📄 ফিৎনা থেকে আত্মরক্ষা
বিগত বছরগুলোতে যুবসমাজের মধ্যে দ্বীনের ব্যাপারে সচেতনতা যথেষ্ট বেড়েছে আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তাদের মধ্যে অস্থিরতা এবং উদ্বিগ্নতা। তাদের সামনে নানামুখী চ্যালেঞ্জ। ক্যারিয়ার গঠনের চ্যালেঞ্জ। অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার চ্যালেঞ্জ। সামাজিক অবস্থান তৈরীর চ্যালেঞ্জ। পরিবারকে সন্তুষ্ট রাখার চ্যালেঞ্জ। সর্বোপরি নিজেকে পাপাচারমুক্ত রেখে দ্বীনের ওপর টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ। অথচ এতসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নেই তাদের যথাযথ নৈতিক ও মানসিক প্রস্তুতি। নেই তাদেরকে পথপ্রদর্শন করার মত কোন শক্তিশালী সমাজ কাঠামো। ফলে কিভাবে নিজেদের দ্বীনদারী অক্ষুণ্ণ রেখে এসব চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে এবং সফলভাবে তা উৎরানো যাবে-এটাই হ’ল সমকালীন দ্বীনদার যুবকদের প্রধান ভাবনা।
বস্তুতঃ একদিকে বস্তুবাদী সমাজের চাকচিক্যময় হাতছানি, চারিত্রিক অধঃপতন ঘটানোর জন্য যাবতীয় উপায়-উপকরণের সহজলভ্যতা; অন্যদিকে নানামুখী মতবাদ ও আদর্শের ডামাডোল। এর মধ্যে একজন দৃঢ় আত্মবিশ্বাসী এবং লক্ষ্যে অবিচল ব্যক্তির পক্ষেও যেখানে নিজেকে ধরে রাখা সহজসাধ্য নয়, সেখানে একজন সাধারণ দ্বীনদার যুবকের পক্ষে তা কতটা কঠিন; সেটা বলাই বাহুল্য। এজন্যই বোধহয় রাসূল (ছাঃ) তাঁর ছাহাবীদের লক্ষ্য করে বলেছেন, তোমাদের পরে এমন একটি সময় আসছে, যখন দ্বীনের উপর অটল থাকা ব্যক্তিদের প্রতিদান হবে তোমাদের মধ্যকার পঞ্চাশজন শহীদের সমপরিমাণ (সিলসিলা ছহীহাহ হা/৪৯৪)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, তোমাদের পর আসছে এমন একটি সময় যখন দ্বীনের উপর ধৈর্যসহকারে টিকে থাকা হবে হাতের মুঠোয় জ্বলন্ত অঙ্গার ধরে থাকার মত সুকঠিন (ঐ)।
এই সর্বগ্রাসী চ্যালেঞ্জ ও ফিৎনাসমূহকে বিদ্বানগণ মৌলিকভাবে দু’টি ভাগে ভাগ করেছেন, যা মানুষের নফস বা অন্তরের সাথে সম্পর্কিত।- (১) শাহওয়াত বা পাপপ্রবণতা (২) শুবহাত বা সন্দেহপ্রবণতা। পাপপ্রবণতার মধ্যে পড়ে যাবতীয় কৃপ্রবৃত্তিমূলক কর্ম, অন্যায় ও পাপাচার। আর সন্দেহ প্রবণতার মধ্যে পড়ে আল্লাহ্র দ্বীন সম্পর্কে যাবতীয় ভ্রান্ত সংশয়, অবিশ্বাস, সত্য দ্বীনকে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হওয়া কিংবা মিথ্যাকে সত্য ভেবে দিশেহারা হওয়া। নিজেকে যারা ফিৎনামুক্ত রাখতে চান, তাদেরকে এই ফিত্না দু’টির পরিচয় অবশ্যই জানতে হবে এবং হৃদয়জগত সাধ্যমত এতদুভয়ের প্রভাব থেকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। যেমন ভবিষ্যৎ বংশধরকে সকল ফিৎনা থেকে রক্ষার জন্য পিতা ইবরাহীম ও ইসমাঈল দো’আ করে বলেছিলেন, হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তাদের মধ্য থেকেই তাদের মধ্যে একজন রাসূল প্রেরণ করুন, যিনি তাদের কাছে আপনার আয়াত সমূহ পাঠ করবেন, তাদেরকে কিতাব ও সুন্নাত শিক্ষা দিবেন এবং তাদের (অন্তরসমূহকে) পরিচ্ছন্ন করবেন (বাক্বারাহ ২/১২৯)।
মানুষের নফস বা অন্তরের একাধিক চরিত্র আছে। যেমন কখনও তা মানুষকে অন্যায়ের প্রতি প্রলুব্ধ করে। একে নফসে আম্মারাহ বলা হয়, যার প্রভাব থেকে আমরা কেউই মুক্ত নই। আবার এই একই নফস মানুষকে অনুশোচনায় নিক্ষেপ করে এবং তার বিবেকশক্তিকে জাগ্রত করে দেয়, যখন সে কোন মন্দ কাজে লিপ্ত হয়। একে বলা হয় নফসে লাওয়ামাহ। আরেক ধরনের নফস রয়েছে, যা মানুষকে আল্লাহ্র কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ করায় এবং তাঁর আনুগত্যেই প্রশান্তি পায়। একে বলা হয় নফসে মুতুমাইন্নাহ। এটাই হ’ল নফসের পরিশুদ্ধ ও পবিত্র অবস্থান। যার জন্য প্রয়োজন নিরন্তর সাধনা। কুপ্রবৃত্তি থেকে বাঁচার তীব্র সংগ্রাম। মনের উপর যে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে, সেই সফল হ’তে পারে। এর প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আত্মাকে কুপ্রবৃত্তি হ’তে অবদমিত রাখল, তার বাসস্থান হল জান্নাত’ (নাযি’আত ৪০)।
প্রিয় পাঠক, নফসকে পরিশুদ্ধ করতে চাইলে ক্রমাগতভাবে শাহওয়াত ও শুবহাতের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়। পরিশুদ্ধি ও পরিচর্যার মাত্রা অনুযায়ীই নির্ধারিত হয় নফসের আচরণ। ইবনুল ক্বাইয়িম বলেন, ‘এই অনুশীলন করার সময় ব্যক্তিকে জানতে হবে যে, আজ সে যতবার আত্মশুদ্ধির প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, আগামীদিন তা তার জন্য ততটাই স্বস্তির কারণ হতে যাচ্ছে। আর যতবার সে শিথিল হচ্ছে, আগামী দিন তার জন্য ততটাই কঠিনভাবে ধরা পড়ার উপলক্ষ্য হ’তে যাচ্ছে। তাকে মনে রাখতে হবে যে, তার কর্ম থেকে অর্জিত মুনাফা হ’ল জান্নাতুল ফেরদাউসের সীমাহীন প্রশান্তিময় আবাসস্থল এবং মহান প্রভুকে দর্শনের সৌভাগ্য। আর লোকসান হওয়ার অর্থ নিশ্চিত জাহান্নাম ও প্রভুর দর্শন থেকে বঞ্চিত হওয়া। যে ব্যক্তি এই মানসিকতায় দৃঢ়প্রত্যয়ী হ’তে পারে, পার্থিব জীবনের হিসাব-নিকাশ তার নিকট গৌণ হয়ে পড়ে। অতএব একজন প্রকৃত মুমিনের কর্তব্য হ’ল আত্মসমালোচনায় গাফলতি না করা এবং অন্তরের গতি-প্রকৃতি ও প্রতিটি পদক্ষেপকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। কেননা আত্মা এমন এক অমূল্য সম্পদ, যা দ্বারা মানুষ সেই গুপ্তধনের অধিকারী হ’তে পারে যা অনন্তকাল ধরে কখনই নিঃশেষ হয় না। এই অমূল্য আত্মাকে যারা কলুষময় করে ধ্বংস করে ফেলে এবং তুচ্ছ প্রাপ্তির বিনিময়ে তার জন্য অবর্ণনীয় ক্ষতি ডেকে আনে সে ব্যক্তি পৃথিবীর সর্বাধিক নির্বোধ ও বিচারজ্ঞানহীন ব্যক্তি। শেষ বিচারের দিনে সে তার পরিণতি জানতে পারবে। আল্লাহ বলেন, ‘সেদিন প্রত্যেক আত্মা যে সৎকর্ম করেছে ও বদকর্ম করেছে তা উপস্থিত পাবে’ (আলে ইমরান ৩০; ইগাছাতুল লাহফান মিন মাছায়িদিশ শয়তান ১/৮৫ পৃঃ)।
সর্বোপরি নফসকে যাবতীয় ফিৎনা থেকে হেফাযত করা এবং সার্বক্ষণিক পরিচর্যার মধ্যে রাখার জন্য পবিত্র কুরআনে কয়েকটি ব্যবহারিক পদক্ষেপ উল্লেখ করা হয়েছে, যার অনুশীলন করা আমাদের জন্য অত্যন্ত যরূরী। যেমন :
ক. কুরআন অধ্যয়ন করা : দুনিয়াতে মানুষের জন্য আল্লাহ্ পক্ষ থেকে সর্বাধিক জীবন্ত নিদর্শন হ’ল আল-কুরআন। কুরআন তেলাওয়াত মানুষের অন্তর প্রশান্ত করে। তাই নফসের পরিশুদ্ধির জন্য নিয়মিত কুরআন পাঠ করা ও তা অনুধাবন করা আমাদের কর্তব্য। সেই সাথে কুরআনী বিধান অনুযায়ী নিজের জীবনকে ঢেলে সাজানোর অনুশীলন আমাদেরকে যাবতীয় ফিৎনা থেকে সুরক্ষা দিতে পারে। কেননা আল্লাহ এই কুরআন দ্বারাই মানুষের অন্তরকে সুদৃঢ় করেন এবং বাতিল থেকে সুরক্ষা দান করেন (ফুরক্বান ২৫/২২)।
খ. রাসূল (ছাঃ)-এর জীবনী পাঠ করা : পবিত্র কুরআনে নবী-রাসূলদের ঘটনাবলীসহ বহু শিক্ষণীয় কাহিনী উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনাসমূহ মানুষকে বাস্তবতা অনুধাবনে সহায়তা করে। রাসূল (ছাঃ)-এর সীরাত এমন অসংখ্য ঘটনায় পরিপূর্ণ, যা একজন মুমিনকে প্রতিটি মুহূর্তে ঈমানী চেতনায় উদ্দীপ্ত রাখে। ন্যায় ও কল্যাণের পথে অটল থাকার জন্য প্রেরণা যোগায়। এজন্য নিয়মিত সীরাত পাঠে অভ্যস্ত হ’তে হবে। অনুরূপভাবে আল্লাহ প্রেরিত অন্যান্য নবীদের কাহিনীসমূহও পাঠ করা যরূরী। কেননা এ সকল ঘটনা নানামুখী বিপদাপদে মানুষকে কী করতে হবে তা স্মরণ করিয়ে দেয়, যা তাকে ফিৎনা থেকে আত্মরক্ষার ঐকান্তিক আত্মবিশ্বাস যোগায়। আল্লাহ বলেন, ‘রাসূলদের ঐ সকল বৃত্তান্ত আমি তোমার নিকট বর্ণনা করছি। এর দ্বারা আমি তোমার হৃদয়কে সুদৃঢ় করি’ (হৃদ ১১/১২০)।
গ. ইলম অনুযায়ী আমল করা : ফরয ও নফল আমলসমূহ আমাদের ঈমানের সবচেয়ে বড় খাদ্য। ফিৎনা থেকে নিজের ঈমানকে রক্ষার জন্য আমলে অগ্রগামী হওয়ার কোন বিকল্প নেই। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘আঁধার রাতের মত ফিৎনা ঘনিয়ে আসার পূর্বেই তোমরা সৎআমলের দিকে ধাবিত হও। সে সময়ে সকালে একজন মুমিন হ’লে বিকালে কাফের হয়ে যাবে। বিকেলে মুমিন হ’লে সকালে কাফের হয়ে যাবে। মানুষ দুনিয়াবী লাভের কিংবা স্বার্থের জন্য তার দ্বীনকে বিক্রি করে ফেলবে’ (মুসলিম ২/২১৩)। সুতরাং ইবাদতে মনোযোগী হওয়া ও প্রতিনিয়ত সৎআমলের অনুশীলন করা, মসজিদের সাথে অন্তরকে সংযুক্ত রাখা, কুরআনকে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা, দ্বীনী জ্ঞান অর্জন করা প্রভৃতি সৎকর্মের মাধ্যমে নিজের ঈমানকে সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার আমরা অধিকাংশ সময় জেনেশুনেও হারাম কর্ম ছাড়তে চাই না কিংবা গড়িমসি করি। ফলে সহজেই আমাদের ঈমান দুর্বল ও অরক্ষিত হয়ে পড়ে। এজন্য সৎআমলের সাথে সাথে অসৎআমল পরিত্যাগ করাও সমভাবে কিংবা অধিকতর যরূরী (নিসা ৪/৬৬)।
ঘ. আল্লাহ্র রাস্তায় খরচ করা: আত্মত্যাগ ও আত্মোৎসর্গ ব্যতীত জীবনের কোন মহৎ লক্ষ্যই অর্জিত হয় না। এজন্য আল্লাহ কুরআনে বার বার নিজের ধন-সম্পদ থেকে খরচ করার জন্য উৎসাহিত করেছেন। যখন কেউ নিঃস্বার্থভাবে আল্লাহ্ পথে খরচ করে, তখন তার অন্তর্জগতে পরিশুদ্ধিতা আসে, খুলুছিয়াতের ফল্গুধারা প্রবাহিত হয়। সে হকের উপরে দৃঢ় থাকার শক্তি অর্জন করে (বাক্বারাহ ২/২৬৫)।
ঙ. সৎব্যক্তিদের সাথে সম্পর্ক গড়া সমাজে চলার জন্য মানুষের সাথে মিশতেই হয়। আর সেই মানুষ যদি সৎ হন এবং সুপথপ্রদর্শনকারী হন, তবে নিজেকে আল্লাহ্ আনুগত্যের উপর ধরে রাখা অনেক সহজ হয়ে যায়। এজন্যই ইসলামে সৎসঙ্গী নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে (তওবা ৯/১১৯, কাহফ ১৮/২৮)। সুতরাং ফিৎনা থেকে বাঁচতে নেককার মানুষদের সান্নিধ্যে থাকা খুবই যরূরী। দ্বীনী সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ততা বা জামাআ’তবদ্ধ জীবন যাপনের মাধ্যমে এই উদ্দেশ্য হাছিল করা সম্ভব।
চ. আল্লাহ্র কাছে দো’আ করা একজন মুমিনের নিষ্ঠা এবং আল্লাহ্র প্রতি তাওয়াক্কুল প্রকাশ পায় তার দো’আর মাধ্যমে। এজন্য দো’আকেই ইবাদত বলা হয়েছে। অতএব ফিৎনা থেকে বাঁচার জন্য সর্বদা আল্লাহ্র নিকট কায়মনোবাক্যে সাহায্য চাইতে হবে। তাঁর খাছ রহমতই কেবল আমাদের ফিৎনা থেকে বাঁচাতে পারে (ইউসুফ ১২/৫৩)।
এজন্য রাসূল (ছাঃ) এই দো’আটি সর্বদা পাঠ করতেন- ‘ইয়া মুক্বাল্লিবাল কুলুব ছাব্বিত কালবী আলা দ্বীনিকা’ (হে অন্তর সমূহের পরিবর্তনকারী! তুমি আমার অন্তরকে তোমার দ্বীনের উপর অবিচল রাখ)। আনাস (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমরা ঈমান এনেছি আপনার প্রতি এবং আপনি যা কিছু নিয়ে এসেছেন তার প্রতি। তবুও কি আপনি আমাদের ব্যাপারে আশংকা করেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ! কেননা মানুষের অন্তরগুলো আল্লাহ্র দুই আঙ্গুলের মাঝে রয়েছে। তিনি যেভাবে খুশী অন্তরের পরিবর্তন ঘটান (তিরমিযী হা/২১৪০, সনদ ছহীহ)। সুতরাং নিজেকে দুনিয়াবী ফিৎনার জোয়ার থেকে রক্ষা করতে হ’লে থেকে উপরোক্ত পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে নিরন্তর সাধনা করে যেতে হবে।
নফসের উপর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে হবে। তবে এজন্য সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন হ’ল ফিৎনা থেকে বাঁচার জন্য নিজের অন্তরের প্রচণ্ড তাকীদ এবং সদিচ্ছা। আমি না চাইলেও ফিৎনায় জড়িয়ে যাচ্ছি অর্থ আমার প্রতিজ্ঞা সবল নয়। যদি কেউ সত্যিকার অর্থে ফিৎনা থেকে বাঁচতে চায় এবং সর্বান্তঃকরণে প্রচেষ্টা চালায়, তবে আল্লাহ তাকে সুপথ প্রদর্শন করবেনই ইনশাআল্লাহ। আর এটা আল্লাহ্ ওয়াদা (আনকাবূত ২৯/৬৯)।
📄 চোখের হেফাজত
আধুনিক যুগে ফেত্নার যে জোয়ার প্রবাহিত হচ্ছে তার মধ্যে মুসলিম যুবকদের জন্য সবচেয়ে বড় ফেৎনা হ’ল সাংস্কৃতিক ফেৎনা। হাযারো মিডিয়ায় বিনোদন ও সংস্কৃতির নামে নারী-পুরুষের অবৈধ সম্পর্ক ও যৌনতাকে তথাকথিত শিল্পিত রূপ দিয়ে যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয় ও চারিত্রিক অধঃপতনকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এর সাথে বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরো ভয়ংকর উঠেছে। ফেসবুক বা ইউটিউবের মত আপাত নিরীহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবেশ করলেও যেকোন মুহূর্তে অন্যায়ের সাথে জড়িয়ে যাওয়ার ভুরি ভুরি হাতছানি তরুণদেরকে সহজেই বিভ্রান্ত করে দেয়। কোন অনৈতিক আহ্বান তাকে অতি সহজেই প্রতারিত করে ফেলে। আর নিয়মিতভাবে এমন প্রতারণার শিকার হ’তে থাকলে একটা সময় আসে, যখন নৈতিকতার দৃঢ় বাঁধনগুলো আলগা হ’তে থাকে। কলুষতা আর পঙ্কিলতায় মিইয়ে যেতে থাকে অন্তরের পবিত্র আভা। অবশেষে একসময় সে হারিয়ে যায় অধঃপতনের করাল গ্রাসে।
চোখ হ’ল মানুষকে দেয়া আল্লাহ্র এক গুরুত্বপূর্ণ নে’মত। এক মহাসম্পদ। পবিত্র কুরআনে এসেছে, ‘আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের মায়ের পেট থেকে এমন অবস্থায় বের করেছেন যখন তোমরা কিছুই জানতে না এবং তোমাদের জন্য শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও হৃদয় সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর’ (নাহল ৭৮)। তাই এই নে’মতের অপব্যবহার করলে একদিন আল্লাহ্র কাছে কঠোর জবাবদিহিতার সম্মুখীন হ’তে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘কর্ণ, চক্ষু ও হৃদয়- প্রত্যেকটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে’ (বনু ইস্রাঈল ১৭/৩৬)।
সুতরাং চোখের হেফাযত করা বিশেষত বর্তমান যুগের তরুণ সমাজের জন্য অতীব যরূরী। কেননা হাল যামানায় সংঘটিত প্রায় সকল সামাজিক পাপের জন্য মূলত চোখই দায়ী। চোখের জানালা দিয়েই মনের দুয়ারে করাঘাত করে পাপের সব পসরা। নিম্নে চোখের পাপ থেকে বাঁচা এবং চোখের হেফাযতের জন্য কিছু পদক্ষেপ উল্লেখ করা হ’ল-
(১) দৃষ্টি সংযত রাখা: দৃষ্টি হ’ল শয়তানের বিষাক্ত তীরের মত, যা দিয়ে শয়তান খুব সহজেই মানুষকে পাপের ফাঁদে আটকাতে পারে। এজন্য আল্লাহ বলেন, (হে মুহাম্মাদ!) বিশ্বাসীদের বল, তারা যেন দৃষ্টিকে সংযত করে এবং যৌনাঙ্গকে হেফাযত করে। এটাই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র। তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সবিশেষ অবগত (আন-নূর ৩০)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, চোখের যেনা হল দৃষ্টিপাত করা, জিহ্বার যেনা হল কথা বলা এবং অন্তরের যেনা হল কুপ্রবৃত্তি ও কুকামনার বশবর্তী হওয়া। আর যৌনাঙ্গ তা সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করে (বুখারী হা/৬২৪৩; মুসলিম হা/২৬৫৭)।
মনে রাখতে হবে, কেউ না জানলেও আল্লাহ বান্দার চোরা চাহনি, গোপন দৃষ্টি, অন্তরসমূহের গোপন কামনা সবই জানেন (ফুছছিলাত ১৯)। সুতরাং আমাদেরকে সাধ্যমত তাক্বওয়া অবলম্বন করতে হবে এবং রাস্তাঘাটে চলাফেরা, পত্র-পত্রিকা ও মিডিয়ায় পদচারণা, ইন্টারনেটে ব্রাউজ করা সর্বক্ষেত্রে দৃষ্টি সংযত রাখার জন্য কঠোর অনুশীলন করতে হবে। যদি সেটা সম্ভব হয়, তবে চোখের খেয়ানত নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়ে ওঠে। আর এমন ব্যক্তিদের জন্যই রাসূল (ছাঃ) সুসংবাদ দিয়ে বলেছেন- তিন ব্যক্তির চোখ কখনো জাহান্নাম দর্শন করবে না- (এক) যে চক্ষু আল্লাহর পথে (জিহাদে) পাহারা দিয়ে রাত্রি যাপন করেছে, (দুই) যে চক্ষু আল্লাহ্র ভয়ে কেঁদেছে এবং (তিন) যে চক্ষু আল্লাহ্ নিষিদ্ধ বস্তু দর্শন করা থেকে বিরত থেকেছে (তাবারাণী কাবীর হা/১০০৩, ছহীহ)।
(২) একাকী নির্জনে না থাকা: একাকিত্ব ও কর্মহীনতা মানুষকে সহজেই পাপের পথে ধাবিত করে। মানুষের অধিকাংশ পাপ একাকিত্বের সময়ই সংঘটিত হয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, যদি লোকেরা একাকিত্বের মাঝে কি ক্ষতি আছে তা জানত, যা আমি জানি; তবে কোন আরোহী রাতে একাকী সফর করত না’ (বুখারী হা/২৮৯৮)।
বর্তমান ফেৎনার যুগে গোপন পাপ সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ)-এর একটি ভয়ংকর হুঁশিয়ারী বার্তা আমাদের মনে রাখা অতীব যরূরী। তিনি বলেন, ‘আমি আমার উম্মতের কতক দল সম্পর্কে অবশ্যই জানি, যারা কিয়ামতের দিন তিহামার শুভ্র পর্বতমালার সমতুল্য নেক আমলসহ উপস্থিত হবে। আল্লাহ সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করবেন। রাবী ছাওবান (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহ্ রাসূল! তাদের পরিচয় পরিষ্কারভাবে আমাদের নিকট বর্ণনা করুন, যাতে অজ্ঞাতসারে আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত না হই। তিনি বলেন, তারা তোমাদেরই ভাই এবং তোমাদেরই সম্প্রদায়ের। তারা রাতের বেলা তোমাদের মতই ইবাদত করবে। কিন্তু তারা এমন লোক যে, একান্ত গোপনে সুযোগ পেলে আল্লাহ্র হারামকৃত বিষয়ে লিপ্ত হয় (ইবনু মাজাহ হা/৪২৪৫)। আল্লাহ বলেন, ‘তারা মানুষ থেকে গোপন করতে চায় কিন্তু আল্লাহ্ থেকে গোপন করে না; অথচ তিনি তাদের সংগেই রয়েছেন, যখন তারা রাতে আল্লাহর অপসন্দনীয় কোন কথা নিয়ে পরামর্শ করে। আর তারা যা করে তা সবই আল্লাহ্ জ্ঞানায়ও’ (নিসা ১০৮)।
(৩) শয়তানের প্রতারণা থেকে সদা সতর্ক থাকা: তরুণ সমাজকে সর্বদা মনে রাখতে হবে যে, শয়তান আমাদের সবচেয়ে বড় ও প্রকাশ্য শত্রু। তাই নিজেকে কখনোই শয়তানের ফিতনা থেকে নিরাপদ ভাবা যাবে না। সেই সাথে নিজের ভেতরকার নৈতিকতাবোধকে সদা জাগ্রত ও সুদৃঢ় রাখতে হবে, যেন কোন অসতর্ক মুহূর্তেও শয়তান কোনভাবে প্রতারিত করতে না পারে। শয়তানের করাঘাত অনুভূত হওয়া মাত্রই শয়তানকে পরাজিত করার তীব্র স্পৃহা যেন সজাগ হয়ে ওঠে। এভাবে নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে একসময় অবচেতনভাবে নিজের আত্মনিয়ন্ত্রণ শক্তি ও বিবেকের বন্ধন প্রবল হয়ে উঠবে। মহান আল্লাহ্র পক্ষ থেকে নিজের মধ্যে তাক্বওয়ার প্রতিরোধবর্ম তৈরী হবে। তখন যে কোন অনৈতিক কাজের প্রলোভন তাকে আর পাপের পথে নিতে পারবে না ইনশাআল্লাহ।
আর যদি শয়তানকে প্রশ্রয় দেয়া হয় এবং পাপ করাটা সহজ হয়ে যায়, তাহলে প্রবৃত্তির কাছে সে নিয়মিতই পরাজিত হতে থাকবে, এমনভাবে যে, সেখান থেকে বের হয়ে আসা তার জন্য হয়ে উঠবে ভীষণ কঠিন থেকে কঠিনতর। হুযায়ফা (রাঃ) বলেন, আমি রাসূল (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, চাটাইয়ের বুনন বা ছিলকার মত এক এক করে ফেৎনা মানুষের অন্তরে আসতে থাকবে। যে অন্তরে তা গেঁথে যাবে তাতে একটি করে কালো দাগ পড়বে। আর যে অন্তর তা প্রত্যাখ্যান করবে তাতে একটি উজ্জ্বল দাগ পড়বে। এমনি করে দুই অন্তর দু’ধরনের হয়ে যায়। একটি হয়ে যায় মসৃণ সাদা পাথরের ন্যায়; যে অন্তর আসমান ও যমীন যতদিন থাকবে, ততদিন কোন ফেৎনা দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। আর অপরটি হয়ে যায় কলসির উল্টা পিঠের ন্যায় ধূসর কালো, যে অন্তর ভালোকে ভালো বলে জানবে না; আবার খারাপকেও খারাপ মনে করবে না, কেবল প্রবৃত্তির দাসত্ব ছাড়া। অর্থাৎ ভালো-মন্দ পার্থক্যের অনুভূতি হারিয়ে ফেলে সে প্রবৃত্তির অনুসরণে যা ইচ্ছা তাই করবে (মুসলিম হা/১৪৪)।
সুতরাং যদি নিয়মিত বিবেক ও হৃদয়ের এই প্রতিরোধ শক্তি জাগ্রত রাখতে পারা যায়, তবে একসময় তা আল্লাহ্র রহমতে হৃদয়ে স্থায়ী হয়ে যাবে। আর এমন হৃদয়ে সহজে কোন পাপ-পঙ্কিলতা প্রবেশ করতে পারবে না। যেমনটি উপরোক্ত হাদীছে বর্ণিত হয়েছে। অতএব মনকে নিয়ন্ত্রণ করার এই কৌশল আমাদেরকে অবশ্যই আয়ত্ত করতে হবে, যদি আমরা পাপমুক্ত অবস্থায় আল্লাহ্ কাছে উপস্থিত হতে চাই। সবশেষে যাবতীয় প্রতিরোধ ও অনিচ্ছাসত্ত্বেও কোনক্রমে পাপ হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তওবা করতে হবে এবং কোন একটি ভালো কাজ দ্বারা সেটির কাফ্ফারা আদায় করতে হবে। যেন তার প্রভাব কোনভাবেই অন্তরে বিস্তার লাভ করতে না পারে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘তুমি যেখানেই থাক, আল্লাহকে ভয় কর এবং পাপের পর পুণ্য কর, যা পাপকে মুছে ফেলবে’ (তিরমিযী হা/১৮৯৭)।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে তাক্বওয়াশীল বান্দা হওয়ার তাওফীক দিন। আমাদেরকে চক্ষু হেফাযতের মত এই গুরুত্বপূর্ণ চারিত্রিক প্রতিরোধবুহ্যটি ধারণ করা ও তার নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি আয়ত্ত করার তাওফীক দান করুন এবং ছোট-বড় যাবতীয় পাপকর্ম থেকে আত্মরক্ষার তাওফীক দান করুন। আমীন!
📄 চিন্তার মানহাজ
তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে কোন বিষয়ে জানা বা সঠিক জ্ঞান অর্জন খুব একটা আয়াসসাধ্য কর্ম নয়। মানুষের মেধা ও ইচ্ছাশক্তির সাথে যদি একনিষ্ঠ প্রচেষ্টা থাকে, তবে সে যে কোন বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জনের সম্ভাবনা রাখে। কিন্তু সঠিক গন্তব্যে পৌঁছতে কেবল জ্ঞানার্জনই কি যথেষ্ট? নাকি তাতে আরো বিশেষ কোন পন্থা অবলম্বন করা যরূরী!
বর্তমান যুগে আমরা এমন অনেক যুবক ভাইকে দেখি যারা জ্ঞানার্জন করছে বটে, কিন্তু জ্ঞানার্জন তাদের বিশেষ উদ্দেশ্য নয় অথবা জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে প্রকৃতার্থে তারা কোন সমস্যার সমাধান খুঁজছে না। বরং তারা পড়ছে বা জানার চেষ্টা করছে নিছক বিনোদনের জন্য কিংবা অন্যের সাথে বিতর্ক করার জন্য। আবার এমন কিছু বিষয় নিয়ে তারা জ্ঞানার্জনে ব্যস্ত, যা কিনা বাস্তব জীবনের সাথে কোন সম্পর্ক রাখে না। আবার কেউবা ভুল পথে জ্ঞানার্জনের ফলে উল্টো পথভ্রষ্টও হচ্ছে। যার জ্বলন্ত উদাহরণ হ’ল জিহাদের নামে জঙ্গীবাদ। হয়তবা এসব তরুণদের মধ্যে আবেগ আছে, ভাল কিছু করার প্রেরণা আছে, কিন্তু জ্ঞানচর্চায় কোন সুশৃংখল ও নিয়মতান্ত্রিক কোন পদ্ধতি তারা অবলম্বন করতে চায় না। দু’একজন বক্তা কিংবা দু’একটি মোটিভেশনাল লেখনীকে সম্বল করে তারা তাদের চিন্তাধারা গড়ে তোলে। সেখানে না থাকে কোন বিশ্লেষণী শক্তি, আর না থাকে কোন ভারসাম্য। ফলে তাদের জ্ঞান তাদের বিশেষ উপকারে আসছে না। সুতরাং আধুনিক যুগে দ্বীনের সঠিক পথ ও পন্থা অনুসন্ধানের জন্য জ্ঞানার্জন যেমন যরূরী, তেমনি যরূরী হ’ল জ্ঞানার্জনের সঠিক পথ ও পদ্ধতি জানা। নতুবা জ্ঞানার্জন করার পরও পথভ্রষ্ট হওয়ার জোরদার সম্ভবনা থেকে যায়।
সুতরাং সঠিক পথে যদি জ্ঞান অর্জন করতে হয়, তবে অবশ্যই আমাদেরকে চিন্তার মানহাজ বা গতিপথ আগে নির্ধারণ করতে হবে। বিশ্লেষণী শক্তি অর্জন করতে হবে। জ্ঞানের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার ক্ষমতা থাকতে হবে। সৃজনশীলতা ও সামগ্রিকতা থাকতে হবে। সঠিক ফলাফল নিয়ে ভাবতে হবে। সর্বোপরি সারলীকরণ থেকে মুক্ত থেকে দৃষ্টিভঙ্গিকে নির্মোহ ও নিরপেক্ষ অবস্থানে রাখতে হবে। তবেই জ্ঞানার্জন আমাদের জন্য উপকারী হয়ে উঠবে। আর সেটা অর্জন করতে গেলে কিছু নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা আবশ্যক। যেমন-
(১) কুরআন ও হাদীছ অনুযায়ী জ্ঞানকে যাচাই করে নেয়া: এটাই হ’ল ইসলামে জ্ঞানার্জনের মূল সূত্র। বিশেষতঃ দ্বীনের কোন বিষয়ে সঠিকভাবে জানা ও বোঝার জন্য কুরআন ও ছহীহ হাদীছকে যুগপৎভাবে সামনে রাখতে হবে। সেই সাথে ছাহাবীরা কিভাবে সেটি বুঝেছেন ও ব্যাখ্যা করেছেন, তার প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে (নিসা ৫৯, ১১৫; আশ-শূরা ৫২)। এটাই হ’ল শরী’আত গবেষণার মূলনীতি। একজন গবেষক যত বড় জ্ঞানী এবং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হন না কেন, গবেষণাকালে তিনি যদি এই মূলনীতি মাথায় না রাখেন এবং সেই সাথে নিরপেক্ষ ও নির্মোহ অবস্থান বজায় রাখতে না পারেন, তবে নিঃসন্দেহে তিনি ভুল করবেন। অবধারিতভাবে ভুল করবেন। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা দেখি, মানুষ কোন বিষয়ের সমাধান পূর্ব থেকেই নিজের মনের মধ্যে এঁকে রাখেন কিংবা নিজস্ব পরিমণ্ডল ও পারিপার্শ্বিক প্রভাব থেকে একটা ধারণা বা অনুসিদ্ধান্ত তৈরী করে নেন। অতঃপর তার স্বপক্ষে কুরআন ও হাদীছের দলীল খোঁজেন। এটা নিরেট স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বার্থদুষ্টতা। কোন ব্যক্তি জ্ঞানবান হওয়া সত্ত্বেও গবেষণা পদ্ধতিতে এই সূত্রগত ভুল থাকায় তিনি স্বভাবতই ভুল পথে পরিচালিত হন (জাছিয়াহ ২৩)।
(২) নির্ভরযোগ্য আলেমদের মতামত নেয়া: কোন দিকে ভ্রূক্ষেপ না করে নিজের জ্ঞানকে সর্বেসর্বা মনে করলেই বিপদ। কোন বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছা গেছে তা বোধগম্য হওয়ার পরও পুনরায় নিশ্চিত হওয়ার জন্য অন্যান্য নির্ভরযোগ্য ও তাক্বওয়াশীল আলেমদের সাথে পরামর্শ প্রয়োজন (ইউসুফ ৭৬; নাহল ৪৩-৪৪)। বিষয়টি যত বেশী জটিল ও বিতর্কপূর্ণ হবে, তত বেশী আলোচনা-পর্যালোচনার প্রয়োজন। পরিশেষে যেটি কুরআন ও হাদীছের সর্বাধিক অনুকূলে ধারণা হবে সেটিকেই অনুসরণ করতে হবে, যদিও তা নিজের চিন্তাধারা কিংবা নিজের পছন্দের মানুষের বিপরীত মত হয় (যুমার ১৮)।
(৩) চিন্তায় সামগ্রিকতা থাকা: চিন্তার ক্ষেত্রে আমাদের একটি বড় ত্রুটি হ’ল সমস্যার মূলে না গিয়ে শাখা-প্রশাখা নিয়ে পড়ে থাকা। এতে সমস্যার সমাধান তো হয়ই না, বরং নিত্য-নতুন সমস্যার ডালপালা গজিয়ে উঠতে থাকে। সুতরাং ফলপ্রসূ চিন্তাধারা গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন সর্বদা মূল সমস্যার প্রতি দৃষ্টি দেয়া। একমুখী বা একদেশদর্শী চিন্তা না করে সামগ্রিকভাবে চিন্তা করা। যেমন কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে যখন আমরা পরস্পর বিপরীত কোন অবস্থার মুখোমুখি হই, তখন যে কোন একটি প্রান্তিকের উপর নির্ভর না করে বিষয়টিকে সামগ্রিকভাবে চিন্তা করা উচিৎ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, আমরা সাধারণতঃ নিজ নিজ অবস্থান থেকে এবং আপন স্বার্থ দ্বারা তাড়িত হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি। এমনকি তখন কুরআন ও হাদীছকে পর্যন্ত নিজের স্বার্থে এবং নিজের মতকে প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যবহার করা হয়। আর এভাবেই ইখতিলাফ বা মতভেদের সৃষ্টি হয়। যদি স্বীয় স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে মুসলিম উম্মাহ্র সামগ্রিক স্বার্থের প্রতি দৃষ্টি থাকত, যদি সাময়িক আবেগের উর্ধ্বে মুসলিম উম্মাহ্র স্বায়ী কল্যাণের চেতনা জাগ্রত থাকত, সর্বোপরি কুরআন বা হাদীছ তথা শরীআ’তের মূল মাকছাদ যদি নযরে থাকত, তবে নিঃসন্দেহে আমাদের চিন্তাধারা এভাবে ক্ষুদ্র স্বার্থের কাছে বলি হ’ত না। প্রয়োজনে নিজের ক্ষতি বা পরাজয় স্বীকার করে হলেও আমরা উম্মাহ্র বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতাম। সুতরাং স্বার্থবাদিতা নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর কল্যাণার্থে সামগ্রিক চিন্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
(৪) সমাধানমূলক চিন্তা করা : কোন বিষয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে কিংবা আবেগতাড়িত হয়ে জ্ঞানার্জন করা বর্তমান যুগে দ্বীনদার যুবকদের পথভ্রষ্টতার অন্যতম কারণ। সাময়িক কোন প্রেক্ষিতকে কেন্দ্র করে ভাসাভাসা জ্ঞানার্জন করেই তারা বিরাট কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে। এদের মধ্যে যারা জঙ্গীবাদ ও চরমপন্থার সাথে জড়িত, তাদের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তারা কী উদ্দেশ্যে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ করছে এবং এর ফলাফলই বা কী- সে সম্পর্কে তাদের ধারণা খুবই অগভীর। কোন প্রকার বিচক্ষণতা ও সমাধানমূলক চিন্তাধারা তাদের মধ্যে কাজ করে না। স্বল্পজ্ঞান আর নির্বুদ্ধিতা নিয়ে তারা এত বড় বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে যা কিনা একজন নিবিষ্ট গবেষক বিদ্বানেরও চিন্তার বাইরে।
আরেক শ্রেণীর যুবক আবার ছুটছে অপ্রয়োজনীয় জ্ঞানের পিছনে। রাসূল (ছাঃ) ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন এমন কিছু বিষয় যেমন গাযওয়াতুল হিন্দ, ইমাম মাহদী, দাজ্জাল, ইয়াজুজ-মাজুজ ইত্যাদি তাদের চূড়ান্ত আকর্ষণের বিষয়। অথচ একজন ঈমানদারের জন্য এসবের উপর বিশ্বাস স্থাপনই যথেষ্ট। কবে নাগাদ এগুলো বাস্তবে রূপ লাভ করবে তা নির্ণয় করা আমাদের দায়িত্ব নয়। এদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হ’ল কথায় কথায় অলীক কল্পনা আর ষড়যন্ত্রতত্ত্ব খুঁজে বেড়ানো, যার কোন বাস্তবতা নেই। ভুমিকম্পের মত প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে পর্যন্ত তারা ষড়যন্ত্রতত্ত্বের জালে ফেলে মানবসৃষ্ট বানিয়ে দেয়। এদের মাঝেও কোন সমাধানমূলক চিন্তাধারা দেখা যায় না। কেবল সমস্যা খুঁজেই তারা জীবনপাত করে দেয়। সুতরাং পথভ্রষ্টতা থেকে আত্মরক্ষার জন্য উদ্দেশ্যহীন জ্ঞানার্জন থেকে বেঁচে থাকা অতীব যরূরী। সেই সাথে প্রয়োজন ধ্বংসাত্মক ও সমাধানহীন চিন্তাধারা থেকে ফিরে আসা।
এতদ্ব্যতীত আরেক শ্রেণীর যুবক রয়েছে যারা তথাকথিত উদারতাবাদ নামের এক অবাস্তব ইউটোপিয়ার পিছনে ছুটছে বিরামহীন। অবস্থানহীনতার মাঝেই তারা অবস্থান খোঁজে। অনৈক্যের মাঝেই তারা ঐক্য খোঁজে। বিশৃংখলতার মধ্যে শৃংখলা খোঁজে। নিজের ছোট্ট পরিবারের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখতেই যারা হিমসিম খায়, তারাই কিনা সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে এক সূতোয় বাঁধতে চায়। কখনও একই দিনে ঈদ ও রামাযান পালন, কখনও আহলেহাদীছ না বলে শুধু মুসলিম বলার দাবী, কখনও ক্ষমতাসীন শাসকের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণের দাবী, কখনও এক পৃথিবী এক খিলাফতের দাবী, কখনও হাদীছ বাদ দিয়ে শুধু কুরআন মানার দাবী- ইত্যাকার আপাতঃজনপ্রিয় শ্লোগান মুখে আওড়িয়ে মিথ্যা আত্মপ্রসাদ লাভ করতে চায়। অথচ বাস্তবতা হল এই যে, শিরক-বিদ’আত জর্জরিত মুসলিম উম্মাহ যদি তাওহীদ ও সুন্নাহর আলোয় আলোকিত না হয়, আক্বীদা-বিশ্বাসে প্রকৃত মুসলিম না হয়, তবে কোন অবস্থাতেই এই ঐক্য সম্ভব নয়। এমনকি সেই হক-বাতিল মিশ্রিত ঐক্যের কোন প্রয়োজনও নেই। কারণ ইহুদী-খৃষ্টানরাও ঐক্যবদ্ধ। কিন্তু তাদের ঐক্য কি তাদেরকে হকের অনুসারী বানাবে কিংবা তাদেরকে জান্নাতী করবে? সুতরাং ঐক্যই মুখ্য নয় বরং বিশুদ্ধ ঈমান ও আমলই মুখ্য।
সুতরাং তথাকথিত কাল্পনিক নিরপেক্ষতা নয়, বরং সত্যের পক্ষে তথা তাওহীদ ও সুন্নাতের পক্ষেই দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। কাফেরদের বিরুদ্ধে মুসলমানের অবস্থান যেমন পরিষ্কার, তেমনই মুশরিক-বিদ’আতীদের বিরুদ্ধেও তাওহীদপন্থীদের অবস্থান পরিষ্কার থাকতে হবে। এর মাঝামাঝি অবস্থানের কোন সুযোগ নেই। সেটা বৃহত্তর ঐক্যের নামেই হোক কিংবা অন্য যে কোন নামে হোক। সুতরাং বৃহত্তর ঐক্য বলে কিছু নেই। সত্য ও মিথ্যা যেমন একীভূত হয় না, জান্নাত ও জাহান্নামের পথচারীদের অবস্থানও কখনও এক হয় না। হক ও বাতিলের দ্বন্দ্ব চিরকালীন। ঐক্য কেবল সম্ভব হকপন্থীদের মাঝেই। এই সত্যকে অনুধাবন না করে অন্ধ আবেগের বশে ‘বিশ্ব মুসলিম এক হও’ শ্লোগানে বিশ্বাস রেখে পথ চলা দ্বীনদার যুবকদের বিপথগামিতার অন্যতম কারণ।
(৫) চিন্তার ভারসাম্য বজায় রাখা। দলীল ও বিশ্লেষণী শক্তির ব্যবহারে নিজের চিন্তাকে যেমন শাণিত করতে হবে, তেমনি ভিন্ন চিন্তার জন্যও একটি ভারসাম্যপূর্ণ স্পেস বা সুযোগ রাখতে হবে। এছাড়া কোন কথা বা কাজ করার সময় কেন সেটি করলাম, সে বিষয়ে নিজের কাছে পরিষ্কার ধারণা রাখতে হবে। সৎ ও যুক্তিপূর্ণ অবস্থান থাকতে হবে। এতে চিন্তার ক্ষেত্রে একটি শৃংখলা ও সাযুজ্য তৈরী হবে। কোন হঠকারিতা সেখানে স্থান পাবে না। সেই সাথে আত্মপরতা তথা নিজের মতকে চূড়ান্ত ভাবার প্রবণতা থাকবে না ইনশাআল্লাহ। এ প্রসঙ্গে একটি বক্তব্য উল্লেখ করা যায়, যেটি ইমাম শাফেঈর মন্তব্য হিসাবে প্রবাদতুল্য হয়েছে- قولي صواب يحتمل الخطأ، وقول المخالف خطأ يحتمل الصواب ‘আমার কথাটি সঠিক, তবে তা ভুল হওয়ারও সম্ভাবনা রাখে এবং বিপক্ষে অবস্থানকারীর কথাটি ভুল, তবে তা সঠিক হওয়ারও সম্ভাবনা রাখে’। এভাবে ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তাধারা বজায় রাখলে পারস্পরিক মতভেদগুলো অনেক ক্ষেত্রেই দূর করা সম্ভব।
পরিশেষে বলব, একটি সভ্য ও সুশীল সমাজ যেমন গড়ে উঠে জ্ঞানচর্চার উপর, তেমনি জ্ঞানের সঠিক চর্চা ও প্রয়োগ নির্ভর করে সুস্থ, স্বাভাবিক ও গঠনমূলক চিন্তাধারার উপর। সেজন্য চিন্তার মানহাজ সম্পর্কে জানা অতীব যরূরী। বিশেষত আধুনিক সমাজে যখন নানামুখী জ্ঞানচর্চার সুযোগ অবারিত হয়েছে, নানামুখী দল ও মতের সয়লাবে প্লাবিত হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্র, তখন নিজের জ্ঞানচর্চাকে সঠিক পথে রাখার জন্য চিন্তার শৃংখলা ও ইস্তিকামাত ধরে রাখা অপরিহার্য। নতুবা যে কোন সময়ে বিভ্রান্তির খপ্পরে পড়ে নিজের আক্বীদা ও আমল বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে। আল্লাহ আমাদেরকে হেফাযত করুন। আমীন!
📄 মতভেদ নিরসন
মতভেদ এমন একটি বিষয়, যা মানবজাতির সৃষ্টিগত স্বভাবের অন্তর্ভুক্ত। নানা মুনির নানা মত- প্রবাদটির মত আমাদের জীবনের প্রতিটি ধাপে মতপার্থক্য এক অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। এই নানান মতের রহস্য ও পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ কুরআনে এভাবে বর্ণনা করেছেন- ‘আল্লাহ চাইলে তোমাদের সবাইকে এক দলভুক্ত করে দিতেন। কিন্তু তিনি চান তোমাদেরকে যে বিধানসমূহ দিয়েছেন, তাতে তোমাদের পরীক্ষা নিতে। অতএব তোমরা আল্লাহ্ আনুগত্যপূর্ণ কর্মসমূহে প্রতিযোগিতা কর। (মনে রেখ) আল্লাহ্র নিকটে তোমাদের সকলের প্রত্যাবর্তন স্থল। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে অবহিত করবেন যেসব বিষয়ে তোমরা মতভেদ করতে’ (মায়েদা ৫/৪৮)। অন্য আয়াতে এসেছে, ‘আপনার রব চাইলে সকল মানুষকে এক জাতি করতে পারতেন। কিন্তু তারা সদা মতভেদ করতেই থাকবে। তবে তারা নয়, যাদের প্রতি আপনার রব অনুগ্রহ করেছেন এবং তাদেরকে এজন্যই সৃষ্টি করেছেন’ (হৃদ ১১/১১৮-১৯)। মানুষের বিবেক-বুদ্ধি, আবেগ-অনুভূতি, চর্চা-অভিজ্ঞতার আলোকে জ্ঞান-বুদ্ধির তারতম্য ঘটে। নিত্য-নতুন ভাবের উদয় হয়। সুতরাং মানবসমাজে মতভেদ থাকবেই। বরং মতের এই বিভিন্নতা আল্লাহ্ অসীম কুদরতের বহিঃপ্রকাশ। নইলে মানবজীবনধারা আমাদের চোখে এতটা বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে ধরা দিত না।
মতভেদ ও মতপার্থক্যের এই স্বভাবজাত বিষয়টি যখন আমরা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, তখন লক্ষ্য করি আমাদের অধিকাংশই এ ব্যাপারে যথেষ্ট অস্পষ্টতা এবং বিভ্রান্তির মধ্যে নিমজ্জিত। একদল মনে করেন মতপার্থক্যই ইসলামের সৌন্দর্য। সুতরাং যত মত তত পথ। যে যে পথেই চলুক না কেন, শেষ ঠিকানা আরাধ্য সত্তার সান্নিধ্য। আর অপর দল মনে করেন, ইসলামে কোন প্রকার মতপার্থক্যের স্থান নেই। সুতরাং ভিন্নমত মানেই ভ্রষ্টতার পথ, বিভ্রান্তির পথ। অথচ সত্য লুকিয়ে আছে এতদুভয়ের মধ্যখানে।
মতভেদের ক্ষেত্রে ইসলামের অবস্থান হ’ল- কোন বিষয়ে মতভেদ থাকা অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু যথাসাধ্য তার নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করতে হবে। আর যদি নিষ্পত্তি করা একান্ত সম্ভব না হয়, তবে তা নিয়ে বাড়াবাড়ি কাম্য নয়; বরং সহনশীলতার সাথে তা সমাধা করতে হবে। এক্ষেত্রে নীতিমালা হ’ল-
প্রথমতঃ কুরআন ও সুন্নাহ্র প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে মতভেদের নিষ্পত্তি করতে হবে। আল্লাহ বলেন- ‘আর যদি কোন বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটে, সে বিষয়টি আল্লাহ এবং রাসূল (কুরআন ও সুন্নাহ)-এর দিকে ফিরিয়ে দাও। এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে সর্বোত্তম’ (নিসা ৪/৫৯)।
দ্বিতীয়তঃ কোন বিষয়ে নিশ্চিত জ্ঞান বা দলীল পাওয়া গেলে সে বিষয়ে মতভেদ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা তাদের নিকট সুস্পষ্ট প্রমাণ আসার পরও বিভক্ত হয়েছে এবং নিজেদের মধ্যে মতভেদ করেছে। আর তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি’ (আলে ইমরান ৩/১০৫)।
তৃতীয়তঃ মতভেদ করে পরস্পরের মধ্যে অনৈক্য ও বিভক্তি সৃষ্টি করা যাবে না। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সকলে আল্লাহ্র রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না’ (আলে ইমরান ৩/১০৩)।
চতুর্থতঃ কোন বিষয়ে স্পষ্ট দলীল না পেলে যদি মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়, তবে তার স্বীকৃতি দিতে ইসলাম নিষেধ করেনি। যেমন ইজতিহাদী মাসআলাগত বিষয়। কেননা মানুষ অসীম জ্ঞানের অধিকারী নয়। তাই তার অজ্ঞতা ও স্বল্পজ্ঞান থেকে জন্ম নিতে পারে ভিন্নমত। এজন্য রাসূল (ছাঃ) বলেন, যখন কোন বিচারক ইজতিহাদ করে এবং সঠিক মতে উপনীত হয়, তখন তাঁর জন্য রয়েছে দু’টি পুরষ্কার। আর যদি সে ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, তবে তার জন্য রয়েছে একটি পুরষ্কার (কেননা সে সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য চেষ্টা চালিয়েছে) (বুখারী হা/৭৩৫২; মিশকাত হা/৩৭৩২)। অনুরূপভাবে বনু কুরায়যায় আছরের ছালাত আদায় সম্পর্কে ছাহাবীদের মতভেদ থেকেও বুঝা যায় যে, সব মতভেদ বাতিলযোগ্য নয় (বুখারী হা/৯৪৬; মুসলিম হা/১৭৭০)। এবং ছাহাবীদের মধ্যেও মতভেদ ছিল। সুতরাং অসঙ্গত মতপার্থক্য যেমন ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়; তেমনিভাবে মতপার্থক্য মানেই যে নিন্দনীয়, তা নয়।
বর্তমান যুগে সচরাচর যে চিত্রটি আমাদের খুব পরিচিত তা হ’ল, ছোটখাটো কোন বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দিলেও আলেম সমাজ ও ধর্মীয় মহলে দেখা দেয় পারস্পরিক দূরত্ব এবং কাদা ছোঁড়াছুড়ির অধৈর্য ও কদর্য প্রতিযোগিতা। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে তো বিষয়টি প্রায় মহামারির আকার ধারণ করেছে। অনেক সময় এই বাকযুদ্ধ এমন পর্যায়ে চলে যায় যে, মনে হয় কেবল খুনোখুনিটা বাকি। এর পিছনে মূল যে কারণটি নিহিত, তা হ’ল- মতপার্থক্যের প্রকৃতি না বুঝা এবং কোন মতপার্থক্য গ্রহণযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তাকে মতবিরোধের হাতিয়ার বানিয়ে নিজেদের মধ্যে অনৈক্য ও বিভক্তি সৃষ্টি করা। অথচ অন্তরে ইখলাছ ও তাক্বওয়ার যথাযথ চর্চা থাকলে এবং উপরোক্ত মূলনীতিগুলো মনে রাখলে এধরনের মতবিরোধ সহজেই এড়ানো যেত। নিম্নে আমরা আরো কয়েকটি আচরণ ও পদ্ধতিগত মূলনীতি উল্লেখ করতে চাই, যেগুলো আমাদের মধ্যকার এই অনৈক্য দূরীকরণে ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন:
(১) ধৈর্য, সহনশীলতা ও পরমতসহিষ্ণুতা অবলম্বন করা: এই শিষ্টাচার অনুসরণ করা মতভেদ দূরীকরণে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। আমাদের মনে রাখা ভাল যে, ভিন্নমত মানেই ভুল মত নয়। বরং বাহ্যদৃষ্টিতে কোন সময় একটি মতকে সঠিক মনে হলেও এমনও হ’তে পারে যে, ভিন্ন মতই সঠিক। মূসা (আঃ) ও খিযির (আঃ)-এর ঘটনা এক্ষেত্রে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় (কাহফ ৬০-৮২)। ইবনে তায়মিয়া বলেন, আমাদের যুগে যত নতুন নতুন ঘটনাবলী ও একের পর এক ফিতনাসমূহ বিস্তৃত হচ্ছে তার পিছনে মৌলিক দুটি কারণ- (১) জ্ঞানের স্বল্পতা। (২) ধৈর্য ও সহনশীলতার ঘাটতি’। তিনি বলেন, عامة الفتن التي وقعت من أعظم أسبابها قلة الصبر؛ إذ الفتنة لها سببان: إما ضعف العلم، وإما ضعف الصبر، فإن الجهل والظلم أصل الشر، وفاعل الشر إنما يفعله لجهله بأنه شر، وتكون نفسه تريده فبالعلم يزول الجهل، وبالصبر يحبس الهوى والشهوة فتزول تلك الفতنة ‘মৌলিকভাবে ফিত্না যেসব কারণে হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হ’ল সহনশীলতার অভাব। যদিও ফিৎনার পিছনে দু’টি কারণ ক্রিয়াশীল। হয় তা জ্ঞানের কমতি, নতুবা ধৈর্যের ঘাটতি। অজ্ঞতা ও যুলুম সকল অকল্যাণের মূল। যে পাপ করে বা অন্যায় করে, সে মূলতঃ অজ্ঞতার কারণে এবং নিজের খাহেশাতের কারণেই তা করে। জ্ঞানের মাধ্যমে অজ্ঞতা দূর হয় আর ছবর বা সহনশীলতার মাধ্যমে খাহেশাত, স্বেচ্ছাচারিতা, কুপ্রবৃত্তির নিবারণ হয়। ফলে ফিৎনা দূরীভূত হয়’ (আল-মুসতাদরাক আলা মাজমূঈল ফাতাওয়া ৫/১২৭)।
(২) সর্বদা পরামর্শ ও আলোচনার দুয়ার খোলা রাখা: যে কোন সমস্যা সমাধানের সর্বোত্তম পদ্ধতি হ’ল ভিন্ন মতাবলম্বীর সাথে আন্তরিকতা ও সত্যনিষ্ঠার সাথে আলোচনা করা। যদি সদিচ্ছা নিয়ে পর্যালোচনার দুয়ার উন্মুক্ত রাখা হয়, তবে যে কোন জটিল বিষয়ের সমাধানও সহজ হয়ে যায়। এজন্য সর্বোত্তম পন্থায় আলোচনা-পর্যালোচনার পথ খোলা রাখতে হবে (আলে ইমরান ৩/১৫৯; নাহল ১৬/১২৫)। আল্লাহ বলেন, ‘আর আমার বান্দাদেরকে বল, তারা যেন এমন কথা বলে- যা উত্তম। নিশ্চয় শয়তান তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির জন্য উস্কানী দেয়; নিশ্চয় শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু’ (বনু ইস্রাঈল ১৭/৫৩)।
(৩) অধিকতর শক্তিশালী দলীলকে প্রাধান্য দেয়া : শরী‘আতের কোন বিষয়ে উভয় মতের স্বপক্ষে যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য দলীল উপস্থিত থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে উভয়ের মধ্যে অধিকতর শক্তিশালী মতটিকে প্রাধান্য দেয়া উচিৎ। আল্লাহ বলেন, ‘যারা মনোযোগ দিয়ে কথা শোনে, অতঃপর তার মধ্যে যেটা উত্তম সেটার অনুসরণ করে, তাদেরকে আল্লাহ সুপথে পরিচালিত করেন এবং তারাই হ’ল জ্ঞানী’ (যুমার ৩৯/১৮)।
(৪) ব্যক্তিস্বার্থ বা কারো প্রতি বিদ্বেষভাব দ্বারা প্রভাবিত না হওয়া : আমাদের সমাজে মতবিরোধ সৃষ্টি হওয়ার অন্যতম কারণ হ’ল ব্যক্তিস্বার্থ দ্বারা তাড়িত হওয়া এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করা। সমাজে অধিকাংশ মতভেদ বিষাক্ত আকার ধারণ করে মূলতঃ স্বার্থপরদের কারণে, যারা যে কোন মূল্যে ব্যক্তিস্বার্থকে চরিতার্থ করতে চায়। যে কোন মতবিরোধ নিরসনের পূর্বশর্ত হ’ল এই মহা ব্যাধি থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা (নিসা ৪/১৩৫; মায়েদা ৫/৮; শূরা ৪২/৪০)।
(৫) বৃহত্তর ও সামগ্রিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া : বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনের জন্য অনেক সময় ক্ষুদ্রতর বিষয়গুলো ত্যাগ করতে হয় কিংবা এড়িয়ে যেতে হয়। এটা দুর্বলতা নয় বরং দূরদর্শিতার পরিচায়ক। মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইসহ খারেজী যুল-খুয়াইছিরার সাথে রাসূল (ছাঃ)-এর আচরণ এই দূরদর্শিতারই সাক্ষ্য দেয়। রাসূল (ছাঃ) চাইলে তাদেরকে হত্যা করতে পারতেন। কিন্তু তা না করে তিনি ছাহাবীদের বললেন, ‘তাকে ছেড়ে দাও, ভবিষ্যতে কেউ যেন না বলতে পারে যে, মুহাম্মাদ তাঁর সাথীদের হত্যা করেন’ (বুখারী হা/৪৯০৫)। হোদায়বিয়ার সন্ধি কিংবা মক্কা বিজয়কালে রাসূল (ছাঃ)-এর ভূমিকা এই মূলনীতির জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত।
(৬) আত্ম-অহংকারে লিপ্ত না হওয়া: অনেক সময় জ্ঞানী হিসাবে পরিচিত ব্যক্তিরাও নিজেদের অহংবোধ ধরে রাখতে গিয়ে স্বীয় মতের বাইরে ভিন্ন কোন মতকে সামান্য অবকাশও দিতে চান না। বরং অন্যায় যিদ ও হঠকারিতার মধ্যে ডুবে যান। অথচ দ্বীনের স্বার্থে অন্যের জ্ঞানকেও স্বীকৃতি দেয়ার উদারতা রাখতে পারলে বহু মতভেদপূর্ণ বিষয় সহজেই সমাধান করা সম্ভব হয়। মনে রাখা ভাল যে, নিজের বিজ্ঞতাকে সর্বেসর্বা ভাবার চেয়ে বড় অজ্ঞতা আর নেই। আল্লাহ্র বাণী আমাদের জন্য অনেক বড় নছীহত- ‘প্রত্যেক জ্ঞানীর উপর অধিক জ্ঞানী আছে’ (ইউসুফ ১২/৭৬)।
(৭) সর্বদা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি রুজু থাকা: কেননা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ) ব্যতীত পৃথিবীর কারো বক্তব্যই শতভাগ গ্রহণীয় নয়। ব্যক্তি যত জ্ঞানী ও যত বড় ইমাম বা নেতা হোন না কেন, যত বড় আকাবির-বুযুর্গ হোন না কেন, তার কথা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথার বিপরীত হ’লে তা সর্বতোভাবে বর্জনীয় (আন’আম ৬/১৫৩; আ’রাফ ৭/৩; নূর ২৪/৫১)। কোন দূরতম ব্যাখ্যা দিয়ে কুরআন ও ছহীহ হাদীছকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।
(৮) আত্মসংশোধনকে হীনতা মনে না করা: কারণ ইছলাহ বা সংশোধনই ঈমানদারদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যত নেককার ব্যক্তিই হোক, কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নয় (ইউসুফ ১২/৫৩; নাজম ৫৩/৩২)। সুতরাং ভুলের উপর টিকে থাকায় কোন কৃতিত্ব নেই; বরং আত্মসংশোধনেই রয়েছে সফলতা। আল্লাহ বলেন, ‘যারা তাক্বওয়া অবলম্বন করে এবং নিজেদের সংশোধন করে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তান্বিতও হবে না’ (আ’রাফ ৭/৩৫)।
(৯) অপরের কল্যাণকামী হওয়া: মানবতার বৃহত্তর কল্যাণচিন্তা যার মনে বিরাজ করে, মতবিরোধে লিপ্ত হওয়া তার জন্য প্রায় অসম্ভবই। বরং সংশোধন ও সংস্কারের প্রবল আকুতি উল্টো তাকে মতবিরোধ নিষ্পত্তির জন্য তাড়িত করে। তার ভাবনা জুড়ে প্রতিধ্বনিত থাকে আল্লাহ্ বাণী- মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই। সুতরাং তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপোষ মীমাংসা করে দাও। আর তাক্বওয়া অবলম্বন কর। যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হ’তে পার (হুজুরাত ৪৯/১০)। এমনকি অমুসলিমের প্রতিও সে থাকে দয়ার্দ্রচিত্ত (মুমতাহিনা ৮)। মানুষকে ক্ষমা করা, ছাড় দেয়া, সহমর্মিতা প্রকাশ করা ইত্যাদি হয় তার নিত্য বৈশিষ্ট্য (আলে ইমরান ৩/১৩৪; নূর ২৪/২২)। কোন অবস্থাতেই সে অন্যের সম্মানহানির চিন্তা করতে পারে না। কখনই মিথ্যা ও শঠতার আশ্রয় নিতে পারে না। রাসূল (ছাঃ) বলেন, একজন মুসলিমের জন্য অন্য মুসলিমের সম্পদ, সম্মান ও জীবনের উপর হস্তক্ষেপ করা হারাম। কোন ব্যক্তির মন্দ হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ মনে করবে (মুসলিম হা/২৫৬৪)। তিনি আরো বলেন, ‘দ্বীন হ’ল কল্যাণকামিতার নাম’ (মুসলিম হা/৫৫)।
(১০) মধ্যপন্থা অবলম্বন করা: একজন মুসলমানের জীবন হবে ভারসাম্যপূর্ণ। অতি অনুরাগ কিংবা অতি বিরাগ তাকে কখনই বিভ্রান্ত বা লক্ষ্যচ্যুত করবে না। কোন অবস্থাতেই সে চরমপন্থা অবলম্বন করবে না। বাড়াবাড়ি করবে না। বরং সাধ্যমত মধ্যপন্থা অবলম্বনের মাধ্যমে সমঝোতার পথ খোলা রাখবে (বাক্বারাহ ২/১৪৩; ফুরক্বান ২৫/৬৭)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, তোমরা সহজ পন্থা অবলম্বন করা, কঠিন পন্থা অবলম্বন করো না। মানুষকে সুসংবাদ দাও, দূরে ঠেলে দিও না (বুখারী হা/৬৯; মুসলিম হা/১৭৩২)।
বর্তমান যুগে আলহামদুলিল্লাহ দ্বীনের দাওয়াতের ময়দান যেমন প্রসারিত হচ্ছে, তেমনি এর বিপরীতে আলেম-ওলামা ও ধর্মীয় দল-উপদলের মধ্যে বাড়ছে পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ ও কলহ-বিবাদ। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে ধার্মিক তরুণদের একটা বড় অংশ একে অপরের বিরুদ্ধে জবাব-পাল্টা জবাব, রদ-পাল্টা রদে মহা ব্যস্ত। কারো বিরুদ্ধে সামান্য ত্রুটি পাওয়া মাত্রই তার বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগা, সম্মানহানি করা এগুলো এখন স্বাভাবিক কালচারে পরিণত হয়েছে। কোন বিষয়ে স্বচ্ছ জ্ঞান কিংবা প্রকৃত তথ্য না জানা থাকলেও তারা বড় বড় মন্তব্য, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যপূর্ণ বক্রোক্তি করতে দ্বিধা করছে না। ফলে মতভেদের বিষবাষ্প বাড়ছে বৈ কমছে না।
এর ফলে ক্ষতি হচ্ছে আমাদের দ্বীনদারিতার। হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের ইখলাছ। বিনষ্ট হচ্ছে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির পরিবেশ। বিপথগামী হচ্ছে আমাদের সমাজ। সর্বোপরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর সার্বিক অগ্রযাত্রা। আল্লাহ বলেন, ‘আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর ও নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ করো না। করলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি ও প্রতিপত্তি হারিয়ে ফেলবে। আর তোমরা ধৈর্য ধারণ কর; নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে থাকেন’ (আনফাল ৮/৪৬)। সুতরাং যদি আমরা আল্লাহ্ প্রকৃত আনুগত্যশীল বান্দা হ’তে চাই, আমাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনকে ইসলামী সংস্কৃতির সুসভ্য বাতাবরণে সাজাতে চাই, ঐক্য ও সংহতির সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে চাই এবং মুসলিম উম্মাহকে বিজয়ী শক্তি হিসাবে দেখতে চাই, তবে আমাদেরকে অবশ্যই মতবিরোধের এই অশুভ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ধৈর্য, সহনশীলতা ও পরমতসহিষ্ণুতার কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেদেরকে পরিশুদ্ধ করতে হবে। পারস্পরিক সমঝোতার পথ খুঁজে নেয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে হবে। অনাকাংখিত কারণে আমাদের মধ্যে শয়তান যেন কোনরূপ বিভেদের দরজা খুলতে না পারে, সে ব্যাপারে আমাদের সদা সতর্ক থাকতে হবে। আর এর মাঝেই নিহিত রয়েছে আমাদের দুনিয়াবী ও পরকালীন সাফল্য ও মর্যাদা। আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন। আমীন!