📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 আল-মুসতাযা বি আমরিল্লাহ

📄 আল-মুসতাযা বি আমরিল্লাহ


আল-মুসতাযা বি আমরিল্লাহ আল-হাসান বিন আল-মুসতানজিদ বিল্লাহ ৫৩৬ হিজরীতে আরমেনীয় গোযযা নামক বাঁদীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার ইন্তেকালের পর তিনি তখতে আরোহণ করেন। ইবনে জাওযী বলেন, তিনি সরকার প্রধান হওয়ার পর সকল শুল্ক মওকুফ করে দেন। এতে করে জুলুমের গতি রুদ্ধ হয়। চারিদিকে ইনসাফের শীতল বাতাস ছড়িয়ে পড়ে। আমি নিজের জীবনে কখনই এমনটা দেখিনি। তিনি ওলামা মুদাররিসীন এবং ইমামদের পেছনে তিনি অনেক অর্থ ব্যয় করেন। তিনি খলীফা হওয়ার সময় সকল সুলতানদের খিলাআত প্রদান করেন।

ইবনে জাওযী বলেন, তিনি অধিকাংশ লোক থেকে পর্দা করতেন। তার খিলাফত কালে উমাইয়্যা বংশীয় শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে। মিসরে তার নামে খুতবা দেয়া এবং মুদ্রায় তার নাম খোদাই করা হয়। যাহাবী বলেন, ৫৬৭ হিজরীতে বাগদাদে রাফেযীদের প্রভাব একেবারেই নিঃশেষিত হয়। ইয়ামন, বুরকা, মিসর এবং উসওয়ান পর্যন্ত তার নামে খুতবা পাঠ হতে থাকে। উবাদ কাতেব বলেন, ৫৬৭ হিজরীতে সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবী মিসরের জামে মসজিদে প্রথম জুমআয় বনূ আব্বাসের নামে খুতবা পাঠ করেন। এতে বিদআত নিস্তেনাবুদ হয় এবং শরীয়ত স্পষ্ট হয়। সালাহুদ্দীন উযীর থাকা অবস্থায় মিসরের শাসনকর্তা আযিদ মারা গেলে সালাহুদ্দীন পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেন। সুলতান নূরুদ্দীন জঙ্গী সালাহুদ্দীনকে খুলাফায়ে বনু আব্বাসের নামে খুতবা পাঠ করতে বললে ৫৬৭ হিজরীর মুহাররম মাসে মিম্বরে দাঁড়িয়ে খলীফার জন্য দু'আ করা হয়।

৫৬৯ হিজরীতে সুলতান নূরুদ্দীন জঙ্গী উপহারস্বরূপ খলীফার নিকট একটি গাধা প্রেরণ করেন। ৫৭১ হিজরীতে সুলতান সালাহুদ্দীন মিসর এবং কাহেরার পার্শ্বে প্রাচীর নির্মাণের নির্দেশ দেন। ৫৭২ হিজরীতে তিনি জাবালে মুকতমে একটি দুর্গ নির্মাণের নির্দেশ দেন। এ বছর সুলতান সালাহুদ্দীন হযরত ইমাম শাফী (র.)-এর কবরে মাযার তৈরি করেন। ৫৭৫ হিজরীর শাওয়াল মাসের শেষে মুসতাযা ইন্তেকাল করেন।

তার খিলাফতকালে নিম্নবর্ণিত ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন- নাহুবিদ ইবনে খুশাব, আবুল হাসান বিন সাফী, হাফেজ আবুল আল্লামা হামদানী, নাহুবিদ নাসিহুদ্দীন বিন দিহান, হাফেজ আল-কাবীর আবুল কাসিম বিন আসাকির, কবি হায়েস বায়েস, হাফেজ আবু বকর বিন খায়রু প্রমুখ।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 আন-নাসর লিদ্দীনিল্লাহ

📄 আন-নাসর লিদ্দীনিল্লাহ


আন-নাসর লিদ্দীনিল্লাহ আহমদ আবুল আব্বাস বিন আল-মুসতাযা বি আমরিল্লাহ ৫৫৩ হিজরীর রযব মাসে যুমরাদ নামক তুর্কী বাঁদির গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। ৫৭৫ হিজরীর যিলকদ মাসের চাঁদনী রাতে তিনি তখতে আরোহণ করেন। মুহাদ্দিসীনদের একটি জামাত তাকে হাদীস রেওয়ায়েত করার অনুমতি প্রদান করেন। সেই মুহাদ্দিসীনদের মধ্যে আবুল হুসাইন আব্দুল হক আল-ইউসুফী এবং আবুল হাসান আলী বিন আসাকির আলবাহাতী প্রমুখ অন্যতম। তিনি নিজেও এক জামাতকে হাদীস বর্ণনা করার ইজাযত দেন। যাহাবী বলেন, এত দীর্ঘ সময় ধরে কোনো খলীফা খিলাফতের কাজ পরিচালনা করেননি। তিনি ৪৭ বছর তখত নসীন ছিলেন। তিনি সারা জীবন ইয্যত এবং সম্মানের সাথে বেঁচে ছিলেন। তিনি সকল শত্রুদের মূলোৎপাটন করেন। সকল সুলতান প্রকাশ্যে তার আনুগত্য ঘোষণা করে। তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার সাহস কারো ছিল না। তার উপর হামলা করার ধৃষ্টতাও কেউ দেখায়নি। যদি কেউ হামলা করেছে তো সঙ্গে সঙ্গে তার গর্দান উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কোন বিরোধী চক্র মাথা তুললে সাথে সাথে তা দমন করা হয়। কেউ তার অনিষ্ট করতে চাইলে আল্লাহ তা'আলা তাকে ধ্বংস করে দিতেন। তিনি স্বীয় পিতামহের মত কল্যাণধর্মী কাজে অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন। তার ভাগ্য অত্যন্ত সুপ্রসন্ন। প্রজা হিতৈষী মানব ছিলেন। প্রত্যেক শহরে সংবাদ সরবরাহের কাজে একাধিক লোক নিয়োগ ছিল। তারা সকল সুলতানের প্রকাশ্য ও গোপনীয় বিষয় লিখে জানাত। তিনি রাজনৈতিক কূটচাল প্রয়োগের ক্ষেত্রে ছিলেন অবিসংবাদিত।

খলীফা আন-নাসর গায়েবের খবর জানতেন না। একবার খাওয়ারিযম শাহীর দূত একটি মোহর আটানো পত্র নিয়ে বাগদাদে আসে। খলীফা তাকে বললেন, তুমি ফিরে যাও। পত্রের বিষয়বস্তু আমার অজানা নয়। দূত ফিরে গেল। যাহাবী বলেন, লোকদের ধারণা খলীফার বশে জিন ছিল। খাওয়ারিযম শাহ বাগদাদ দখলের জন্য হামদান শহরে পৌছুলে ২০ দিন ধরে বিরামহীন বরফ বর্ষিত হয়। ফলে সে আর সামনে এগুতে পারে না। এ পরিস্থিতিতে তার সাথীরা মন্তব্য করল, খলীফার উপর আক্রমণ করার উদ্দেশে যাত্রা করেছে বিধায় আল্লাহ তা'আলা এ গযব নাযিল করেছেন। অবশেষে সে ফিরে যায়।

আন-নাসর যখন লোকদের শাস্তি দিতেন তখন দারুণ কঠোরতা অবলম্বন করতেন। আর কাউকে দান করলে নিশ্চিতভাবে তার দুস্থতা ও দরিদ্রতা কেটে যেত। জনৈক ব্যক্তি ভারত থেকে খলীফার জন্য একটি তোতা পাখি এনেছিল। পাখিটি قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ পড়তে পারত। বাগদাদে পৌঁছে সেদিন রাতে পাখিটি মারা যায়। সকালে লোকটি দারুণ বিচলিত হয়ে পড়ে। ইত্যবসরে খলীফার খাদেম এসে বলল, পাখিটি কোথায়? সে বলল, মারা গেছে। খাদেম বলল, বলত কতটুকু পুরষ্কার পাবার আশায় তুমি খলীফার জন্য পাখিটি এনেছিলে? সে বলল, পাঁচ শ' দিনারের আশা ছিল। খাদেম তার কাঙ্ক্ষিত অর্থ তাকে দিয়ে বলল, এগুলো খলীফা তোমাকে দিয়েছেন। তুমি ভারত গমনের পর থেকেই খলীফা এ ব্যাপারে অবগত ছিলেন।

একবার সদরে জাঁহার সাথে অনেক মুফতী বাগদাদে আসেন। এদের মধ্যে একজন ফকীহ তার নিজের ঘোড়ায় চড়ে স্বীয় বাসস্থান সমরকন্দ থেকে বাগদাদে আসার সময় তার স্ত্রী ঘোড়াটি রেখে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বলল, এত সুন্দর ঘোড়াটি তুমি নিয়ে যেও না। খলীফা দেখলে কেড়ে নিবেন। মুফতী সাহেব বললেন, খলীফার এতটা দুঃসাহস হবে না। এর মধ্যেই বিষয়টি খলীফার কানে পৌছে যায়। তিনি তার শাহী বাবুর্চিকে বাগদাদে এলে সেই মুফতী সাহেবের ঘোড়াটি কেড়ে নেবার আদেশ দিলেন। তাই হল। শখের ঘোড়াটি হাত ছাড়া হওয়ায় ফকীহ দারুণ বেদনায় হতবিহ্বল হয়ে পড়লেন। সদরে জাঁহা ফিরে যাওয়ার সময় খলীফা সকল মুফতীর খিলআত প্রদান করেন। সেই মুফতী সাহেবও খিলআত প্রাপ্ত হন। খিলআত হিসেবে খলীফা তাকে তার অনিন্দ সুন্দর শখের প্রিয় ঘোড়াটি প্রদান করেন। প্রদানের সময় খলীফা তাকে বলেন, তোমার ঘোড়াটি কেড়ে নেবার মত দুঃসাহস এই খলীফার না থাকলেও তাঁরই এক নিম্নস্তরের গোলাম তা ছিনিয়ে নিয়েছিল। এ কথা শুনে মুফতী সাহেব বিস্ময়াবিভূত হয়ে পড়েন এবং খলীফার কারামতের কায়িলে পরিণত হন।

আল-মুফিক-আব্দুল লতীফ বলেন, মানুষের অন্তরে খলীফার ভয় জেঁকে বসেছিল। বাগদাদের লোকদের মতই ভারত এবং মিসরের জনগণ তাঁকে ভীষণ ভয় পেত। খলীফা মুতাসিমের পর যে বীরত্ব, নির্ভীকতা ও সাহসীকতার অপমৃত্যু ঘটেছিল তিনি তা পুনর্জীবিত করেন। তাঁর গুপ্তচররা মুসলিম সাম্রাজ্যের সকল প্রান্তে চষে ফিরত। সমাজের গুরুত্বহীন সংবাদও তারা যত্ন সহকারে বাগদাদে সরবরাহ করত। ইবনে ওয়াসিল বলেন, আন-নাসর অত্যন্ত বুদ্ধিমান, চালাক, বীর, চিন্তাশীল, নির্ভুল অভিমত পেশকারী এবং ঝানু রাজনীতিবিদ। কূটনৈতিক তৎপরতায় তিনি অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ ছিলেন। ইবনে আছীর বলেন, আন-নাসরের চারিত্রিক গুণাবলী অনেক বেশি খারাপ ছিল। তার রুসমাত এবং ট্যাক্সের ভারে গোটা ইরাক বিধ্বস্ত হয়। তিনি লোকদের সম্পদ নিজের রক্ষিত মালের সাথে একিভূত করতেন।

৫৮০ হিজরীতে তিনি আহকাম জারি করলেন- যে ব্যক্তি ইমাম মূসার শহীদ হওয়ার স্থানে এসে আশ্রয় নিবে তাকে নিরাপত্তা দেয়া হবে। ৫৮১ হিজরীতে পশ্চিমাঞ্চলীয় শহরগুলোতে খলীফার নামে খুতবা পাঠ করা হয়। ৫৮৩ হিজরীতে অনেক বিজয় অর্জিত হয়। সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবী শাম মুলুকের অধিকাংশ শহরগুলো দখল করে নেন। এগুলোর মধ্যে সবচাইতে বড় বিজয় ছিল বাইতুল মুকাদ্দিস বিজয়। যা ফিরিঙ্গীরা ৯১ বছর শাসন করেছে। ৫৮৯ হিজরীতে সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবী ইন্তেকাল করেন। ৫৯০ হিজরীতে সালজুক বংশীয় সর্বশেষ বাদশাহ সুলতান টগর-ল-বেগ শাহ মারা যায়। ৬২২ হিজরীর রমযানের শেষ শনিবারে খলীফা আন-নাসর ইন্তেকাল করেন।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 আয-যাহের বিআমরিল্লাহ আবু নসর

📄 আয-যাহের বিআমরিল্লাহ আবু নসর


আয-যাহের বিআমরিল্লাহ আবু নসর মুহাম্মাদ বিন আন-নাসের লিদ্দীনিল্লাহ ৫৭১ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার শাসনামলে তিনি উত্তরাধিকার মনোনীত হন। পিতার পর তিনি তখতে আরোহণ করেন।

বাহান্ন বছর বয়সে তিনি তখতনসীন হন। প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ রাজ্য জয়ের প্রতি মনোনিবেশ না করার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ক্ষেত শুষ্ক হয়ে গেছে। এখন আর সেখানে কি রোপণ করা যেতে পারে? তারা বলল, আল্লাহ তা'আলা আপনার জীবন দীর্ঘায়ু করুন। তিনি বললেন, আসরের পর দোকান খুললে সে কতটুকুর মুনাফা করতে পারে? তিনি প্রজাবৃন্দের সাথে করুণাসূচক আচরণ করেন। সকল ট্যাক্স ক্ষমা করেন। অত্যাচার প্রতিহত করণের ব্যবস্থা নেন এবং প্রচুর দান করেন। ইবনে আছীর বলেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এবং হযরত উমর ফারুক (রা.) কর্তৃক প্রবর্তিত ইনসাফ প্রতিষ্ঠার নীতিগুলো তিনি ছাড়া কোনো খলীফা অনুসরণ করেননি। তবে যদি এটা বলা হয়, হযরত উমর বিন আব্দুল আযীযের পর সেই নীতি অনুসরণের কোনো খলীফা ছিল না- তাহলে সেটা হবে সবচাইতে বিশুদ্ধ অভিমত।

তার পিতা এবং পিতামহ যে ভূখণ্ড ও সম্পদ কুক্ষিগত করেছিলেন সেগুলো তিনি হকদারদের ফিরিয়ে দেন। সাম্রাজ্যের সকল কর তিনি মওকুফ করে দেন। তিনি খাজনা আদায়ে পুরাতন নীতি অনুসরণের আহকাম জারী করেন। প্রাচীন প্রথায় ইরাকের শুল্ক আদায়ের নির্দেশ দেন। পুরাতন খলীফাদের যুগে ইরাকে ২০ হাজার দিনার আদায় করা হত। তার পিতার যুগে ৮০ হাজারে উন্নতি হয়। তিনি পুরাতন হিসাব অনুযায়ী ১০ হাজার ক্ষমা করে ১০ হাজার আদায়ের নির্দেশ দেন। এরপরও প্রজাবৃন্দের অনুরোধের প্রেক্ষিতে সতেজ বৃক্ষের খাজনা আদায়ের হুকুম দেন।

তার ন্যায়বিচারের আরেকটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে, ওসেতা শহরের এক সরকারী অফিসারের নিকট এক লাখ দিনার ছিল। যা সে অন্যায়ভাবে উপার্জন করেছিল। দারুল খিলাফতের নির্দেশে সেগুলো হকদারদের নিকট ফিরিয়ে দেয়া হয়। জনগণের মধ্যে যারা খাজনা অনাদায়ের দায়ে বন্দী ছিল তিনি ১০ হাজার দিরহাম পাঠিয়ে বিচারককে তাদের মুক্তি দেবার নির্দেশ দেন। ঈদুল আযহার রাতে তিনি ওলামা এবং সাহাবাদের মধ্যে এক লাখ দিনার বণ্টন করেন। সুবত ইবনে জাওযী বলেন, খলীফা ধনাগারে প্রবেশ করলে খাদেম বলল, আপনার বাবার যুগে এ কোষাগার ধন-রত্নে পরিপূর্ণ ছিল। জবাবে তিনি বললেন, আমি কোষাগার ভরপুর করার জন্য আসিনি। আল্লাহর পথে সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে চাই। ধন-রত্ন সংগ্রহ ও জমা করা সওদাগরের কাজ। ইবনে ওয়ায়েল বলেন, আয-যাহের ন্যায়বিচার করতেন এবং শুল্ক মওকুফ করেন। তিনি জনগণের সাথে উঠা বসা করতেন।

৬২৩ হিজরীর রযব মাসের ১৩ তারিখ সোমবার রাতে এ মহামতি খলীফার ইন্তেকাল হয়। তিনি নয় মাস কয়েক দিন খিলাফত পরিচালনা করেন। তিনি তার পিতার নিকট থেকে হাদীস রেওয়ায়েতের অনুমতি লাভ করেন। আর আবু সলেহ নসর বিন আব্দুর রাযযাক বিন শায়েখ আব্দুল কাদির জিলানী (র.) তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেন।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 আল-মুসতানসির বিল্লাহ জাফর

📄 আল-মুসতানসির বিল্লাহ জাফর


আল-মুসতানসির বিল্লাহ আবু জাফর মানসুর বিন আয-যাহের বিআমরিল্লাহ ৫৭৭ হিজরীর সফর মাসে জনৈক তুর্কী বাঁদির গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার পর ৬২৩ হিজরীর রযব মাসে তিনি তখতে আরোহণ করেন। তিনি প্রজাগণের মধ্যে ন্যায়বিচার ছড়িয়ে দেন। বিচার ব্যবস্থায় ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেন। ওলামা এবং দ্বীনদারদের উপদেষ্টা নিয়োগ করেন। মসজিদ, মাদরাসা ও হাসপাতাল নির্মাণ করেন। দ্বীনকে শক্তিশালী করেন। শত্রুদের ধ্বংস করে দেন। সুন্নতের প্রসার ঘটান। ফিতনা দমন করেন। সুন্নতের উপর চলার তাকীদ দেন। জিহাদের সুন্দর ব্যবস্থাপনা তৈরি করেন।

মুফিক আব্দুল লতীফ বলেন, তিনি সুন্দর আখলাক গ্রহণের মাধ্যমে মসনদে আরোহণ করেন। তিনি বিদআত বন্ধ করেন। দ্বীনদার সভাসদ নিয়োগ, ইসলামকে শক্তিশালী, বিলুপ্ত প্রায় দ্বীনের কাজ পুনপ্রবর্তন এবং লোকদের অন্তরে সেকাজগুলোর প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করেন। হাফেজ যাকীউদ্দীন আব্দুল আযীম মুনযেরী বলেন, মুসতানসির নেককার এবং নেক কাজের প্রতি অত্যন্ত নিষ্ঠাবান। তিনি মাদরাসা আল-মুনতাসিরীয়া নামক একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন। ইবনে ওয়াসেল বলেন, মুনতাসির দজলা নদীর তীরে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এ ধরনের উন্নত প্রতিষ্ঠান পৃথিবীতে আর একটিও ছিল না। তৎকালীন যুগে এহেন ছাত্র সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠান ছিল দুনিয়াতে বিরল। এ প্রতিষ্ঠানে চার মাযহাবের চার শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। এতে একটি হাসপাতালও ছিল। ফকীহদের জন্য ছিল একটি বাবুর্চিখানা। পর্যাপ্ত ঠাণ্ডা পানির ব্যবস্থা ছিল। ফকীহদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা, যানবাহন, তেল, প্রদীপ, কাগজ ইত্যাদির সরবরাহ ছিল অফুরন্ত। এরপরও ফকীহদের এক দিনার করে মাসিক ভাতা প্রদান করা হত।

খলীফার সেবায় নিয়োজিত থাকা বিশাল সৈন্যবাহিনী। তার বাবা ও দাদারও এত সুবিশাল বাহিনী ছিল না। তিনি নিজেও একজন সাহসী, নির্ভীক, বীর-বাহাদুর লোক ছিলেন। তাতাররা তার রাজ্যগুলোতে হামলা করলে তার বাহিনী রুখে দাঁড়ায়। ফলে তাতাররা লজ্জাজনকভাবে পরাজিত হয়। খিফাজী নামক খলীফার একজন ভাই ছিল। সেও একজন নির্ভীক যোদ্ধা। মুনতাসিরের মৃত্যুর পর তার দুর্ভাগ্য তাকে নিদারুণভাবে জড়িয়ে ধরে। আত্মম্ভরিতা, মদ্যপান এবং কর্কশ স্বভাবের কারণে লোকেরা তার বাইআত গ্রহণ না করে মুসতানসিরের ছেলে আবু আহমদের হাতে বাইআত করে।

যাহাবী বলেন, মাদরাসা মুসতানসারীয়ার বাজেট ছিল ৭০ মিছকাল। মাদরাসার ভিত্তি দেয়া হয় ৬২৫ হিজরীতে। আর একাজ সমাপ্ত হয় ৬৩১ হিজরীতে। এতে একটি গ্রন্থাগার ছিল। ১৬০ উট বহনযোগ্য গ্রন্থাদি সমৃদ্ধ এ পাঠাগারে চার মযহাবের ২৪৮ জন ছাত্র জ্ঞান চর্চা করত। এ মাদরাসার শিক্ষাবর্ষ শুরু হত রযব মাসে। ৬৩২ হিজরীতে প্রচলিত স্বর্ণের ক্ষুদ্রাংশে নির্মিত মুদ্রার পরিবর্তে মুসতানসির চাদীর মুদ্রা তৈরি করেন। ৬৩৫ হিজরীতে কাযী শামসুদ্দীন আহমদ আল-জুফী দামেশকের বিচারক মনোনীত হন। ৬৩৭ হিজরীতে শায়খ আযুদ্দীন বিন আব্দুস সালাম দামেশকের খতীব মনোনীত হন।

৬৪০ হিজরীর জামাদিউল আখের মাসের শুক্রবারে মুসতানসির ইন্তেকাল করেন। তার শাসনামলে নিম্নবর্ণিত ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন- ইমাম আবুল কাসিম আর-রাফী, জামালুল মিসরী, ইবনে মাযুর আন-নাহবী, ইয়াকুব আল-হুমুবী, সিকাকী, হাফেজ আবুল হাসান বিন কিতান, মুফিক আব্দুল লতীফ বাগদাদী, হাফেজ আবু বকর ইবনে নুকতা, আযুদ্দীন আলী বিন আছীর, সাইফুল আমাদী, ইবনে ফুযলান, উমর বিন আল-ফরিয, শিহাবুদ্দীন সহরওয়ার্দী, আল্লামা আবুল খাত্তাব বিন ওহয়া, হাফেজ আবু রবী বিন মুসলিম প্রমুখ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00