📄 আল-মুনতাসির বিল্লাহ
আল-মুনতাসির বিল্লাহ মুহাম্মাদ আবু জাফর (অথবা আবু আব্দুল্লাহ) বিন মুতাওয়াক্কিল বিন মুতাসিম বিন হারুন রশীদ জায়শা নাম্নী রোমান বাঁদির গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সুদর্শন, প্রতাপান্বিত, জ্ঞানী, সৎ কাজের অনুরাগী, জুলুম নিঃশেষকারী এবং আলী পরিবারের প্রতি দয়ার্দ্র ছিলেন, হযরত ইমাম হুসাইনের কবর শরীফ যিয়ারতের অনুমতি দেন এবং তার বংশধরদের নিকট ফিদকের বাগান হস্তান্তর করেন।
মুনতাসির তার পিতা নিহত হওয়ার পর ২৪৭ হিজরীর শাওয়াল মাসে খিলাফতের তখতে আরোহণ করে সর্বপ্রথম স্বীয় ভ্রাতাদ্বয় মুতায এবং মুঈদকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করেন- যাদেরকে মুতাওয়াক্কিল উত্তরাধিকার মনোনীত করেছিলেন। প্রজাবৃন্দের মাঝে ন্যায় ও ইনসাফ ছড়িয়ে দেবার কারণে জনগণ তার প্রতাপের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। তিনি উঁচু মাপের ধৈর্যশীল। তার চয়নকৃত বাণীর মধ্যে এটি একটি- ক্ষমার স্বাদ শাস্তি প্রদানের স্বাদের চেয়ে বেশি মিষ্টি, ভদ্র লোকদের জন্য প্রতিশোধ গ্রহণ এক লজ্জাকর কাজ।
খিলাফতের মসনদে সমাসীন হয়ে তুর্কীদের সমালোচনা করেন, তাদের প্রতি খলীফা মুতাওয়াক্কিলকে হত্যার দোষ চাপিয়ে দেন এবং এ কারণে তাদের শাস্তি প্রদান করেন। ফলে তুর্কীরা হতাশ হয়ে পড়ে। কারণ তিনি ধৈর্যশীল, সাহসী এবং জ্ঞানী, অবশেষে তারা মুনতাসিরের চিকিৎসকের নিকট ত্রিশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা ঘুষ পাঠায়। চিকিৎসক খলীফার ঔষধে বিষ মাখিয়ে দেয়। এতে তার মৃত্যু হয়। কেউ কেউ বলেন, ভুলক্রমে বিষ মিশ্রিত ঔষধ সেবনের ফলে চিকিৎসক নিজেই পরলোকগমন করে। কেউ কেউ বলেন, অন্তিম মুহূর্তে খলীফা মুনতাসির বলেন, হে আমার জননী! দীন-দুনিয়া উভয় জগৎ আমার শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমার বাবার ইন্তেকালের কারণ আমি নিজেই।
মুনতাসির ২৪৮ হিজরীর রবিউল আখের মাসের ৫ তারিখে ২৪ বছর বয়সে প্রায় ছয় মাস খিলাফত পরিচালনা করে ইন্তেকাল করেন। কথিত আছে, একদিন মুনতাসির খেলাধুলার জন্য বসে আছেন। তার বাবার খাযানা থেকে একখানা কার্পেট সেই মজলিসে পাঠানো হয়। কার্পেটের মাঝে জনৈক আরোহীর চিত্র অঙ্কিত ছিল। আরোহীটি মুকুট পরিহিত ছিল। এর আশেপাশে ফার্সী ভাষায় কিছু লিখা ছিল। মুনতাসির ফার্সী ভাষায় পারদর্শী একজনকে ডেকে এর ভাবার্থ জানানোর জন্য বললেন, সে একবার পড়ে চুপ হয়ে গেল। তিনি আবার বললেন, এর ভাবার্থ কি? সে বলল, এর কোন অর্থ নেই। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, লিখা আছে-আমি শিরওয়া বিন কিসরা বিন হরমুয। আমি স্বীয় পিতাকে হত্যা করেছি। কিন্তু ছয় মাসের বেশি রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পাইনি, এ কথা শুনে স্বর্ণ খচিত থাকার পরও তিনি কার্পেটটি জ্বালিয়ে দেবার নির্দেশ দেন।
লাতায়িফুল মাআরিফ গ্রন্থে ছালাবী লিখেছেন, মুনতাসির খিলাফত প্রাপ্ত হয়ে প্রকৃত খলীফায় পরিণত হন। কারণ তার বাবা-দাদা সহ পাঁচজন সকলেই খলীফা ছিলেন। মুনতাসিরের ভাই মুতায এবং মুতামাদও প্রকৃত খলীফা ছিলেন। আমি (গ্রন্থকার) বলছি, মুসতাসিমও এমন খলীফা ছিলেন, যাকে তাতাররা শহীদ করে দেয়। তার বাবা-দাদা সহ পূর্বপুরুষও খলীফা ছিলেন। ছালাবী বলেন, কিসরা বংশে যে বাদশাহ খালেস তিনি হলেন শিরওয়া, তিনি নিজ পিতাকে হত্যা করেন এবং ছয় মাসের বেশি জীবিত ছিলেন না। বন্ আব্বাসের মধ্যে খালেস খলীফা মুনতাসির, তিনিও নিজ পিতাকে হত্যা করেন এবং ছয় মাসের বেশি জীবিত ছিলেন না।
📄 আল-মুসতায়িন বিল্লাহ
মুতাওয়াক্কিলের ভাই আল-মুসতায়িন বিল্লাহ আবুল আব্বাস আহমদ বিন মুতাসিম বিন রশীদ ২২১ হিজরীতে মুখারিক নামক বাঁদির গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তার লাবণ্যময় চেহারায় বসন্তের দাগ ছিল। তিনি ছিলেন তোতলা। মুনতাসিরের ইন্তেকালের পর সাম্রাজ্যের কর্মকর্তাবৃন্দ পরামর্শক্রমে মুসতায়িনকে খলীফা মনোনীত করেন। তিনি ২৮ বছর বয়সে খিলাফতের তখতে আরোহণ করেন এবং ২৫১ হিজরী পর্যন্ত তার খিলাফত ছিল। ওসীফ এবং বাগা নামক দুই তুর্কী যারা মুতাওয়াক্কিলের হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিল তিনি তাদেরকে পৃথক করে দিলে তুর্কীরা ভয়ে সামরাহ থেকে বাগদাদে চলে যায়। অতঃপর তারা ক্ষমা প্রার্থনা করে মুসতায়িনের নিকট দূত পাঠিয়ে সামরাহ-এ ফিরে আসার অনুমতি চায়। তিনি তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। করে তুর্কীদের বন্দী করার ইচ্ছা করলে তারা মুতায বিল্লাহর নিকট বাইআত গ্রহণ করে। মুতায বিশাল বাহিনী নিয়ে মুসতায়িনের উপর হামলা করেন। মুসতায়িন নিহত হওয়ায় বাগদাদবাসী উত্তেজিত হয়ে পড়ে। উভয় বাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। এ লড়াই কয়েক মাস ধরে চলতে থাকে। হতাহত হয় অসংখ্য জনতা, যুদ্ধের দীর্ঘতর কারণে মানুষের জীবন অচল হয়ে পড়ে। অবশেষে মুসতায়িনের বাহিনী সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। তিনি সন্ধি স্থাপনের মাধ্যমে ২৫২ হিজরীতে খিলাফত থেকে সরে দাঁড়ান। এ সন্ধিতে কাযি ইসমাঈল মুসতায়িনের প্রতি কঠোর শর্তাবলী আরোপ করে। অন্যান্য কাযিগণ আরোপিত কঠোর শর্তাবলীকেই সন্ধির শর্তসমূহ হিসেবে চুক্তিপত্রে মোহর এঁটে দেয়।
মুসতায়িন ওয়াসেত শহরে চলে যান। তিনি সেখানে নয় মাস যাবত এক আমীরের নযরবন্দী হিসেবে অবস্থান করেন। অতঃপর সেই আমীর তাকে সামরাহ-এ পাঠিয়ে দেয়। মুতায আহমদ বিন তুলুনকে এক লিখিত ফরমানের মাধ্যমে মুসতায়িনকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। প্রতি উত্তরে আহমদ জানায়- খলীফার বংশধর আমি কখনই হত্যা করব না। অতঃপর এ কাজের জন্য সাঈদ হাজেবকে নিয়োগ করা হয়। ২৫২ হিজরীর শাওয়াল মাসের ৩ তারিখে যখন তার বয়স ৩১ বছর সে তাকে হত্যা করে।
মুসতায়িন সৎ, জ্ঞানী, সাহিত্যিক এবং বাগ্মী ছিলেন। তিনিই সর্বপ্রথম তিন শেলাইবিশিষ্ট জামা ও লম্বা টুপি পরিধান করেন। তার খিলাফতকালে নিম্নবর্ণিত ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন- আবদ বিন হামীদ, আবু তাহের বিন আল-সরাহ হারেস বিন মিসকীন, আবু হাতিম, জাখাত প্রমুখ।
📄 আল-মুতাম বিল্লাহ
২৩২ হিজরীতে আল-মুতায বিল্লাহ মুহাম্মাদ ভিন্ন মতে যাবের আবু আব্দুল্লাহ বিন মুতাওয়াক্কিল বিন রশীদ কাবীহা নামক রোমান বাঁদির গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। মুসতায়িনকে অপসারণের পর ২৫২ হিজরীতে ১৯ বছর বয়সে খিলাফতের তখতে আরোহণ করেন। ইতোপূর্বে এত অল্প বয়সে কেউ খিলাফত পাননি। তিনি টগবগে যুবক ছিলেন।
মুতাযের হাদীসের উস্তাদ আলী বিন হরব বলেন, আমি তার চেয়ে সুন্দর খলীফা আর দেখিনি। তিনিই প্রথম খলীফা যিনি ঘোড়াকে স্বর্ণের অলংকার পরান। পূর্ববর্তী খলীফাগণ স্ব স্ব ঘোড়ার গলায় হাল্কা রৌপ্যের অলংকার পরাতেন। মসনদে আরোহণের বছর ওয়াছেক কর্তৃক নিযুক্ত আশনাস নামক রাষ্ট্রের ডেপুটি কর্মকর্তা মারা যায়। তার পরিত্যক্ত সম্পদ হিসেবে পঞ্চাশ হাজার দিনার রেখে যায়- যা মুতায হস্তগত করেন। তার মৃত্যুর পর মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বিন তাহেরকে নায়েব মনোনীত করেন। তিনি সর্বদা নিজের কাছে দু'টি তলোয়ার বেঁধে রাখতেন। কিছুদিন পর তাকে অপসারণ করে তদস্থানে নিজের ভাই আবু আহমদকে নিয়োগ করেন। তিনি সোনার মুকুট পরতেন এবং দু'টি তলোয়ার বহন করতেন। তাকেও অপসারিত করে ওয়াসেত শহরে পাঠিয়ে দেয়া হয়। অতঃপর মদ্যপ বাগাকে নায়েবের দায়িত্ব দেয়া হয়। সেও শাহী মুকুট পরত। সে এক বছর পর মুতাযের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। অবশেষে তাকে হত্যা করা হয় এবং তার কর্তিত মস্তক মুতাযের সামনে হাজির করা হয়।
এ বছর রযব মাসে তিনি তার ভাই মুঈদ বিল্লাহকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করেন। বেত্রাঘাত করান এবং বন্দী করে রাখেন। এতে মুঈদ পরলোক গমন করলে মুতায ভয় পেয়ে যান। হত্যার অপরাধে যেন অভিযুক্ত না হন সে জন্য তিনি কাযীদের ডেকে সাক্ষ্য প্রদান করেন। কিন্তু এতে কোন আছর হলো না।
মুতায তুর্কীদের বিশেষ করে সালেহ বিন ওসীফকে দেখে দারুণ ভয় পেতেন। একদিন তুর্কীরা অর্থের বিনিময়ে সালেহকে হত্যার কথা জানালে মুতায তার মায়ের কাছে কিছু অর্থ চাইলে তিনি তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। সে সময় কোষাগারে কোন অর্থকড়ি ছিল না। ঘুষ প্রদানে বিলম্ব হওয়ায় তুর্কীরা সালেহ বিন ওসীফ এবং মুহাম্মাদ বিন বাগাকে সাথে নিয়ে অস্ত্র সজ্জিত হয়ে রাজ প্রাসাদে প্রবেশ করে মুতাযকে বেরিয়ে আসতে বলে, তিনি অসুস্থ বেরিয়ে আসতে পারবেন না- এ কথা জানিয়ে দেন। তারা কোলাহল করতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা ভেতরে প্রবেশ করে। মুতাযের পা ধরে বাইরে নিক্ষেপ করে। তাকে মারতে মারতে মুখ লাল করে দেয়া হয়। গরমের সময় ছিল, তুর্কীরা তাকে রোদে দাঁড় করিয়ে রাখে। তারা মুতাযকে তার বাইআত থেকে সরে হবার জন্য চাপ দেয়। অতঃপর কাযী বিন আবু শিওয়ারিবকে ডাকা হয়। তার সামনে তিনি নিজ বাইআত থেকে সরে যান। তারপর মুহাম্মাদ বিন ওয়াছেক- যাকে মুতায বাগদাদে পাঠিয়ে দিয়েছিল তিনি বাগদাদ থেকে রাজধানী সামরাহ-এ এসে পৌছলে তিনি তার উপর খিলাফতের দায়িত্ব অর্পণ করেন এবং তার হাতে বাইআত করেন।
এ ঘটনার পাঁচ দিন পর এক দল লোক এসে গোসল করানোর জন্য মুতাযকে হাম্মামে নিয়ে যায়। গোসলের পর তার পিপাসা লাগে। তাকে পানি দেয়া হয়নি। হাম্মাম থেকে বেরিয়ে এসে তাকে বরফের পানি খাওয়ানো হলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে ইন্তেকাল করেন। তিনিই প্রথম খলীফা যিনি পিপাসায় কাতর হয়ে ২৫৫ হিজরীর শাওয়াল মাসের ৮ তারিখে পরলোক গমন করেন।
প্রথমে মুতাযের জননী কাবীহা তাদের ভয়ে আত্মগোপন করে ছিল। পরে রমযান মাসে বেরিয়ে এসে সালেহ বিন ওসীফকে অনেক ধন-দৌলত অর্থাৎ তের লাখ দিনার এবং দুটি জামা। তন্মধ্যে একটি জামায় জমরুদ এবং অপরটিতে মতি ও ইয়াকুত জড়ানো ছিল। এ দু'টি জামার আনুমানিক মূল্য দুই হাজার দিনার। এত সম্পদ দেখে ইবনে ওসীফ বলল, এত সম্পদ থাকার পরও পঞ্চাশ হাজার দিনারের জন্য এ নারী তার আপন ছেলেকে হারিয়েছে। ইবনে ওসীফ তার কাছ থেকে এগুলো নিয়ে তাকে মক্কা শরীফে পাঠিয়ে দেয়। কাবীহা মুতামাদের খিলাফত পর্যন্ত সেখানেই ছিল। অতঃপর সে সামরাহ ফিরে আসে এবং ২৬৪ হিজরীতে পরলোক গমন করে। মুতাযের যুগে যেসব ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন তারা হলেন- সারী সাকতী, হারুন বিন সাঈদ, মুসনাদের লেখক দারমী, আকবী প্রমুখ।
📄 আল-মুহতাদী বিল্লাহ
আল-মুহতাদী বিল্লাহ খালীফাতুস সালেহ মুহাম্মাদ আবু ইসহাক ভিন্ন মতে আবু আব্দুল্লাহ বিন ওয়াছেক বিন মুতাসিম বিন হারুন রশীদ ওরদাহ নাম্নী বাঁদির গর্ভে ২১০ হিজরীর পর তার দাদার শাসনামলে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ২৫৫ হিজরীর রযব মাসের ১৯ তারিখে তখতে খিলাফত প্রাপ্ত হন। মুতায সর্বপ্রথম তার বাইআত করেন এবং নিজ খিলাফত তার উপর অর্পণ করেন। মুতাযের সামনে তাকে বসানো হয়। মুতায কাযীর সামনে সাক্ষ্য দেন। কাযী বলেন, মুতায খিলাফত পরিচালনায় অপারগ। মুতায কাযীর কথা স্বীকার করেন। মুহতাদী এ কথা শুনে বাইআতের জন্য নিজের হাত বাড়িয়ে দিলে মুহতাদী সর্বপ্রথম বাইআত করেন। অতঃপর তিনি মজলিসের মধ্যভাগে এসে উপবেশন করেন।
মুহতাদী সুদর্শন, ইবাদত গুজার, দানশীল, বুদ্ধিমান, আল্লাহ তা'আলার বিধানাবলী চালু করার ক্ষেত্রে বদ্ধপরিকর এবং সাহসী ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু তার কোন সাহায্যকারী ছিল না। খতীব বলেন, মুহতাদী খলীফা হওয়া থেকে আরম্ভ করে নিহত হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন রোযা রাখতেন।
হাশিম বিন কাসিম বলেন, আমি একদিন রমযান মাসে মুহতাদীর কাছে বসে ছিলাম, আমি উঠে আসার ইচ্ছা করলে তিনি আমাকে বসিয়ে দিলেন। ইফতার করে তিনি নামায পড়ালেন। অতঃপর আবার খানা চাইলেন। এক ডালা ভর্তি খানা এলো। এতে ছিল ময়দার রুটি, এক বাটি সিরকা এবং যয়তুন তেল। তিনি আমাকে খেতে বললেন। আমি খেতে আরম্ভ করলাম। আমার মনে হল আরো খানা আসবে। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি কি রোযা ছিলে না? আমি বললাম, ছিলাম। তিনি বললেন, আগামীকাল রোযা রাখবে না? আমি বললাম, রমযান শরীফের রোযা কেন রাখব না? তিনি বললেন, ভালো করে খাও, তবে আর কোন খানা আসবে না। আমার কাছে এছাড়া আর কোন খানা নেই। আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম, আমিরুল মুমিনীন! আল্লাহ তা'আলা আপনাকে অনেক নেয়ামত দিয়েছেন। তিনি বললেন, এটা তুমি ঠিকই বলেছ। আমি বনূ উমাইয়্যার খলীফা হযরত উমর বিন আব্দুল আযীযের জীবন নিয়ে চিন্তা করেছি। তিনি স্বল্প ভোজন এবং জনগণের চিন্তার কারণে পাতলা ছিলেন- যা তুমি জান। অতঃপর আমি নিজ খান্দানের প্রতি দৃষ্টি ফেরায়ে আমি দারুণ মর্মাহত হয়েছি। লোকেরা আমাদের বন্ হাশিম বলে। অথচ তারা যা ছিল না আমরা তা গ্রহণ করেছি। যা তুমি দেখছ।
জাফর বিন আব্দুল ওহেদ বলেন, মুহতাদীর সাথে আলাপ চারিতার এক পর্যায়ে আমি বললাম, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (র.) এ কথাই বলেছেন এবং আপনার বাবা এবং দাদা এ মাসয়ালার উপরই কাজ করেছেন। তিনি বললেন, আল্লাহ তা'আলা ইমাম আহমদের উপর রহম করুন। আমার পিতার সাথে সম্পর্কোচ্ছেদ করা জায়েয হলে সঙ্গে সঙ্গে আমি তা করতাম। অতঃপর তিনি আমাকে বললেন, সর্বদা সত্য কথা বলবে। যে সত্য কথা বলে সে আমার দৃষ্টিতে অধিক প্রিয়।
তাফতুয়া বলেন, জনৈক হাশেমী বর্ণনা করেন, আমরা মুহতাদীর কাছে একখানা পোশাক বক্স দেখেছি। যাতে তিনি একটি জামা এবং একটি কম্বল রাখতেন। রাতে তিনি এ দু'টো পরে নামায আদায় করতেন। মুহতাদী লোকদের ক্রীড়া-কৌতুক ও খেলাধুলা করতে নিষেধ করেন। এর সামগ্রীগুলো ফেলে দেন। গান বাজনা হারাম ঘোষণা করেন। প্রশাসকদের অত্যাচার থেকে জনগণকে রক্ষা করেন। তিনি নিজেই বিচারালয়ে বসতেন। তিনি নিজেই কেরানীদের কাছ থেকে হিসাব নিতেন। সোমবার এবং বৃহস্পতিবারে অবকাশে থাকতেন। রুসার একটি দলকে বেত্রাঘাত করেন। রাফেযী হয়ে যাওয়ার সংবাদ পেয়ে দারুণ ঘৃণায় তিনি জাফর বিন মাহমুদকে বাগদাদে পাঠিয়ে দেন।
মুতাযের রক্তের প্রতিশোধ নেবার জন্য মূসা বিন বাগা রায় থেকে একদল সৈন্যসহ খিলাফতের রাজধানী সরমন রায়ে সালেহ বিন ওসীফকে হত্যা করার জন্য আসে। মূসার আগমন সংবাদ পেয়ে জনগণ ওসীফকে লক্ষ্য করে বলল, হে ফিরাউন তোমার জন্য এক মূসা এসে পড়েছে। মূসা এসে খলীফার নিকট অনুমতি চাইল। তিনি প্রত্যাখ্যান করলেন। সে সময় তিনি আদালতে বসে ছিলেন। মূসা তার উপর জনতাকে লেলিয়ে দিল। তার সৈন্যরা খলীফাকে একটি দুর্বল ঘোড়ায় উঠিয়ে প্রাসাদ লুণ্ঠন করে। খলীফা বললেন, মূসা আল্লাহ তা'আলাকে ভয় কর। তোমার উদ্দেশ্য কি? সে বলল, আল্লাহর কসম, আমার উদ্দেশ্য ভালো, আপনি আমাদের নিকট প্রতিশ্রুতি দিন যে, আপনি সালেহ বিন ওসীফের পক্ষপাতিত্ব করবেন না। মুহতাদী শপথ করলেন। মূসা সদলবলে খলীফার বাইআত করল। অতঃপর সালেহ বিন ওসীফের কৃত অপরাধের শাস্তি প্রদানের জন্য তাকে ডাকা হয়। সে আত্মগোপন করে। মুহতাদী তার সাথে সন্ধি করার চেষ্টা শুরু করেন।
এতে জনতার কথা বলার সুযোগ হলো যে, সালেহ কোথায় আত্মগোপন করেছে তা খলীফা জানেন। আমিরুল মুমিনীনকে অপসারণের চক্রান্ত হয়। এটা জানতে পেয়ে মুহতাদী একদিন সকালে তলোয়ার হাতে বেরিয়ে এসে বললেন, আমাকে মুসতায়িন এবং মুতায ভেবো না। আল্লাহর কসম! আমি রাগান্বিত হলে জীবনের কোন মায়া নেই। এটা আমার তলোয়ার, এটা আমার হাতে থাকা অবস্থায় হত্যা করেই যাব; দ্বীন, শরম এবং তাকওয়া বলতে কিছু জিনিস রয়েছে। খলীফাদের সাথে শত্রুতা মানে আল্লাহ তা'আলার বিরোধিতা করা। আমার কাছে সালেহ-এর কোন সংবাদ নেই। এ কথা শুনে লোকেরা সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে যায়। মূসা বিন বাগা সালেহকে ধরে আনতে পারলে দশ হাজার দিনার পুরস্কার ঘোষণা করে। কিন্তু কেউ তাকে ধরতে পারল না।
গ্রীষ্মকাল, প্রচণ্ড গরমের কারণে এক যুবক একটি ভূগর্ভস্থ কক্ষে ঢুকে পড়ে। সেখানে সালেহকে দেখে সে চিনতে পারে। যুবকটি এসে মূসাকে জানিয়ে দেয়। সে কয়েকজন লোক পাঠিয়ে তার মাথা কেটে আনে। এতে মুহতাদী দারুণ মর্মাহত হন। মূসা বাকিয়ালের সাথে সন-এ গমন করলে মুহতাদী মূসাকে হত্যা করার জন্য বাকিয়ালের নিকট লিখিত ফরমান পাঠান। বাকিয়াল তা মূসার সামনে পেশ করলে সে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। সে-ই মুহতাদীকে হত্যা করার জন্য ফিরে এল। উভয়ের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে গেল। একদিনেই নিহত হল চার হাজার তুর্কী, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত খলীফার বাহিনী পরাজিত হল। তিনি বন্দী হলেন। তাকে মেরে ফেলা হল।
মুহতাদী ২৫৬ হিজরীর রযব মাসে নিহত হন। এ হিসাবে তিনি পনেরো দিন কম এক বছর খিলাফত পরিচালনা করেছিলেন। তুর্কীরা যখন মুহতাদীকে আক্রমণ করে তখন প্রজাবৃন্দ মসজিদগুলোতে এ কথাটি লিখে ঝুলিয়ে দেয়- হে মুসলমানগণ! উমর বিন আব্দুল আযীযের মত ন্যায়পরায়ণ খলীফাকে সাহায্য কর এবং তার বিজয়ের জন্য আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা কর।