📄 বিভিন্ন ঘটনাবলী
লাফযূয়া বলেন, হামেদ বিন আব্বাস বিন উযীর আমার নিকট বর্ণনা করেন যে, একদিন আমি মামুনের কাছে বসেছিলাম। মামুন হাঁচি দিলেন। আমি আলহামদুলিল্লাহর জবাব দিলাম না। মামুন এর কারণ জানতে চাইলেন। আমি বললাম, হে আমিরুল মুমিনীন! আপনার আভিজাত্য বজায় রাখার জন্য বলিনি। তিনি বললেন, আমি সে রকম বাদশাহ নই যারা দো'আকে পরোয়া করে না।
ইবনে আসাকির আবু মুহাম্মাদ ইয়াযিদী থেকে বর্ণনা করেন, আমি মামুনকে শৈশবকালে শিক্ষাদান করেছি, একদিন যথারীতি আমি এলাম কিন্তু মামুন অন্দর থেকে বের হলো না। আমি পরপর দু'জন খাদেমকে ডাকতে পাঠালাম। এরপরও সে এল না। আমি বললাম, সে নিজের সময়গুলো নষ্ট করছে। এ কথা শুনে খাদেমরা বলল, আপনি যাবার পর শাহজাদা খাদেমদের যথেচ্ছা ব্যবহার করে এবং তাদের প্রহার করে। আজ তাকে হাল্কা শাসন করবেন। ইত্যবসরে মামুন এলো, আমি তাকে সাতটি বেত্রাঘাত করলাম। মামুন কাঁদতে লাগল। এমন সময় জাফর বিন ইয়াহইয়া বরমন্ত্রী এসে পড়লেন। শাহজাদা রুমাল দিয়ে চোখাশ্রু মুছতে মুছতে কার্পেটের উপর গিয়ে বসল এবং জাফরকে ডেকে নিলেন। আমি উঠে বাইরে গেলাম। মামুন জাফরের কাছে নালিশ করে কিনা এ ব্যাপারে আমার ভয় হল। জাফর চলে গেলে আমি তার কাছে এসে বললাম, আমার ভয় ছিল যদি আমার ব্যাপারে নালিশ কর। এটা শুনে মামুন বলল, হে বাবা মুহাম্মাদ! আমি হারুন রশীদকেও বলি না, সেখানে জাফরকে বলব? কারণ শিক্ষা গ্রহণে আমার উপকার। আমি আদবের মোহতাজ।
আসমায়ী বলেন, মামুনের মোহরে খোদাই করে লিখা ছিল আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ। মুহাম্মাদ বিন উবাদা বলেন, খলীফাদের মধ্যে হযরত উসমান (রা.) এবং মামুন ছাড়া কেউ হাফেজ ছিলেন না। ইবনে আয়নাহ বলেন, একদিন মামুন ওলামাদের সাথে সাধারণ পরিষদে বসেছিলেন। জনৈক মহিলা এসে বলল, হে আমিরুল মুমিনীন! আমার ভাই ইন্তেকাল করেছে। মুত্যুর সময় ছয় শত দিনার রেখে গেছে, আমাকে এক দিনার দিয়ে বলা হয়েছে, এটাই তোমার অংশ। মামুন কিছুক্ষণ ফারায়েযের অঙ্ক কষে বললেন, তুমি একটি দিনারই পাবে। ওলামা হযরত বললেন, আমিরুল মুমিনীন! এটা কি করে হয়? মামুন বললেন, মৃত ব্যক্তি দু'জন কন্যা সন্তান রেখে গেছে। মহিলা বলল, হ্যাঁ। মামুন বললেন, এ দু'সন্তান পেয়েছে, দুই-তৃতীয়াংশ। অর্থাৎ চার'শ দিনার। তার মা রয়েছে, সে পেয়েছে অষ্টাংশ অর্থাৎ এক'শ দিনার। স্ত্রীর ভাগে অষ্টমাংশ অর্থাৎ ৭৫ দিনার, তার বারো জন ভাই ছিল না? মহিলা বলল, হ্যাঁ। মামুন বললেন, তারা পেয়েছে দুই দিনার করে। অবশিষ্ট থাকে এক দিনার, যা তোমার ভাগে এসেছে।
মুহাম্মাদ বিন হাফয আল-আনমাতী বর্ণনা করেন, ঈদের দিন আমি মামুনের সাথে খানা খেতে বসলাম। দসতরখানে ছিল তিন শতাধিক প্রকার খানা। মামুন এক একটি খানার প্রতি ইশারা করে বললেন, এ খানা অমুক রোগের ঔষধ। যার বমন করার অভ্যাস রয়েছে সে এ খানা খাবে না ইত্যাদি এ ধরনের আরো অনেক কথা। ইয়াহইয়া বিন আকতাম এ দৃশ্য দেখে বলল, আমিরুল মুমিনীন! চিকিৎসা শাস্ত্রের দিক থেকে দেখা হলে আপনি জালেনুস। জ্যোর্তিবিদ্যায় আপনি হলেন হরমুস। উলুমুল ফিকহে আলী বিন আবু তালিব। দানশীলতায় হাতেম তাঈ। সত্যবাদিতায় আবু যর। দয়ার্দ্রতায় কাব বিন উমামা। এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষায় আপনি হলেন সহুল বিন আদিয়া। এ কথা শুনে মামুন দারুণ খুশি হয়ে বললেন, এজন্য জ্ঞানের কারণে মানুষকে মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে।
ইয়াহইয়া বিন আকতাম বলেন, আমি মামুনের চেয়ে পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তি আর দেখিনি। একদিন রাতে আমি তার সাথে ছিলাম। তিনি আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে বললেন, ইয়াহইয়া দেখ তো আমার পায়ের কাছে কি? আমি তেমন কিছু দেখতে পেলাম না। তিনি নিশ্চিন্ত হতে পারলেন না। বিছানার দায়িত্বে নিয়োজিত প্রহরীদের ডাকলেন। জনৈক প্রহরী মোমবাতি নিয়ে হাযির হলো। তিনি তাকেও দেখতে বললেন, ফলে দেখা গেল বিছানার নিচে একটি লম্বা সাপ বসে রয়েছে। তারা সাপটি মেরে ফেলল। আমি বললাম, আমিরুল মুমিনীনকে এ ঘটনার প্রেক্ষিতে আলেমুল গায়েব বললেও কোন ক্ষতি নেই। তিনি বললেন, আল্লাহ ক্ষমা করুন। তুমি একি বলছ? আমি এইমাত্র স্বপ্নে দেখলাম, এক ব্যক্তি আমার কাছে এসে এ কবিতাটি আবৃত্তি করল- "হে ঘুমন্ত ব্যক্তি! জেগে উঠুন এবং নগ্ন তলোয়ার দ্বারা নিজেকে রক্ষা করুন।" এটা শুনে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল এবং বিশ্বাস হল অবশ্যই কিছু একটা হতে চলেছে। অবশেষে বিছানার নিচে সাপ পাওয়া গেল।
উমারাহ বিন আকল বলেন, একদিন কবি আবু হাফসা আমাকে বললেন, তুমি কি কখন ভেবে দেখেছ যে, আমার দৃষ্টিতে মামুন কবিতার ভাবার্থ মোটেও অনুধাবন করতে সক্ষম নন। আমি বললাম, তার চেয়ে বেশি কথোপকথন অনুধাবনকারী আর কে আছে। আল্লাহর কসম! আপনি তাকে অনেক কবিতা শুনিয়েছেন। আর তিনি প্রথম চরণ শুনেই গোটা কবিতার সারাংশ ও ভাবার্থ বুঝে ফেলেন। তিনি বললেন, আমার শ্রেষ্ঠ রচনা চমৎকার একটি কবিতা তাকে শুনালাম। কিন্তু তার মধ্যে কোন প্রকার অনুভূতি জাগ্রত হল বলে মনে হল না। কবিতার অর্থটি এরূপ- "ইমামুল হুদা মামুন দ্বীন নিয়ে মশগুল। আর জনতা দুনিয়ার মোহে আচ্ছন্ন।" আমি বললাম, কবিতার প্রভাব-শক্তি মাটি হয়ে গেছে। মামুন যদি শুধু দ্বীন নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়েন তাহলে রাষ্ট্রীয় কার্যাদি কিভাবে সম্পাদন হবে? আপনি তার শানে সে কবিতাটিই আবৃত্তি করেছেন, যা আপনার চাচা ওলীদের সামনে আবৃত্তি করেছিলেন।
নযর বিন শামীল বলেন, আমি তালিযুক্ত চাদর পরে মামুনের কাছে গেলাম। তিনি বললেন, নযর! আমিরুল মুমিনীনের সামনে এভাবেই কি আসা উচিত? আমি বললাম, হে আমিরুল মুমিনীন! এমনটা পরেছি গরমের কারণে। তিনি বললেন, না না, কথা এটা নয়। মনে হয় তুমি গরীব হয়ে গেছ। এ হাদীসটি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে দেখ, যা হিশাম বিন বশীর আমার কাছে বর্ণনা করেছেন। তিনি মুজাহিদ থেকে, মুজাহিদ আল-শা'বী থেকে, তিনি ইবনে আব্বাস থেকে রেওয়ায়েত করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, এমন নারী যার মধ্যে দ্বীন এবং লাবণ্য রয়েছে এমন নারীকে বিয়ে করলে অভাব ও দরিদ্রতার দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। আমি বললাম, আমিরুল মুমিনীন! হিশামের বর্ণনা অনুযায়ী আপনার অভিমত সত্য। তবে হাসানের বরাত দিয়ে আউফুল আরাবী আমার কাছে রেওয়ায়েত করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, দ্বীনী ও লাবণ্যময়ী নারীকে বিয়ে করলে আয়েশের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। মামুন কোলবালিসে হেলান দিয়েছিলেন। আমার কথা শুনে সোজা হয়ে উঠে বসলেন। তিনি বললেন, তবে কি প্রথম হাদীসে শব্দ ভুল রয়েছে? বললাম, জ্বি হ্যাঁ, হিশাম ভুল বলেছেন। তিনি বুঝতে পারেননি। অতঃপর মামুন রেওয়ায়েতের মধ্যে পার্থক্যগুলো বর্ণনা করলেন।
মামুন আমাকে বললেন, তুমি কি আরবী কবিদের সনদ বর্ণনা করতে পারবে? আমি আরবী কবির একটি কবিতা আবৃত্তি করলাম। এটা শুনে মামুন বললেন, আল্লাহ তা'আলা এমন ধরনের কবিদের বিধ্বস্ত করুন, যারা ইলমুল আদব (আরবী সাহিত্য) ভালোভাবে জানে না। অতঃপর তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনে ইবনে আবী উরওয়াতাল মাদানী কবির কাব্য বলে শোনালেন। আমিও তাকে অনেক কবিতা শোনালাম। তিনি আমাকে পঞ্চাশ হাজার দিরহাম দেবার নির্দেশ লিখে আমাকেসহ কাগজটি ফজল বিন সহলের কাছে পৌঁছে দিতে বললেন। আমি গেলাম। ফজল বললেন, অমিরুল মুমিনীনের খুব ভুল ধরছেন? আমি বললাম, হিশাম ভুলের উপর ছিলেন। আর তিনি তার অনুসরণ করছিলেন। এ কথা শুনে ফজল নিজের পক্ষ থেকে আরো ত্রিশ হাজার দিরহাম দিলেন।
খতীব মুহাম্মাদ বিন যিয়াদ আরাবী থেকে বর্ণনা করেন, একদিন আমি মামুনকে ইয়াহইয়া বিন আকতামের সাথে বাগানে পায়চারী করতে দেখলাম। সামনে গিয়ে খলীফা সূচক অভিবাদন জানালাম। আমি শুনলাম তিনি ইয়াহইয়াকে বললেন, আবু মুহাম্মাদ ইলমে আদব সম্পর্কে অভিজ্ঞ, অতঃপর তিনি আমাকে একটি কবিতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। আমি এর যথাযথ ব্যাখ্যা করায় তিনি আমাকে আম্বর দান করলেন, সে সময় যা তার হাতে ছিল। আমি সেটি পাঁচ হাজার দিরহামে বিক্রি করি।
আবু উবাদা বলেন, মামুন পৃথিবীর বাদশাহ, তার মত আর একজনকেও দেখিনি।
আবু দাউদ বলেন, মামুনের নিকট এক খারেজী লোক এলে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে আমার খিলাফতের কোন দলিল আছে কি? সে বলল, আছে তা হলো কুরআন শরীফের এ আয়াত- وَمَنْ لَمْ يَحْكُمُ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَফَرُونَ
মামুন বললেন, কিভাবে বুঝলে এটা কুরআনের আয়াত?
সে বলল, উম্মতের ইজমা দ্বারা। তিনি বললেন, যখন তোমরা নাযিলকৃত আয়াতের ক্ষেত্রে উম্মতের ইজমা দ্বারা একমত হচ্ছ, তখন বিশ্লেষণসাপেক্ষেও ঐকমত্যে পৌছা উচিত। সে বলল, আপনি সত্য বলেছেন।
ইবনে আসাকির মুহাম্মাদ বিন মানসুর থেকে বর্ণনা করেন। মামুনের উক্তি হল-ভদ্র লোকদের আলামত হচ্ছে সে ঊর্ধ্বতন লোকদের অত্যাচার সহ্য করবে। কিন্তু দুর্বলদের উপর জুলুম করবে না।
সাঈদ বিন মুসলিম বলেন, মামুন বলতেন, আমি ক্ষমা করতে এতটাই ভালোবাসি যে, যদি অপরাধীরা তা জানতে পারে তাহলে তাদের অন্তর থেকে ভয় উঠে যাবে এবং তারা ভীষণ আনন্দিত হবে।
ইবরাহীম বিন সাঈদ জাওহারী থেকে বর্ণনা করেন, এক অপরাধীকে মামুনের সামনে আনা হলে তিনি কসম খেয়ে বললেন, আমি তোমাকে হত্যা করব। সে বলল, হে আমিরুল মুমিনীন! একটু ধৈর্য ধরুন এবং সহনশীলতার সাথে কাজ করুন। কারণ নমনীয়তা প্রদর্শন অর্ধেক ক্ষমা করার সমান। মামুন বললেন, আমি যে কসম করেছি। সে বলল, আল্লাহ তা'আলার সামনে হত্যাকারী হিসেবে উপস্থিত হওয়ার চেয়ে কসম তরককারী হয়ে হাযির হওয়া অনেক ভালো। এ কথা শুনে তিনি তাকে ছেড়ে দেন।
খতীব আবুল সলত আব্দুস সালাম বিন সালেহ থেকে বর্ণনা করেন, একদিন আমি মামুনের কক্ষে শুয়ে গেলাম। এদিকে মশালবাহীদের তন্দ্রার কারণে মশাল গলে পড়ে যায়। মামুন নিজেই উঠে আসেন এবং মশালগুলো ঠিক করে দেন। এমন সময় আমার চোখ খুলল। আমি শুনতে পেলাম মামুন বলছেন, নিয়ম অনুযায়ী আমি গোসলখানায় ছিলাম। গোসলখানার খাদেমরা আমাকে গালি দিল। আমি যে তাদের গালি শুনতে পেলাম তা তারা জানত না। আমি তাদের ক্ষমা করে দিলাম।
সূলী আব্দুল্লাহ বিন আল-বাওয়াব থেকে বর্ণনা করেন, মামুন অত্যন্ত ধৈর্যশীল ব্যক্তি ছিলেন। এমনকি তার ধৈর্যশীলতা দেখে আমাদেরই রাগ হত। একদিন আমরা জাহাজে করে দজলা নদী ভ্রমণ করছিলাম। জাহাজের ডেকে পর্দা টানানো ছিল। একদিকে আমরা অন্যদিকে মাঝি মাল্লার দল বসেছিল। একজন মাঝি বলল, তোমরা জান আমার অন্তরে মামুনের প্রতি এতটুকু শ্রদ্ধাবোধ নেই। তিনি আমার চোখের কাঁটা। কারণ তিনি নিজ ভাইয়ের হত্যাকারী, আল্লাহর কসম, এ কথা শুনে মামুন হেসে উঠলেন। অতঃপর তিনি আমাদের বললেন, আপনারা একটি গ্রহণযোগ্য উপায় বের করুন যা দ্বারা মর্যাদাবান ব্যক্তিদের দৃষ্টিতে আমি সম্মানিত হতে পারি।
খতীব ইয়াহইয়া বিন আকতাম থেকে বর্ণনা করেন, আমি মামুনের চেয়ে দয়াবান আর কাউকে দেখিনি। একদিন আমি তার গৃহে শয়ন করলাম। তখনও আমি ঘুমিয়ে যাইনি। মামুন হাঁচি দিয়ে উঠে বসলেন। হাঁচির শব্দে কারো যেন ঘুমের ক্ষতি না হয় সেজন্য জামার কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে নিয়ে বলতে লাগলেন, ইনসাফের প্রথম পর্যায় হচ্ছে নিকটবর্তী বন্ধুদের প্রতি ইনসাফ প্রদর্শন। অতঃপর ক্রমান্বয়ে নগণ্যদের প্রতিও।
ইবনে আসাকির ইয়াহইয়া বিন খালিদ বরমন্ত্রী থেকে রেওয়ায়েত করেন, একদা মামুন আমাকে বললেন, ইয়াহইয়া! লোকদের প্রয়োজনে সাহায্য করাকে সৌভাগ্য মনে করবে। কারণ আকাশ ধ্বংস হবে। যুগ যুগান্তর কেউ বেঁচে থাকতে পারবে না। এবং কারো দয়াও অবিনশ্বর নয়।
আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ যহরী কর্তৃক বর্ণিত, মামুন বলেন, আমার মতে কষ্টার্জিত বিজয় স্বভাবজাত বিজয়ের চেয়ে প্রিয়। কারণ স্বভাবজাত বিজয় ম্লান হয়ে পড়ে। আর কষ্টার্জিত বিজয় অটুট থাকে।
শা'বী থেকে বর্ণিত মামুন বলেন, যে তোমার ভালো সংকল্পে গর্বিত নয়, সে তোমার নেক কাজেরও সমর্থক নয়। আবুল আলীয়া বলেন, আমি মামুনকে বলতে শুনেছি, সুলতানের খোশামোদ করা ঘৃণ্য কাজ।
আলী বিন আব্দুর রহীম আল-মুরুযী বলেন, মামুন বলতেন, ঐ ব্যক্তি নিজের নসের উপর অত্যাচার করে যে এমন কাউকে কাছে পেতে চায় যে তার থেকে নিজেকে দূরে রাখে। যে এমন ব্যক্তির সামনে বিনয় প্রদর্শন করে যে তাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করে না। এবং যে এমন লোকের প্রশংসায় পরিতৃপ্ত হয় যে তার সম্পর্কে জানে না।
মুখারিক বলেন, একদা আমি মামুনের সামনে এ কবিতাটি আবৃত্তি করলাম, "আমি এমন বন্ধু চাই চরম হতাশা ও বেদনার সময় যে আমাকে সান্ত্বনা দিবে।" মামুন কবিতাটি পুনঃ পুনঃ আবৃত্তি করতে বললেন। আমি সাতবার আবৃত্তি করলাম। তিনি বললেন, মুখারিক! আমার গোটা রাজত্ব নিয়ে নাও, পরিবর্তে আমাকে এ ধরনের একটি বন্ধু এনে দাও।
হুদাবা বিন খালিদ বলেন, একবার আমি মামুনের সাথে খেতে বসলাম। খাওয়া দাওয়া শেষে দসতরখান উঠানের সময় যেসব দানা মাটিতে পড়ে যায় সেগুলো কুড়িয়ে কুড়িয়ে খেতে লাগলাম। তা দেখে মামুন বললেন, তোমার কি পেট ভরেনি? আমি বললাম, জ্বি হ্যাঁ, পেট ভরেছে। কিন্তু হাম্মাদ বিন সালামা- সাবিত বাসফীর বরাত দিয়ে হযরত আনাস (রা.)-এর একখানা হাদীস আমার নিকট বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, যে দসতরখানের নীচে পড়ে থাকা দানা উঠিয়ে খাবে সে দরিদ্রতা থেকে মুক্ত থাকবে। এ হাদীস শুনে মামুন আমাকে এক হাজার দিরহাম দিলেন।
হাসান বিন আবদাশ সাফার বলেন, মামুন বুরান বিনতে হাসান বিন সাদকে বিয়ে করার সময় লোকেরা হাসানকে অনেক উপহার দেয়। এক ফকীর দুটি উপহার পাত্র প্রেরণ করে। সে একটিটিতে লবণ অপরটি পাউডার ভর্তি করে এ মর্মে একখানা পত্র লিখে হাসানের কাছে পাঠায়। আমি এক ফকীরের পক্ষ থেকে এ উপহারটুকু পাঠালাম। ধনাঢ্যদের উপহার সামগ্রীর তালিকায় যেন আমার নাম লিখা না হয়। বরকতের জন্য লবণ এবং সুগন্ধির জন্য পাউডার পাঠালাম। হাসান এ পাত্র দু'টি মামুনের সামনে পেশ করল। তিনি তা পছন্দ করলেন এবং পাত্র দু'টি খালি করে তাকে স্বর্ণমুদ্রা ভরে পাত্র দু'টি ফকীরের কাছে পাঠিয়ে দিলেন।
সূলী মুহাম্মাদ বিন কাসেম থেকে বর্ণনা করেন, আমি মামুনকে এ কথা বলতে শুনেছি যে, আল্লাহর কসম! ক্ষমা করার মধ্যে আমি এমন মজা পাই যে, এটা অনুধাবন করতে পারলে লোকেরা অপরাধ করে এমনিতেই আমার কাছে আসত।
সূলী হুসাইন আল-খলীহ থেকে বর্ণনা করেন, একদা মামুন রেগে আমার ভাতা বন্ধ করে দেন। আমি একটি কবিতা লিখে জনৈক লোকের হাতে মামুনের কাছে পাঠালাম। এতে তার প্রশংসা এবং আমার অর্থ সংকটের বিবরণ লিপিবদ্ধ ছিল। তিনি তা পাঠান্তে বললেন, কবিতাটি সুন্দর হয়েছে। তবে আমার কাছে সে কিছু পাবে না। কারণ সে আমীনের প্রশংসা গাথায় আমার দুর্নাম করেছে। এটা শুনে জনৈক প্রহরী বলল, আমিরুল মুমিনীন! আজ আপনার ক্ষমার প্রবণতা কোথায়? এ কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমার ভাতা চালু করে দিলেন।
হাম্মাদ বিন ইসহাক বলেন, মামুন বাগদাদে এলে যুহর পর্যন্ত আদালতে বসে লোকদের প্রতি ইনসাফ করতেন এবং মজলুমদের ন্যায় বিচার করে দিতেন।
মুহাম্মাদ বিন আব্বাস বলেন, মামুন রশীদের দাবা খেলার প্রতি প্রবল ঝোঁক ছিল। তিনি বলতেন, এ খেলা মেধাকে সতেজ রাখে। তিনি এ খেলার নতুন নতুন দিক উদ্ভাবন করেন। তিনি বলেন, আমি কাউকে নিয়ে খেলতে চাইলে সকলে বাহানা দিত। আসলে তারা ভালো খেলতে জানত না।
হাখাত বলেন, মামুনের বন্ধু বলেন, তার অবয়ব এবং শরীরের রং একই মত। তবে হাঁটুর নীচের দিকের রং ছিল গাঢ় হলুদ বর্ণের।
ইসহাক মওসূলী বলেন, মামুনের কথা হল- সেই সঙ্গীত উত্তম যে সঙ্গীতের মাধ্যমে মেহেরবানী এবং শিষ্টতার বাণী প্রচারিত হয়।
ইবনে আবু দাউদ বলেন, একবার রোম সম্রাট মামুনের কাছে ১০০ কেজি মেশক আম্বর উপঢৌকন হিসেবে পাঠালে তিনি দ্বিগুণ উপঢৌকন পাঠানোর নির্দেশ দানে বললেন, যাতে তারা ইসলামের শানশওকত বুঝতে পারেন। আবু উবাদা বলেন, আমার জানা নেই আল্লাহ তা'আলা মামুনের চেয়ে বেশি দানশীলতা এবং দয়ার্দ্রতার গুণ দিয়ে আর কাউকে সৃষ্টি করেছেন কিনা।
ছুমামা বিন আশরাস বলেন, বাগ্মীতার দিক থেকে আমি জাফর বিন ইয়াহইয়া এবং মামুনের চেয়ে বড় আর কাউকে দেখিনি। সালাফী তওরিয়াত গ্রন্থে হাফয মাদায়েনী থেকে রেওয়ায়েত করেন, জনৈক হাবশী লোক মামুনের কাছে এসে নবুওয়তের দাবী করে বলল, আমি মূসা বিন ইমরান। মামুন বললেন, হযরত মূসা (আ.) হাত দিয়ে ডিম তৈরির মুজিযা দেখিয়েছেন। তুমিও যদি সেই মুজিযা দেখাতে পার তাহলে আমরা তোমার প্রতি ঈমান আনব। লোকটি বলল, মূসা বিন ইমরানের সামনে ফিরাউন বলেছিল,
أَنَا رَبُّكُمُ الْأَعْلي (অর্থাৎ আমি তোমাদের বড় রব)। এরপর তিনি মুজিযা দেখিয়েছেন। আপনি সেই দাবী করলে আমি মুজিযা দেখাব। অন্যথায় প্রয়োজন নেই।
মামুন বলতেন, প্রশাসকদের হটকারিতার কারণে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়।
ইবনে আসাকির ইয়াহইয়া বিন আকতাম থেকে বর্ণনা করেন, মামুন প্রতি মঙ্গলবারে ফিকাহ শাস্ত্র নিয়ে মতবিনিময়ের জন্য আলেমদের নিয়ে মজলিস করতেন। একদিন জনৈক ব্যক্তি একটি কাপড় পরে জুতা হাতে নিয়ে মজলিসের এক কোণে এসে দাঁড়িয়ে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করল, এ মজলিস কি উম্মতের ইজতেমার জন্য না বিজয় গাঁথা ও প্রতিশোধ গ্রহণের উপায় বের করার মজলিস? মামুন সালামের জবাব দিয়ে বললেন, প্রথমটার জন্য দ্বিতীয়টার জন্য নয়; বরং এ মজলিস এ জন্য যে, প্রথমে মুসলিম উম্মাহর কাজের দায়িত্ব আমার ভাইয়ের উপর ছিল। অতঃপর আমার এবং আমার ভাইয়ের মাঝে বিবাদ হওয়ায় এ দায়িত্ব আমার উপর বর্তায়। ইজতেমায় আমি মুসলমানদের মতামতের মোহতাজ। যাতে তারা আমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়। তাদের ধারণা খিলাফত আমার হাত থেকে চলে গেলে ইসলামের ভিত্তি ধসে যাবে, মুসলমানদের কাজ গড়বড় হয়ে পড়বে, এতে বিভাদের সৃষ্টি হবে, জিহাদ ভ্রান্ত হয়ে যাবে, হজ্বের কাজ হবে না, সব পথ বন্ধ হয়ে যাবে। এ লক্ষ্যে সাবধানতার জন্য আমি প্রস্তুতি নিয়েছি। যাতে মুসলমানদের মধ্যে খিলাফতের বিষয়ে একজনকে রাজি করে তার উপর খিলাফতের দায়িত্ব দিয়ে আমি পৃথক হয়ে যাব। এরপর সে লোকটি সালাম দিয়ে চলে গেল।
মুহাম্মাদ বিন মুনযির আল-কিন্দী বলেন, একদা হারুন রশীদ হজ্ব করার পর কুফায় এসে সকল মুহাদ্দিসের আহ্বান করেন। আব্দুল্লাহ বিন ইদরীস এবং ঈসা বিন ইউনুস ছাড়া সকলেই এসে উপস্থিত হন। হারুন তাদের ডেকে আনার জন্য আমীন এবং মামুনকে পাঠালেন। ইবনে ইদরীস তাদের দু'জনের সামনে একশ' হাদীস পাঠ করেন। হাদীস পড়া হলে মামুন বললেন, অনুমতি পেলে সবেমাত্র পাঠকৃত আপনার সকল হাদীস আমি মুখস্থ শুনিয়ে দেব। তিনি বললেন, শোনাও তো দেখি। তিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হুবহু হাদীসগুলো শুনিয়ে দিলেন। আব্দুল্লাহ বিন ইদরীস মামুনের প্রখর মুখস্থ শক্তি দেখে অস্থির হয়ে পড়লেন।
কোন কোন ওলামায়ে কেরামের মতে গ্রীক দর্শনের অনেক প্রাচীন ও মূল্যবান গ্রন্থাদি মামুনের হস্তগত ছিল। যাহাবী সংক্ষিপ্তভাবে এর বিবরণ দিয়েছেন।
ফাকেহী বলেন, মামুন সর্বপ্রথম কাবা শরীফকে সাদা রেশমের চাদর দ্বারা আচ্ছাদন করেন। খলীফা নাসেরের যুগ পর্যন্ত শ্বেত রেশম গেলাফের প্রচলন ছিল। পরবর্তীতে সুলতান মাহমুদ সবক্তগীন তার শাসনামলে হলুদ রেশমের গেলাফে কাবা শরীফ আচ্ছাদন করেন।
মামুনের বাণীগুলো হচ্ছে- লোকদের জ্ঞান-গরিমা নিয়ে গবেষণা করার মধ্যে যতটুকু লাভ রয়েছে, জীবনী আলোচনায় ততটুকু নেই। দ্বিতীয় বাণী- যখন কোন বিপদ এসে যায় তখন এ বিপদ থেকে কেটে উঠা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। তৃতীয় বাণী-সবচেয়ে ভালো মজলিস হচ্ছে যেখানে লোকেরা মানুষদের অবস্থা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে। মানুষ তিন ধরনের। এক, পেটুক, যে সর্বদা খায়, দুই. অসুস্থ, যাকে সবসময় ঔষধ খেতে হয়, এবং তিন. সেই অসুস্থ লোক যার অবস্থা সর্বদা অপ্রীতিকর।
মামুন বর্ণনা করেন, আমি এক ব্যক্তি ছাড়া কারো কাছে নিরুত্তর হইনি। একদা সে কুফাবাসীকে নিয়ে এসে কুফার প্রশাসকের ব্যাপারে অভিযোগ উত্থাপন করল। আমি বললাম, তুমি মিথ্যা বলছ। তিনি তো বড় ইনসাফগার লোক। সে বলল, আমিরুল মুমিনীন সত্য বলেছেন। আর আমি মিথ্যা বলেছি। তবে এ শাসককে কেন আমাদের জন্যই শুধু নির্দিষ্ট করেছেন। কেন তাকে অন্য শহরে স্থানান্তর করছেন না? যাতে সে শহরটিকে তিনি ইনসাফে ভরে দিতে পারেন। যেমন আমাদেরকে ন্যায় বিচারেও সৎ শাসনে ভরে দিয়েছেন। আমি অবশেষে অপারগ হয়ে বললাম, তোমরা যাও। আমি তাকে পৃথক করে দিব।
মামুনের অনেক কবিতা রয়েছে। তিনি দাবা খেলার প্রশংসায় বহু কবিতা রচনা করেন।
📄 মামুন কর্তৃক বর্ণিত হাদীসসমূহ:
বায়হাকী বলেন, আমি আবু আব্দুল্লাহ হাকেম থেকে শুনেছি। তিনি আবু আহমদ সায়রাফী এবং তিনি জাফর বিন আবু উসমান তায়ালাসী থেকে বর্ণনা করেন, আমি (জাফর বিন আবু উসমান) আরাফার দিন মামুনের পেছনে মেহরাবে দাঁড়িয়ে নামায পড়লাম। সালাম ফিরে লোকেরা তাকবীর পাঠ করতে লাগল। আমি মামুনকে দেখলাম। তিনি বললেন, চুপ কর। হযরত আবুল কাসেম (সা.)-এর সুন্নত হল আগামীকাল তাকবীর বলা। (রাবী বলেন) ঈদুল আযহার দিন আমি নামায পড়তে গেলাম। মামুন মিম্বরে আরোহণ করে খুৎবা দিলেন। হামদ ও ছানার পর তিনি বললেন,
اللَّهُ أَكْبَرُ كَبِيرًا وَالْحَمْدُ لِلَّهِ كَثِيرًا وَسُبْحَانَ اللَّهِ بُكْرَةً وَأَصِيلًا
আমি হাশিম বিন বাশীর থেকে বর্ণনা করছি। তিনি ইবনে শবরমা থেকে, তিনি শাবী থেকে, তিনি বারা বিন আযেব থেকে, তিনি আবু বুরদা বিন দিনার থেকে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-থেকে রেওয়ায়েত করেন। নবী আকরাম (সা.) ইরশাদ করেন, যে ঈদুল আযহার নামাযের আগে কুরবানী করবে সে যবেহকৃত পশুর গোশত খেতে পারবে। আর যে ঈদুল আযহার নামাযের পর কুরবানী করবে সে সুন্নতের পথ ধরে পৌঁছে যাবে।
اللهُ أَكْبَرُ كَبِيرًا وَالْحَمْدُ لِلَّهِ كَثِيرًا وَسُبْحَانَ اللَّهِ بكرة وأصيلا
হে পৃথিবীর প্রতিপালক! আমাকে যোগ্যতা দাও। হাকিম বলেন, আমি এ হাদীসখানা আবু আহমদ ছাড়া অন্য কোন সূত্রে লিপিবদ্ধ করিনি। আমার দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি নির্ভরযোগ্য। আমার মনে তার প্রতি কিছুটা সংশয় ছিল। কিন্তু আমি আবুল হাসান এবং দারা কুতনীকে জিজ্ঞেস করলাম। তারা বললেন, আমাদের দৃষ্টিতে জাফরও বিশুদ্ধ। আমি বললাম, শায়খ আবু আহমদ? বললেন, আমি উযীর আবুল ফজল জাফর বিন ফরাত থেকে, তিনি আবুল হুসাইন মুহাম্মাদ বিন আব্দুর রহমান রুদবারী থেকে, তিনি মুহাম্মাদ বিন আব্দুল মালিক তারিখী থেকে রেওয়ায়েত করেন। তারা সকলেই নির্ভরযোগ্য। অতঃপর বললেন, আমার থেকে হযরত তায়ালাসী হাদীস বয়ান করেছেন এবং তার থেকে ইয়াহইয়া বিন মুঈন। তিনি বলেন, মামুন খুতবায় এ হাদীসটি পড়েন।
সূলী বলেন, আমার কাছে হযরত তায়ালাসী ইয়াহইয়া বিন মুঈনের বরাত দিয়ে বয়ান করেন, বাগদাদে আরাফার দিন, সেদিন শুক্রবার ছিল মামুন খুতবা দেন। সালাম ফেরানোর পর লোকেরা তাকবীর দেয়। মামুন তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং লাফ দিয়ে মেহরাবের লাঠি হাতে নিয়ে বললেন, এটা কিসের আওয়াজ? অসময়ে কেন তাকবীর দিচ্ছ? আমাকে হাশিম বিন বাশীর, তিনি মুজাহিদ থেকে, তিনি ইবনে আব্বাস থেকে রেওয়ায়েত করেন- রাসূলুল্লাহ (সা.) জমরাতুল উকবা পর্যন্ত তালবীয়া পাঠ করতেন। আর দ্বিতীয় দিন যুহর পর্যন্ত তালবীয়া এবং তাকবীর বলতেন।
সূলী বলেন, আবুল কাসেম- আহমদ বিন ইবরাহীম মওসূলীর বরাত দিয়ে আমার নিকট বর্ণনা করেন, একদিন জনৈক ব্যক্তি মামুনের কাছে এসে বলল, হে আমিরুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টি বালবাচ্চা। আল্লাহ তা'আলার দৃষ্টিতে ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে প্রিয় যে তার সৃষ্ট বালবাচ্চাদের উপকার করবে। মামুন চিৎকার দিয়ে বলে উঠলেন, চুপ কর আমি হাদীসের দিক থেকে তোমার চেয়ে বড় আলেম। আমার নিকট ইউসুফ বিন আতীয়া সাফায়ী বর্ণনা করেন। তিনি সাবিত থেকে, তিনি আনাস (রা.) থেকে রেওয়ায়েত করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টি বালবাচ্চা, আল্লাহ তা'আলার দৃষ্টিতে সবচেয়ে প্রিয় ঐ ব্যক্তি যে তার বালবাচ্চাদের উপকার করে।
ইবনে আসাকিরও এ হাদীসটি অভিন্ন সূত্রে বর্ণনা করেছেন, যা আবু ইয়ালা মওসূলী স্বরচিত মসনদ গ্রন্থে ইউসুফ বিন আতীয়ার সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
সূলী বলেন, মাসীহ বিন হাতিম আল-আকলী আমার কাছে বর্ণনা করেন, আব্দুল জব্বার বিন আব্দুল্লাহ বলেন, আমি মামুনের খুতবা শুনেছি। তিনি লজ্জার উপর বয়ান রাখছিলেন। তিনি এর অনেক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে বললেন, হাশিম আমার নিকট বয়ান করেন। তিনি মানসুর থেকে, তিনি হাসান থেকে, তিনি আবু বকরাহ থেকে, তিনি ইমরান বিন হুসাইন থেকে রেওয়ায়েত করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, লজ্জা হল ঈমান, আর ঈমান হল জান্নাত, বেলজ্জা হল বাড়াবাড়ি, আর বাড়াবাড়ি হল জাহান্নাম। ইবনে আসাকির এটি ইয়াহইয়া বিন আকতাম আল মামুন থেকে বর্ণনা করেছেন।
হাকিম বলেন, মুহাম্মাদ বিন আহমদ বিন তামীম ইয়াহইয়া বিন আকতামের বরাত দিয়ে বলেন, একদিন মামুন আমাকে বললেন, ইয়াহইয়া! আমার মন চাইছে যে, আমি হাদীস বর্ণনা করব। আমি বললাম, আমিরুল মুমিনীনের চেয়ে এ কাজ করার বেশি হকদার আর কে আছে? তিনি মিম্বর আনতে বললেন, মিম্বর আনা হল। তিনি মিম্বরে আরোহণ করলেন। সর্বপ্রথম এ হাদীসটি তিনি বয়ান করেন। বলেন, হাশিম আমাকে, তিনি আবুল জাহাম থেকে, তিনি যহরী থেকে, তিনি আবু সালামা থেকে, তিনি আবু হুরায়রা থেকে রেওয়ায়েত করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, জাহান্নামে ইমরাউল কায়েস কবিদের পতাকাবাহী হবে। অতঃপর তিনি আরো তিনটি হাদীস বর্ণনা করার পর মিম্বর থেকে নেমে এসে আমাকে বললেন, ইয়াহইয়া! আমার এ মজলিসটি কেমন লাগল? আমি বললাম, আমিরুল মুমিনীন! আপনার মজলিসটি অত্যন্ত চমৎকার হয়েছে। অতঃপর তিনি বলতে লাগলেন, তোমার কসম, এ মজলিসে লোকদের মাঝে কোন মিষ্টতা ছিল না। এ মজলিস তালিযুক্ত কাপড় পরিহিতদের মজলিস ছিল। যারা কলম কালি নিয়ে এসেছিল।
খতীব বলেন, আবুল হাসান আলী বিন কাসেম আমার নিকট ইবরাহীম বিন সাঈদ আল-জাওহারী থেকে বর্ণনা করেন, মামুন মিসর জয় করলে জনৈক ব্যক্তি তাকে বলল, সেই প্রতিপালকের শোকর, যিনি হে আমিরুল মুমিনীন! আপনার দুশমনদের পরাজিত করেছেন এবং ইরাক, সিরিয়া এবং মিসরবাসীকে আপনার অনুগত করে দিয়েছেন। সাবাশ! আপনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চাচার সন্তান। মামুন বললেন, এখনও আমার একটি অভিপ্রায় বাকী থেকে গেছে, আর তা হল- আমি একই সভায় বসে ইয়াহইয়ার মত বরেণ্য মুহাদ্দিসদের সাথে মতবিনিময় করব, তারা বলবেন, আল্লাহ তা'আলা আপনার প্রতি সন্তুষ্ট- এ বিষয়ে আপনি কি বর্ণনা করতে পারেন? আমি বলব, আমার নিকট হাদীস বর্ণনা করেছেন হাম্মাদ বিন সালামা এবং হাম্মাদ বিন যায়েদ। তারা সাবিত বানানী থেকে, তিনি আনাস বিন মালিক (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, নবী (সা.) বলেন, যে দু'সন্তান অথবা এর চেয়ে বেশি সন্তান লালন পালন করবে, তারা তার সামনে লালিত পালিত হবে এবং তার সামনে মারা যাবে, তাহলে সে ব্যক্তি জান্নাতে আমার সাথে এভাবে থাকবে- এ কথা বলে তিনি (সা.) দু'টি আঙুল ফাঁক করে দেখালেন।
খতীব বলেন, এ রেওয়ায়েতটি ভুল। আর ভুলটি হল মামুন হাম্মাদ থেকে বর্ণনা করেছেন। অথচ মামুন ১৭০ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেছেন। আর হাম্মাদ বিন সালামা ১৬৭ হিজরীতে এবং হাম্মাদ বিন যায়েদ ১৭৯ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন।
হাকিম বলেন, মুহাম্মাদ বিন ইয়াকুব বিন ইসমাঈল আমার নিকট মুহাম্মাদ বিন সহল বিন আসকার থেকে বর্ণনা করেন, একদিন মামুন আযান দেবার জন্য দাঁড়ালেন। আমরাও তার পার্শ্বে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ইত্যবসরে এক মুসাফির যার হাতে কালির দোয়াত ছিল এসে বলল, আমিরুল মুমিনীন! আমি মুহাদ্দিস। মামুন বললেন, তুমি একি বলছ? তোমার অমুক অধ্যায়টি স্মরণ আছে? এরপর মামুন হাদীস বয়ান করতে শুরু করলেন। পরিশেষে মামুন লোকদের উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমরা তিনদিন হাদীস পড়ে মুহাদ্দিস বলতে লেগেছ।
ইবনে আসাকির বলেন, মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম ইয়াহইয়া বিন আকতাম থেকে বর্ণনা করেন, আমি একদিন রাতে মামুনের পার্শ্বে শুয়ে ছিলাম। গভীর রাতে পিপাসার কারণে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমি পার্শ্ব পরিবর্তন করলাম। মামুন বললেন, ইয়াহইয়া! কি হয়েছে? আমি বললাম, পিপাসা লেগেছে। এ কথা শুনে তিনি এক গ্লাস পানি এনে আমাকে পান করালেন। আমি বললাম, হে আমিরুল মুমিনীন! আপনি খাদেমকেও ডাকলেন না, কোন গোলামকেও জাগালেন না। তিনি বললেন, আমাকে আমার বাবা, তিনি আমার দাদা থেকে তিনি উকবা বিন আমের থেকে রেওয়ায়েত করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, কাওমের সরদার হবেন তার খাদেম।
খতীব এ রেওয়ায়েতটি মামুনের সূত্রে এভাবে বর্ণনা করেছেন, আমার নিকট হারুন রশীদ, তিনি মাহদী থেকে, তিনি মানসুর থেকে, তিনি তার পিতা থেকে, তিনি ইকরামা থেকে, তিনি ইবনে আব্বাস থেকে, তিনি জারীর বিন আব্দুল্লাহ থেকে রেওয়ায়েত করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, কাওমের সরদার হবেন তার খাদেম।
ইবনে আসাকির আবু হুযায়ফা থেকে বর্ণনা করেন, আমি মামুনের থেকে শুনেছি, তিনি আমার নিকট এ হাদীস বর্ণনা করেন, আমার বাবা আমাকে, তিনি আমার দাদা থেকে, তিনি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন। নবী আকরাম (সা.) ইরশাদ করেন, কাওমের গোলাম এ কাওমের মধ্য থেকেই হবে।
মুহাম্মাদ বিন কাদামা বলেন, যখন মামুন এ সংবাদ পেলেন যে, আমার থেকে আবু হুযায়ফা এ হাদীসটি রেওয়ায়েত করেছেন, তখন তিনি আবু হুযায়ফাকে দশ হাজার দিরহাম পুরষ্কার দিলেন।
মামুনের যুগে ২০০ হিজরীতে আদমশুমারির হিসাব অনুযায়ী বনু আব্বাসের জনসংখ্যা ছিল ৩৩ হাজার।
মামুনের যুগে নিম্নবর্ণিত ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন- সুফিয়ান বিন আয়নাহ, হযরত ইমাম শাফী (র.), আঃ রহমান বিন মাহদী, ইয়াহইয়া বিন সাঈদ আল-কাতান, ইউনুস বাকের (মাগাযীর বর্ণনাকারী), হযরত ইমাম আবু হানীফা (র.)-এর ছাত্র আবু মতীহ বলখী, দানশীল মারুফ কারখী, আল-মুবতাদা গ্রন্থের লেখক ইসহাক বিন বশীর, ইমাম মালিক (র.)-এ গুরুত্বপূর্ণ ছাত্র এবং মিসরের কাযী ইসহাক বিন ফরাত, আবু উমর শিবানী, ইমাম মালিক (র.)-এর ছাত্র আললাগবী আশহাব, ইমাম আবু হানীফা (র.)-এর ছাত্র হাসান বিন মীয়াদ লুলুয়ী, হাম্মাদ বিন উসামা, হাফেজ রুহ বিন উবাদা, যায়েদ বিন হিব্বান, আবু দাউদ তায়ালাসী, গাযী বিন কায়েস- ইমাম মালিক (র.)-এর ছাত্র, প্রসিদ্ধ দানশীল আবু সুলায়মান দারানী, আলী রেযা বিন মূসা কাযেম, আরবের ইমাম ফারা, কায়তাবা বিন মিহরান, নাহুবিদ কতরব, ওয়াকেদী, আবু উবায়দা, মুআম্মার বিন মুছনা, নযর বিন শামীল, সাইয়্যেদা নফীসা, কৃষ্ণী নাহুবিদ হিশাম, ইয়াযিদী, ইয়াযিদ বিন হারুন, বসরার কাযী ইয়াকুব বিন ইসহাক হাযরামী, আঃ রাজ্জাক, আবুল আতাহীয়া, আবু আসেম, আঃ মালিক বিন মাজশুন, আব্দুল্লাহ বিন হাকাম, আবু যায়েদ আনসারী, আসমায়ী প্রমুখ।