📄 সাফফাহ: বনু আব্বাসের প্রথম খলীফা
সাফ্ফাহ: বনূ আব্বাসের প্রথম খলীফা আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন আলী বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব। উপাধি আবুল আব্বাস। সাফফাহ বনু আব্বাসের প্রথম বাদশাহ। তিনি ১০৮ হিজরী ভিন্ন মতে ১০৪ হিজরীতে বলকার উত্তপ্ত রণাঙ্গনে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই প্রতিপালিত হন। কুফায় তার বাইআত গ্রহণ অনুষ্ঠান হয়। জননীর নাম রায়েলাতুল হারেছা। তিনি স্বীয় ভ্রাতা ইবরাহীম বিন মুহাম্মাদের নিকট হাদীস শ্রবণ করেন। চাচা ঈসা বিন আলী তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বয়সে স্বীয় ভ্রাতা মানসুরের ছোট।
ইমাম আহমদ মুসনাদ গ্রন্থে হযরত আবু সাঈদ খুদরী থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, একটি বিশৃঙ্খল অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হলে আমার আহলে বাইতের মধ্য থেকে সাফফাহ নামক একজনের আবির্ভাব হবে। তিনি প্রচুর পরিমাণে সম্পদ লোকদের দান করবেন।
উবাইদুল্লাহ আয়শী বলেন, আমার বাবা বলেছেন, বনু আব্বাসের শাসনামল যখন এলো তখন আমার শিক্ষক বললেন, আল্লাহর কসম! বনু আব্বাসের পরিবার অপেক্ষা বড় কারী, ইবাদতকারী এবং দানশীল এ ভুবনে আর কেউ নেই।
ইবনে জারীর তাবারী বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বীয় চাচা হযরত আব্বাসকে "আপনার বংশে খিলাফত স্থানান্তর হবে" এ কথা বলার পর থেকে হযরত আব্বাসের বংশধররা খিলাফত প্রাপ্তির কামনা করতে থাকেন।
রাশিদীন বিন কুরায়েব কর্তৃক বর্ণিত, আবু হাশিম আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন হানীফ সিরিয়া যাবার পথে মুহাম্মাদ বিন আলী বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্বাসের সাথে সাক্ষাত হলে বলেন, হে চাচাতো ভাই! এ কথা কাউকে বলবেন না, আমার মন বলছে, অচিরেই খিলাফত আপনাদের হাতে এসে পড়বে। মুহাম্মাদ বললেন, আমারও তাই মনে হচ্ছে, এ কথা আর কাউকে জানাবেন না।
মাদায়েনী বলেন, আমি অনেক লোকের নিকট শুনেছি, ইমাম মুহাম্মাদ বিন আলী বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস তিন বার অর্থাৎ, প্রথম বার ইয়াযিদ বিন মুআবিয়ার মৃত্যুর সময় দ্বিতীয় বার এ শতাব্দীর শুরুর দিকে এবং তৃতীয় বার আফ্রিকায় বিশৃঙ্খলার সময় বলেছিলেন, আমার মনে হয় পূর্ব দিক থেকে দলে দলে লোকেরা আমাদের সাহায্য নিতে ছুটে আসবে এবং তাদের সাহায্যে বনূ আব্বাসের অশ্বগুলো পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত ছুটে যাবে। ইয়াযিদ বিন আবু মুসলিম আফ্রিকায় শহীদ হওয়ার পর বারবার জাতি বিদ্রোহ করলে হযরত ইমাম মুহাম্মাদ আবু মুসলিম খোরাসানীকে একটি পত্র দিয়ে মুহাম্মাদ (সা.)-এর পরিবারের প্রতি লোকদের আহ্বান করার জন্য পাঠান। লোকেরা প্রস্তুত ছিল। ইত্যবসরে ইমাম মুহাম্মাদ ইন্তেকাল করেন। লোকেরা তার পুত্র ইবরাহীমের নিকট বাইআত করে। এ সংবাদ পেয়ে মারওয়ান ইবরাহীমকে উঠিয়ে নিয়ে যায় এবং হত্যা করে। অতঃপর ইবরাহীমের ভাই সাফফার কাছে দলে দলে আমজনতা আসতে থাকে। অবশেষে ১৩২ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসের ৩ তারিখে কুফায় সাফফার নিকট লোকেরা বাইআত গ্রহণ করে। তিনি এসব লোকের জুমআর নামায পড়াতেন এবং খুতবার মধ্যে বলেন, সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ পাকের যিনি বিধান হিসেবে ইসলামকে মনোনীত করেছেন। অতঃপর তিনি কুরআন শরীফের আয়াত তিলাওয়াতের মাধ্যমে নিজ পরিবারের বিবরণ দানে বললেন, নবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর ইসলামের সকল কার্যাদি আসহাবে রসূল (সা.)-দের উপর বর্তায়। কিন্তু বনূ হরব এবং মারওয়ান তা কুক্ষিগত করে অত্যাচার আরম্ভ করে। তারা অনেক অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ে। আমাদের প্রাপ্য আমাদের দেয়া হলে আমরা সে যুগের হতদরিদ্রদের সেবা করতে পারতাম। যারা আমাদের বংশের সাথে কোন প্রকার সম্পর্ক রেখেছে আমাদের বংশের সাথে তাদেরকেও সরিয়ে দেয়া হয়েছে। সে সময় আমাদের এবং আহলে বাইতের কোন প্রকার ক্ষমতাই ছিল না। হে কুফাবাসী! আপনারা আমার ভালোবাসার প্রাসাদ এবং বন্ধুত্বের মারকায। আপনারা কখনই আমার ভালোবাসা থেকে দূরে সরে যাবেন না। অত্যাচারীর নির্মম অত্যাচারও আমাদের পৃথক করে রাখতে পারবে না।
ঈসা বিন আলী (বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস হাশেমী, হিজাযী, বাগদাদী) হুমায়মা থেকে কুফা আসার সময় সাফফাহর সাথে চৌদ্দজন বীর সাহসী লোককে নিতে বলেন, সংবাদ পেয়ে মারওয়ান প্রতিরোধ করতে এলে তিনি নির্মমভাবে পরাজিত হন এবং তিনি সহ বনূ উমাইয়্যার অসংখ্য মানুষ ও অগনন সৈনিক নিহত হয়। এভাবে সাফফাহ গোটা পশ্চিমাঞ্চল পদানত করেন।
যাহাবী বলেন, সাফফাহর শাসনামলে ঐক্যের মধ্যে ফাটল ধরায় তাহেরা থেকে সুদান পর্যন্ত বিস্তৃত ভূখণ্ড, গোটা স্পেন এবং কতিপয় শহর বেদখল হয়ে যায়। অতঃপর সেগুলো আর হাতে আসেনি। সাফফাহ ১৩৬ হিজরীর যিলহজ মাসে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। তিনি ভ্রাতা আবু জাফরকে খিলাফতের উত্তরাধিকার মনোনীত করে যান। তিনি ১৩৪ হিজরীতে খিলাফতের রাজধানী কুফা থেকে আনবারে স্থানান্তর করেন।
সূলী বলেন, সাফফাহ বিভিন্ন সময় এ কথাগুলো বলেছেন, কুদরত বাড়লে প্রবৃত্তি হ্রাস পায়। পরহেযগারী কমে গেলে সত্য মান হয়। অসভ্য সেই ব্যক্তি যে কৃপণতা গ্রহণ এবং ধৈর্যকে অসম্মান জ্ঞান করে। ধৈর্য ও নম্রতা ক্ষতির কারণ হলে ক্ষমা করে দিবে। ধৈর্য এক মহৎ গুণ। শরীয়তে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত বাদশাহ কোন প্রকার বিশ্রাম নিবে না, চিন্তাভাবনা করে অবিশ্রান্ত কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
সূলী বলেন, সাফফাহ অত্যন্ত দানশীল ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ওয়াদা করলে তা পূরণ না করা পর্যন্ত স্থানচ্যুত হতেন না। একবার আব্দুল্লাহ বিন হাসান তাকে বললেন, আমি কোন দিন এক লাখ দেরহাম দেখিনি। সঙ্গে সঙ্গে সাফফাহ এক লাখ দেরহাম নিয়ে এসে তার বাড়িতে পৌছে দেবার নির্দেশ দেন। তিনি অনেক কবিতা রচনা করেন। তার আংটিতে খোদাই করে লিখা ছিল- الله ثقة عبد الله به يؤ من
সাঈদ বিন মুসলিম বাহালী বলেন, একদা তিনি বনু হাশিমসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের মজলিসে বসেছিলেন। তার হাতে ছিল পবিত্র কুরআন শরীফ। ইত্যবসরে আব্দুল্লাহ বিন হাসান এসে বললেন, আল্লাহ তা'আলা কুরআন শরীফে আমাদের যে প্রাপ্যের কথা বলেছেন তা আমদের বুঝিয়ে দিন। সাফফাহ বললেন, তোমার পূর্বপুরুষ হযরত আলী (রা.) আমার চেয়ে অনেক উত্তম ও ন্যায়পরায়ণ খলীফা ছিলেন। আর তোমার পিতামহ হযরত হাসান এবং হযরত হোসেন তোমার চেয়ে অনেক উত্তম ছিলেন। অতএব আমার উপর কর্তব্য হযরত আলী (রা.) স্বীয় সন্তানদের যতটুকু দিয়েছেন আমিও তোমাকে ততটুকু দিব- এটাই ইনসাফ। এর অতিরিক্ত প্রাপ্তির যোগ্য তুমি নও। এ কথা শুনে তিনি নিরুত্তর রইলেন।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, বনু আব্বাসের শাসনামলে প্রশাসনিক দফতরগুলো থেকে আরবদের নাম বাদ পড়ে এবং তদস্থলে তুর্কীরা আসে। আস্তে আস্তে সবই তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং পরবর্তীতে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। এ সাম্রাজ্য বহু ভাগে বিভক্ত হয় এবং তারা পৃথক পৃথক গভর্নরের মাধ্যমে অত্যাচারের সাথে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্র পরিচালনা করে।
কথিত আছে, তিনি রক্ত ঝরিয়ে সকল গভর্নরের আনুগত্য অর্জন করেন। তবে তার বদান্যতা ছিল অপার। তার খিলাফতকালে যায়েদ বিন আসলাম, আব্দুল্লাহ বিন আবু বকর বিন হাজাম, মদীনা শরীফের বিচারপতি রাবীআ, আব্দুল মালিক বিন উমায়ের, ইয়াহইয়া বিন আবু ইসহাক হাযরামী, সুপ্রসিদ্ধ লেখক আব্দুল হামিদ (তিনি মারওয়ানের সাথে বুসির নামক স্থানে নিহত হন), মানসুর বিন মুতামার, হাম্মাম বিন মানবাহ প্রমুখ ওলামা ইন্তেকাল করেন।
📄 আল-মুনতাসির বিল্লাহ
আল-মুনতাসির বিল্লাহ মুহাম্মাদ আবু জাফর (অথবা আবু আব্দুল্লাহ) বিন মুতাওয়াক্কিল বিন মুতাসিম বিন হারুন রশীদ জায়শা নাম্নী রোমান বাঁদির গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সুদর্শন, প্রতাপান্বিত, জ্ঞানী, সৎ কাজের অনুরাগী, জুলুম নিঃশেষকারী এবং আলী পরিবারের প্রতি দয়ার্দ্র ছিলেন, হযরত ইমাম হুসাইনের কবর শরীফ যিয়ারতের অনুমতি দেন এবং তার বংশধরদের নিকট ফিদকের বাগান হস্তান্তর করেন।
মুনতাসির তার পিতা নিহত হওয়ার পর ২৪৭ হিজরীর শাওয়াল মাসে খিলাফতের তখতে আরোহণ করে সর্বপ্রথম স্বীয় ভ্রাতাদ্বয় মুতায এবং মুঈদকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করেন- যাদেরকে মুতাওয়াক্কিল উত্তরাধিকার মনোনীত করেছিলেন। প্রজাবৃন্দের মাঝে ন্যায় ও ইনসাফ ছড়িয়ে দেবার কারণে জনগণ তার প্রতাপের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। তিনি উঁচু মাপের ধৈর্যশীল। তার চয়নকৃত বাণীর মধ্যে এটি একটি- ক্ষমার স্বাদ শাস্তি প্রদানের স্বাদের চেয়ে বেশি মিষ্টি, ভদ্র লোকদের জন্য প্রতিশোধ গ্রহণ এক লজ্জাকর কাজ।
খিলাফতের মসনদে সমাসীন হয়ে তুর্কীদের সমালোচনা করেন, তাদের প্রতি খলীফা মুতাওয়াক্কিলকে হত্যার দোষ চাপিয়ে দেন এবং এ কারণে তাদের শাস্তি প্রদান করেন। ফলে তুর্কীরা হতাশ হয়ে পড়ে। কারণ তিনি ধৈর্যশীল, সাহসী এবং জ্ঞানী, অবশেষে তারা মুনতাসিরের চিকিৎসকের নিকট ত্রিশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা ঘুষ পাঠায়। চিকিৎসক খলীফার ঔষধে বিষ মাখিয়ে দেয়। এতে তার মৃত্যু হয়। কেউ কেউ বলেন, ভুলক্রমে বিষ মিশ্রিত ঔষধ সেবনের ফলে চিকিৎসক নিজেই পরলোকগমন করে। কেউ কেউ বলেন, অন্তিম মুহূর্তে খলীফা মুনতাসির বলেন, হে আমার জননী! দীন-দুনিয়া উভয় জগৎ আমার শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমার বাবার ইন্তেকালের কারণ আমি নিজেই।
মুনতাসির ২৪৮ হিজরীর রবিউল আখের মাসের ৫ তারিখে ২৪ বছর বয়সে প্রায় ছয় মাস খিলাফত পরিচালনা করে ইন্তেকাল করেন। কথিত আছে, একদিন মুনতাসির খেলাধুলার জন্য বসে আছেন। তার বাবার খাযানা থেকে একখানা কার্পেট সেই মজলিসে পাঠানো হয়। কার্পেটের মাঝে জনৈক আরোহীর চিত্র অঙ্কিত ছিল। আরোহীটি মুকুট পরিহিত ছিল। এর আশেপাশে ফার্সী ভাষায় কিছু লিখা ছিল। মুনতাসির ফার্সী ভাষায় পারদর্শী একজনকে ডেকে এর ভাবার্থ জানানোর জন্য বললেন, সে একবার পড়ে চুপ হয়ে গেল। তিনি আবার বললেন, এর ভাবার্থ কি? সে বলল, এর কোন অর্থ নেই। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, লিখা আছে-আমি শিরওয়া বিন কিসরা বিন হরমুয। আমি স্বীয় পিতাকে হত্যা করেছি। কিন্তু ছয় মাসের বেশি রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পাইনি, এ কথা শুনে স্বর্ণ খচিত থাকার পরও তিনি কার্পেটটি জ্বালিয়ে দেবার নির্দেশ দেন।
লাতায়িফুল মাআরিফ গ্রন্থে ছালাবী লিখেছেন, মুনতাসির খিলাফত প্রাপ্ত হয়ে প্রকৃত খলীফায় পরিণত হন। কারণ তার বাবা-দাদা সহ পাঁচজন সকলেই খলীফা ছিলেন। মুনতাসিরের ভাই মুতায এবং মুতামাদও প্রকৃত খলীফা ছিলেন। আমি (গ্রন্থকার) বলছি, মুসতাসিমও এমন খলীফা ছিলেন, যাকে তাতাররা শহীদ করে দেয়। তার বাবা-দাদা সহ পূর্বপুরুষও খলীফা ছিলেন। ছালাবী বলেন, কিসরা বংশে যে বাদশাহ খালেস তিনি হলেন শিরওয়া, তিনি নিজ পিতাকে হত্যা করেন এবং ছয় মাসের বেশি জীবিত ছিলেন না। বন্ আব্বাসের মধ্যে খালেস খলীফা মুনতাসির, তিনিও নিজ পিতাকে হত্যা করেন এবং ছয় মাসের বেশি জীবিত ছিলেন না।
📄 আল-মুসতায়িন বিল্লাহ
মুতাওয়াক্কিলের ভাই আল-মুসতায়িন বিল্লাহ আবুল আব্বাস আহমদ বিন মুতাসিম বিন রশীদ ২২১ হিজরীতে মুখারিক নামক বাঁদির গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তার লাবণ্যময় চেহারায় বসন্তের দাগ ছিল। তিনি ছিলেন তোতলা। মুনতাসিরের ইন্তেকালের পর সাম্রাজ্যের কর্মকর্তাবৃন্দ পরামর্শক্রমে মুসতায়িনকে খলীফা মনোনীত করেন। তিনি ২৮ বছর বয়সে খিলাফতের তখতে আরোহণ করেন এবং ২৫১ হিজরী পর্যন্ত তার খিলাফত ছিল। ওসীফ এবং বাগা নামক দুই তুর্কী যারা মুতাওয়াক্কিলের হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিল তিনি তাদেরকে পৃথক করে দিলে তুর্কীরা ভয়ে সামরাহ থেকে বাগদাদে চলে যায়। অতঃপর তারা ক্ষমা প্রার্থনা করে মুসতায়িনের নিকট দূত পাঠিয়ে সামরাহ-এ ফিরে আসার অনুমতি চায়। তিনি তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। করে তুর্কীদের বন্দী করার ইচ্ছা করলে তারা মুতায বিল্লাহর নিকট বাইআত গ্রহণ করে। মুতায বিশাল বাহিনী নিয়ে মুসতায়িনের উপর হামলা করেন। মুসতায়িন নিহত হওয়ায় বাগদাদবাসী উত্তেজিত হয়ে পড়ে। উভয় বাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। এ লড়াই কয়েক মাস ধরে চলতে থাকে। হতাহত হয় অসংখ্য জনতা, যুদ্ধের দীর্ঘতর কারণে মানুষের জীবন অচল হয়ে পড়ে। অবশেষে মুসতায়িনের বাহিনী সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। তিনি সন্ধি স্থাপনের মাধ্যমে ২৫২ হিজরীতে খিলাফত থেকে সরে দাঁড়ান। এ সন্ধিতে কাযি ইসমাঈল মুসতায়িনের প্রতি কঠোর শর্তাবলী আরোপ করে। অন্যান্য কাযিগণ আরোপিত কঠোর শর্তাবলীকেই সন্ধির শর্তসমূহ হিসেবে চুক্তিপত্রে মোহর এঁটে দেয়।
মুসতায়িন ওয়াসেত শহরে চলে যান। তিনি সেখানে নয় মাস যাবত এক আমীরের নযরবন্দী হিসেবে অবস্থান করেন। অতঃপর সেই আমীর তাকে সামরাহ-এ পাঠিয়ে দেয়। মুতায আহমদ বিন তুলুনকে এক লিখিত ফরমানের মাধ্যমে মুসতায়িনকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। প্রতি উত্তরে আহমদ জানায়- খলীফার বংশধর আমি কখনই হত্যা করব না। অতঃপর এ কাজের জন্য সাঈদ হাজেবকে নিয়োগ করা হয়। ২৫২ হিজরীর শাওয়াল মাসের ৩ তারিখে যখন তার বয়স ৩১ বছর সে তাকে হত্যা করে।
মুসতায়িন সৎ, জ্ঞানী, সাহিত্যিক এবং বাগ্মী ছিলেন। তিনিই সর্বপ্রথম তিন শেলাইবিশিষ্ট জামা ও লম্বা টুপি পরিধান করেন। তার খিলাফতকালে নিম্নবর্ণিত ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন- আবদ বিন হামীদ, আবু তাহের বিন আল-সরাহ হারেস বিন মিসকীন, আবু হাতিম, জাখাত প্রমুখ।
📄 আল-মুতাম বিল্লাহ
২৩২ হিজরীতে আল-মুতায বিল্লাহ মুহাম্মাদ ভিন্ন মতে যাবের আবু আব্দুল্লাহ বিন মুতাওয়াক্কিল বিন রশীদ কাবীহা নামক রোমান বাঁদির গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। মুসতায়িনকে অপসারণের পর ২৫২ হিজরীতে ১৯ বছর বয়সে খিলাফতের তখতে আরোহণ করেন। ইতোপূর্বে এত অল্প বয়সে কেউ খিলাফত পাননি। তিনি টগবগে যুবক ছিলেন।
মুতাযের হাদীসের উস্তাদ আলী বিন হরব বলেন, আমি তার চেয়ে সুন্দর খলীফা আর দেখিনি। তিনিই প্রথম খলীফা যিনি ঘোড়াকে স্বর্ণের অলংকার পরান। পূর্ববর্তী খলীফাগণ স্ব স্ব ঘোড়ার গলায় হাল্কা রৌপ্যের অলংকার পরাতেন। মসনদে আরোহণের বছর ওয়াছেক কর্তৃক নিযুক্ত আশনাস নামক রাষ্ট্রের ডেপুটি কর্মকর্তা মারা যায়। তার পরিত্যক্ত সম্পদ হিসেবে পঞ্চাশ হাজার দিনার রেখে যায়- যা মুতায হস্তগত করেন। তার মৃত্যুর পর মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বিন তাহেরকে নায়েব মনোনীত করেন। তিনি সর্বদা নিজের কাছে দু'টি তলোয়ার বেঁধে রাখতেন। কিছুদিন পর তাকে অপসারণ করে তদস্থানে নিজের ভাই আবু আহমদকে নিয়োগ করেন। তিনি সোনার মুকুট পরতেন এবং দু'টি তলোয়ার বহন করতেন। তাকেও অপসারিত করে ওয়াসেত শহরে পাঠিয়ে দেয়া হয়। অতঃপর মদ্যপ বাগাকে নায়েবের দায়িত্ব দেয়া হয়। সেও শাহী মুকুট পরত। সে এক বছর পর মুতাযের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। অবশেষে তাকে হত্যা করা হয় এবং তার কর্তিত মস্তক মুতাযের সামনে হাজির করা হয়।
এ বছর রযব মাসে তিনি তার ভাই মুঈদ বিল্লাহকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করেন। বেত্রাঘাত করান এবং বন্দী করে রাখেন। এতে মুঈদ পরলোক গমন করলে মুতায ভয় পেয়ে যান। হত্যার অপরাধে যেন অভিযুক্ত না হন সে জন্য তিনি কাযীদের ডেকে সাক্ষ্য প্রদান করেন। কিন্তু এতে কোন আছর হলো না।
মুতায তুর্কীদের বিশেষ করে সালেহ বিন ওসীফকে দেখে দারুণ ভয় পেতেন। একদিন তুর্কীরা অর্থের বিনিময়ে সালেহকে হত্যার কথা জানালে মুতায তার মায়ের কাছে কিছু অর্থ চাইলে তিনি তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। সে সময় কোষাগারে কোন অর্থকড়ি ছিল না। ঘুষ প্রদানে বিলম্ব হওয়ায় তুর্কীরা সালেহ বিন ওসীফ এবং মুহাম্মাদ বিন বাগাকে সাথে নিয়ে অস্ত্র সজ্জিত হয়ে রাজ প্রাসাদে প্রবেশ করে মুতাযকে বেরিয়ে আসতে বলে, তিনি অসুস্থ বেরিয়ে আসতে পারবেন না- এ কথা জানিয়ে দেন। তারা কোলাহল করতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা ভেতরে প্রবেশ করে। মুতাযের পা ধরে বাইরে নিক্ষেপ করে। তাকে মারতে মারতে মুখ লাল করে দেয়া হয়। গরমের সময় ছিল, তুর্কীরা তাকে রোদে দাঁড় করিয়ে রাখে। তারা মুতাযকে তার বাইআত থেকে সরে হবার জন্য চাপ দেয়। অতঃপর কাযী বিন আবু শিওয়ারিবকে ডাকা হয়। তার সামনে তিনি নিজ বাইআত থেকে সরে যান। তারপর মুহাম্মাদ বিন ওয়াছেক- যাকে মুতায বাগদাদে পাঠিয়ে দিয়েছিল তিনি বাগদাদ থেকে রাজধানী সামরাহ-এ এসে পৌছলে তিনি তার উপর খিলাফতের দায়িত্ব অর্পণ করেন এবং তার হাতে বাইআত করেন।
এ ঘটনার পাঁচ দিন পর এক দল লোক এসে গোসল করানোর জন্য মুতাযকে হাম্মামে নিয়ে যায়। গোসলের পর তার পিপাসা লাগে। তাকে পানি দেয়া হয়নি। হাম্মাম থেকে বেরিয়ে এসে তাকে বরফের পানি খাওয়ানো হলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে ইন্তেকাল করেন। তিনিই প্রথম খলীফা যিনি পিপাসায় কাতর হয়ে ২৫৫ হিজরীর শাওয়াল মাসের ৮ তারিখে পরলোক গমন করেন।
প্রথমে মুতাযের জননী কাবীহা তাদের ভয়ে আত্মগোপন করে ছিল। পরে রমযান মাসে বেরিয়ে এসে সালেহ বিন ওসীফকে অনেক ধন-দৌলত অর্থাৎ তের লাখ দিনার এবং দুটি জামা। তন্মধ্যে একটি জামায় জমরুদ এবং অপরটিতে মতি ও ইয়াকুত জড়ানো ছিল। এ দু'টি জামার আনুমানিক মূল্য দুই হাজার দিনার। এত সম্পদ দেখে ইবনে ওসীফ বলল, এত সম্পদ থাকার পরও পঞ্চাশ হাজার দিনারের জন্য এ নারী তার আপন ছেলেকে হারিয়েছে। ইবনে ওসীফ তার কাছ থেকে এগুলো নিয়ে তাকে মক্কা শরীফে পাঠিয়ে দেয়। কাবীহা মুতামাদের খিলাফত পর্যন্ত সেখানেই ছিল। অতঃপর সে সামরাহ ফিরে আসে এবং ২৬৪ হিজরীতে পরলোক গমন করে। মুতাযের যুগে যেসব ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন তারা হলেন- সারী সাকতী, হারুন বিন সাঈদ, মুসনাদের লেখক দারমী, আকবী প্রমুখ।