📄 আল-হাকিম বি আমরিল্লাহ আবুল আব্বাস
আল-হাকিম বি আমরিল্লাহ আবুল আব্বাস আহমদ বিন আবু আলী হোসেন আবকী বিন আলী বিন আবু বকর বিন খলীফা মুসতারশিদ বিল্লাহ বিন মুসতাযহার বিল্লাহ। বাগদাদে হত্যাযজ্ঞের সময় আত্মগোপনের কারণে তিনি প্রাণে রক্ষা পান। তিনি এক দল লোক নিয়ে বাগদাদ থেকে বনূ খিফাজা গোত্রের আমীর হুসাইন বিন ফালাহ-এর কাছে চলে যান। তার কাছে কিছু দিন থেকে আরবীদের সাথে দামেশকে আমীর ঈসা বিন মাহনার নিকট গমন করেন। দামেশকের শাসনকর্তা আন-নাসর তাকে ডেকে পাঠায়। তিনি তখনও যাননি। ইতোমধ্যে তাতাররা আক্রমণ করে। আল-মুলকুল মুযাফফর দামেশকে তাতারীদের সাথে লড়াই শেষে আমীর ফালাজ বাগদাদীর হাতে আবার তাকে দামেশকে ডেকে পাঠায়। জনসাধারণ তার হাতে বাইআত গ্রহণ করে। আরবের একদল উমারা তাকে সমর্থন জানায়। তিনি তাদের সহচরত্বে ঘানা, হাদীসা, হাইবত, আনবার প্রভৃতি শহর দখল করেন।
অতঃপর তাতারীদের সাথে লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে আনেন। তারপর মুলকুয যাহিরের আহ্বান সম্বলিত দামেশকের নায়েব আলাউদ্দীন তোবায়রিসের পত্র তার কাছে পৌছে। অবশেষে সফর মাসে তিনি দামেশকে পৌছুলে দামেশকের নায়েব আলাউদ্দীন তাকে সুলতান আল-মুলকুয যাহিরের কাছে পাঠিয়ে দেয়। তিনি কায়রোতে পৌছুার তিনদিন পূর্বেই সেখানে মুসতানসিরের বাইআত সম্পন্ন হয়। এজন্য তিনি বন্দী হওয়ার আশঙ্কায় হলবে ফিরে যান। হলবে সেখানকার শাসনকর্তা এবং সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ তার হাতে বাইআত গ্রহণ করেন। বাইআতকারীদের মধ্যে ছিলেন আব্দুল হালীম বিন তাইমিয়া। বাইআতকারীদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। তিনি ঘানায় যান। মুসতানসির ঘানায় গেলে তিনি তার আনুগত্য গ্রহণ করেন। মুসতানসির তাতারীদের সাথে যুদ্ধে নিখোঁজ হওয়ায় রুহবার প্রশাসক ঈসা বিন মাহনার নিকট যান। সেখান থেকে আল-মুলকুয যাহির বিবরস তাকে ডেকে পাঠায়। তিনি নিজ সন্তানদের সাথে একদলসহ কায়রোতে পৌঁছেন। যাহির তাকে অত্যন্ত সমাদর করে এবং তার নিকট খিলাফতের বাইআত করে। যাহির দুর্গের শিখরে আরোহণ করে। তিনি সেখানে কয়েক বার খুতবা প্রদান করেন।
শায়খ কুতুবুদ্দীন বলেন, ৬৬১ হিজরীর মুহাররম মাসের ৮ তারিখ বৃহস্পতিবারে সুলতান একটি আম মজলিশের ইন্তেজাম করে। হামিক বি আমরিল্লাহ কিলআতুল জাবালের বড় প্রাসাদে গিয়ে সুলতানের সাথে উপবেশন করেন। সুলতান তার সম্মানে যমীন চুম্বন করে এবং বাইআত করে। খলীফা সুলতানকে খিলাআত প্রদান করায় তার লোকেরা একের পর এক বাইআত করতে থাকে। পর দিন জুমআয় তিনি খুতবা পাঠ করেন। হামদ এবং সালাতের পর জিহাদ ও ইমামতের গুরুত্ব তুলে ধরে খিলাফতের বেইজ্জতির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি খুতবায় এভাবে আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করেন— সেই প্রতিপালকের প্রশংসা যিনি বনু আব্বাসের সাহায্যকারী। খুতবা শেষে তার বাইআতের ঘোষণা দেওয়া হয়।
৬৬১ হিজরীতে এ ঘটনার পর তাতারীরা ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। আশ্রয়কারী হয়ে তারা মুসলিম সাম্রাজ্যে নীরবতার সাথে বসবাস করতে লাগে। তাদের জন্য ভাতা নির্ধারণ করা হয়। এভাবে তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি কমতে থাকে। ৬৬২ হিজরীতে কাসরিয়ীন শহরে মাদরাসা যাহিরিয়া নির্মিত হয়। শাফী মাযহাবের ফিকাহ শাস্ত্র শিক্ষা দানের জন্য তাকী বিন যারীর এবং হাদীসের শিক্ষক হিসেবে শরফ দিময়াতীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ বছর মিসরে শক্ত ভূমিকম্প হয়। ৬৬৩ হিজরীতে স্পেনের বাদশাহ সুলতানুল মুসলিমীন আবু আব্দুল্লাহ বিন আল-আহমর ফিরিঙ্গীদের পরাজিত করে বাতীস শহর ছিনিয়ে নেন। এ বছর কায়রো শহরের বিভিন্ন ভবনে অগ্নিসংযোগ হয়। এ বছর সুলতান উমারাদের সাথে নিয়ে আশমুন সাগর খনন কার্যে সশরীরে অংশগ্রহণ করেন। এ বছর তাতারীদের সরদার হালাকু খান মারা যায়। তদস্থলে তার ছেলে আবগা বাদশাহ হয়। এ বছর সুলতান তার চার বছরের পুত্র সন্তান মুলক আল-সাঈদকে উত্তরাধিকার মনোনীত করে। এ বছর মিসরে প্রত্যেক মাযহারের চার বিচারক নিয়োগ করা হয়। এ বছর রমযান মাসে সুলতান খলীফাকে পর্দার আড়ালে রাখে। ৬৬৫ হিজরীতে সুলতান হাসিনাহ শহরে একটি জামে মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দেয়। ৬৬৭ হিজরীতে নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়। এ মসজিদে হানাফী মাযহাবের খতীব নিয়োগ পান।
৬৭৪ হিজরীতে সুলতান নূবা এবং দানকিলা যুদ্ধের মাধ্যমে জয় করে নূবার বাদশাহকে যাহিরের সামনে হাযির করা হয় এবং দানকিলার অধিবাসীদের উপর যিজিয়া কর আরোপ করা হয়। যাহাবী বলেন, ৩৩ হিজরীতে সর্বপ্রথম আব্দুল্লাহ বিন আবু সুরাহ ৫০০০ ঘোড় সওয়ার নিয়ে নূবা আক্রমণ করেও বিজয় ছিনিয়ে আনতে না পেয়ে সন্ধি করেন। অতঃপর হিশামের যুগেও হামলা চালানো হয়। কিন্তু বিজয় আসেনি। এরপর যথাক্রমে মানসুর, নাসিরুদ্দৌলা বিন হামদান এবং সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর ভাই তুরান শাহ ৫৬৮ হিজরীতে লড়াই করেও বিজয়মাল্য পরতে পারেনি। আর তা এ বছর বিজিত হয়। এ বিজয়কে নিয়ে ইবনে আব্দুয যাহির একটি কবিতা লিখেছেন যার অর্থ হলো— "এটা এমন এক বিজয় যা কখন শুনিনি, দেখিনি এবং লোকরো এর বিবরণ দেয়নি।"
৬৭৬ হিজরীর মুহাররম মাসে সুলতান মুলকু যাহির ইন্তেকাল করে। তদস্থলে ১৮ বছর বয়সে তার ছেলে সাঈদ মুহাম্মাদ উপবেশন করে। এ বছর তাকী বিন রাযী মিসর এবং কায়রো উভয় শহরের বিচারপতি মনোনীত হন। ইতিপূর্বে শহরদ্বয়ে পৃথক পৃথক বিচারপতি ছিলেন। ৬৭৮ হিজরীতে সাঈদ মুহাম্মাদকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং সে এ বছর মারা যায়। তার স্থলে স্বীয় ভাই বদরুদ্দীন শালামাশ সুলতান হয়ে মিসরে সাত বছর দায়িত্ব পালন করে। তার উপাধি ছিল মুলকুল আদেল। আমীর সাইফুদ্দীন কালাদুন (কালদুয) তার অভিভাবকত্বের দায়ভার গ্রহণ করে। দু'দিকে দু'জনের নাম খোদিত মুদ্রা চালু হয়। খুতবায় দু'জনের নাম পাঠ করা হয়। রযব মাসে শালামাশকে সরিয়ে কালাদুন আর-মুলকুন মানসুর উপাধি নিয়ে একচ্ছত্র বাদশাহ হয়ে যায়। ৬৭৯ হিজরীতে আরাফার দিন শিলা এবং বজ্রপাত হয়। ৬৮০ হিজরীতে তাতারীরা সিরিয়ায় এসে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করলে সুলতান তাদের সাথে যুদ্ধ করলে মুসলমানরা বিজিত হয়।
হযরত মুআবিয়া (রা.)-এর শাসনামলে তারাবালাস শহর বিজিত হয়। ৫০৩ হিজরীতে খৃস্টানরা তা ছিনিয়ে নেয়। ৬৮৮ হিজরীতে তা আবার পুনঃদখল হয়। ৬৮৯ হিজরীর যিলকদ মাসে সুলতান কালাদুনের ইন্তেকাল হয়। তদস্থলে তার ছেলে আল-মুলকুল আশরাফ সালাহুদ্দীন খলীল সুলতান হয়। ৬৯১ হিজরীতে সুলতান রোমের দুর্গ অবরোধ করে। ৬৯৩ হিজরীতে সুলতান নিহত হয়। তার ভাই মুহাম্মদ বিন মানসুর ৯ বছর বয়সে আল-মুলকুন নাসর উপাধি নিয়ে ক্ষমতার আরোহণ করে। ৬৯৪ হিজরীর মুহাররম মাসে তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে কিতবাগা আল-মানসুর মুলকুল আদেল লকব ধারণ করে তখতে উপবেশন করে। এ বছর তাতারীদের বাদশাহ ফাযান বিন আওগুন বিন আব-না বিন হালাকু খান ইসলাম গ্রহণ করায় মুসলমানরা খুশি হয় এবং তার সৈন্যদের মাঝে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে।
৬৯২ হিজরীতে সুলতান মুলকূল আদেল দামেশক গেলে সফর মাসে লাজীন জবরদস্তীমূলক আমীর-উমারাদের থেকে আনুগত্যের শপথ আদায় করে। খলীফা তাকে খিলআত প্রদান করেন। মুলকুন আদেল সরহদে পালিয়ে যায়। অবশেষে ৬৯৮ হিজরীতে লাজীন নিহত হয়। অতঃপর ক্ষমতাচ্যুত মুলকুন নাসর মুহাম্মাদ বিন মানসুর কালাদুন আবার সুলতান হয়। খলীফা তাকেও খিলআত প্রদান করেন। আর আল-মুলকূল আদেল নায়েবে সালতানাত হয়ে হাম্মাত শহরে গমন করে। সে মৃত্যু অবধি ৭০২ হিজরী পর্যন্ত সেখানেই ছিল।
৭০১ হিজরীর জামাদিউল আউয়াল মাসের ১৮ তারিখ জুমআর রাতে খালীফা হাকিম বি আমরিল্লাহ ইন্তেকাল করেন। আল্লাহ তা'আলা তার উপর রহম করুন। আসরের সময় দুর্গের নিচে সওকে খায়েল-এ তার জানাযার নামায পড়ানো হয়। খলীফার আত্মীয়-স্বজন এবং সাম্রাজ্যের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ রক্ষী-প্রহরীসহ জানাযার নামাযে শরীক হন। তাকে সাইয়্যেদাহ নাফীসার নিকটে সমাহিত করা হয়। তিনি প্রথম খলীফা যাকে সর্বপ্রথম এখানে দাফন করা হয়েছিল। তখন থেকে আজ পর্যন্ত তার বংশধরকে এখানেই দাফন করা হয়।
📄 আল-মুসতাকফী বিল্লাহ আবু রাবীআ
আল-মুকতাফী বিল্লাহ আবু রাবীআ সুলায়মান বিন হাকিম বি আমরিল্লাহ ৬৮৪ হিজরীর মুহাররম মাসের মাঝামাঝিতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার খিলাফত কালে তিনি উত্তরাধিকার মনোনীত হওয়ায় পরবর্তীতে খলীফা হন। ৭০১ হিজরীর জামাদিউল আউয়াল মাসে মিসর এবং সিরিয়ার মিম্বারগুলোতে তার নামে খুতবা পাঠ করা হয়। এর সুসংবাদ মুসলিম সাম্রাজ্যের চারিদিকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। খিলাফতের খান্দানরা আস্তাবলে থাকতেন। সুলতান তাদের দুর্গে ডেকে এনে তাদের পৃথক পৃথক ঘর দেয়।
৭০২ হিজরীতে তাতাররা সিরিয়ার উপর হামলা চালায়, খলীফা এবং সুলতান যৌথভাবে মোকাবিলা করলে তারা পরাজিত হয়। এ যুদ্ধে অনেক তাতার সৈন্য নিহত হয়। এ বছর মিসর এবং শামে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়। ফলে বিধ্বস্ত বাড়ির নিচে অনেক মানুষ চাপা পড়ে মারা যায়। ৭০৪ হিজরীতে আমীর বিবরস জামে মসজিদে হাকিম-এ দরস তদরীস শুরু করেন। তিনি চারজন কাযী নিয়োগ করেন। ফিকহের দু'জন শিক্ষক, সাঈদুদ্দীন হারেছী হাদীসের জন্য এবং আবু হায়ানকে আরবী ব্যাকরণের উস্তাদ পদে নিয়োগ দেন।
৭০৮ হিজরীর রমযান মাসে সুলতান আল-মুলকুন নসর মুহাম্মাদ বিন কারাদুন হজ্বব্রত পালনের জন্য মিসর থেকে এক জামাত আমীর-উমারাসহ যাত্রা করে। পথিমধ্যে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মর্মাহত হয়ে সে মিসরে ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার সংবাদ পাঠালে ৭০৮ হিজরীর শাওয়াল মাসের ২৩ তারিখে রুকুনদ্দৌলা বিবরস তদস্থলে অধিষ্ঠিত হয়। সে মুলকুল মুযাফফর উপাধি ধারণ করে। খলীফা তাকে খিলআত এবং পাগড়ি প্রদান করেন। অতঃপর খলীফার একখানা ফরমান নিয়ে সে সিরিয়া গমন করে। শাহী ফরমানে লিখা ছিল— إِنَّهُ مِنْ سُلَيْمَانَ وَإِنَّهُ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
৭০৯ হিজরীতে আল-মুলকুন নাসর আবার সালতানাতের দাবী করলে আমীর-উমারাদের একটি জামাত তাকে সমর্থন জানায়। শাবান মাসে দামেশকে আসে এবং ঈদুল ফিতরের দিন সে মিসরের দুর্গে প্রবেশ করে। মুলকুল মুযাফফর পালিয়ে যায় এবং পরবর্তীতে তাকে হত্যা করা হয়। এ বছর তাতারীদের বাদশাহ ফুবন্দ তার রাজ্যে রাফেযীদের অনুরুপ খতীবদের হযরত আলী (রা.), আহলে বাইত এবং তার আওলাদ ছাড়া খুতবায় কারো নাম উল্লেখ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করে। তার মৃত্যু পর্যন্ত অর্থাৎ ৭১৬ হিজরী পর্যন্ত এ নির্দেশ বহাল ছিল। তারপর তার ছেলে আবু সাঈদ ক্ষমতায় অরোহণ করলে চারিদিকে ইনসাফ ছড়িয়ে পড়ে। তিনি সুন্নতকে কায়েম করেন। খুতবায় যথাক্রমে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.), হযরত উমর ফারুক (রা.), হযরত উসমান গনী (রা.) এবং হযরত আলী মুর্তজা (রা.)-এর নাম জারী করেন। তার প্রশাসনিক নীতি সকল (তাতারী) বাদশাহদের নীতি অপেক্ষা শ্রেয়, বলিষ্ঠ ও উত্তম ছিল। তিনি সুন্নতের অনুসারী ছিলেন। মৃত্যু অবধি তিনি এই অভিন্ন তরিকার উপর অটুট ছিলেন। ৭৩৬ হিজরীতে তার মৃত্যুর পর তাতারীদের সালতানাত দুর্বল হয়ে পড়ে।
৭১৭ এবং ৭২৭ হিজরীতে নীল নদের পানি আশ্চর্যজনকভাবে হ্রাস পায়। পর দিন আবার নীল নদের পানিতে শহর প্লাবিত হয়। ৭২৮ হিজরীতে পবিত্র মক্কা নগরীর মসজিদে হারাম এবং তার দরজা নির্মাণ করা হয়। ৭৩০ হিজরীতে মাদরাসা সালিহিয়ায় জুমআর নামায কায়েম করা হয়। এ বছর কুসুন একটি জামে মসজিদ নির্মাণ করেন। ৭৩৩ হিজরীতে সুলতান আবনুস বৃক্ষের কাষ্ঠ দ্বারা কাবা শরীফের দরজা তৈরি করে। ৭৩৬ হিজরীতে সুলতান খলীফাকে কেল্লার এক শীর্ষ প্রকোষ্ঠে নজরবন্দী করে। ৭৩৭ হিজরীর যিলহজ্ব মাসে আত্মীয়-স্বজনসহ খলীফাকে কুসে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অবশেষে খলীফা ৫০ বছর বয়সে ৭৪০ হিজরীর শাবান মাসে ইন্তেকাল করেন। তাকে সেখানেই চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
ইবনে হাজার 'আদ-দর' গ্রন্থে লিখেছেন, খলীফা মুসতাকফী জ্ঞানী, উদার এবং বীর-বাহাদুর ব্যক্তি ছিলেন। তার হস্তাক্ষর ছিল অপূর্ব। তিনি ওলামা এবং সাহিত্যিকদের সহচরত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তিনি তাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধা এবং সমাদর করতেন। তার শাসনামলে, নজরবন্দী থাকাকালীন এমনকি কুসে অবস্থান করার সময় সর্বদা তার নামে খুতবা পাঠ করা হত। ইবনে ফাযলুল্লাহ 'আল-মাসলিক' গ্রন্থের অনুবাদ করতে গিয়ে লিখেছেন, খলীফা মুসতাকফী অত্যন্ত নম্র হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন।
📄 আল-ওয়াছিক বিল্লাহ ইবরাহীম
আল-ওয়াছিক বিল্লাহ ইবরাহীম বিন ওলীয়ে আহাদ আল-মুসতামসিক বিল্লাহ আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন হাকিম বি আমারিল্লাহ আবুল আব্বাস আহমদের দাদা হাকিম পুত্র মুহাম্মাদকে আল-মুসতামসিক বিল্লাহ উপাধি দিয়ে উত্তরাধিকার মনোনীত করেন। তবে তিনি পিতার সামনে ইন্তেকাল করায় হাকিম তার নাতি ইবরাহীমকে উত্তরাধিকার মনোনীত করেন। হাকিমের ধারণা ছিল ইবরাহীমের মধ্যে খিলাফত পরিচালনার যোগ্যতা সৃষ্টি হবে। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি নিজেই বুঝতে পারেন যে, ইবরাহীম এ কাজের যোগ্য নন। কারণ তিনি খেলাধুলা প্রিয় এবং চরিত্রহীন লোকদের সহচর ছিলেন। হাকিম তার সংশোধনে অপারগ হয়ে তাকে উত্তরাধিকার থেকে অপসারণ করে ইবরাহীমের চাচা মুসতাকফীকে উত্তরাধিকার মনোনীত করেন। ফলে ইবরাহীম খলীফা এবং সুলতানের মধ্যে মনোমালিন্যের বীজ বপন করেন।
মুসতাকফী মৃত্যুর সময় পুত্র আহমদকে উত্তরাধিকার মনোনীত করেন। কিন্তু সুলতান এ ব্যাপারে ভ্রূক্ষেপ না করায় জনগণ ইবরাহীমের নিকট বাইআত করে এবং তাকে আল-ওয়াছিক বিল্লাহ উপাধি দেয়। মৃত্যুর সময় সুলতান এ কাজে দারুণ অনুতপ্ত হয় এবং ৭৪২ হিজরীর মুহাররম মাসের শেষে ইবরাহীমকে অপসারণ করে আহমদকে হাকিম বি আমরিল্লাহ উপাধি দিয়ে খলীফা নির্ধারণ করে দেয়। আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী বলেন, লোকেরা ইবরাহীমের অনৈতিক কাজসমূহের অভিযোগ জানালেও সুলতান তাদের কথায় কোনো প্রকার কান দেয়নি। উপরন্তু তারই হাতে বাইআত হয়।
ইবনে ফাযলুল্লাহ 'আল-মাসালিক' গ্রন্থে লিখেছেন, খিলাফতের যোগ্যতা এসে যাবে ভেবেই হাকিম ইবরাহীমকে উত্তরাধিকার মনোনীত করেছিলেন। কিন্তু তিনি সৎলোকের সহচরে না গিয়ে মন্দ মানুষের সংস্পর্শে হারাম কাজে লিপ্ত হয়ে পড়েন। মুসতাকফীর মৃত্যুর সময় তার ছেলের প্রতি করুণা করার প্রেক্ষিতে খলীফার সাথে সুলতানের সম্পর্কে ভাটা পড়ে। এর সূত্র ধরে সুলতান ইবরাহীমকেই মনোনীত করে। যেহেতু ইবরাহীমের দাদা হাকিম তাকে উত্তরাধিকার বানিয়েছেন মুসতাকফী তার ছেলে আহমদকে মনোনীত করার আগেই। প্রধান বিচারপতি আবু উমর বিন জামাত সুলতানের বিরোধিতা করেন। কিন্তু তার অভিমতটিই প্রাধান্য পেয়ে যায়। খুতবায় তার পরিবর্তে সুলতানের নাম উল্লেখ হয়। মুসতাকফীর মৃত্যুর পর থেকে খুতবায়, মিম্বরে এবং দু'আর মজলিসে খলীফাদের নাম বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং সুলতানদের নাম বাকী থেকে যায়। সুলতানের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত এ অবস্থা অব্যাহত ছিল। মৃত্যুর কড়াঘাতে শঙ্কিত সুলতানের তখন দৃষ্টি খুলে যায়। খলীফা মুসতাকফীর ওসীয়ত মোতাবিক খিলাফত বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য সুলতান এবার উঠে পড়ে লাগে। সে তার পূর্বের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয় এবং ইবরাহীমকে অপসারণ করে।
📄 আল-হাকিম বি আমরিল্লাহ আবুল আব্বাস
আল-হাকিম বি আমরিল্লাহ আবুল আব্বাস আহমদ বিন আল-মুসতাকফী। কুস শহরে ইন্তেকালের সময় মুসতাকফী হাকিমকে উত্তরাধিকার মনোনীত করলে সুলতান আল-মুলকুন নাসর হাকিমের চাচাত ভাই ইবরাহীমকে নির্বাচন করে। ইবরাহীমের চরিত্র ভাল না হওয়ার কারণে কাযী আযুদ্দীন বিন জামাত সুলতানের বিরোধিতা করেন। কিন্তু তা কোনোই কাজে আসেনি। সুলতান ইবরাহীমের কাছেই বাইআত করে। অবশেষে মৃত্যুর সময় সুলতানের বোধোদয় হয়। সে ইবরাহীমকে অপসারণ করে আহমদের (হাকিমের) নিকট বাইআত গ্রহণের জন্য আমীর-উমারাদের ওসীয়ত করে। সুলতানের মৃত্যুর পর আল মানসুর আবু বকর বিন নসর সুলতান হয়। ৭৪১ হিজরীর যিলহজ মাসের ১১ তারিখ মঙ্গলবারে নতুন সুলতান একটি মজলিশের আয়োজন করে। এ মজলিশে ইবরাহীম এবং হাকিম উভয়কেই ডেকে আনা হয়। ভরা মজলিশে কাযীদের জিজ্ঞাসা করে, শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে খিলাফতের হকদার কে? কাযী আযুদ্দীন বিন জামাত বললেন, খলীফা মুসতাকফী মৃত্যুর সময় কুস শহরে পুত্র আহমদকে উত্তরাধিকার মনোনীত করেন। এ কাজের সত্যতা প্রমাণের জন্য খলীফা কুস শহরের ৪০ জন ইনসাফগার সাক্ষীও রেখে গেছেন। এ কথা শুনে সুলতান সঙ্গে সঙ্গে ইবরাহীমকে অপসারণ করে আহমদের নিকট বাইআত করে আল-হাকিম বি আমরিল্লাহ উপাধি দেয়।
ইবনে ফাযলুল্লাহ 'মাসালিক' গ্রন্থে লিখেছেন, হাকিম বি আমরিল্লাহ হলেন আমাদের যুগের ইমাম এবং আমাদের দেশের জন্য রহমতের বারিধারায় সিক্ত বাদশাহ। সারা জীবন মঙ্গলময় কাজ করার দরুন তার প্রতি সকলের সশ্রদ্ধ দৃষ্টি নত হয়ে যেত। তিনি খিলাফতের রীতিনীতিগুলোকে পুনঃজীবন দান করেন। তার বিরুদ্ধবাদিদের কাউকে তিনি শাস্তি দেননি। তিনি বাপ-দাদার পদাঙ্ক অনুসরণে চলতেন। স্বীয় পরিজনের মধ্যে বিরাজিত হতাশা এবং মতভেদ দূর করে দেন। সকল মিম্বরগুলোতে তার নামে খুতবা পাঠ হতে থাকে।
আল্লামা ইবনে হাজার বলেন, প্রথমে তার উপাধি আল-মুসতানসির নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে আল-হাকিম লকব হয়ে যায়। ৭৫৩ হিজরীর মধ্যবর্তীতে প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। তাঁর শাসনামলের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে— সুলতান মানসুরের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা এবং মদ পানের দায়ে তাকে অপসারণ করা হয়। তাকে কুসে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং ওখানেই সে নিহত হয়। মানসুর অপসারিত হবার পর তার ভাই আল-মুলকুল আশরাফ সুলতান হয়। তাঁকেও তখত থেকে নামিয়ে দেওয়ার পর তার ভাই আহমদ নসর লকব ধারণপূর্বক মসনদে আরোহণ করে। ৭৪৩ হিজরীতে আহমদকেও ক্ষমতা থেকে সরিয়ে তদস্থলে তার ভাই ইসমাঈল সলিহ উপাধি নিয়ে সুলতান হয়। ৭৪৬ হিজরীতে ইসমাঈল সলিহের মৃত্যু হলে খলীফা তার ভাই শাবানকে আল-কামিল উপাধি দিয়ে সুলতান মনোনীত করেন। ৭৪৭ হিজরীতে কামিল নিহত হলে তার ভাই আমীর হাজ আল-মুযাফফর উপাধি নিয়ে তখত নসীন হয়। তাঁকেও ৭৪৮ হিজরীতে অপসারণের পর তার ভাই হোসেনকে নসর উপাধি দিয়ে সুলতান বানানো হয়। ৭৫২ হিজরীতে হোসেন ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ালে তার ভাই সলিহ সুলতান মনোনীত হয়।
তার যুগে যেসব ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন তাঁরা হলেন— হাফেজ আবুল হাজ, তাজ আব্দুল বাকী ইয়াযনী, শামস আব্দুল হাদী, ইবনুল ওয়ার্দী, আবু হিয়ান, ইবনুল লুবান, ইবনে আদলান, ইবনে ফযলুল্লাহ, ইবনে কাইয়্যম জাওযী প্রমুখ।