📄 কিসের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত আমরা!
বলা হয়ে থাকে যে, Life is a race- জীবন হ’ল এক প্রতিযোগিতার নাম। হ্যাঁ, প্রতিযোগিতাই বটে। আমাদের নিত্যকার পথচলা, আমাদের দৈনন্দিন চিন্তাধারা, আমাদের জীবনের লক্ষ্য, কর্মপন্থা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সবকিছুর মধ্যেই এই প্রতিযোগিতার উপস্থিতি প্রবলভাবে বিদ্যমান। বিদ্যালয় পড়ুয়া শিশু, খেলার মাঠের তরুণ, চাকুরীর পরীক্ষায় অবতীর্ণ যুবক কিংবা বাসে ওঠার সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা পেশাজীবী, টিসিবির পণ্য পেতে লাইনে দাঁড়ানো শ্রমজীবী-এমন কেউই নেই যিনি এই বিরামহীন প্রতিযোগিতার চক্র থেকে বাইরে আছেন। এমনকি এই প্রতিযোগিতাই মানুষের জীবনের চালিকাশক্তি। অন্যকে টপকে সামনে যাওয়া কিংবা নিজেকে পিছনে পড়তে না দেয়ার জোর মানসিকতাই প্রতিযোগিতা, যা প্রতিটি মানুষের ভেতরকার সহজাত প্রবণতা।
এই চাওয়া ইতিবাচক হ’লে নিঃসন্দেহে তাতে দোষের কিছু নেই। বরং তা প্রশংসার যোগ্য এবং কাম্য। কিন্তু যে প্রতিযোগিতা মানুষকে অন্যায়ের পথে পরিচালিত করে, ব্যক্তি ও সমাজ জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যে প্রতিযোগিতা ন্যায়-ইনছাফের দণ্ডকে পদদলিত করে; যে প্রতিযোগিতা স্রেফ ভোগসর্বস্ব, আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থবাদী; যে প্রতিযোগিতা অর্থহীন ও অন্তঃসারশূন্য, সর্বোপরি যে প্রতিযোগিতা আখেরাতকে ভুলিয়ে দেয়- সে প্রতিযোগিতা নিঃসন্দেহে ব্যর্থ ও ধ্বংসাত্মক।
আজকের পুঁজিবাদী দুনিয়া এবং ভোগবাদী সমাজের দিকে যদি আমরা তাকাই, তাহ’লে বিলক্ষণ দেখা যাবে যে, অধিকাংশ মানুষই এক অন্তহীন নেতিবাচক প্রতিযোগিতার ঘেরাটোপে বাধা। সবাই যেন কোন এক অপ্রদর্শিত নেশার ঘোরে ছুটে চলেছে- আরো চাই! আরো চাই! চাওয়ার যেন কোন শেষ নেই। হিসাবের খেরোখাতায় চাহিদাগুলো একটার পর একটা ধারাবাহিক যোগ হ’তেই থাকে। প্রলম্বিত হয় অন্ধের মত অবিশ্রান্ত ছুটে চলার পরিধি। হঠাৎ কখনও যদি পিছু ফিরে তাকানোর অবসর হয়, ভেতরকার কোন দূরাগত সত্ত্বার পরশে অশান্ত মনটা সহসা প্রশান্ত হয়, তখন ক্ষণিকের জন্য হ’লেও মনে হয় কিসের পিছনে ছুটছি আমি? এসবের পিছনে ছুটে দিন শেষে লাভটা কী? কেন এসব করছি? কার জন্য করছি? লাভালাভের নিত্য হিসাবটা তখন কেমন যেন অর্থহীন, বিষাদময় মনে হয়। একসময় উদাসী মন সখেদে বলে ওঠে- নাহ, জীবনটা বোধ হয় ষোল আনাই মিছে।
বস্তুতঃ এটা মোটেই বেসুরো মনের ঔদাস্যভরা কথা মাত্র নয়। বরং ষোল আনা মিছে ব্যর্থ জীবনালেখ্য কিন্তু সত্যিই রচনা করে চলেছে মানব সংসারের অধিকাংশ জীবন। যে জীবন মহান স্রষ্টা আল্লাহ্র সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পরিচালিত নয়, যে জীবন রাসূল (ছাঃ)-এর প্রদর্শিত পথের পথিক নয়, সে জীবন যত চকচকেই পরিদৃষ্ট হোক না কেন, তা আদতেই ব্যর্থ জীবন। পশু-পাখির মতই এ জীবন মূল্যহীন। পরকালের খাতায় যে জীবনের মূল্য যোগ হয় না, সে জীবন তো আসলেই মিছে! ষোল আনাই মিছে!
প্রিয় পাঠক! দুনিয়ার চাক্যচিক্য ও মোহে আমরা ঈমানদার হওয়া সত্ত্বেও প্রায়শঃই ভুলে যাই, আমরা আখেরাতের সন্তান, দুনিয়ার নই। আমাদের আসল বাসস্থান জান্নাত, দুনিয়া নয়। আমাদের প্রতিযোগিতার বিষয়বস্তু দুনিয়া নয়, আখেরাত। দুনিয়ায় তো আমরা এসেছি মাত্র ক’দিনের মুসাফির হয়ে। সময় ফুরানো মাত্র ফিরে যেতে হবে আসল গন্তব্যে। একজন পর্যটক যেমন রঙিন দুনিয়ার স্বপ্নাতুর মুহূর্তগুলো ক্ষণিকের জন্য আস্বাদন করে ফেরৎ যায়, তার থেকে বিন্দুমাত্র ভিন্ন নয় আমাদের এই জীবন। আখেরাতের আয়নায় দুনিয়াটা দেখলে এই মহাসত্যটি অনুধাবন করা মোটেই রহস্যময় কিছু নয়।
কিন্তু আমরা যে গাফেল। চূড়ান্ত গাফেল। গাফলতির পর্দা চোখে টেনে তাই তো নির্বোধ গাধার মত পরিশ্রম করি এমন কিছুর পিছনে, যেসবের কোনই উপযোগিতা নেই আখেরাতে। নেই তাতে বিশেষ দুনিয়াবী প্রাপ্তিও। অপরদিকে স্বল্প পরিশ্রমেই যেখানে অপেক্ষা করছে আবারিত প্রাপ্তি, চিরস্থায়ী স্বপ্নপূরণের লোভনীয় হাতছানি, তার জন্য একদণ্ড সময় বের করতে গেলেও আসে হাযারো আলস্য আর অজুহাতের সমাহার।
অথচ আমরা নিজেদের কতই না বুদ্ধিমান ভাবি! আখের গোছানোর জন্য আমরা কতই না স্থিতধী পরিকল্পনাবিদ! কিন্তু কখনও কি ভেবেছি আখের গোছানোর নামে আমরা আসলে কি গোছাচ্ছি? আমাদের ভবিষ্যৎ ভাবনার চালাকি আর প্রশান্তিতে ভরপুর চেহারার বিপরীতে চূড়ান্ত বিচার দিবসে অপেক্ষমাণ কোন সে হতভাগ্য, নতমুখ চেহারা লুকিয়ে আছে? আফসোস শত আফসোস!
সেদিনের কথা পবিত্র কুরআনে আল্লাহ আমাদেরকে অসংখ্যবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। দরদভরা ভাষায় তিনি জানিয়ে দিয়েছেন এই জীবনের মূল প্রতিযোগিতা আসলে কিসের? কী এর বিষয়বস্তু। তিনি আহ্বান জানান, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে ক্ষমা এবং এমন জান্নাত লাভের জন্য প্রতিযোগিতা কর, যার সীমানা আসমান এবং যমীনব্যাপী। কেবল মুত্তাকীদের জন্যই যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে’ (আলে ইমরান ৩/১৩৩)। তিনি আরো বলেন, ‘তোমরা এগিয়ে চল তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে, যার প্রশস্ততা আসমান ও যমীনের মত। আর তা প্রস্তুত রাখা হয়েছে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারীদের জন্য’ (হাদীদ ৫৭/২১)। মুমিনদের প্রশংসায় আল্লাহ বলেন, ‘তারা হ’ল এমন বান্দা যারা কল্যাণের কাজে সর্বদা প্রতিযোগিতা করে এবং তাতে তারা অগ্রগামী থাকে’ (মুমিনূন ২৩/৬১)। ‘অতএব (জান্নাতে নে’মতলাভের জন্য) প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হোক’ (মুত্বাফফিফীন ৮৩/২৬)।
কখনও ধমকের সুরে বলেন, ‘অতএব তোমরা সৎকাজের প্রতিযোগিতা কর, তোমরা যেখানেই থাক না কেন, আল্লাহ তোমাদের সকলকে একত্র করবেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে পূর্ণ ক্ষমতাবান’ (বাক্বারাহ ২/১৪৮)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘অতএব সৎকর্মে তোমরা প্রতিযোগিতা কর, আল্লাহ্ দিকেই সকলের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করেছিলে, সে সম্পর্কে তিনি তোমাদেরকে অবহিত করবেন’ (মায়েদাহ ৫/৪৮)। কখনও আগাম স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন আমাদের পরকালের আফসোস বার্তা- ‘হায়! যদি আবার দুনিয়ার জীবনে ফিরে যেতে পারতাম!’ (আনআম ২৭)। ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আরো কিছু কালের জন্য অবকাশ দিলে না কেন? তাহলে আমি ছাদাকা করতাম এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতাম!’ (মুনাফিকুন ১০)। ‘হায়! যদি পরকালের জন্য অগ্রিম কিছু পাঠাতে পারতাম!’ (ফজর ২৪)। ‘হায়! যদি আমরা শুনতাম, নিজেদের বুদ্ধি-বিবেককে কাজে লাগাতাম!’ (মুলক ১০)।
অতএব প্রিয় পাঠক! আমাদের জীবনটা এক নিরেট প্রতিযোগিতার মঞ্চ। এই মঞ্চের সত্যিকারের প্রতিযোগী কেবল তারাই যারা আখেরাতকে চিনেছে। ফলাফল পাবে কেবল তারাই যারা আখেরাতের জন্য প্রতিযোগিতা করে। এর বাইরে যারা রয়েছে, তারা কেউ প্রতিযোগীই নয়। কেননা প্রতিযোগিতার বিষয়বস্তুই তাদের জানা নেই। অতএব আসুন! আমরা আমাদের প্রতিযোগিতার বিষয়বস্তু চিনতে শিখি। টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত, পদ-পদবী, গাড়ি-বাড়ির ধোঁকায় আর দুনিয়াবী অসার প্রতিযোগিতায় নিজেকে বিলীন করে না দেই। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা জেনে রেখো যে, পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া- কৌতুক, জাঁকজমক, পরস্পর গর্ব করা, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির প্রাচুর্যের লাভের প্রতিযোগিতা ছাড়া আর কিছুই নয়’ (হাদীদ ৫৭/২০)। সুতরাং জেনেশুনে এসব জিনিসকে প্রতিযোগিতার বিষয়বস্তু বানানো নিরেট এবং নিরেট বোকামী ছাড়া কিছুই নয়। এজন্য হাসান বছরী (রহঃ) বলেন, ‘তুমি যখন কাউকে দুনিয়াবী দিক থেকে তোমার সাথে প্রতিযোগিতা করতে দেখবে, তখন তার সাথে তুমি আখেরাতের বিষয়ে প্রতিযোগিতা কর’ (ইবনু আবী শায়বাহ হা/৩৬৩৬১)।
সুতরাং আমরা প্রতিযোগিতা করব। তবে তা যেন নির্বোধের মত দুনিয়ামুখী না হয়ে পরকালীন কল্যাণই একমাত্র লক্ষ্য হয়। প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কাজও যদি পরকালীন মুক্তির জন্য হয়, তাতেই আমাদের চূড়ান্ত সাফল্য নিহিত। আর এই প্রতিযোগিতাই আমাদের জন্য নির্ধারণ করে দেবে আমাদের সেই চিরস্থায়ী সুখের ঠিকানা। আল্লাহ বলেন, ‘তারা সকলে সমান নয়। আহলে কিতাবদের মধ্যে একটি হকপন্থী দল আছে, তারা রাত্রিকালে ছালাতরত অবস্থায় আল্লাহর আয়াত পাঠ করে। তারা আল্লাহ ও আখেরাতের উপর বিশ্বাস রাখে এবং তারা সৎকাজের আদেশ দেয়, অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে এবং তারা কল্যাণকর কাজে প্রতিযোগিতা করে। তারাই সৎকর্মশীলদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত (আলে ইমরান ৩/ ১১৪)। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সকল ভাই ও বোনকে ভোগবাদী দুনিয়ার মোহ থেকে রক্ষা করুন এবং আখেরাতমুখী জীবন যাপনের মাধ্যমে পরকালের পথে জীবনের মূল প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন!
📄 অর্থ-বিত্ত নয়, আমাদের সম্বল ঈমান ও সৎআমল
দ্রব্যমূল্যের সীমাহীন উল্লম্ফন, আয়ের সাথে ব্যয়ের ক্রমব্যবধান, জীবন- জীবিকার ব্যাপক সংকোচন, ব্যবসা-বাণিজ্যের অবনমন, তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, বিশ্বব্যাপী দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি আমাদের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনধারায় এক বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। করোনার পর আবার ঘুরে দাঁড়ানোর মুহূর্তে হঠাৎ এই ছন্দপতনে হতোদ্যম হয়ে পড়েছে নাগরিক জীবন। পার্শ্ববর্তী দেশ শ্রীলংকা ও পাকিস্তানের বেহাল দশায় যোগ হয়েছে বাড়তি ভীতি। অজানা আশংকায় ভীতচকিত মানুষের মনজুড়ে বিরাজ করছে এক ধরনের অজানা অস্থিরতা। মনে হচ্ছে এই বুঝি আর পেরে ওঠা হবে না। সন্তান-সংসার, পরিবার-পরিজন নিয়ে এমন অনিশ্চয়তা আর দুর্ভাবনায় দিন কাটাচ্ছে বহু নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার। শুধু দক্ষিণ এশিয়াতেই নয়, করোনা এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের জোড়া ধাক্কায় সমগ্র বিশ্বেই শুরু হয়েছে দ্রব্যমূল্যের ভয়াবহ উর্ধ্বগতি। বিশ্বজুড়ে শোনা যাচ্ছে নতুন করে অর্থনৈতিক মন্দার পদধ্বনি। মা’আযাল্লাহ।
প্রতিবার ধাক্কা আসে, আর আমরা নির্দিষ্ট কাউকে দোষারোপ করি। কখনও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে, কখনও বিশ্বব্যবস্থাকে। কিন্তু আমরা হয়ত কখনও ভাবার অবকাশ পাই না যে, এসব আমাদের জন্য অবহারিতভাবে প্রাপ্য কিংবা এসব আমাদেরই পাপাচারের ফল! সরকার দুর্নীতিগ্রস্ত, অবিবেচকের মত তেল- বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে চলেছে- এটা নিঃসন্দেহে গুরুতর অপরাধ; কিন্তু একই অপরাধের অংশীদার কি আমরাও সমানভাবে নই? নইলে তেলের দাম বাড়তে না বাড়তেই অন্য সবকিছুর দাম এমন আকাশছোঁয়া কেন হ’ল? এই সিন্ডিকেটেড অপরাধের জন্য দায়ী কি কেবল সরকার? তেলের দরবৃদ্ধির সাথে সঙ্গতি না রেখে রাতারাতি ইচ্ছেমত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বহুগুণ বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় তো সরকার নয়, আমরাই লিপ্ত। বলা হয়ে থাকে যে, সরকার জনগণের প্রতিচ্ছবি। সুতরাং যে দেশের জনগণ যেমন, সে দেশের সরকারও তেমন হবে-এটাই স্বাভাবিক।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এজন্যই ঘোষণা দিয়েছেন- ‘মানুষের কৃতকর্মের ফল হিসাবেই স্থলে ও সমুদ্রে সর্বত্র বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাদের কর্মের কিছু শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা (আল্লাহ্ দিকে) ফিরে আসে’ (সূরা রূম ৪১)। তিনি আরো বলেন, ‘তোমাদেরকে যেসব বিপদাপদ স্পর্শ করে, সেগুলো তোমাদেরই কৃতকর্মের ফসল। অনেক গুনাহ তো আল্লাহ ক্ষমাই করে দেন’ (সূরা আশ-শূরা ৩০)। অর্থাৎ দুনিয়াবী বিপদাপদ কখনও আল্লাহ্ পক্ষ থেকে পরীক্ষাস্বরূপ আসে; তবে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষের নিজেদেরই কৃতকর্মের শাস্তিমূলক প্রতিফল।
প্রিয় পাঠক, একজন ঈমানদারের জন্য ব্যক্তি ও সমাজের উপর আপতিত বিপদাপদ বৃহত্তর অর্থে তার জীবন পরীক্ষারই অংশ। সেজন্য সে তাতে অস্থিরচিত্ত হয় না, হতাশায় মুহ্যমান হয় না। বরং নিজের অন্তরকে আল্লাহ্ প্রতি আরো বেশী প্রণত করে দেয়। হৃদয়কে আল্লাহ্র রহমতের আশায় প্রশস্ত রাখে। নিজেকে আরো সচেতনভাবে পরকালের জন্য প্রস্তুত করে। যেমন :
ক. তওবা ও ইস্তিগফার : যে কোন বিপদ থেকে মুক্তির জন্য যাবতীয় পাপাচার থেকে তওবা করা এবং আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনার বিকল্প নেই। এতে আল্লাহ্র রহমত বর্ষিত হয় এবং বিপদ থেকে দ্রুত মুক্তি লাভ করা যায়। সূরা হৃদে এসেছে, (হুদ আঃ বলেন) তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর তার দিকে ফিরে আস। (তাহ’লে) তিনি তোমাদেরকে নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত উত্তম জীবনের স্বাদ দেবেন এবং প্রত্যেক অনুগ্রহ পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তিকে তার প্রাপ্য মোতাবেক অনুগ্রহ করবেন। আর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে নিশ্চয়ই আমি তোমাদের উপর মহা দিনের শাস্তির আশংকা করি (হুদ ৩)।
খ. ধৈর্য ধারণ : পরীক্ষায় ঘেরা মুমিন যিন্দেগীতে ধৈর্য সর্বোত্তম ঢাল। মানবচরিত্রে ধৈর্য ধারণের চেয়ে উত্তম গুণ আর নেই। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে কিছু ভয় ও ক্ষুধা দ্বারা এবং কিছু ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা পরীক্ষা নিব। আর আপনি সুসংবাদ দিন ধৈর্যশীলদেরকে’ (বাক্বারা ১৫৫)।
মুমিনের বৈশিষ্ট্যই হ’ল সে যেমন সুখের সময় আল্লাহ্র প্রতি সন্তুষ্ট থেকে প্রাণভরে শুকরিয়া আদায় করবে, তেমনি দুঃখ-কষ্টের সময় আল্লাহ্র প্রতি পূর্ণ ভরসা রেখে ধৈর্য অবলম্বন করবে। কোন অবস্থাতেই সে আল্লাহকে ভুলে যাবে না, আল্লাহ্র প্রতি ভরসা হারাবে না। একথা সে সর্বদা মনে রাখবে যে, রিযিকের ফয়ছালা হয় আসমানে। যে রব সুসময়ে রিযিক দিয়েছেন, সেই রব দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির দুঃসময়েও রিযিক দিতে পারেন। তিনিই সবকিছুর মালিক ও নিয়ন্ত্রণকর্তা (বাক্বারা ২৪৫)। এজন্য ইবরাহীম বিন আদহাম (রহ.) চমৎকারভাবে বলেছেন, আল্লাহ্র কসম! আমি মোটেই পরোয়া করি না যদি যবের প্রতিটি দানার মূল্য এক দিনারও হয়। কেননা আমার দায়িত্ব হ’ল আল্লাহ্র নির্দেশ মোতাবেক ইবাদত জারি রাখা। আর আল্লাহ্ কাজ হ’ল আমাকে তাঁর প্রতিশ্রুত রিযিক দান করা’। সুতরাং দিশেহারা হওয়া নয়; বরং আমাদেরকে তওবা এবং ধৈর্যের মাধ্যমে বিপদাবস্থা থেকে পরিত্রাণ চাইতে হবে। এতেই আমাদের মুক্তি নিহিত রয়েছে ইনশাআল্লাহ।
অপরদিকে আমাদেরকে এ বিশ্বাস সুদৃঢ় রাখতে হবে যে, দুনিয়াবী জীবন-জীবিকা, ধন-সম্পদ, বাড়ি-গাড়ি কোনকিছুই আমাদের প্রকৃত সম্পদ নয়, বরং ক্ষণকালের ভোগসামগ্রী মাত্র। সুতরাং এসবের মূল্যবৃদ্ধি, ঘাটতি, ক্ষয়ক্ষতি যেন আমাদের হীনবল করে না দেয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘দুনিয়াই যার মূল লক্ষ্য এবং সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ, আল্লাহ তাআ’লা তার চোখের সামনে দরিদ্রতা স্থাপন করে দেন তথা যাবতীয় অভাব তার সামনে উপস্থিত করেন’ (তিরমিযী হা/২৪৬৫)।
কেননা আমাদের মূল সম্পদ এবং আমাদের চিরস্থায়ী উপার্জন হ’ল আমাদের বিশুদ্ধ ঈমান এবং সৎআমল; যাতে কোন শিরক-বিদ’আত থাকবে না, থাকবে না রিয়া-প্রদর্শনীর সংমিশ্রণ। যিনি এমন দুই অমূল্য সম্পদের অধিকারী হয়েছেন, তার মত সৌভাগ্যবান আর কেউ নেই। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাদের উদ্দেশ্যে সুসংবাদবাণী উচ্চারণ করে বলেন, ‘তোমাদের ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি তোমাদেরকে আমার নৈকট্যশীল করবে না; বরং নৈকট্যশীল হবে তারাই, যারা ঈমান এনেছে এবং সৎআমল করেছে। আর তাদের জন্য তাদের কর্মফলস্বরূপ রয়েছে বহুগুণ পুরস্কার। আর তারা সুউচ্চ প্রাসাদে নিরাপদে বসবাস করবে’ (সাবা ৩৭)। উক্ত আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, যতক্ষণ আমাদের ঈমান আছে এবং আল্লাহ্ পক্ষ থেকে সৎআমল করার তাওফীক আছে, ততক্ষণ আমরা শত বিপদের মধ্যেও সম্পদশালী। শত দুর্বলতার মাঝেও ক্ষমতাবান। শত দুঃখ-বেদনার মাঝেও সর্বংসহা প্রশান্ত হৃদয়। কেননা আমাদের মূল সম্বল, আমাদের মূল পুঁজি আমাদের হাতছাড়া হয়নি। এই সম্বল যার সংরক্ষণে থাকে, পৃথিবীর তাবৎ বিপদাপদের বার্তা তাকে আতংকিত করে না। বরং আখেরাতের চির প্রশান্তিময় গন্তব্যের জন্য জোগাড়-প্রস্তুতিই হয় তার জীবনের সবকিছু। অতএব দুনিয়ার সবকিছু চলে যাক, কিন্তু কোন অবস্থাতেই যেন ঈমান সম্পদটাকে না হারাই, সৎআমলের পাল্লা যেন লঘুতর না হয়ে পড়ে- এটাই হোক আমাদের দাঁতে দাঁত চাপা প্রতিজ্ঞা।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে দুনিয়াবী যাবতীয় বিপদাপদ থেকে রক্ষা করুন! সর্বাবস্থায় একমাত্র তাঁর প্রতি ভরসা রেখে তাঁর মহা অনুগ্রহ লাভের মাধ্যম তথা ঈমান ও সৎআমলের পথে পরিচালিত হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন!
📄 ইসলামী মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির চর্চা
একজন সভ্য মানুষের জীবন মানে বিশ্বাস ও মূল্যবোধের চমৎকার সুসমন্বয়। মানুষ যা বিশ্বাস করে, যা অন্তরের গহীনে লালন করে, তা-ই মূল্যবোধ আকারে প্রকাশ পায়। ইসলাম যেমন স্রষ্টার প্রতি সৃষ্টির দায়িত্ব-কর্তব্য নির্ধারণ করেছে, ঠিক তেমনি মানুষের প্রতি মানুষের পারস্পরিক দায়িত্ব-কর্তব্যও নির্ধারণ করে দিয়েছে। মানবসত্তার অন্তর্নিহিত মর্যাদাকে যথাযথ মূল্য দেয়ার মাধ্যমেই এই সামাজিক দায়িত্ববোধ ও মূল্যবোধের জন্ম হয়। পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে অধীনস্থ কর্মচারী, প্রতিবেশী, মেহমান, পথচারী, বড়ীব-দুখী তথা সমাজের সর্বশ্রেণীর মানুষের প্রতি আলাদাভাবে কর্তব্য নির্ধারণ করেছে ইসলাম। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সদ্ব্যবহার কর তোমাদের পিতা-মাতা, আত্মীয়-পরিজন, ইয়াতীম-মিসকীন, আত্মীয় বা অনাত্মীয় প্রতিবেশী, সহচর সাথী, মুসাফির ও দাস-দাসীদের সাথে। নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারী ও গর্বিতজনকে ভালবাসেন না’ (নিসা ৪/৩৬)।
এই আয়াতে মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি সামাজিক সম্পর্কের কথা পৃথকভাবে উল্লেখ করে তার প্রতি যত্নবান হওয়ার জন্য যেভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা থেকে সুস্পষ্ট প্রতিভাত হয় যে, ইসলামে সামাজিক দায়িত্ববোধের স্থান কতটা সুপ্রশস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি সমাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য যেমন আইন-আদালত ও প্রশাসনের নিত্য প্রয়োজন পড়ে; তেমনি প্রয়োজন হয় ব্যক্তিমানুষের মূল্যবোধের চর্চা। সামাজিক রীতিনীতি ও আচরণবিধির জন্ম হয় এই মূল্যবোধের জায়গা থেকেই। উত্তম আচরণ, সৌজন্যবোধ, সততা, ন্যায়নিষ্ঠা, বিশ্বস্ততা, ক্ষমাপরায়ণতা, সহানুভূতি, পরোপকার, ভাল-মন্দ বাছবিচার, দানশীলতা, মানুষের বিপদে-আপদে এগিয়ে আসা, নিজের এবং অপরের অধিকারের প্রতি সচেতনতা, শৃংখলাবোধ, কারো কোন প্রকার ক্ষতি না করা, মানুষের সুখ-দুঃখের প্রতি লক্ষ্য রাখা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করা ইত্যাদি মানবজাতির এমন অত্যাবশ্যক কিছু আচরণবিধি, যার উপস্থিতি একটি সমাজকে কল্যাণময় মানবীয় সমাজে পরিণত করে। বিনির্মাণ করে সভ্যতার সুরম্য প্রাসাদ। অপরদিকে এর অনুপস্থিতিতে সৃষ্টি হয় চরম সামাজিক অবক্ষয়ের।
একটি সমাজ সুরক্ষায় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ও প্রশাসন নিয়ামক শক্তি হলেও জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া তা কখনই সফল হয় না। যে সকল দেশকে উন্নত দেশ হিসাবে দেখা হয়, সেসব দেশে সরকারের পাশাপাশি জনসচেতনতাই কিন্তু সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আধুনিক মুসলিম সমাজের দিকে তাকালে মোটাদাগে যে সমস্যাগুলো চোখে ধরা পড়ে, তার একটা বড় অংশেরই উদ্ভব ঘটেছে সামাজিক মূল্যবোধ চর্চার ঘাটতি থেকে। বিশ্বাসে ও সংস্কৃতিতে শ্রেষ্ঠ উম্মত হলেও সেই বিশ্বাস ও সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটানোয় আমাদের যে বিরাট গাফলতি ও ঘাটতি রয়েছে, তা স্বতঃসিদ্ধ এবং প্রমাণিত। পাশ্চাত্য বিশ্ব এবং মুসলিম বিশ্বের মধ্যে আজ সভ্যতার সূচকে যে আনুপাতিক ব্যবধান তৈরী হয়েছে, তার জন্য বহুলাংশে দায়ী হল বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠীর মাঝে সামাজিক সংস্কৃতি ও দায়িত্বশীলতার প্রবল অভাব। এ কারণেই ১৮৮১ সালে প্যারিস সম্মেলন থেকে ফিরে মুফতী মুহাম্মাদ আবদুহু (১৮৪৯-১৯০৫ খৃ.) মুসলিম জাতির এই দুর্দশার দিকে ইঙ্গিত করে বেদনার্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, ذهبت للغرب، فوجدت إسلاما، ولم أجد مسلمين، ولما عدت للشرق، وجدت مسلمين، ولكن لم أجد إسلاما ‘আমি পশ্চিমে গেলাম, সেখানে পেলাম ইসলাম, কিন্তু মুসলমান পেলাম না; আবার যখন প্রাচ্যে ফিরলাম, তখন মুসলমান পেলাম কিন্তু ইসলাম পেলাম না’।
পাশ্চাত্য বিশ্ব তাদের সমাজে অভ্যন্তরীণ শৃংখলা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে সভ্যতার মাপকাঠিতে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। অপরপক্ষে মুসলিম বিশ্ব ধর্মীয় চেতনায় সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও দায়িত্ব ও চেতনাবোধের প্রবল দুর্বলতার কারণে প্রায় সর্বত্রই বিশৃংখলা ও পশ্চাদগামিতার স্রোতে খাবি খাচ্ছে। আমরা আদর্শের কথা বলি, কিন্তু তা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করি না। সততার দাবী করি, কিন্তু নিজেকে অসততা থেকে বের করে আনতে পারি না। মানুষের কাছে বিশ্বস্ততা কামনা করি, অথচ নিজে বিশ্বস্ত হ’তে পারি না। অপরের কাছ থেকে ন্যায়ের প্রত্যাশা করি, কিন্তু নিজে ন্যায়পরায়ণ হ’তে পারি না। অপরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার নছীহত করি, অথচ নিজের পরিমণ্ডল অপরিচ্ছন্ন রাখি। ঘর কিংবা গাড়ির জানালা থেকে টুপ করে ময়লা নিক্ষেপ করতে কিংবা যত্রতত্র থুথু ও সিগারেট নিক্ষেপ করতে আমরা একটুও দ্বিধাবোধ করি না। কি অশিক্ষিত, কি শিক্ষিত- প্রত্যেকেই আমরা কমবেশী এই দ্বিচারিতার মধ্যে ডুবে আছি। ফলে সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও মুসলিম সমাজ আধুনিক বিশ্বে পশ্চাৎপদ হিসাবেই পরিগণিত।
আশার কথা হ’ল, আধুনিক মুসলিম যুবসমাজ এখন বেশ সচেতন হয়ে উঠছে। তারা এই পশ্চাৎপদতার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে মুসলিম সমাজকে কথায়-কাজে, চলনে-বলনে একটি সুসভ্য সমাজ হিসাবে গড়ে তোলার তাকীদ অনুভব করছে। তারা চেষ্টা করছে একটু একটু করে মানুষের মাঝে সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে। নিঃসন্দেহে এ কাজ কঠিন। তবুও শক্ত হাতে সকল বাধা পেরিয়ে যাবার হিম্মত থাকলে এই প্রয়াস অবশ্যই একদিন সফলতার মুখ দেখবে ইনশাআল্লাহ। তরুণ সমাজের প্রতি তাই আমাদের আহ্বান, আসুন! সামাজিক মূল্যবোধ চর্চায় আমরা নিজেরা যত্নবান হই এবং মানুষের মাঝে সততা, কল্যাণ ও ন্যায়ের বার্তাগুলো সাধ্যমত ছড়িয়ে দেই। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের সাহায্যার্থে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করি। নিদেনপক্ষে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং পরিবেশ রক্ষার মত অতি সাধারণ বিষয়গুলোতেও যদি গণজাগরণ তৈরী করা যায়, তবুও সমাজে কার্যকর ও টেকসই পরিবর্তন আসতে খুব বেশী সময় লাগার কথা নয়। সর্বোপরি এর মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন দুনিয়া ও আখেরাতে আমাদের অবস্থানকে অনেক উঁচু করবেন ইনশাআল্লাহ। প্রিয় তরুণ সমাজ! আমরা কি এই দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত আছি?
📄 ফিৎনা থেকে আত্মরক্ষা
বিগত বছরগুলোতে যুবসমাজের মধ্যে দ্বীনের ব্যাপারে সচেতনতা যথেষ্ট বেড়েছে আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তাদের মধ্যে অস্থিরতা এবং উদ্বিগ্নতা। তাদের সামনে নানামুখী চ্যালেঞ্জ। ক্যারিয়ার গঠনের চ্যালেঞ্জ। অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার চ্যালেঞ্জ। সামাজিক অবস্থান তৈরীর চ্যালেঞ্জ। পরিবারকে সন্তুষ্ট রাখার চ্যালেঞ্জ। সর্বোপরি নিজেকে পাপাচারমুক্ত রেখে দ্বীনের ওপর টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ। অথচ এতসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নেই তাদের যথাযথ নৈতিক ও মানসিক প্রস্তুতি। নেই তাদেরকে পথপ্রদর্শন করার মত কোন শক্তিশালী সমাজ কাঠামো। ফলে কিভাবে নিজেদের দ্বীনদারী অক্ষুণ্ণ রেখে এসব চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে এবং সফলভাবে তা উৎরানো যাবে-এটাই হ’ল সমকালীন দ্বীনদার যুবকদের প্রধান ভাবনা।
বস্তুতঃ একদিকে বস্তুবাদী সমাজের চাকচিক্যময় হাতছানি, চারিত্রিক অধঃপতন ঘটানোর জন্য যাবতীয় উপায়-উপকরণের সহজলভ্যতা; অন্যদিকে নানামুখী মতবাদ ও আদর্শের ডামাডোল। এর মধ্যে একজন দৃঢ় আত্মবিশ্বাসী এবং লক্ষ্যে অবিচল ব্যক্তির পক্ষেও যেখানে নিজেকে ধরে রাখা সহজসাধ্য নয়, সেখানে একজন সাধারণ দ্বীনদার যুবকের পক্ষে তা কতটা কঠিন; সেটা বলাই বাহুল্য। এজন্যই বোধহয় রাসূল (ছাঃ) তাঁর ছাহাবীদের লক্ষ্য করে বলেছেন, তোমাদের পরে এমন একটি সময় আসছে, যখন দ্বীনের উপর অটল থাকা ব্যক্তিদের প্রতিদান হবে তোমাদের মধ্যকার পঞ্চাশজন শহীদের সমপরিমাণ (সিলসিলা ছহীহাহ হা/৪৯৪)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, তোমাদের পর আসছে এমন একটি সময় যখন দ্বীনের উপর ধৈর্যসহকারে টিকে থাকা হবে হাতের মুঠোয় জ্বলন্ত অঙ্গার ধরে থাকার মত সুকঠিন (ঐ)।
এই সর্বগ্রাসী চ্যালেঞ্জ ও ফিৎনাসমূহকে বিদ্বানগণ মৌলিকভাবে দু’টি ভাগে ভাগ করেছেন, যা মানুষের নফস বা অন্তরের সাথে সম্পর্কিত।- (১) শাহওয়াত বা পাপপ্রবণতা (২) শুবহাত বা সন্দেহপ্রবণতা। পাপপ্রবণতার মধ্যে পড়ে যাবতীয় কৃপ্রবৃত্তিমূলক কর্ম, অন্যায় ও পাপাচার। আর সন্দেহ প্রবণতার মধ্যে পড়ে আল্লাহ্র দ্বীন সম্পর্কে যাবতীয় ভ্রান্ত সংশয়, অবিশ্বাস, সত্য দ্বীনকে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হওয়া কিংবা মিথ্যাকে সত্য ভেবে দিশেহারা হওয়া। নিজেকে যারা ফিৎনামুক্ত রাখতে চান, তাদেরকে এই ফিত্না দু’টির পরিচয় অবশ্যই জানতে হবে এবং হৃদয়জগত সাধ্যমত এতদুভয়ের প্রভাব থেকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। যেমন ভবিষ্যৎ বংশধরকে সকল ফিৎনা থেকে রক্ষার জন্য পিতা ইবরাহীম ও ইসমাঈল দো’আ করে বলেছিলেন, হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তাদের মধ্য থেকেই তাদের মধ্যে একজন রাসূল প্রেরণ করুন, যিনি তাদের কাছে আপনার আয়াত সমূহ পাঠ করবেন, তাদেরকে কিতাব ও সুন্নাত শিক্ষা দিবেন এবং তাদের (অন্তরসমূহকে) পরিচ্ছন্ন করবেন (বাক্বারাহ ২/১২৯)।
মানুষের নফস বা অন্তরের একাধিক চরিত্র আছে। যেমন কখনও তা মানুষকে অন্যায়ের প্রতি প্রলুব্ধ করে। একে নফসে আম্মারাহ বলা হয়, যার প্রভাব থেকে আমরা কেউই মুক্ত নই। আবার এই একই নফস মানুষকে অনুশোচনায় নিক্ষেপ করে এবং তার বিবেকশক্তিকে জাগ্রত করে দেয়, যখন সে কোন মন্দ কাজে লিপ্ত হয়। একে বলা হয় নফসে লাওয়ামাহ। আরেক ধরনের নফস রয়েছে, যা মানুষকে আল্লাহ্র কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ করায় এবং তাঁর আনুগত্যেই প্রশান্তি পায়। একে বলা হয় নফসে মুতুমাইন্নাহ। এটাই হ’ল নফসের পরিশুদ্ধ ও পবিত্র অবস্থান। যার জন্য প্রয়োজন নিরন্তর সাধনা। কুপ্রবৃত্তি থেকে বাঁচার তীব্র সংগ্রাম। মনের উপর যে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে, সেই সফল হ’তে পারে। এর প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আত্মাকে কুপ্রবৃত্তি হ’তে অবদমিত রাখল, তার বাসস্থান হল জান্নাত’ (নাযি’আত ৪০)।
প্রিয় পাঠক, নফসকে পরিশুদ্ধ করতে চাইলে ক্রমাগতভাবে শাহওয়াত ও শুবহাতের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়। পরিশুদ্ধি ও পরিচর্যার মাত্রা অনুযায়ীই নির্ধারিত হয় নফসের আচরণ। ইবনুল ক্বাইয়িম বলেন, ‘এই অনুশীলন করার সময় ব্যক্তিকে জানতে হবে যে, আজ সে যতবার আত্মশুদ্ধির প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, আগামীদিন তা তার জন্য ততটাই স্বস্তির কারণ হতে যাচ্ছে। আর যতবার সে শিথিল হচ্ছে, আগামী দিন তার জন্য ততটাই কঠিনভাবে ধরা পড়ার উপলক্ষ্য হ’তে যাচ্ছে। তাকে মনে রাখতে হবে যে, তার কর্ম থেকে অর্জিত মুনাফা হ’ল জান্নাতুল ফেরদাউসের সীমাহীন প্রশান্তিময় আবাসস্থল এবং মহান প্রভুকে দর্শনের সৌভাগ্য। আর লোকসান হওয়ার অর্থ নিশ্চিত জাহান্নাম ও প্রভুর দর্শন থেকে বঞ্চিত হওয়া। যে ব্যক্তি এই মানসিকতায় দৃঢ়প্রত্যয়ী হ’তে পারে, পার্থিব জীবনের হিসাব-নিকাশ তার নিকট গৌণ হয়ে পড়ে। অতএব একজন প্রকৃত মুমিনের কর্তব্য হ’ল আত্মসমালোচনায় গাফলতি না করা এবং অন্তরের গতি-প্রকৃতি ও প্রতিটি পদক্ষেপকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। কেননা আত্মা এমন এক অমূল্য সম্পদ, যা দ্বারা মানুষ সেই গুপ্তধনের অধিকারী হ’তে পারে যা অনন্তকাল ধরে কখনই নিঃশেষ হয় না। এই অমূল্য আত্মাকে যারা কলুষময় করে ধ্বংস করে ফেলে এবং তুচ্ছ প্রাপ্তির বিনিময়ে তার জন্য অবর্ণনীয় ক্ষতি ডেকে আনে সে ব্যক্তি পৃথিবীর সর্বাধিক নির্বোধ ও বিচারজ্ঞানহীন ব্যক্তি। শেষ বিচারের দিনে সে তার পরিণতি জানতে পারবে। আল্লাহ বলেন, ‘সেদিন প্রত্যেক আত্মা যে সৎকর্ম করেছে ও বদকর্ম করেছে তা উপস্থিত পাবে’ (আলে ইমরান ৩০; ইগাছাতুল লাহফান মিন মাছায়িদিশ শয়তান ১/৮৫ পৃঃ)।
সর্বোপরি নফসকে যাবতীয় ফিৎনা থেকে হেফাযত করা এবং সার্বক্ষণিক পরিচর্যার মধ্যে রাখার জন্য পবিত্র কুরআনে কয়েকটি ব্যবহারিক পদক্ষেপ উল্লেখ করা হয়েছে, যার অনুশীলন করা আমাদের জন্য অত্যন্ত যরূরী। যেমন :
ক. কুরআন অধ্যয়ন করা : দুনিয়াতে মানুষের জন্য আল্লাহ্ পক্ষ থেকে সর্বাধিক জীবন্ত নিদর্শন হ’ল আল-কুরআন। কুরআন তেলাওয়াত মানুষের অন্তর প্রশান্ত করে। তাই নফসের পরিশুদ্ধির জন্য নিয়মিত কুরআন পাঠ করা ও তা অনুধাবন করা আমাদের কর্তব্য। সেই সাথে কুরআনী বিধান অনুযায়ী নিজের জীবনকে ঢেলে সাজানোর অনুশীলন আমাদেরকে যাবতীয় ফিৎনা থেকে সুরক্ষা দিতে পারে। কেননা আল্লাহ এই কুরআন দ্বারাই মানুষের অন্তরকে সুদৃঢ় করেন এবং বাতিল থেকে সুরক্ষা দান করেন (ফুরক্বান ২৫/২২)।
খ. রাসূল (ছাঃ)-এর জীবনী পাঠ করা : পবিত্র কুরআনে নবী-রাসূলদের ঘটনাবলীসহ বহু শিক্ষণীয় কাহিনী উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনাসমূহ মানুষকে বাস্তবতা অনুধাবনে সহায়তা করে। রাসূল (ছাঃ)-এর সীরাত এমন অসংখ্য ঘটনায় পরিপূর্ণ, যা একজন মুমিনকে প্রতিটি মুহূর্তে ঈমানী চেতনায় উদ্দীপ্ত রাখে। ন্যায় ও কল্যাণের পথে অটল থাকার জন্য প্রেরণা যোগায়। এজন্য নিয়মিত সীরাত পাঠে অভ্যস্ত হ’তে হবে। অনুরূপভাবে আল্লাহ প্রেরিত অন্যান্য নবীদের কাহিনীসমূহও পাঠ করা যরূরী। কেননা এ সকল ঘটনা নানামুখী বিপদাপদে মানুষকে কী করতে হবে তা স্মরণ করিয়ে দেয়, যা তাকে ফিৎনা থেকে আত্মরক্ষার ঐকান্তিক আত্মবিশ্বাস যোগায়। আল্লাহ বলেন, ‘রাসূলদের ঐ সকল বৃত্তান্ত আমি তোমার নিকট বর্ণনা করছি। এর দ্বারা আমি তোমার হৃদয়কে সুদৃঢ় করি’ (হৃদ ১১/১২০)।
গ. ইলম অনুযায়ী আমল করা : ফরয ও নফল আমলসমূহ আমাদের ঈমানের সবচেয়ে বড় খাদ্য। ফিৎনা থেকে নিজের ঈমানকে রক্ষার জন্য আমলে অগ্রগামী হওয়ার কোন বিকল্প নেই। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘আঁধার রাতের মত ফিৎনা ঘনিয়ে আসার পূর্বেই তোমরা সৎআমলের দিকে ধাবিত হও। সে সময়ে সকালে একজন মুমিন হ’লে বিকালে কাফের হয়ে যাবে। বিকেলে মুমিন হ’লে সকালে কাফের হয়ে যাবে। মানুষ দুনিয়াবী লাভের কিংবা স্বার্থের জন্য তার দ্বীনকে বিক্রি করে ফেলবে’ (মুসলিম ২/২১৩)। সুতরাং ইবাদতে মনোযোগী হওয়া ও প্রতিনিয়ত সৎআমলের অনুশীলন করা, মসজিদের সাথে অন্তরকে সংযুক্ত রাখা, কুরআনকে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা, দ্বীনী জ্ঞান অর্জন করা প্রভৃতি সৎকর্মের মাধ্যমে নিজের ঈমানকে সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার আমরা অধিকাংশ সময় জেনেশুনেও হারাম কর্ম ছাড়তে চাই না কিংবা গড়িমসি করি। ফলে সহজেই আমাদের ঈমান দুর্বল ও অরক্ষিত হয়ে পড়ে। এজন্য সৎআমলের সাথে সাথে অসৎআমল পরিত্যাগ করাও সমভাবে কিংবা অধিকতর যরূরী (নিসা ৪/৬৬)।
ঘ. আল্লাহ্র রাস্তায় খরচ করা: আত্মত্যাগ ও আত্মোৎসর্গ ব্যতীত জীবনের কোন মহৎ লক্ষ্যই অর্জিত হয় না। এজন্য আল্লাহ কুরআনে বার বার নিজের ধন-সম্পদ থেকে খরচ করার জন্য উৎসাহিত করেছেন। যখন কেউ নিঃস্বার্থভাবে আল্লাহ্ পথে খরচ করে, তখন তার অন্তর্জগতে পরিশুদ্ধিতা আসে, খুলুছিয়াতের ফল্গুধারা প্রবাহিত হয়। সে হকের উপরে দৃঢ় থাকার শক্তি অর্জন করে (বাক্বারাহ ২/২৬৫)।
ঙ. সৎব্যক্তিদের সাথে সম্পর্ক গড়া সমাজে চলার জন্য মানুষের সাথে মিশতেই হয়। আর সেই মানুষ যদি সৎ হন এবং সুপথপ্রদর্শনকারী হন, তবে নিজেকে আল্লাহ্ আনুগত্যের উপর ধরে রাখা অনেক সহজ হয়ে যায়। এজন্যই ইসলামে সৎসঙ্গী নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে (তওবা ৯/১১৯, কাহফ ১৮/২৮)। সুতরাং ফিৎনা থেকে বাঁচতে নেককার মানুষদের সান্নিধ্যে থাকা খুবই যরূরী। দ্বীনী সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ততা বা জামাআ’তবদ্ধ জীবন যাপনের মাধ্যমে এই উদ্দেশ্য হাছিল করা সম্ভব।
চ. আল্লাহ্র কাছে দো’আ করা একজন মুমিনের নিষ্ঠা এবং আল্লাহ্র প্রতি তাওয়াক্কুল প্রকাশ পায় তার দো’আর মাধ্যমে। এজন্য দো’আকেই ইবাদত বলা হয়েছে। অতএব ফিৎনা থেকে বাঁচার জন্য সর্বদা আল্লাহ্র নিকট কায়মনোবাক্যে সাহায্য চাইতে হবে। তাঁর খাছ রহমতই কেবল আমাদের ফিৎনা থেকে বাঁচাতে পারে (ইউসুফ ১২/৫৩)।
এজন্য রাসূল (ছাঃ) এই দো’আটি সর্বদা পাঠ করতেন- ‘ইয়া মুক্বাল্লিবাল কুলুব ছাব্বিত কালবী আলা দ্বীনিকা’ (হে অন্তর সমূহের পরিবর্তনকারী! তুমি আমার অন্তরকে তোমার দ্বীনের উপর অবিচল রাখ)। আনাস (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমরা ঈমান এনেছি আপনার প্রতি এবং আপনি যা কিছু নিয়ে এসেছেন তার প্রতি। তবুও কি আপনি আমাদের ব্যাপারে আশংকা করেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ! কেননা মানুষের অন্তরগুলো আল্লাহ্র দুই আঙ্গুলের মাঝে রয়েছে। তিনি যেভাবে খুশী অন্তরের পরিবর্তন ঘটান (তিরমিযী হা/২১৪০, সনদ ছহীহ)। সুতরাং নিজেকে দুনিয়াবী ফিৎনার জোয়ার থেকে রক্ষা করতে হ’লে থেকে উপরোক্ত পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে নিরন্তর সাধনা করে যেতে হবে।
নফসের উপর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে হবে। তবে এজন্য সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন হ’ল ফিৎনা থেকে বাঁচার জন্য নিজের অন্তরের প্রচণ্ড তাকীদ এবং সদিচ্ছা। আমি না চাইলেও ফিৎনায় জড়িয়ে যাচ্ছি অর্থ আমার প্রতিজ্ঞা সবল নয়। যদি কেউ সত্যিকার অর্থে ফিৎনা থেকে বাঁচতে চায় এবং সর্বান্তঃকরণে প্রচেষ্টা চালায়, তবে আল্লাহ তাকে সুপথ প্রদর্শন করবেনই ইনশাআল্লাহ। আর এটা আল্লাহ্ ওয়াদা (আনকাবূত ২৯/৬৯)।