📄 আল-মুকতাফী লি আমরিল্লাহ
আল-মুকতাফী লি আমরিল্লাহ ৪৮৯ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসের বার তারিখে আল-মুকতাফী লি আমরিল্লাহ আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আল-মুসতাযহার বিল্লাহ এক হাবশী বাঁদীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। রাশেদকে অপসারণের পর ৪০ বছর বয়সে তিনি খিলাফতের তখতে বসেন। আল-মুকতাফী লি আমরিল্লাহ উপাধি ধারণ করার কারণ হলো তিনি খলীফা হওয়ার ছয় দিন পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে স্বপ্নে দেখেন। তিনি (সা.) তাকে বলছেন, অচিরেই তুমি খিলাফত পাবে। তুমি আল-মুকতাফী লি আমরিল্লাহ লকব ধারণ করবে। ফলে তিনি তাই করেন।
মুকতাফী তখতে আরোহণ অন্তে ইনসাফ ও সুবিচারের মাধ্যমে গোটা বাগদাদ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ফেললে সুলতান মাসউদ দারুল খুলাফার সকল আসবাবপত্র যেমন চতুষ্পদ প্রাণী, গৃহের সজ্জা-সরঞ্জাম স্বর্ণ, রৌপ্য, পর্দা ইত্যাদি নিয়ে নেয়। খিলাফতের আস্তাবলে চারটি অশ্ব এবং আটটি গাধা ছাড়া আর কিছুই সে রেখে যায়নি। কথিত আছে, বাইআতের সময় মুকতাফীর সাথে মাসউদের এমন শর্তই ছিল। অতঃপর ৫৩১ হিজরীতে সুলতান মাসউদ কয়েকটি বাগান ছাড়া খিলাফতের সাথে সম্পৃক্ত সকল জিনিসপত্র নিজের অধীনে নেয়। এরপরও সে খলীফার নিকট থেকে এক লাখ দিনার নিয়ে আসার জন্য স্বীয় উযীরকে পাঠায়। মুকতাফী বললেন, বড়ই বিস্ময়ের বিষয় যে, তোমরা জান মুসতারশিদ নিজের সকল সম্পদ নিয়ে মাসউদের কাছে চলে গিয়েছিলেন। এতে যে অবস্থা হয় তা দুনিয়াবাসী অবগত। তারপর রাশেদ খলীফা হয়ে যা করেছেন তা দিবালোকের ন্যায় উজ্জ্বল। এরপরও যা ছিল ঘরের জিনিসপত্রসহ মাসউদ নিজেই সেগুলো নিয়ে গেছে। মাসউদ উক্ত দুই খলীফার ধনাগারও লুণ্ঠন করেছে। এখন আমি তোমাকে কোথা থেকে সম্পদ এনে দিব? বর্তমানে শুধু এতটুকুই বাকী রয়েছে যে, নিজের ঘর-বাড়ি তোমাদের ছেড়ে দিয়ে আমি অন্য কোথাও চলে যাব। আমি আল্লাহ তা'আলার সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে, আমি মুসলমানদের উপর অত্যাচার করে একটি দানাও আদায় করব না। এ কথা শুনে মাসউদ নিজের অভিপ্রায় প্রত্যাহার করে। কিন্তু সে সম্পদ আরোহণের জন্য লোকদের উপর কঠোরতা আরোপ করতে থাকে। ব্যবসায়ীদের উপর ট্যাক্সের বড় বড় বোঝা চাপিয়ে দেয়।
৫৩৩ হিজরীতে বিহতারাহ শহরে এক লক্ষ ৮০ হাজার ফুট পর্যন্ত ভয়ঙ্কর ভূমিকম্পে অনেক মানুষ হতাহত হয়। এ বছর শহরগুলো খলীফার নিয়ন্ত্রণে আসে। মাসউদ দুর্বল, অসহায় ও নিঃস্ব হয়ে পড়ে। সুলতান সিনজর-এরও একই অবস্থা হয়। ৫৪১ হিজরীতে মাসউদ বাগদাদে এসে মুদ্রা প্রস্তুতকারী কারখানার ভিত্তি দেয়। ইবনে উবাবী সুলতান কর্তৃক জনগণের উপর অত্যাচারের বিবরণ দানে মাসউদকে শাসালে মাসউদ এ নসীহত গ্রহণ করে শহরময় এলান করে জানিয়ে দেয় যে, আর কেউ করারোপ করবে না। ৫৪৩ হিজরীতে ফিরিঙ্গীরা দামেশক অবরোধ করলে হলবের শাসনকর্তা নূরুদ্দীন মাহমুদ বিন জঙ্গী এবং তার ভাই তাদের মোকাবিলা করেন। আলহামদুলিল্লাহ মুসলমানগণ বিজয় অর্জন করে। ৫৪৭ হিজরীতে সুলতান মাসউদ মারা যায়। মুকতাফীর উযীর ইবনে হুবায়রাহ বলেন, মাসউদের সাথে প্রকাশ্য মোকাবিলা করার শক্তি না থাকায় আমরা এক মাস বিরামহীন মাসউদের জন্য বদদু'আ করি। এক মাস পূর্ণ হলে মাসউদ মারা যায়।
মাসউদের পরলোক গমনের পর খাস বেগ তার ভাই মুহাম্মাদকে খুযস্তান থেকে ডেকে এনে তার উপর সালতানাত সোপর্দ করে। সে দিন থেকে মুকতাফী মুক্ত-স্বাধীন খলীফা হিসেবে পরিণত হন। ৫৪৮ হিজরীতে তুর্কীরা সুলতান সিনজরের উপর হামলা চালিয়ে তাকে বন্দী করে। ৫৪৯ হিজরীতে মিসরের শাসনকর্তা আল-ফায়েয ঈসা তখতে আসীন হয়। মুকতাফী নূরুদ্দীন জঙ্গীকে মিসর অধিকার করার জন্য লিখিতভাবে জানান। এ সময় মুকতাফীর শান-শওকত বেড়ে যায়। তিনি ৫৫৫ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসের ছয় তারিখ রবিবার রাতে ইন্তেকাল করেন।
যাহাবী বলেন, মুকতাফী খলীফাদের মুকুট, আলেম, সাহিত্যিক, ধৈর্যশীল, বাহাদুর, চরিত্রবান, বিশ্বস্ত এবং খিলাফত পরিচালনায় দক্ষ ও বিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি খিলাফতকে পুনর্জীবন দান করেন। আবু তালিব আব্দুর রহমান বিন মুহাম্মাদ বলেন, মুসতাকফী ছাড়া এমন নরম দিল, চরিত্রবান, বীর খলীফা অতিবাহিত হননি। ইবনে জাওযী বলেন, মুকতাফীর খিলাফত কালে বাগদাদ এবং ইরাক আবার খলীফার হাতে আসে।
📄 আল-মুসতানজিদ বিল্লাহ
আল-মুসতানজিদ বিল্লাহ আবুল মুযাফ্ফর ইউসুফ বিন আল-মুকতাফী ৫১৮ হিজরীতে গিরজিস্তানের তাউস নামক বাঁদীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। ৫৪৭ হিজরীতে মুকতাফী তাকে উত্তরাধিকার মনোনীত করেন। মুকতাফীর মৃত্যুর পর তার নিকট বাইআত করা হয়।
মুসতানজিদ ইনসাফ, সুবিচার এবং নমনীয় স্বভাবের লোক ছিলেন। তিনি অনেক শুল্ক ক্ষমা করে দেন। ইরাকের সমস্ত কর মাফ করেন। বখাটে ও সন্ত্রাসী লোকদের সাথে তিনি কঠোর আচরণ করতেন। ইবনে জাওযী বলেন, মুসতানজিদ বিল্লাহ উজ্জ্বল প্রাজ্ঞতা, নির্ভুল অভিমত, সঠিক বিচার, প্রখর বুদ্ধিমত্তা এবং দয়ার্দ্র ব্যক্তি ছিলেন। ইলম এবং বীরত্বে তার দক্ষতা প্রসিদ্ধ। তিনি অনেক কবিতা লিখেছেন।
খিলাফত লাভের প্রথম বছর অর্থাৎ ৫৫৫ হিজরীতে মিসর শাসনকর্তা আল-ফায়েয মারা গেলে তার ছেলে আযল্লিদ্বীনিল্লাহ তখতে উপবেশন করেন। ৫৬২ হিজরীতে সুলতান নূরুদ্দীন জঙ্গী আমীর আসাদউদ্দীনকে দুই হাজার অশ্বারোহী দিয়ে মিসরে পাঠান। আসাদউদ্দীন সাঈদ শহরে ফিরিঙ্গীদের সাথে যুদ্ধে বিজয় অর্জন করেন। ৫৬৪ হিজরীতে ফিরিঙ্গীরা বিশাল বাহিনী নিয়ে মিসর হামলা করলে আসাদউদ্দীন সাহায্যার্থ এগিয়ে আসেন। মিসরের শাসনকর্তা তার ভাতিজা সালাহুদ্দীন ইউসুফ বিন আইয়ূবকে উযীর নিয়োগ করেন। ৫৬৬ হিজরীর রবিউস সানী মাসের আট তারিখে খলীফা মুসতানজিদ ইন্তেকাল করেন। যাহাবী বলেন, মুসতানজিদ অসুস্থ অবস্থা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়ে আকাশ লাল হয়ে ছিল।
📄 আল-মুসতাযা বি আমরিল্লাহ
আল-মুসতাযা বি আমরিল্লাহ আল-হাসান বিন আল-মুসতানজিদ বিল্লাহ ৫৩৬ হিজরীতে আরমেনীয় গোযযা নামক বাঁদীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার ইন্তেকালের পর তিনি তখতে আরোহণ করেন। ইবনে জাওযী বলেন, তিনি সরকার প্রধান হওয়ার পর সকল শুল্ক মওকুফ করে দেন। এতে করে জুলুমের গতি রুদ্ধ হয়। চারিদিকে ইনসাফের শীতল বাতাস ছড়িয়ে পড়ে। আমি নিজের জীবনে কখনই এমনটা দেখিনি। তিনি ওলামা মুদাররিসীন এবং ইমামদের পেছনে তিনি অনেক অর্থ ব্যয় করেন। তিনি খলীফা হওয়ার সময় সকল সুলতানদের খিলাআত প্রদান করেন।
ইবনে জাওযী বলেন, তিনি অধিকাংশ লোক থেকে পর্দা করতেন। তার খিলাফত কালে উমাইয়্যা বংশীয় শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে। মিসরে তার নামে খুতবা দেয়া এবং মুদ্রায় তার নাম খোদাই করা হয়। যাহাবী বলেন, ৫৬৭ হিজরীতে বাগদাদে রাফেযীদের প্রভাব একেবারেই নিঃশেষিত হয়। ইয়ামন, বুরকা, মিসর এবং উসওয়ান পর্যন্ত তার নামে খুতবা পাঠ হতে থাকে। উবাদ কাতেব বলেন, ৫৬৭ হিজরীতে সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবী মিসরের জামে মসজিদে প্রথম জুমআয় বনূ আব্বাসের নামে খুতবা পাঠ করেন। এতে বিদআত নিস্তেনাবুদ হয় এবং শরীয়ত স্পষ্ট হয়। সালাহুদ্দীন উযীর থাকা অবস্থায় মিসরের শাসনকর্তা আযিদ মারা গেলে সালাহুদ্দীন পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেন। সুলতান নূরুদ্দীন জঙ্গী সালাহুদ্দীনকে খুলাফায়ে বনু আব্বাসের নামে খুতবা পাঠ করতে বললে ৫৬৭ হিজরীর মুহাররম মাসে মিম্বরে দাঁড়িয়ে খলীফার জন্য দু'আ করা হয়।
৫৬৯ হিজরীতে সুলতান নূরুদ্দীন জঙ্গী উপহারস্বরূপ খলীফার নিকট একটি গাধা প্রেরণ করেন। ৫৭১ হিজরীতে সুলতান সালাহুদ্দীন মিসর এবং কাহেরার পার্শ্বে প্রাচীর নির্মাণের নির্দেশ দেন। ৫৭২ হিজরীতে তিনি জাবালে মুকতমে একটি দুর্গ নির্মাণের নির্দেশ দেন। এ বছর সুলতান সালাহুদ্দীন হযরত ইমাম শাফী (র.)-এর কবরে মাযার তৈরি করেন। ৫৭৫ হিজরীর শাওয়াল মাসের শেষে মুসতাযা ইন্তেকাল করেন।
তার খিলাফতকালে নিম্নবর্ণিত ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন- নাহুবিদ ইবনে খুশাব, আবুল হাসান বিন সাফী, হাফেজ আবুল আল্লামা হামদানী, নাহুবিদ নাসিহুদ্দীন বিন দিহান, হাফেজ আল-কাবীর আবুল কাসিম বিন আসাকির, কবি হায়েস বায়েস, হাফেজ আবু বকর বিন খায়রু প্রমুখ।
📄 আন-নাসর লিদ্দীনিল্লাহ
আন-নাসর লিদ্দীনিল্লাহ আহমদ আবুল আব্বাস বিন আল-মুসতাযা বি আমরিল্লাহ ৫৫৩ হিজরীর রযব মাসে যুমরাদ নামক তুর্কী বাঁদির গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। ৫৭৫ হিজরীর যিলকদ মাসের চাঁদনী রাতে তিনি তখতে আরোহণ করেন। মুহাদ্দিসীনদের একটি জামাত তাকে হাদীস রেওয়ায়েত করার অনুমতি প্রদান করেন। সেই মুহাদ্দিসীনদের মধ্যে আবুল হুসাইন আব্দুল হক আল-ইউসুফী এবং আবুল হাসান আলী বিন আসাকির আলবাহাতী প্রমুখ অন্যতম। তিনি নিজেও এক জামাতকে হাদীস বর্ণনা করার ইজাযত দেন। যাহাবী বলেন, এত দীর্ঘ সময় ধরে কোনো খলীফা খিলাফতের কাজ পরিচালনা করেননি। তিনি ৪৭ বছর তখত নসীন ছিলেন। তিনি সারা জীবন ইয্যত এবং সম্মানের সাথে বেঁচে ছিলেন। তিনি সকল শত্রুদের মূলোৎপাটন করেন। সকল সুলতান প্রকাশ্যে তার আনুগত্য ঘোষণা করে। তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার সাহস কারো ছিল না। তার উপর হামলা করার ধৃষ্টতাও কেউ দেখায়নি। যদি কেউ হামলা করেছে তো সঙ্গে সঙ্গে তার গর্দান উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কোন বিরোধী চক্র মাথা তুললে সাথে সাথে তা দমন করা হয়। কেউ তার অনিষ্ট করতে চাইলে আল্লাহ তা'আলা তাকে ধ্বংস করে দিতেন। তিনি স্বীয় পিতামহের মত কল্যাণধর্মী কাজে অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন। তার ভাগ্য অত্যন্ত সুপ্রসন্ন। প্রজা হিতৈষী মানব ছিলেন। প্রত্যেক শহরে সংবাদ সরবরাহের কাজে একাধিক লোক নিয়োগ ছিল। তারা সকল সুলতানের প্রকাশ্য ও গোপনীয় বিষয় লিখে জানাত। তিনি রাজনৈতিক কূটচাল প্রয়োগের ক্ষেত্রে ছিলেন অবিসংবাদিত।
খলীফা আন-নাসর গায়েবের খবর জানতেন না। একবার খাওয়ারিযম শাহীর দূত একটি মোহর আটানো পত্র নিয়ে বাগদাদে আসে। খলীফা তাকে বললেন, তুমি ফিরে যাও। পত্রের বিষয়বস্তু আমার অজানা নয়। দূত ফিরে গেল। যাহাবী বলেন, লোকদের ধারণা খলীফার বশে জিন ছিল। খাওয়ারিযম শাহ বাগদাদ দখলের জন্য হামদান শহরে পৌছুলে ২০ দিন ধরে বিরামহীন বরফ বর্ষিত হয়। ফলে সে আর সামনে এগুতে পারে না। এ পরিস্থিতিতে তার সাথীরা মন্তব্য করল, খলীফার উপর আক্রমণ করার উদ্দেশে যাত্রা করেছে বিধায় আল্লাহ তা'আলা এ গযব নাযিল করেছেন। অবশেষে সে ফিরে যায়।
আন-নাসর যখন লোকদের শাস্তি দিতেন তখন দারুণ কঠোরতা অবলম্বন করতেন। আর কাউকে দান করলে নিশ্চিতভাবে তার দুস্থতা ও দরিদ্রতা কেটে যেত। জনৈক ব্যক্তি ভারত থেকে খলীফার জন্য একটি তোতা পাখি এনেছিল। পাখিটি قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ পড়তে পারত। বাগদাদে পৌঁছে সেদিন রাতে পাখিটি মারা যায়। সকালে লোকটি দারুণ বিচলিত হয়ে পড়ে। ইত্যবসরে খলীফার খাদেম এসে বলল, পাখিটি কোথায়? সে বলল, মারা গেছে। খাদেম বলল, বলত কতটুকু পুরষ্কার পাবার আশায় তুমি খলীফার জন্য পাখিটি এনেছিলে? সে বলল, পাঁচ শ' দিনারের আশা ছিল। খাদেম তার কাঙ্ক্ষিত অর্থ তাকে দিয়ে বলল, এগুলো খলীফা তোমাকে দিয়েছেন। তুমি ভারত গমনের পর থেকেই খলীফা এ ব্যাপারে অবগত ছিলেন।
একবার সদরে জাঁহার সাথে অনেক মুফতী বাগদাদে আসেন। এদের মধ্যে একজন ফকীহ তার নিজের ঘোড়ায় চড়ে স্বীয় বাসস্থান সমরকন্দ থেকে বাগদাদে আসার সময় তার স্ত্রী ঘোড়াটি রেখে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বলল, এত সুন্দর ঘোড়াটি তুমি নিয়ে যেও না। খলীফা দেখলে কেড়ে নিবেন। মুফতী সাহেব বললেন, খলীফার এতটা দুঃসাহস হবে না। এর মধ্যেই বিষয়টি খলীফার কানে পৌছে যায়। তিনি তার শাহী বাবুর্চিকে বাগদাদে এলে সেই মুফতী সাহেবের ঘোড়াটি কেড়ে নেবার আদেশ দিলেন। তাই হল। শখের ঘোড়াটি হাত ছাড়া হওয়ায় ফকীহ দারুণ বেদনায় হতবিহ্বল হয়ে পড়লেন। সদরে জাঁহা ফিরে যাওয়ার সময় খলীফা সকল মুফতীর খিলআত প্রদান করেন। সেই মুফতী সাহেবও খিলআত প্রাপ্ত হন। খিলআত হিসেবে খলীফা তাকে তার অনিন্দ সুন্দর শখের প্রিয় ঘোড়াটি প্রদান করেন। প্রদানের সময় খলীফা তাকে বলেন, তোমার ঘোড়াটি কেড়ে নেবার মত দুঃসাহস এই খলীফার না থাকলেও তাঁরই এক নিম্নস্তরের গোলাম তা ছিনিয়ে নিয়েছিল। এ কথা শুনে মুফতী সাহেব বিস্ময়াবিভূত হয়ে পড়েন এবং খলীফার কারামতের কায়িলে পরিণত হন।
আল-মুফিক-আব্দুল লতীফ বলেন, মানুষের অন্তরে খলীফার ভয় জেঁকে বসেছিল। বাগদাদের লোকদের মতই ভারত এবং মিসরের জনগণ তাঁকে ভীষণ ভয় পেত। খলীফা মুতাসিমের পর যে বীরত্ব, নির্ভীকতা ও সাহসীকতার অপমৃত্যু ঘটেছিল তিনি তা পুনর্জীবিত করেন। তাঁর গুপ্তচররা মুসলিম সাম্রাজ্যের সকল প্রান্তে চষে ফিরত। সমাজের গুরুত্বহীন সংবাদও তারা যত্ন সহকারে বাগদাদে সরবরাহ করত। ইবনে ওয়াসিল বলেন, আন-নাসর অত্যন্ত বুদ্ধিমান, চালাক, বীর, চিন্তাশীল, নির্ভুল অভিমত পেশকারী এবং ঝানু রাজনীতিবিদ। কূটনৈতিক তৎপরতায় তিনি অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ ছিলেন। ইবনে আছীর বলেন, আন-নাসরের চারিত্রিক গুণাবলী অনেক বেশি খারাপ ছিল। তার রুসমাত এবং ট্যাক্সের ভারে গোটা ইরাক বিধ্বস্ত হয়। তিনি লোকদের সম্পদ নিজের রক্ষিত মালের সাথে একিভূত করতেন।
৫৮০ হিজরীতে তিনি আহকাম জারি করলেন- যে ব্যক্তি ইমাম মূসার শহীদ হওয়ার স্থানে এসে আশ্রয় নিবে তাকে নিরাপত্তা দেয়া হবে। ৫৮১ হিজরীতে পশ্চিমাঞ্চলীয় শহরগুলোতে খলীফার নামে খুতবা পাঠ করা হয়। ৫৮৩ হিজরীতে অনেক বিজয় অর্জিত হয়। সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবী শাম মুলুকের অধিকাংশ শহরগুলো দখল করে নেন। এগুলোর মধ্যে সবচাইতে বড় বিজয় ছিল বাইতুল মুকাদ্দিস বিজয়। যা ফিরিঙ্গীরা ৯১ বছর শাসন করেছে। ৫৮৯ হিজরীতে সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবী ইন্তেকাল করেন। ৫৯০ হিজরীতে সালজুক বংশীয় সর্বশেষ বাদশাহ সুলতান টগর-ল-বেগ শাহ মারা যায়। ৬২২ হিজরীর রমযানের শেষ শনিবারে খলীফা আন-নাসর ইন্তেকাল করেন।