেমদের খুঁজে পাওয়া এখন ভীষণ দুষ্কর। রাসূল (ছাঃ) ইখলাছহীন লোক দেখানো আমলকারীদের হুঁশিয়ার করে বলেন, إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ الشَّرْكُ الْأَصْغَرُ قَالُوا : وَمَا الشَّرْكُ الْأَصْغَرُ يَا رَسُولَ اللَّهِ ؟ قَالَ : الرِّيَاءُ তোমাদের জন্য সবচেয়ে যে বিষয়টি ভয় করি তা হ’ল ছোট শিরক। ছাহাবীরা জিজ্ঞাসা করলেন, ছোট শিরক কী? জবাবে রাসূল (ছাঃ) বললেন, রিয়া বা লোক দেখানো আমল’ (ছহীহুল জামে’ হা/১৫৫৫)।

(খ) মাল ও মর্যাদার লিপ্সা: তরুণদের মধ্যে এই দু’টি রোগ এখন সবার শীর্ষে। দ্বীনের কাজে নেমে অর্থলিপ্সা, যশ-খ্যাতি আর পদ-পদবীর পিছনে ছোটার এই নেশা তরুণদের আমল-আখলাকের মধ্যে এক বিশাল নৈরাজ্য তৈরী করেছে। দাওয়াতী ময়দান এখন যেন আর দ্বীনের দাওয়াতের কেন্দ্র নয়, বরং ব্যবসাকেন্দ্র। পুঁজিবাদী, বস্তুবাদী সমাজের মত এখানেও যে যার মত নিজের দর বাড়াতে হাযারো অসুন্দর, অসৎ কৌশল ও ধোঁকাবাজির আশ্রয় নিচ্ছে। দ্বীনদারিতা এখানে কেবল মুখোশ। ‘আল্লাহ কবুল করুন’-এর মত আল্লাহ্র সন্তুষ্টির আলাপও এখানে কেবলই মুখের বুলি। দিন শেষে মাল ও মর্যাদার গোপন প্রতিযোগিতাই সবকিছু। এ এক অন্তহীন নেশাগ্রস্ত পথ, যার পিছনে ছোটা মানুষটা শেষ পর্যন্ত জানে না, তার গন্তব্য কোথায়। ইন্নালিল্লাহ! রাসূল (ছাঃ) বোধহয় এজন্যই মুসলিম উম্মাহকে বার বার সতর্ক করেছেন, إن أخْوَفُ ما أخاف عليكم الرياء والشهوة الخفية ‘তোমাদের উপর আমার সবচেয়ে অধিক যে জিনিসের ভয় হয়, তা হ’ল লোক দেখানো আমল ও গোপন কুপ্রবৃত্তি’ (সিলসিলা ছহীহাহ হা/৫০৮)। রাসূল (ছাঃ) স্পষ্ট হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন, مَا ذِئْبَانِ جَائِعَانِ أُرْسِلَا فِي غَنَمٍ، بِأَفْسَدَ لَهَا مِنْ حِرْصِ الْمَرْءِ عَلَى الْمَالِ وَالشَّرَفِ لِدِينِهِ ‘দু’টি ক্ষুধার্ত নেকড়ে বাঘকে ছাগলের পালে ছেড়ে দেয়া হ’লে তা যতটুকু না ক্ষতিসাধন করে, কারো সম্পদ ও ক্ষমতার লোভ এর চেয়ে বেশী ক্ষতিসাধন করে তার ধর্ম ও ধার্মিকতায়’ (তিরমিযী হা/২৩৭৬)।

(গ) স্বার্থবাদিতা: মাল-মর্যাদার লোভের সাথে স্বার্থদুষ্টতা তরুণদের আখলাকী নৈরাজ্যে এনেছে এক নতুন মাত্রা। কবির ভাষায়- ‘কথায় সবাই সবার, স্বার্থে যে যার’। ভদ্রবেশী এই স্বার্থদুষ্টদের কাছে নিজের স্বার্থটাই সবকিছু। সামান্য স্বার্থহানিতে তাদের ঈমান টলটলায়মান। নিজের ব্যক্তিস্বার্থে জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিতে তারা এক মুহূর্ত দেরী করে না। নিজের দীর্ঘ লালিত নৈতিক অবস্থান ও আদর্শকে সামান্য স্বার্থের বিনিময়ে এক লহমায় বিলিয়ে দিতে তারা বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করে না। যে কোন মূল্যে স্বার্থ উদ্ধারই তাদের প্রধান লক্ষ্য। নিজের স্বার্থ ধরে রাখতে সমাজে বিভেদের দুয়ার খুলতেও তাদের বিন্দুমাত্র বাধে না। এতে যদি সমস্ত দুনিয়াও ধ্বংস হয়ে যায়, তাতে তাদের যায়-আসে না। মুসলিম উম্মাহ ও সমাজের প্রতি দায়-দায়িত্বহীন এই মানুষগুলো আপাত ধার্মিক হ’লেও প্রচণ্ড রকম আত্মকেন্দ্রিক, নিষ্ঠুর এবং হৃদয়হীন। স্বার্থের জন্য হেন কিছু নেই, যা তারা করতে পারে না। এমন কিছু নেই, যা বলতে পারে না। এমন কোথাও নেই, যেখানে যেতে পারে না। যত নীচেই নামা লাগুক, তারা দ্বিধাবোধ করে না। মুহূর্তেই বন্ধুকে শত্রু, শত্রুকে বন্ধু বানাতে তারা নিত্য সিদ্ধহস্ত। নীতি-আদর্শের কোন মূল্য তাদের কাছে নেই। স্বার্থের কাছেই বন্দী তাদের বিবেক, বিদ্যা-বুদ্ধি।

(ঘ) মুনাফিকী: ঈমানদারিতার ও ঈমানহীনতার মাঝামাঝি অবস্থান হ’ল মুনাফিকীর। বিশ্বাসগত মুনাফিক এ যুগে না থাকলেও আমলগত মুনাফিকে গিজ গিজ করছে সমাজ। কারো প্রতি বিশ্বাস, আস্থা রাখার যেন উপায় নেই। শয়তানী ফেরেবে পড়ে মুহূর্তে মুহূর্তে মানুষগুলো যেন ঈমান হারাচ্ছে। টাকা-পয়সার নয়-ছয়, দুর্নীতি, জালিয়াতি তাদের হাতের মোয়া। তাদের কথার সাথে কাজের কোন মিল নেই। মুখের সুন্দর কথা ও আচরণের সাথে বাস্তব জীবনের যোজন যোজন তফাৎ। এদের উদ্দেশ্যেই রাসূল (ছাঃ) ছাহাবীদেরকে বলেছিলেন, ‘এমন একদল মানুষের তোমাদের পর আসবে যারা মানত/অঙ্গিকার করবে কিন্তু পূরণ করবে না; খেয়ানত করবে, আমানতদার হবে না; তারা (মিথ্যা) সাক্ষ্য দেবে অথচ তাদের সাক্ষ্য চাওয়া হবে না। আর তাদের মাঝে মেদওয়ালা লোক বাড়বে তথা আরাম, বিলাসিতা প্রকাশ পাবে’ (বুখারী হা/৬৬৯৫)।

(ঙ) হিংসা ও অহংকার: সাধারণ নিরহংকারভাব তরুণটি ভাইটির হাসিমুখ নিমিষেই পরিবর্তন হয়ে যায়, যখন তার স্বার্থের ন্যূনতম ব্যাঘাত ঘটে। একটু টোকা দিলে প্রশস্ত অন্তরের মানুষটা অহংকারে হঠাৎ স্ফীত হয়ে ওঠে। হিংসায় জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়ে তার অন্তরটা ভীষণ রকম কুঞ্চিত ও সংকীর্ণ হয়ে আসে। এই দৃশ্য এখন দ্বীনদার ভাইদের মধ্যে অতীব সাধারণ। অথচ আমরা সবাই জানি অহংকার, হিংসার মত অপছন্দনীয় আর অপবিত্র কাজ আল্লাহর কাছে আর দ্বিতীয়টি নেই। তবুও আমরা নির্বিকারচিত্তে এই আচরণ করে যাচ্ছি। এতটুকু ভাবারও প্রয়োজন বোধ করছি না। পবিত্র কুরআনের সূরা আন’আমের ১২৫ নং আয়াতটি বড়ই ভাবায় যে, দ্বীনের প্রভাবটা আমাদের অন্তরে আসলে কতটুকু বিরাজ করছে? নতুবা আমাদের আখলাক এতটা বিদ্বেষপূর্ণ আর অহংকারে ভরপুর হয় কিভাবে? আল্লাহ বলেন, আল্লাহ কাউকে সৎপথে পরিচালিত করার ইচ্ছা করলে, তিনি তার হৃদয়কে ইসলামের জন্য প্রশস্ত করে দেন এবং কাউকে বিপথগামী করার ইচ্ছা করলে তিনি তাদের হৃদয়কে অতিশয় সংকীর্ণ করে দেন, যেন সে (খুব কষ্ট করে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায়) আকাশে আরোহণ করছে। অর্থাৎ তার কাছে তখন ইসলামের অনুসরণ আকাশে আরোহণের মতই দুঃসাধ্য মনে হয়’। হ্যাঁ, অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে আপোষহীন অবস্থান থাকবে। অসৎ ব্যক্তিদের প্রতি স্বভাবজাত দূরত্ববোধ থাকবে। কিন্তু সেটা যখন হিংসা ও অহংকারের রূপ পরিগ্রহ করে, তখন তাকে আখলাকী অধঃপতন ছাড়া কি বলা যায়!

(চ) পণ্ডিতমন্যতা: জ্ঞান-বিজ্ঞানের সহজলভ্যতা এখন বহু তরুণকে অকাল পণ্ডিত বানিয়ে ফেলেছে। যাকে তাকে কাফির, বিদ’আতী, মুশরিক আখ্যা দেয়ায় সিদ্ধহস্ত এই পণ্ডিতমন্য সদ্য তরুণদের দাপটে থরহরিকম্প এখনকার সোশ্যাল মিডিয়া। এদের পাণ্ডিত্যের দাপট ও কথাবার্তার ভাবসাব এমনই যে, তাদের দেখে মনে হয় তারা সবজান্তা সমশের কিংবা মুসলিম উম্মাহর মহান রক্ষাকর্তা। যদিও শিক্ষা-দিক্ষায় তাদের অবস্থান খুবই নগণ্য। বড়দের প্রতি এদের ন্যূনতম সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ নেই। নির্দিষ্ট কিছু অনুসৃত ব্যক্তি ছাড়া কাউকে গোনায় ধরে না। কথায় কথায় বিজ্ঞ আলেম-ওলামাদের ছোট-বড় ভুলগুলোকে অপমানজনকভাবে রদ করা এবং কুরুচিপূর্ণ ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ ভাষায় মুসলিম জামা’আত থেকে খারিজ করা এদের নিত্যকর্ম। মুখের ভাষা ও আখলাকে তারা এতটাই অবিনয়ী, উদ্ধত, হিংসুক, অহংকারী, ঝগড়াটে এবং কুটতর্কপ্রিয়, যা একজন দাঈ-র কাছে কোন অবস্থাতেই কাম্য নয়। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতিমধ্যে এই অতি সালাফী গোষ্ঠীটিকে ‘জামাআতুত তাখরীজ’ (মানহাজ থেকে খারিজকারী দল) বা ‘জামাআতুত তাহযীর’ (আলেমদের সম্পর্কে সতর্ককারী দল) হিসাবে আখ্যা দেয়া হয়েছে। উগ্র আচার-আচরণে তারা চরমপন্থীদের চেয়ে কোন অংশে কম নয়।

কথায় কথায় মানহাজ গেল রব তোলা, নাম ধরে অমুক-তমুকের কাছে ইলম নেওয়া যাবে না- ঘোষণা করা, মানুষের দোষ-ত্রুটি জোর করে খুঁজে বের করে তাদেরকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, পাণ্ডিত্য জাহির করতে বিশেষ বিশেষ আরব আলেমদের উদ্ধৃতি পেশ করা, ‘কিবারুল উলামা’দেরকে আকাবির-বুযুর্গদের মত নির্ভুল ইমামতের আসনে বসিয়ে দিয়ে অন্যদেরকে তুচ্ছ করা, অপমানজনক উপাধি দিয়ে উপহাস করা ইত্যাদিকে তারা ইসলামের মহান খেদমত মনে করে। এদের সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ)-এর একটি হাদীছ খুবই প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন, ‘আমি আমার উম্মতের উপর জিহ্বার জ্ঞানী ( علিম اللسان) তথা বাগ্মী মুনাফিকদেরকে অধিক ভয় করি’ (সিলসিলা ছহীহাহ হা/১০১৩)। তাবেঈ আহনাফ বলেন, আমি ওমর (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি আমরা আলোচনা করতাম যে, মুখের (জিহ্বার) জ্ঞানী বা বাগ্মী মুনাফিকরা এই উম্মতকে ধ্বংস করে দিবে’ (মুসনাদুল ফারূক ২/৬৬১)।

এই ঘরবন্দী পণ্ডিতমন্যরা সাধারণতঃ ময়দানে আসে না। সমাজের কোন উপকারে তেমন আসে না। তারা দায়িত্ব নিতে ভয় পায়। ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করে। কোন সংগঠন বা ফোরামের সাথে যুক্ত হয় না; বরং বিচ্ছিন্নভাবে নিজের মত থাকতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। এজন্য জামা’আতবদ্ধ না হওয়ার ফৎওয়া তাদের জন্য প্রেসার রিলিজ তথা চাপমুক্তির কারণ হয়েছে। এক ধরনের অপরাধবোধ থেকেও তাদেরকে মুক্তি দিয়েছে। সুযোগ করে দিয়েছে রোমান্টিক প্রেমিকের মত সকলকে বাছবিচারহীন ভালবাসার বিমল অনুভূতি নিয়ে স্বাধীনভাবে চলার। যদিও বাস্তবে তাদের এই ভালোবাসার বাতচিৎ একেবারেই সত্য নয় বরং বৃত্তবন্দী।

তরুণদের এই আখলাকী নৈরাজ্যের বাস্তবতা তুলে ধরার পিছনে উদ্দেশ্য এটাই যে, আমাদের তরুণদের বুঝতে হবে যে, প্রকৃত মুসলিমের জন্য ছহীহ আক্বীদা ও আমলই যথেষ্ট নয়, বরং সমানভাবে আখলাকী উন্নয়নও যরূরী। যদি সেটা করতে না পারি, তবে বুঝতে হবে আমাদের শুদ্ধ আক্বীদা, শুদ্ধ আমলের চর্চা কেবল বাহ্যিক। আমাদের অন্তরে তার কোন প্রভাব নেই। আমাদের চরিত্রে তার কোন প্রতিফলন নেই।

মনে রাখতে হবে, মুসলিম উম্মাহর বর্তমান দুর্দশার মূলে কাজ করছে প্রথমতঃ ঈমানী দুর্বলতা। দ্বিতীয়তঃ জ্ঞানের স্বল্পতা। ঈমানী দুর্বলতা এমনই বিষয় যে, কেবল জ্ঞানার্জন করলেই তা দূর করা যায় না। যেমনভাবে ইহুদী-খৃষ্টানরা তাওরাত-ইঞ্জীল পড়ত, কিন্তু তারা ঈমানের উপর টিকে থাকতে পারে নি। আবার জ্ঞান বলতে কেবল পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞানই বুঝায় না। নতুবা আজকের এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে জ্ঞানের স্বল্পতাকে কোন অজুহাত পেশ করা যায় না। আবার কুরআন বা হাদীছ পাঠ করতে জানলেই জ্ঞানী হওয়া যায় না; নতুবা আরবী ভাষাভাষীরা সবচেয়ে বড় জ্ঞানী হ’ত, আবার বাতিল ফেরকার আলেমরা জ্ঞানার্জনের পরও পথভ্রষ্ট হ’ত না। এজন্য রাসূল (ছাঃ) একশ্রেণীর পথভ্রষ্ট ব্যক্তি সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী করেছেন যারা জ্ঞানী হওয়ার পরও সুপথপ্রপ্ত নয়। তিনি বলেন, ‘তারা শ্রুতিমধুর কণ্ঠে কুরআন তেলাওয়াত করবে, কিন্তু আল্লাহর বাণী তাদের গলা দিয়ে নামবে না তথা অন্তরে প্রবেশ করবে না। তারা দ্বীন থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে, যেমনভাবে তীর লক্ষ্যবস্তু ভেদ করে বেরিয়ে যায়’ (বুখারী হা/৪৩৫১)।

সুতরাং কাংখিত সেই ঈমান ও ইলম হ’ল যা অন্তরে পৌঁছায়, যা অন্তর দিয়ে ধারণ করা যায় এবং হৃদয় দিয়ে অনুশীলন করা যায়। যে ঈমান ও আমলের সাথে অন্তরের সম্পর্ক নেই, তা কখনই প্রকৃত ঈমান ও ইলম নয়। সুতরাং এই অবস্থা থেকে উত্তরণে আমাদেরকে যেমন ঈমানের দুর্বলতা দূর করতে হবে, তেমনি বিশুদ্ধ জ্ঞানার্জনের জন্য তাক্বওয়া, ইখলাছ ও আত্মশুদ্ধির প্রশিক্ষণে ব্রতী হ’তে হবে। পাশাপাশি আখলাকের প্রশিক্ষণের জন্য অন্ততঃ দু’টি বিষয়ের চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। যথা:

(ক) সততা : সততা আমরা কমবেশী বজায় রাখার চেষ্টা করি বটে, তবে কেবল চেষ্টাই যথেষ্ট নয়। কেননা পরিচ্ছন্ন অন্তর ও আখলাকী পূর্ণতা অর্জন করার জন্য যেটা প্রয়োজন- কথায় ও চিন্তায় শতভাগ সৎ থাকার সংগ্রাম। মিথ্যা ও প্রতারণার সংশ্লেষ থেকে নিজেকে সর্বতোভাবে দূরে রাখার প্রতিজ্ঞা। ভোগের লালসা ও মানুষের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্খা থেকেই অসততা ও দুর্নীতিপরায়ণতা তৈরী হয়। কেবল আল্লাহভীতি এবং সততার নিরন্তর চর্চার মধ্য দিয়েই এই প্রবণতা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্য-সঠিক কথা বল, তাহলে তিনি তোমাদের কাজ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহাসাফল্য লাভ করবে’ (আহযাব ৩৩/৭০-৭১)।

(খ) আমানতদারিতা : সততার সাথে সাথে আমানতদারিতার চর্চাও অত্যন্ত যরূরী। আমানতদারিতা খেয়ানতের বিপরীত। মুনাফিকী ও দ্বিচারিতার বিপরীত। প্রগাঢ় দায়িত্ববোধ, কর্তব্যনিষ্ঠা, বিশ্বস্ততা, আস্থাভাজন হওয়ার মধ্যেই তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এটা এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বোধ ও কর্মনীতি, যেখান থেকে তৈরী হয় চারিত্রিক সততা, দৃঢ়তা, ধৈর্য, উদারতা, পরমতসহিষ্ণুতা, অহিংসা, অন্যের ক্ষতি করা থেকে মুক্ত থাকা প্রভৃতি মৌলিক সৎগুণ। এজন্য রাসূল (ছাঃ) এমন কোন খুৎবা ছিল না যেখানে বলতেন না, ‘যার আমানতদারিতা নেই, তার ঈমান নেই এবং যার ওয়াদা-অঙ্গীকারের মূল্য নেই তার দ্বীনও নেই’ (আহমাদ, ছহীহুত তারগীব হা/৩০০৪)।

প্রিয় পাঠক! মানুষের মনুষ্যত্বের অধঃপতন এবং আখলাকী বিচ্যুতি শুরু হয় সততা ও আমানতদারিতায় ক্ষান্তি ঘটার মাধ্যমে। সততার যোগ যেমন নিজের সাথে, আমানতদারিতার যোগ তেমন অপরের সাথে। রাসূল (ছাঃ) নবুওতলাভের পূর্বেও বিশেষভাবে এদু’টি মৌলিক মানবীয় গুণের জন্য প্রশংসিত ছিলেন। বর্তমান প্রজন্ম জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগিয়ে গেলেও মনুষ্যত্বের প্রতিযোগিতায় চরমভাবে পিছিয়ে পড়ছে। বস্তুবাদী ফেৎনার প্লাবন এবং নৈতিক ও আদর্শিক অবক্ষয় তাদেরকে নাবিকহারা নৌকার মত দিগ্বিদিকশূন্য করে দিয়েছে। সেজন্য এই যুগে নিজেকে লক্ষ্যপথে ধরে রাখতে ব্যক্তিজীবনে যেমন ঈমান ও ইলমের চর্চা প্রয়োজন, তাক্বওয়া ও ইখলাছের চর্চা প্রয়োজন, তেমনি সামাজিক জীবনে প্রয়োজন সততা ও আমানতদারিতার কঠোর অনুশীলনের। তাকওয়া ও ইখলাছের পথ ধরেই ঈমান ও ইলমের শুদ্ধিতা আসে। আর সততা ও আমানতদারিতার ধারাবাহিক চর্চার মধ্য দিয়ে আখলাকী শুদ্ধতা স্থায়িত্ব লাভ করে। প্রতি মুহূর্তে এই দুইয়ের চর্চা আমাদের হৃদয়জগতকে পরিচ্ছন্ন, প্রশান্ত, আলোকিত, অমলিন ও অবিচল রাখে।

মুমিনের জিহাদ মূলতঃ রাজনৈতিক নয়, বরং আদর্শিক ও নৈতিক। এই জিহাদ যত না মানবশত্রুর বিরুদ্ধে; তার চেয়ে অনেক বেশী অন্তরশত্রুর বিরুদ্ধে। এই জিহাদই মুক্তির পথ। কলবে সালীম তথা বিশুদ্ধ চিত্ত অর্জনের পথ। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে হাযারো ফেৎনার জাল ছড়িয়ে শয়তান আমাদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। শক্তহাতে সততা ও আমানতদারিতার ঢাল ধরে রেখে এই সকল চ্যালেঞ্জকে মুকাবিলা করতে হয়। অতএব শিরক ও বিদ’আত থেকে নিবৃত থেকে ঈমান ও আমলের শুদ্ধতা করা যেমন যরূরী, তদ্রুপই যরূরী রাসূল (ছাঃ)-এর চরিত্রে চরিত্রবান হয়ে আখলাকী শুদ্ধতা অর্জন করা। দুনিয়াবী যাবতীয় ফেৎনা থেকে মুক্ত থাকতে এবং আল্লাহর দেখানো পথে পবিত্র জীবন পরিচালনা করতে এর কোনই বিকল্প নেই। আল্লাহ আমাদেরকে ঈমানের পথে ইখলাছ ও ইস্তিকামাতের সাথে কায়েম ও দায়েম থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন!

📘 তারুণ্যের আত্নপাঠ ও সমাজ চিন্তা 📄 হতাশার দহন থেকে মুক্তি

📄 হতাশার দহন থেকে মুক্তি


ব্যক্তিগত অপারগতা ও অজ্ঞতা; অপরদিকে সামাজিক অবিচার ও অনাচার- মূলতঃ এ দু’টি কারণ মানুষকে একদিকে যেমন জীবনযুদ্ধে অসহায় ও বিপন্ন করে তোলে, অন্যদিকে সমাজের বিরুদ্ধে করে তোলে বিক্ষুব্ধ ও বিদ্রোহী। আর এখান থেকেই ধীরে ধীরে পুঞ্জীভূত হয় হতাশা আর বেদনার এক অবিচ্ছেদ্য মেঘকাব্য। যা কখনও একাকিত্বের বেদনায় মুষড়ে পড়ে গুমরে গুমরে কাঁদে আবার কখনওবা ক্ষোভের বিজলী বর্ষণে অবিরল ধারায় ঝরে পড়ে। মানুষের এই জীবনগতি প্রায় সবার ক্ষেত্রে একই রকম। তবে মূল পার্থক্য ঘটে বোধের জায়গায় এবং নীতির প্রতি অবিচলতায়। যারা ঈমানদার তারা ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাসকে নিত্য সাথী করে সাধ্যমত আদর্শের পথে নিজেকে পরিচালনা করেন। কিন্তু যারা ঈমানহীন তারা প্রায়শই এই যুদ্ধের ময়দানে নিঃশর্ত আত্মসমার্পণ করে স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন। এই দ্বৈরথের মাঝে আবহমানকাল ধরে অতিক্রান্ত হচ্ছে মানব সমাজের দৈনন্দিন জীবনাচার।

বাংলাদেশ সহ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বস্তুগত উন্নয়নের জোয়ার ক্রমবর্ধমান হ’লেও মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে Depression বা হতাশার বিস্তার কিন্তু ধীরে ধীরে বাড়ছে। কারণ আধুনিক বস্তুবাদী দুনিয়ায় মিডিয়া ও মার্কেটিং-এর সীমাহীন Hype-এ মানুষের ব্যক্তিগত প্রত্যাশার জায়গা যেই উত্তুঙ্গ হারে বাড়ছে, প্রাপ্তির জায়গা নিঃসন্দেহে সেই হারে বাড়ছে না। ফলে মানুষ দ্রুতই নিজেকে প্রতিযোগিতার ময়দানে পরাজিত এবং পশ্চাদপদ ভেবে হতোদ্যম হয়ে পড়ছে। একটা সময় হতাশার গ্রাস থেকে নিজেকে আর বের করে আনতে পারছে না। ফলে অধিকাংশ সময় নেতিবাচক সিদ্ধান্তেই সে মুক্তি খুঁজে পেতে চাচ্ছে। কেউ ক্ষণিকের মিথ্যা সুখের জন্য বেছে নিচ্ছে অনৈতিক সিদ্ধান্ত কিংবা মাদকের মত নীল দংশন। কেউবা চূড়ান্ত পর্যায়ে বেছে নিচ্ছে আত্মহননের পথ।

বাংলাদেশে কিছু আত্মহত্যার ঘটনা সবাইকে নাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে ২০২২ সালে ঢাকার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী আবু মুহসিন খান (৫৮)-এর ফেসবুক লাইভে এসে আত্মহত্যা এবং তৎপূর্ববর্তী বক্তব্যসমূহ যথেষ্ট ভাবনার খোরাক যুগিয়েছে সবাইকে। ফুটিয়ে তুলেছে দৃশ্যত চাকচিক্যপূর্ণ বর্তমান সমাজব্যবস্থার ভয়াবহ ফাঁপা দিকগুলো। জনাব আবু মুহসিনের কিছু কথা এতটাই বাস্তব ও রূঢ় সত্য, যা আমাদের সমাজ জেনেশুনেই চেপে রাখছে। যেমন- প্রথমতঃ এখান থেকে স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছে যে, মানুষ একে অপরের প্রতি দায়িত্ববোধ দিন দিন ভুলে যাচ্ছে এবং সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। শিথিল হচ্ছে পারিবারিক বন্ধন। মানুষ হয়ে পড়ছে নিঃসঙ্গ। সবকিছু থেকেও না থাকার বেদনায় জীবনে বেঁচে থাকা অর্থহীন হয়ে উঠছে অনেকের জন্যই।

পাশ্চাত্যের প্রচারণায় প্রলুব্ধ সমাজ এখন সন্তান গ্রহণে আগ্রহী নয়। ছেলে হোক, মেয়ে হোক দু’টি সন্তানই যথেষ্ট-এই শ্লোগান ছিল বাংলাদেশে আশির দশকের। আর বিংশ শতাব্দীর শ্লোগান হ’ল- ‘দু’টি সন্তানের বেশী নয়, একটি হ’লে ভালো হয়’। এমনকি ২০১২ সালে এক সন্তান নীতি গ্রহণের জন্যও প্রস্তাব উঠেছিল। এই প্রচারণার সামাজিক ক্ষতি হ’ল মানুষ এখন সন্তান নিতে এমন অনাগ্রহী হয়ে উঠেছে যে, দুইয়ের বেশী সন্তান বর্তমানে খুব কম সংখ্যক পরিবারেই রয়েছে। এই দু’একটি সন্তান আবার যখন বড় হচ্ছে খুব স্বাভাবিকভাবেই পড়াশোনা কিংবা জীবিকার তাগিদে তারা পিতা-মাতা থেকে দূর-দূরান্তে চলে যাচ্ছে। তারপর বছরে হয়তো এক-দু’বার ঈদ কিংবা বার্ষিক ছুটিতে তাদের সাথে পিতা-মাতার দেখা হয়। আর যারা বিদেশে চলে যায়, তাদের সাথে এই ব্যবধানটা আরো দীর্ঘ হয়। কখনো কয়েক বছর চলে যায়।

আর এভাবে সন্তানের অনুপস্থিতিতে একসময় প্রৌঢ়ত্বে উপনীত হওয়া পিতা-মাতা ভুগতে থাকেন নিঃসঙ্গতায়। একাকিত্বের প্রহরগুলো তাদের জন্য হয়ে ওঠে চরম যন্ত্রণার। ইন্টারনেটের বদৌলতে যোগাযোগব্যবস্থা সহজলভ্য হ’লেও কৃত্রিমতার আবরণ ছেদ করে সেই যোগাযোগ কখনও সন্তানকে পাশে পাওয়ার বিকল্প হয় না। হাযারো মানুষের ভিড়ে প্রিয়জনকে খুঁজে পেতে তাদের অব্যক্ত হৃদয় সদা ব্যাকুল থাকে।

ফলে বাহ্যতঃ সন্তানরা কে কোন দেশে থাকে বা কোথায় বড় বড় চাকুরী করে, তা নিয়ে পিতা-মাতার গর্বভরা কণ্ঠের আড়ালে যে দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে থাকে, তা অদেখাই থেকে যায়। মুখোশের আড়ালে থেকে যায় বেদনার এক অশ্রুঝরা ব্যথাতুর উপাখ্যান। এভাবে আমাদের সামাজিক সম্পর্কগুলো যেমন নড়বড়ে হচ্ছে, তেমনি আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম বেড়ে উঠছে গুরুজনদের নিবিড় স্নেহ-ভালোবাসার পবিত্র বন্ধন থেকে বঞ্চিত এক কুপমুণ্ডক পরিবেশে। এভাবে পাশ্চাত্যের মত আমাদের সামাজিক সম্পর্কগুলো শিথিল হচ্ছে। আর বিচ্ছিন্নতা ও একাকিত্বের ঘেরাটোপে বাধা পড়ছে আমাদের পৌঢ় জীবন।

অর্থ-বিত্তের ঝনঝনানি আর সামাজিক স্ট্যাটাস যে কখনই মানুষকে প্রকৃত শান্তি দিতে পারে না তার বাস্তব উদাহরণ আবু মুহসিন। তার আর্তনাদ- একা থাকা যে কী কষ্ট-যারা একা থাকেন তারাই একমাত্র বলতে পারেন বা বোঝেন। এই আর্তনাদ কেবল আবু মুহসিনের নয়, বরং বর্তমান আধুনিক ও শিক্ষিত সমাজের ঘরে ঘরে কান পাতলে আজ এই আর্তনাদ শোনা যায়। আগামীতে হয়তো আরো শোনা যাবে। যদি না তথাকথিত জনসংখ্যা বৃদ্ধির আশংকায় সন্তান গ্রহণকে নিরুৎসাহিত করার প্রকৃতিবিরুদ্ধ সিদ্ধান্ত থেকে আমরা সরে না আসি।

আশার কথা যে, চীন, জাপানসহ ইউরোপীয় দেশগুলো ইতিমধ্যে এই নীতির সামাজিক অপকারিতা বুঝতে পেরে পিছু হটেছে এবং জনসংখ্যাকে জনশক্তি হিসাবে বিবেচনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে আমাদের দেশের সরকারেরও কিছুটা বোধোদয় ঘটেছে এবং জনসংখ্যাকে জাতীয় দুর্যোগ হিসাবে প্রচারের হঠকারিতাও কমিয়ে দিয়েছে। মূলতঃ আল্লাহ্র আইন বিরোধী কোন পদক্ষেপই সমাজে প্রকৃত শান্তি আনতে পারে না। এই বোধ যত জাগ্রত হবে, ততই আমরা ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণের পথে ধাবিত হ’তে পারব ইনশাআল্লাহ।

এই সামাজিক অবক্ষয়ের অপর এক চিত্র আমরা দেখেছি গত ১০ই ফেব্রুয়ারী’২২ রাজধানীর বাড্ডাতে। এক হতভাগ্য পিতা তার ছোট সন্তানকে প্রায় সব সম্পত্তি লিখে দেয়ার পরও তার হাতে নিয়মিত শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত মারা গেছেন। এতেই শেষ হয়নি। সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে দুই সন্তানের বিবাদ-কাটাকাটিতে পিতার লাশ ২৪ ঘন্টা বাড়ির গ্যারেজে পড়ে ছিল। পরে পুলিশ এসে লাশ দাফনের ব্যবস্থা করে। দ্বীন শিক্ষার অভাব ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সঠিক চর্চা না থাকায় মানুষ কিভাবে পশুর চেয়েও অধমে পরিণত হয়, তার একটি ক্ষুদ্র উদাহরণ এই ঘটনা। সামান্য সম্পত্তির লোভে পরিবারগুলোতে জ্বলছে তুষের আগুন। ভাঙছে ভাই-বোনের সম্পর্ক, দূরত্ব তৈরী হচ্ছে পিতা-মাতার সাথে সন্তানের, নিত্য কলহ চলছে প্রতিবেশীদের মধ্যে। দ্বীনদারী আর সব জায়গায় থাকলেও সহায়-সম্পত্তির আগ্রাসী লোভ তাদের খেয়ে ফেলছে নেকড়ের মত। হিংস্র পশুর চেয়ে তারা ভয়ংকর হয়ে উঠছে সময়ে সময়ে।

দ্বিতীয়তঃ সমাজে ধর্মীয় জ্ঞানের অপপ্রয়োগও প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে এখানে। একজন ব্যক্তি যখন একই সাথে কালেমা পাঠ করে, এমনকি ওমরায় পরিহিত ইহরামের কাপড় দিয়ে কাফন দেয়ার জন্য অছিয়ত করে, আবার দ্বিধাহীন চিত্তে আত্মহননের মত মহাপাপ করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে- এখানে তার অভাবটা কিসের? আল্লাহ্ উপর বিশ্বাস বা ভরসার দুর্বলতা না-কি দ্বীন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের? মানুষ হিসাবে প্রত্যেকের জীবনে কঠিন মুহূর্ত আসতেই পারে, কিন্তু ঈমানদারদের জন্য সেটা কাটিয়ে ওঠা বিশেষ কষ্টসাধ্য নয় যদি আল্লাহ্র উপর তার পূর্ণ বিশ্বাস ও ভরসা থাকে। তাছাড়া প্রকৃতপক্ষে যারা দ্বীন বোঝেন, যাদের জীবনটা আল্লাহ্র সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত, তারা কখনও এমন অবসর খুঁজে পান না যে, একাকিত্বের বেদনায় জীবনটাকে অকেজো করে তুলবেন। বরং এই নিঃসঙ্গ সময়কে তারা আল্লাহ্ ইবাদতে নিবিষ্ট থাকার মোক্ষম উপলক্ষ হিসাবে নেন। দুনিয়াবী ব্যস্ততা থেকে মুক্ত থেকে আল্লাহ্র সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলার এই সুযোগকে বরং তারা উপহার মনে করে সানন্দেই গ্রহণ করেন। যারা মহান প্রভুর সাথে সম্পর্কের এই স্বাদ আস্বাদন করতে পারেনি, একাকী জীবন তাদের জন্য দুর্বিষহ হ’তে পারে, কিন্তু একজন প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তির নিকট তা মোটেই প্রত্যাশিত নয়। এই ঘটনায় বোঝা যায় যে, এদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্বীনের প্রতি যথেষ্ট ভালোবাসা রয়েছে, কিন্তু দ্বীন সম্পর্কে ভয়াবহ অজ্ঞতার কারণে অধিকাংশ মানুষ ডুবে আছে কুসংস্কার ও বিভ্রান্তির অতল তলে।

সর্বোপরি বর্তমান প্রেক্ষাপটে যে প্রশ্নটি বার বার আমাদের মনে ধাক্কা দিচ্ছে তা হ’ল, হাযারো ইতিবাচক দিক পেছনে ঠেলে অধিকাংশ মানুষ কেন নেতিবাচক সিদ্ধান্তকেই অগ্রাধিকার দেয়? কেন শত প্রাপ্তির মাঝেও নিজের অপ্রাপ্তিগুলোকেই বড় করে দেখে? কেন হতাশার প্রান্তসীমায় পৌঁছে অবশেষে নিজেকে নিঃশেষ করে দেয়ার মত চূড়ান্ত পরিকল্পনা পর্যন্ত করে? এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা কয়েকটি বিষয়কে সামনে আনতে পারি-

(১) আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাসের দুর্বলতা: যে ব্যক্তি তার সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস রাখে না বা আস্থা রাখে না; সে কখনই জীবনে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না ও সঠিক পথে পরিচালিত হ’তে পারে না। কেননা সে তার জীবনের মূল ভরকেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। নিঃশ্বাসে, বিশ্বাসে যার যোগ আল্লাহ্র সাথে, সঠিক পথের যাত্রী হওয়ার নছীব কেবল তারই হয় (আলে ইমরান ৩/১০১)।

(২) জীবনের মূল্য সম্পর্কে অজ্ঞতা: মানুষকে আল্লাহ খুব সংক্ষিপ্ত একটি সময় দিয়েছেন তাকে পরীক্ষা করার জন্য। একজন পরীক্ষার্থী যেমন তার পরীক্ষার মূল্য বুঝে বলে পরীক্ষার হ’লে ভালো ফলাফলের জন্য প্রাণান্ত পরিশ্রম করে, শেষ সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করে; ঠিক তেমনি এই জীবন পরীক্ষার মূল্য সম্পর্কে জ্ঞাত ব্যক্তি পার্থিব জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে গুরুত্বপূর্ণ ভেবে পরকালীন সাফল্যের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়। শুরু কিংবা মধ্যটা খারাপ গেলেও শেষটা ভাল করার জন্য যারপরনেই ইচ্ছা তাকে ব্যতিব্যস্ত রাখে। কিন্তু যে ব্যক্তি অজ্ঞ, সে শিশু, পাগল কিংবা চতুষ্পদ জন্তুর মতই উদাসীন থেকে যায়। এই পরীক্ষার হল তার জন্য কেবল সময় পার করার স্থান ছাড়া কিছু নয়। জীবনের প্রকৃত মূল্য সে জানে না, অনুধাবনো করতে পারে না। তাই এর বিনাশ সাধনেও সে কুণ্ঠাবোধ করে না।

(৩) জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে অসচেতনতা: আল্লাহ্র দাসত্বকে যে জীবনের মূল লক্ষ্য বানাতে পারেনি, সে নিঃসন্দেহে লক্ষ্যহীন কিংবা ভুল লক্ষ্যপানে ছুটে চলা ব্যক্তি (যারিয়াত ৫১/৫৬)। সে আল্লাহ্র দাসত্বের মূল অংক মেলানো ভুলে গিয়ে সর্বদা ভুল অংক মেলাতে সচেষ্ট হয়। তারপর সহসা কোন অংক মেলাতে ব্যর্থ হ’লে খুব সহজেই সে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।

(৪) ধৈর্যের অভাব: পার্থিব জীবন আমাদের পরীক্ষার জীবন। যে কোন সময় যে কোন ধরনের পরীক্ষা আমাদের উপর নেমে আসবে। কখনও সে পরীক্ষা কঠিন থেকে কঠিনতর হবে, কিন্তু কোন অবস্থাতেই হাল ছেড়ে দেয়া মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। সর্বাবস্থায় সে আল্লাহ্র উপর ভরসা রাখবে এবং ধৈর্য সহকারে সুসময়ের জন্য অপেক্ষা করবে, এটাই ঈমানের দাবী। যারা এই ধৈর্যের নীতি অবলম্বন করে না, তারা অতি সহজেই হতাশাগ্রস্ত হয়ে ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়।

(৫) আত্মকেন্দ্রিকতা: আধুনিক সমাজব্যবস্থায় প্রত্যেক মানুষ স্বতন্ত্র সত্তা (Entity) হিসাবে বসবাস করতে চায়। অর্থাৎ যে যার মত স্বাধীনভাবে চলাফেরা করবে, কেউ কারো ব্যাপারে নাক গলাবে না- এটাই আধুনিক জগতের আদর্শিক মূলনীতি। ফলে একে অপরের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া এখানে যরূরী নয়। স্বার্থপরতা, অসামাজিকতা, আত্মকেন্দ্রিকতা এই সমাজব্যবস্থার আবশ্যিক অনুষঙ্গ। তাই একে অপরের অতি কাছে থেকেও তারা একেকজন যেন বসবাস করে অবরুদ্ধ জানালার ভেতরে। ফলে ফিতরাত বা প্রকৃতিবিরোধী এই সমাজ ব্যবস্থায় মানুষ সহজেই হতাশা ও বিষণ্ণতাগ্রস্ত হচ্ছে। ফিনল্যাণ্ড, জাপানের মত দেশগুলো বিপুল সম্পদশালী হওয়া সত্ত্বেও সেসব দেশে আত্মহত্যার উচ্চহার এ কথারই সাক্ষ্য দেয়।

মুক্তির পথ: এ অবস্থা থেকে উদ্ধার পেতে চাইলে করণীয় হ’ল-

প্রথমতঃ ইতিবাচক জীবন যাপন করা: মনে রাখতে হবে, মানুষের জীবন ভালো-মন্দ, সহজ-কঠিন, ইতি আর নেতির বিচিত্র সমাহার। জীবনে কখনো ভালো সময় আসবে, কখনও মন্দ সময় আসবে এটাই জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। অতএব একজন মুমিন ব্যক্তি সর্বদা মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে তার জীবন পরিচালনা করবে। এমনভাবে যে, আনন্দের সময় সে আত্মহারা হবে না, আবার দুঃখের সময় শোকে বিবেকহারা হয়ে পড়বে না। বরং জীবনের সকল অবস্থায় কৃতজ্ঞতা ও সহনশীলতার সমাহারে ভারসাম্য বজায় রাখবে। সবকিছুকে যথাসম্ভব ইতিবাচকভাবে নেবে। যেমন ওহুদ যুদ্ধের সাময়িক পরাজয়ে মুসলমানরা যেন অধিক শোকাকুল না হয়, সেজন্য তাদের মধ্যে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির উন্মেষ ঘটাতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সান্ত্বনা সূচক বক্তব্য, ‘তোমাদেরকে যদি আঘাত লেগে থাকে, অনুরূপ আঘাত (বদর যুদ্ধে) তো তাদেরও লেগেছে এবং মানুষের মধ্যে এ (বিপদের) দিনগুলিকে পর্যায়ক্রমে অদল-বদল করে থাকি’ (আলে ইমরান ৩/১৪০)। ঈমানদারের পরিচয় দিতে গিয়ে রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘মুমিনের অবস্থা বিস্ময়কর। সকল কাজই তার জন্য কল্যাণকর। মুমিন ছাড়া অন্য কেউ এ বৈশিষ্ট্য লাভ করতে পারে না। যখন তারা কল্যাণ ও মঙ্গলের মধ্যে থাকে, তখন সে শোকরগুযার থাকে। আর যখন অসচ্ছলতা কিংবা বিপদাপদে আক্রান্ত হয়, তখন সে ধৈর্যধারণ করে। ফলে প্রতিটি অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর হয়ে যায়’ (মুসলিম হা/৭৩৯০)।

দ্বিতীয়তঃ হতাশাকে প্রশ্রয় না দেয়া: আমাদের যাপিত জীবনে সুখ-দুঃখের সাথে হতাশার যোগ খুবই ওতপ্রোত। যে কোন অপ্রত্যাশিত কথায় ও কাজে কিংবা অপ্রাপ্তির বেদনায় আমাদের মধ্যে হতাশা আসতেই পারে। কিন্তু একজন বিশ্বাসী মানুষ তা নিজের মধ্যে জিইয়ে রাখতে পারে না। তার চেষ্টা থাকে যে কোন মূল্যে তা দূরীভূত করা কিংবা ভুলে যাওয়া। কেননা আল্লাহ্র বাণী হ’ল- ‘আল্লাহ্র রহমত থেকে নিরাশ হওয়া পথভ্রষ্ট লোকদের কাজ’ (হিজর ৫৬)। কুরআনে অন্যত্র এসেছে, তোমরা আল্লাহ্ অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই অবিশ্বাসীরা ব্যতীত কেউই আল্লাহ্ করুণা থেকে নিরাশ হয় না (ইউসুফ ১২/৮৭)। আল্লাহ বলেন, এই পৃথিবীতে কিংবা তোমাদের ব্যক্তিজীবনে যে সকল বিপদাপদ আসে, তা ঘটার আগেই আমি তা কিতাবে (তাকদীরে) লিপিবদ্ধ করে রেখেছি। নিশ্চয়ই এটা আল্লাহ্ পক্ষে খুব সহজ। এটা এজন্য যে, তোমরা যা হারিয়েছ তাতে যেন তোমরা বিমর্ষ না হও এবং যা তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন তার জন্য আনন্দে উদ্বেলিত না হও। নিশ্চয়ই আল্লাহ পসন্দ করেন না কোন উদ্ধত-অহংকারীকে (হাদীদ ৫৭/২২-২৩)। সর্বাবস্থায় আল্লাহ্র সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকাই ঈমানদারের পরিচয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘সে ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ পেয়েছে যে, আল্লাহকে রব, ইসলামকে দ্বীন এবং মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে রাসূল হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট হয়েছে’ (মুসলিম হা/৫৭)।

তৃতীয়তঃ মানুষের সাথে সুসম্পর্ক রাখা: মানুষের সাথে মিশতে পারা এবং তাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখতে পারা হতাশা ও বিষণ্ণতা থেকে বেরিয়ে আসার অন্যতম কার্যকর মহৌষধ। এজন্য রাসূল (ছাঃ) আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ও সৎসঙ্গে থাকাকে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছেন। আত্মকেন্দ্রিক ও অসামাজিক মানুষ বরাবরই নিজের কষ্টের সময়গুলো মানুষের সাথে ভাগাভাগি করতে না পেরে নিদারুণ মানসিক কষ্টে আপতিত হয়। সুতরাং সমাজের ভালো মানুষদের সংস্পর্শে থাকা, সংঘবদ্ধ ও সাংগঠনিক জীবন যাপন করা মানুষের জন্য খুবই যরূরী এবং ইসলামের অন্যতম নির্দেশনা। একাকী বিচ্ছিন্ন জীবন ইসলামে কাম্য নয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, জামা’আতবদ্ধ জীবন রহমত আর বিচ্ছিন্ন জীবন হ’ল আযাব (ছহীহুল জামে’ হা/৩১০৯)। তিনি আরো বলেন, তোমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বসবাস কর। বিচ্ছিন্নতা থেকে সাবধান থাক। কেননা শয়তান বিচ্ছিন্নজনের সাথে থাকে এবং সে দু’জন (ঐক্যবদ্ধ ও সংঘবদ্ধ) মানুষ থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে। যে লোক জান্নাতের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম জায়গার ইচ্ছা পোষণ করে সে যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকে’ (তিরমিযী হা/২১৬৫)।

cuartoঃ শয়তানী কুমন্ত্রণার ব্যাপারে সতর্ক থাকা: শয়তান মানুষের চূড়ান্ত শত্রু। সে সর্বদা কুমন্ত্রণা যোগায় মানুষকে অন্যায় পথে নেয়ার জন্য। আল্লাহ বলেন, ‘শয়তান তোমাদের দারিদ্রের ভয় দেখায় এবং অশ্লীল কাজের নির্দেশ দেয়। আর আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন’ (বাক্বারাহ ২/২৬৮)। এজন্য সর্বদা শয়তানের ফেরেব থেকে সর্বদা সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক।

পঞ্চমতঃ তাক্বদীর ও তাওয়াক্কুল অবলম্বন করা: আল্লাহ্র উপর ভরসা ও তাক্বদীরে বিশ্বাস যে কোন মানুষের জন্য অফুরন্ত আত্মবিশ্বাস ও সৃদৃঢ মনোবলের খোরাক। কেননা সে জানে যে, সবকিছুর নিয়ন্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। বিশ্বাসী বান্দার একান্ত মঙ্গলের জন্যই তাঁর কর্মপরিকল্পনা। এই বিশ্বাস তাকে কখনও পথ হারাতে দেয় না। আশার প্রদীপ নিভতে দেয় না। বরং বুক ভরে প্রশান্তির নিঃশ্বাস নিয়ে সে সর্বাবস্থায় বলতে পারে- আলহামদুলিল্লাহ। সে সর্বদা বিশ্বাস রাখে- إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُসْرًا ‘নিশ্চয় কঠিনের সাথে রয়েছে সহজ, কষ্টের সাথে রয়েছে স্বস্তি’ (সূরা শারাহ ৬)। শত কষ্টের মাঝেও হাযেরা (আঃ)-এর মত প্রগাঢ় ভরসা নিয়ে তার মুখে উচ্চারিত হয়- إذن لن يضيعنا الله ‘আল্লাহ আমাদেরকে কখনই ধ্বংস করবেন না’। মহাবিপদের মুখেও বিচলিত না হয়ে মূসা (আঃ)-এর মত দৃঢ়তার সাথে বলতে পারে- كُلًّا إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ ‘কখনই না, নিশ্চয়ই আমার সাথে আমার রব রয়েছেন, অচিরেই তিনি আমাকে পথ দেখাবেন’ (শুআ’রা ৬২)। হতাশায় ডুবু ডুবু অবস্থাতেও সে রবকে ভুলে যায় না। বরং সমগ্র অন্তর ঢেলে দিয়ে মূসা (আঃ)-এর মত তাঁর সমস্ত চাওয়া-পাওয়া, বেদনা-আর্তি কেবল আল্লাহর কাছেই নিবেদন করে- رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ খَيْرٍ فَقِيرٌ ‘হে আমার রব! আমার প্রতি আপনি যা কিছু কল্যাণ নাযিল করবেন, আমি তারই মুখাপেক্ষী’ (ক্বাছাছ ২৪)। সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ্র প্রতি এই দৃঢ় ঈমান ও বিশ্বাস দুনিয়াবী যে কোন হতাশা ও অপ্রাপ্তির কষ্ট থেকে মুক্তির অব্যর্থ ঔষধ।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে দুনিয়াবী পরীক্ষার মঞ্চে সদা- সর্বদা সত্য ও ন্যায়ের উপর অবিচল রাখুন এবং যাবতীয় হতাশা থেকে মুক্ত থেকে আল্লাহ্ উপর পূর্ণ ভরসা রেখে জীবন পরিচালনার তাওফীক দিন। আমীন!

📘 তারুণ্যের আত্নপাঠ ও সমাজ চিন্তা 📄 ঝরাপাতা জীবন ও মৃত্যুর অমোঘ বাস্তবতা

📄 ঝরাপাতা জীবন ও মৃত্যুর অমোঘ বাস্তবতা


২০২১ সালের ২৬শে মার্চ আমাদের প্রিয় দ্বীনী ভাই মতীউর রহমান এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় একই সাথে হারিয়েছেন দুই বোনসহ পরিবারের পাঁচ পাঁচ জন সদস্য। পরদিন ২৭শে মার্চ রাত ১২-টা নাগাদ রংপুর, পীরগঞ্জে অনুষ্ঠিত জানাযায় শরীক হই। বেশ বড় বাড়ি মতীউর ভাইদের। একদিন আগেও ছিল প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর। নাতি-নাতনিদের আদর ভরা মিষ্টি মিষ্টি বুলি নানা-নানী, মামা-মামীদের হৃদয়ে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দিত। নিত্যদিন কত কাজ ছিল, কত পরিকল্পনা ছিল তাদের। সন্তানদের লেখাপড়া, ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষেত-খামার সবকিছু মিলিয়ে ব্যস্ত জীবন। আজ সেই ভরা বাড়িতে হঠাৎ নিস্তব্ধতা। হাহাকার শূন্যতা। জানাযায় উপস্থিত উঠোনভরা গণজমায়েত ছাপিয়ে সেই বাড়ির প্রতিটি কোণ থেকে খাঁ খাঁ মরুর বিরান সুর এসে অন্তরে শেলের মত বাঁধে। মৃত্যুর অমোঘ বাস্তবতাকে আমরা কেউ অস্বীকার করতে পারি না। মৃত্যুর চেয়ে সুনিশ্চিত আর কিছু নেই। কিন্তু তবুও সেই মৃত্যু যখন আপনজনের চিরবিদায়ের বার্তা হয়ে নিষ্ঠুরভাবে ধরা দেয়, তখন সেই বাস্তবতাকে বড় অবাস্তব বলে মনে হয়।

মহান প্রভু ধৈর্যশক্তি নামক এক মহা নে’মত না দিলে এই বিচ্ছেদ বেদনা সওয়া অথৈ পারাবার পাড়ি দেয়ার চেয়ে দুঃসাধ্য হয়ে উঠত। বাড়ির উঠোনেই নতুন চারটি কবর। আমি বেদনাতুর মতীউর ভাইকে দেখি। অব্যক্ত বেদনায় মুষড়ে পড়া তার পরিবারের সদস্যদের দিকে তাকাই। ভাবতে পারি না, কীভাবে পরিবারটি এতগুলো প্রিয়জন হারানোর কষ্ট সইবে? কোথায় এই অন্ত হীন ব্যথার উপশম খুঁজবে! প্রতিটি সকাল যে হবে তাদের জন্য এক নতুন বেদনার উপাখ্যান! এই লেখা যখন লিখছি তখন মাদারীপুরে এক স্পীড বোট দুর্ঘটনায় মুহূর্তেই ২৬ জন জলজ্যান্ত মানুষ লাশে পরিণত হ’ল। নয় বছরের শিশু মীম হারালো বাবা-মা আর ছোট দুই বোন। পরিবারে তার আর কেউ রইল না। মৃত্যুর অমোঘ বাস্তবতার কাছে আমরা কি নিদারুণ অসহায়!

প্রিয় পাঠক, মৃত্যুর এই বিভীষিকা প্রতিনিয়ত আমাদের তাড়িয়ে ফিরছে- একথা জানার বাকি না থাকলেও আমরা কি নিজেদের অত্যাসন্ন মৃত্যু নিয়ে দু’দণ্ড ভাববার অবকাশ পেয়েছি? নাকি যৌবনের তাজা রক্ত, অর্থ-বিত্ত কিংবা ক্ষমতার মোহে আরো বহুকাল কাটানোর রঙিন স্বপ্ন দেখছি! এই স্বপ্ন ফিকে হওয়ার সময় কি এখনও হয়নি! করোনাকালে কত রথি-মহারথি, বিত্তশালী, ক্ষমতাশালীদের অকস্মাৎ মৃত্যু আমরা দেখেছি। ধন-সম্পদ, পরিকল্পিত ডায়েট, সুরক্ষিত ঘরবাড়ি, পৃথিবীর সর্বোত্তম চিকিৎসাব্যবস্থাও তাদেরকে রক্ষা করতে পারেনি। দুনিয়াতে অট্টালিকার পর অট্টালিকা যার হাতে গড়া, তিনি এখন নিঃসঙ্গ মাটির বিছানায় নিজের দেহাবশেষ রক্ষায় ব্যস্ত। কেউই মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পায়নি। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যেখানেই থাক না কেন, মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই; যদিও তোমরা সুউচ্চ দুর্গে অবস্থান কর’ (সূরা নিসা ৭৮)।

তাছাড়া সময়ের হিসাব কষলে আমাদের যাপিত জীবনের স্বাভাবিক আয়ুষ্কালই বা কতটুকু? আখেরাতের তুলনায় তা এতটাই গৌণ যে, কাল কেয়ামতের ময়দানে যখন জিজ্ঞাসা করা হবে, তোমরা কতদিন ছিলে দুনিয়াতে? আমাদের জবাব হবে- একটি সকাল কিংবা একটি সন্ধ্যা (সূরা নাযি’আত ৪৬)। এই তো আমাদের জীবন! এই সময়টুকু একজন পথচারী কিংবা একজন আগন্তুকের ক্ষণিক বিশ্রামের সময়টুকুও তো নয়। রাসূল (ছাঃ) এই অমোঘ বাস্তবতার প্রতিই যেন ইঙ্গিত করেছেন, ‘তুমি দুনিয়াতে এমনভাবে কাটাও যেন তুমি একজন আগন্তুক কিংবা পথচারী’ (বুখারী হা/৬৪১৬)।

জন্ম-মৃত্যুর মধ্যবর্তী এই সময়টুকু মিলেই আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের জীবন। অতীব সংক্ষিপ্ত হ’লেও এই জীবন আমাদের জন্য অতীব মূল্যবান। কেননা জীবনের এই ক্ষণকাল সময়টুকুতে যে যতটুকু পরকালীন প্রস্তুতি নিতে পেরেছে, তার উপরই যে নির্ভর করছে তার চিরস্থায়ী তথা পরকালীন জীবনের যাবতীয় সুখ-দুঃখ। প্রতিটি মুহূর্তেই মৃত্যু আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে প্রবল গতিতে। সেই সাথে ফুরিয়ে আসছে আমাদের জীবনের ব্যাপ্তি। আমাদের অজান্তে, আমাদের অলক্ষ্যে বেজে চলেছে বেলা শেষের ঘণ্টাধ্বনি। পরীক্ষার হলে একজন ছাত্র যেমন শেষ ঘণ্টা বাজার আগে সবকিছু সাধ্যমত লিখে ফেলার প্রাণান্ত চেষ্টা চালায়, আমাদের পার্থিব জীবনের বাস্তবতা ঠিক একই রূপ। মৃত্যুই এখানে শেষ ঘণ্টা। তারপর যাবতীয় কর্মযজ্ঞ শেষ। শুরু হবে কর্মফলের পালা। আর এর ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে আমাদের জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য।

অনেকে দুনিয়াবী দুঃখ-কষ্টে পতিত হলেই জীবন সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়েন। নিজেকে নিঃশেষ করে দিতে চান। অথচ তিনি যদি জীবনের প্রকৃত গুরুত্ব ও বাস্তবতা উপলব্ধি করতেন, তাহলে এক মুহূর্তের জন্যও এই চিন্তা করতেন না। কেননা কাল কেয়ামতের ময়দানে মানুষ সবচেয়ে বেশী আফসোস করবে পার্থিব জীবনের এই মূল্যবান সময়টুকুর জন্যই। সে আফসোসে প্রাণপাত করে সেদিন বলবে, ‘হে আমার রব! আমাকে আরো কিছু কালের জন্য অবকাশ দিলে না কেন? তাহলে আমি ছাদাকা করতাম এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতাম!’ (সূরা মুনাফিকূন ১০)।

প্রিয় পাঠক, পরকালীন সম্বল অর্জনে আমাদের আলস্য, দুর্বলতা ও অসচেতনতার সবচেয়ে বড় কারণ হ’ল মৃত্যুর স্মরণ থেকে গাফেল থাকা এবং মৃত্যুপূর্ব জীবনের মূল্যটুকু সঠিকভাবে অনুধাবন করতে না পারা। এজন্য আমরা হরহামেশা নিশ্চিন্ত মনে বলি, জীবনটা একভাবে কাটিয়ে দিলেই তো হ’ল। অথচ রাসূল (ছাঃ) জীবনটাকে একটা গণীমত উল্লেখ করে বলেছেন- ‘পাঁচটি জিনিসের পূর্বে পাঁচটি জিনিসকে তোমরা গণীমত মনে কর; বার্ধক্যের পূর্বে তোমার যৌবনকে, অসুস্থতার পূর্বে তোমার সুস্থতাকে, দারিদ্রের পূর্বে তোমার স্বচ্ছলতাকে, ব্যস্ততার পূর্বে তোমার অবসরকে, মরণের পূর্বে তোমার জীবনকে’ (ছহীহুল জামে হা/১০৭৭)। মৃত্যু নামক পর্দা হঠাৎ উঠে যাওয়া মাত্রই সব কিছু সাঙ্গ হয়ে যাবে আর নতুন এক সীমাহীন জগৎ চোখের সামনে ধরা দেবে। সেদিন দুনিয়াবী জীবনের গাফিলতিকে স্মরণ করে সে প্রচণ্ড আফসোস করবে। কিন্তু তাতে বিন্দুমাত্র লাভ হবে না। আল্লাহ বলেন, তুমি এই দিবস সম্পর্কে উদাসীন ছিলে। অতঃপর আজ (বাস্তবতা দেখে) তোমার চক্ষু স্থির, প্রখর (ক্বাফ ২২)।

একথাই স্মরণ করিয়ে দিয়ে একদিন জিব্রীল এসে রাসুল (ছাঃ)-কে বললেন, হে মুহাম্মাদ! যতদিন খুশী জীবন যাপন করুন, কিন্তু মনে রাখবেন, আপনার মৃত্যু অনিবার্য; প্রিয়জনকে যত খুশী ভালোবাসুন, কিন্তু মনে রাখবেন, একদিন তাকে আপনার ছাড়তে হবে; আপনি যা ইচ্ছা করুন, কিন্তু মনে রাখবেন একদিন আপনি প্রতিফল পাবেন। জেনে রাখুন হে মুহাম্মাদ! মুমিনের মর্যাদা হ’ল রাত্রি জাগরণে এবং তার সম্মান হ’ল, অপরের মুখাপেক্ষী না হওয়ার মধ্যে (সিলসিলা ছহীহাহ হা/৮৩১)।

সুতরাং পাঠক! আমাদেরকে মৃত্যুর এই চিরন্তন বাস্তবতা সচেতনভাবে উপলব্ধি করতে হবে। পার্থিব জীবনের সর্বশেষ সীমারেখা এই মৃত্যু। আজ হোক, কাল হোক এই সীমারেখা আমাদের অতিক্রম করতেই হবে। অতএব যারা মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের মৃত্যুকে কেবল কান্না আর বেদনার উপলক্ষ্য নয়; বরং উপদেশ ও স্মারক হিসাবে গ্রহণ করে আমাদেরও প্রস্তুত হতে হবে, সেই অমোঘ বাস্তবতার কাছে নিজেকে সঁপে দেয়ার জন্য। প্রস্তুতি নিতে হবে নিজ নিজ আমলনামা সাধ্যমত ভরপুর করে চিরস্থায়ী জীবনে সফল হওয়ার জন্য। এমনভাবে যেন সেই মহাবিচারের দিনে পরম প্রশান্তির সাথে সকলকে আমরা ডেকে ডেকে বলতে পারি- ‘নাও, আমার আমলনামা দেখ, আমার রেজাল্টশীট পড়ে দেখ; আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতাম আমাকে হিসাবের মুখোমুখি হতে হবে’ (সূরা হাক্কাহ ১৯-২০)। আর সেদিন আমাদের রব আমাদের আনন্দিত চেহারা দেখে খুশী হয়ে বলবেন, ‘হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি তোমার প্রভুর নিকটে ফিরে এসো সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। অতঃপর আমার বান্দাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ কর’ (সূরা ফজর ২৭-৩০)। সেই মহাদিবসে এই মহান সৌভাগ্য লাভের জন্য আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি তো!

ফন্ট সাইজ
15px
17px