📄 জীবনটাকে গড়তে হবে
আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে দ্রুত ধাবিত হও। যার প্রশস্ততা আসমান ও যমীন পরিব্যপ্ত। যা প্রস্তুত করা হয়েছে আল্লাহভীরুদের জন্য।’ -আলে ইমরান ৩/১৩৩।
দিন যায়, দিন আসে। স্বপ্নবিভোর মানুষ আপন গতিতে ছুটতে থাকে। অধরা জাগতিক স্বপ্নের পিছনে। ধোঁকাময় দুনিয়ার পিছনে। অন্যের সাথে লিপ্ত হয় হাস্যকর প্রতিযোগিতায়। পদ কিংবা সম্পদের। স্বার্থ কিংবা সুনামের। অর্থহীন কাজে আর খেল-তামাশায় ভীষণভাবে অপচয় করতে থাকে ‘সময়’ নামক মহামূল্যবান সম্পদ। ভুলে যায় তার আসল স্বপ্নের কথা। চিরন্তন গন্তব্যের কথা। ভুলে যায় জান্নাতের অফুরন্ত নে’মতের কথা, জাহান্নামের কল্পনাতীত শাস্তির কথা। এই আত্মভোলা মানুষকে সচকিত করতেই যেন মহান আল্লাহ্ দরদী সতর্কবার্তা- হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আর প্রত্যেকেরই ভেবে দেখা উচিৎ যে, সে আগামীকালের জন্য কী অগ্রিম পাঠিয়েছে। ...আর তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, ফলে আল্লাহ্ তাদেরকে আত্মভোলা করে দিয়েছেন। তারাই হ’ল পাপাচারী (হাশর ১৮-১৯)। এই ভীষণ প্রতারণামুখর জগৎটাকে তিনি এক লাইনে সংজ্ঞায়িত করে বলেন- ‘তোমরা জেনে রেখ যে, পৃথিবীর জীবন তো ক্রীড়া- কৌতুক, জাঁকজমক, পারস্পরিক গর্ব প্রকাশ আর ধন-সম্পদ ও সন্তান- সন্ততিতে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ব্যতীত আর কিছুই নয়’ (হাদীদ ২০)।
মূলতঃ পৃথিবীর এই জীবনের দু’টি রূপ। একটি তার দৃশ্যমান কিন্তু ধোঁকাময় রূপ। অপরটি অদৃশ্য কিন্তু বাস্তব রূপ। পর্দার সামনে বসে থাকা দর্শক যেমন জানে না পর্দার পিছনে কি হচ্ছে, তেমনি দুনিয়াবী নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা মানুষগুলো বোঝে না পৃথিবীর এই রঙ্গমঞ্চের পিছনে অলক্ষ্যে কী ঘটছে। যদিও সে নিজেকে বড়ই বুদ্ধিমান ভাবে। অতঃপর একদিন যখন সময় ঘনিয়ে আসবে, চোখটা বন্ধ হওয়া মাত্রই মুহূর্তে সে সবকিছু বুঝে ফেলবে। চোখের সামনে থেকে মরীচিকার পর্দা যেদিন উন্মুক্ত হয়ে যাবে, সবকিছুর বাস্তবতা যখন সে স্বচক্ষে দেখবে, তখন তার হতবুদ্ধি চেহারার দিকে লক্ষ্য করে আল্লাহ বলবেন, ‘তুমি তো এই দিবস সম্পর্কে উদাসীন ছিলে, এখন তোমার সামনে থেকে পর্দা উঠিয়ে নিয়েছি। সুতরাং এখন তোমার দৃষ্টিতে সবকিছু পরিষ্কার’ (ক্বাফ ২২)।
প্রিয় পাঠক, আমাদের এই পার্থিব জীবনটা নিরেট পরীক্ষার জীবন। এই পরীক্ষার সিলেবাস, পাঠ্যক্রম সবার জন্য একই। প্রশ্ন ও উত্তরপত্রও একই। হিন্দু হোক, খ্রীষ্টান হোক, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সবাই আমরা একই পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থী। একজন সচেতন পরীক্ষার্থী যেমন সতর্কতার সাথে তার পরীক্ষার সিলেবাস সবচেয়ে সঠিক উপায়ে এবং যথাযথভাবে পূরণ করার জন্য সাধ্যমত প্রচেষ্টা চালায়, হাযারো পরিকল্পনা সাজায়; ঠিক তেমনিভাবে একজন সচেতন মুসলিমকে নিজের জীবন পরীক্ষায় ভালোভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে নিজেকে তৈরী করতে হয়, গড়ে তুলতে হয়।
সুতরাং আমরা যারা সচেতন, যারা জীবনের প্রকৃত মূল্য অনুধাবন করি, তাদেরকে অবশ্যই আপন আপন জীবনকে সাজাতে হবে এই মহাপরীক্ষাকে কেন্দ্র করেই। যার কাছে এই জীবনপরীক্ষার গুরুত্ব যত বেশী, তার প্রস্তুতিও তত বেশী এবং তার অর্থহীন কর্ম ও সময়ের অপচয়ও তত কম। সে সর্বদা নিজেকে সে পথেই পরিচালনা করতে চায়, যেখানে সে নিজেকে আগামীতে দেখতে চায়।
এক্ষণে জানা আবশ্যক যে, কিভাবে আমরা এই প্রস্তুতি গ্রহণ করব? কিভাবে পরিকল্পনামাফিক জীবনটাকে সাজিয়ে তুলব? এর উপকরণগুলো কী হবে? হ্যাঁ, এই প্রস্তুতির উপকরণ ও সিলেবাসের প্রাপ্তি আল্লাহ আমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন। এমনকি এর জন্য পবিত্র কুরআনের বড় অংশ অধ্যয়নেরও প্রয়োজন হবে না। কেননা অত্যন্ত সংক্ষেপে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তা কুরআনের অন্যতম সংক্ষিপ্ত সূরা আল-আছর-এই উল্লেখ করেছেন। যা নিম্নরূপ-
(১) এক আল্লাহ্র প্রতি বিশুদ্ধ ঈমান আনা: জীবনটাকে গড়তে হ’লে আমাদের সর্বপ্রথম কর্তব্য জীবনের মূল লক্ষ্য তথা গন্তব্য নির্ধারণ করা। কারণ এই গন্তব্যের শুদ্ধতাই আমাদের চলার পথের শুদ্ধতা নির্ণয় করে। গন্তব্য যদি ভুল হয়, তাহলে বাকী সবকিছুই ভ্রান্ত হয়ে যায়। এটাই হ’ল ছিরাতুল মুস্তাকীমের পথ, যার মূল উপজীব্য হ’ল, নির্ভেজাল তাওহীদী আক্বীদা- যাতে এক আল্লাহ্র প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ থাকে এবং তাঁর ইবাদতে অন্য কাউকে শরীক না করার সুদৃঢ় প্রতিজ্ঞা থাকে। এই দর্শনের মূল কথা হ’ল- আমরা একমাত্র আপনারই ইবাদত করি, একমাত্র আপনার কাছেই সাহায্য চাই। এই দর্শনের মূল রস হ’ল- সবকিছু কেবল আল্লাহ্র উদ্দেশ্যেই হবে, যার নাম ইখলাছ। এই দর্শন মোতাবেক চলার পথ হ’ল- রিসালাত ও আখেরাত। রিসালাত হ’ল ছিরাতুল মুস্তাকীমের পথ আর গন্তব্য হ’ল আখেরাত। এই তাওহীদ-রিসালাত-আখেরাত দর্শনই আমাদের জীবন গড়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক উপাদান। অত্যন্ত ভয়ংকর ব্যাপার যে, বিশ্বজাহানের সামান্য গুটি কয়েক মানুষ ব্যতীত বাকি সকলেই জীবন পরীক্ষার এই পয়লা সবকটি সম্পর্কে হয় বেখবর, নয়তো উদাসীন। অথচ এই জ্ঞান না থাকলে কোন অবস্থাতেই জান্নাতে প্রবেশের সুযোগ নেই। এজন্য আল্লাহ বলেন, ‘অতএব তুমি জেনে নাও, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নেই’ (মুহাম্মাদ ১৯)। যাদের এই জ্ঞান নেই তাদেরকে আল্লাহ চতুষ্পদ জন্তুর সাথে তুলনা করে বলেন, ‘আমরা বহু জিন ও মানবকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি। তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তা দ্বারা তারা উপলব্ধি করে না, তাদের চোখ আছে তা দ্বারা তারা দেখে না, আর তাদের কান আছে তা দ্বারা তারা শুনে না; তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত, বরং তার চেয়েও বেশী বিভ্রান্ত। তারাই হ’ল উদাসীন’ (আল-আ’রাফ ১৭৯)। চতুষ্পদ জন্তুর সাথে তুলনার কারণ হ’ল- একটি গরুকেও যদি লাঠিপেটা করা হয়, সে লাঠির দিকে নয়; বরং লাঠি বহনকারী লোকটির দিকে তেড়ে যায়। কারণ সেও জানে লাঠির মত জড়বস্তুর কোন ক্ষমতা নেই। অথচ একশ্রেণীর উদাসীন মানুষ জড় পৃথিবীর যিনি সৃষ্টিকারী, পরিচালনাকারী-তাকেই চেনে না। বরং তাঁর সৃষ্টবস্তুসমূহকে ক্ষমতাধর কল্পনা করে পুজা করে, অনুসরণ করে। সুতরাং শিরকমুক্ত বিশুদ্ধ ঈমান জীবনে সফলতা অর্জনের প্রথম পাঠ।
(২) সৎআমল করা: যা কিছু আল্লাহ করতে বলেছেন, তা করা; যা থেকে নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাকার নামই সৎআমল। আল্লাহ কি করতে বলেছেন-না বলেছেন তা জানার জন্য অপরিহার্য হ’ল দলীল। আর সেই দলীল হ’ল রাসূল (ছাঃ)-এর আনীত দু’টি মৌলিক বস্তু- (১) পবিত্র কুরআন ও (২) ছহীহ হাদীছ। আবার এই দলীল অনুসরণের মানদণ্ড হ’ল- রাসূল (ছাঃ) ও ছাহাবীদের তরীকা বা অনুসৃত পথ, যাকে বলা হয় সালাফে ছালেহীনের মানহাজ। অর্থাৎ ছাহাবীরা কুরআন ও ছহীহ হাদীছকে যেভাবে বুঝেছিলেন, সেভাবে বোঝা। তাদের বুঝের বিপরীত কোন বুঝ ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। কোন আমল তখনই সৎআমল হিসাবে গণ্য হবে যখন তা উপরোক্ত মানদণ্ডসমূহে উত্তীর্ণ হয়। এর বাইরে কোন ধর্মীয় ও সামাজিক রসম-রেওয়াজ ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়, বরং তা বিদআ’ত এবং কুসংস্কার হবে, মানুষ সেটা যতই ভাল কাজ মনে করে করুক না কেন। সুতরাং সফল জীবন লাভের জন্য নিজের আমলনামাকে যেমন ফরয ও নফল ইবাদতসমূহ এবং সৎআমল দিয়ে সাজাতে হবে, তেমনি লক্ষ্য রাখতে হবে যেন সৎআমলগুলো রাসূল (ছাঃ) কর্তৃক অনুমোদিত হয়, কোন মনগড়া আমল বা রসম-রেওয়াজ না হয়। অনুরূপভাবে যাবতীয় প্রকার হারাম উপার্জন এবং পাপ ও অন্যায়ের কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। সেই সাথে তওবা-ইস্তিগফার, যিকির-আযকার ও দান-ছাদাক্বার মাধ্যমে নিজের অন্তর ও কর্মজগতকে সাধ্যতম শুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
(৩) মানুষকে কল্যাণের পথে দাওয়াত দেয়া : কেবল নিজেকে নয়, বরং অন্যকেও সুন্দর জীবন গঠনের কাজে সহযোগিতা করা আমাদের অন্যতম কর্তব্য। যাতে সমাজ জীবন পাপ-পঙ্কিলতামুক্ত হয়, অন্যায়-অবিচার দূর হয়। সমাজের মানুষ ভাল না থাকলে নিজে ভাল থাকা যায় না। সমাজে অনাচার-দুরাচার থাকলে তার প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা সম্ভব হয় না। সেজন্য এই সামাজিক দায়িত্ব পালনকে আল্লাহ মুসলিম উম্মাহর জন্য অপরিহার্য করে দিয়েছেন। এই দায়িত্ব যিনি যথাযথভাবে পালন করেন, তার নিজের জন্যও এতে রয়েছে অফুরান ছওয়াব। যাকে দাওয়াত দিয়ে সৎপথে চলার জন্য সহযোগিতা করা হবে, তার সমপরিমাণ ছওয়াব পাবেন তিনিও, যিনি সহযোগিতা করবেন। তবে শর্ত হ’ল- দাওয়াত হ’তে হবে একমাত্র রাসূল (ছাঃ)-এর দেখানো পথে, নিজের মনগড়া পথে নয়। দাওয়াত হ’তে হবে কেবল আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্য, নিজের স্বার্থ হাছিলের জন্য নয়। তবেই এই দাওয়াত নিজের জন্য এবং জনসমাজের জন্য বৃহত্তর কল্যাণ বয়ে আনবে।
(৪) ধৈর্যধারণ করা : জীবন গড়ার এই পথ নিঃসন্দেহে মোটেই সহজ নয়। প্রতি মুহূর্তে এতে বাধা আসবে, প্রতিরোধ আসবে, চ্যালেঞ্জ আসবে। যে যত অবিচল গতিতে এগিয়ে চলবে, তাকে তত বেশী এই বাধা মোকাবিলা করতে হবে। এই বাধার মুখে প্রতিরোধ প্রাচীর হয়ে যেই বর্ম আমাদের সর্বাধিক সুরক্ষা দিতে পারে- তার নাম ধৈর্য, ধৈর্য এবং ধৈর্য। যে কোন মূল্যে জীবন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হ’তে হবে-এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে দাঁতে দাঁতে চেপে এই পথে টিকে থাকার নামই ধৈর্য। ধৈর্য তিন প্রকার- (১) দুনিয়াবী বিপদাপদে ধৈর্য ধরা, (২) আল্লাহ্র আনুগত্যের উপর টিকে থাকার জন্য ধৈর্য ধারণ, (৩) পাপাচার ও কুপ্রবৃত্তির তাড়না থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রাখার যুদ্ধে ধৈর্য ধারণ। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে কোন না কোন ভাবে আমাদেরকে ধৈর্যের এই তিনটি রূপেরই মুখোমুখি হতে হয়। এজন্যই পবিত্র কুরআনে আল্লাহ অসংখ্যবার ছবর বা ধৈর্যকে মুমিনের আবশ্যিক গুণ হিসাবে উল্লেখ করেছেন।
জীবনকে সফলতার সাথে গড়ে তুলতে হলে উপরোক্ত চারটি মৌলিক উপকরণ আবশ্যক। যে অবস্থানেই আমরা থাকি না কেন, যদি উক্ত সূত্রগুলো প্রয়োগ করতে পারি, নিঃসন্দেহে আমরা দুনিয়া ও আখেরাতে চূড়ান্তভাবে সফল হতে পারব ইনশাআল্লাহ।
মনে রাখতে হবে আমাদের জীবনে সফলতা অর্জনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হ’ল শয়তান। সে আমাদের প্রকাশ্য শত্রু। আমাদের বিশ্বাসে সংশয় ঢুকিয়ে, অন্তরে কুমন্ত্রণা যুগিয়ে, শুবহাত ও শাহওয়াতের ঘোর লাগা চকচকে হাতিয়ার চালিয়ে সে সদা-সর্বদা ছুটছে তার ওয়াদা বাস্তবায়নের পথে। আল্লাহ্র কাছে তার চিরন্তন শপথ- ‘আমি অবশ্যই পাপ ও অন্যায় কাজকে মানুষের কাছে সুশোভিত করে তুলব, তাদের সকলকেই বিপথগামী করে ছাড়ব। তবে আপনার একনিষ্ঠ বান্দাদের ছাড়া’ (হিজর ৩৯-৪০)।
তাওহীদী আক্বীদা-বিশ্বাসে কুমন্ত্রণা ঢোকাতে পারা তার সবচেয়ে বড় সফলতা। ভক্তি আর যুক্তির চোরাস্রোত দিয়ে কোনভাবে যদি সে বিশ্বাসের ফাটল ধরাতে পারে। যদি শিরক আর বিদ’আতের ফাঁদে আটকাতে পারে, যদি অন্তরে নিফাকীর ফর্মালিন মেশাতে পারে, তাহলেই সে সফল। যদি তাতে ব্যর্থ হয়, তখন সে শুরু করে আরেক মিশন। কখনও আমাদের চলার পথে কাঁটা বিছায়, কখনও আমল নষ্ট করার চেষ্টা চালায় আবার কখনও আমলের ঘাটতি ঘটানোর চেষ্টায় অবিচল থাকে।
সব চেষ্টা যখন ব্যর্থ হয়ে যায়, তখন সে সর্বশেষ চাল হিসাবে নিয়তটাকে নষ্ট করার সুযোগ নেয়। ভালো কাজ থেকে বিরত রাখতে না পারলে সে আপ্রাণ চেষ্টা করে যেন সেই ভালো কাজ যেন কোন মতেই আল্লাহর জন্য না হয়। আর এভাবে ভালো কাজের মধ্যেও ইখলাছটাকে নিষ্ক্রিয় করে দিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ ও নিফাকীর বিষবাষ্প ঢুকিয়ে দেয়। বান্দা যখন নিশ্চিত যে, এবার বোধহয় সে সফল হ’ল, শয়তানের হাত থেকে বোধহয় সে এখন নিরাপদ, ঠিক তখনই তাকে সর্বহারা করার এমন ভয়ংকর সূক্ষ্ম আয়োজন করে শয়তান (কাহফ ১০৩)।
শয়তানের এই মায়াজাল থেকে নিজেকে বাঁচাতে উপরোক্ত চার মূলনীতির চতুর্থ মূলনীতি ছবর বা নিরন্তর ধৈর্যের কোন বিকল্প নেই। যিনি যত বেশী ধৈর্য অবলম্বন করতে পারেন, তিনি তত বেশী ইস্তিকামাত অর্জন করতে পারেন। শয়তানের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা ততবেশী তার বৃদ্ধি পায়।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, জীবনের সফলতাকে যেন আমরা ধন-সম্পদ, পদমর্যাদা, দুনিয়াবী প্রাচুর্য কিংবা সুখ-শান্তি দিয়ে না মাপি। কেননা দুনিয়াবী জীবন বড়ই বৈচিত্র্যময়। এখানে সফলতার সংজ্ঞা সবার জন্য এক নয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের মাঝে হাযারো রং ও বর্ণের মানুষ সৃষ্টি করেছেন। কাউকে ধনী করেছেন, কাউকে করেছেন দরিদ্র। কাউকে সুবিধাভোগী করেছেন, কাউকে সুবিধাহীন। জীবনে কখনও আনন্দ আসবে, হতাশা আসবে। আক্ষেপ থাকবে, অভিমান থাকবে। পাপ থাকবে, ইস্তিগফার থাকবে। ভুল থাকবে, তওবা থাকবে। উত্থান আসবে, পতন আসবে। স্বচ্ছলতা আসবে, দারিদ্র্য আসবে। এসবই জীবনের নিত্য অনুষঙ্গ। ব্যক্তিভেদে প্রতিটি বিষয়ের মধ্যেই আল্লাহ কারো জন্য সফলতা রেখেছেন, কারো জন্য বিফলতা। সুতরাং কেউ দরিদ্র মানেই ব্যর্থ নয়; আবার ধনী হলেই সফল নয়।
অপরদিকে পার্থিব জীবনে পরম সুখ কিংবা চরম দুঃখ বলেও কিছু নেই। সবকিছু মিলেই মানবজীবন। তথাকথিত সুখের নেশায় ছুটে বেড়ানো মানুষ এক সময় নিশ্চিত অনুধাবন করে- জীবনে আসলে চূড়ান্ত সুখ বলে কিছু নেই। হ্যাঁ, এই পৃথিবীর জীবন সেই অর্থে পুরোপুরি সুখের কখনই হবে না। কেননা দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী। চিরস্থায়ী সুখের জায়গা একমাত্র জান্নাত। তবুও এ জীবনে সর্বাবস্থায় একটা সুখময় অনুভূতির জায়গা আল্লাহ রেখেছেন। যার চাবিকাঠি জানা আমাদের জন্য যরূরী। আর তা হ’ল- (১) সর্বাবস্থায় আল্লাহ্র শুকরিয়া আদায় করা, যা আসে তাক্বদীরের প্রতি বিশ্বাস তথা আল্লাহ্ সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্টি থেকে। (২) নিয়মিত ধৈর্য ধারণের অনুশীলন করা, যা আসে তাওয়াক্কুল বা আল্লাহ্র প্রতি আশাবাদপূর্ণ ভরসা থেকে। সুতরাং জীবনটাকে গড়তে হ’লে আমাদেরকে শুকরিয়া ও ছবরের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে আসতে হবে, প্রতিনিয়ত অনুশীলনের মাধ্যমে তা অর্জন করতে হবে (মুসলিম হা/২৯৯৯)।
অতএব আসুন! আমরা আখেরাতের জন্য বাঁচি। প্রতিটি সময়কে আখেরাতের জন্য ব্যয় করি। জীবনের পরিকল্পনাটা এমনভাবে সাজাই, যেন আখেরাতের সফলতাই আমাদের মূল ভাবনা হয়। আমাদের এই সফলতা পূর্ণতা পাবে না, যদি না পরিবার ও সমাজ সবাইকে নিয়ে পরকালে মহাসফলতা অর্জনের পরিকল্পনা আমাদের থাকে। এটাই প্রকৃত সমাজ গড়ার সংগ্রাম। এই সংগ্রামে আমাদের অবতীর্ণ হ’তে হবে, যদি আমরা প্রকৃত সফল হ’তে চাই (সূরা ছফ ১০-১৩)। আমরা জীবনটাকে যেন এমনভাবে না সাজাই, যাতে পৃথিবীতে আমাদের আসা না আসা সমান হয়ে যায়। এমন জীবন যেন না হয়, যে জীবন খালি হাতে আসে, আবার খালি হাতে ফিরে যায়, কিছুই নিতে পারেনা। এমন মহাব্যর্থতা নিয়ে যেন আমরা জীবনটা শেষ না করি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে সঠিক পথে নিজের জীবন গড়ে তোলার তাওফীক দান করুন এবং চিরস্থায়ী জীবনের সর্বোচ্চ অর্জন তথা জান্নাতুল ফেরদাউসের পথে পরিচালিত করুন। আমীন!
📄 জীবন এক নিরন্তর পরীক্ষা
দুনিয়াবী জীবনের রূঢ় বাস্তবতা, দৈনন্দিন জীবন-জীবিকার অবিশ্রান্ত মহড়া আমাদের এতটাই আত্মভোলা করে রাখে যে, প্রায়শঃই আমরা বিস্মৃত হই যে, দুনিয়াবী জীবন আমাদের জন্য পরীক্ষা ক্ষেত্র। আমাদের প্রাত্যহিক যাপিত জীবন, আমাদের উপর আপতিত বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্ট, সুখ-আনন্দ সবকিছুই এই পরীক্ষার নিত্য অনুষঙ্গ। আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি আচরণের অন্তরালে চলমান থাকে চুলচেরা হিসাব-নিকাশ (যিলযাল ৯৯/৭-৮)।
সবকিছুর মধ্যেই নিহিত মহান স্রষ্টার এক নিখুঁত কর্মকৌশল, যার পশ্চাতে লুকিয়ে থাকে বইয়ের পৃষ্ঠার মত ধারাবাহিক একের পর এক এলাহী নিদর্শন আর কার্যকারণ। কখনও এই পরীক্ষা এতই সূক্ষ্ম যে, তার বাস্তবতা অনুভব করতে আমাদের সীমিত জ্ঞান ও বিবেক একান্তই অক্ষম। কখনও পরীক্ষার ধরণগুলোও এমন বিস্তৃত শাখা-প্রশাখাময় যে, বাস্তবিকপক্ষে তা যে কোন পরীক্ষার অংশ, তাও আমাদের ধারণার অতীত হয়।
কখনও মহান রব সুনিশ্চিত বিপদ কিংবা মৃত্যুর হাত থেকে আমাদের বাঁচিয়ে পরীক্ষা নেন- আমরা কতটুকু রবের প্রতি শোকরগুযার; আবার কখনও কঠিন বিপদ চাপিয়ে পরীক্ষা নেন- কতটুকু আমরা রবের সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট। কখনও আমাদের মধ্যে মতভেদের স্রোতে ছেড়ে দিয়ে পরীক্ষা নেন- কে আমাদের মধ্যে রবের বিধানের প্রতি আনুগত্যশীল আর কে সীমালংঘনকারী। কখনও মানুষকে দলে দলে বিভক্ত করে পরীক্ষা নেন- কে সঠিক পথের উপর অবিচল থাকতে চায় আর কে পথভ্রষ্ট। কখনও দুনিয়াবী প্রলোভনের বস্তুগুলো সামনে হাযির করে পরীক্ষা নেন- কে রবকে বেশী অগ্রাধিকার দেয় আর কে নিজের নফসকে। কার নিয়ত শুদ্ধ আর কার নিয়ত অশুদ্ধ। কখনও পারস্পরিক দুনিয়াবী স্বার্থ সামনে এনে পরীক্ষা নেন- দুনিয়ার মোহ আমাদের কাছে বড়, নাকি পরকালীন মুক্তি। অন্যের হক রক্ষা করা যরূরী, নাকি নিজের অন্যায় স্বার্থসিদ্ধি।
কখনও সফলতা দিয়ে পরীক্ষা নেন-আমরা অহংকারী, নাকি রবের রহমতের ভিখারী। কখনও বিফলতা দিয়ে পরীক্ষা নেন- আমরা বেসামাল অনুযোগকারী, নাকি কল্যাণের প্রত্যাশায় ধৈর্যধারণকারী। কখনও দারিদ্র্য চাপিয়ে দিয়ে পরীক্ষা নেন- আমরা হালাল নাকি হারাম উপার্জনের প্রত্যাশী। কখনও ধনাঢ্য করে পরীক্ষা নেন- আমরা হালাল পথে ও নেকীর কাজে ব্যয়ের অভিলাষী, নাকি হারাম বিলাস-ব্যাসনে সম্পদ অপচয়কারী। কখনও পাপের কাজের সম্মুখীন করে পরীক্ষা নেন- কতটা আমরা রবের প্রতি প্রত্যাবর্তনশীল ও তওবাকারী আর কতটা অবাধ্য ও স্বেচ্ছাচারী। কখনও নেকীর কাজ করিয়ে পরীক্ষা নেন- কতটা তা আল্লাহ্ জন্য ইখলাছপূর্ণ আর কতটা ব্যক্তিস্বার্থ কিংবা দুনিয়াবী প্রাপ্তির জন্য। কখনও দ্বীনদারীর পরীক্ষা নেন- কতটা আমরা আল্লাহ্ ভয়ে দ্বীন পালন করি, আর কতটা মানুষের প্রতি অন্ধ ভালবাসা, অধিকাংশের ভয় কিংবা ব্যক্তিগত গোড়ামি থেকে পালন করি। এরূপ হাযারো মাধ্যমে, হাযারো পদ্ধতিতে প্রতিনিয়ত আল্লাহ আমাদের পরীক্ষা নেন এবং নিচ্ছেন, সফলতা-ব্যর্থতার হিসাব রাখছেন। আমাদের অগোচরে।
দৈনিন্দন জীবনে আমাদের আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়বস্তু থাকে দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, সম্পদহানি ইত্যাদি। অথচ এসব বিষয় মানবজীবনের একান্ত অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, যা থেকে চাইলেই বের হওয়া সম্ভব নয়। বরং কারা আল্লাহ্র উপর প্রকৃত ভরসাকারী, কারা উত্তম ধৈর্যশীলতা অবলম্বনকারী, তা বাছাই করে নিতে আল্লাহ এটা আমাদের জন্য অবধারিত করে রেখেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে কিছু ভয় ও ক্ষুধা দ্বারা এবং কিছু ধন-সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা পরীক্ষা করব। (এমতাবস্থায়) আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন’ (বাক্বারাহ ২/১৫৫)। কখনও আল্লাহ উপদেশ স্বরূপ বান্দার পরীক্ষা নেন। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘আর তারা কি লক্ষ্য করে না যে, তারা প্রতি বছর একবার বা দু’বার কোন না কোন বিপদে পতিত হয়ে থাকে? তবুও তারা তওবা করে না এবং উপদেশ গ্রহণও করে না’ (তওবা ৯/১২৬)।
আবার ঈমানদার ও দ্বীনদার হলেই যে আমরা আল্লাহ্ পরীক্ষা থেকে বেঁচে যাব, এমনটি ভাবার কোন সুযোগ নেই। বরং তাদের জন্য পরীক্ষাটা আরো বড়। আল্লাহ বলেন, ‘মানুষ কি মনে করে যে, আমরা ঈমান এনেছি-এ কথা বললেই তাদেরকে পরীক্ষা না করে ছেড়ে দেয়া হবে’? (আনকাবূত ২৯/২)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘পৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা নেয়া হয় নবীদের। তারপর বান্দার দ্বীনদারীর মাত্রার উপর পরীক্ষা করা হয়। যে যত দ্বীনদারীতে অবিচল, সে তত কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়’ (তিরমিযী হা/২৩৯৮; ইবনু মাজাহ হা/৪০২৩)। কেন আল্লাহ ঈমানদারদের পরীক্ষা নেন? এর কিছু কারণ রয়েছে। যেমন-
ক. ঈমানের দাবীর সত্যতা ও নিয়তের ভালো-মন্দ যাচাই করা। আল্লাহ বলেন, ‘আমি অবশ্যই তাদের পূর্ববর্তীদেরকেও পরীক্ষা করেছিলাম। সুতরাং আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন কারা সত্যবাদী এবং কারা মিথ্যাবাদী’ (আনকাবূত ২৯/৩)।
খ. ইখলাছ ও তাক্বওয়াশীলতা যাচাই করা। কারা আল্লাহ্র প্রকৃত মুখলিছ বান্দা আর কারা প্রকৃত আল্লাহভীরু, তার পরীক্ষা আল্লাহ নানা রূপে নিয়ে থাকেন। আমলের পরীক্ষায় অনেকে বিপুল সমৃদ্ধ হলেও ইখলাছ ও তাক্বওয়ার ঘাটতিতে সে হারিয়ে ফেলে তার আমলের সুফল (মায়েদাহ ২৭; কাহফ ১০৩; মুসলিম হা/২৫৮১)।
গ. দ্বীনের ব্যাপারে অধিক অগ্রগামিতা যাচাই: দ্বীন পালনে সবাই সমান নয়। সবাই একই মর্যাদার অধিকারীও নয়। দ্বীনের প্রতি অগ্রগামিতার প্রতিযোগিতায় প্রাগ্রসরদের নির্বাচন করা এই পরীক্ষার অংশ (নিসা ৪/৯৫; ফাত্বির ৩২)।
ঘ. হককে দৃঢ়ভাবে ধারণকারী নির্বাচন করা: ঈমানদারীর দাবী সত্ত্বেও বান্দা সত্যিই হকের অনুসরণকারী কি-না কিংবা কতটুকু অনুসন্ধানী তা যাচাই করা এই পরীক্ষার অংশ (আলে ইমরান ৩/১০৫)।
ঙ. জান্নাতে উচ্চতর স্থান নির্ধারণ: জান্নাতীরা সবাই সমান স্তরের হবে না। আমলের শুদ্ধতা ও পরীক্ষায় সফল হওয়ার মাপকাঠিতে আল্লাহ তাদের জন্য জান্নাতের বিভিন্ন স্তর নির্ধারণ করবেন (আন’আম ৬/১৩২)।
চ. পরিশুদ্ধ করা: আল্লাহ যাদের কল্যাণ চান, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করার জন্যও তাদেরকে বিপদগ্রস্থ রেখে পরীক্ষা নেন, যাতে একসময় সে গুনাহমুক্ত হয়ে যায় (তিরমিযী হা/২৩৯৮; ইবনু মাজাহ হা/৪০২৩)।
অনেক সময় ঈমানদারদেরকে পর্যন্ত দল-উপদলে বিভক্ত হতে দেখে আমরা হতাশা বোধ করি; আবার অতি দ্বীনদার কেউ নিজেকে দায়মুক্ত ভেবে সঙ্গোপনে আত্মতুষ্টিও লালন করি। অথচ এই দলে দলে বিভক্তি মূলতঃ আল্লাহ্র পরীক্ষারই অংশ, যার মাধ্যমে তিনি অধিকতর ভাল-মন্দ বাছাই করে নেন। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ চাইলে তিনি তোমাদের (ঐক্যবদ্ধ) এক জাতিতে পরিণত করতে পারতেন। তবে তিনি চান তোমাদেরকে যা কিছু প্রদান করেছেন, তা দিয়ে পরীক্ষা করতে। অতএব তোমরা কল্যাণের কাজে প্রতিযোগিতা কর’ (মায়েদাহ ৫/৪৮)। অন্য আয়াতে তিনি বলেন, ‘আল্লাহ চাইলে তোমাদেরকে এক জাতিতে পরিণত করতে পারতেন, কিন্তু তিনি যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন। আর তোমরা যা করছ, সে বিষয়ে তোমাদের অবশ্যই জিজ্ঞাসা করা হবে’ (নাহল ১৬/৯৩)। সুতরাং মুসলমানদের মধ্যে একতা কাম্য হলেও তা হবার নয়। কেননা এই বিভক্তির মধ্য দিয়েই আল্লাহ তাঁর সৎ ও একনিষ্ঠ মুমিন বান্দাদেরকে অসৎ এবং কপট ঈমানদার থেকে বাছাই করে নেন।
সর্বোপরি এটাই স্বতঃসিদ্ধ যে, দুনিয়ায় আমাদের যাপিত জীবনের সবটুকু অংশই এক মহাপরীক্ষার অংশ এবং এতে সফল হওয়াই আমাদের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। এই সত্যটা আমরা যতই অনুধাবন করব এবং এর প্রভাব যত বেশী আমাদের জীবনাচরণে পরিলক্ষিত হবে, ততই আমরা সফলতার উচ্চ সোপানে আরোহণ করতে পারব ইনশাআল্লাহ।
📄 লক্ষ্যপূর্ণ জীবন
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষের চলার পথ ভিন্ন ভিন্ন রাখলেও সকলের গন্তব্য একই নির্ধারণ করে রেখেছেন। আমাদের জীবনের অবস্থানগত দিক হাযারো বৈচিত্র্যে ভরপুর থাকলেও পরিসমাপ্তির জায়গাটা সকলের জন্য এক। আমরা প্রত্যেকেই জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতসারে একটি সুনির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে ছুটে চলেছি। এমনকি মহাকালের জীব-জড় সকল প্রাণী ও বস্তুই সেই একক মহাগন্তব্যের পথে ধাবমান। এসব কিছু থেকে সুস্পষ্টই প্রতীয়মান হয়, আমাদের জীবনটা কিছুতেই লক্ষ্যহীন নয়। প্রতিবার মৃতজনের অনন্তযাত্রার সংবাদপ্রাপ্তিতে ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহ্ জন্য এবং তাঁর কাছেই আমাদের প্রত্যাবর্তন) যে শব্দবন্ধটি আমাদের মুখ থেকে বের হয়, তা আমাদেরকে জীবনের সেই চূড়ান্ত লক্ষ্যের কথা গভীর উপলব্ধির সাথে স্মরণ করিয়ে দেয়।
মানবজীবন একমাত্র আল্লাহ্র উদ্দেশ্যেই নিবেদিত। আল্লাহ্র দাসত্বের মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করাই হ’লে এ জীবনের মূল লক্ষ্য। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই বাস্তব জীবনে এসে এই মহাসত্যটি ভুলে যায়। জীবনের ঊষালগ্নে নবীন কিশোরের চোখের দ্যুতিতে পিতা-মাতা ও অভিভাবকগণ যে রঙিন স্বপ্নের ঝিলিক এঁকে দেন সযতনে, তা জাগতিক প্রয়োজনে কিংবা সামাজিক বলয়ে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থানের জানান দেয়ার তাড়নায় বড় সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে ধরা দেয় বটে; কিন্তু জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের পথে সেটি নিছক একটি নিমিত্ত ভিন্ন কিছুই নয়। তবুও জৈবিক স্বপ্ন পূরণের সাধনাই পরিশেষে আমাদের অধিকাংশের জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্যে পরিণত হয়। যার অনিবার্য ফলস্বরূপ দুনিয়াবী প্রাপ্তির গর্ব অথবা অপ্রাপ্তির বেদনা আমাদের ভাবনাজগতকে সর্বদা বেসামাল করে রাখে। অথচ জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকলে কোন অবস্থাতেই এসব ক্ষণস্থায়ী লোভনীয় বস্তুতে প্রতারিত হওয়ার কথা ছিল না।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রয়োজন ব্যতিরেকে পৃথিবীতে কোন কিছুই সৃষ্টি করেননি। পৃথিবী পরিচালনার জন্য তিনি বিভিন্ন মানুষকে বিভিন্ন মেধা দিয়ে প্রেরণ করেছেন। মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত এই মেধা ব্যবহারের মাধ্যমে পার্থিব জীবনকে নানা মাত্রায় সুষমামণ্ডিত করে মানবসভ্যতাকে অগ্রযাত্রার পথে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। ক্বিয়ামত পর্যন্ত এই ধারাবাহিকতার কোন ছেদ ঘটবে না। সুতরাং সমাজের প্রত্যেকে আলেমে দ্বীন, কিংবা চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী হবে; এমন কোন বাধ্যবাধকতা ইসলামে নেই। বরং যার যার মেধা ও আগ্রহ অনুযায়ী মানুষ পেশা বেছে নিতে পারে। তবে চূড়ান্ত বিচারে প্রতিটি কর্মের লক্ষ্য হতে হবে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি; এটাই হ’লে ইসলামী জীবনদর্শনের মূলকথা।
জীবনের মূল লক্ষ্যের এই তাৎপর্য অনুধাবন না করতে পারার কারণে অনেক দ্বীনদার ভাইকেও কখনও এমন হতাশায় নিক্ষিপ্ত দেখা যায় যে, তিনি ক্যারিয়ারের পিছনে সময় দিতে গিয়ে দ্বীনের কাজে যথেষ্ট সময় দিতে পারেন না। অথচ এটাই সত্য যে, তিনি যে হালাল ‘ক্যারিয়ার’ গঠনে সময় দিচ্ছেন এবং এর মাধ্যমে জনগণের সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন, সেটিই তার জন্য ‘ইবাদত’ হ’তে পারে, যদি এর মাধ্যমে তিনি আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জন ও মানবতার সেবার সংকল্প করে থাকেন। অপরদিকে যে ব্যক্তি দ্বীনের খেদমতে ব্যস্ত রয়েছেন, অথচ তার লক্ষ্য হল দুনিয়া; তার দ্বীনের খেদমত আর ‘ইবাদত’ থাকে না। কেননা আল্লাহকে খুশী করা তার মূল লক্ষ্য নয়। তেমনিভাবে একজন ব্যক্তি যদি সর্বশ্রেষ্ট ইবাদত ছালাতও আদায় করে; অথচ ছালাতের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সে সচেতন নয়, কেবল মানুষকে দেখানোর জন্য ছালাত আদায় করে; তার ছালাত আর ‘ইবাদত’ থাকে না; বরং ‘আদাত’ বা নিছক অভ্যাসগত কর্মে পরিণত হয়। এই লক্ষ্যহীন ছালাতে তার কোন ছওয়াব হয় না, চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনেও কোন উপকারে আসে না। মোদ্দাকথা, জীবনের মহান লক্ষ্যকে সামনে রাখতে পারলে মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপই অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে লক্ষ্য সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান ও ঈমান না থাকলে অনেক সৎআমলও পরিশেষে অর্থহীন হয়ে যায়।
সুতরাং লক্ষ্যপূর্ণ জীবনই অর্থপূর্ণ জীবন। প্রতিটি কাজ আল্লাহ্র সন্তুষ্টির খালেছ নিয়তে করার প্রতিজ্ঞাকে সামনে রেখে যদি আমরা জীবন পরিচালনা করতে পারি কিংবা বহুল আলোচিত ‘ক্যারিয়ার’ গঠন করতে পারি, তবে কর্মক্ষেত্র যেখানেই হোক না কেন, পেশা যা-ই হোক না কেন, আমাদের জীবন প্রকৃত লক্ষ্য অর্জনের পথেই ধাবিত হবে ইনশাআল্লাহ। আর এই লক্ষ্যকে বুকে ধারণ করা এবং সেই মোতাবেক নিজেকে পরিচালনা করতে পারা এবং না পারার মধ্যেই একজন মানুষের দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা-ব্যর্থতা নির্ভর করছে।
একজন মুমিন তার জীবনের লক্ষ্যের উপর কতটা অটুট তার প্রাথমিক একটা প্রমাণ হয়ে যায় তার দৈনন্দিন ছালাত আদায়ের মধ্যেই। কেননা ছালাতই প্রভুর সাথে একান্ত সান্নিধ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এই ছালাত যে যত গুরুত্ব সহকারে এবং খুশ-খুযূ সহকারে আদায় করতে পারে, জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে তার সচেতনতা তত বেশী। এজন্য পবিত্র কুরআনে ছালাত আদায় নয়; বরং প্রতিবারই ছালাত কায়েমের কথা বলা হয়েছে। এই চেতনার উপর ছওয়াবেরও কম-বেশী হয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, এমনও লোক আছে (যারা ছালাত আদায় করে বটে; কিন্তু সঠিকভাবে রুকন ও শর্তগুলো পূরণ না করায় এবং ছালাতে একাগ্রতা ও খুশু-খুযু না থাকায় ছালাতের পূর্ণ ছওয়াব পায় না) যাদের কেউ দশ ভাগের এক ভাগ, কেউ নয় ভাগের এক ভাগ, কেউ আট ভাগের এক ভাগ, কেউ সাত ভাগের এক ভাগ, কেউ ছয় ভাগের এক ভাগ, কেউ পাঁচ ভাগের এক ভাগ, কেউ চার ভাগের এক ভাগ, কেউ তিন ভাগের এক ভাগ, কেউবা অর্ধাংশ ছওয়াব পায় (আবুদাউদ হা/৭৯৬, সনদ হাসান)। অর্থাৎ জীবনের লক্ষ্যের সাথে যেমন আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপের গভীর সংযোগ রয়েছে; তেমনিভাবে এর উপরই নির্ভর করে প্রতিটি ইবাদতের কুবুলিয়াত বা গ্রহণযোগ্যতা।
স্মর্তব্য যে, লক্ষ্য নির্ধারণ করার পর তা অর্জনের চেষ্টা করতে গিয়ে আমাদের তরুণরা প্রায়শই ভুল পথে হাটে। কখনও তারা কোন পছন্দের ব্যক্তিকে মানদণ্ড ধরে নিয়ে তাকে অন্ধভাবে হুবহু অনুসরণ করে। অথচ এটা সঠিক পদ্ধতি নয়। কেননা লক্ষ্য একই থাকলেও একেকজনের লক্ষ্য অর্জনের প্রকৃতি ও সফলতার ধরন একেক রকম। উদাহরণস্বরূপ আপেল গাছের নিচে বসে গবেষণা করলেই কেউ নিউটন হয়ে যায় না। মসজিদে নববীতে বসে পাঠগ্রহণ করলেই কেউ শায়খ উছায়মীন হয় না। সুতরাং কাউকে হুবহু অনুসরণ করাকে জীবনের লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ রক্ষা যাবে না। বরং ইখলাছ তথা আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনই যেন আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য হয়, তাহলে যে কোন লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব ইনশাআল্লাহ।
লক্ষ্য অর্জনের পথে আধুনিক তরুণদের মধ্যে অপর যে সমস্যাটি প্রকট আকার ধারণ করেছে তা হল, খ্যাতি বা আত্মপ্রচারের নেশা। যার অনিবার্য ফলাশ্রুতি হ’ল ইখলাছের ঘাটতি, সফলতার জন্য শর্টকাট রাস্তা খোঁজা, কপটতা এবং শেষমেষ ব্যর্থতা ও হতাশার সাগরে নিমজ্জিত হওয়া। তথ্যপ্রযুক্তি এবং নিত্য-নতুন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক প্রসার এতে যোগ করেছে অবক্ষয়ের এক নতুন অধ্যায়। জীবনে বড় স্বপ্ন থাকার গুরুত্ব অপরিসীম। জীবনের যদি কোন বিশেষ লক্ষ্য না থাকে, মহৎ কিছুর স্বপ্ন না থাকে তবে সে জীবন সৃজনশীল ও সার্থক হয়ে গড়ে ওঠে না। সুতরাং তারুণ্যের স্বপ্নজগতের সীমা-পরিসীমা আকাশছোঁয়া থাকবে, এটাই প্রত্যাশিত। এপিজে আবুল কালামের মতে, ‘স্বপ্ন তা নয় যা তুমি ঘুমিয়ে দেখ, বরং স্বপ্ন তা-ই যা তোমাকে ঘুমোতে দেয় না’। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, স্বপ্ন হবে বাস্তবতাবিবর্জিত, স্বপ্ন ছোঁয়ার পথ ও পদ্ধতি হবে কোন শর্টকাট রাস্তায় কিংবা অসদুপায় অবলম্বন করে। আত্মপ্রচার, আত্মপ্রশংসা, সমাজে নাম-ডাক, প্রভাব- প্রতিপত্তি লাভের গোপন প্রত্যাশা কখনই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ নয়।
কোন মহৎ স্বপ্ন অর্জন করতে গেলে তার পিছনে অবশ্যই দীর্ঘ সময় দিতে হয়। কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। একাধারে তার পিছনে লেগে থাকতে হয়। তার প্রতি সৎ এবং বিশ্বস্ত থাকতে হয়। সর্বোপরি আল্লাহ প্রদত্ত যোগ্যতা এবং তাঁর রহমতে তা পরিপূর্ণতা লাভ করে। সুতরাং কোন স্বপ্ন অর্জনে একনিষ্ঠতা, সৎনিয়ত এবং সঠিক কর্মপন্থার কোন বিকল্প নেই। পৃথিবীতে সফল ব্যক্তিমাত্রই এক বাক্যে বলেছেন, জীবনে সফল হওয়ার জন্য কোন শর্টকাট পথ নেই। মানুষ ততটুকুই পাবে, যতটুকু সে চেষ্টা করেছে। একনিষ্ঠতা ও অধ্যবসায় না থাকলে কেউই সফল হ’তে পারে না।
অতএব সফলতা অর্জনে ইখলাছের কোন বিকল্প নেই। পৃথিবীতে যারাই সফলতার শিখরে আরোহণ করেছেন, তাদের প্রত্যেকের মাঝেই সাধারণ যে গুণ বা বৈশিষ্ট্যটি সর্বাধিক লক্ষ্যণীয় তা হ’ল একনিষ্ঠতা। যারা যে কাজে একনিষ্ঠ ও সৎ থেকেছেন, বিশ্বস্ততার সাথে নিজের কর্তব্য সমাধা করেছেন, তারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে আবশ্যকভাবে সফলতার মুকুট পরেছেন। যদিওবা কেউ জীবদ্দশায় সফল হননি, তবুও পরবর্তী প্রজন্ম তার ফসল যুগ যুগ ধরে ভোগ করে গেছে। অপরপক্ষে কোন কাজ যদি সততা, একনিষ্ঠতা, বিশ্বস্ততা ও আমানতদারিতার সাথে না করা হয়, তবে যত বড় কাজই হোক না কেন, তাতে সফলতা আসতে পারে না। সাময়িকভাবে তা কখনও রঙ চড়ালেও এক সময় তা বুদবুদের মতই হারিয়ে যায়।
ইখলাছহীন কর্ম যেমন দুনিয়াবী জীবনে সফলতা পায় না, তেমনি পরকালীন জীবনেও তার কোন মূল্য থাকে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, ‘আল্লাহ কেবল মুত্তাকীদের আমলই গ্রহণ করে থাকেন’ (মায়েদা ৫/২৭)। রাসূল (ছাঃ)- কে একদিন এক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞাসা করল, সেই ব্যক্তি সম্পর্কে আপনি কী বলবেন যে আল্লাহ্র রাস্তায় যুদ্ধ করে নেকীও লাভ করতে চায় আবার মানুষের মধ্যে প্রসিদ্ধিও অর্জন করতে চায়? রাসূল (ছাঃ) বললেন, তার জন্য কিছুই নেই। সেই ব্যক্তি তিনবার একই প্রশ্ন করল, রাসূল (ছাঃ) একই জবাব দিলেন। অতঃপর বললেন, আল্লাহ সেই আমল ব্যতীত কোন আমল কবুল করেন না, যে আমল কেবল তাঁরই উদ্দেশ্যে এবং তাঁরই সন্তুষ্টি লাভের প্রত্যাশায় করা হয় (নাসাঈ হা/৩১৪০, সনদ ছহীহ)। সুতরাং ইখলাছহীন আমল যে কত ভয়ংকর, তা এই হাদীছ থেকে দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
একজন পশ্চিমা লেখকের ভাষায়, ‘একনিষ্ঠতা একজন অতি সামান্য ব্যক্তিকেও ‘প্রবল মেধাবী, অথচ কপট’-এমন ব্যক্তির চেয়ে অধিকতর মূল্যবান করে তোলে’ (Sincerity makes the very least person to be of more value than the most talented hypocrite)। অর্থাৎ সুতরাং তরুণ সমাজ যারা আপন মেধা বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তাদের প্রতি আহ্বান থাকবে, আত্মপরতা, আত্মপ্রচার, সমাজে নাম-ডাক লাভের আকাংখা প্রভৃতি আত্মবিনাশী রোগ যেন আমাদেরকে কোনমতেই গ্রাস না করে ফেলে। কেননা মেধার সাথে ইখলাছ, সততা ও আমানতদারিতা যদি যুক্ত না হয়, তবে সেই মেধা কখনই জাতির উপকারে আসবে না। খ্যাতির সাময়িক রঙিন জগত হয়ত পুলক যোগাবে, কিন্তু আদতে তা দুনিয়া ও আখেরাতে কোথাও সফলতার মুখ দেখবে না। এটাই আল্লাহ্ রীতি। সুতরাং সফলতা অর্জন করতে হলে অবশ্যই একনিষ্ঠ থাকতে হবে, নিজের অন্তর্জগতকে পরিশুদ্ধ রাখতে হবে, উদ্দেশ্যে সৎ থাকতে হবে এবং আমানতদারিতার সাথে নিজের দায়িত্ব পালন করে যেতে হবে। সর্বোপরি লক্ষ্যে অটুট থাকতে হবে। তবেই আল্লাহ্র রহমত নেমে আসবে এবং ব্যক্তি ও সমাজের জন্য তা একদিন কল্যাণময় পথের দিশারী হবে ইনশাআল্লাহ।
📄 নৈতিক দৃঢ়তা
ঈমান আনার পর আল্লাহ রব্বুল ‘আলামীন যে বিষয়টিকে সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন তা হ’ল ঈমানের উপর দৃঢ় থাকা। পবিত্র কুরআনের বহু আয়াতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ঈমানী দৃঢ়তা অর্জনের জন্য আহ্বান করা হয়েছে মুমিনদেরকে। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুহাম্মাদ! তুমি এবং তোমার সাথে যারা তওবা করেছে সবাই সরলপথের ওপর দৃঢ় থাক, যেভাবে তোমাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর তোমরা সীমালংঘন করো না। নিশ্চয়ই তোমরা যা কিছু করছ তা তিনি দেখছেন (হৃদ ১১২)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই যারা বলেছে আমাদের প্রভু আল্লাহ এবং তার ওপর দৃঢ় থেকেছে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না (আহক্বাফ ১৩)। অনুরূপভাবে রাসূল (ছাঃ) নিজেও ছাহাবীদেরকে সতর্ক করেছেন। সুফিয়ান বিন আব্দুল্লাহ ছাক্বাফী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল (ছাঃ)-কে একবার জিজ্ঞেস করলাম, আমাকে ইসলাম সম্পর্কে এমন একটি কথা বলুন, যে সম্পর্কে আমি আর অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করব না। নবী করীম (ছাঃ) বললেন, ‘তুমি বল, আমি ঈমান এনেছি, অতঃপর তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাক’ (মুসলিম হা/৬২)।
ইস্তিক্বামাত তথা ঈমানী দৃঢ়তার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে হাফেয ইবনুল কাইয়িম (রহঃ) বলেন, ‘ইস্তিক্বামাত এমন একটি শব্দ যা দ্বীনের সবকিছুকেই শামিল করে। এটি হ’ল আল্লাহ্ সম্মুখে পূর্ণ আমানতদারিতা এবং অঙ্গীকারাবদ্ধতা নিয়ে দণ্ডায়মান হওয়া। এর সম্পর্ক কথা, কর্ম ও নিয়তের সাথে। সবকিছু কেবলমাত্র আল্লাহ্ জন্য হওয়া, আল্লাহ্র পথে হওয়া এবং আল্লাহ্র নির্দেশ মোতাবেক হওয়ার মাধ্যমে ইস্তিকামাত অর্জিত হয়’ (মাদারিজুস সালিকীন)।
অন্যত্র তিনি বলেন, অন্তরে নৈতিক দৃঢ়তা বা ইস্তিক্বামাত সৃষ্টির মাধ্যম হ’ল, আল্লাহ্র আদেশ ও নিষেধকে গুরুত্ব প্রদান করা। আর সেটা জাগ্রত হয় আদেশ ও নিষেধকর্তা তথা আল্লাহ্র প্রতি শ্রদ্ধা পোষণের মাধ্যমে (আল-ওয়াবেলুছ ছাইয়েব)। কোন কোন বিদ্বান বলেন, ইস্তিক্বামাত হ’ল রাসূল (ছাঃ) প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করা এবং প্রবৃত্তির পথে না চলা।
একজন মুসলমানের প্রকৃত পরিচয় পাওয়া যায় তার ইস্তিক্বামাত তথা নৈতিক ও আদর্শিক দৃঢ়তার মাধ্যমে। যিনি যত শক্তিশালী ঈমানদার, তার নৈতিক দৃঢ়তা তত বেশী। শয়তানের প্রতারণা এবং দুনিয়াবী কোন লোভ-লালসার কাছে তিনি পরাজিত হন না। যদি কখনওবা নফসের প্ররোচনায় পদস্খলিত হনও, তবে সম্বিত ফিরে পাওয়া মাত্র নিজেকে সংশোধন করে নেন। অপরদিকে যিনি যত দুর্বল ঈমানদার, তার নৈতিক দৃঢ়তা তত কম। শয়তানের কাছে তিনি সহজেই পরাজিত হন। সামান্য দুনিয়াবী স্বার্থের টোকায় তিনি পথভ্রষ্ট হয়ে যান। এমনকি একসময় অন্তরে এমনভাবে মোহর পড়ে যায় যে, সংশোধনের পথ অনুসন্ধানের চেতনাটুকুও হারিয়ে ফেলেন।
সমাজে চলার পথে এমন ভুরি ভুরি উদাহরণ পাই, যারা একসময় দ্বীনের পথে চলতেন, কিন্তু দুনিয়াবী ব্যস্ততার অজুহাতে দ্বীন থেকে এত দূরে সরে গেছেন যে, ফরয ছালাতটুকুও নিয়মিত আদায় করেন না। অনেক মাদরাসা পড়ুয়া ছাত্রকে দেখা যায় কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর সম্পূর্ণ ভিন্ন চেহারায় পরিবর্তিত হয়েছেন, এমনকি নিজের দ্বীনদারিতায় সমৃদ্ধ অতীতকে পর্যন্ত বেমালুম ভুলে গেছেন। অনেক ভাইকে দেখা যায়, তীব্র আবেগ নিয়ে দ্বীনের পথে এসেছেন, কিছুকাল পরই সে আবেগে ভাটা পড়ে আবার দ্বীন থেকে দূরে সরে গেছেন। জীবনের উষাকালে যে বোনটি পর্দার সাথে চলতেন এবং ধার্মিকা হিসেবে পরিচিত ছিলেন, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্পণ করার পর সহসাই তিনি এখন দ্বীনের সাথে সম্পর্কচ্যুত। কিছুকাল পূর্বে যে ভাইটি সমাজে আদর্শবান ও দ্বীনী ব্যক্তিত্ব হিসাবে বরিত হয়েছেন, সময়ের আবর্তে তিনি এখন ভিন্ন চিন্তাধারা, ভিন্ন বসনের মানুষ। একসময় যিনি ছিলেন দ্বীনদার তরুণদের আইকন; তিনি এখন আদর্শহীন, চেতনাহীন, নিফাকীর সমুদ্রে নিজেকে হাতড়ে ফেরা এক পচনুন্মুখ বর্জ্যসদৃশ। এসবই ইস্তিক্বামাত হারানোর পরিণাম। ভয়ংকর ব্যাপার এই যে, কোন ব্যক্তি একবার দ্বীনের পথ থেকে বিচ্যুত হলে, খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে, তিনি ফিরে আসতে পেরেছেন। শয়তানের চক্রান্ত তাদের উপর এত শক্তিশালীভাবে বিজয়ী হয়ে যায়, যে তা থেকে তওবার পথ যেন তাদের জন্য চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যায়। আল্লাহ আমাদের হেফাযত করুন!
তারুণ্য ও যৌবনে পদার্পণকারী সত্যপিয়াসী ভাই ও বোনদের প্রতি বিনীত পরামর্শ- ইসলামকে প্রকৃত অর্থে জানুন এবং বুঝুন। দ্বীনকে স্বীয় চিত্তে দৃঢ়ভাবে ধারণ করুন। নিজেকে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহ্র আনুগত্যের কাছে সঁপে দিন। রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশিত পথকে নিজের জন্য একান্ত আপন করে নিন। শয়তান ও প্রবৃত্তির পথে চলাকে নিজের জন্য কঠিন থেকে কঠিনতর করে দিন। আত্মসমালোচনা, তওবা-ইস্তিগফারকে নিজের দৈনন্দিন কর্মসূচীতে পরিণত করুন। এভাবে নিত্য প্রচেষ্টার মাধ্যমে যে নৈতিক ও আদর্শিক দৃঢ়তা সৃষ্টি হবে, তা-ই হকের উপর আমৃত্যু আমাদেরকে টিকিয়ে রাখবে। দুনিয়াবী স্বার্থের কাঁটা এবং শয়তানী চক্রান্ত সহজে গ্রাস করতে পারবে না ইনশাআল্লাহ। পবিত্র কুরআনে এসেছে, আল্লাহ মুমিনদের দৃঢ় বাক্য দ্বারা মযবুত রাখেন ইহকালীন জীবনে ও পরকালে (কবরে) এবং সীমালংঘনকারীদের পথভ্রষ্ট করেন। বস্তুতঃ আল্লাহ যা চান তাই করেন’ (ইবরাহীম ১৪/২৭)। নিঃসন্দেহে সেই ‘দৃঢ় বাক্য’ হ’ল তাওহীদের কালেমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।
এই নৈতিক দৃঢ়তা সৃষ্টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হ’ল, আল্লাহ্র সাথে সম্পর্ক সুদৃঢ় করা। নফল ইবাদত, যিকির-আযকার, হালাল-হারামের সীমারেখা মেনে চলার মাধ্যমে যে ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহ্র যত নিকটবর্তী করে নিতে পারবে তার জন্য আল্লাহ্র উপর সর্বাবস্থায় ভরসা রাখা এবং দৃঢ় নৈতিক অবস্থান নিয়ে টিকে থাকা সহজ হয়ে যায়। সমস্ত দুনিয়াও যদি এরূপ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে চলে যায়, তবুও তারা বিচলিত হয় না, পদস্খলিত হয় না। এরূপ মুমিনদের লক্ষ্য করেই রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘মুমিনের ব্যাপারটি বড়ই বিস্ময়কর। তার সমস্ত বিষয়টিই কল্যাণময়। মুমিন ব্যতীত আর কারু জন্য এরূপ নেই। যখন তাকে কল্যাণ স্পর্শ করে, তখন সে শুকরিয়া আদায় করে। ফলে এটা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যখন তাকে অকল্যাণ স্পর্শ করে, তখন সে ছবর করে। ফলে এটাও তার জন্য কল্যাণকর হয়’ (মুসলিম হা/২৯৯৯)। আল্লাহ আমাদের সকল ভাই-বোনকে দৃঢ় নৈতিকতাসম্পন্ন ও আদর্শবান বান্দাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নিন। আমীন!