📄 আর-রাযি বিল্লাহ
আর-রাযী বিল্লাহ আব্বাস মুহাম্মাদ বিন মুকতাদর মুতাযদ বিন তলহা বিন মুতাওয়াক্কিল ২৯৭ হিজরীতে জুলুম নামক এক রোমান বাঁদীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। কাহিরকে অপসারণ করার পর তিনি তখতে উপবেশন করেন। মসনদে আরোহণের পর তিনি ইবনে মুকালাকে নির্দেশ দেন যে, কাহিরের ভুলত্রুটিগুলো পুস্তক আকারে লিপিবদ্ধ করে মানুষদের তা শুনিয়ে দাও।
৩২২ হিজরীতে মুরওয়াদিজের সিপাহসালার দিলম ইস্পাহানে মারা যায়। তার রাজ্যের সীমানা এতই সম্প্রসারিত হয়েছিল যে, লোকেরা বলত, দিলম বাগদাদ আক্রমণের ইচ্ছা করছে। দিলম বলত, আরব সাম্রাজ্য ভেঙ্গে আজমী সাম্রাজ্য গড়ে তোলাই আমার লক্ষ্য। এ বছর আলী বিন বুয়া রাযীর নিকট বলে পাঠালো যে, যে শহরগুলো আমার করতলগত সেগুলোর জন্য বার্ষিক এক কোটি দিরহাম কর আমাকে দিতে হবে। রাযী সঙ্গে সঙ্গে তা পাঠিয়ে দিলে ইবনে বুয়া সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে প্রজাদের উপর বল প্রয়োগ করা ছেড়ে দেয়।
এ বছর মাহদীর দাবীদার পশ্চিমাঞ্চলে ২৫ বছর রাজত্ব করার পর মারা যায়। সে মিসরের ফাতেমী খলীফাদের একজন। কথিত আছে, সে হযরত আলীর উত্তরাধিকার প্রাপ্ত, সে ইমাম মাহদীর দাবী করে বলত, আমি হযরত আলীর বংশধর। মূলত তার দাদা অগ্নিপূজক ছিল। কাযী আবূ বকর বাকলানী বলেন, মাহদী দাবীদার লোকটির লকব ছিল উবায়দুল্লাহ। তার দাদা অগ্নিপূজক। সে পশ্চিমাঞ্চলে এসে মাহদীর দাবী করে বলে, আমি হযরত আলীর বংশধর। কিন্তু কোনো আলেম তাঁর দাবীর সাথে ঐকমত্য পোষণ করেননি।
৩২৩ হিজরীতে রাযী শাসনভার নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। তার দুই ছেলে আবুল ফজল এবং আবু জাফর পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে নিজেদের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এ বছর জামাদিউল আউয়াল মাসে এক প্রকার বিশেষ অন্ধকার গোটা পৃথিবীকে গিলে ফেলে। এটি আসর থেকে মাগরীব পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। এ বছর যিলকাদা মাসের সকল রজনীতে আকাশের বড় বড় নক্ষত্রগুলো ভেঙে ভেঙে পড়তে থাকে।
৩২৪ হিজরীতে মুহাম্মাদ বিন আমীর রায়েক ওয়াসেত এবং এর পার্শ্ববর্তী শহরগুলো দখল করে নেয়। শহরগুলোতে মুহাম্মাদের ফরমান জারি হয়। উযীরগণকে বরখাস্ত করা হয়।
৩২৫ হিজরীতে মুসলিম সাম্রাজ্য কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। প্রথমে বিদ্রোহীরা শহরগুলো দখল করে। তারপর প্রশাসকবৃন্দ অধিকৃত শহর, নগর ও জনপদ থেকে কেন্দ্রীয় কোষাগারে খারাজ আসা বন্ধ হয়ে যায়। চারিদিকে অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ে। বাগদাদ এবং এর পার্শ্ববর্তী জনপদ ছাড়া রাযীর হাতে আর কোন কিছুই রইল না। এ সময় খিলাফত নামসর্বস্ব হয়ে পড়ে। ফলে উমাইয়্যা বংশীয় স্পেনের বাদশাহ আমীর আব্দুর রহমান বিন মুহাম্মাদের সাহস বেড়ে যায়। তিনি নিজের নামের সাথে আমীরুল মুমিনীন নাসিরুদ্দীনীল্লাহ উপাধি লাগিয়ে দাবী করে বলেন, আমিই খিলাফতের বেশি হকদার।
৩২৬ হিজরীতে বুহকিম আলী বিন রায়েককে আক্রমণ করে। আলী আত্মগোপন করে। বুহকিম বাগদাদে প্রবেশ করলে রাযী তাকে সাদর সম্ভাষণ জানান। তাকে আমীরুল উমারা খিতাব দেন।
৩২৭ হিজরীতে আবু আলী উমর বিন ইয়াহইয়া স্বীয় বন্ধু কারমাতীকে এ মর্মে পত্র লিখল যে, জনপ্রতি পাঁচ দিনার আদায়সাপেক্ষে হাজীদের রাস্তা খুলে দাও এবং হজ্ব করার অনুমতি দাও। সে অনুমতি দিল, লোকেরা হজ্ব আদায় করতে লাগল।
৩২৮ হিজরীতে দজলা নদীর পানি ফুলে ১৯ হাত খাড়া হয়ে যায়। এতে গোটা বাগদাদ প্লাবিত হয়। মানুষ এবং প্রাণিকুল ডুবে যায়।
৩২৯ হিজরীতে রাযী অসুস্থ হয়ে পড়লে রবিউল আউয়াল মাসে ৩১ বছর ৬ মাস বয়সে পরলোক গমন করেন। তিনি দানশীল, জ্ঞানী, সাহিত্যিক, কবি, বাগ্মী এবং ওলামা মাশায়েখ প্রিয় ছিলেন।
খতীব বলেন, রাযীর অনেক ফাযাইল রয়েছে। তিনিই সর্বশেষ খলীফা যার কবিতাগুলো প্রেমের রসে সিক্ত। তিনি শেষ খলীফা যিনি সেনা বাহিনীর ভাতা নির্ধারণের রীতিনীতি প্রণয়ন করেন। তিনি আখেরী খলীফা যিনি জুমআর খুতবা পাঠ করেন। তিনি সর্বশেষ খলীফা যিনি সহকর্মীদের সাথে পরামর্শ সভায় বসতেন। তিনি শেষ খলীফা যিনি পূর্ববর্তী খলীফাদের রীতি অনুযায়ী উপঢৌকন প্রদান করতেন।
📄 আল-মুত্তাকীলিল্লাহ
আল-মুত্তাকীলিল্লাহ আবু ইসহাক ইবরাহীম বিন মুকতাদার বিন মুতাযদ বিন মুফিক তলহা বিন মুতাওয়াক্কিল স্বীয় ভ্রাতা রাযীর মৃত্যুর পর খিলাফতের তখতে আসীন হন। সে সময় তার বয়স ৩৪ বছর। তার মায়ের নাম খুলুব, ভিন্ন মতে যহরা। তার মা বাঁদি ছিলেন। তিনি কথার খিলাফ করতেন না। বাঁদি ব্যবহার করতেন না। অনেক রোযা রাখতেন এবং ইবাদত করতেন। তিনি কখনই শরাব স্পর্শ করেননি। তিনি যে বছর মসনদে আরোহণ করেন সে বছর মদীনা শরীফের সবুজ গম্বুজ ভারী বর্ষণ এবং বজ্রপাতের আওয়াজে ভেঙে যায়। এ গম্বুজকে বাগদাদের মুকুট মনে করা হতো।
এ বছর বুহকিম তুর্কী নিহত হওয়ায় তার স্থানে কুর্তগীনকে আমীরুল উমারা নিয়োগ করা হয়। এ বছর ইবনে রায়েক আক্রমণ করে। কুর্তগীন প্রতিহত করতে গিয়ে পরাজিত হয়ে লজ্জায় আত্মগোপন করলে ইবনে রায়েক তার স্থানে আমীরুল উমারা হয়ে যায়।
৩৩০ হিজরীতে বাগদাদে চরম দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে এক বস্তা গমের মূল্য দাঁড়ায় ৩১৬ দিনার। এ দুর্ভিক্ষে লোকেরা মৃত প্রাণী ভক্ষণ করে। এ বছর আবুল হাসান আলী বিন মুহাম্মাদ ইয়াযিদী হামলার মোকাবিলা করতে গিয়ে খলীফা মুত্তাকী এবং ইবনে রায়েক পরাজিত হয়ে মওছুলে চলে যান। খলীফা তাকরীয়ত শহরে পৌছুলে সেখানে সাইফুদ্দৌলা আবুল হাসান আলী বিন আব্দুল্লাহ বিন হামদান এবং তার ভাই হাসানের সাথে সাক্ষাত হয়। ইবনে রায়েককে ধোঁকায় ফেলে হত্যা করা হয়। তদস্থলে খলীফা হাসান বিন হামদানকে নাসিরুদ্দৌলা উপাধি দিয়ে সাইফুদ্দৌলা এবং নাসিরুদ্দৌলা দুই ভাইকে নিয়ে খলীফা বাগদাদ রওনা করেন। ওদিকে সাইফুদ্দৌলা মাদায়েনের কাছে ইয়াযিদীর মোকাবিলা করে। তীব্র লড়াই হয়। অবশেষে ইয়াযিদী পরাজিত হয়ে ওসেতে পালিয়ে যায়।
৩৩১ হিজরীতে রোমানরা আরযান শহরে চড়াও হয়ে সেখানে গণহত্যা চালায়। এ বছর ওসেত-এ উমারা সাইফুদ্দৌলার উপর আক্রমণ চালায়। ওদিকে তওযুন ওয়াসিতা থেকে বাগদাদে এলে সাইফুদ্দৌলা মওসুলে চলে যায়। তওযুন রমযান মাসে বাগদাদে আসে। মুত্তাকী তাকে আমীরুল উমারা খেতাব দেয়। মুত্তাকী ইবনে হামদানের নিকট সাহায্য চেয়ে পত্র লিখলে সে এক সুবিশাল বাহিনী নিয়ে এসে পড়ায় তওযুন পরাজিত হয়। খলীফা মিসরের আমীর আখশাদের সাহায্য চেয়ে পত্র লিখায় বনূ হামদুন রাগান্বিত হয়ে পড়ে। অবশেষে খলীফা তওযুনকে সন্ধি করার প্রস্তাব দিলে সে তা গ্রহণ করে।
৩৩৩ হিজরীর মুহাররম মাসের চার তারিখে মুত্তাকী রুকা থেকে বাগদাদের উদ্দেশে যাত্রা করেন। তওযুন খলীফাকে স্বাগত জানাতে বাইরে আসে। তওযুন খলীফা এবং ইবনে মুকালা-যে খলীফার সাথে ছিল দু'জনকেই সে বন্দী করে খলীফার চক্ষুদ্বয় উপড়ে ফেলে তাকে বাগদাদে পৌছে দেয়। সেখানে তার আংটি, চাদর ও লাঠি ছিনিয়ে নেওয়া হয়। অতঃপর তওযুন বাগদাদে এসে আব্দুল্লাহ বিন মুকতাফীর নিকট খিলাফতের বাইআত করে এবং তাকে মুসতাকফী বিল্লাহ লকব দেওয়া হয়। মুত্তাকী নিজেও ক্ষতবিক্ষত হয়ে তার বাইআত গ্রহণ করেন। মুত্তাকীকে বন্দী রেখে ২৫ বছর পর ৩৫৭ হিজরীর শাবান মাসে তিনি মুক্তি পান।
📄 আল-মুসতাকফী বিল্লাহ
আল-মুসতাকফী বিল্লাহ আবুল কাসিম আব্দুল্লাহ বিন মুকতাফী বিন মুতাযদ ইমলাহুন্নাস নামক বাঁদির গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। মুত্তাকী অপসারিত হওয়ার পর ৩৩৩ হিজরীর সফর মাসে ৪১ বছর বয়সে তিনি খিলাফত লাভ করেন। এ বছরেই তওযুন পরলোক গমন করলে তারই সহচর আবু জাফর বিন শিরযাদকে আমীরুল উমারা নিয়োগ করেন। খলীফা তাকে খিলআত প্রদান করেন। অতঃপর আহমদ বিন বুয়া বাগদাদে এলে ইবনে শিরযাদ আত্মগোপন করে। ইবনে বুয়া বিনা বাধায় দারুল খুলাফায় প্রবেশ করে খলীফার সামনে গিয়ে বসে পড়ে। খলীফা তাকে মা'যাদ্দৌলা লকবসহ খিলআত প্রদান করেন। অতঃপর তিনি তার দ্বিতীয় ভাই আলীকে ইমাদুদ্দৌলা এবং তৃতীয় ভাই হাসানকে রুকনদ্দৌলা উপাধি দেন। আর তিনি ইমামুল হক লকব ধারণ করে ফরমান জারি করেন।
কিছুদিন পর প্রশাসন মাযাদ্দৌলার হাতে জিম্মি হয়ে পড়লে সে খলীফার দৈনিক খরচের জন্য পাঁচ হাজার দিরহাম ভাতা নির্ধারণ করে দেয়। মাযাদ্দৌলা দায়লামীদের মধ্যে সাম্রাজ্যের প্রথম নায়েব। সে-ই সর্বপ্রথম খারাজ আদায়ের জন্য লোক নিয়োগ করে। সে লোকদের মাঝে সন্তরণ বিদ্যার খাহেশ পয়দা করে। সে নৌকা চালনা প্রতিযোগিতার প্রবর্তন করে।
কিছুদিন পর খলীফা সম্পর্কে মাযাদ্দৌলার খারাপ ধারণা জন্ম নেয়। ৩৩৪ হিজরীর জামাদিউল আখের মাসের কোনো একদিন দরবার বসল, সভাসদবর্গ স্ব স্ব আসনে উপবেশনরত। তখত অলংকৃত করে বসে আছেন খলীফা মুসতাকফী। দায়লামী সম্প্রদায়ের দু'জন লোক তখতের দিকে এগিয়ে গেল। হাতে চুমু দিবে ভেবে খলীফা তাদের দিকে হস্ত প্রসারিত করলে হাত ধরে টেনে তারা খলীফাকে নিচে ফেলে দিল। অতঃপর তারা তার পাগড়ি দিয়ে খলীফাকে বেঁধে রেখে অন্দর মহল অবাধে লুণ্ঠন করে। ওদিকে মাযাদ্দৌলা স্বীয় আলয়ে অবস্থান করে। তারা মুসতাকফীকে পায়ে হেঁটে আপন কক্ষে নিয়ে যায়। অতঃপর তাকে খিলাফত থেকে সরে দাঁড়াতে বলে এবং তার চক্ষুদ্বয় খুলে নেয়। সে সময় তার খিলাফতের বয়স হয়েছিল এক বছর চার মাস।
এরপর লোকেরা ফজল বিন মুকতাদরের নিকট বাইআত করলে অপারগ হয়ে তিনি তার উপর খিলাফত সোপর্দ করেন। অতঃপর মুসতাকফীকে বন্দী করা হয়। ৩৩৮ হিজরীতে তিনি জেলখানায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মুসতাকফীর ব্যাপারে এ কথা প্রসিদ্ধ যে, তিনি ছিলেন শীআ।
📄 আল-মতি বিল্লাহ
আল-মতি বিল্লাহ আবুল কাসেম আল-ফজল বিন মুকতাদর বিন মুতাযদ ৩০ হিজরীতে মাশগালা নামক বাঁদির গর্ভে জন্মগ্রহণ করে। ৩৩৪ হিজরীতে তিনি মসনদে আরোহণ করেন। মাযাদ্দৌলা দৈনিক ভাতা হিসেবে একশ দিনার খলীফার জন্য নির্ধারণ করে দেয়।
এ বছর বাগদাদে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। লোকেরা মৃত প্রাণী ভক্ষণ করে এবং পশুর বিষ্ঠা খেয়ে জীবন রক্ষার চেষ্টা চালায়। ক্ষুধার জ্বালায় অনেকেই পথের ধারে মরে পড়ে থাকত। জঠরজ্বালা নিবারণের জন্য অনেকেই কুকুরের গোশত খেত, রুটি, বাগান এবং জমি বিক্রয় হত। মাযাদ্দৌলার জন্য এক বস্তা আটা কেনা হয়। আর দামেশকে এক বস্তার বাজার দর ১৯ দিনার। এ বছর মাযাদ্দৌলা এবং নসিরুদ্দৌলার মধ্যে লড়াই হয়। মতি মাযাদ্দৌলার সাথে রণাঙ্গনে গমন করেন। ফেরার পথে মতি বন্দীদের সাথে ছিলেন। এ বছর মিসরের আমীর আখশীদ মৃত্যুবরণ করে। তার আসল নাম মুহাম্মাদ বিন ত ফারাগনী। আখশীদের অর্থ শাহানশাহ। ফারগানের সকল বাদশাহকে এ লকবে ভূষিত করা হত। যেমন তরিস্তানের বাদশাহদের ইস্পাহান্দ, জুরজানের সূল, তুর্কীদের খাকান, আশরুসানের আফসীন এবং সমরকন্দ বাদশাহদের লকব সামান। আখশীদ অত্যন্ত সাহসী লোক ছিলেন, কাহিরের যুগে তিনি মিসরের শাসনকর্তা নিয়োগ হন। তার আট হাজার গোলাম ছিল।
এ বছর পশ্চিমাঞ্চলীয় শাসনকর্তা কায়েম উবায়দী মারা যায়, তদস্থলে তদীয় পুত্র আল-মানসুর ইসমাঈল নিযুক্ত হয়। সে তার পিতা থেকেও বেশি অভিশপ্ত ছিল। সে নবীদের শানে গালি দিত। সে আলেমদের হত্যা করে। ৩৩৫ হিজরীতে মাযাদ্দৌলা মতির নিকট থেকে প্রতিজ্ঞা ও প্রতিশ্রুতি দেয় এবং তাকে দারুল খুলাফায় প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়। এ বছর মাযাদ্দৌলা আব্বাসীয় খিলাফতের দরবারে অনুরোধ জানায় যে, তার ভাই ইমাদুদ্দৌলাকে তার সহযোগী হিসেবে তাকে দেয়া হোক এবং তার মৃত্যুর পর তার ভাইকে যেন তার স্থলাভিসিক্ত করা হয়। মতি তার আবেদন মঞ্জুর করেন। কিন্তু ইমাদুদ্দৌলা এ বছরেই মারা যাওয়ায় মতি তার আরেক ভাই রুকনদ্দৌলাকে তার সহকারী বানিয়ে দেন।
৩৩৯ হিজরীতে হজরে আসওয়াদ স্ব স্থানে স্থাপন করা হয় এবং এর চারিপাশে সাত হাজার সাতশ সাড়ে সত্তর দিরহাম ওজন সমপরিমাণ রৌপ্য দিয়ে বাঁধাই করা হয়। মুহাম্মাদ বিন নাফে খাযায়ী বলেন, হজরে আসওয়াদ স্থাপনের পূর্বে আমি খুব ভালো করে দেখেছি যে, এর উপরটি কালো এবং বাকী অংশ সাদা। এটি লম্বায় এক হাত। ৩৪১ হিজরীতে একটি কওমের আবির্ভাব ঘটে যারা মৃত্যুর পর পুনঃজন্মে বিশ্বাসী ছিল। তাদের মধ্যে একজন এ দাবী করেছিল যে, আমার মধ্যে হযরত আলী (রা.)-এর রুহ দেয়া হয়েছে। তার স্ত্রী দাবী করত তার মধ্যে হযরত ফাতিমা (রা.)-এর রুহ দেয়া হয়েছে। হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর রুহের দাবী করত আরেকজন। জনতার হাতে তারা প্রহৃত হয়। এ বছর পশ্চিমাঞ্চলীয় শাসনকর্তা মানসুর উবায়দী তার প্রবর্তিত মানুরীয়া শহরে ইন্তেকাল করেন। তার উত্তরাধিকার প্রাপ্ত ছেলে সাদ 'মযদ্দীন' লকব ধারণ করে তখত নসীন হয়ে কাহেরা শহরের গোড়াপত্তন করেন। মানসুর নেককার লোক ছিলেন। তার পিতার সময় যারা অত্যাচারিত হয়েছিল তিনি তাদের খুঁজে বের করেন। লোকেরা তাকে বন্ধু ভাবাপন্ন মনে করতো। তার ছেলে সাদও নেককার ছিলেন। তার সময় গোটা পশ্চিমাঞ্চল তার অধীনে চলে আসে।
৩৪৩ হিজরীতে খুরাসানের শাসনকর্তা মতির নামে খুতবা পাঠ করেন। এ খবর পেয়ে মতি তাকে খিলআত প্রদান করেন। ৩৪৪ হিজরীতে মিসরে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়। এতে অনেক ভবন বিধ্বস্ত হয়। এর স্থায়িত্ব ছিল তিন ঘণ্টা। এ থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য লোকেরা অত্যন্ত বিনয়ের সাথে প্রার্থনা করে। ৩৪৬ হিজরীতে সমুদ্রের পানি আশি হাত উঁচু হয়ে যায়। ফলে পর্বতগুলো দ্বীপে পরিণত হয়। রায় এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে ভূমিকম্প হয়। ফলে তালকান শহর সমূলে বিধ্বস্ত হয়। এতে ত্রিশজন লোক ছাড়া শহরের সকলে নিহত হয়। রায়-এর উপকণ্ঠে দেড় শত গ্রাম লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। হালওয়ানের অধিকাংশ ধসে পড়ে। মৃত মানুষের হাড়ে সয়লাব হয়ে যায় নগর-জনপদ। মাটি ফেটে ঝরনাধারার সৃষ্টি হয়। রায়-এর একটি পাহাড় ভেঙে খানখান হয়ে যায়। জায়গায় জায়গায় যমীন ফেটে চৌচির হয়ে যায় এবং গর্তের সৃষ্টি হয়। এ সব ফাটল এবং গহ্বর থেকে পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি বের হয়। আবার কোনগুলো থেকে শুধু ধোঁয়া নির্গত হতে থাকে। এটি ইবনে জাওযী কর্তৃক বর্ণিত। ৩৪৭ হিজরীতে আবার ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানীর ফলে পৃথিবীতে রোগ ছড়িয়ে পড়ে।
৩৫০ হিজরীতে মাযাদ্দৌলা বাগদাদে এক সুবিশাল প্রসাদ নির্মাণ করে। এর ভিত ছিল ৩৬ হাত নিচে প্রথিত। গভীর ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে এ বছর আবুল আব্বাস আব্দুল্লাহ বিন হাসান বিন শাওয়ারিব বিচারপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ বছর রোমানরা আফরিতশ দ্বীপটি দখল করে নেয়, যা ২৩০ হিজরী থেকে মুসলমানরা শাসন করত। এ বছর স্পেনের শাসনকর্তা নাসিরুদ্দীনিল্লাহ ইন্তেকাল করেন। তদস্থলে তার ছেলে তখতে আরোহণ করেন। ৩৫১ হিজরীতে শীআরা মসজিদের দরজায় দরজায় এ কথাগুলো লিখেছিল- (হযরত) মুআবিয়া (রা.)-এর উপর অভিশাপ। যারা হযরত ফাতিমা (রা.)-এর হক ফিদকের বাগান আত্মসাৎ করেছে তাদের প্রতি লানত। যারা ইমাম হাসান (রা.) কে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পার্শ্বে সমাহিত হতে দেয়নি তাদের উপরও অভিশাপ। যারা হযরত আবু যর (রা.)-কে বহিষ্কার করেছে তাদের প্রতিও লানত। রাতে কোন এক ব্যক্তি এ লেখাগুলো মিশে দেয়। সকালে মাযাদ্দৌলা আবার এগুলো লিখতে চাইলে উযীর মাহলাবী বলল, কথাগুলো এমন হওয়া উচিত যে, নবী পরিবারের উপর অত্যাচারকারীদের প্রতি আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক এবং হযরত মুআবিয়া (রা.)-এর উপর স্পষ্টভাবে অভিশাপ বর্ষণের কথা লিখতে বলল, বস্তুত তাই লিখা হল।
৩৫২ হিজরীতে মাযাদ্দৌলা আশুরার দিন দোকান-পাট বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়। বাবুর্চিদের রান্নাবান্না করতে নিষেধ করে। মেয়েরা মাথার চুল খুলে নিজের মুখে আঘাত করে হায় হোসেন বলে মাতম করে। বাগদাদে এটাই প্রথম দিন যে দিন সর্বপ্রথম সেখানে বিদআত হয়। কিছু দিন তা চালু ছিল। সংবাদ পেয়ে খলীফা মতি জানাযায় অংশ গ্রহণ করতে মাযাদ্দৌলার বাসবভনে হাওজায় আরোহণ পূর্বক আসে। এ কথা জানতে পেয়ে মাযাদ্দৌলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে মাটিতে তিনবার চুমু দিয়ে খলীফাকে কষ্ট করে এসে জানাযায় শরীক হতে বারণ করেন। ফলে খলীফা প্রাসাদে ফিরে যান। এ বছর ১২ যিলহজ তারিখে জাঁকজমকভাবে বাঁশি বাজিয়ে ঈদ করা হয়। ৩৫৩ হিজরীতে সাইফুদ্দৌলার জন্য ২৪/২৫ হাত উঁচু তাঁবু নির্মাণ করা হয়। ৩৫৪ হিজরীতে মাযাদ্দৌলার বোন ইন্তেকাল করে। এ বছর রোমান সম্রাট ইয়াকুব মুসলমানদের শহরের পার্শ্বে কায়সারীয়া শহর আবাদ করেন। ৩৫৬ হিজরীতে মাযাদ্দৌলার অন্তর্ধানে তার ছেলে বখতিয়ারকে "আয্যাদ্দৌলা" উপাধি দিয়ে তদস্থলে নিয়োগ করা হয়। ৩৫৭ হিজরীতে কারমতী দামেশক দখল করে। সিরিয়া ও মিসরের লোকদের হজ্ব বন্ধ করে দেয়। আবার মিসর আক্রমণের পরিকল্পনা করলে বনু উবায়েদ সম্প্রদায় তাদের প্রতিহত করার আগেই তারা মিসর দখল করে। এদিকে শীআরা আকলীম, মিশর এবং ইরাকে নিজেদের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করে। তারা খুতবা থেকে বনু আব্বাসের নাম বাদ দেয়। কালো কাপড় পরতে মানা করে। খতীবদের সাদা কাপড় পরতে আদেশ করে এবং এ শব্দগুলো দিয়ে খুতবা পাঠ করে- "اللهم صلى على محمد المصطفي وعلي على المرتضي وعلي فاطمة البতুল وعلي الحسن وعلي الحسين سط الرسুল وصل علي الائمة اباء أمير المنومنين المعز بالله"
৩৬১ হিজরীতে মিসরে আযানের মধ্যে حي علي خير العمل - এ শব্দটি বৃদ্ধি করা হয়। এ বছর জামে আযহারের ভিত্তি দেয়া হয়। আর তা ৩৬১ হিজরীর রমযান মাসে শেষ হয়। এ বছর ইরাকে একটি তারকা বিকট আওয়াজে পতন হয় এবং পৃথিবীময় সূর্যের ন্যায় আলো ছড়িয়ে পড়ে। ৩৬২ হিজরীতে বখতিয়ার খলীফার উপর কর আরোপ করে। এ কথা শুনে খলীফা মতি, বখতিয়ারকে বললেন, তুমি যদি এটাই চাও যে তাহলে আমি স্বেচ্ছায় নিজ গৃহে আবদ্ধ হয়ে থাকব এবং সর্বস্ব বর্জন করব। এরপরও বখতিয়ার খলীফার প্রতি চাপ অব্যাহত রাখে। ফলে খলীফা নিজ গৃহের আসবাবপত্র বেচে চার লাখ দিরহাম মতির হাতে তুলে দেন। এ কথা জনতার মুখে মুখে ছড়িয়ে যায়। তারা বলতে থাকে খলীফাকেও কর দিতে হচ্ছে। এ বছর বখতিয়ারের গোলাম নিহত হওয়ায় তার উযীর আবুল ফজল শিরাযী এর বদলাস্বরূপ বাগদাদের এক দিকে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে অনেক ঘর-বাড়ি, সম্পদরাজি এবং বনী আদম পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়। এই অভিশপ্ত উযীরও আগুনে পুড়ে মরে। এত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড বাগদাদে আর কখনই হয়নি।
৩৬৩ হিজরীতে মতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ বিন শায়বান হাশিমীকে কাযীউল কুযযাতের দায়িত্ব দিতে চাইলে তিনি তা গ্রহণে অসম্মতি জানান। মতি শর্তাবলীর দীর্ঘ ফিরিস্তি প্রস্তুত করেন। এ পদের কোনো পারিশ্রমিক তিনি নিবেন না। কোন প্রকার খিলাফত গ্রহণ করবেন না। শরীয়ত বিরোধী সুপারিশও তার নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না। তার কেরানীর জন্য মাসিক তিনশ দিনার, পুলিশের জন্য দেড়শ দিনার, আহকাম জারিকারীর একশ দিরহাম, কোষাগার এবং দফতরীর জন্য সাতশ দিরহাম বেতন দেয়া হয়। ৩৬৩ হিজরীতে অর্ধাঙ্গ রোগে আক্রান্ত হয়ে মতির কথায় জড়তার সৃষ্টি হয়। ইখতিয়ার তার প্রহরী সবক্তগীন মারফত বলে পাঠায় যে, তিনি যেন খিলাফতের দায়িত্ব তদীয় পুত্র আল-তয়েলিল্লাহ-এর উপর অর্পণ করেন। তিনি তাই করেন। ৩৬৩ হিজরীর যিলকাদা মাসের ২৩ তারিখ বুধবারে মতি তার পুত্র তয়ে-এর উপর খিলাফত অর্পণ করেন। মতি ২৯ বছর কয়েক মাস রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। অতঃপর প্রধান বিচারপতি শায়খুল ফাযেল লকব দিয়ে মতিকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়। মতি তার ছেলেকে নিয়ে ওসেত গমন করেন। সেখানে ৩৬৪ হিজরীর মুহাররম মাসে তিনি ইন্তেকাল করেন।
মতির যুগে নিম্নবর্ণিত ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন- খারকী শায়খে হাম্বলী, আবু বকর শিবলী, ইবনে কাযী, আবু রাযা, আবু বকর সৃলী, হাছিম বিন কালীব, আবু লতীব, আবু জাফর, আবু নসর ফারাবী, আবু ইসহাক মরুযী, আবুল কাসেম দিনুরী, আবু বকর যবয়ী, আবুল কাসিম তুনুখী, ইবনে হুদা, আবু আলী বিন আবু হুরায়রা, আবু উমর মাসউদী, ইবনে দরসতুয়া, আবু আলী তাবারী, ফাকেহী, কবি মুতানাব্বী, ইবনে হিব্বান, ইবনে শাবান, আবু আলী আল-কানী, আবুল ফরাহ প্রমুখ।