📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 আল-মুসতায়িন বিল্লাহ

📄 আল-মুসতায়িন বিল্লাহ


মুতাওয়াক্কিলের ভাই আল-মুসতায়িন বিল্লাহ আবুল আব্বাস আহমদ বিন মুতাসিম বিন রশীদ ২২১ হিজরীতে মুখারিক নামক বাঁদির গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তার লাবণ্যময় চেহারায় বসন্তের দাগ ছিল। তিনি ছিলেন তোতলা। মুনতাসিরের ইন্তেকালের পর সাম্রাজ্যের কর্মকর্তাবৃন্দ পরামর্শক্রমে মুসতায়িনকে খলীফা মনোনীত করেন। তিনি ২৮ বছর বয়সে খিলাফতের তখতে আরোহণ করেন এবং ২৫১ হিজরী পর্যন্ত তার খিলাফত ছিল। ওসীফ এবং বাগা নামক দুই তুর্কী যারা মুতাওয়াক্কিলের হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিল তিনি তাদেরকে পৃথক করে দিলে তুর্কীরা ভয়ে সামরাহ থেকে বাগদাদে চলে যায়। অতঃপর তারা ক্ষমা প্রার্থনা করে মুসতায়িনের নিকট দূত পাঠিয়ে সামরাহ-এ ফিরে আসার অনুমতি চায়। তিনি তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। করে তুর্কীদের বন্দী করার ইচ্ছা করলে তারা মুতায বিল্লাহর নিকট বাইআত গ্রহণ করে। মুতায বিশাল বাহিনী নিয়ে মুসতায়িনের উপর হামলা করেন। মুসতায়িন নিহত হওয়ায় বাগদাদবাসী উত্তেজিত হয়ে পড়ে। উভয় বাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। এ লড়াই কয়েক মাস ধরে চলতে থাকে। হতাহত হয় অসংখ্য জনতা, যুদ্ধের দীর্ঘতর কারণে মানুষের জীবন অচল হয়ে পড়ে। অবশেষে মুসতায়িনের বাহিনী সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। তিনি সন্ধি স্থাপনের মাধ্যমে ২৫২ হিজরীতে খিলাফত থেকে সরে দাঁড়ান। এ সন্ধিতে কাযি ইসমাঈল মুসতায়িনের প্রতি কঠোর শর্তাবলী আরোপ করে। অন্যান্য কাযিগণ আরোপিত কঠোর শর্তাবলীকেই সন্ধির শর্তসমূহ হিসেবে চুক্তিপত্রে মোহর এঁটে দেয়।

মুসতায়িন ওয়াসেত শহরে চলে যান। তিনি সেখানে নয় মাস যাবত এক আমীরের নযরবন্দী হিসেবে অবস্থান করেন। অতঃপর সেই আমীর তাকে সামরাহ-এ পাঠিয়ে দেয়। মুতায আহমদ বিন তুলুনকে এক লিখিত ফরমানের মাধ্যমে মুসতায়িনকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। প্রতি উত্তরে আহমদ জানায়- খলীফার বংশধর আমি কখনই হত্যা করব না। অতঃপর এ কাজের জন্য সাঈদ হাজেবকে নিয়োগ করা হয়। ২৫২ হিজরীর শাওয়াল মাসের ৩ তারিখে যখন তার বয়স ৩১ বছর সে তাকে হত্যা করে।

মুসতায়িন সৎ, জ্ঞানী, সাহিত্যিক এবং বাগ্মী ছিলেন। তিনিই সর্বপ্রথম তিন শেলাইবিশিষ্ট জামা ও লম্বা টুপি পরিধান করেন। তার খিলাফতকালে নিম্নবর্ণিত ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন- আবদ বিন হামীদ, আবু তাহের বিন আল-সরাহ হারেস বিন মিসকীন, আবু হাতিম, জাখাত প্রমুখ।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 আল-মুতাম বিল্লাহ

📄 আল-মুতাম বিল্লাহ


২৩২ হিজরীতে আল-মুতায বিল্লাহ মুহাম্মাদ ভিন্ন মতে যাবের আবু আব্দুল্লাহ বিন মুতাওয়াক্কিল বিন রশীদ কাবীহা নামক রোমান বাঁদির গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। মুসতায়িনকে অপসারণের পর ২৫২ হিজরীতে ১৯ বছর বয়সে খিলাফতের তখতে আরোহণ করেন। ইতোপূর্বে এত অল্প বয়সে কেউ খিলাফত পাননি। তিনি টগবগে যুবক ছিলেন।

মুতাযের হাদীসের উস্তাদ আলী বিন হরব বলেন, আমি তার চেয়ে সুন্দর খলীফা আর দেখিনি। তিনিই প্রথম খলীফা যিনি ঘোড়াকে স্বর্ণের অলংকার পরান। পূর্ববর্তী খলীফাগণ স্ব স্ব ঘোড়ার গলায় হাল্কা রৌপ্যের অলংকার পরাতেন। মসনদে আরোহণের বছর ওয়াছেক কর্তৃক নিযুক্ত আশনাস নামক রাষ্ট্রের ডেপুটি কর্মকর্তা মারা যায়। তার পরিত্যক্ত সম্পদ হিসেবে পঞ্চাশ হাজার দিনার রেখে যায়- যা মুতায হস্তগত করেন। তার মৃত্যুর পর মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বিন তাহেরকে নায়েব মনোনীত করেন। তিনি সর্বদা নিজের কাছে দু'টি তলোয়ার বেঁধে রাখতেন। কিছুদিন পর তাকে অপসারণ করে তদস্থানে নিজের ভাই আবু আহমদকে নিয়োগ করেন। তিনি সোনার মুকুট পরতেন এবং দু'টি তলোয়ার বহন করতেন। তাকেও অপসারিত করে ওয়াসেত শহরে পাঠিয়ে দেয়া হয়। অতঃপর মদ্যপ বাগাকে নায়েবের দায়িত্ব দেয়া হয়। সেও শাহী মুকুট পরত। সে এক বছর পর মুতাযের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। অবশেষে তাকে হত্যা করা হয় এবং তার কর্তিত মস্তক মুতাযের সামনে হাজির করা হয়।

এ বছর রযব মাসে তিনি তার ভাই মুঈদ বিল্লাহকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করেন। বেত্রাঘাত করান এবং বন্দী করে রাখেন। এতে মুঈদ পরলোক গমন করলে মুতায ভয় পেয়ে যান। হত্যার অপরাধে যেন অভিযুক্ত না হন সে জন্য তিনি কাযীদের ডেকে সাক্ষ্য প্রদান করেন। কিন্তু এতে কোন আছর হলো না।

মুতায তুর্কীদের বিশেষ করে সালেহ বিন ওসীফকে দেখে দারুণ ভয় পেতেন। একদিন তুর্কীরা অর্থের বিনিময়ে সালেহকে হত্যার কথা জানালে মুতায তার মায়ের কাছে কিছু অর্থ চাইলে তিনি তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। সে সময় কোষাগারে কোন অর্থকড়ি ছিল না। ঘুষ প্রদানে বিলম্ব হওয়ায় তুর্কীরা সালেহ বিন ওসীফ এবং মুহাম্মাদ বিন বাগাকে সাথে নিয়ে অস্ত্র সজ্জিত হয়ে রাজ প্রাসাদে প্রবেশ করে মুতাযকে বেরিয়ে আসতে বলে, তিনি অসুস্থ বেরিয়ে আসতে পারবেন না- এ কথা জানিয়ে দেন। তারা কোলাহল করতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা ভেতরে প্রবেশ করে। মুতাযের পা ধরে বাইরে নিক্ষেপ করে। তাকে মারতে মারতে মুখ লাল করে দেয়া হয়। গরমের সময় ছিল, তুর্কীরা তাকে রোদে দাঁড় করিয়ে রাখে। তারা মুতাযকে তার বাইআত থেকে সরে হবার জন্য চাপ দেয়। অতঃপর কাযী বিন আবু শিওয়ারিবকে ডাকা হয়। তার সামনে তিনি নিজ বাইআত থেকে সরে যান। তারপর মুহাম্মাদ বিন ওয়াছেক- যাকে মুতায বাগদাদে পাঠিয়ে দিয়েছিল তিনি বাগদাদ থেকে রাজধানী সামরাহ-এ এসে পৌছলে তিনি তার উপর খিলাফতের দায়িত্ব অর্পণ করেন এবং তার হাতে বাইআত করেন।

এ ঘটনার পাঁচ দিন পর এক দল লোক এসে গোসল করানোর জন্য মুতাযকে হাম্মামে নিয়ে যায়। গোসলের পর তার পিপাসা লাগে। তাকে পানি দেয়া হয়নি। হাম্মাম থেকে বেরিয়ে এসে তাকে বরফের পানি খাওয়ানো হলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে ইন্তেকাল করেন। তিনিই প্রথম খলীফা যিনি পিপাসায় কাতর হয়ে ২৫৫ হিজরীর শাওয়াল মাসের ৮ তারিখে পরলোক গমন করেন।

প্রথমে মুতাযের জননী কাবীহা তাদের ভয়ে আত্মগোপন করে ছিল। পরে রমযান মাসে বেরিয়ে এসে সালেহ বিন ওসীফকে অনেক ধন-দৌলত অর্থাৎ তের লাখ দিনার এবং দুটি জামা। তন্মধ্যে একটি জামায় জমরুদ এবং অপরটিতে মতি ও ইয়াকুত জড়ানো ছিল। এ দু'টি জামার আনুমানিক মূল্য দুই হাজার দিনার। এত সম্পদ দেখে ইবনে ওসীফ বলল, এত সম্পদ থাকার পরও পঞ্চাশ হাজার দিনারের জন্য এ নারী তার আপন ছেলেকে হারিয়েছে। ইবনে ওসীফ তার কাছ থেকে এগুলো নিয়ে তাকে মক্কা শরীফে পাঠিয়ে দেয়। কাবীহা মুতামাদের খিলাফত পর্যন্ত সেখানেই ছিল। অতঃপর সে সামরাহ ফিরে আসে এবং ২৬৪ হিজরীতে পরলোক গমন করে। মুতাযের যুগে যেসব ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন তারা হলেন- সারী সাকতী, হারুন বিন সাঈদ, মুসনাদের লেখক দারমী, আকবী প্রমুখ।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 আল-মুহতাদী বিল্লাহ

📄 আল-মুহতাদী বিল্লাহ


আল-মুহতাদী বিল্লাহ খালীফাতুস সালেহ মুহাম্মাদ আবু ইসহাক ভিন্ন মতে আবু আব্দুল্লাহ বিন ওয়াছেক বিন মুতাসিম বিন হারুন রশীদ ওরদাহ নাম্নী বাঁদির গর্ভে ২১০ হিজরীর পর তার দাদার শাসনামলে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ২৫৫ হিজরীর রযব মাসের ১৯ তারিখে তখতে খিলাফত প্রাপ্ত হন। মুতায সর্বপ্রথম তার বাইআত করেন এবং নিজ খিলাফত তার উপর অর্পণ করেন। মুতাযের সামনে তাকে বসানো হয়। মুতায কাযীর সামনে সাক্ষ্য দেন। কাযী বলেন, মুতায খিলাফত পরিচালনায় অপারগ। মুতায কাযীর কথা স্বীকার করেন। মুহতাদী এ কথা শুনে বাইআতের জন্য নিজের হাত বাড়িয়ে দিলে মুহতাদী সর্বপ্রথম বাইআত করেন। অতঃপর তিনি মজলিসের মধ্যভাগে এসে উপবেশন করেন।

মুহতাদী সুদর্শন, ইবাদত গুজার, দানশীল, বুদ্ধিমান, আল্লাহ তা'আলার বিধানাবলী চালু করার ক্ষেত্রে বদ্ধপরিকর এবং সাহসী ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু তার কোন সাহায্যকারী ছিল না। খতীব বলেন, মুহতাদী খলীফা হওয়া থেকে আরম্ভ করে নিহত হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন রোযা রাখতেন।

হাশিম বিন কাসিম বলেন, আমি একদিন রমযান মাসে মুহতাদীর কাছে বসে ছিলাম, আমি উঠে আসার ইচ্ছা করলে তিনি আমাকে বসিয়ে দিলেন। ইফতার করে তিনি নামায পড়ালেন। অতঃপর আবার খানা চাইলেন। এক ডালা ভর্তি খানা এলো। এতে ছিল ময়দার রুটি, এক বাটি সিরকা এবং যয়তুন তেল। তিনি আমাকে খেতে বললেন। আমি খেতে আরম্ভ করলাম। আমার মনে হল আরো খানা আসবে। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি কি রোযা ছিলে না? আমি বললাম, ছিলাম। তিনি বললেন, আগামীকাল রোযা রাখবে না? আমি বললাম, রমযান শরীফের রোযা কেন রাখব না? তিনি বললেন, ভালো করে খাও, তবে আর কোন খানা আসবে না। আমার কাছে এছাড়া আর কোন খানা নেই। আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম, আমিরুল মুমিনীন! আল্লাহ তা'আলা আপনাকে অনেক নেয়ামত দিয়েছেন। তিনি বললেন, এটা তুমি ঠিকই বলেছ। আমি বনূ উমাইয়‍্যার খলীফা হযরত উমর বিন আব্দুল আযীযের জীবন নিয়ে চিন্তা করেছি। তিনি স্বল্প ভোজন এবং জনগণের চিন্তার কারণে পাতলা ছিলেন- যা তুমি জান। অতঃপর আমি নিজ খান্দানের প্রতি দৃষ্টি ফেরায়ে আমি দারুণ মর্মাহত হয়েছি। লোকেরা আমাদের বন্ হাশিম বলে। অথচ তারা যা ছিল না আমরা তা গ্রহণ করেছি। যা তুমি দেখছ।

জাফর বিন আব্দুল ওহেদ বলেন, মুহতাদীর সাথে আলাপ চারিতার এক পর্যায়ে আমি বললাম, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (র.) এ কথাই বলেছেন এবং আপনার বাবা এবং দাদা এ মাসয়ালার উপরই কাজ করেছেন। তিনি বললেন, আল্লাহ তা'আলা ইমাম আহমদের উপর রহম করুন। আমার পিতার সাথে সম্পর্কোচ্ছেদ করা জায়েয হলে সঙ্গে সঙ্গে আমি তা করতাম। অতঃপর তিনি আমাকে বললেন, সর্বদা সত্য কথা বলবে। যে সত্য কথা বলে সে আমার দৃষ্টিতে অধিক প্রিয়।

তাফতুয়া বলেন, জনৈক হাশেমী বর্ণনা করেন, আমরা মুহতাদীর কাছে একখানা পোশাক বক্স দেখেছি। যাতে তিনি একটি জামা এবং একটি কম্বল রাখতেন। রাতে তিনি এ দু'টো পরে নামায আদায় করতেন। মুহতাদী লোকদের ক্রীড়া-কৌতুক ও খেলাধুলা করতে নিষেধ করেন। এর সামগ্রীগুলো ফেলে দেন। গান বাজনা হারাম ঘোষণা করেন। প্রশাসকদের অত্যাচার থেকে জনগণকে রক্ষা করেন। তিনি নিজেই বিচারালয়ে বসতেন। তিনি নিজেই কেরানীদের কাছ থেকে হিসাব নিতেন। সোমবার এবং বৃহস্পতিবারে অবকাশে থাকতেন। রুসার একটি দলকে বেত্রাঘাত করেন। রাফেযী হয়ে যাওয়ার সংবাদ পেয়ে দারুণ ঘৃণায় তিনি জাফর বিন মাহমুদকে বাগদাদে পাঠিয়ে দেন।

মুতাযের রক্তের প্রতিশোধ নেবার জন্য মূসা বিন বাগা রায় থেকে একদল সৈন্যসহ খিলাফতের রাজধানী সরমন রায়ে সালেহ বিন ওসীফকে হত্যা করার জন্য আসে। মূসার আগমন সংবাদ পেয়ে জনগণ ওসীফকে লক্ষ্য করে বলল, হে ফিরাউন তোমার জন্য এক মূসা এসে পড়েছে। মূসা এসে খলীফার নিকট অনুমতি চাইল। তিনি প্রত্যাখ্যান করলেন। সে সময় তিনি আদালতে বসে ছিলেন। মূসা তার উপর জনতাকে লেলিয়ে দিল। তার সৈন্যরা খলীফাকে একটি দুর্বল ঘোড়ায় উঠিয়ে প্রাসাদ লুণ্ঠন করে। খলীফা বললেন, মূসা আল্লাহ তা'আলাকে ভয় কর। তোমার উদ্দেশ্য কি? সে বলল, আল্লাহর কসম, আমার উদ্দেশ্য ভালো, আপনি আমাদের নিকট প্রতিশ্রুতি দিন যে, আপনি সালেহ বিন ওসীফের পক্ষপাতিত্ব করবেন না। মুহতাদী শপথ করলেন। মূসা সদলবলে খলীফার বাইআত করল। অতঃপর সালেহ বিন ওসীফের কৃত অপরাধের শাস্তি প্রদানের জন্য তাকে ডাকা হয়। সে আত্মগোপন করে। মুহতাদী তার সাথে সন্ধি করার চেষ্টা শুরু করেন।

এতে জনতার কথা বলার সুযোগ হলো যে, সালেহ কোথায় আত্মগোপন করেছে তা খলীফা জানেন। আমিরুল মুমিনীনকে অপসারণের চক্রান্ত হয়। এটা জানতে পেয়ে মুহতাদী একদিন সকালে তলোয়ার হাতে বেরিয়ে এসে বললেন, আমাকে মুসতায়িন এবং মুতায ভেবো না। আল্লাহর কসম! আমি রাগান্বিত হলে জীবনের কোন মায়া নেই। এটা আমার তলোয়ার, এটা আমার হাতে থাকা অবস্থায় হত্যা করেই যাব; দ্বীন, শরম এবং তাকওয়া বলতে কিছু জিনিস রয়েছে। খলীফাদের সাথে শত্রুতা মানে আল্লাহ তা'আলার বিরোধিতা করা। আমার কাছে সালেহ-এর কোন সংবাদ নেই। এ কথা শুনে লোকেরা সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে যায়। মূসা বিন বাগা সালেহকে ধরে আনতে পারলে দশ হাজার দিনার পুরস্কার ঘোষণা করে। কিন্তু কেউ তাকে ধরতে পারল না।

গ্রীষ্মকাল, প্রচণ্ড গরমের কারণে এক যুবক একটি ভূগর্ভস্থ কক্ষে ঢুকে পড়ে। সেখানে সালেহকে দেখে সে চিনতে পারে। যুবকটি এসে মূসাকে জানিয়ে দেয়। সে কয়েকজন লোক পাঠিয়ে তার মাথা কেটে আনে। এতে মুহতাদী দারুণ মর্মাহত হন। মূসা বাকিয়ালের সাথে সন-এ গমন করলে মুহতাদী মূসাকে হত্যা করার জন্য বাকিয়ালের নিকট লিখিত ফরমান পাঠান। বাকিয়াল তা মূসার সামনে পেশ করলে সে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। সে-ই মুহতাদীকে হত্যা করার জন্য ফিরে এল। উভয়ের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে গেল। একদিনেই নিহত হল চার হাজার তুর্কী, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত খলীফার বাহিনী পরাজিত হল। তিনি বন্দী হলেন। তাকে মেরে ফেলা হল।

মুহতাদী ২৫৬ হিজরীর রযব মাসে নিহত হন। এ হিসাবে তিনি পনেরো দিন কম এক বছর খিলাফত পরিচালনা করেছিলেন। তুর্কীরা যখন মুহতাদীকে আক্রমণ করে তখন প্রজাবৃন্দ মসজিদগুলোতে এ কথাটি লিখে ঝুলিয়ে দেয়- হে মুসলমানগণ! উমর বিন আব্দুল আযীযের মত ন্যায়পরায়ণ খলীফাকে সাহায্য কর এবং তার বিজয়ের জন্য আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা কর।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 আল-মুতামাদ আলাল্লাহ

📄 আল-মুতামাদ আলাল্লাহ


আল-মুতামাদ আলাল্লাহ আবুল আব্বাস (আবু জাফর) আহমদ বিন মুতাওয়াক্কিল বিন মুতাসিম বিন হারুন রশীদ ২২৯ হিজরীতে ফিতয়ান নাম্নী রোমান বাঁদির গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। মুতামাদ নিহত হওয়ার সময় তিনি জুসিকে বন্দী ছিলেন। তাকে বের করে লোকেরা তার হাতে বাইআত করে। তিনি স্বীয় ভ্রাতা মোফিক তলহাকে পূর্বাঞ্চলীয় গভর্নর নিয়োগ করেন। পুত্র জাফরকে উত্তরাধিকার মনোনীত করে মিসর এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় গভর্নর পদে নিয়োগ দেন। তার লকব মফুয ইলাল্লাহ রাখা হয়। তিনি আরাম আয়েশ, খেলাধুলা এবং মুসলিম উম্মাহ সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়লে জনসাধারণ অসন্তুষ্ট হয়ে তার ভাই তালহার দিকে ঝুঁকে পড়ে।

মুতামাদের খিলাফতকালে বসরা এবং তার পার্শ্ববর্তী জনপদগুলো দস্যু কর্তৃক আক্রান্ত হয়। দস্যুরা শহরে নারকীয় তাণ্ডব চালায়। লুণ্ঠন করে শহরময় আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। মুসলিম বাহিনীর সাথে তাদের লড়াই হয়। এরপর ইরাকে মহামারী ছড়িয়ে পড়ে। এতে সহস্রাধিক মাখলুকের প্রাণহানি ঘটে। মহামারীর পর ভূমিকম্পেও সহস্রাধিক পশু-প্রাণীর জীবন সাঙ্গ ঘটে।

এদিকে ২৭০ হিজরী পর্যন্ত দস্যুদের সাথে লড়াই চলতে থাকে। এ বছর দস্যু সরদার বাহবুদ আল্লাহ তার প্রতি অভিশাপ বর্ষণ করুন নিহত হয়। সে রিসালতের দাবী করে বলত, আমি আলেমুল গায়েব। সে ১৫ লাখ মুসলমানকে হত্যা করেছিল। একদিনে বসরায় সে ৩ লাখ মুসলমান হত্যা করে। সে মিম্বরে দাঁড়িয়ে হযরত উসমান, হযরত আলী, হযরত মুআবিয়া, হযরত তালহা, হযরত যুবায়ের এবং হযরত আয়শা (রা.)-কে গালি দিত। এক এক উলুবিয়া নারীকে ২/৩ দিরহামে নিলামে বিক্রি করত। একেক দস্যুর কাছে দশ জন উলুবিয়া নারী বাঁদি হিসেবে ছিল। এ অসৎ লোকটি নিহত হলে তার কর্তিত মাথা বর্শায় গেঁথে বাগদাদের পথে পথে ঘোরানো হয়। এতে করে লোকেরা আনন্দ করে এবং দস্যুদের সাথে লড়াইরত মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক তালহাকে ধন্যবাদ জানায় এবং কবিগণ তার প্রশংসায় কাব্য রচনা করে।

২৬০ হিজরীতে ইরাকে ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ফলে এক বস্তা গমের দাম এক শ' দিনারে গিয়ে পৌছে। এ বছর রোমানরা লুলু শহর দখল করে নেয়। ২৬১ হিজরীতে পুত্র জাফরকে উত্তরাধিকার এবং তারপর ভাই তালহাকে উত্তরাধিকার মনোনীত করেন। জাফরকে শাম, জাযিরা এবং আরমেনিয়ার গভর্নর পদে নিয়োগ দেন। আর তালহাকে ইরাক, বাগদাদ, হিজায, ইয়ামন, ফারিস, ইস্পাহান, রায়, খুরাসান, তবরিস্তান, সিজিস্তান এবং সনদের গভর্নর নিযুক্ত করেন। তিনি দু'জনের জন্য পৃথক দু'টি পতাকা নির্বাচন করেন। সাম্রাজ্যের প্রধান বিচারপতিকে ডেকে উভয়ের মাঝে লিখিত চুক্তি সম্পাদন করেন যে, জাফরের অবর্তমানে তালহার রায় চূড়ান্ত। এ চুক্তিপত্র প্রধান বিচারপতি ইবনে আবু শাওয়ারিব খানায়ে কাবার দেয়ালে ঝুলিয়ে দেন।

২৬৬ হিজরীতে রক্ত ঝরিয়ে দেয়ারে বকর জনপদটি দখল করে নেয়। ফলে জাযিরাবাসী এবং মওসূলবাসী সেখান থেকে পালিয়ে যায়। এ বছর গ্রাম্য লোকেরা কাবা শরীফের গেলাফ চুরি করে নিয়ে যায়।

২৬৭ হিজরীতে আহমদ বিন আব্দুল্লাহ আল-হিজাবী খুরাসান, সিজিস্তান এবং কারমান দখল করার পর ইরাক দখলের পাঁয়তারা করলে তার গোলামরা তাকে হত্যা করে।

মুতামাদের ভাই মুফিক (তালহা) ২৬৪ হিজরীতে সৈন্য বাহিনীসহ মুতামাদের উপর আক্রমণ করে। এতে মুতামাদ মর্মাহত ও হতাশ হন। অবশেষে ২৬৯ হিজরীতে মিসরের ডেপুটি প্রশাসক ইবনে তুলুনের সাথে মুতামাদের পত্রাদি বিনিময়ের মাধ্যমে যে কথা হয় তার ভিত্তিতে ইবনে তুলুন সসৈন্যে এবং মুতামাদ সামরাহ থেকে দামেশকের উদ্দেশে রওয়ানা করেন। এ সংবাদ পেয়ে মুফিক লিখিতভাবে ইসহাক বিন কানদাজকে জানালো যে, যে কোনভাবে মুতামাদকে ফিরিয়ে আনতে হবে। ইসহাক নাসীবীন শহর থেকে মুতামাদের উদ্দেশে যাত্রা করে। মওসূল এবং হাদীসার মধ্যবর্তী স্থানে উভয়ের সাক্ষাত হলে ইসহাক বলল, আমিরুল মুমিনীন! আপনার ভাই আপনার দুশমনদের সাথে লড়াই করছে। আর আপনি খিলাফতের রাজধানী ছেড়ে কোথায় চলেছেন? শত্রুরা জানতে পেলে চতুর্দিক থেকে আক্রমণ করে আপনার বাপ-দাদার সাম্রাজ্য দখল করে নিবে। আর সে সময় আপনার কিছুই করার থাকবে না।

ইসহাক মুতামাদের গতিবিধির উপর সর্বদা নযর রাখার জন্য বিশ্বস্ত কিছু লোক নিযুক্ত করেছিল। সে মুতামাদকে জানালো, এ স্থান আপনার জন্য নিরাপদ নয়। এখান থেকে ফিরে যেতে হবে। মুতামাদ বললেন, আমার কাছে শপথ কর যে, তোমরা আমাকে কষ্ট দিবে না এবং আমাকে শত্রুর হাতে তুলে দিবে না? ইসহাক শপথ করল। অতঃপর তিনি সামরাহর দিকে রওয়ানা করেন। পথিমধ্যে মুফিকের কেরানী সাদ বিন মুখাল্লাদের সাথে সাক্ষাত হয়। ইসহাক মুতামাদকে সাদের নিকট হস্তান্তর করে। সে অন্যত্র চলে যায়। সাদ তাকে রাজধানীতে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। সে তাকে আহমদ বিন খাসীবের বাড়িতে নিয়ে যায় এবং পাঁচ'শ অশ্বারোহী মুতামাদকে রাজধানীতে প্রবেশ না দেবার জন্য নিযুক্ত রাখে। সংবাদ পেয়ে মুফিক ইসহাককে বৃত্তি ও জায়গীর প্রদান করে এবং যুল সানাদাইন উপাধি দেয়। আর সাদকে যুল ওয়াযারাতাইন উপাধি দেয়।

মুতামাদ সাদের হাতে গৃহবন্দী ছিলেন। তার কোন কাজ করার ইখতিয়ার ছিল না। তিনি নিজের এ অপারগতা ও অসহায়ত্বকে উপজীব্য করে একটি কবিতা রচনা করেন- "আশ্চর্য! আমি বাদশাহ, অথচ আমার ইখতিয়ারে কোন জিনিস নেই। আমি বাদশাহ হয়েও আমার লোকবল কম।"

তিনি প্রথম খলীফা যিনি নিপতিত হন, তার উপর লোকের পাহারা বসানো হয় এবং তার অপবাদ ছড়ানো হয়। অতঃপর মুতামাদ মধ্যস্থতায় আসেন। এ খবর পেয়ে ইবনে তুলুন বিচারক এবং আমীর উমরাহদের ডেকে বলল, মুফিক আমিরুল মুমিনীনকে বন্দী করে রেখেছেন। অতএব তার বাইআত থেকে পৃথক হওয়া উচিত, কাযি বাকার বিন কীতীয়াহ ব্যতীত সকলেই সমর্থন জানাল। কাযী বাকার বললেন, তোমরাই প্রথমে আমার সামনে মুতামাদের উত্তরাধিকার সংক্রান্ত ফরমান পেশ করেছ- যার কারণে তাকে উত্তরাধিকার বানানো হয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা স্বয়ং মুতামাদের নিকট থেকে তার পৃথকীকরণের হুকুমনামা না দেখাবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি অনুমতি দিব না। এর জবাবে ইবনে তুলুন বলল, এ মুহূর্তে মুতামাদ বন্দী এবং গযবে নিপতিত, এজন্য তিনি ফরমান লিখতে পারবেন না। কাযী বাকার বললেন, আমি এ অবস্থায় কোন হুকুম দিতে পারি না। ইবনে তুলুন বলল, পৃথিবীব্যাপী প্রসিদ্ধ যে, কাযী বাকার এত অনন্য ও অদ্বিতীয় বিচারক, এজন্য তোমার অহংকার হয়েছে। আসলে তোমার বিবেক বৃদ্ধতার দংশনে ক্ষত-বিক্ষত। এ কথা বলে ইবনে তুলুন কাযী বাকারকে বন্দী করল এবং যতগুলো উপহার সামগ্রী তাকে দেয়া হয়েছিল সবগুলো জব্দ করা হল। এর আনুমানিক মূল্য ছিল দশ হাজার দিনার। কথিত আছে, এ কথা জানতে পেয়ে মুফিক বলল, তোমরা মিম্বরে আরোহণ করে ইবনে তুলুনকে অভিশাপ দাও।

২৭০ হিজরীতে মুতামাদ সামরাহ-এ ফিরে আসেন। এ সময় তার সাথে সর্বদা একদল সৈন্য থাকত, যা দ্বারা মনে হত তিনি পূর্ণ স্বাধীন। এ বছর ইবনে তুলুনের ইন্তেকাল হয়। মুফিক তদস্থলে স্বীয় পুত্র আবুল আব্বাসকে মিসরের গভর্নর নিয়োগ করে। আবুল আব্বাস একদল সৈন্যসহ মিসরে যায়। এদিকে খামারিয়া বিন আহমদ বিন তুলুন আগেই বাবার আসনে অধিষ্ঠিত হয়। উভয়ের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। এতে মিসরবাসীর ললাটে বিজয় চুম্বন করে। এ বছর বাগদাদে দজলা নদীর বাঁধ ফেটে যাওয়া বাগদাদ নগরী প্লাবিত হয়। এতে করে সাত হাজার ঘর-বাড়ি ধসে পড়ে। এ বছর রোমানরা এক লাখ সৈন্য নিয়ে তরতুস আক্রমণ করে। এতে মুসলমানরা জয়লাভ করে। এ যুদ্ধে প্রচুর গনীমত মুসলমানদের হস্তগত হয়।

এ বছর আব্দুল্লাহ বিন উবায়েদ নিজেকে ইমাম মাহদী দাবী করে। সে এ আকীদার উপর অটল থেকে ২৭৮ হিজরীতে হজ্ব পালন করতে গেলে কেনানা গোত্রের লোকেরা তার অনুসরণ করে।

সূলী বলেন, ২৭১ হিজরীতে হারুন বিন ইবরাহীম আল-হাশেমীর নির্দেশে বাগদাদে শুধু পয়সার প্রচলন ঘটে। এ ব্যবস্থা কিছুদিন চালু থাকে। ২৭৮ হিজরীতে নীলনদ শুষ্ক হয়ে যাওয়ায় মিসরে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এ বছর মুফিকের পরলোক গমনে মুতামাদের স্বস্তির নিঃশ্বাস নসীব হয়। এ বছর কুফায় কারমাহ নামক একটি দলের আবির্ভাব ঘটে। এরা ছিল পথভ্রষ্ট ও ফাসিক। তারা ফরয গোসলকে নাজায়েয এবং মদ পানকে জায়েয বলত। তারা আযানের মধ্যে এ শব্দটি বৃদ্ধি করে ان ان محمد بن الحنفية رسول الله - ফরয সাব্যস্ত করত, বাইতুল মুকাদ্দিসে হজ্ব করত এবং তাকেই কেবলা বানিয়েছিল। এরূপে শরীয়তে তারা অনেক জিনিসের কম বেশি করে। তাদের মতবাদটি জাহেল, বর্বর ও অসভ্য লোকেরা গ্রহণ করে।

২৭৯ হিজরীতে আবু ফজল বিন মুফিকের প্রতি সেনা বাহিনীর আনুগত্য এবং নিজের দুর্বলতা ও অপারগতার কারণ মুতামাদ নিজ ছেলেকে উত্তরাধিকার থেকে অপসারণ করে আবুল ফজল বিন মুফিককে উত্তরাধিকার মনোনীত করেন এবং তাকে মুতাযদ উপাধি দেন। এ বছর মুতাযদ মিথ্যা গল্প, নোবেল-নাটক, দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা সংক্রান্ত গ্রন্থাদি ক্রয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এর কয়েক মাস পর ২৭৯ হিজরীর রযব মাসের ১৯ তারিখ সোমবারে ২৩ বছর রাষ্ট্র পরিচালনার পর ইন্তেকাল করেন। কেউ কেউ বলেন, তাকে বিষ খাওয়ানো হয়। কারো মতে রাতের আঁধারে তাকে গলাটিপে হত্যা করা হয়েছে।

মুতামাদের যুগে নিম্নবর্ণিত ওলামায়ে কেরাম এ নশ্বর জগত ত্যাগ করেন- হযরত ইমাম মুসলিম, হযরত আবু দাউদ, হযরত তিরমিযী, হযরত ইবনে মাজা, রাবীহুল জায়যী, রবীহুল মুরাদী, ইউসুফ বিন আব্দুল আলী, যাবের বিন বাকার, আবুল ফজল আর-রিয়াশী, মুহাম্মাদ বিন ইয়াহইয়া যাহলী, হাজ্জাজ বিন শায়ের আজালী আল-হাফেজ, কাযীউল কুযযাত ইবনে আবু শাওয়ারিব সুসী আল-মাকরী, উমর বিন শায়বা, আবু যরআ আর-রাযী, মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল হাকাম, কাযী বাকার, দাউদ যাহেরী, ইবনে দারাহ, বাকা বিন মুখাল্লাদ, ইবনে কুতায়বা, আবু হাতিম আর-রাযী প্রমুখ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00