📄 আল-মুতাওয়াক্কিল আলাল্লাহ আবু আব্দুল্লাহ
আল-মুতাওয়াক্কিল আলাল্লাহ আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আল-মুতাযদ সর্বশেষ খলীফাদের পিতা। তিনি প্রথমে উত্তরাধিকার মনোনীত হয়েছিলেন। তার পিতার মৃত্যুর পর ৭৬৩ হিজরীর জামাদিউল উলা মাসে তিনি খিলাফতের তখতে আরোহণ করেন। তিনি পঁয়তাল্লিশ বছর খিলাফত পরিচালনা করেন। এর মধ্যে সেই সময়টুকুও অন্তর্ভুক্ত যে সময়ে তিনি অন্তরীণ ছিলেন। এর বিবরণ আমরা সামনে পেশ করব।
তিনি অনেক আওলাদ রেখে যান। কথিত আছে, তিনি ছিলেন এক শত সন্তানের জনক। এদের মধ্যে কেউ গর্ভে, প্রসবের সময় এবং শৈশবে মারা গেছে। আর অধিকাংশরা পরিণত বয়সে পরলোক গমন করে। এদের থেকে পাঁচজন খিলাফত প্রাপ্ত হন- যার নজির অন্য খলীফাদের মধ্যে বিরল। তারা হলেন, ১। আল-মুসতাইন আল-আব্বাস। ২। আল-মুতাযদ দাউদ। ৩। আল-মুসতাকফী সুলায়মান। ৪। আল-কায়িম হামযা এবং ৫। আল-মুসতানজিদ ইউসুফ।
খলীফা মুতাওয়াককিলের জীবিত আওলাদের মধ্যে একমাত্র মূসাই বাকী থাকে- যে চারিত্রিক দিক থেকে ইবরাহীম বিন মুসতাকফীর অনুরূপ ছিল। সে সময় বনূ আব্বাসের যতগুলো লোক ছিল মুতাওয়াককিলের আওলাদই ছিল ততগুলো।
৭৬৪ হিজরীতে আল-মানসুর মুহাম্মাদ অপসারিত হলে শাবান বিন হুসাইন বিন নসর বিন মুহাম্মাদ বিনা কালাদুন 'আশরাফ' উপাধি নিয়ে সুলতান মনোনীত হয়। ৭৭৩ হিজরীতে অভিজাতবর্গকে সহজে নির্ণয়ের জন্য সুলতান তাদেরকে সবুজ পাগড়ি বাঁধার নির্দেশ দেয়। এটা ছিল একটি অভিনব কাজের আদেশ। এ বছর উদ্ধত তাইমুর লঙ্গ আক্রমণ চালিয়ে শহরগুলো ধ্বংস করে ফেলে, অনেক বনী আদম হত্যা করে এবং খোদার যমীনে ফিতনা ছড়িয়ে দেয়। আল্লাহ তা'আলা এই অভিশপ্তকে ৮৭৩ হিজরীতে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেন।
তাইমুর লঙ্গ দিহকানের বাসিন্দা ছিল। সে চুরি-রাহাজানীর মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে। অতঃপর খায়ল শহরের সুলতানের কাছে চলে যায়। সুলতানের মৃত্যু হলে সে তার স্থানে বসে। আস্তে আস্তে সে এমন বেড়ে যায় যে, কিয়ামত পর্যন্ত ইতিহাসে তার নাম রয়ে যায়। জনৈক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, তাইমুর লঙ্গ সর্বপ্রথম কত সালে হামলা করে? সে জবাব দেয়, শাস্তির বছর। কারণ আরবী বর্ণমালার মান-নির্ণয় অক্ষরের বিন্যাস প্রণালীর দৃষ্টিকোণ থেকে শাস্তি (عَذَابٌ) এর সংখ্যাগত মান হয় ৭৭৩।
৭৭৫ হিজরীর রমযান মাসে সুলতানের সামনে কেল্লার মধ্যে বুখারী শরীফের ক্লাস আরম্ভ হয়। প্রথমে হাফেজ যাইনুদ্দীন ইরাকী পরবর্তীতে শিহাবুদ্দীন ইরয়ানী কারী নিযুক্ত হন। ৭৭৮ হিজরীতে আশরাফ শাবান নিহত হলে তার ছেলে আলী আল-মানসুর উপাধি নিয়ে তখত নসীন হয়। এ বছর শাবান মাসের ১৪ তারিখে চন্দ্রগ্রহণ এবং ২৮ তারিখে সূর্যগ্রহণ হয়।
৭৭৯ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসের ৪ তারিখে আতাবেগ আল-আসাকির যাকারীয়া বিন ইবরাহীম বিন আল-মুসতামসিক বিন খলীফা হাকিমকে খিলআত প্রদান করে এবং খলীফা বানিয়ে দেয়। অথচ কেউ তার কাছে বাইআত করেনি এবং কেউ তার বিষয়ে ইজমাও করেনি। যাকারীয়া বিন ইবরাহীম আল-মুসতাযদ উপাধি ধারণপূর্বক খলীফা মুতাওয়াককিলকে কুস শহরে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। আশরাফ নিহত হওয়ার সময় আতাবেগের অন্তরে খলীফার প্রতি জিঘাংসার সৃষ্টি হয়। মুতাওয়াককিল কুসে গমন করলে রবিউল আউয়ালের ২০ তারিখে মুসতাযদ ১৫ দিনের জন্য খলীফা হয়ে সেও অপসারিত হয়।
৭৮২ হিজরীতে নামাযের সময় এক লোক চিল্লাচিল্লি করলে নামায শেষে তাকে শূকরের সুরতে দেখা গেল। ৭৮৫ হিজরীর সফর মাসে মানসুর নিহত হলে তার ভাই হাজী বিন আশরাফ সালিহ উপাধি নিয়ে সুলতান মনোনীত হয়। ৭৮৪ হিজরীর রমযান মাসে সালিহ অপসারিত হয় এবং যাহির উপাধি নিয়ে বরকুক বাদশাহ হয়।
৭৮৫ হিজরীর রযব মাসে বরকুক খলীফা মুতাওয়াককিলকে জাবাল দুর্গে বন্দী আল-ওয়াছিক বিল্লাহ উপাধি দিয়ে মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম আল-মুসতামসিক বিন হাকিমের হাতে বাইআত করে নেয়। মুহাম্মাদ ৭৮৮ হিজরীতে ইন্তেকাল করলে লোকেরা মুতাওয়াককিলকে পুনরায় খলীফা মনোনীত করার জন্য অনুরোধ জানালে বরকুক তা প্রত্যাখ্যান করে। সে তার ভাই মুহাম্মাদ যাকারীয়াকে ডেকে এনে খলীফা বানায়। সে ৭৯১ হিজরী পর্যন্ত খলীফা ছিল। অবশেষে বরকুক লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে মুতাওয়াককিলকে মুক্তি দেয় এবং তাকে আবার খলীফা মনোনীত করে। আর যাকারীয়াকে অপসারণ করা হয়। সে স্বেচ্ছায় গৃহজীবন বেছে নেয় এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয়। আর মুতাওয়াককিল মৃত্যু অবধি খলীফাই থাকেন।
📄 আল-ওয়াছিক বিল্লাহ উমর
আল-ওয়াছিক বিল্লাহ উমর বিন ইবরাহীম বিন ওলীআহাদ আল-মুসতামসিক বিন হাকিম। মুতাওয়াক্কিলের অপসারণের পর ৭৮৫ হিজরীর রযব মাসে লোকেরা তার হাতে বাইআত গ্রহণ করে। ৭৮৮ হিজরীর শাওয়াল মাসের ১৯ তারিখ বুধবারে খলীফা থাকা অবস্থায় তার ইন্তেকাল হয়।
📄 আল-মুসতাসিম বিল্লাহ যাকারিয়া
আল-মুসতাসিম বিল্লাহ যাকারিয়া বিন ইবরাহীম বিন আল-মুসতামসিক। তার ভাই-এর মৃত্যুর পর তার বাইআত হয় এবং ৭৯১ হিজরীতে তাকে অপসারণ করা হয়। এর বিবরণ আমরা পেশ করেছি।
📄 আল-মুসতাইন বিল্লাহ আবুল ফজল
আল-মুসতাইন বিল্লাহ আবুল ফজল আল-আব্বাস বিন মুতাওয়াক্কিল বাঈ খাতুন নামক তুর্কী বাঁদির গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। ৮০৮ হিজরীতে মুতাওয়াক্কিলের মৃত্যুর পর তার বাইআত হয়। আল-মুলকুন নাসর ফারাজ সে সময় সুলতান। নাসর শায়েখের সাথে লড়াইয়ে পরাজিত ও নিহত হলে ৮১৫ হিজরীর মুহাররম মাসে খিলাফত মুক্ত হয়ে সুলতানও খলীফার কাছে বাইআত করে। খলীফা বাগদাদে পরিপক্ক বাইআত গ্রহণের পর আমীর-উমারাদের নিয়ে মিসরে আসেন। পয়সায় তার নাম খোদাই করা হয়। শায়খুল ইসলাম ইবনে হাজার তাকে নিয়ে একটি দীর্ঘ কবিতা রচনা করেন।
খলীফা মিসর এসে দুর্গে অবস্থান করেন। শায়খুল আসতাবলও সেই দুর্গে ছিল। মিসরের রাষ্ট্রীয় কাজ করার জন্য শায়খকে মনোনীত করা হয়। তাকে নিযামুল মুলুক উপাধি দেয়া হয়। উমারাগণ খলীফার দরবারে কাজ শেষ করে শায়খের খিদমতে হাযির হতো। সব কাজের দায়িত্ব তার উপর ছিল। তারা খলীফার নিকট থেকে কাজের লিখিত অনুমোদন নিত। আর শায়খ ফরমান জারি করত, আস্তে আস্তে কাজ তার হাতে চলে আসে। এমনকি খলীফার অজান্তেও অনেক ফরমান জারি হতে থাকে। ফলে খলীফা মর্মাহত হন। অবশেষে শায়খ তার উপর সালতানাত অর্পণের জন্য খলীফা সমীপে আবেদন করে। খলীফা এ শর্তে এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন যে, তাকে কেল্লা ছেড়ে নিজ বাড়িতে চলে যেতে হবে। শায়খ এ শর্ত প্রত্যাখ্যান করে মুঈদ উপাধি ধারণপূর্বক জবরদস্তিমূলক সুলতান হয়ে যায়। অতঃপর সে খলীফাকে অপসারণ করে তার ভাই দাউদের নিকট বাইআত করে নেয়। মুসতাইন কেল্লা ছেড়ে সপরিবারে আপন নিবাসে চলে আসেন। শায়খ মুসতাইনের সাথে দেখা সাক্ষাত এবং তার সভা সমাবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এ সংবাদ পেয়ে সিরিয়ার নায়েব নওরুজ বিচারক এবং ওলামাদের সমবেত করে এ ব্যাপারে ফতোয়া জানতে চায়। তারা মুঈদের কাজ অবৈধ হিসেবে ফতোয়া দেন। ফলে নওরুজ মুঈদের সাথে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। সংবাদ পেয়ে ৮১৭ হিজরীতে মুইদ সসৈন্যে যুদ্ধে গমন করে। মুসতাইন ইসকান্দারিয়া চলে গেলে সেখানে গিয়ে তাকে বন্দী করা হয়। ততর সুলতান হলে তাকে মুক্তি দিয়ে কায়রো যাওয়ার অনুমতি দেয়। কিন্তু তিনি ইসকান্দারিয়াকে নিজের স্বপ্নের নগরী মনে করে সেখানেই তার বসবাসের জন্য ভবন নির্মাণ করেন এবং সেখানেই থেকে যান। অবশেষে ৮৩৩ হিজরীর জামাদিউল আখির মাসে প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে খলীফা ইন্তেকাল করেন।
৮১২ হিজরীতে প্রথম দিন নীল নদের পানি আশ্চর্যজনকভাবে হ্রাস পায়। পর দিন আবার নীল নদের পানিতে শহর প্লাবিত হয়। ৮১৪ হিজরীতে ভারত সম্রাট গিয়াসউদ্দীন শাহ বিন ইসকান্দার শাহ খলীফার নিকট অনেক ধন-দৌলত ও উপহার সামগ্রী পাঠিয়ে খিলাফতের দরবারে উপাধি প্রদানের আবেদন জানান।
তার শাসনামলে যেসব ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন তাঁরা হলেন- ইয়ামনের কবি আল-মুফিক আন-নশরী, হাম্বলী আলেম নাসরুল্লাহ বাগদাদী, নাহুবিদ শামসুল মুঈদ মক্কী, শিহাবুল হিসবানী, ইয়ামনের মুফতী শিহাবুন নশরী 'ফারাইয এবং হিসাব' গ্রন্থের লেখক ইবনুল বাহায়েম, ইয়ামনের কবি ইবনুল আফীফ, কাযী আসাকিরের পিতা হানাফী আলেম মুহিব বিন শিহনা প্রমুখ।