📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 আয-যাহের বিআমরিল্লাহ আবু নসর

📄 আয-যাহের বিআমরিল্লাহ আবু নসর


আয-যাহের বিআমরিল্লাহ আবু নসর মুহাম্মাদ বিন আন-নাসের লিদ্দীনিল্লাহ ৫৭১ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার শাসনামলে তিনি উত্তরাধিকার মনোনীত হন। পিতার পর তিনি তখতে আরোহণ করেন।

বাহান্ন বছর বয়সে তিনি তখতনসীন হন। প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ রাজ্য জয়ের প্রতি মনোনিবেশ না করার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ক্ষেত শুষ্ক হয়ে গেছে। এখন আর সেখানে কি রোপণ করা যেতে পারে? তারা বলল, আল্লাহ তা'আলা আপনার জীবন দীর্ঘায়ু করুন। তিনি বললেন, আসরের পর দোকান খুললে সে কতটুকুর মুনাফা করতে পারে? তিনি প্রজাবৃন্দের সাথে করুণাসূচক আচরণ করেন। সকল ট্যাক্স ক্ষমা করেন। অত্যাচার প্রতিহত করণের ব্যবস্থা নেন এবং প্রচুর দান করেন। ইবনে আছীর বলেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এবং হযরত উমর ফারুক (রা.) কর্তৃক প্রবর্তিত ইনসাফ প্রতিষ্ঠার নীতিগুলো তিনি ছাড়া কোনো খলীফা অনুসরণ করেননি। তবে যদি এটা বলা হয়, হযরত উমর বিন আব্দুল আযীযের পর সেই নীতি অনুসরণের কোনো খলীফা ছিল না- তাহলে সেটা হবে সবচাইতে বিশুদ্ধ অভিমত।

তার পিতা এবং পিতামহ যে ভূখণ্ড ও সম্পদ কুক্ষিগত করেছিলেন সেগুলো তিনি হকদারদের ফিরিয়ে দেন। সাম্রাজ্যের সকল কর তিনি মওকুফ করে দেন। তিনি খাজনা আদায়ে পুরাতন নীতি অনুসরণের আহকাম জারী করেন। প্রাচীন প্রথায় ইরাকের শুল্ক আদায়ের নির্দেশ দেন। পুরাতন খলীফাদের যুগে ইরাকে ২০ হাজার দিনার আদায় করা হত। তার পিতার যুগে ৮০ হাজারে উন্নতি হয়। তিনি পুরাতন হিসাব অনুযায়ী ১০ হাজার ক্ষমা করে ১০ হাজার আদায়ের নির্দেশ দেন। এরপরও প্রজাবৃন্দের অনুরোধের প্রেক্ষিতে সতেজ বৃক্ষের খাজনা আদায়ের হুকুম দেন।

তার ন্যায়বিচারের আরেকটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে, ওসেতা শহরের এক সরকারী অফিসারের নিকট এক লাখ দিনার ছিল। যা সে অন্যায়ভাবে উপার্জন করেছিল। দারুল খিলাফতের নির্দেশে সেগুলো হকদারদের নিকট ফিরিয়ে দেয়া হয়। জনগণের মধ্যে যারা খাজনা অনাদায়ের দায়ে বন্দী ছিল তিনি ১০ হাজার দিরহাম পাঠিয়ে বিচারককে তাদের মুক্তি দেবার নির্দেশ দেন। ঈদুল আযহার রাতে তিনি ওলামা এবং সাহাবাদের মধ্যে এক লাখ দিনার বণ্টন করেন। সুবত ইবনে জাওযী বলেন, খলীফা ধনাগারে প্রবেশ করলে খাদেম বলল, আপনার বাবার যুগে এ কোষাগার ধন-রত্নে পরিপূর্ণ ছিল। জবাবে তিনি বললেন, আমি কোষাগার ভরপুর করার জন্য আসিনি। আল্লাহর পথে সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে চাই। ধন-রত্ন সংগ্রহ ও জমা করা সওদাগরের কাজ। ইবনে ওয়ায়েল বলেন, আয-যাহের ন্যায়বিচার করতেন এবং শুল্ক মওকুফ করেন। তিনি জনগণের সাথে উঠা বসা করতেন।

৬২৩ হিজরীর রযব মাসের ১৩ তারিখ সোমবার রাতে এ মহামতি খলীফার ইন্তেকাল হয়। তিনি নয় মাস কয়েক দিন খিলাফত পরিচালনা করেন। তিনি তার পিতার নিকট থেকে হাদীস রেওয়ায়েতের অনুমতি লাভ করেন। আর আবু সলেহ নসর বিন আব্দুর রাযযাক বিন শায়েখ আব্দুল কাদির জিলানী (র.) তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেন।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 আল-মুসতানসির বিল্লাহ জাফর

📄 আল-মুসতানসির বিল্লাহ জাফর


আল-মুসতানসির বিল্লাহ আবু জাফর মানসুর বিন আয-যাহের বিআমরিল্লাহ ৫৭৭ হিজরীর সফর মাসে জনৈক তুর্কী বাঁদির গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার পর ৬২৩ হিজরীর রযব মাসে তিনি তখতে আরোহণ করেন। তিনি প্রজাগণের মধ্যে ন্যায়বিচার ছড়িয়ে দেন। বিচার ব্যবস্থায় ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেন। ওলামা এবং দ্বীনদারদের উপদেষ্টা নিয়োগ করেন। মসজিদ, মাদরাসা ও হাসপাতাল নির্মাণ করেন। দ্বীনকে শক্তিশালী করেন। শত্রুদের ধ্বংস করে দেন। সুন্নতের প্রসার ঘটান। ফিতনা দমন করেন। সুন্নতের উপর চলার তাকীদ দেন। জিহাদের সুন্দর ব্যবস্থাপনা তৈরি করেন।

মুফিক আব্দুল লতীফ বলেন, তিনি সুন্দর আখলাক গ্রহণের মাধ্যমে মসনদে আরোহণ করেন। তিনি বিদআত বন্ধ করেন। দ্বীনদার সভাসদ নিয়োগ, ইসলামকে শক্তিশালী, বিলুপ্ত প্রায় দ্বীনের কাজ পুনপ্রবর্তন এবং লোকদের অন্তরে সেকাজগুলোর প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করেন। হাফেজ যাকীউদ্দীন আব্দুল আযীম মুনযেরী বলেন, মুসতানসির নেককার এবং নেক কাজের প্রতি অত্যন্ত নিষ্ঠাবান। তিনি মাদরাসা আল-মুনতাসিরীয়া নামক একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন। ইবনে ওয়াসেল বলেন, মুনতাসির দজলা নদীর তীরে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এ ধরনের উন্নত প্রতিষ্ঠান পৃথিবীতে আর একটিও ছিল না। তৎকালীন যুগে এহেন ছাত্র সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠান ছিল দুনিয়াতে বিরল। এ প্রতিষ্ঠানে চার মাযহাবের চার শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। এতে একটি হাসপাতালও ছিল। ফকীহদের জন্য ছিল একটি বাবুর্চিখানা। পর্যাপ্ত ঠাণ্ডা পানির ব্যবস্থা ছিল। ফকীহদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা, যানবাহন, তেল, প্রদীপ, কাগজ ইত্যাদির সরবরাহ ছিল অফুরন্ত। এরপরও ফকীহদের এক দিনার করে মাসিক ভাতা প্রদান করা হত।

খলীফার সেবায় নিয়োজিত থাকা বিশাল সৈন্যবাহিনী। তার বাবা ও দাদারও এত সুবিশাল বাহিনী ছিল না। তিনি নিজেও একজন সাহসী, নির্ভীক, বীর-বাহাদুর লোক ছিলেন। তাতাররা তার রাজ্যগুলোতে হামলা করলে তার বাহিনী রুখে দাঁড়ায়। ফলে তাতাররা লজ্জাজনকভাবে পরাজিত হয়। খিফাজী নামক খলীফার একজন ভাই ছিল। সেও একজন নির্ভীক যোদ্ধা। মুনতাসিরের মৃত্যুর পর তার দুর্ভাগ্য তাকে নিদারুণভাবে জড়িয়ে ধরে। আত্মম্ভরিতা, মদ্যপান এবং কর্কশ স্বভাবের কারণে লোকেরা তার বাইআত গ্রহণ না করে মুসতানসিরের ছেলে আবু আহমদের হাতে বাইআত করে।

যাহাবী বলেন, মাদরাসা মুসতানসারীয়ার বাজেট ছিল ৭০ মিছকাল। মাদরাসার ভিত্তি দেয়া হয় ৬২৫ হিজরীতে। আর একাজ সমাপ্ত হয় ৬৩১ হিজরীতে। এতে একটি গ্রন্থাগার ছিল। ১৬০ উট বহনযোগ্য গ্রন্থাদি সমৃদ্ধ এ পাঠাগারে চার মযহাবের ২৪৮ জন ছাত্র জ্ঞান চর্চা করত। এ মাদরাসার শিক্ষাবর্ষ শুরু হত রযব মাসে। ৬৩২ হিজরীতে প্রচলিত স্বর্ণের ক্ষুদ্রাংশে নির্মিত মুদ্রার পরিবর্তে মুসতানসির চাদীর মুদ্রা তৈরি করেন। ৬৩৫ হিজরীতে কাযী শামসুদ্দীন আহমদ আল-জুফী দামেশকের বিচারক মনোনীত হন। ৬৩৭ হিজরীতে শায়খ আযুদ্দীন বিন আব্দুস সালাম দামেশকের খতীব মনোনীত হন।

৬৪০ হিজরীর জামাদিউল আখের মাসের শুক্রবারে মুসতানসির ইন্তেকাল করেন। তার শাসনামলে নিম্নবর্ণিত ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন- ইমাম আবুল কাসিম আর-রাফী, জামালুল মিসরী, ইবনে মাযুর আন-নাহবী, ইয়াকুব আল-হুমুবী, সিকাকী, হাফেজ আবুল হাসান বিন কিতান, মুফিক আব্দুল লতীফ বাগদাদী, হাফেজ আবু বকর ইবনে নুকতা, আযুদ্দীন আলী বিন আছীর, সাইফুল আমাদী, ইবনে ফুযলান, উমর বিন আল-ফরিয, শিহাবুদ্দীন সহরওয়ার্দী, আল্লামা আবুল খাত্তাব বিন ওহয়া, হাফেজ আবু রবী বিন মুসলিম প্রমুখ।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 আল-মুসতানসির বিল্লাহ আহমদ

📄 আল-মুসতানসির বিল্লাহ আহমদ


আল-মুসতানসির বিল্লাহ আহমদ আবুল কাসিম বিন যাহির বিন বি আমরিল্লাহ আবূ নসর মুহাম্মাদ বিন নসর লিদ্দীনিল্লাহ আহমদ। শায়খ কুতুবুদ্দীন বলেন, আল-মুসতানসির বিল্লাহ বাগদাদে বন্দী ছিলেন। তাতারীদের ফিতনার সময় জিন্দানখানা থেকে পালিয়ে পশ্চিম ইরাকে চলে যান। বিবরস সুলতান হওয়ার পর তিনি বনু মিহারিশ গোত্রের ১০ জন প্রতিনিধি নিয়ে সুলতানের কাছে আসেন। সুলতান বিচারক ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে তাকে স্বাগত জানিয়ে কায়রোতে নিয়ে আসে। প্রধান বিচারপতি তাজুদ্দীন বিন বিনতুল ইআয তার বংশ পরম্পরা ছাবেত করেন। ৬৫৯ হিজরীর রযব মাসের ১৩ তারিখ সর্বপ্রথম সুলতান তার হাতে খিলাফতের বাইআত করে। অতঃপর প্রধান বিচারপতি তাজুদ্দীন, তারপর শায়খ আযুদ্দীন বিন আব্দুস সালাম, অভিজাত ব্যক্তিবর্গ, তারপর রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ এবং তারপর একে একে সকলেই তার হাতে বাইআত করে। তার নামে খোদিত মুদ্রা চালু হয় এবং তার নামে খুতবা পাঠ শুরু হয়। তিনি তার ভাইয়ের উপাধি আল-মুসতানসির ধারণ করেন। জনগণ তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়। তিনি জুমআর দিন শেভাযাত্রার মাধ্যমে অশ্বারোহণে জামে মসজিদে গিয়ে মিম্বরে দাঁড়িয়ে খুতবা পাঠ করতেন। তিনি খুতবার মধ্যে সর্বপ্রথম বনু আব্বাসের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের বিবরণ দানে সুলতান এবং সকল মুসলমানের জন্য দু'আ করতেন। অতঃপর নামায পড়াতেন, নামাযের পর পুরাতন রীতি অনুযায়ী সুলতানকে খিলআত প্রদান করতেন। তিনি কায়রোর বাইরে একটি শিবির স্থাপন করেন। ৬৫৯ হিজরীর শাবান মাসের ৪ তারিখ সোমবারে তিনি সুলতানকে নিয়ে অশ্বারোহণে সেখানে যান। উযীর, উমারা এবং বিচারপতিগণ সেখানে উপস্থিত ছিল। খলীফা নিজ হাতে সুলতানকে খিলআত এবং মাল্য পরিয়ে দেন। ফখরুদ্দীন বিন লুকমান মিম্বরে আরোহণপূর্বক খলীফার ফরমান পাঠ করে শোনান। খিলআত গ্রহণ করে সুলতান তার উপদেষ্টাকে ঘোড়ায় চড়িয়ে চলে যেত। আর তার সাথে পদব্রজে চলত আমীরদের একটি বড় জামাত। তিনি কায়রোকে অলংকৃত করেন। সুলতান খলীফার জন্য একজন উপদেষ্টা, দূত, বাবুর্চি, প্রহরী, কোষাধ্যক্ষ, পত্র লেখক নিয়োগ করে। গোটা রাজ্য তার হস্তে অর্পণ করে। তাকে দেওয়া হয় একশটি ঘোড়া, ৩০টি খচ্চর, ১০ কাতার উট ইত্যাদি।

যাহাবী বলেন, খলীফা মুসতানসিরের ভাতিজা মুত্তাকীর তার খিলাফত আর কারো হস্তগত হয়নি। তবে হলবের শাসনকর্তা আমীর শামসুদ্দীন আফরাশ আল-হাকিম বি আসরিল্লাহ উপাধি ধারণ করে খিলাফতের দাবী করেন এবং হলবে খিলাফত কায়েম করায় তার নামে মুদ্রা ও খুতবা পাঠ শুরু হয়।

কিছু দিন পর খলীফা আল-মুসতানসির ইরাক যাওয়ার ইচ্ছা করেন। সুলতান তাকে দামেশক পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার জন্য দামেশক পর্যন্ত যায়। দামেশকে গিয়ে সুলতান খলীফা এবং মওসুলের শাসনকর্তার আওলাদদের এক লাখ দিনার এবং ৬৬ হাজার দিরহাম প্রদান করেন। অতঃপর খলীফা শরক, ওলীয়ান, মওসুল, বুকারা এবং জাযীরার বাদশাহদের নিয়ে হলবে যান। হলবের শাসনকর্তা স্বীয় খিলাফত পরিত্যাগ করে খলীফার আনুগত্যে চলে আসেন এবং নম্রতা প্রদর্শন করেন। অতঃপর খলীফা সামনে অগ্রসর হয়ে হাদীসা দখল করে নেন। তাতারীরা এসে তাদের উপর হামলা চালায়। এতে অনেক মুসলমান শহীদ হলো এবং খলীফা নিরুদ্দেশ হন। কেউ কেউ বলেন, তিনিও শহীদ হন। এটাই মনে হয় বিশুদ্ধ অভিমত। কেউ কেউ বলেন, তিনি পালিয়ে যান। পরবর্তীতে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এটা ৬৬০ হিজরীর মুহাররম মাসের ৩ তারিখের ঘটনা। এ হিসাব অনুযায়ী তিনি মাত্র ছয় মাস খিলাফত পরিচালনা করেছেন। তার পর আল-হাকিম যিনি হলবে খিলাফতের দাবী করেছিলেন তিনি আল-হাকিম বি আমরিল্লাহ উপাধি ধারণ করে খিলাফতের তখতে আরোহণ করেন।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 আল-হাকিম বি আমরিল্লাহ আবুল আব্বাস

📄 আল-হাকিম বি আমরিল্লাহ আবুল আব্বাস


আল-হাকিম বি আমরিল্লাহ আবুল আব্বাস আহমদ বিন আবু আলী হোসেন আবকী বিন আলী বিন আবু বকর বিন খলীফা মুসতারশিদ বিল্লাহ বিন মুসতাযহার বিল্লাহ। বাগদাদে হত্যাযজ্ঞের সময় আত্মগোপনের কারণে তিনি প্রাণে রক্ষা পান। তিনি এক দল লোক নিয়ে বাগদাদ থেকে বনূ খিফাজা গোত্রের আমীর হুসাইন বিন ফালাহ-এর কাছে চলে যান। তার কাছে কিছু দিন থেকে আরবীদের সাথে দামেশকে আমীর ঈসা বিন মাহনার নিকট গমন করেন। দামেশকের শাসনকর্তা আন-নাসর তাকে ডেকে পাঠায়। তিনি তখনও যাননি। ইতোমধ্যে তাতাররা আক্রমণ করে। আল-মুলকুল মুযাফফর দামেশকে তাতারীদের সাথে লড়াই শেষে আমীর ফালাজ বাগদাদীর হাতে আবার তাকে দামেশকে ডেকে পাঠায়। জনসাধারণ তার হাতে বাইআত গ্রহণ করে। আরবের একদল উমারা তাকে সমর্থন জানায়। তিনি তাদের সহচরত্বে ঘানা, হাদীসা, হাইবত, আনবার প্রভৃতি শহর দখল করেন।

অতঃপর তাতারীদের সাথে লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে আনেন। তারপর মুলকুয যাহিরের আহ্বান সম্বলিত দামেশকের নায়েব আলাউদ্দীন তোবায়রিসের পত্র তার কাছে পৌছে। অবশেষে সফর মাসে তিনি দামেশকে পৌছুলে দামেশকের নায়েব আলাউদ্দীন তাকে সুলতান আল-মুলকুয যাহিরের কাছে পাঠিয়ে দেয়। তিনি কায়রোতে পৌছুার তিনদিন পূর্বেই সেখানে মুসতানসিরের বাইআত সম্পন্ন হয়। এজন্য তিনি বন্দী হওয়ার আশঙ্কায় হলবে ফিরে যান। হলবে সেখানকার শাসনকর্তা এবং সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ তার হাতে বাইআত গ্রহণ করেন। বাইআতকারীদের মধ্যে ছিলেন আব্দুল হালীম বিন তাইমিয়া। বাইআতকারীদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। তিনি ঘানায় যান। মুসতানসির ঘানায় গেলে তিনি তার আনুগত্য গ্রহণ করেন। মুসতানসির তাতারীদের সাথে যুদ্ধে নিখোঁজ হওয়ায় রুহবার প্রশাসক ঈসা বিন মাহনার নিকট যান। সেখান থেকে আল-মুলকুয যাহির বিবরস তাকে ডেকে পাঠায়। তিনি নিজ সন্তানদের সাথে একদলসহ কায়রোতে পৌঁছেন। যাহির তাকে অত্যন্ত সমাদর করে এবং তার নিকট খিলাফতের বাইআত করে। যাহির দুর্গের শিখরে আরোহণ করে। তিনি সেখানে কয়েক বার খুতবা প্রদান করেন।

শায়খ কুতুবুদ্দীন বলেন, ৬৬১ হিজরীর মুহাররম মাসের ৮ তারিখ বৃহস্পতিবারে সুলতান একটি আম মজলিশের ইন্তেজাম করে। হামিক বি আমরিল্লাহ কিলআতুল জাবালের বড় প্রাসাদে গিয়ে সুলতানের সাথে উপবেশন করেন। সুলতান তার সম্মানে যমীন চুম্বন করে এবং বাইআত করে। খলীফা সুলতানকে খিলাআত প্রদান করায় তার লোকেরা একের পর এক বাইআত করতে থাকে। পর দিন জুমআয় তিনি খুতবা পাঠ করেন। হামদ এবং সালাতের পর জিহাদ ও ইমামতের গুরুত্ব তুলে ধরে খিলাফতের বেইজ্জতির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি খুতবায় এভাবে আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করেন— সেই প্রতিপালকের প্রশংসা যিনি বনু আব্বাসের সাহায্যকারী। খুতবা শেষে তার বাইআতের ঘোষণা দেওয়া হয়।

৬৬১ হিজরীতে এ ঘটনার পর তাতারীরা ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। আশ্রয়কারী হয়ে তারা মুসলিম সাম্রাজ্যে নীরবতার সাথে বসবাস করতে লাগে। তাদের জন্য ভাতা নির্ধারণ করা হয়। এভাবে তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি কমতে থাকে। ৬৬২ হিজরীতে কাসরিয়ীন শহরে মাদরাসা যাহিরিয়া নির্মিত হয়। শাফী মাযহাবের ফিকাহ শাস্ত্র শিক্ষা দানের জন্য তাকী বিন যারীর এবং হাদীসের শিক্ষক হিসেবে শরফ দিময়াতীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ বছর মিসরে শক্ত ভূমিকম্প হয়। ৬৬৩ হিজরীতে স্পেনের বাদশাহ সুলতানুল মুসলিমীন আবু আব্দুল্লাহ বিন আল-আহমর ফিরিঙ্গীদের পরাজিত করে বাতীস শহর ছিনিয়ে নেন। এ বছর কায়রো শহরের বিভিন্ন ভবনে অগ্নিসংযোগ হয়। এ বছর সুলতান উমারাদের সাথে নিয়ে আশমুন সাগর খনন কার্যে সশরীরে অংশগ্রহণ করেন। এ বছর তাতারীদের সরদার হালাকু খান মারা যায়। তদস্থলে তার ছেলে আবগা বাদশাহ হয়। এ বছর সুলতান তার চার বছরের পুত্র সন্তান মুলক আল-সাঈদকে উত্তরাধিকার মনোনীত করে। এ বছর মিসরে প্রত্যেক মাযহারের চার বিচারক নিয়োগ করা হয়। এ বছর রমযান মাসে সুলতান খলীফাকে পর্দার আড়ালে রাখে। ৬৬৫ হিজরীতে সুলতান হাসিনাহ শহরে একটি জামে মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দেয়। ৬৬৭ হিজরীতে নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়। এ মসজিদে হানাফী মাযহাবের খতীব নিয়োগ পান।

৬৭৪ হিজরীতে সুলতান নূবা এবং দানকিলা যুদ্ধের মাধ্যমে জয় করে নূবার বাদশাহকে যাহিরের সামনে হাযির করা হয় এবং দানকিলার অধিবাসীদের উপর যিজিয়া কর আরোপ করা হয়। যাহাবী বলেন, ৩৩ হিজরীতে সর্বপ্রথম আব্দুল্লাহ বিন আবু সুরাহ ৫০০০ ঘোড় সওয়ার নিয়ে নূবা আক্রমণ করেও বিজয় ছিনিয়ে আনতে না পেয়ে সন্ধি করেন। অতঃপর হিশামের যুগেও হামলা চালানো হয়। কিন্তু বিজয় আসেনি। এরপর যথাক্রমে মানসুর, নাসিরুদ্দৌলা বিন হামদান এবং সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর ভাই তুরান শাহ ৫৬৮ হিজরীতে লড়াই করেও বিজয়মাল্য পরতে পারেনি। আর তা এ বছর বিজিত হয়। এ বিজয়কে নিয়ে ইবনে আব্দুয যাহির একটি কবিতা লিখেছেন যার অর্থ হলো— "এটা এমন এক বিজয় যা কখন শুনিনি, দেখিনি এবং লোকরো এর বিবরণ দেয়নি।"

৬৭৬ হিজরীর মুহাররম মাসে সুলতান মুলকু যাহির ইন্তেকাল করে। তদস্থলে ১৮ বছর বয়সে তার ছেলে সাঈদ মুহাম্মাদ উপবেশন করে। এ বছর তাকী বিন রাযী মিসর এবং কায়রো উভয় শহরের বিচারপতি মনোনীত হন। ইতিপূর্বে শহরদ্বয়ে পৃথক পৃথক বিচারপতি ছিলেন। ৬৭৮ হিজরীতে সাঈদ মুহাম্মাদকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং সে এ বছর মারা যায়। তার স্থলে স্বীয় ভাই বদরুদ্দীন শালামাশ সুলতান হয়ে মিসরে সাত বছর দায়িত্ব পালন করে। তার উপাধি ছিল মুলকুল আদেল। আমীর সাইফুদ্দীন কালাদুন (কালদুয) তার অভিভাবকত্বের দায়ভার গ্রহণ করে। দু'দিকে দু'জনের নাম খোদিত মুদ্রা চালু হয়। খুতবায় দু'জনের নাম পাঠ করা হয়। রযব মাসে শালামাশকে সরিয়ে কালাদুন আর-মুলকুন মানসুর উপাধি নিয়ে একচ্ছত্র বাদশাহ হয়ে যায়। ৬৭৯ হিজরীতে আরাফার দিন শিলা এবং বজ্রপাত হয়। ৬৮০ হিজরীতে তাতারীরা সিরিয়ায় এসে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করলে সুলতান তাদের সাথে যুদ্ধ করলে মুসলমানরা বিজিত হয়।

হযরত মুআবিয়া (রা.)-এর শাসনামলে তারাবালাস শহর বিজিত হয়। ৫০৩ হিজরীতে খৃস্টানরা তা ছিনিয়ে নেয়। ৬৮৮ হিজরীতে তা আবার পুনঃদখল হয়। ৬৮৯ হিজরীর যিলকদ মাসে সুলতান কালাদুনের ইন্তেকাল হয়। তদস্থলে তার ছেলে আল-মুলকুল আশরাফ সালাহুদ্দীন খলীল সুলতান হয়। ৬৯১ হিজরীতে সুলতান রোমের দুর্গ অবরোধ করে। ৬৯৩ হিজরীতে সুলতান নিহত হয়। তার ভাই মুহাম্মদ বিন মানসুর ৯ বছর বয়সে আল-মুলকুন নাসর উপাধি নিয়ে ক্ষমতার আরোহণ করে। ৬৯৪ হিজরীর মুহাররম মাসে তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে কিতবাগা আল-মানসুর মুলকুল আদেল লকব ধারণ করে তখতে উপবেশন করে। এ বছর তাতারীদের বাদশাহ ফাযান বিন আওগুন বিন আব-না বিন হালাকু খান ইসলাম গ্রহণ করায় মুসলমানরা খুশি হয় এবং তার সৈন্যদের মাঝে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে।

৬৯২ হিজরীতে সুলতান মুলকূল আদেল দামেশক গেলে সফর মাসে লাজীন জবরদস্তীমূলক আমীর-উমারাদের থেকে আনুগত্যের শপথ আদায় করে। খলীফা তাকে খিলআত প্রদান করেন। মুলকুন আদেল সরহদে পালিয়ে যায়। অবশেষে ৬৯৮ হিজরীতে লাজীন নিহত হয়। অতঃপর ক্ষমতাচ্যুত মুলকুন নাসর মুহাম্মাদ বিন মানসুর কালাদুন আবার সুলতান হয়। খলীফা তাকেও খিলআত প্রদান করেন। আর আল-মুলকূল আদেল নায়েবে সালতানাত হয়ে হাম্মাত শহরে গমন করে। সে মৃত্যু অবধি ৭০২ হিজরী পর্যন্ত সেখানেই ছিল।

৭০১ হিজরীর জামাদিউল আউয়াল মাসের ১৮ তারিখ জুমআর রাতে খালীফা হাকিম বি আমরিল্লাহ ইন্তেকাল করেন। আল্লাহ তা'আলা তার উপর রহম করুন। আসরের সময় দুর্গের নিচে সওকে খায়েল-এ তার জানাযার নামায পড়ানো হয়। খলীফার আত্মীয়-স্বজন এবং সাম্রাজ্যের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ রক্ষী-প্রহরীসহ জানাযার নামাযে শরীক হন। তাকে সাইয়্যেদাহ নাফীসার নিকটে সমাহিত করা হয়। তিনি প্রথম খলীফা যাকে সর্বপ্রথম এখানে দাফন করা হয়েছিল। তখন থেকে আজ পর্যন্ত তার বংশধরকে এখানেই দাফন করা হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00