📄 আল-কাদের বিল্লাহ
আল-কাদের বিল্লাহ আবুল আব্বাস আহমদ বিন ইসহাক বিন মুকতাদার মওসুমা তামান্না অথবা দিমনা নামক বাঁদীর গর্ভে ৩৩৬ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তয়ে অপসারিত হওয়ার পর তিনি তখতে আরোহণ করেন। তয়ে অপসারিত হওয়ার সময় তিনি বাগদাদে ছিলেন না। ১০ই রমযানে তাকে ডেকে আনা হয়। ১১ই রমযানে সাধারণ পরিষদের সামনে তিনি মসনদে উপবেশন করেন। খতীব বলেন, কাদের বিল্লাহ অত্যন্ত সাধু, সুবিবেচক, ঝানু রাজনীতিবিদ, তাহাজ্জুদ গুজার এবং সদকা-খয়রাতকারী ছিলেন। তিনি আল্লামা আবু বশর হারবী শাফীর নিকট ফিকহ অর্জন করেন। তিনি "فضائل صحابه تكفير معتزله قائلين خلق القرآن" শীর্ষক একটি কিতাব লিখেন।
খিলাফত লাভের প্রথম বর্ষের শাওয়াল মাসে একটি আড়ম্বরপূর্ণ সভার আহ্বান করা হয়। এতে কাদের বিল্লাহ এবং বাহাউদ্দৌলা প্রতিজ্ঞা রক্ষাকরণের শপথ করে এবং কাদের বিল্লাহ নিজের প্রাসাদ ছাড়া গোটা সাম্রাজ্য তার উপর সোপর্দ করেন। এ বছর মক্কা শরীফের শাসনকর্তা আবুল ফুতুহ আল-হাসান বিন জাফর উলুবী খিলাফতের দাবী তোলে। মিসরশাহীর শাসন মক্কায় পরাভূত হয়। ৩৮২ হিজরীতে উযীর আবু নসর করখ অঞ্চলে একটি ভবন নির্মাণ করে। এর নাম রাখা হয় 'দারুল ইলম'। ৩৮৪ হিজরীতে ইরাক, সিরিয়া এবং ইয়ামনের লোকেরা হজ্ব করতে গিয়ে রাস্তা থেকে ফিরে আসে। কারণ এ বছর ট্যাক্স ছাড়া হজ্ব করতে যেতে বাধা দেয়া হয়। ৩৮৭ হিজরীতে সুলতান ফখরুদ্দৌলার তিরোধানে তার চার বছরের শিশু তদস্থলে নিয়োগ হয়। কাদের বিল্লাহ তাকে মাজদুদ্দৌলা উপাধি দেন। ৩৮৬ হিজরীতে মিসরশাহী আযীয মৃত্যুবরণ করে। তদস্থলে তদীয় পুত্র মানসুর আল-হাকিম বিআমরিল্লাহ উপাধি ধারণ করে সমাসীন হয়। ৩৯৩ হিজরীতে দামেশকের নায়েব আসওয়াদ পশ্চিমাঞ্চলীয় এক লোককে ধরে হত্যা করে, কারণ সে আবু বকর (রা.) এবং উমর (রা.)-কে ভালোবাসত।
৩৯৫ হিজরীতে হাকিম মিসরে একদল ওলামাকে হত্যা করে। ৩৯৬ হিজরীতে হাকিম মিশর এবং হারামাইন শরীফাইনে এ ফরমান জারি করে, যে কোনো স্থানে আমার নাম উচ্চারিত হলে শ্রবণকারী আমার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে যাবে এবং সিজদা করবে। ৩৯৮ হিজরীতে বাগদাদে শিয়া-সুন্নী দ্বন্দ্ব হয়। এতে কাদের বিল্লাহ রাগান্বিত হয়ে পড়েন। তিনি একদল অশ্বারোহী ফৌজ সুন্নতের অনুসারীদের সাহায্যার্থ প্রেরণ করেন। ৩৯৯ হিজরীতে বসরার কাযী আবু আমরকে অপসারণ করে আবুল হাসান বিন শাওয়ারিবকে কাযী পদে নিয়োগ দেয়া হয়। ৪০০ হিজরীতে দজলা নদীর পানি এতটাই কমে যায়, যা ইতোপূর্বে আর কখনই হয়নি। ৪১১ হিজরীতে হাকিম মিসরের হালওয়ান নামক গ্রামে নিহত হয়। ৪২২ হিজরীর যিলহজ মাসের এগারো তারিখ সোমবার রাতে কাদের বিল্লাহ ইন্তেকাল করেন।
তার শাসনামলে বর্ণিত ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন- আবু আহমদ আসকারী আদীব, রুমানী নাহুবিদ, আবুল হাসান মাসরজসী, আবু আব্দুল্লাহ মরযুবানী, মুঈদুদ্দৌলার উযীর সাহেব বিন উবাদা, হাফেজ দারা কুতনী, ইবনে শাহীন, আবু বকর আওদী ইমামুশ শাফীয়া, ইউসুফ ইবনে সিরানী, ইবনে রুলাক আল-মিসরী, ইবনে আবী যায়েদ আল-মালিকী, কওতুল কুবের লেখক আবু তালিব আল-মালী, ইবনে বার্তা আল-হাম্বলী, ইবনে শামউন খাতায়ী, খাতেমিল লগবী, আওফু আবু বকর, ইবনে গালবুন আল-মাকরী, কাশমিহনা, মাআনী বিন যাকারিয়া আন-নাহরুয়ানী, ইবনে খুওয়ায মিন্দাদ, ইবনে জনা, সহীহ-এর লেখক জওহরী, আল-জামালের লেখক ইবনে ফারেস, ইবনে মান্দাত আল-হাফেজ ইসমাঈল শায়খে শাফীয়াহ, আসবানা বিনিল ফারাজ শায়খে মালিকীয়া, বদিউয্যামান, ইবনে লাল, ইবনে আবী যাযনীন, আবু হায়ান আত-তাওহিদী, কবি আলওয়াদ, আল-ফারিবিনের লেখক আল-হারবী, কবি আবুল ফাতাহ আল-বাস্ত্রী, হালিমী শায়খে শাফীয়াহ, ইবনুল ফারিয, আবুল হাসান আল-কালবেসী, কাযী আবু বকর বাকলানী, আবু তবীব সালুকী, ইবনে আকফানী, আল-খুত্ব-এর লেখক ইবনে নাযাতাহ, সামিরী শায়খে শাফিয়াহ, মুসতাদরাকের লেখক হাকীম ইবনে কুজ, শায়েখ আবু হামেদ, ইবনে ফুরাক, শরীফ রেজা, আবু বকর আর-রাযী, হাফেজ আব্দুল গেনা বিন সাঈদ, ইবনে মারদুয়া, হাফতুল্লাহ বিন সালামা, ইবনুল বাওয়াব, আব্দুর রহমান মুহামেলী, আবু বকর আল-কাফাল, ইবনুল ফুখার, আলী বিন ঈসা প্রমুখ। যাহাবী এছাড়াও অসংখ্য মনীষীর নাম উল্লেখ করেছেন।
📄 আল-কায়িম বি আমরিল্লাহ
আল-কায়িম বি আমরিল্লাহ আবু জাফর আব্দুল্লাহ বিন আল-কাদের বিল্লাহ ৩৯১ হিজরীর যিলকদ মাসের মাঝামাঝিতে উম্মে ওলাদ মাসুমা বদরুদ্দোজা ভিন্ন মতে কতরুননিদা নামক দাসীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পিতার জীবদ্দশায় ওলীয়ে আহাদ ছিলেন। তিনিই তাকে কায়িম বি আমরিল্লাহ খেতাব দেন। পিতার ইন্তেকালের পর ৪২২ হিজরীতে তিনি খিলাফতের তখতে আরোহণ করেন।
ইবনে আছীর (রহ.) বলেন, তিনি অত্যন্ত সুদর্শন, সংযমী, ইবাদতকারী, দানশীল, আলেম, আল্লাহর উপর ভরসাকারী, ধৈর্যশীল, সুসাহিত্যিক, সদা প্রফুল্ল, ইনসাফকারী এবং অভাব পূরণকারী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। কোনো কিছু চাইলে তিনি কাউকে বঞ্চিত করতেন না।
খতীব বলেন, মুসলিম সাম্রাজ্যে বসাসীরী অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিংস্র হয়ে উঠে। তাকে প্রতিহত করার মত কেউ ছিল না। আরবে আযমে সকলেই তার ভয়ে কাঁপত। তার থেকে পরিত্রাণের জন্য দু'আ করা হতো। সে লোকদের সম্পদ আত্মসাত করতো। গ্রামের পর গ্রাম লুণ্ঠন করতো। কায়িম তাকে প্রতিহত করেন। প্রথমে উভয়ের মধ্যে প্রীতিকর সম্পর্ক ছিল। পরবর্তীতে সম্পর্কে চিড় ধরলে বসাসীরী দারুল খুলাফা লুণ্ঠন এবং খলীফাকে বন্দী করার ষড়যন্ত্র করে। ফলে খলীফা রায়ের শাসনকর্তা আবু তালিব মুহাম্মাদ বিন মাকয়ালের সাহায্য প্রার্থনা করেন। রায়ের শাসনকর্তা টগর বেগ নামে প্রসিদ্ধ ছিল। সে ৪৪৭ হিজরীতে এসে বসাসীরীর বাসগৃহে আগুন ধরিয়ে দেয়। সে রহবা শহরে পালিয়ে যায়। তুর্কীরা বসাসীরীর পতাকা তলে সমবেত হয়। সে খলীফার বিরুদ্ধে মিসর শাসনকর্তার সাহায্য চাইলে সে তাকে অর্থ-সম্পদ দিয়ে সহযোগিতা করে। অতঃপর সে গটর বেগের ভাই টপালকে তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে সাহায্য করার জন্য আহ্বান জানায়। সে তাকে লোভ দিয়ে এ মর্মে পত্র লেখে যে, আমি বিজিত হলে তোমাকে রায়ের শাসনকর্তা বানাব। লোভে পড়ে টপাল টগর বেগের উপর আক্রমণ করলে বসাসীরী ৪৫০ হিজরীতে বাগদাদের দিকে কুজ করে। খলীফা বাগদাদের বাইরে এসে তার সাথে লড়াই করেন। মানসুর জামে মসজিদে মিসর শাসনকর্তার নামে খুতবা পাঠ করা হয়। আযানে حَيَّ عَلَىٰ خَيْرِ الْعَمَلِ শব্দগুলো বৃদ্ধি করা হয়। সে সময় খলীফা নিয়ন্ত্রিত এলাকা ছাড়া সর্বত্র তার নামে খুতবা পঠিত হতে থাকে। এক মাস পর্যন্ত লড়াই চলতে থাকে। যিলহজ মাসের শেষ দিকে সে খলীফাকে বন্দী করে গানায় নিয়ে গিয়ে কয়েদ করে রাখে।
ওদিকে টগর বেগ তার ভাইকে পরাজিত এবং হত্যা করে গানার প্রশাসককে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনপূর্বক খলীফাকে দারুল খুলাফায় পৌছে দেবার জন্য পত্র লেখে। সে তাই করে। ৪৫১ হিজরীর যিলকদ মাসের পাঁচ তারিখে খলীফা এসে পৌছেন। সে সময় তিনি অত্যন্ত খোশ হাল অবস্থায় ছিলেন। অতঃপর টগর বেগ সুসজ্জিত বাহিনী নিয়ে বসাসীরীর উপর হামলা করে। যুদ্ধে বসাসীরী পরাজিত হয়। সে তাকে হত্যা করে তার কর্তিত মস্তকখানা বাগদাদে পাঠিয়ে দেয়। খলীফা দারুল খুলাফায় ফিরে এসে জায়নামাযে ঘুমাতেন। দিনে রোযা রাখতেন, রাতে নামায পড়তেন। যারা তাকে কষ্ট দিত তিনি তাদের ক্ষমা করে দিতেন। তিনি তার লুণ্ঠিত সম্পদ মূল্য প্রদান ছাড়া ফেরত নিতেন না। তিনি বলতেন, সর্ব বিষয়ের সওয়াব আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট থেকে নিব। তিনি বালিশে মাথা রাখতেন না। কথিত আছে, তার প্রাসাদ লুণ্ঠন হওয়ার সময় খেলাধুলার কোন আসবাবপত্র পাওয়া যায়নি। এটা তার বুযুর্গীর উন্নত দলিল।
বর্ণিত আছে, বসাসীরী তাকে কয়েদ করে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি এ দু'আটি লিখে কাবা গৃহের দেয়ালে ঝুলিয়ে দেবার জন্য মক্কা শরীফে পাঠিয়ে দেন- "বান্দা মিসকিনের পক্ষ হতে মহান আল্লাহর দরবারে, হে ত্রিভুবনের শাহানশাহ! আপনি মনের গোপন অভিব্যক্তি সম্পর্কেও অবগত। অন্তরের অবস্থা আপনার সামনে দিবাকরের ন্যায় ভাস্বর। হে মাবুদ! আপনার অপার জ্ঞানভাণ্ডার নিজের সৃজনশীলতার ব্যাপারে সম্যক জ্ঞাত। ইলাহী! আপনার এ বান্দা আপনার নেয়ামত অস্বীকার করেছে, কৃতজ্ঞতা আদায় করেনি। নিয়ামতরাজির উপর নির্ভর করেনি। আপনার হুকুম মানার ক্ষেত্রে অমনোযোগী হয়েছে। ফলে আমার উপর এক বিদ্রোহীকে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে- যাদের সাথে আমাদের দুশমনী, হে প্রতিপালক! সাহায্য হ্রাস পেয়েছে এবং অত্যাচার বৃদ্ধি পেয়েছে। হে পালনকর্তা! আপনিই প্রত্যেক বিষয়ে অবিসংবাদিত, পরিজ্ঞাত, নিয়ন্ত্রক এবং বিচারক। আপনারই সমীপে ফরিয়াদ, প্রত্যাবর্তন এবং পানাহ চাইছি। হে দয়াময়! আপনার মাখলুক আমার উপর প্রভুত্ব করছে। আমি আপনার কাছেই ফরিয়াদ করছি। আমি আপনার ইনসাফ প্রার্থী। আপনি আমার উপর থেকে অন্ধকারের যবনিকা অপসৃত করুন। আপনার দয়া ও মমতার দুয়ার অবারিত করুন। আমাদের মাঝে ইনসাফ করুন। আপনিই খাইরুল হাকেমীন।"
৪২৮ হিজরীতে মিসর শাসনকর্তা আয-যাহের উবায়দী আট বছর চার মাস রাজত্ব করে মারা যায়। তার স্থানে তদীয় পুত্র আল-মুসতানসির সাত বছরের জন্য কায়েম থাকে। যাহাবী বলেন, তার শাসনামলে মিসরে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়- যার তীব্রতা একমাত্র ইউসুফ (আ.)-এর যুগের সাথে তুলনা করা যেতে পারে, এ দুর্ভিক্ষ সাত বছর স্থায়ী হয়। লোকেরা একে অপরকে কেটে ভক্ষণ করতো। সে সময় একটি রুটি পঞ্চাশ দিনারে বিক্রি হয়। ৪৪৩ হিজরীতে মুআয বিন নাদিস খুতবা থেকে উবায়দীদের নাম বাদ দিলে পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে বনু আব্বাসের নাম পঠিত হতে থাকে। ৪৫১ হিজরীতে গাযনার বাদশাহ সুলতান ইবরাহীম মাহমুদ বিন সবক্তগীন এবং টগর বেগের ভাই খুরাসানের শাসনকর্তা জাফর বেগ বিন সালজুকের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। পরে উভয়ের মাঝে সন্ধি হয়। এর এক বছর পর জাফর বেগ ইন্তেকাল করে। তদস্থলে তদীয় পুত্র তখত নসীন হয়।
৪৫৪ হিজরীতে খলীফা নিজ কন্যাকে টগর বেগের সাথে বিয়ে দেন- যা কখনই এমনটা হয়নি। বনূ আব্বাস স্ববংশীয় ছাড়া কোথাও (কন্যা) বিয়ে দেয়নি। এমনকি বনূ যুয়া, যারা খলীফাদের উপর হুকুমত চালিয়েছে তাদেরকেও বন্ আব্বাস কন্যা দেয়নি। আর আমার (গ্রন্থকার) যুগে খলীফা তার মেয়েকে ডেপুটি সুলতানের গোলামের সাথে বিয়ে দেন। ৪৫৫ হিজরীতে টগর বেগ খলীফার মেয়েকে নিয়ে বাগদাদে এসে মাওয়ারিছ এবং খারাজ ফিরিয়ে দেয়। অতঃপর বাগদাদের উপর দেড় লাখ দিনার ট্যাক্স বসিয়ে রায়ে চলে যায়। সেখানে পৌছে সে মারা যায়। আল্লাহ তা'আলা তার গুনাহ ক্ষমা করবেন না। তার শূন্য পদে তার ভাতিজা খুরাসানের শাসনকর্তা আরসালান অধিষ্ঠিত হয়। খলীফা তার কাছে খিলাআত পাঠান। যাহাবী বলেন, আরসালান সর্বপ্রথম বাগদাদে মিম্বরে আরোহণপূর্বক নিজের উপাধি সুলতান হিসেবে ঘোষণা করে। সে অন্যান্য সুলতানের চেয়ে অধিক শক্তিশালী হওয়ায় খ্রিস্টানদের অধিকাংশ শহর, নগর, জনপদ দখল করে নেয়। সে নিযামুল মুলুককে উযীর নিয়োগ করে। উমায়দুল মুলুকসহ সভাসদদের বরখাস্ত করে। সে শাফী মাযহাবের মদদদাতা। হারামাইন শরীফাইনের ইমাম এবং আবুল কাসিম আল-কুশায়রীকে অত্যন্ত সমাদর ও সম্মান করত। সে মাদরাসায়ে নিযামিয়ার ভিত্তি স্থাপন করে। বর্ণিত রয়েছে যে, সর্বপ্রথম ফিকহ-এর জন্য এ মাদরাসার ভিত্তি দেয়া হয়।
৪৫৮ হিজরীতে দুই চেহারাবিশিষ্ট এক কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। এ বছর আকাশে চাঁদের সমান একটি তারকা দেখা দেয়। এ থেকে তীব্র তাপদাহ নির্গত হয়। এ দৃশ্য দেখে লোকেরা ভীষণ ভয় পায়। দশরাত পর্যন্ত এর অস্তিত্ব ছিল। পরে তা আস্তে আস্তে ম্লান হয়ে যায়। ৪৫৯ হিজরীতে মাদরাসা নিযামিয়ার কাজ সমাপ্ত হয়। শিক্ষক হিসেবে শায়খ আবু ইসহাক শিরাজী নিয়োগ পান। ৪৬০ হিজরীতে রমলায় বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়। এতে রমলা সমূলে বিধ্বস্ত হয়। পঁচিশ হাজার লোক নিহত হয়। ৪৬১ হিজরীতে দামেশকের জামে মসজিদে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কারুকার্য ও স্বর্ণ-রৌপ্য খচিত সাদের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। ৪৬২ হিজরীতে মক্কার আমীরের দূত এসে সুলতান আল্ব আরসালানকে এ সংবাদ দেয় যে, মক্কা শরীফে মুসতানসিরের নামে খুতবা বন্ধ হয়ে বনু আব্বাসের নামে খুতবা পড়া আরম্ভ হয়েছে এখান থেকে حَيَّ عَلَىٰ خَيْر الْعَمَلِ শব্দগুলো বাদ পড়েছে। এ কথা শুনে সুলতান দূতকে খুশি হয়ে ত্রিশ হাজার দিনার এবং খিলআত প্রদান করে।
৪৬৩ হিজরীতে বনূ আব্বাস ও সুলতান আল্ব আরসালানের শক্তি এবং মুসতানসিরের সালতানাতের পতন দেখে লোকেরা বনূ আব্বাসের নামে খুতবা পাঠ করতে থাকে। এ বছর এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মাধ্যমে রোমানরা মুসলমানদের নিকট পরাজিত হয়। এ যুদ্ধে সুলতান আরসালান স্বয়ং সেনাপতিত্বের দায়িত্ব পালন করেন এবং রোম সম্রাটকে বন্দী করে নিয়ে আসেন। অতঃপর মোটা অংশের মুক্তিপণ নিয়ে সম্রাটকে ছেড়ে দেয়া হয়। ৪৬৪ হিজরীতে ছাগলের মাঝে মরণ ব্যাধি রোগের প্রাদুর্ভাব হওয়ায় পালের পর পাল ছাগল মরে সাফ হয়ে যায়। ৪৬৫ হিজরীতে আল্ব আরসালান নিহত হয়। তার জায়গায় পুত্র মুলক শাহ অধিষ্ঠিত হয়। তাকে জালালুদ্দৌলা উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ৪৬৬ হিজরীতে দজলা নদীর ৩০ হাত খাড়া পানিতে বাগদাদ প্লাবিত হয়। এতে প্রচুর জান ও মালের ক্ষয়ক্ষতি হয়। এক লাখের বেশি ঘরবাড়ি ধ্বংস হওয়ায় বাগদাদ বিরান ভূমিতে পরিণত হয়। ৪৬৭ হিজরীতে ৪৫ বছর খিলাফত পরিচালনার পর তিনি শাবান মাসের ১৩ তারিখ বৃহস্পতিবার রাতে জগতের মায়া কাটিয়ে পরপারে পাড়ি জমান।
তার খিলাফত কালে নিম্নবর্ণিত ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন- আবু বকর ইয়ূরকানী, আবুল ফজল ফালকী, ছাআলাবী, কুদদারী শায়খে হানাফীয়া, ইবনে সীনা দার্শনিক, কবি মিহয়ার, আবু নাঈম, আবু যায়েদ, তাহযীবের লেখক বুরুয়ী মালিকী, আবুল হাসান বসরী মুতাযানী, মক্কী, শায়খ আবু মুহাম্মাদ জুবিনী, মাহদী সাহেবে তাফসীর, আকলিলী, ছুমানিনী, ইরশাদের লেখক আবু আমর দাদানী জালিল, সালিম রাযী, আবুল আলা মুফযী, আবু উসমান ছাবুনী, ইবনে বাত্তাল বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাকার, কাযী আবু তয়্যব তাবারী, ইবনে শায়তী মাকরী, মাদরদী শাফী, ইবনে বাব শাদ, শিহাব বিন বুরহান নাহুবিদ, ইবনে হাযাম যাহেরী, বায়হাকী, ইবনে সায়্যেদাহ, আবু ইয়ালা বিন ফারার শায়খে হানাবালা, শাফী হাযালী, শায়খে বাগদাদী ইবনে রাশীক, উমদাহ বিন আব্দুল বার প্রমুখ।
📄 আল-মুকতাদী বি আমরিল্লাহ
আল-মুকতাদী বি আমরিল্লাহ আবুল কাসিম আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন কায়িম বি আমরিল্লাহ গর্ভে থাকাকালীন তার পিতার মৃত্যু হয়। বাবার ইন্তেকালের ছয় মাস পরে তিনি এক দাসীর গর্ভে ভূমিষ্ঠ হন। দাদার মৃত্যুর পর তিনি ১৯ বছর তিন মাস বয়সে খিলাফতে আসীন হন। তার খিলাফতকালে শহরগুলোতে অনেক নেক কাজ হয়। খিলাফতের সীমানা বৃদ্ধি পায়। তার খিলাফত ছিল পূর্ববর্তী খিলাফতের বিপরীত। বাগদাদে গান-বাজনা নিষিদ্ধ হয়। গায়কগায়িকাদের বাগদাদ থেকে বের করে দেয়া হয়। পর্দা বিনষ্ট না হওয়ার জন্য হাম্মামের সিঁড়িগুলো ভেঙে ফেলেন। বনু আব্বাসের মধ্যে তার খিলাফত ছিল অত্যন্ত দ্বীনদার, অতিশয় নেককার এবং প্রতাপান্বিত। তার খিলাফতের প্রথম বছর থেকেই পবিত্র মক্কা শরীফে উবায়দীদের নামে খুতবা পাঠ করা হতে থাকে। এ বছর নিযামুল মুলুক তারকা বিশেষজ্ঞদের সমবেত করে সূর্যাস্তের পর থেকে নববর্ষের সূচনা হিসেবে গণ্য করা হয়। আগে সূর্যোদয় থেকে দিনের শুরু হতো।
৪৬৮ হিজরীতে দামেশকে মুকতাদীর নামে খুতবা দেয়া আরম্ভ হয়। আযান থেকে حَيَّ عَلَىٰ خَيْرِ الْعَمَلِ শব্দগুলো বাদ পড়ে। ৪৬৯ হিজরীতে আবু নসর বিন উসতাদ আবুল কাসিম কাশিরী আশআরী বাগদাদের মাদরাসা নিযামিয়ায় এসে ওয়াজ করেন। এতে হানাবেলারা রাগান্বিত হওয়ায় এক বড় ফিত্নার সৃষ্টি হয়। ফলে এক দল আরেক দলের হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়। ৪৭৫ হিজরীতে মুকতাদী সুলতানের নিকট আবু ইসহাক শিরাজীকে পাঠিয়ে উমায়েদ আবুল ফাতাহ- এর অভিযোগ দায়ের করেন। ৪৭৬ হিজরীতে দুর্ভিক্ষ উঠে যাওয়ায় শহরগুলোতে ফসলাদি উৎপাদিত হয়। ৪৭৭ হিজরীতে কণ্ডনীয়া এবং আকসার শাসনকর্তা সসৈন্যে সিরিয়ায় গমন করেন এবং ইনতাকীয়া শহর দখল করেন। ৪৭৮ হিজরীতে বাগদাদে অন্ধকার নেমে আসে, বিদ্যুৎ চমকায়। আকাশ থেকে বালু মাটি বর্ষিত হয়। ৪৭৯ হিজরীতে সুবতা ও মুরাকিশের শাসনকর্তা ইউসুফ বিন তাশফীনের অনুরোধের প্রেক্ষিতে মুকতাদী তাকে তার অধীনস্থ রাজ্যগুলো প্রদানকরত আমিরুল মুসলিমীন উপাধিতে ভূষিত করেন। এ বছর থেকে হারামাইন শরীফাইন উবায়দীদের নাম রহিত করে খুতবায় খলীফার নাম পাঠ করা হয়।
৪৮৪ হিজরীতে ফিরিঙ্গীরা গোটা সাকলীয়া উপদ্বীপ দখল করে নেয়। ৪৮৫ হিজরীতে সুলতান মুলক শাহ আবার বাগদাদে এসে খলীফাকে অতিসত্বর বাগদাদ ছেড়ে চলে যাওয়ার সংবাদ দেয়। খলীফা কিছুটা সময় প্রার্থনা করেন। সে তার প্রার্থনা প্রত্যাখ্যান করে। অতঃপর খলীফা সুলতান মুলক শাহ- এর উযীরের নিকট সময় চাইলে সে মাত্র ১০ দিন সময় দেয়। কিন্তু ১০ দিন অতিক্রান্ত না হতেই সুলতান রোগাক্রান্ত হয়ে মারা যায়। লোকেরা এটাকে খলীফার কারামত হিসেবে উল্লেখ করে। কথিত আছে, খলীফা মুকতাদী সময় লাভের দিনগুলোতে রোযা রাখতে শুরু করেন। ইফতারের মুহূর্তে ছাই-এর উপর বসে সুলতান মুলক শাহ থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আল্লাহ তা'আলার দরবারে দু'আ করতেন। আল্লাহ পাক তার দু'আ কবুল করেন।
সুলতান মুলক শাহ- এর মৃত্যু সংবাদ তার স্ত্রী গোপন রেখে আমীর-উমারাদের নিকট থেকে তার পাঁচ বছরের শিশু সন্তান মাহমুদের জন্য উত্তরাধিকারের (ওলী আহাদের) শপথ নেয়। অতঃপর সে তাকে সুলতান মনোনীত করার জন্য খলীফার নিকট আবেদন জানায়। খলীফা তা মঞ্জুর করেন এবং তাকে নাসিরুদ্দীন ওয়া দুনিয়া উপাধি দেন। কিছু দিন পর মাহমুদের ভাই বরকিয়ারুক হামলা চালায়। খলীফা তাকে সুলতান বানিয়ে রুকনদ্দৌলা উপাধি দেয়। এ ঘটনার পর দিন ৪৮৭ হিজরীতে শামসুন নাহার নামক বাঁদীর বিষ প্রয়োগে খলীফা মুকতাদী ইন্তেকাল করেন।
তার খিলাফতকালে যেসব ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন তাঁরা হলেন- আব্দুল কাহের জুরজানী, আবুল ওয়ালীদ বাজী, আবু ইসহাক শিরাজী বিখ্যাত নাহুবিদ, শামলের লেখক ইবনে সবাআ, ইমামুল হারামাইন আল-মুতাওয়াল্লী, আদ-দামগানী হানাফী, ইবনে ফাযাল মুজাশায়ী, বুযুদী শায়খে হানাফী প্রমুখ।
📄 আল-মুসতায়হার বিল্লাহ
আল-মুসতাযহার বিল্লাহ আবুল আব্বাস আহমদ বিন মুকতাদী বিল্লাহ ৪৭০ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার মৃত্যুর পর ১৬ বছর বয়সে তিনি তখতে আরোহণ করেন। ইবনে আছীর (র.) বলেন, তিনি অত্যন্ত কোমল মতি, উন্নত চরিত্র, নেককার এবং সদা লাস্যমান। অনেক বিষয়ে তিনি নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। যা তার ব্যাপক জ্ঞানভাণ্ডারের অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি দানশীল, উদার এবং ওলামা প্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। এই খলীফার খিলাফতে অসুন্দরের কোনো নমুনা পাওয়া যাবে না। খিলাফতের দিনগুলো তার যুদ্ধ বিগ্রহের কারণে সর্বদা উদ্বিগ্ন অবস্থায় কেটেছে। খিলাফত লাভে প্রথম বছর মিসর শাসনকর্তা মুসতানসির উবায়দীর মৃত্যুর পর তার ছেলে তখত নসীন হয়। এ বছর রোমানরা বলনসীয়াহ শহর দখল করে নেয়।
৪৮৮ হিজরীতে সমরকন্দের বাদশাহ আহমদ খা নিহত হয়। ৪৮৯ হিজরীতে একমাত্র শনিগ্রহ ছাড়া সকল গ্রহপুঞ্জ ও নক্ষত্ররাজি বুরজে হতে মীন রাশি জমা হলে জ্যোতিষিরা ঐকমত্য হয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করল- অচিরেই হযরত নূহ (আ.)- এর যুগের মত তুফান হবে। কিন্তু একটি প্লাবন ছাড়া আর কিছুই হয়নি। ৪৯০ হিজরীতে খুরাসানের শাসনকর্তা সুলতান আরসালান আরগোয়ান বিন আলব আরসালান সালজুকী নিহত হয়। এ বছর ফিরিঙ্গীরা এসে সর্বপ্রথম তায়কীয়া শহর দখল করে। ৪৯২ হিজরীতে ফিরিঙ্গীরা দেড় মাস দুর্গে আবদ্ধ থাকার পর বাইতুল মুকাদ্দীস দখল করে এবং আলেম-ওলামা, ইবাদতকারী ও দানশীলদের এক বড় জামাতকে হত্যা করে। নিহতদের সংখ্যা আনুমানিক ৭০ সহস্রাধিক। এ বছর মিসরে এত অন্ধকার নেমে আসে যে, আপন হাত পর্যন্ত দেখা যেত না। আকাশ থেকে অবিরাম বালু বর্ষিত হয়। এ বছর ফিরিঙ্গী এবং স্পেন শাসনকর্তা ইবনে নাশিকীনের মধ্যে লড়াই হয়। মুসলমানরা জয়লাভ করে।
৫০৭ হিজরীতে মওসুলের বাদশাহ মওদুদ ফিরিঙ্গীদের বাদশাহর সাথে যুদ্ধ করার জন্য বাইতুল মুকাদ্দীস যান। সেখানে তুমুল যুদ্ধ হয়। অতঃপর মওদুদ দামেশকে এসে জামে মসজিদে জুমআর নামায পড়ে বেরুনোর সময় জনৈক বাতনীর অতর্কিত আক্রমণে নিহত হন। ৫১১ হিজরীতে প্রাকৃতিক প্লাবনে বোখার এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলো ডুবে যায়। এ বছর সুলতান মুহাম্মাদের মৃত্যু হয়। ৫১২ হিজরীতে খলীফা মুসতাযহার বিল্লাহ ১৩ রবিউল আউয়াল মঙ্গলবারে ২৫ বছর খিলাফত পরিচালনার পর পরপারে পাড়ি জমান। মুসতাযহার কবিতা জানতেন। তার অনেক কবিতা প্রসিদ্ধতা অর্জন করেছে।
তার যুগে যেসব ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন তাঁরা হলেন- আবুল মুতফার সামআনী, নাসরুল মুকাদ্দাসী, আবুল ফরজ, রুয়ানী, খতীব তিবরিযী, কিয়ার হারায়ী, ইমাম গাযালী, মুসতাযহারের প্রশংসামূলক জীবনী লেখক শাশী, আয়বরদী আল-লগবী, ইবনে সায়্যেদাহ, আবু ইয়ালা বিন ফারার শায়খে হানাবালা, শাফী হাযালী, শায়খে বাগদাদী ইবনে রাশীক, উমদাহ বিন আব্দুল বার প্রমুখ।