📄 আল-মুতাদ বিল্লাহ আবুল ফাতাহ
আল-মুতাযদ বিল্লাহ আবুল ফাতাহ দাউদ বিন আল-মুতাওয়াক্কিল কাজল নাম্নী এক তুর্কী বাঁদির গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। স্বীয় ভাইয়ের অপসারণের পর ৮১৫ হিজরীতে তিনি খিলাফতে আরোহন করেন। সে সময় সালতানাত সুলতান মুঈদের দখলে ছিল। ৮২৪ হিজরীতে সুলতানের তিরোধানে তার ছেলে আহমদ মুযাফফর উপাধি নিয়ে তখত দখল করে। ততর তার সহকারী নিযুক্ত হয়। শাবান মাসে ততর তাকে বন্দী করলে খলীফা তাকে যাহির উপাধিসহ সালতানাত প্রদান করেন। ততর যিলহজ মাসে মৃত্যুবরণ করলে তার ছেলে মুহাম্মদ সালিহ উপাধি নিয়ে সুলতান নিয়োগ হয়। বরসিয়ায়ী আক্রমণ চালিয়ে সালিহকে তখত থেকে নামিয়ে দেয়। খলীফা ৮২৫ হিজরীর রবিউল আখির মাসে বরসিয়ায়ীকে সুলতান বানিয়ে দেন। সুলতান থাকাকালীন ৮৪১ হিজরীর যিলহজ মাসে তার মৃত্যু হলে তদস্থলে তার ছেলে আল-আযীয উপাধি নিয়ে বাদশাহ মনোনীত হয়। হিকমাক তার সহকারী নিযুক্ত হয়। ৮৪২ হিজরীতে হিকমাক আযীযের নিকট থেকে সালতানাত কেড়ে নিলে খলীফা যাহির উপাধি দিয়ে তাকে সুলতান বানিয়ে দেয়। খলীফা এ সুলতানের যুগেই ইন্তেকাল করেন।
খলীফা মুতাযদ হলেন বুযর্গ খলীফাদের নেতা, মেধাবী, সচেতন, ওলামাদের সহচার্য গ্রহণকারী এবং দানশীল। সৃজনশীলতায় তার অবদান অপার। ৮৪৫ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসের ৪ তারিখ রবিবারে ৭০ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। (ইবনে হাজার আসকালানীর গবেষণা অনুযায়ী)। তবে খলীফার ভাতিজার মতে, তিনি ৬৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
৮১৬ হিজরীতে সদরুদ্দীন বিন আদমীকে বিচার এবং হিসাব সংরক্ষণ উভয় দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি একত্রে দুই দায়িত্ব পালন করেন। ৮১৯ হিজরীতে মুতাকাল্লীবাগার উপর তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। সেই প্রথম তুর্কী লোক যার উপর রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। এ বছর এক লোক আকাশে গিয়ে আল্লাহর সাথে দেখা করার দাবী করে। লোকটি ছিল পাগল। অনেক আম-জনসাধারণ তার কথা বিশ্বাস করেছিল। তাকে বন্দী করা হয়। ৮২১ হিজরীতে দু'টি গর্দান এবং ছয় পাবিশিষ্ট একটি মহিষের জন্ম হয়। এ ছিল মহান আল্লাহ তা'আলার এক অপূর্ব নিদর্শন। ৮২২ হিজরীর ভূমিকম্পে অধিকাংশ লোক নিহত হয়। এ বছর মাদরাসাতুল মুঈদাহ প্রতিষ্ঠিত হয়। শায়খ শামস বিন মুদিরীকে শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। সুলতানের উপস্থিতিতে ক্লাস আরম্ভ হয়েছিল। সুলতানের ছেলে ইবরাহীম শিক্ষকের জায়নামায নিয়মিত বিছিয়ে দিতেন।
৮২৩ হিজরীতে গাযা শহরে একটি উট যবেহ করা হলে তার গোশত প্রদীপের মত আলো ছড়াতে থাকে। ৮২৪ হিজরীতে নীল নদের পানিতে পার্শ্ববর্তী জনপদ প্লাবিত হয়। ৮২৫ হিজরীতে ফাতিমা বিনতে কাযী জালালুদ্দীন বালকীনী একটি বাচ্চা প্রসব করে যার পুরুষ লিঙ্গ স্ত্রীলিঙ্গ উভয়টা ছিল। গরুর মত মাথায় দু'টি শিং ফুঁড়ে উঠে। সে সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। এ বছর কায়রো শহরে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয় এবং নীল নদের পানি ব্যাপক বৃদ্ধি পায়।
তার শাসনামলে নিম্নবর্ণিত ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন- শাফী মাযহাবের মুফতী শিহাব বিন হুজ্জাহ, আদীব বুরহান বিন রিফা, মদীনা শরীফের মুফতী ও মুহাদ্দিস আবু বকর আল-মুরাগী, মক্কা শরীফের হাফেজ জামাল বিন যহির, কামুসের লেখক মুজাদ সিরাজী, শামস বিন কাবানী হানাফী, আবু হুরায়রা বিন নিকাশ, দানুয়ী, উস্তাদ অযুদ্দীন বিন জামাত বিন হিশাম আজমী, জালাল বালকীতী, বুরহান বিজুরী, ইরাক শাসনকর্তা শামস বিন মুদিরী, আলা বিন মুআলা, বদর বিন দাযামেনী, তাকীউল হাসিনী, শারেহ ইবনে শুজা, হারবী, ইবনে জারজী, কবি তকী বিন হুজ্জা, মক্কার নাহুবিদ জালাল মুরশিদী, মুহাদ্দিস শিহাব বিন মুহমাররাহ, আলা আল-বুখারী, শামস আল-বাসাতী, জামাল বিন খাইয়্যাত, তয়্যব বাগদাদী প্রমুখ।
📄 আল-মুসতাকফী বিল্লাহ আবুর রাবী
আল-মুসতাকফী বিল্লাহ আবুর রাবী সুলায়মান স্বীয় ভ্রাতা মুতাযদের যুগে উত্তরাধিকার মনোনীত হন। তিনি হলেন মুতাযদের আপন ভাই। আল-মুসতাকফী বিল্লাহ আবুর রাবী সুলায়মান বিন মুতাওয়াক্কিল আল-আব্বাসী ছিলেন বনূ আব্বাসের একজন মহান নেতা এবং আমিরুল মুমিনীন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চাচার আওলাদ এবং খুলাফায়ে রাশেদার ওয়ারেশ। তিনি আল্লাহ তা'আলার দ্বীনে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
মুকতাফী অত্যন্ত নেককার, দ্বীনদার, ইবাদতকারী, কুরআন তিলাওয়াতকারী, নীরব, লোকদের অপরাধ মার্জনাকারী এবং সচ্চরিত্রবান খলীফা ছিলেন। খলীফা মুকতাযদ অধিকাংশ সময় তার প্রশংসা করতেন। তার আওলাদেরা ছিলেন দ্বীনদার এবং ইবাদতকারী। সম্ভবত হযরত উমর বিন আব্দুল আযীয (র.)-এর আওলাদের পর কোন খলীফার আওলাদ এত ইবাদতকারী এবং দানশীল ছিল না। ৮৫৪ হিজরীর যিলহজ মাসের শেষ জুমআর দিনে খলীফা মুসতাকফী ৬৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। সুলতান নিজেই জানাযার সাথে কবর পর্যন্ত গমন করেন।
মুকতাফীর খিলাফতকালে যে সব ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করে তাঁরা হলেন- তকী আল-মাকরিরী, শায়খ উবাদা, কবি ইবনে কামীল, ওফায়ী, কাবানী, ইবনে হাজার আসকালানী প্রমুখ।
📄 আল-কায়িম বি আমরিল্লাহ আবুল বাকা
আল-কায়িম বি আমরিল্লাহ আবুল বাকা হামযা বিন মুতাওয়াককিল তার ভাইয়ের পর বাইআত গ্রহণ করেন। খলীফা মুসতাকফী কাউকে উত্তরাধিকার মনোনীত করেননি। কারিমের স্বভাব ছিল তেজোদীপ্ত। তিনি ছিলেন বীর বাহাদুর ব্যক্তি। তিনি প্রতাপের সাথে কিছু দিন খলীফা ছিলেন। তবে তিনি তার ভাইয়ের মত ছিলেন না। ৮৫৭ হিজরীতে সুলতান মুলকুয যাহির হিকমাক ইন্তেকাল করলে তদস্থলে তার ছেলে উসমান আল-মানসুর উপাধি নিয়ে উপবেশন করে। দেড় মাস পর ইনাল হামলা চালিয়ে তাকে বন্দী করে। খলীফা রবিউল আউয়াল মাসে ইনালকে আশরাফ উপাধি দিয়ে সুলতান মনোনীত করেন। কয়েকদিন পর রণাঙ্গনে সৈন্য বাহিনী প্রেরণকে কেন্দ্র করে সুলতানের সাথে খলীফার মনোমালিন্য হয়। এ কারণে ৮৫৯ হিজরীর জামাদিউল আউয়াল মাসে সুলতান খলীফাকে অপসারণ করে ইসকান্দারিয়া পাঠিয়ে দেয়। খলীফা মৃত্যু অবধি ৮৬৩ হিজরী পর্যন্ত সেখানে বন্দী ছিলেন। মৃত্যুর পর ভ্রাতা মুসতাইনের পার্শ্বে তাকে সমাহিত করা হয়।
তার শাসনামলে আমার পিতা ইন্তেকাল করেন।
📄 আল-মুসতানজিদ বিল্লাহ আবুলু মুহাসিন
আল-মুসতানজিদ বিল্লাহ আবুল মুহাসিন ইউসুফ বিন মুতাওয়াক্কিল তার ভাইয়ের অপসারণের পর তিনি খিলাফতের তখতে আরোহণ করেন। সে সময় সুলতান আশরাফ ইনাল সালতানাতের তখতে উপবিষ্ট ছিল। ৮৬৫ হিজরীতে সুলতানের মৃত্যু হলে তার ছেলে আহমদ মুঈদ উপাধি নিয়ে সুলতান হয়। এ বছর রমযান মাসে খোশকদম তার উপর হামলা চালিয়ে তাকে বন্দী করে এবং যাহির উপাধি নিয়ে নিজেই সুলতান হয়ে যায়। ৮৭২ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসে সুলতান মারা যায়। তার স্থানে বালবায়ী যাহির উপাধি নিয়ে নিযুক্ত হয়। দুই মাস পর তার সৈন্যরা হামলা চালিয়ে তাকে তখত থেকে নামিয়ে দেয় এবং তামরীগাকে যাহির উপাধি দিয়ে সুলতান মনোনীত করে। দুই মাস পর তার উপরও হামলা চালানো হয় এবং তদস্থলে সর্বশেষ সুলতান ফাতিয়ায়ী আশরাফ উপাধি নিয়ে সালতানাতের তখতে আরোহণ করে। সে প্রভাব-প্রতিপত্তি, শান-শওকত, ক্ষিপ্রতা এবং কৌশলের মাধ্যমে সালতানাতের ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়। নাসর মুহাম্মাদ বিন কালাদুনের সালতানাত থেকে আজ পর্যন্ত এমন সুলতান আর কখনই পাওয়া যায়নি। সে সসৈন্যে মিসর থেকে ফোরাতের উপকূল পর্যন্ত চষে বেড়িয়েছে। সে কাযী এবং শিক্ষককে বেতন দিয়ে পুষত না। ৮৮৪ হিজরীর মুহাররম মাসের ১৪ তারিখে দুই বছর পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগে আক্রান্ত থাকার পর তিনি ইন্তেকাল করেন। সে সময় তার বয়স ছিল ৯০ বছর অথবা এর চেয়ে কিছু বেশি। কেল্লায় তার নামাযের জানাযা পড়ানো হয় এবং সমাহিত খলীফাদের পার্শ্বে তাকে দাফন করা হয়।