📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 আল-মুহতাদী বিল্লাহ

📄 আল-মুহতাদী বিল্লাহ


আল-মুহতাদী বিল্লাহ খালীফাতুস সালেহ মুহাম্মাদ আবু ইসহাক ভিন্ন মতে আবু আব্দুল্লাহ বিন ওয়াছেক বিন মুতাসিম বিন হারুন রশীদ ওরদাহ নাম্নী বাঁদির গর্ভে ২১০ হিজরীর পর তার দাদার শাসনামলে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ২৫৫ হিজরীর রযব মাসের ১৯ তারিখে তখতে খিলাফত প্রাপ্ত হন। মুতায সর্বপ্রথম তার বাইআত করেন এবং নিজ খিলাফত তার উপর অর্পণ করেন। মুতাযের সামনে তাকে বসানো হয়। মুতায কাযীর সামনে সাক্ষ্য দেন। কাযী বলেন, মুতায খিলাফত পরিচালনায় অপারগ। মুতায কাযীর কথা স্বীকার করেন। মুহতাদী এ কথা শুনে বাইআতের জন্য নিজের হাত বাড়িয়ে দিলে মুহতাদী সর্বপ্রথম বাইআত করেন। অতঃপর তিনি মজলিসের মধ্যভাগে এসে উপবেশন করেন।

মুহতাদী সুদর্শন, ইবাদত গুজার, দানশীল, বুদ্ধিমান, আল্লাহ তা'আলার বিধানাবলী চালু করার ক্ষেত্রে বদ্ধপরিকর এবং সাহসী ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু তার কোন সাহায্যকারী ছিল না। খতীব বলেন, মুহতাদী খলীফা হওয়া থেকে আরম্ভ করে নিহত হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন রোযা রাখতেন।

হাশিম বিন কাসিম বলেন, আমি একদিন রমযান মাসে মুহতাদীর কাছে বসে ছিলাম, আমি উঠে আসার ইচ্ছা করলে তিনি আমাকে বসিয়ে দিলেন। ইফতার করে তিনি নামায পড়ালেন। অতঃপর আবার খানা চাইলেন। এক ডালা ভর্তি খানা এলো। এতে ছিল ময়দার রুটি, এক বাটি সিরকা এবং যয়তুন তেল। তিনি আমাকে খেতে বললেন। আমি খেতে আরম্ভ করলাম। আমার মনে হল আরো খানা আসবে। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি কি রোযা ছিলে না? আমি বললাম, ছিলাম। তিনি বললেন, আগামীকাল রোযা রাখবে না? আমি বললাম, রমযান শরীফের রোযা কেন রাখব না? তিনি বললেন, ভালো করে খাও, তবে আর কোন খানা আসবে না। আমার কাছে এছাড়া আর কোন খানা নেই। আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম, আমিরুল মুমিনীন! আল্লাহ তা'আলা আপনাকে অনেক নেয়ামত দিয়েছেন। তিনি বললেন, এটা তুমি ঠিকই বলেছ। আমি বনূ উমাইয়‍্যার খলীফা হযরত উমর বিন আব্দুল আযীযের জীবন নিয়ে চিন্তা করেছি। তিনি স্বল্প ভোজন এবং জনগণের চিন্তার কারণে পাতলা ছিলেন- যা তুমি জান। অতঃপর আমি নিজ খান্দানের প্রতি দৃষ্টি ফেরায়ে আমি দারুণ মর্মাহত হয়েছি। লোকেরা আমাদের বন্ হাশিম বলে। অথচ তারা যা ছিল না আমরা তা গ্রহণ করেছি। যা তুমি দেখছ।

জাফর বিন আব্দুল ওহেদ বলেন, মুহতাদীর সাথে আলাপ চারিতার এক পর্যায়ে আমি বললাম, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (র.) এ কথাই বলেছেন এবং আপনার বাবা এবং দাদা এ মাসয়ালার উপরই কাজ করেছেন। তিনি বললেন, আল্লাহ তা'আলা ইমাম আহমদের উপর রহম করুন। আমার পিতার সাথে সম্পর্কোচ্ছেদ করা জায়েয হলে সঙ্গে সঙ্গে আমি তা করতাম। অতঃপর তিনি আমাকে বললেন, সর্বদা সত্য কথা বলবে। যে সত্য কথা বলে সে আমার দৃষ্টিতে অধিক প্রিয়।

তাফতুয়া বলেন, জনৈক হাশেমী বর্ণনা করেন, আমরা মুহতাদীর কাছে একখানা পোশাক বক্স দেখেছি। যাতে তিনি একটি জামা এবং একটি কম্বল রাখতেন। রাতে তিনি এ দু'টো পরে নামায আদায় করতেন। মুহতাদী লোকদের ক্রীড়া-কৌতুক ও খেলাধুলা করতে নিষেধ করেন। এর সামগ্রীগুলো ফেলে দেন। গান বাজনা হারাম ঘোষণা করেন। প্রশাসকদের অত্যাচার থেকে জনগণকে রক্ষা করেন। তিনি নিজেই বিচারালয়ে বসতেন। তিনি নিজেই কেরানীদের কাছ থেকে হিসাব নিতেন। সোমবার এবং বৃহস্পতিবারে অবকাশে থাকতেন। রুসার একটি দলকে বেত্রাঘাত করেন। রাফেযী হয়ে যাওয়ার সংবাদ পেয়ে দারুণ ঘৃণায় তিনি জাফর বিন মাহমুদকে বাগদাদে পাঠিয়ে দেন।

মুতাযের রক্তের প্রতিশোধ নেবার জন্য মূসা বিন বাগা রায় থেকে একদল সৈন্যসহ খিলাফতের রাজধানী সরমন রায়ে সালেহ বিন ওসীফকে হত্যা করার জন্য আসে। মূসার আগমন সংবাদ পেয়ে জনগণ ওসীফকে লক্ষ্য করে বলল, হে ফিরাউন তোমার জন্য এক মূসা এসে পড়েছে। মূসা এসে খলীফার নিকট অনুমতি চাইল। তিনি প্রত্যাখ্যান করলেন। সে সময় তিনি আদালতে বসে ছিলেন। মূসা তার উপর জনতাকে লেলিয়ে দিল। তার সৈন্যরা খলীফাকে একটি দুর্বল ঘোড়ায় উঠিয়ে প্রাসাদ লুণ্ঠন করে। খলীফা বললেন, মূসা আল্লাহ তা'আলাকে ভয় কর। তোমার উদ্দেশ্য কি? সে বলল, আল্লাহর কসম, আমার উদ্দেশ্য ভালো, আপনি আমাদের নিকট প্রতিশ্রুতি দিন যে, আপনি সালেহ বিন ওসীফের পক্ষপাতিত্ব করবেন না। মুহতাদী শপথ করলেন। মূসা সদলবলে খলীফার বাইআত করল। অতঃপর সালেহ বিন ওসীফের কৃত অপরাধের শাস্তি প্রদানের জন্য তাকে ডাকা হয়। সে আত্মগোপন করে। মুহতাদী তার সাথে সন্ধি করার চেষ্টা শুরু করেন।

এতে জনতার কথা বলার সুযোগ হলো যে, সালেহ কোথায় আত্মগোপন করেছে তা খলীফা জানেন। আমিরুল মুমিনীনকে অপসারণের চক্রান্ত হয়। এটা জানতে পেয়ে মুহতাদী একদিন সকালে তলোয়ার হাতে বেরিয়ে এসে বললেন, আমাকে মুসতায়িন এবং মুতায ভেবো না। আল্লাহর কসম! আমি রাগান্বিত হলে জীবনের কোন মায়া নেই। এটা আমার তলোয়ার, এটা আমার হাতে থাকা অবস্থায় হত্যা করেই যাব; দ্বীন, শরম এবং তাকওয়া বলতে কিছু জিনিস রয়েছে। খলীফাদের সাথে শত্রুতা মানে আল্লাহ তা'আলার বিরোধিতা করা। আমার কাছে সালেহ-এর কোন সংবাদ নেই। এ কথা শুনে লোকেরা সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে যায়। মূসা বিন বাগা সালেহকে ধরে আনতে পারলে দশ হাজার দিনার পুরস্কার ঘোষণা করে। কিন্তু কেউ তাকে ধরতে পারল না।

গ্রীষ্মকাল, প্রচণ্ড গরমের কারণে এক যুবক একটি ভূগর্ভস্থ কক্ষে ঢুকে পড়ে। সেখানে সালেহকে দেখে সে চিনতে পারে। যুবকটি এসে মূসাকে জানিয়ে দেয়। সে কয়েকজন লোক পাঠিয়ে তার মাথা কেটে আনে। এতে মুহতাদী দারুণ মর্মাহত হন। মূসা বাকিয়ালের সাথে সন-এ গমন করলে মুহতাদী মূসাকে হত্যা করার জন্য বাকিয়ালের নিকট লিখিত ফরমান পাঠান। বাকিয়াল তা মূসার সামনে পেশ করলে সে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। সে-ই মুহতাদীকে হত্যা করার জন্য ফিরে এল। উভয়ের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে গেল। একদিনেই নিহত হল চার হাজার তুর্কী, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত খলীফার বাহিনী পরাজিত হল। তিনি বন্দী হলেন। তাকে মেরে ফেলা হল।

মুহতাদী ২৫৬ হিজরীর রযব মাসে নিহত হন। এ হিসাবে তিনি পনেরো দিন কম এক বছর খিলাফত পরিচালনা করেছিলেন। তুর্কীরা যখন মুহতাদীকে আক্রমণ করে তখন প্রজাবৃন্দ মসজিদগুলোতে এ কথাটি লিখে ঝুলিয়ে দেয়- হে মুসলমানগণ! উমর বিন আব্দুল আযীযের মত ন্যায়পরায়ণ খলীফাকে সাহায্য কর এবং তার বিজয়ের জন্য আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা কর।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 আল-মুতামাদ আলাল্লাহ

📄 আল-মুতামাদ আলাল্লাহ


আল-মুতামাদ আলাল্লাহ আবুল আব্বাস (আবু জাফর) আহমদ বিন মুতাওয়াক্কিল বিন মুতাসিম বিন হারুন রশীদ ২২৯ হিজরীতে ফিতয়ান নাম্নী রোমান বাঁদির গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। মুতামাদ নিহত হওয়ার সময় তিনি জুসিকে বন্দী ছিলেন। তাকে বের করে লোকেরা তার হাতে বাইআত করে। তিনি স্বীয় ভ্রাতা মোফিক তলহাকে পূর্বাঞ্চলীয় গভর্নর নিয়োগ করেন। পুত্র জাফরকে উত্তরাধিকার মনোনীত করে মিসর এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় গভর্নর পদে নিয়োগ দেন। তার লকব মফুয ইলাল্লাহ রাখা হয়। তিনি আরাম আয়েশ, খেলাধুলা এবং মুসলিম উম্মাহ সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়লে জনসাধারণ অসন্তুষ্ট হয়ে তার ভাই তালহার দিকে ঝুঁকে পড়ে।

মুতামাদের খিলাফতকালে বসরা এবং তার পার্শ্ববর্তী জনপদগুলো দস্যু কর্তৃক আক্রান্ত হয়। দস্যুরা শহরে নারকীয় তাণ্ডব চালায়। লুণ্ঠন করে শহরময় আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। মুসলিম বাহিনীর সাথে তাদের লড়াই হয়। এরপর ইরাকে মহামারী ছড়িয়ে পড়ে। এতে সহস্রাধিক মাখলুকের প্রাণহানি ঘটে। মহামারীর পর ভূমিকম্পেও সহস্রাধিক পশু-প্রাণীর জীবন সাঙ্গ ঘটে।

এদিকে ২৭০ হিজরী পর্যন্ত দস্যুদের সাথে লড়াই চলতে থাকে। এ বছর দস্যু সরদার বাহবুদ আল্লাহ তার প্রতি অভিশাপ বর্ষণ করুন নিহত হয়। সে রিসালতের দাবী করে বলত, আমি আলেমুল গায়েব। সে ১৫ লাখ মুসলমানকে হত্যা করেছিল। একদিনে বসরায় সে ৩ লাখ মুসলমান হত্যা করে। সে মিম্বরে দাঁড়িয়ে হযরত উসমান, হযরত আলী, হযরত মুআবিয়া, হযরত তালহা, হযরত যুবায়ের এবং হযরত আয়শা (রা.)-কে গালি দিত। এক এক উলুবিয়া নারীকে ২/৩ দিরহামে নিলামে বিক্রি করত। একেক দস্যুর কাছে দশ জন উলুবিয়া নারী বাঁদি হিসেবে ছিল। এ অসৎ লোকটি নিহত হলে তার কর্তিত মাথা বর্শায় গেঁথে বাগদাদের পথে পথে ঘোরানো হয়। এতে করে লোকেরা আনন্দ করে এবং দস্যুদের সাথে লড়াইরত মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক তালহাকে ধন্যবাদ জানায় এবং কবিগণ তার প্রশংসায় কাব্য রচনা করে।

২৬০ হিজরীতে ইরাকে ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ফলে এক বস্তা গমের দাম এক শ' দিনারে গিয়ে পৌছে। এ বছর রোমানরা লুলু শহর দখল করে নেয়। ২৬১ হিজরীতে পুত্র জাফরকে উত্তরাধিকার এবং তারপর ভাই তালহাকে উত্তরাধিকার মনোনীত করেন। জাফরকে শাম, জাযিরা এবং আরমেনিয়ার গভর্নর পদে নিয়োগ দেন। আর তালহাকে ইরাক, বাগদাদ, হিজায, ইয়ামন, ফারিস, ইস্পাহান, রায়, খুরাসান, তবরিস্তান, সিজিস্তান এবং সনদের গভর্নর নিযুক্ত করেন। তিনি দু'জনের জন্য পৃথক দু'টি পতাকা নির্বাচন করেন। সাম্রাজ্যের প্রধান বিচারপতিকে ডেকে উভয়ের মাঝে লিখিত চুক্তি সম্পাদন করেন যে, জাফরের অবর্তমানে তালহার রায় চূড়ান্ত। এ চুক্তিপত্র প্রধান বিচারপতি ইবনে আবু শাওয়ারিব খানায়ে কাবার দেয়ালে ঝুলিয়ে দেন।

২৬৬ হিজরীতে রক্ত ঝরিয়ে দেয়ারে বকর জনপদটি দখল করে নেয়। ফলে জাযিরাবাসী এবং মওসূলবাসী সেখান থেকে পালিয়ে যায়। এ বছর গ্রাম্য লোকেরা কাবা শরীফের গেলাফ চুরি করে নিয়ে যায়।

২৬৭ হিজরীতে আহমদ বিন আব্দুল্লাহ আল-হিজাবী খুরাসান, সিজিস্তান এবং কারমান দখল করার পর ইরাক দখলের পাঁয়তারা করলে তার গোলামরা তাকে হত্যা করে।

মুতামাদের ভাই মুফিক (তালহা) ২৬৪ হিজরীতে সৈন্য বাহিনীসহ মুতামাদের উপর আক্রমণ করে। এতে মুতামাদ মর্মাহত ও হতাশ হন। অবশেষে ২৬৯ হিজরীতে মিসরের ডেপুটি প্রশাসক ইবনে তুলুনের সাথে মুতামাদের পত্রাদি বিনিময়ের মাধ্যমে যে কথা হয় তার ভিত্তিতে ইবনে তুলুন সসৈন্যে এবং মুতামাদ সামরাহ থেকে দামেশকের উদ্দেশে রওয়ানা করেন। এ সংবাদ পেয়ে মুফিক লিখিতভাবে ইসহাক বিন কানদাজকে জানালো যে, যে কোনভাবে মুতামাদকে ফিরিয়ে আনতে হবে। ইসহাক নাসীবীন শহর থেকে মুতামাদের উদ্দেশে যাত্রা করে। মওসূল এবং হাদীসার মধ্যবর্তী স্থানে উভয়ের সাক্ষাত হলে ইসহাক বলল, আমিরুল মুমিনীন! আপনার ভাই আপনার দুশমনদের সাথে লড়াই করছে। আর আপনি খিলাফতের রাজধানী ছেড়ে কোথায় চলেছেন? শত্রুরা জানতে পেলে চতুর্দিক থেকে আক্রমণ করে আপনার বাপ-দাদার সাম্রাজ্য দখল করে নিবে। আর সে সময় আপনার কিছুই করার থাকবে না।

ইসহাক মুতামাদের গতিবিধির উপর সর্বদা নযর রাখার জন্য বিশ্বস্ত কিছু লোক নিযুক্ত করেছিল। সে মুতামাদকে জানালো, এ স্থান আপনার জন্য নিরাপদ নয়। এখান থেকে ফিরে যেতে হবে। মুতামাদ বললেন, আমার কাছে শপথ কর যে, তোমরা আমাকে কষ্ট দিবে না এবং আমাকে শত্রুর হাতে তুলে দিবে না? ইসহাক শপথ করল। অতঃপর তিনি সামরাহর দিকে রওয়ানা করেন। পথিমধ্যে মুফিকের কেরানী সাদ বিন মুখাল্লাদের সাথে সাক্ষাত হয়। ইসহাক মুতামাদকে সাদের নিকট হস্তান্তর করে। সে অন্যত্র চলে যায়। সাদ তাকে রাজধানীতে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। সে তাকে আহমদ বিন খাসীবের বাড়িতে নিয়ে যায় এবং পাঁচ'শ অশ্বারোহী মুতামাদকে রাজধানীতে প্রবেশ না দেবার জন্য নিযুক্ত রাখে। সংবাদ পেয়ে মুফিক ইসহাককে বৃত্তি ও জায়গীর প্রদান করে এবং যুল সানাদাইন উপাধি দেয়। আর সাদকে যুল ওয়াযারাতাইন উপাধি দেয়।

মুতামাদ সাদের হাতে গৃহবন্দী ছিলেন। তার কোন কাজ করার ইখতিয়ার ছিল না। তিনি নিজের এ অপারগতা ও অসহায়ত্বকে উপজীব্য করে একটি কবিতা রচনা করেন- "আশ্চর্য! আমি বাদশাহ, অথচ আমার ইখতিয়ারে কোন জিনিস নেই। আমি বাদশাহ হয়েও আমার লোকবল কম।"

তিনি প্রথম খলীফা যিনি নিপতিত হন, তার উপর লোকের পাহারা বসানো হয় এবং তার অপবাদ ছড়ানো হয়। অতঃপর মুতামাদ মধ্যস্থতায় আসেন। এ খবর পেয়ে ইবনে তুলুন বিচারক এবং আমীর উমরাহদের ডেকে বলল, মুফিক আমিরুল মুমিনীনকে বন্দী করে রেখেছেন। অতএব তার বাইআত থেকে পৃথক হওয়া উচিত, কাযি বাকার বিন কীতীয়াহ ব্যতীত সকলেই সমর্থন জানাল। কাযী বাকার বললেন, তোমরাই প্রথমে আমার সামনে মুতামাদের উত্তরাধিকার সংক্রান্ত ফরমান পেশ করেছ- যার কারণে তাকে উত্তরাধিকার বানানো হয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা স্বয়ং মুতামাদের নিকট থেকে তার পৃথকীকরণের হুকুমনামা না দেখাবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি অনুমতি দিব না। এর জবাবে ইবনে তুলুন বলল, এ মুহূর্তে মুতামাদ বন্দী এবং গযবে নিপতিত, এজন্য তিনি ফরমান লিখতে পারবেন না। কাযী বাকার বললেন, আমি এ অবস্থায় কোন হুকুম দিতে পারি না। ইবনে তুলুন বলল, পৃথিবীব্যাপী প্রসিদ্ধ যে, কাযী বাকার এত অনন্য ও অদ্বিতীয় বিচারক, এজন্য তোমার অহংকার হয়েছে। আসলে তোমার বিবেক বৃদ্ধতার দংশনে ক্ষত-বিক্ষত। এ কথা বলে ইবনে তুলুন কাযী বাকারকে বন্দী করল এবং যতগুলো উপহার সামগ্রী তাকে দেয়া হয়েছিল সবগুলো জব্দ করা হল। এর আনুমানিক মূল্য ছিল দশ হাজার দিনার। কথিত আছে, এ কথা জানতে পেয়ে মুফিক বলল, তোমরা মিম্বরে আরোহণ করে ইবনে তুলুনকে অভিশাপ দাও।

২৭০ হিজরীতে মুতামাদ সামরাহ-এ ফিরে আসেন। এ সময় তার সাথে সর্বদা একদল সৈন্য থাকত, যা দ্বারা মনে হত তিনি পূর্ণ স্বাধীন। এ বছর ইবনে তুলুনের ইন্তেকাল হয়। মুফিক তদস্থলে স্বীয় পুত্র আবুল আব্বাসকে মিসরের গভর্নর নিয়োগ করে। আবুল আব্বাস একদল সৈন্যসহ মিসরে যায়। এদিকে খামারিয়া বিন আহমদ বিন তুলুন আগেই বাবার আসনে অধিষ্ঠিত হয়। উভয়ের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। এতে মিসরবাসীর ললাটে বিজয় চুম্বন করে। এ বছর বাগদাদে দজলা নদীর বাঁধ ফেটে যাওয়া বাগদাদ নগরী প্লাবিত হয়। এতে করে সাত হাজার ঘর-বাড়ি ধসে পড়ে। এ বছর রোমানরা এক লাখ সৈন্য নিয়ে তরতুস আক্রমণ করে। এতে মুসলমানরা জয়লাভ করে। এ যুদ্ধে প্রচুর গনীমত মুসলমানদের হস্তগত হয়।

এ বছর আব্দুল্লাহ বিন উবায়েদ নিজেকে ইমাম মাহদী দাবী করে। সে এ আকীদার উপর অটল থেকে ২৭৮ হিজরীতে হজ্ব পালন করতে গেলে কেনানা গোত্রের লোকেরা তার অনুসরণ করে।

সূলী বলেন, ২৭১ হিজরীতে হারুন বিন ইবরাহীম আল-হাশেমীর নির্দেশে বাগদাদে শুধু পয়সার প্রচলন ঘটে। এ ব্যবস্থা কিছুদিন চালু থাকে। ২৭৮ হিজরীতে নীলনদ শুষ্ক হয়ে যাওয়ায় মিসরে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এ বছর মুফিকের পরলোক গমনে মুতামাদের স্বস্তির নিঃশ্বাস নসীব হয়। এ বছর কুফায় কারমাহ নামক একটি দলের আবির্ভাব ঘটে। এরা ছিল পথভ্রষ্ট ও ফাসিক। তারা ফরয গোসলকে নাজায়েয এবং মদ পানকে জায়েয বলত। তারা আযানের মধ্যে এ শব্দটি বৃদ্ধি করে ان ان محمد بن الحنفية رسول الله - ফরয সাব্যস্ত করত, বাইতুল মুকাদ্দিসে হজ্ব করত এবং তাকেই কেবলা বানিয়েছিল। এরূপে শরীয়তে তারা অনেক জিনিসের কম বেশি করে। তাদের মতবাদটি জাহেল, বর্বর ও অসভ্য লোকেরা গ্রহণ করে।

২৭৯ হিজরীতে আবু ফজল বিন মুফিকের প্রতি সেনা বাহিনীর আনুগত্য এবং নিজের দুর্বলতা ও অপারগতার কারণ মুতামাদ নিজ ছেলেকে উত্তরাধিকার থেকে অপসারণ করে আবুল ফজল বিন মুফিককে উত্তরাধিকার মনোনীত করেন এবং তাকে মুতাযদ উপাধি দেন। এ বছর মুতাযদ মিথ্যা গল্প, নোবেল-নাটক, দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা সংক্রান্ত গ্রন্থাদি ক্রয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এর কয়েক মাস পর ২৭৯ হিজরীর রযব মাসের ১৯ তারিখ সোমবারে ২৩ বছর রাষ্ট্র পরিচালনার পর ইন্তেকাল করেন। কেউ কেউ বলেন, তাকে বিষ খাওয়ানো হয়। কারো মতে রাতের আঁধারে তাকে গলাটিপে হত্যা করা হয়েছে।

মুতামাদের যুগে নিম্নবর্ণিত ওলামায়ে কেরাম এ নশ্বর জগত ত্যাগ করেন- হযরত ইমাম মুসলিম, হযরত আবু দাউদ, হযরত তিরমিযী, হযরত ইবনে মাজা, রাবীহুল জায়যী, রবীহুল মুরাদী, ইউসুফ বিন আব্দুল আলী, যাবের বিন বাকার, আবুল ফজল আর-রিয়াশী, মুহাম্মাদ বিন ইয়াহইয়া যাহলী, হাজ্জাজ বিন শায়ের আজালী আল-হাফেজ, কাযীউল কুযযাত ইবনে আবু শাওয়ারিব সুসী আল-মাকরী, উমর বিন শায়বা, আবু যরআ আর-রাযী, মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল হাকাম, কাযী বাকার, দাউদ যাহেরী, ইবনে দারাহ, বাকা বিন মুখাল্লাদ, ইবনে কুতায়বা, আবু হাতিম আর-রাযী প্রমুখ।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 আল-মুতাদ বিল্লাহ

📄 আল-মুতাদ বিল্লাহ


আল-মুতাযদ বিল্লাহ আহমদ আবুল আব্বাস বিন মুফিক তলহা বিন মুতাওয়াক্কিল বিন মুতাসিম বিন হারুন রশীদ ২৪২ হিজরীর যিলকদা মাসে, সূলীর মতে ২৪৩ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসে সাওয়াব অথবা হরজ অথবা যরার নামক বাঁদির গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। স্বীয় চাচা মুতামাদের পর ২৭৯ হিজরীতে তিনি খিলাফতের তখতে উপবেশন করেন।

বনূ আব্বাসের খলীফাদের মধ্যে মুতাযদ সুদর্শন, সাহসী, নির্ভীক, জ্ঞানী এবং বুদ্ধিমান। বীরত্বের কারণে তিনি একাই বাঘের সঙ্গে লড়াই করতেন। তিনি রেগে গেলে খুব কম ক্ষমা করতেন। অপরাধীদের জীবন্ত পুঁতে ফেলতেন। তিনি ঝানু রাজনীতিবিদ ছিলেন।

আব্দুল্লাহ বিন হামদুন বলেন, একদা মুতাযদ শিকার করতে যান। আমিও সঙ্গে ছিলাম। ক্ষীরা বা শশার ক্ষেত অতিক্রম করার সময় ক্ষেতের পাহারাদাররা ফরিয়াদ জানাল। মুতাযদ বললেন, কি হয়েছে? তারা বলল, তিনজন গোলাম এসে আমাদের ফসল নষ্ট করে দিয়েছে। অতঃপর তিনি গোলামদের ডেকে এনে ক্ষেতের এক পার্শ্বে হত্যা করেন। কয়েক দিন পর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, সত্য করে বলতো লোকেরা আমার প্রতি কেন সন্তুষ্ট নয়? বললাম, আপনি রক্ত পিপাসু তাই। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, আমি খিলাফতের তখতে উপবেশন করার পর থেকে কোনো দিন অবৈধ রক্তপাত করিনি। বললাম, আহমদ বিন তয়্যবকে কেন হত্যা করেছেন? তিনি বললেন, সে আমাকে বক্রতার দিকে আহ্বান করতে চাইছিল। বললাম, সেই তিন গোলামকে কেন হত্যা করলেন? তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, অনুসন্ধান ছাড়া আমি তাদের হত্যা করিনি, তারা হত্যাকারী এবং চোর ছিল।

কাযী ইসমাঈল বলেন, আমি মুতাযদের কাছে গিয়ে দেখলাম তার পেছনে কয়েকজন রোমান সুন্দরী যুবতী দাঁড়িয়ে আছে। চলে আসার সময় তিনি বললেন, কাযী সাহেব! খারাপ ধারণা করবেন না। আল্লাহর কসম! আমি আজ পর্যন্ত কখনই হারাম কাজের জন্য কোমরের দড়ি খুলিনি। একদিন আমি তার কাছে গেলাম। তিনি আমার দিকে এক টুকরো কাগজ নিক্ষেপ করেন। এতে লিখা রয়েছে- কতিপয় আলেম এক স্থানে একত্রিত হয়ে হালালকে হারাম এবং হারামকে হালালের ফতোয়া দিয়েছে। বাদশাহর অবর্তমানে তারা এর উপর আমল করবে। আমি বললাম, তারা বেদ্বীন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তারা বেদ্বীন না মিথ্যাবাদী? বললাম, যারা মদকে মোবাহ এবং মুতাআকে মোবাহ মনে করে না এবং যারা মুতাআকে মোবাহ এবং গানকে মোবাহ বলে না এরা কি পথভ্রষ্ট নয়? আর যে আলেমদের ত্রুটি নিয়ে উপহাস করবে সে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠা পাবে না। এ কথা শুনে মুতাযদ সঙ্গে সঙ্গে কাগজটি পুড়ে ফেলার নির্দেশ দেন।

মুতাযদ প্রতিটি রণাঙ্গনে অব্যর্থ ও সফল। লোকেরা তাকে ভয় পেত। ফলে নতুন ফেতনা মাথাচাড়া দিতে পারত না; বরং অনেক ফেতনা এমনিতেই প্রতিহত হয়। তিনি খারাজ হ্রাস এবং শুল্ক মওকুফ করেন। তিনি সুশাসন ও ন্যায় বিচারের সুবাতাস বয়ে দেন। প্রজাদের উপর আরোপিত অত্যাচার বিদূরিত করেন। বন্ আব্বাসের খিলাফতের ভিত্তি অপরিচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। বনূ আব্বাসের খিলাফতের ইমারতকে রক্ষা করায় তিনি দ্বিতীয় সাফফাহ নামে প্রসিদ্ধ।

তিনি পথে ঘাটে গান বাজনা পথ নাট্য করার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তিনি লোকদের ঈদুল আযহার নামায পড়াতেন। তিনি প্রথম রাকাআতে ছয় তাকবীর এবং দ্বিতীয় রাকাআতে এক তাকবীর বলতেন। তবে তিনি নিজে কোন খুতবা পড়তেন না।

২৮০ হিজরীতে তিনি কায়রো যান এবং আফ্রিকার গভর্নরের সাথে তার লড়াই হয়। এ বছর দেবল থেকে সূর্যগ্রহণের সংবাদ আসে। এ বছর শাওয়াল মাসে দেবলে সূর্যগ্রহণ লাগে। ফলে আসর পর্যন্ত অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল। এরপর কালো আধার নেমে আসে- যা প্রথম রাত পর্যন্ত ছিল। এরপর ভূমিকম্প হয়। এতে শহরের ব্যাপক ক্ষতি সাধন হয়। বিধ্বস্ত ভবনের নিচ থেকে আনুমানিক লক্ষাধিক বনী-আদমকে উদ্ধার করা হয়।

২৮১ হিজরীতে রোমের মুকুরিয়া শহর বিজিত হয়। এ বছর রায় এবং তবরিস্তানে পানির সংকট দেখা দেওয়ায় এক রিতল পানির মূল্য দাঁড়ায় এক দিরহাম, লোকেরা দুর্ভিক্ষের কারণে মৃত প্রাণী খেতে শুরু করে। এ বছর তিনি মক্কার দারুন নদওয়া ভেঙে মসজিদে হারামের পার্শ্বে আরেকটি মসজিদ নির্মাণ করেন।

২৮২ হিজরীতে মুতাযদ কাবীহার রেওয়াজসমূহ নিষিদ্ধ করেন। নওরোজের দিন আগুন জ্বালানো এবং লোকদের গায়ে পানি ছিটানোর প্রথা রহিত করেন। এটা ছিল অগ্নিপূজকদের রীতি। এ বছর তিনি কতর আল-নাদা বিনতে খামারুয়া বিন আহমদ বিন তুলুনকে বিয়ে করেন। সে রবিউল আউয়াল মাসেই পৃথক হয়ে যায়। বিয়ের সময় কতর আল-নাদা পৃত্যালয় থেকে চার হাজার কমরবন্দ এবং দশ সেন্দুক ভর্তি মনিমুক্তা নিয়ে স্বামীর ঘরে আসেন।

২৮৩ হিজরীতে গর্ভের বাচ্চাকেও মিরাছ প্রদানের নির্দেশ দেন। এ লক্ষ্যে তিনি পৃথক একটি দফতর প্রতিষ্ঠা করেন। এ আইনটি জনতার অভিনন্দন কুড়ায় এবং তারা খলীফার জন্য দু'আ করে।

২৮৪ হিজরীতে মিসরে এক প্রকার গভীর লাল বর্ণের প্রকাশ ঘটে। এতে মানুষের চেহারা এবং দেয়ালগুলো পর্যন্ত লাল হয়ে যায়। ফলে তারা অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এ থেকে পরিত্রাণের জন্য দু'আ করলে এ লাল বর্ণটি আসর থেকে রাত পর্যন্ত থাকে।

ইবনে জারীর বলেন, ২৮৪ হিজরীতে মুতাযদ মিম্বরে দাঁড়িয়ে হযরত মুআবিয়া (রা.)-এর প্রতি অভিশাপ বর্ষণের জন্য ফরমান জারি করতে চাইলে তার উযীর ওবাইদুল্লাহ বাধা দিয়ে বললেন, এতে মুসলিম মিল্লাতের মাঝে ক্ষোভের সঞ্চার হবে। কিন্তু তিনি তার কথা শুনলেন না। আহকাম জারি করলেন। হুকুম নামায় তিনি হযরত আলী (রা.)-এর প্রশংসা এবং হযরত মুআবিয়া (রা.)-এর দোষত্রুটি বিধৃত করেন। এটা দেখে কাযী ইউসুফ বললেন, আমিরুল মুমিনীন! আপনার এ কাজে ফিতনা সৃষ্টির আশংকা রয়েছে। আপনি এমনটি করবেন না। তিনি বললেন, এর উপায় হিসেবে আমার নিকট আমার তলোয়ার রয়েছে। কাযী সাহেব বললেন, আর আপনি আলী পরিবারের জন্য কি উপায় বের করবেন? তাদের বিচরণ তো জ্ঞানের শেষ সীমানা পর্যন্ত। তারা যদি তাদের অধিকারের কথা শুনে লোকদের হাতে তলোয়ার তুলে দেয়? এ কথা শুনে তিনি স্বীয় ইচ্ছা প্রত্যাখ্যান করেন।

২৮৫ হিজরীতে বসরায় এক প্রকার হলুদ বর্ণের অন্ধকার দেখা দেয়। অতঃপর তা ক্রমান্বয়ে সবুজ এবং কালো বর্ণ ধারণ করে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর আকাশ থেকে দেড়শ' দিরহাম ওজনের একটি চাদর পড়ে। প্রবল ঝড়ে পাঁচ শতাধিক বৃক্ষ উপড়ে যায়। তারপর আসমান থেকে সাদা-কালো পাথর বর্ষিত হয়।

২৮৬ হিজরীতে বাহরাইনে আবু সাঈদের আবির্ভাব ঘটে, সে হজরে আসওয়াদ উপড়ে ফেলে। খলীফার সৈন্যদের সাথে তার লড়াই হয়। তারা পরাজিত হলে সে বসরা এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ তার হস্তগত হয়।

খতীব এবং ইবনে আসাকির আবুল হুসাইন আল-খারীবী থেকে রেওয়ায়েত করেন, একদা মুতাযদ কাযী আবু হাযিমের নিকট বলে পাঠালেন যে, অমুক ব্যক্তি আমার নিকট থেকে কর্জ নিয়েছে। আমি আপনার আদালতের মাধ্যমে আমার পাওনা ফিরে পেতে চাই। কাযী সাহেব বলে পাঠালেন, আমিরুল মুমিনীন! আল্লাহ্ তা'আলা আপনার হায়াত দারাজ করুন। আপনার স্মরণ আছে যে, আপনি আমার কাঁধে এ দায়িত্ব অর্পণের পর বলেছিলেন, আজ থেকে আদালতের এ কর্তব্য তোমার উপর বর্তাবে। অতএব সাক্ষী ছাড়া আপনার অভিযোগ কিভাবে বিশুদ্ধ হিসেবে মেনে নেয়া যেতে পারে? তিনি জানিয়ে দিলেন যে, অমুক অমুক আমার সাক্ষী। কাযী সাহেব তাদের পাঠিয়ে দিতে বললেন। খলীফার সাক্ষীদ্বয় কাযীর সামনে এসে ভয়ে বিষয়টি অস্বীকার করলে কাযী সাহেব খলীফার অভিযোগ খারিজ করে দেন।

ইবনে হামদুন নাদীম বলেন, মুতাযদ তার খাস বাঁদি এবং বিশেষ করে তার প্রিয়তমা দারীরাহকে নিয়ে উপসাগরে ষাট হাজার দিনার ব্যয়ে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করে বসবাস করার ইচ্ছা করেন। কিন্তু কিছুদিন পর দারীরাহ পরলোক গমন করায় তিনি দারুণ ব্যথিত হন।

২৮৯ হিজরীতে মুতাযদ জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে রবিউল আখের মাসের ২২ তারিখ সোমবারে ইন্তেকাল করেন। মাসউদী বলেন, মুমূর্ষু অবস্থায় একজন ডাক্তার এসে তার নাড়ীতে হাত দিলে তিনি জোরে লাথি দেন। এতে ডাক্তারের মৃত্যুর পরই তার মৃত্যু হয়।

মুতাযদ অনেক কবিতা জানতেন। তিনি চার পুত্র এবং এগারো জন কন্যা রেখে যান। তার শাসনামলে নিম্ন বর্ণিত ওলামাগণ ইন্তেকাল করেন- ইবনুল মাওয়াযী আল-মালেকী, ইবনে আবীদদুনিয়া, কাযী ইসমাঈল, হারেছ বিন আবু উসামা, আবুল আইনা মুবার্রদ, আবু সাঈদ, কবি নাহতারী প্রমুখ।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 আল-মুকতাফী বিল্লাহ

📄 আল-মুকতাফী বিল্লাহ


আল-মুকতাফী বিল্লাহ আবু মুহাম্মদ আলী বিন মুতাযদ ২৬৪ হিজরীর রবিউল আখের মাসের মাঝামাঝিতে জীজক নামক তুর্কী বাঁদীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দৃষ্টান্তহীন সুদর্শন ছিলেন। পিতা মুতাযদের খিলাফতকালেই তিনি উত্তরাধিকার মনোনীত হন। পিতার অসুস্থতার সময় ২৮৯ হিজরীর রবিউল আখের মাসের ১৯ তারিখে আসর নামাযের পর লোকেরা তার বাইআত করে।

সূলী বলেন, খলীফাদের মধ্যে তার নামটি হযরত আলী ছাড়া আর কারো ছিল না। ইমাম হাসান বিন আলী, হাদী এবং মুকতাফী ব্যতীত 'আবু মুহাম্মাদ' কারো কুনিয়ত ছিল না। মুতাযদের মৃত্যুর সময় মুকতাফী রাকা শহরে অবস্থান করছিলেন। তার অনুপস্থিতিতে উযীর আবুল হাসান কাসিম বিন উবায়দুল্লাহ তার পক্ষ থেকে বাইআত গ্রহণ করেন। তাকে খবর দেয়া হলে তিনি জমাদিউল আখের মাসের ৭ তারিখে দজলা নদী দিয়ে জাহাজ যোগে বাগদাদ এসে পৌছেন। তার আগমনে বাগদাদবাসী খুশি হয়ে তাকে স্বাগত জানায়। তিনি তখত নসীন হওয়ার পর তার পিতা লোকদের কাছ থেকে যেসব ঘর-বাড়ি দখল করেছিল তিনি সেগুলো ভেঙে তদস্থলে মসজিদ নির্মাণ করেন। যেসব বাগান এবং দোকান নেয়া হয়েছিল তিনি তা মালিকদের নিকট ফিরিয়ে দেন। এতে তিনি জনতার চোখে মহানুভবতায় পরিণত হন। লোকেরা তার জন্য দু'আ করতে থাকে।

এ বছর বাগদাদে প্রচণ্ড ভূমিকম্প হয়। এর প্রকোপ কয়েক দিন পর্যন্ত থাকে। বসরায় তীব্র ঝড়ের কারণে অনেক বৃক্ষ উপড়ে পড়ে। যার দৃষ্টান্ত পূর্ববর্তী ইতিহাসে বিরল। ইয়াহইয়া বিন যাকরুয়া কারমতীর সাথে শাহী সৈনিকদের দীর্ঘ যুদ্ধ হয়। অবশেষে ২৯০ হিজরীতে সে মারা গেলে তদস্থলে তার ভাই হুসাইন 'আমিরুল মুমিনীন মাহদী' উপাধি ধারণ করে নেতৃত্ব দেন। তার চেহারায় একটি দাগ ছিল। সেও ২৯১ হিজরীতে নিহত হন।

২৯১ হিজরীতে ইনতালিয়া প্রচুর মালে গনীমতসহ বিজিত হয়। ২৯৩ হিজরীতে দজলা নদী ফুলে-ফেঁপে এমন তরঙ্গের সৃষ্টি করে যার আকস্মিক আঘাতে বাগদাদের অধিকাংশ অংশ ধসে পড়ে। সেদিন বাগদাদের রাজপথে ২১ হাত পানি জমা হয়।

সূলী বলেন, আমি মুকতাফীর নিকট থেকে শুনেছি, তিনি মুমূর্ষু অবস্থায় বলেন, আল্লাহর কসম! আমি সেই সাত শ' দিনারের জন্য দারুণ ভীত- যা মুসলমানদের সম্পদ আমি ব্যয় করেছি। আমার ভয় হচ্ছে কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা'আলা যেন এ ব্যাপারে কোন প্রশ্ন না করেন। এ ভুলের জন্য আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

তিনি ২৯৫ হিজরীর যিলকাদা মাসের ২২ তারিখ রবিবার রাতে যুবক কালেই ইন্তেকাল করেন। আট ছেলে এবং আট মেয়ে রেখে তিনি মারা যান।

তার যুগে যেসব ওলামা হযরত মৃত্যুবরণ করেন তাঁরা হলেন- আব্দুল্লাহ বিন আহমদ বিন হাম্বল, ইমামুল আরাবী কানবাল মাকরী, মুফতী আবু আব্দুল্লাহ বুসানজী, মুসনাদের লেখক বায্যার, আবু মসনদ আল-কুযী, কাযী আবু হাযিম, সালেহ জুযাহ, মুহাম্মাদ বিন নসরুল মরুযী, আবু হুসাইন নূরী, আবু জাফর তিরমিযী প্রমুখ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00