📄 আল-মুসতাকফী বিল্লাহ আবুর রাবী
আল-মুসতাকফী বিল্লাহ আবুর রাবী সুলায়মান স্বীয় ভ্রাতা মুতাযদের যুগে উত্তরাধিকার মনোনীত হন। তিনি হলেন মুতাযদের আপন ভাই। আল-মুসতাকফী বিল্লাহ আবুর রাবী সুলায়মান বিন মুতাওয়াক্কিল আল-আব্বাসী ছিলেন বনূ আব্বাসের একজন মহান নেতা এবং আমিরুল মুমিনীন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চাচার আওলাদ এবং খুলাফায়ে রাশেদার ওয়ারেশ। তিনি আল্লাহ তা'আলার দ্বীনে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
মুকতাফী অত্যন্ত নেককার, দ্বীনদার, ইবাদতকারী, কুরআন তিলাওয়াতকারী, নীরব, লোকদের অপরাধ মার্জনাকারী এবং সচ্চরিত্রবান খলীফা ছিলেন। খলীফা মুকতাযদ অধিকাংশ সময় তার প্রশংসা করতেন। তার আওলাদেরা ছিলেন দ্বীনদার এবং ইবাদতকারী। সম্ভবত হযরত উমর বিন আব্দুল আযীয (র.)-এর আওলাদের পর কোন খলীফার আওলাদ এত ইবাদতকারী এবং দানশীল ছিল না। ৮৫৪ হিজরীর যিলহজ মাসের শেষ জুমআর দিনে খলীফা মুসতাকফী ৬৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। সুলতান নিজেই জানাযার সাথে কবর পর্যন্ত গমন করেন।
মুকতাফীর খিলাফতকালে যে সব ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করে তাঁরা হলেন- তকী আল-মাকরিরী, শায়খ উবাদা, কবি ইবনে কামীল, ওফায়ী, কাবানী, ইবনে হাজার আসকালানী প্রমুখ।
📄 আল-কায়িম বি আমরিল্লাহ আবুল বাকা
আল-কায়িম বি আমরিল্লাহ আবুল বাকা হামযা বিন মুতাওয়াককিল তার ভাইয়ের পর বাইআত গ্রহণ করেন। খলীফা মুসতাকফী কাউকে উত্তরাধিকার মনোনীত করেননি। কারিমের স্বভাব ছিল তেজোদীপ্ত। তিনি ছিলেন বীর বাহাদুর ব্যক্তি। তিনি প্রতাপের সাথে কিছু দিন খলীফা ছিলেন। তবে তিনি তার ভাইয়ের মত ছিলেন না। ৮৫৭ হিজরীতে সুলতান মুলকুয যাহির হিকমাক ইন্তেকাল করলে তদস্থলে তার ছেলে উসমান আল-মানসুর উপাধি নিয়ে উপবেশন করে। দেড় মাস পর ইনাল হামলা চালিয়ে তাকে বন্দী করে। খলীফা রবিউল আউয়াল মাসে ইনালকে আশরাফ উপাধি দিয়ে সুলতান মনোনীত করেন। কয়েকদিন পর রণাঙ্গনে সৈন্য বাহিনী প্রেরণকে কেন্দ্র করে সুলতানের সাথে খলীফার মনোমালিন্য হয়। এ কারণে ৮৫৯ হিজরীর জামাদিউল আউয়াল মাসে সুলতান খলীফাকে অপসারণ করে ইসকান্দারিয়া পাঠিয়ে দেয়। খলীফা মৃত্যু অবধি ৮৬৩ হিজরী পর্যন্ত সেখানে বন্দী ছিলেন। মৃত্যুর পর ভ্রাতা মুসতাইনের পার্শ্বে তাকে সমাহিত করা হয়।
তার শাসনামলে আমার পিতা ইন্তেকাল করেন।
📄 আল-মুসতানজিদ বিল্লাহ আবুলু মুহাসিন
আল-মুসতানজিদ বিল্লাহ আবুল মুহাসিন ইউসুফ বিন মুতাওয়াক্কিল তার ভাইয়ের অপসারণের পর তিনি খিলাফতের তখতে আরোহণ করেন। সে সময় সুলতান আশরাফ ইনাল সালতানাতের তখতে উপবিষ্ট ছিল। ৮৬৫ হিজরীতে সুলতানের মৃত্যু হলে তার ছেলে আহমদ মুঈদ উপাধি নিয়ে সুলতান হয়। এ বছর রমযান মাসে খোশকদম তার উপর হামলা চালিয়ে তাকে বন্দী করে এবং যাহির উপাধি নিয়ে নিজেই সুলতান হয়ে যায়। ৮৭২ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসে সুলতান মারা যায়। তার স্থানে বালবায়ী যাহির উপাধি নিয়ে নিযুক্ত হয়। দুই মাস পর তার সৈন্যরা হামলা চালিয়ে তাকে তখত থেকে নামিয়ে দেয় এবং তামরীগাকে যাহির উপাধি দিয়ে সুলতান মনোনীত করে। দুই মাস পর তার উপরও হামলা চালানো হয় এবং তদস্থলে সর্বশেষ সুলতান ফাতিয়ায়ী আশরাফ উপাধি নিয়ে সালতানাতের তখতে আরোহণ করে। সে প্রভাব-প্রতিপত্তি, শান-শওকত, ক্ষিপ্রতা এবং কৌশলের মাধ্যমে সালতানাতের ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়। নাসর মুহাম্মাদ বিন কালাদুনের সালতানাত থেকে আজ পর্যন্ত এমন সুলতান আর কখনই পাওয়া যায়নি। সে সসৈন্যে মিসর থেকে ফোরাতের উপকূল পর্যন্ত চষে বেড়িয়েছে। সে কাযী এবং শিক্ষককে বেতন দিয়ে পুষত না। ৮৮৪ হিজরীর মুহাররম মাসের ১৪ তারিখে দুই বছর পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগে আক্রান্ত থাকার পর তিনি ইন্তেকাল করেন। সে সময় তার বয়স ছিল ৯০ বছর অথবা এর চেয়ে কিছু বেশি। কেল্লায় তার নামাযের জানাযা পড়ানো হয় এবং সমাহিত খলীফাদের পার্শ্বে তাকে দাফন করা হয়।
📄 আল-মুতাওয়াক্কিল আলাল্লাহ
আল-মুতাওয়াক্কিল আলাল্লাহ আবু আব্দুল্লাহ আব্দুল আযীয বিন ইয়াকুব বিন মুতাওয়াক্কিল জিন্দীর মেয়ে হাজ মুলক-এর গর্ভে ৮১৯ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। খিলাফত তার পিতার হস্তগত ছিল না। তিনি শৈশব থেকেই সুন্দর চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। তিনি জ্ঞান আহরণে মশগুল থাকতেন। তিনি আমার পিতার কাছেও ইলম অর্জন করেছেন। তার চাচা মুকতাফী তার মেয়ের সাথে তাকে বিয়ে দেন। তার ঔরসে এক পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে যিনি অত্যন্ত নেককার, হাশিমী এবং হাশিমীর আওলাদ। মুসতানজিদের অসুস্থতার সময় তাকে উত্তরাধিকার মনোনীত করা হয়। তার মৃত্যুর পর ৮৮৪ হিজরীর মুহাররম মাসের ১৬ তারিখ সোমবারে সুলতান, বিচারপতিগণ এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দের উপস্থিতিতে আম জনতা তার হাতে বাইআত করে। বাইআতের পর কেল্লা থেকে নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন। সেদিন তার সাথে ছিল গোটা মন্ত্রী পরিষদ। সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে আবার কেল্লায় প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি মুসতানজিদের মত কেল্লায় বসবাস করতেন।
এ বছর সুলতান মুলকূল আশরাফ হজের জন্য হিজায গমন করেন। তার পূর্বে ১০০ বছর কোন সুলতান হজ করেননি। হজের পূর্বে তিনি মদীনা শরীফে যিয়ারত করেন এবং সেখানে ৬০০০ দিনার খরচ করেন। অতঃপর মক্কায় এসে ৫০০০ দিনার ব্যয় করেন। সেখানে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন এবং এখানে একজন বড় মাপের উস্তাদকে নিয়োগ দেন। হজের আহকাম শেষ করে ফেরার সময় শহরে খুশির বন্যা বয়ে যায়। ৮৮৫ হিজরীতে দাওয়াদারের নেতৃত্বে মিসরের সৈন্যরা ইরাকের উপর হামলা চালায়। ইয়াকুব শাহ বিন হাসান রাহী অঞ্চলে তাদের সাথে লড়াই করে। এ যুদ্ধে মিসরীরা পরাজিত, অনেক মিসরী নিহত এবং দাওয়াদার কয়েদ হয়। পরে তাকে হত্যা করা হয়। এ যুদ্ধটি রমযানুল মোবারক মাসের শেষ দিকে সংঘটিত হয়। ৮৮৬ হিজরীর ১৭ই মুহাররম ভূমিকম্প হয়। এতে মাদরাসা সালিহার ছাদ ধসে পড়ে বিচারপতি শরফুদ্দীন বিন আব্দ নিহত হন। এ বছর রবিউল আউয়াল মাসে খাকী নামক একজন ভারতীয় লোক এসে তার বয়স ১৫০ বছর দাবী করে। আমিও (গ্রন্থকার) তাকে দেখেছি। তার দাড়ি কালো, সে বলেছে, আমি ১৮ বছর বয়সে হজ করে ভারতে ফিরে যাই। সুলতান হাসানের যুগে তাতারীদের আক্রমণের সময় বাগদাদ হয়ে মিসর আসি। আমার মতে সে মিথ্যা বলেছে। এ বছর শাওয়াল মাসে মদীনা শরীফ থেকে এ মর্মে পত্র আসে যে, রমযানুল মুবারকের ১৩ তারিখে বজ্রপাতের কারণে মসজিদে নববী (সা.)-এর ছাদ, খাযানা এবং গ্রন্থাদি জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যায়। মসজিদের দেয়াল ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না- যা এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য। ৯০৩ হিজরীর মুহাররম মাসের শেষ বুধবারে খলীফা মুতাওয়াক্কিল আলাল্লাহ ইন্তেকাল করেন। তিনি পুত্র ইয়াকুবকে আলসাতমাসাক বিল্লাহ উপাধি দিয়ে ওলী আহাদ মনোনীত করে যান। এটাই হল সর্বশেষ অবস্থা যা আমি এই ইতিহাসে লিপিবদ্ধ করলাম।