📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 আল-মুতাদ বিল্লাহ

📄 আল-মুতাদ বিল্লাহ


আল-মুতাযদ বিল্লাহ আহমদ আবুল আব্বাস বিন মুফিক তলহা বিন মুতাওয়াক্কিল বিন মুতাসিম বিন হারুন রশীদ ২৪২ হিজরীর যিলকদা মাসে, সূলীর মতে ২৪৩ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসে সাওয়াব অথবা হরজ অথবা যরার নামক বাঁদির গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। স্বীয় চাচা মুতামাদের পর ২৭৯ হিজরীতে তিনি খিলাফতের তখতে উপবেশন করেন।

বনূ আব্বাসের খলীফাদের মধ্যে মুতাযদ সুদর্শন, সাহসী, নির্ভীক, জ্ঞানী এবং বুদ্ধিমান। বীরত্বের কারণে তিনি একাই বাঘের সঙ্গে লড়াই করতেন। তিনি রেগে গেলে খুব কম ক্ষমা করতেন। অপরাধীদের জীবন্ত পুঁতে ফেলতেন। তিনি ঝানু রাজনীতিবিদ ছিলেন।

আব্দুল্লাহ বিন হামদুন বলেন, একদা মুতাযদ শিকার করতে যান। আমিও সঙ্গে ছিলাম। ক্ষীরা বা শশার ক্ষেত অতিক্রম করার সময় ক্ষেতের পাহারাদাররা ফরিয়াদ জানাল। মুতাযদ বললেন, কি হয়েছে? তারা বলল, তিনজন গোলাম এসে আমাদের ফসল নষ্ট করে দিয়েছে। অতঃপর তিনি গোলামদের ডেকে এনে ক্ষেতের এক পার্শ্বে হত্যা করেন। কয়েক দিন পর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, সত্য করে বলতো লোকেরা আমার প্রতি কেন সন্তুষ্ট নয়? বললাম, আপনি রক্ত পিপাসু তাই। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, আমি খিলাফতের তখতে উপবেশন করার পর থেকে কোনো দিন অবৈধ রক্তপাত করিনি। বললাম, আহমদ বিন তয়্যবকে কেন হত্যা করেছেন? তিনি বললেন, সে আমাকে বক্রতার দিকে আহ্বান করতে চাইছিল। বললাম, সেই তিন গোলামকে কেন হত্যা করলেন? তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, অনুসন্ধান ছাড়া আমি তাদের হত্যা করিনি, তারা হত্যাকারী এবং চোর ছিল।

কাযী ইসমাঈল বলেন, আমি মুতাযদের কাছে গিয়ে দেখলাম তার পেছনে কয়েকজন রোমান সুন্দরী যুবতী দাঁড়িয়ে আছে। চলে আসার সময় তিনি বললেন, কাযী সাহেব! খারাপ ধারণা করবেন না। আল্লাহর কসম! আমি আজ পর্যন্ত কখনই হারাম কাজের জন্য কোমরের দড়ি খুলিনি। একদিন আমি তার কাছে গেলাম। তিনি আমার দিকে এক টুকরো কাগজ নিক্ষেপ করেন। এতে লিখা রয়েছে- কতিপয় আলেম এক স্থানে একত্রিত হয়ে হালালকে হারাম এবং হারামকে হালালের ফতোয়া দিয়েছে। বাদশাহর অবর্তমানে তারা এর উপর আমল করবে। আমি বললাম, তারা বেদ্বীন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তারা বেদ্বীন না মিথ্যাবাদী? বললাম, যারা মদকে মোবাহ এবং মুতাআকে মোবাহ মনে করে না এবং যারা মুতাআকে মোবাহ এবং গানকে মোবাহ বলে না এরা কি পথভ্রষ্ট নয়? আর যে আলেমদের ত্রুটি নিয়ে উপহাস করবে সে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠা পাবে না। এ কথা শুনে মুতাযদ সঙ্গে সঙ্গে কাগজটি পুড়ে ফেলার নির্দেশ দেন।

মুতাযদ প্রতিটি রণাঙ্গনে অব্যর্থ ও সফল। লোকেরা তাকে ভয় পেত। ফলে নতুন ফেতনা মাথাচাড়া দিতে পারত না; বরং অনেক ফেতনা এমনিতেই প্রতিহত হয়। তিনি খারাজ হ্রাস এবং শুল্ক মওকুফ করেন। তিনি সুশাসন ও ন্যায় বিচারের সুবাতাস বয়ে দেন। প্রজাদের উপর আরোপিত অত্যাচার বিদূরিত করেন। বন্ আব্বাসের খিলাফতের ভিত্তি অপরিচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। বনূ আব্বাসের খিলাফতের ইমারতকে রক্ষা করায় তিনি দ্বিতীয় সাফফাহ নামে প্রসিদ্ধ।

তিনি পথে ঘাটে গান বাজনা পথ নাট্য করার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তিনি লোকদের ঈদুল আযহার নামায পড়াতেন। তিনি প্রথম রাকাআতে ছয় তাকবীর এবং দ্বিতীয় রাকাআতে এক তাকবীর বলতেন। তবে তিনি নিজে কোন খুতবা পড়তেন না।

২৮০ হিজরীতে তিনি কায়রো যান এবং আফ্রিকার গভর্নরের সাথে তার লড়াই হয়। এ বছর দেবল থেকে সূর্যগ্রহণের সংবাদ আসে। এ বছর শাওয়াল মাসে দেবলে সূর্যগ্রহণ লাগে। ফলে আসর পর্যন্ত অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল। এরপর কালো আধার নেমে আসে- যা প্রথম রাত পর্যন্ত ছিল। এরপর ভূমিকম্প হয়। এতে শহরের ব্যাপক ক্ষতি সাধন হয়। বিধ্বস্ত ভবনের নিচ থেকে আনুমানিক লক্ষাধিক বনী-আদমকে উদ্ধার করা হয়।

২৮১ হিজরীতে রোমের মুকুরিয়া শহর বিজিত হয়। এ বছর রায় এবং তবরিস্তানে পানির সংকট দেখা দেওয়ায় এক রিতল পানির মূল্য দাঁড়ায় এক দিরহাম, লোকেরা দুর্ভিক্ষের কারণে মৃত প্রাণী খেতে শুরু করে। এ বছর তিনি মক্কার দারুন নদওয়া ভেঙে মসজিদে হারামের পার্শ্বে আরেকটি মসজিদ নির্মাণ করেন।

২৮২ হিজরীতে মুতাযদ কাবীহার রেওয়াজসমূহ নিষিদ্ধ করেন। নওরোজের দিন আগুন জ্বালানো এবং লোকদের গায়ে পানি ছিটানোর প্রথা রহিত করেন। এটা ছিল অগ্নিপূজকদের রীতি। এ বছর তিনি কতর আল-নাদা বিনতে খামারুয়া বিন আহমদ বিন তুলুনকে বিয়ে করেন। সে রবিউল আউয়াল মাসেই পৃথক হয়ে যায়। বিয়ের সময় কতর আল-নাদা পৃত্যালয় থেকে চার হাজার কমরবন্দ এবং দশ সেন্দুক ভর্তি মনিমুক্তা নিয়ে স্বামীর ঘরে আসেন।

২৮৩ হিজরীতে গর্ভের বাচ্চাকেও মিরাছ প্রদানের নির্দেশ দেন। এ লক্ষ্যে তিনি পৃথক একটি দফতর প্রতিষ্ঠা করেন। এ আইনটি জনতার অভিনন্দন কুড়ায় এবং তারা খলীফার জন্য দু'আ করে।

২৮৪ হিজরীতে মিসরে এক প্রকার গভীর লাল বর্ণের প্রকাশ ঘটে। এতে মানুষের চেহারা এবং দেয়ালগুলো পর্যন্ত লাল হয়ে যায়। ফলে তারা অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এ থেকে পরিত্রাণের জন্য দু'আ করলে এ লাল বর্ণটি আসর থেকে রাত পর্যন্ত থাকে।

ইবনে জারীর বলেন, ২৮৪ হিজরীতে মুতাযদ মিম্বরে দাঁড়িয়ে হযরত মুআবিয়া (রা.)-এর প্রতি অভিশাপ বর্ষণের জন্য ফরমান জারি করতে চাইলে তার উযীর ওবাইদুল্লাহ বাধা দিয়ে বললেন, এতে মুসলিম মিল্লাতের মাঝে ক্ষোভের সঞ্চার হবে। কিন্তু তিনি তার কথা শুনলেন না। আহকাম জারি করলেন। হুকুম নামায় তিনি হযরত আলী (রা.)-এর প্রশংসা এবং হযরত মুআবিয়া (রা.)-এর দোষত্রুটি বিধৃত করেন। এটা দেখে কাযী ইউসুফ বললেন, আমিরুল মুমিনীন! আপনার এ কাজে ফিতনা সৃষ্টির আশংকা রয়েছে। আপনি এমনটি করবেন না। তিনি বললেন, এর উপায় হিসেবে আমার নিকট আমার তলোয়ার রয়েছে। কাযী সাহেব বললেন, আর আপনি আলী পরিবারের জন্য কি উপায় বের করবেন? তাদের বিচরণ তো জ্ঞানের শেষ সীমানা পর্যন্ত। তারা যদি তাদের অধিকারের কথা শুনে লোকদের হাতে তলোয়ার তুলে দেয়? এ কথা শুনে তিনি স্বীয় ইচ্ছা প্রত্যাখ্যান করেন।

২৮৫ হিজরীতে বসরায় এক প্রকার হলুদ বর্ণের অন্ধকার দেখা দেয়। অতঃপর তা ক্রমান্বয়ে সবুজ এবং কালো বর্ণ ধারণ করে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর আকাশ থেকে দেড়শ' দিরহাম ওজনের একটি চাদর পড়ে। প্রবল ঝড়ে পাঁচ শতাধিক বৃক্ষ উপড়ে যায়। তারপর আসমান থেকে সাদা-কালো পাথর বর্ষিত হয়।

২৮৬ হিজরীতে বাহরাইনে আবু সাঈদের আবির্ভাব ঘটে, সে হজরে আসওয়াদ উপড়ে ফেলে। খলীফার সৈন্যদের সাথে তার লড়াই হয়। তারা পরাজিত হলে সে বসরা এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ তার হস্তগত হয়।

খতীব এবং ইবনে আসাকির আবুল হুসাইন আল-খারীবী থেকে রেওয়ায়েত করেন, একদা মুতাযদ কাযী আবু হাযিমের নিকট বলে পাঠালেন যে, অমুক ব্যক্তি আমার নিকট থেকে কর্জ নিয়েছে। আমি আপনার আদালতের মাধ্যমে আমার পাওনা ফিরে পেতে চাই। কাযী সাহেব বলে পাঠালেন, আমিরুল মুমিনীন! আল্লাহ্ তা'আলা আপনার হায়াত দারাজ করুন। আপনার স্মরণ আছে যে, আপনি আমার কাঁধে এ দায়িত্ব অর্পণের পর বলেছিলেন, আজ থেকে আদালতের এ কর্তব্য তোমার উপর বর্তাবে। অতএব সাক্ষী ছাড়া আপনার অভিযোগ কিভাবে বিশুদ্ধ হিসেবে মেনে নেয়া যেতে পারে? তিনি জানিয়ে দিলেন যে, অমুক অমুক আমার সাক্ষী। কাযী সাহেব তাদের পাঠিয়ে দিতে বললেন। খলীফার সাক্ষীদ্বয় কাযীর সামনে এসে ভয়ে বিষয়টি অস্বীকার করলে কাযী সাহেব খলীফার অভিযোগ খারিজ করে দেন।

ইবনে হামদুন নাদীম বলেন, মুতাযদ তার খাস বাঁদি এবং বিশেষ করে তার প্রিয়তমা দারীরাহকে নিয়ে উপসাগরে ষাট হাজার দিনার ব্যয়ে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করে বসবাস করার ইচ্ছা করেন। কিন্তু কিছুদিন পর দারীরাহ পরলোক গমন করায় তিনি দারুণ ব্যথিত হন।

২৮৯ হিজরীতে মুতাযদ জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে রবিউল আখের মাসের ২২ তারিখ সোমবারে ইন্তেকাল করেন। মাসউদী বলেন, মুমূর্ষু অবস্থায় একজন ডাক্তার এসে তার নাড়ীতে হাত দিলে তিনি জোরে লাথি দেন। এতে ডাক্তারের মৃত্যুর পরই তার মৃত্যু হয়।

মুতাযদ অনেক কবিতা জানতেন। তিনি চার পুত্র এবং এগারো জন কন্যা রেখে যান। তার শাসনামলে নিম্ন বর্ণিত ওলামাগণ ইন্তেকাল করেন- ইবনুল মাওয়াযী আল-মালেকী, ইবনে আবীদদুনিয়া, কাযী ইসমাঈল, হারেছ বিন আবু উসামা, আবুল আইনা মুবার্রদ, আবু সাঈদ, কবি নাহতারী প্রমুখ।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 আল-মুকতাফী বিল্লাহ

📄 আল-মুকতাফী বিল্লাহ


আল-মুকতাফী বিল্লাহ আবু মুহাম্মদ আলী বিন মুতাযদ ২৬৪ হিজরীর রবিউল আখের মাসের মাঝামাঝিতে জীজক নামক তুর্কী বাঁদীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দৃষ্টান্তহীন সুদর্শন ছিলেন। পিতা মুতাযদের খিলাফতকালেই তিনি উত্তরাধিকার মনোনীত হন। পিতার অসুস্থতার সময় ২৮৯ হিজরীর রবিউল আখের মাসের ১৯ তারিখে আসর নামাযের পর লোকেরা তার বাইআত করে।

সূলী বলেন, খলীফাদের মধ্যে তার নামটি হযরত আলী ছাড়া আর কারো ছিল না। ইমাম হাসান বিন আলী, হাদী এবং মুকতাফী ব্যতীত 'আবু মুহাম্মাদ' কারো কুনিয়ত ছিল না। মুতাযদের মৃত্যুর সময় মুকতাফী রাকা শহরে অবস্থান করছিলেন। তার অনুপস্থিতিতে উযীর আবুল হাসান কাসিম বিন উবায়দুল্লাহ তার পক্ষ থেকে বাইআত গ্রহণ করেন। তাকে খবর দেয়া হলে তিনি জমাদিউল আখের মাসের ৭ তারিখে দজলা নদী দিয়ে জাহাজ যোগে বাগদাদ এসে পৌছেন। তার আগমনে বাগদাদবাসী খুশি হয়ে তাকে স্বাগত জানায়। তিনি তখত নসীন হওয়ার পর তার পিতা লোকদের কাছ থেকে যেসব ঘর-বাড়ি দখল করেছিল তিনি সেগুলো ভেঙে তদস্থলে মসজিদ নির্মাণ করেন। যেসব বাগান এবং দোকান নেয়া হয়েছিল তিনি তা মালিকদের নিকট ফিরিয়ে দেন। এতে তিনি জনতার চোখে মহানুভবতায় পরিণত হন। লোকেরা তার জন্য দু'আ করতে থাকে।

এ বছর বাগদাদে প্রচণ্ড ভূমিকম্প হয়। এর প্রকোপ কয়েক দিন পর্যন্ত থাকে। বসরায় তীব্র ঝড়ের কারণে অনেক বৃক্ষ উপড়ে পড়ে। যার দৃষ্টান্ত পূর্ববর্তী ইতিহাসে বিরল। ইয়াহইয়া বিন যাকরুয়া কারমতীর সাথে শাহী সৈনিকদের দীর্ঘ যুদ্ধ হয়। অবশেষে ২৯০ হিজরীতে সে মারা গেলে তদস্থলে তার ভাই হুসাইন 'আমিরুল মুমিনীন মাহদী' উপাধি ধারণ করে নেতৃত্ব দেন। তার চেহারায় একটি দাগ ছিল। সেও ২৯১ হিজরীতে নিহত হন।

২৯১ হিজরীতে ইনতালিয়া প্রচুর মালে গনীমতসহ বিজিত হয়। ২৯৩ হিজরীতে দজলা নদী ফুলে-ফেঁপে এমন তরঙ্গের সৃষ্টি করে যার আকস্মিক আঘাতে বাগদাদের অধিকাংশ অংশ ধসে পড়ে। সেদিন বাগদাদের রাজপথে ২১ হাত পানি জমা হয়।

সূলী বলেন, আমি মুকতাফীর নিকট থেকে শুনেছি, তিনি মুমূর্ষু অবস্থায় বলেন, আল্লাহর কসম! আমি সেই সাত শ' দিনারের জন্য দারুণ ভীত- যা মুসলমানদের সম্পদ আমি ব্যয় করেছি। আমার ভয় হচ্ছে কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা'আলা যেন এ ব্যাপারে কোন প্রশ্ন না করেন। এ ভুলের জন্য আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

তিনি ২৯৫ হিজরীর যিলকাদা মাসের ২২ তারিখ রবিবার রাতে যুবক কালেই ইন্তেকাল করেন। আট ছেলে এবং আট মেয়ে রেখে তিনি মারা যান।

তার যুগে যেসব ওলামা হযরত মৃত্যুবরণ করেন তাঁরা হলেন- আব্দুল্লাহ বিন আহমদ বিন হাম্বল, ইমামুল আরাবী কানবাল মাকরী, মুফতী আবু আব্দুল্লাহ বুসানজী, মুসনাদের লেখক বায্যার, আবু মসনদ আল-কুযী, কাযী আবু হাযিম, সালেহ জুযাহ, মুহাম্মাদ বিন নসরুল মরুযী, আবু হুসাইন নূরী, আবু জাফর তিরমিযী প্রমুখ।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 আল-মুকতাদার বিল্লাহ

📄 আল-মুকতাদার বিল্লাহ


২৮২ হিজরীর রমযান মাসে গারীব নামক রোমান অথবা তুর্কী বাঁদির গর্ভে আল-মুকতাদার বিল্লাহ আবুল ফজল জাফর বিন মুতাযদ জন্মগ্রহণ করেন। অন্তিম শয্যায় মুকতাফীকে পরবর্তী খলীফা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে মুকতাদার সে সময় বালেগ হওয়ায় তিনি তাকে উত্তরাধিকার মনোনীত করেন। মুকতাদার তেরো বছর বয়সে খিলাফতের তখতে সমাসীন। তিনিই বয়সের দিক দিয়ে সর্ব কনিষ্ঠ খলীফা। উযীর আব্বাস বিন হাসান তাকে বাচ্চা ভেবে তার বাইআত থেকে সরে দাঁড়ানোর মতামত ব্যক্ত করলে লোকেরা সমর্থন জানিয়ে আব্দুল্লাহ বিন মুতায-এর প্রস্তাব করে। জানতে পেয়ে আব্দুল্লাহ বিন মুতায বলল, রক্ত ঝরার আশঙ্কা না থাকার শর্তে আমি খিলাফত গ্রহণ করব। সংবাদ পেয়ে মুতাকাদ বিপুল পরিমাণ সম্পদের বিনিময়ে আব্দুল্লাহকে সন্তুষ্ট করায় আব্দুল্লাহ খিলাফত প্রত্যাখ্যান করে।

জনগণ এ প্রক্রিয়া মেনে না নেয়ায় ২৯২ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসের বিশ তারিখে ফুটবল খেলারত অবস্থায় জনতা মুকতাদারের উপর আক্রমণ করে বসলে তিনি ঘরের মধ্যে গিয়ে আত্মগোপন করেন। লোকেরা আব্দুল্লাহ বিন মুতাযাদকে ডেকে আনলে সামরিক অফিসারগণ, বিচারকমণ্ডলী, রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ এবং শহরের অভিজাত শ্রেণীর নাগরিকরা তার হাতে বাইআত করেন এবং তাকে গালিব বিল্লাহ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। অতঃপর মুহাম্মাদ বিন দাউদ বিন জাররাহকে উযীর এবং আবুল মুছনা আহমদ বিন ইয়াকুবকে কাযী পদে নিয়োগ দানে নতুন খলীফার নামে আহকাম জারি হতে থাকে।

মাআফী বিন যাকারিয়া জারীরী বলেন, মুকতাদারকে অপসারণ করে ইবনে মুতাযের বাইআত গ্রহণের পর লোকেরা মুহাম্মাদ বিন জারীর তাবারীর নিকট এলে তিনি নতুন উযীর এবং কাযীর নাম জানতে চাইলেন। তারা বলল, মুহাম্মাদ বিন দাউদ বিন জাররাহ হলেন উযীর, আর আবুল মুছনা আহমদ বিন ইয়াকুব হলেন কাযী। তিনি বললেন, এ কাজ পূর্ণতা পায়নি। তারা বলল, আপনি কি এদের যোগ্য মনে করছেন না?

বাইআতের পর ইবনে মুতায মুকতাদারকে দারুল খুলাফা ছেড়ে দেবার কথা বলে পাঠালে মুকতাদার বললেন, বিনা চেষ্টায় কেন তা ছেড়ে দিব? মুকতাদার তার পক্ষের কতিপয় লোককে অস্ত্র সজ্জিত করলেন। আল্লাহ তা'আলা ইবনে মুতাযের বাহিনীতে ভীতি ছড়ায়ে দিলেন। ইবনে মুতায তার উযীর ও কাযীকে নিয়ে পালিয়ে গেল। বাগদাদে কতলে আম (গণহত্যা) আরম্ভ হল। যেসব ফকীহ এবং আমীরগণ মুকতাদারকে অপসারণ করেছিল তাদের বন্দী করে ইউসুফের নিকট সোপর্দ করা হলে তিনি তাদের মধ্য থেকে চারজন বাদে যাদের মধ্যে কাযী আবু উমর ছিল সকলকে হত্যা করেন। ইবনে মুতাযকে বন্দী করে জিন্দানখানায় পাঠানো হয়। কয়েক দিন পর সে লাশ হয়ে বেরিয়ে আসে।

অতঃপর মুকতাদার আবুল হাসান আলী বিন মুহাম্মাদ বিন ফরাতকে উযীর নিয়োগ করেন। তিনি মাজলুমদের পাশে দাঁড়ান, ইনসাফের প্রসার ঘটান এবং মুকতাদারকে ইনসাফ করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেন। অল্প বয়স্ক হওয়ার কারণে মুকতাদার সাম্রাজ্যের যাবতীয় কার্যাদি সম্পাদনের দায়িত্ব আবুল হাসানের উপর অর্পণ করে তিনি খেলাধুলায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

এ বছর তিনি ইহুদী ও খৃস্টানদের সেবা গ্রহণ না করার ফরমান জারি করেন। এ বছর পশ্চিমাঞ্চলে মাহদী নামক এক প্রতারকের আবির্ভাব ঘটে। সে ইমামত দখল করে এবং খিলাফতের দাবী তোলে, লোকেরা তার সাথে ইনসাফপূর্ণ আচরণ করে এবং দূর-দূরান্ত থেকে জনতার ঢল এসে তার পতাকা তলে সমবেত হয়। ধীরে ধীরে পশ্চিমাঞ্চলীয় জনপদগুলো তার কব্জায় আসতে থাকে এবং তার ভূখণ্ডের পরিধি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায়। সে ইমাম মাহদীর দাবী করে। অবশেষে আফ্রিকার গভর্নর যিয়াদাতুল্লাহ বিন আগলিব পালিয়ে মিসর হয়ে ইরাক পাড়ি জমান। এরপর মুসলিম বিশ্বের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রশাসন বনূ আব্বাসের হাত থেকে মাহদীর দখলে চলে যায়।

ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিতে এ ঘটনাটি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং বনূ আব্বাসের জন্য একটি মর্মান্তিক ও দুঃখজনক ক্লান্তিকাল। এ হিসাব মোতাবিক বনূ আব্বাসের সাম্রাজ্য মুসলিম বিশ্ব হিসেবে ১৬০ বছরের চেয়ে কিছু বেশি সময় তাদের হতে পরিচালিত হয়ে আসে। এরপর মুসলিম জাহানের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলো তাদের হাতছাড়া হতে থাকে। যাহাবী বলেন, বয়সে ছোট হওয়ার কারণে মুকতাদার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় অনেক ভুল-ভ্রান্তির জন্ম দেন।

৩০০ হিজরীতে দায়নুর শহরে একটি পাহাড় ধসে পড়ে এবং এর নীচ থেকে এত পানি বের হয় যা দ্বারা কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়। এ বছর মাদী খচ্চর পুরুষ খচ্চরে পরিণত হয়। আল্লাহ তা'আলা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।

৩০১ হিজরীতে আলী বিন ঈসাকে উযীর নিযুক্ত করা হয়। তিনি অত্যন্ত ঈমানদারী, ইনসাফ এবং তাকওয়ার সাথে কাজ করতেন। তিনি মদ্যপান নিষিদ্ধ করে আহকাম জারি করেন। তিনি শুল্কমুক্ত বাণিজ্যিক বাজার গড়ে তোলেন। এ বছর আবু উমরকে দ্বিতীয় বার কাযী পদে নিয়োগ দেয়া হয়। এ বছর মুকতাদার সর্বপ্রথম অশ্বারোহণে স্বীয় প্রাসাদ থেকে শামাসীয়া শহরে গমন করেন এবং জনতার সামনে নিজের আত্মপ্রকাশ ঘটান। এ বছর হুসাইন হাল্লাজ মারুফ মানসুর (মানসুর হাল্লাজ) উটের পিঠে চড়ে বাগদাদ আসেন। তিনি নিজেকে আনাল্লাহ (আমি আল্লাহ) দাবী করতেন। বাগদাদে এর প্রসার ঘটে। তার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে বিতর্ক করে জানা যায় কুরআন, হাদীস এবং ফিকাহ সম্পর্কে তার কোনই ধারণা নেই। এ আকীদা বহনের জন্য তাকে বন্দী করা হয়। অবশেষে ৩০৯ হিজরীতে কাযী আবু উমরের ফতোয়া মোতাবিক তাকে শূলেতে চড়ানো হয়।

৩০১ হিজরীতে মাহদী চল্লিশ হাজার বারবার সৈন্য নিয়ে মিসর আক্রমণ করার জন্য যাত্রা করে। পথিমধ্যে নীল নদে প্রবল উত্তাল থাকার কারণে তারা ইস্কান্দারীয়ায় ফিরে গিয়ে সেখানে ফেতনা ফাসাদের জন্ম দেয়। তাদের প্রতিহত করার জন্য শাহী ফৌজ পাঠানো হয়। বরকা অঞ্চলে উভয়ের মধ্যে যুদ্ধ হলে শাহী বাহিনী পরাজিত হয় এবং মাহদী ইস্কান্দারীয়া এবং ফিউম পদানত করে।

৩০২ হিজরীতে মুকতাদার তার পাঁচ পুত্রের খতনা করেন। এ বাবদ তিনি ছয়লাখ দিনার খরচ করেন। পুত্রদের সাথে তিনি অগণন ইয়াতিম শিশুর খতনা করান এবং তাদের প্রতি অনেক করুণা করেন। এ বছর মুকতাদার সর্বপ্রথম মিসরের জামে মসজিদে নামায পড়ান।

৩০৪ হিজরীতে বাগদাদে যাবযাব নামক একটি ভয়ঙ্কর প্রাণীর আবির্ভাব ঘটে, সে রাতে দ্বি-তলায় উঠে বাচ্চাদের খেয়ে ফেলত এবং নারীদের নিতম্বে আঘাত করত। লোকেরা তার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাবার জন্য থালাবাসন বাজাত। এ ঘটনা অনেক দিন পর্যন্ত চলে।

৩০৫ হিজরীতে রোমান সাম্রাজ্য মুকতাদারের প্রতি বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করে এবং সন্ধি করার জন্য উপঢৌকনসহ কতিপয় লোক তার কাছে পাঠানো হয়। মুকতাদার রোমানদের অভ্যর্থনা জ্ঞাপনের জন্য শামাসীয়া তোরণ থেকে দারুল খুলাফা পর্যন্ত এক লাখ ৬০ হাজার বর্ম পরিহিত সৈন্য দাঁড়িয়ে দেন। তাদের পেছনে ৬০ হাজার সেবক এবং সাত শ' প্রহরী নিয়োগ করেন। দারুল খুলাফায় দেয়ালগুলোতে গৌরব চিহ্ন খাতে ৪৮ হাজার যবনিকা দ্বারা সুসজ্জিত করেন। ২২ হাজার কার্পেট বিছিয়ে দেন। একশ' শিকারী পাখি শিকলে বেঁধে নিজের সামনে রাখেন। এ বছর ওমানের বাদশাহ মুকতাদারের নিকট উপঢৌকন পাঠায়। এর মধ্যে ছিল কালো বর্ণের একটি পাখি- যে তোতা পাখি বিশুদ্ধ ও স্পষ্ট ভাবে পার্সী ও হিন্দী ভাষায় কথা বলত।

৩০৬ হিজরীতে মুকতাদারের মা একটি চিকিৎসালয় গড়ে তোলেন। যার বার্ষিক খরচের পরিমাণ চার হাজার দিনার। এ বছর মুকতাদারের অবহেলার কারণে সাম্রাজ্যের সকল বন্দোবস্ত শাহী হারামের হাতে চলে যায়। মুকতাদারের মা প্রতি জুমুয়ায় ইজলাসের আহ্বান করতে থাকেন। এতে কাযীগণ এবং রাষ্ট্রের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের উপস্থিত হওয়ার ফরমান জারি করেন। এ বছর কাসিম মুহাম্মাদ বিন মাহদী মিসরের অধিকাংশ জনপদ দখল করে নেয়।

৩০৮ হিজরীতে বাগদাদে খাদ্যশস্যের দারুণ সংকট দেখা দেয়। ফলে প্রজাবৃন্দ অভাব-অনটনে নিপতিত হয়। কথিত আছে, বাগদাদে প্রশাসক হামেদ বিন আব্বাসের অত্যাচারে জনগণ অস্থির হয়ে লুটপাট আরম্ভ করলে লড়াই বেধে যায়। ক্ষিপ্ত জনতা জেলখানায় আগুন ধরিয়ে দিলে কয়েদীরা পালিয়ে যায়। সাম্রাজ্যের উযীরকে প্রস্তারাঘাতে হত্যা করা হয়। আব্বাসীয় সাম্রাজ্য গোলযোগপূর্ণ হয়ে উঠলে বাগদাদ পর্যন্ত কোন শস্য পৌঁছাত না। এ বছর আল-কাসিম জাযীরা কাসতাত শহর দখল করে নিলে মিসরবাসী বিচলিত হয়ে উঠে। তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়।

৩১১ হিজরীতে তিনি এ আদেশ দেন যে, মুতাযদের ফরমান মোতাবিক গর্ভস্থ বাচ্চাকে অবশ্যই সম্পদের ভাগ দিতে হবে। ৩১২ হিজরীতে খোরাসানের আমীরের হাতে ফারগানা বিজিত হয়। ৩১৪ হিজরীতে রোম সাম্রাজ্যের মালতীয়া অঞ্চল তলোয়ার দ্বারা জয় হয়। এ বছর দজলা নদীর পানিতে মওছুল শহর প্লাবিত হয়। ৩১৫ হিজরীতে রোমানরা দিময়াত শহরে লুটপাট করে এবং জামে মসজিদে বাঁশি বাজায়। এ বছর দিলাম গোত্রের লোকেরা রায় এবং জাবাল শহরে হামলা করে গভর্নরকে হত্যা এবং বাচ্চাদের যবেহ করে।

৩১৬ হিজরীতে কারমতী দারুল হিজরত নামক একটি ভবন তৈরি করায় বিশৃঙ্খলা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। মুসলমানদের উপর আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে সে অনেক জনপদ দখল করে। তার সহচরের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। তার সৈন্যরা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। খিলাফতের ভিত্তি কেঁপে উঠে। মুকতাদার তার সাথে যুদ্ধ করার জন্য কয়েক বার সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করেন। কিন্তু পরাজিত হয়ে তারা ফিরে আসে। তাদের ভয়ে হজ্ব বন্ধ হয়ে যায়। মক্কাবাসী মক্কা শরীফ ছেড়ে পালিয়ে যায়। রোমানরা খাল্লাত আক্রমণ করে সেখানকার জামে মসজিদের মিম্বর বের করে তদস্থলে ক্রুশদণ্ড স্থাপন করে।

৩১৭ হিজরীতে মুনিস ভেবেছিল মুকতাদার আমাকে বাদ দিয়ে হারুন বিন গারীবকে আমীরুল উমারা বানাতে চান- এজন্য সে বিদ্রোহ করে। মুহাররম মাসে শুক্লা পক্ষে এশার পর সকল সৈন্য ও আমীরকে নিয়ে দারুল খুলাফা আক্রমণ করে। এ দৃশ্য দেখে মুকতাদারের প্রাণ উড়ে যায়। সে সময় তিনি স্বীয় জননী, খালা এবং স্ত্রীকে নিয়ে সরে পড়েন। তার ঘর থেকে ছয় লাখ দিনার লুট করে নেয়। লোকেরা তার অপসারণের উপর সাক্ষ্য দেয়। মুনিস এবং আমীরগণ মুহাম্মাদ বিন মুতাযদকে আল-কাহির বিল্লাহ লকব দিয়ে তার বাইআত গ্রহণ করেন। আবু আলী বিন মুকালার উপর উযীরের দায়িত্ব দেয়া হয়। এটা ছিল জুমআর দিন। রবিবারে আলকাহির বিল্লাহ ইজলাস করেন। সোমবারে উযীর এ সংবাদ সকল রাজ্য প্রশাসকদের নিকট সরবরাহ করে। সেদিন সৈন্যরা তাদের বেতন-ভাতাদি প্রার্থনা করে। সে সময় মুনিস উপস্থিত ছিল না। ফলে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। সৈন্যরা দিরহানকে হত্যা করে, মুনিসের ভবনে হামলা চালায় এবং মুকতাদারের অনুসন্ধান করে। অবশেষে তারা মুকতাদারকে কাঁধে করে দারুল খুলাফায় নিয়ে আসে এবং আল কাহির বিল্লাহকে ধরে এনে তার সামনে পেশ করে। সে সময় আল-কাহির কাঁদছিলেন। অন্তর আল্লাহ আল্লাহ করছিল। মুকতাদার তাকে বললেন, ভাই ভয় পেয়ো না। তোমার কোনো অপরাধ নেই। তুমি আমার কোন অসম্মান করনি। আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের কিছুই বলব না। এ ঘটনা অবলোকনে লোকেরা নীরব নিস্তব্ধ হয়। পূর্বের উযীরকেই আবার নিয়োগ করেন। রাজ্যগুলোতে বিষয়টি জানিয়ে দেয়া হয়। মুকতাদার খলীফার আসনেই অধিষ্ঠিত থাকেন। তিনি সৈন্যদের পুরস্কৃত করেন।

এ বছর মুকতাদার হাজীদের সাথে মানসুর দালমীকে পাঠান। যিনি হাজীদের নিরাপদে মক্কা শরীফে পৌছে দেয়। ৮ যিলহজ তারিখে আল্লাহর দুশমন আবু তাহির কারমতী মক্কায় গিয়ে মসজিদে হারামের হাজীদের হত্যা করে এবং লাশগুলো যমযম কূপে ফেলে দেয়। লৌহদণ্ডের আঘাতে হজরে আসওয়াদ ভেঙে গুড়িয়ে দেয় এবং খানায়ে কাবার দেয়াল থেকে তা পৃথক করে ফেলে। ১১ দিন পর্যন্ত হজরে আসওয়াদ এভাবেই পড়ে ছিল। অতঃপর সে তা নিয়ে চলে যায়। ২০ বছরের বেশি সময় পর্যন্ত সেটি তার কবজায় ছিল। ৫০ হাজার দিনারের বিনিময়ে তা ফিরিয়ে দেবার কথা হলেও পরবর্তীতে সে তা ফিরিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। অবশেষে মতির খিলাফত কালে হজরে আসওয়াদটি আনা হয়।

কথিত আছে, হজরে আসওয়াদটি মক্কা শরীফ থেকে দারুল হিজরাতে নিয়ে যাওয়ার সময় যে উট একে বহন করেছে সে উটই মারা গেছে। এভাবে পথিমধ্যে ৪০টি উট মারা যায়। আর ফিরিয়ে আনার সময় হজরে আসওয়াদ বহনকারী দুর্বল উটটি মোটাতাজা হয়ে যায়।

মুহাম্মদ বিন রবী বিন সুলায়মান বলেন, কারামতের এ বছরে আমি মক্কা শরীফে ছিলাম। জনৈক ব্যক্তি কাবা শরীফের সাদের নালা খুলে ফেলার জন্য সাদে উঠলে আমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। আমি দু'আ করলাম, হে আল্লাহ! আপনি বড়ই সহনশীল। কিন্তু এ জুলুম আমার মোটেও সহ্য হয় না। লোকটি সঙ্গে সঙ্গে সাদ থেকে পড়ে মারা গেল।

কারমতী কাবার দরজায় উঠে এ কবিতাটি পাঠ করে- "আমি আল্লাহর সাথে রয়েছি, আল্লাহর কসম! আমিই সৃজনশীলতাকে সৃষ্টি করি এবং ধ্বংস করি।" এরপর এ জালেম লোকটি বেশি দিন অবকাশ পায়নি, সে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এ বছর বাগদাদে একটি বড় ফিতনা সৃষ্টি হয়। এর কারণ হল- ইরশাদ হচ্ছে, عَسَى أَن يَبْعَثَكَ رَبُّكَ মَقَامًا مَّحْمُودًا অর্থ- "অচিরেই তোমার প্রতিপালক তোমাকে মাকামে মাহমুদে পৌছে দিবেন।"-এ আয়াতের ব্যাখ্যা নিয়ে। হানাবিলা সম্প্রদায়ের দাবী এ আয়াতের অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে আরশে পাকে সমাসীন করাবেন। আর অপর পক্ষের বক্তব্য হল- এর অর্থ এটা নয়। এ থেকে রাসূলের শাফাআত উদ্দেশ্য। এ ফিতনায় অনেক লোক প্রাণ হারায়।

৩১৯ হিজরীতে কারমতী কুফায় এসে ধমক দিলে বাগদাদবাসী বাগদাদ দখলের ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। লোকেরা এ থেকে পরিত্রাণের জন্য আল্লাহ তা'আলার দরবারে অত্যন্ত বিনয় জড়িত ক্রন্দনের সাথে প্রার্থনা করে। এ বছর দিলাম গোত্রের লোকেরা দিনুর অঞ্চল দখল করে সেখানকার অনেক লোককে বন্দী এবং হত্যা করে।

৩২০ হিজরীতে মুনিস বারবার জাতি নিয়ে গঠিত এক বিরাট বাহিনী নিয়ে মুকতাদারকে আক্রমণ করতে এলে তিনিও সসৈন্যে ময়দানে আসেন। যুদ্ধের এক পর্যায়ে জনৈক বারবার ফৌজের বর্শার আঘাতে মুকতাদার যমীনে পড়ে গেলে সে তার তলোয়ার দ্বারা খলীফার মাথা কেটে ফেলে। তার কর্তিত মস্তক বর্শার আগায় গেঁথে তার উপর কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয় এবং তার লাশটি উলঙ্গ করে দূরে ফেলে দেয়। লোকেরা খড়কুটো ও বর্জ্য দ্বারা তার লজ্জা স্থান ঢেকে দেয় এবং সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয়। এটা ৩২০ হিজরীর শাওয়াল মাসের ২৭ তারিখ সোমবারের ঘটনা।

মুকতাদার বিশুদ্ধ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তিনি শাহওয়াত এবং শরাব থেকে অপারগ ছিলেন। তার সাথে অপচয় পূর্ণ মাত্রায় বিরাজ করত। নারীরা তার উপর পেরেশান ছিল। তিনি তাদের মাঝে খিলাফতের সকল জওহর বিলিয়ে দেন। তিনি এতিমদের তিনগুণ বেশি দান করতেন। অনন্য ও অদ্বিতীয় একটি জওহরের তসবীহ তিনি এক দারোগাকে দান করেন। তার নিকট রোমান, সাকালাবী এবং হাবশী গোলাম ছাড়াও ১১ হাজার হিজড়া গোলাম ছিল। মুকতাদারের ১২ পুত্রের মধ্যে রেজা, মুত্তাকী এবং মতি-এ তিনজন খলীফা হন।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 আল-কাহির বিল্লাহ

📄 আল-কাহির বিল্লাহ


আল-কাহির বিল্লাহ আবু মানসুর মুহাম্মাদ বিন মুতাযদ বিন তলহা বিন মুতাওয়াক্কিল ফিতনাহ নামক বাঁদীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। মুকতাদার নিহত হওয়ার সময় লোকেরা তাকে এবং মুহাম্মাদ বিন মুকতাফীকে নির্বাচন করে। তারা খিলাফত গ্রহণের অনুরোধ নিয়ে ইবনে মুকতাফীর নিকট গেলে তিনি তা গ্রহণে অসম্মতি জানিয়ে বলেন, খিলাফতে আমার প্রয়োজন নেই। কারণ আমার চাচা কাহির খিলাফতের বেশি হকদার। কাহির খিলাফত গ্রহণ করলে বাইআত হয়ে যায়। ৩১৭ হিজরীতে তাকে আল-কাহির উপাধি দেয়া হয়।

তিনি খিলাফতে আসীন হয়ে সর্বপ্রথম মুকতাদারের আওলাদদের উপর জরিমানা আরোপ করেন এবং এতে তারা অনেক ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা করে। পরিস্থিতি এমন হয় যে, মুকতাদারের মা ধুকেধুকে ইন্তেকাল করেন।

৩২১ হিজরীতে সেনা বাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে মুনিস এবং ইবনে মুকালাহসহ কতিপয় লোক কাহিরকে খিলাফতচ্যুত করে ইবনে মুকতাফীকে তখতে বসানোর চেষ্টা চালায়। জানতে পেয়ে কাহির একটি ফাঁদ পাতেন। তিনি তার বিরোধী সকলকে বন্দী করে হত্যা করেন এবং ফৌজদের উপহার- উপঢৌকন দিয়ে হাত করে নেন। এভাবে তিনি প্রজাদের অন্তরে মর্যাদার আসন করে নেন। তিনি তার লকবের সাথে 'আল-মুনতাকিম মিন আ'দায়াদ্বীনিল্লাহ'- এতটুকু বৃদ্ধি করেন।

এ বছর তিনি গায়িকা বাঁদিদের রাখা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। মদ দূরে ফেলে দেন। গায়কদের বন্দী করেন। হিজড়াদের নির্বাসনে পাঠান। খেলাধূলার সামগ্রী ভেঙে ফেলেন। যারা উত্তেজনাকর গান গাইত এবং যারা ঠাণ্ডা সঙ্গীত পরিবেশন করত না তাদের বিক্রি করে দেবার নির্দেশ দেন। অথচ তিনি নিজেই অসম্ভব রকম গান শুনতেন এবং মদ পান করে বুদ হয়ে থাকতেন।

৩২২ হিজরীতে দায়লম আলী বিন বুয়ার সহযোগিতায় ইস্পাহানের উপর আক্রমণ চালায়। সে সম্পদের পাহাড় গড়েছিল। খলীফার নায়েবের সাথে মিলে মুহাম্মাদ বিন ইয়াকুবকে পরাজিত করে এবং ইবনে বুয়া পারস্যের দিকে দৃষ্টি দেয়। তার বাবা-মা ছিল হতদরিদ্র। তারা মৎস্য শিকার করত। একদিন সে স্বপ্নে দেখল, তার পেশাবের রাস্তা দিয়ে এক খণ্ড অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বের হয়ে পৃথিবী আলোকিত করে ফেলেছে। সে নিজেই এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করল এ ভাবে যে, তার আওলাদ বাদশাহ হবে। আর অগ্নিস্ফুলিঙ্গ যতদূর পর্যন্ত পৌছেছে ততদূর পর্যন্ত তার রাজ্যের সীমানা যুদ্ধের মাধ্যমে সম্প্রসারিত হবে।

ইবনে বুয়া অনেক মাল জমা করে এবং অধিকাংশ শহর তার পদানত হয়। খোরাসান এবং পারস্য খিলাফত থেকে বেরিয়ে ইবনে বুয়ার অধীনে চলে যায়। এ বছর কাহির ইসহাক বিন ইসমাঈলকে কূপের মধ্যে লটকিয়ে হত্যা করেন। তার অপরাধ ছিল- সে খিলাফত লাভের আগে কাহিরের এক বাঁদিকে কাহিরের চেয়ে বেশি মূল্য দিয়ে কিনে নিয়েছিল।

এ বছর ইবনে মুকালা আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে এসে সেনা বাহিনীতে এ অপপ্রচার চালায় যে, সৈন্যদের বন্দী করে রাখার জন্য কাহির ভূগর্ভস্থ কক্ষ নির্মাণ করেছেন। এ কথা শুনে তারা কোষমুক্ত তলোয়ার নিয়ে কাহিরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লে তিনি পালিয়ে যান এবং ৩২২ হিজরীর জামাদিউল আখের মাসের ছয় তারিখে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের হাতে তিনি বন্দী হন।

জনগণ আব্বাস মুহাম্মাদ বিন মুকতাদারের নিকট বাইআত করে এবং আর-রাযী বিল্লাহ উপাধি দিয়ে তার উপর খিলাফত চাপিয়ে দেয়। অতঃপর লোকেরা উযীর, আবুল হাসান বিন কাযী আবু উমর, হাসান বিন আব্দুল্লাহ বিন আবুল শাওয়ারিব, আবু তালিব বিন বহলুলকে কাহিরের নিকট পাঠায়। তারা তাকে বলল, এখন আপনি কি করতে চান? তিনি বললেন, তোমরা আমার বাইআত করেছ। আমি তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট নই। তোমরা আমার আনুগত্য করবে এবং অন্যদেরকেও আনুগত্য করতে উদ্বুদ্ধ করবে। এর জবাবে উযীর কাহিরকে অপসারণের অভিমত ব্যক্ত করে চলে যায়।

কাযী আবুল হাসান বলেন, আমি রাযীর নিকট গিয়ে বিস্তারিত জানিয়ে বললাম, আমার দৃষ্টিতে তার আমানত ফরয। রাযী বললেন, তোমাকে ছেড়ে দেয়া হল। আমি সেখান থেকে চলে আসার পর কাহিরের চোখে সীসা ঢেলে দেয়া হয়, ফলে তিনি চিরদিনের জন্য অন্ধ হয়ে যান। মাহমুদ ইস্পাহানী বলেন, দুশ্চরিত্র এবং রক্ত ঝরানোর প্রতি অসম্ভব নেশার কারণে কাহিরকে অপসারণ করা হয়। তিনি পদচ্যুত হতে অসম্মতি জানালে তার চক্ষুদ্বয় খুলে নেয়া হয়।

সূলী বলেন, কাহির ছিলেন রক্ত পিপাসু, দুশ্চরিত্র, স্বতন্ত্র মেজাজ এবং মদ্যপায়ী। প্রহরী পছন্দ না হলে তিনি তার বংশের পর বংশ হত্যা করতেন। তিনি বর্শা হাতে নিলে কাউকে না কাউকে হত্যা না করা পর্যন্ত ক্ষান্ত হতেন না।

৩৩৯ হিজরীর জামাদিউল আউয়াল মাসের শেষের দিকে ৫৩ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। তিনি আব্দুস সামাদ, আবুল কাসিম, আবুল ফজল এবং আব্দুল আযীয নামক চার পুত্রের জনক।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00