📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 মামুন কর্তৃক বর্ণিত হাদীসসমূহ:

📄 মামুন কর্তৃক বর্ণিত হাদীসসমূহ:


বায়হাকী বলেন, আমি আবু আব্দুল্লাহ হাকেম থেকে শুনেছি। তিনি আবু আহমদ সায়রাফী এবং তিনি জাফর বিন আবু উসমান তায়ালাসী থেকে বর্ণনা করেন, আমি (জাফর বিন আবু উসমান) আরাফার দিন মামুনের পেছনে মেহরাবে দাঁড়িয়ে নামায পড়লাম। সালাম ফিরে লোকেরা তাকবীর পাঠ করতে লাগল। আমি মামুনকে দেখলাম। তিনি বললেন, চুপ কর। হযরত আবুল কাসেম (সা.)-এর সুন্নত হল আগামীকাল তাকবীর বলা। (রাবী বলেন) ঈদুল আযহার দিন আমি নামায পড়তে গেলাম। মামুন মিম্বরে আরোহণ করে খুৎবা দিলেন। হামদ ও ছানার পর তিনি বললেন,
اللَّهُ أَكْبَرُ كَبِيرًا وَالْحَمْدُ لِلَّهِ كَثِيرًا وَسُبْحَانَ اللَّهِ بُكْرَةً وَأَصِيلًا
আমি হাশিম বিন বাশীর থেকে বর্ণনা করছি। তিনি ইবনে শবরমা থেকে, তিনি শাবী থেকে, তিনি বারা বিন আযেব থেকে, তিনি আবু বুরদা বিন দিনার থেকে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-থেকে রেওয়ায়েত করেন। নবী আকরাম (সা.) ইরশাদ করেন, যে ঈদুল আযহার নামাযের আগে কুরবানী করবে সে যবেহকৃত পশুর গোশত খেতে পারবে। আর যে ঈদুল আযহার নামাযের পর কুরবানী করবে সে সুন্নতের পথ ধরে পৌঁছে যাবে।
اللهُ أَكْبَرُ كَبِيرًا وَالْحَمْدُ لِلَّهِ كَثِيرًا وَسُبْحَانَ اللَّهِ بكرة وأصيلا
হে পৃথিবীর প্রতিপালক! আমাকে যোগ্যতা দাও। হাকিম বলেন, আমি এ হাদীসখানা আবু আহমদ ছাড়া অন্য কোন সূত্রে লিপিবদ্ধ করিনি। আমার দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি নির্ভরযোগ্য। আমার মনে তার প্রতি কিছুটা সংশয় ছিল। কিন্তু আমি আবুল হাসান এবং দারা কুতনীকে জিজ্ঞেস করলাম। তারা বললেন, আমাদের দৃষ্টিতে জাফরও বিশুদ্ধ। আমি বললাম, শায়খ আবু আহমদ? বললেন, আমি উযীর আবুল ফজল জাফর বিন ফরাত থেকে, তিনি আবুল হুসাইন মুহাম্মাদ বিন আব্দুর রহমান রুদবারী থেকে, তিনি মুহাম্মাদ বিন আব্দুল মালিক তারিখী থেকে রেওয়ায়েত করেন। তারা সকলেই নির্ভরযোগ্য। অতঃপর বললেন, আমার থেকে হযরত তায়ালাসী হাদীস বয়ান করেছেন এবং তার থেকে ইয়াহইয়া বিন মুঈন। তিনি বলেন, মামুন খুতবায় এ হাদীসটি পড়েন।

সূলী বলেন, আমার কাছে হযরত তায়ালাসী ইয়াহইয়া বিন মুঈনের বরাত দিয়ে বয়ান করেন, বাগদাদে আরাফার দিন, সেদিন শুক্রবার ছিল মামুন খুতবা দেন। সালাম ফেরানোর পর লোকেরা তাকবীর দেয়। মামুন তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং লাফ দিয়ে মেহরাবের লাঠি হাতে নিয়ে বললেন, এটা কিসের আওয়াজ? অসময়ে কেন তাকবীর দিচ্ছ? আমাকে হাশিম বিন বাশীর, তিনি মুজাহিদ থেকে, তিনি ইবনে আব্বাস থেকে রেওয়ায়েত করেন- রাসূলুল্লাহ (সা.) জমরাতুল উকবা পর্যন্ত তালবীয়া পাঠ করতেন। আর দ্বিতীয় দিন যুহর পর্যন্ত তালবীয়া এবং তাকবীর বলতেন।

সূলী বলেন, আবুল কাসেম- আহমদ বিন ইবরাহীম মওসূলীর বরাত দিয়ে আমার নিকট বর্ণনা করেন, একদিন জনৈক ব্যক্তি মামুনের কাছে এসে বলল, হে আমিরুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টি বালবাচ্চা। আল্লাহ তা'আলার দৃষ্টিতে ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে প্রিয় যে তার সৃষ্ট বালবাচ্চাদের উপকার করবে। মামুন চিৎকার দিয়ে বলে উঠলেন, চুপ কর আমি হাদীসের দিক থেকে তোমার চেয়ে বড় আলেম। আমার নিকট ইউসুফ বিন আতীয়া সাফায়ী বর্ণনা করেন। তিনি সাবিত থেকে, তিনি আনাস (রা.) থেকে রেওয়ায়েত করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টি বালবাচ্চা, আল্লাহ তা'আলার দৃষ্টিতে সবচেয়ে প্রিয় ঐ ব্যক্তি যে তার বালবাচ্চাদের উপকার করে।

ইবনে আসাকিরও এ হাদীসটি অভিন্ন সূত্রে বর্ণনা করেছেন, যা আবু ইয়ালা মওসূলী স্বরচিত মসনদ গ্রন্থে ইউসুফ বিন আতীয়ার সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

সূলী বলেন, মাসীহ বিন হাতিম আল-আকলী আমার কাছে বর্ণনা করেন, আব্দুল জব্বার বিন আব্দুল্লাহ বলেন, আমি মামুনের খুতবা শুনেছি। তিনি লজ্জার উপর বয়ান রাখছিলেন। তিনি এর অনেক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে বললেন, হাশিম আমার নিকট বয়ান করেন। তিনি মানসুর থেকে, তিনি হাসান থেকে, তিনি আবু বকরাহ থেকে, তিনি ইমরান বিন হুসাইন থেকে রেওয়ায়েত করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, লজ্জা হল ঈমান, আর ঈমান হল জান্নাত, বেলজ্জা হল বাড়াবাড়ি, আর বাড়াবাড়ি হল জাহান্নাম। ইবনে আসাকির এটি ইয়াহইয়া বিন আকতাম আল মামুন থেকে বর্ণনা করেছেন।

হাকিম বলেন, মুহাম্মাদ বিন আহমদ বিন তামীম ইয়াহইয়া বিন আকতামের বরাত দিয়ে বলেন, একদিন মামুন আমাকে বললেন, ইয়াহইয়া! আমার মন চাইছে যে, আমি হাদীস বর্ণনা করব। আমি বললাম, আমিরুল মুমিনীনের চেয়ে এ কাজ করার বেশি হকদার আর কে আছে? তিনি মিম্বর আনতে বললেন, মিম্বর আনা হল। তিনি মিম্বরে আরোহণ করলেন। সর্বপ্রথম এ হাদীসটি তিনি বয়ান করেন। বলেন, হাশিম আমাকে, তিনি আবুল জাহাম থেকে, তিনি যহরী থেকে, তিনি আবু সালামা থেকে, তিনি আবু হুরায়রা থেকে রেওয়ায়েত করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, জাহান্নামে ইমরাউল কায়েস কবিদের পতাকাবাহী হবে। অতঃপর তিনি আরো তিনটি হাদীস বর্ণনা করার পর মিম্বর থেকে নেমে এসে আমাকে বললেন, ইয়াহইয়া! আমার এ মজলিসটি কেমন লাগল? আমি বললাম, আমিরুল মুমিনীন! আপনার মজলিসটি অত্যন্ত চমৎকার হয়েছে। অতঃপর তিনি বলতে লাগলেন, তোমার কসম, এ মজলিসে লোকদের মাঝে কোন মিষ্টতা ছিল না। এ মজলিস তালিযুক্ত কাপড় পরিহিতদের মজলিস ছিল। যারা কলম কালি নিয়ে এসেছিল।

খতীব বলেন, আবুল হাসান আলী বিন কাসেম আমার নিকট ইবরাহীম বিন সাঈদ আল-জাওহারী থেকে বর্ণনা করেন, মামুন মিসর জয় করলে জনৈক ব্যক্তি তাকে বলল, সেই প্রতিপালকের শোকর, যিনি হে আমিরুল মুমিনীন! আপনার দুশমনদের পরাজিত করেছেন এবং ইরাক, সিরিয়া এবং মিসরবাসীকে আপনার অনুগত করে দিয়েছেন। সাবাশ! আপনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চাচার সন্তান। মামুন বললেন, এখনও আমার একটি অভিপ্রায় বাকী থেকে গেছে, আর তা হল- আমি একই সভায় বসে ইয়াহইয়ার মত বরেণ্য মুহাদ্দিসদের সাথে মতবিনিময় করব, তারা বলবেন, আল্লাহ তা'আলা আপনার প্রতি সন্তুষ্ট- এ বিষয়ে আপনি কি বর্ণনা করতে পারেন? আমি বলব, আমার নিকট হাদীস বর্ণনা করেছেন হাম্মাদ বিন সালামা এবং হাম্মাদ বিন যায়েদ। তারা সাবিত বানানী থেকে, তিনি আনাস বিন মালিক (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, নবী (সা.) বলেন, যে দু'সন্তান অথবা এর চেয়ে বেশি সন্তান লালন পালন করবে, তারা তার সামনে লালিত পালিত হবে এবং তার সামনে মারা যাবে, তাহলে সে ব্যক্তি জান্নাতে আমার সাথে এভাবে থাকবে- এ কথা বলে তিনি (সা.) দু'টি আঙুল ফাঁক করে দেখালেন।

খতীব বলেন, এ রেওয়ায়েতটি ভুল। আর ভুলটি হল মামুন হাম্মাদ থেকে বর্ণনা করেছেন। অথচ মামুন ১৭০ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেছেন। আর হাম্মাদ বিন সালামা ১৬৭ হিজরীতে এবং হাম্মাদ বিন যায়েদ ১৭৯ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন।

হাকিম বলেন, মুহাম্মাদ বিন ইয়াকুব বিন ইসমাঈল আমার নিকট মুহাম্মাদ বিন সহল বিন আসকার থেকে বর্ণনা করেন, একদিন মামুন আযান দেবার জন্য দাঁড়ালেন। আমরাও তার পার্শ্বে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ইত্যবসরে এক মুসাফির যার হাতে কালির দোয়াত ছিল এসে বলল, আমিরুল মুমিনীন! আমি মুহাদ্দিস। মামুন বললেন, তুমি একি বলছ? তোমার অমুক অধ্যায়টি স্মরণ আছে? এরপর মামুন হাদীস বয়ান করতে শুরু করলেন। পরিশেষে মামুন লোকদের উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমরা তিনদিন হাদীস পড়ে মুহাদ্দিস বলতে লেগেছ।

ইবনে আসাকির বলেন, মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম ইয়াহইয়া বিন আকতাম থেকে বর্ণনা করেন, আমি একদিন রাতে মামুনের পার্শ্বে শুয়ে ছিলাম। গভীর রাতে পিপাসার কারণে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমি পার্শ্ব পরিবর্তন করলাম। মামুন বললেন, ইয়াহইয়া! কি হয়েছে? আমি বললাম, পিপাসা লেগেছে। এ কথা শুনে তিনি এক গ্লাস পানি এনে আমাকে পান করালেন। আমি বললাম, হে আমিরুল মুমিনীন! আপনি খাদেমকেও ডাকলেন না, কোন গোলামকেও জাগালেন না। তিনি বললেন, আমাকে আমার বাবা, তিনি আমার দাদা থেকে তিনি উকবা বিন আমের থেকে রেওয়ায়েত করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, কাওমের সরদার হবেন তার খাদেম।

খতীব এ রেওয়ায়েতটি মামুনের সূত্রে এভাবে বর্ণনা করেছেন, আমার নিকট হারুন রশীদ, তিনি মাহদী থেকে, তিনি মানসুর থেকে, তিনি তার পিতা থেকে, তিনি ইকরামা থেকে, তিনি ইবনে আব্বাস থেকে, তিনি জারীর বিন আব্দুল্লাহ থেকে রেওয়ায়েত করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, কাওমের সরদার হবেন তার খাদেম।

ইবনে আসাকির আবু হুযায়ফা থেকে বর্ণনা করেন, আমি মামুনের থেকে শুনেছি, তিনি আমার নিকট এ হাদীস বর্ণনা করেন, আমার বাবা আমাকে, তিনি আমার দাদা থেকে, তিনি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন। নবী আকরাম (সা.) ইরশাদ করেন, কাওমের গোলাম এ কাওমের মধ্য থেকেই হবে।

মুহাম্মাদ বিন কাদামা বলেন, যখন মামুন এ সংবাদ পেলেন যে, আমার থেকে আবু হুযায়ফা এ হাদীসটি রেওয়ায়েত করেছেন, তখন তিনি আবু হুযায়ফাকে দশ হাজার দিরহাম পুরষ্কার দিলেন।

মামুনের যুগে ২০০ হিজরীতে আদমশুমারির হিসাব অনুযায়ী বনু আব্বাসের জনসংখ্যা ছিল ৩৩ হাজার।

মামুনের যুগে নিম্নবর্ণিত ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন- সুফিয়ান বিন আয়নাহ, হযরত ইমাম শাফী (র.), আঃ রহমান বিন মাহদী, ইয়াহইয়া বিন সাঈদ আল-কাতান, ইউনুস বাকের (মাগাযীর বর্ণনাকারী), হযরত ইমাম আবু হানীফা (র.)-এর ছাত্র আবু মতীহ বলখী, দানশীল মারুফ কারখী, আল-মুবতাদা গ্রন্থের লেখক ইসহাক বিন বশীর, ইমাম মালিক (র.)-এ গুরুত্বপূর্ণ ছাত্র এবং মিসরের কাযী ইসহাক বিন ফরাত, আবু উমর শিবানী, ইমাম মালিক (র.)-এর ছাত্র আললাগবী আশহাব, ইমাম আবু হানীফা (র.)-এর ছাত্র হাসান বিন মীয়াদ লুলুয়ী, হাম্মাদ বিন উসামা, হাফেজ রুহ বিন উবাদা, যায়েদ বিন হিব্বান, আবু দাউদ তায়ালাসী, গাযী বিন কায়েস- ইমাম মালিক (র.)-এর ছাত্র, প্রসিদ্ধ দানশীল আবু সুলায়মান দারানী, আলী রেযা বিন মূসা কাযেম, আরবের ইমাম ফারা, কায়তাবা বিন মিহরান, নাহুবিদ কতরব, ওয়াকেদী, আবু উবায়দা, মুআম্মার বিন মুছনা, নযর বিন শামীল, সাইয়্যেদা নফীসা, কৃষ্ণী নাহুবিদ হিশাম, ইয়াযিদী, ইয়াযিদ বিন হারুন, বসরার কাযী ইয়াকুব বিন ইসহাক হাযরামী, আঃ রাজ্জাক, আবুল আতাহীয়া, আবু আসেম, আঃ মালিক বিন মাজশুন, আব্দুল্লাহ বিন হাকাম, আবু যায়েদ আনসারী, আসমায়ী প্রমুখ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00