📄 ইয়াযিদ বিন ওলীদ
ইয়াযিদ আবু খালিদ বিন ওলীদ বিন আব্দুল মালিক সৈন্যদের ভাতা হ্রাস করায় তাকে নাকেস (অঙ্গহীন বা অসম্পূর্ণ) উপাধিতে ভূষিত করা হয়। চাচাত ভাই ওলীদকে হত্যা করে তিনি খিলাফতের তখত অধিকার করেন। ইয়াযিদের মা হলেন ফরান্দ বিনতে ফিরোজ, ফিরোজের মা হলেন শিরাওয়া বিন কিসরার মেয়ে, শিরাওয়ার মা হলেন খাকান বাদশাহর মেয়ে, আর ফিরোজের নানী হলেন কায়সারের কন্যা। এ জন্য তিনি গর্ব করে এ কবিতাটি আবৃত্তি করতেন, "আমি কিসরার দৌহিত্র, মারওয়ানের পুত্র এবং আমার নানা কায়সার ও খাকান।"
ছা’লাবী বলেন, ইয়াযিদ দাদা এবং নানা উভয় দিক থেকে শাহজাদা ছিলেন। ওলীদের হত্যাকাণ্ডের পর তিনি এক অভিভাষণে বলেন, "আল্লাহর কসম, আমি গর্বিত ও উদ্ধত হয়ে আপনাদের সামনে আসিনি। দুনিয়ার মোহ এবং সাম্রাজ্যের লোভ আমার নেই। আল্লাহ তা'আলা আমার প্রতি করুণা না করলে আমি গুনাহগার হবো। আমি আপনাদের আল্লাহ তা'আলার কিতাব এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নতের প্রতি আহ্বান করছি। যখন হালালকে হারামকারীদের এবং বিদআতের রক্ষকদের আবির্ভাব হয়েছে তখন হিদায়েতের নিশান পুরাতন হয়ে পড়েছে এবং আল্লাহভীরুদের দীপ্তি নির্বাপিত হয়েছে। সমাজের এ চিত্র দর্শনে আমি আজ ভীতসন্ত্রস্ত। অন্তরের কঠোরতা এবং চরিত্রের তিমিরাচ্ছন্নতা দূর করুন। আমি আপনাদের সঠিক ও সোজা পথে ফিরিয়ে নিতে চাই। আমি এ বিষয়ে ইসতেখারা করেছি। আমি আমার আত্মীয় এবং বন্ধুদের বলবো, আল্লাহ তা'আলা পৃথিবী এবং তাঁর বান্দাদের ভ্রষ্টাচার থেকে নিরাপদ রাখবেন। আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত আর কোন শক্তি নেই। জনতা! আমি আপনাদের একটি ইট অথবা একটি পাথরও অর্থহীন হতে দিব না- এ মানসিকতা নিয়েই আমি আপনাদের নেতা হয়েছি। সংগৃহীত রাজস্ব সংশ্লিষ্ট শহর-নগরেই ব্যয় করবো, যাতে আপনারা সমানভাবে উপকৃত হতে পারেন। যদি এ শর্তে আপনারা আমার বাইআত গ্রহণ করেন তবে আমি আপনাদের এবং আপনাদের সেবা করা আমার জন্য ফরয, আর এ শর্ত থেকে সরে দাঁড়ালে আমার কোন বাইআত নেই। এ দৃষ্টিকোণ থেকে আমার চেয়ে কোন যোগ্য ও সাহসী ব্যক্তি থাকলে আপনারা তার বাইআত গ্রহণ করুন। আর আমি আপনাদের আগে তার কাছে বাইআত এবং তার আনুগত্য করবো। আমি আল্লাহর নিকট আমার এবং আপনাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি।"
উসমান বিন আবুল আতিকা বলেন, ইয়াযিদ হলেন প্রথম খলীফা যিনি অস্ত্র সজ্জিত হয়ে ঈদগাহে যান। তার খিলাফতকালে দুর্গের দরজা থেকে ঈদগাহ পর্যন্ত অস্ত্র সজ্জিত অশ্বারোহীর দল রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতো।
আবু উসমান লাইছী কর্তৃক বর্ণিত, ইয়াযিদ, বনু উমাইয়্যাদের উদ্দেশ্যে বলেন, তোমরা গান-বাজনা বর্জন কর। গান মানুষের লজ্জা হ্রাস করে, মনের কামনা বাড়িয়ে দেয়, মনুষ্যত্বকে ধ্বংস করে ফেলে, সুরা পানের প্রবল ইচ্ছা জাগ্রত হয় এবং যিনার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। কারণ গান যিনার অগ্র স্তম্ভ। পারপক্ষে নারীর কণ্ঠে গান শ্রবণ থেকে বিরত থাক。
ইবনে আব্দুল হাকিম বলেন, আমি ইমাম শাফী (রা.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, খলীফা হওয়ার পর ইয়াযিদ কাদিরীয়া বিশ্বাসের প্রতি মানুষদের আহ্বান করেন。
তিনি বেশি দিন খিলাফত পরিচালনা করেননি। খিলাফত লাভের বর্ষেই জিলহজ মাসের সাত তারিখে তিনি ইন্তেকাল করেন। তিনি ছয় মাস খিলাফত পরিচালনা করেন। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৩৫ অথবা ৪৬ বছর। কথিত আছে যে, তিনি প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে পরলোকগমন করেন।
📄 ইবরাহীম বিন ওলীদ বিন আব্দুল মালিক
ইবরাহীম বিন ওলীদ বিন আব্দুল মালিক আবু ইসহাক স্বীয় ভ্রাতা ইয়াযিদের মৃত্যুর পর খিলাফতের তখতে আরোহণ করেন। তিনি উত্তরাধিকার মনোনীত হওয়ার ক্ষেত্রে মতভেদ রয়েছে。
বুরদা বিন সিনান বলেন, মৃত্যুর প্রাক্কালে আমি ইয়াযিদের নিকট গেলাম। কিছুক্ষণ পর প্রখ্যাত আলেম কাতান এসে ইয়াযিদকে বললেন, আপনার প্রাসাদ তোরণে অনেক লোক দন্ডায়মান আমি তাদের দূত হিসেবে আপনার নিকট এসেছি। আমি আল্লাহর ওয়াস্তে আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই যে, আপনি স্বীয় ভ্রাতা ইবরাহীমকে কেন উত্তরাধিকার মনোনীত করছেন না? এ কথা শুনে ইয়াযিদ রাগান্বিত হয়ে বললেন, আমি ইবরাহীমকে উত্তরাধিকার মনোনীত করবো? হে আবুল উলামা! আপনিই বলুন আমি কাকে উত্তরাধিকার মনোনীত করতে পারি? আমি এ বিষয়ে কাউকে ইশারাও করবো না। পরবর্তীতে কাতান বলেন, অতঃপর খলীফা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লেন। আমি খলীফার ইন্তেকাল হয়েছে ভেবে তার নিকট বসে পড়লাম এবং তার বক্তব্যের বিষয়বস্তু লিপিবদ্ধ করে এর উপর সাক্ষ্যপ্রদান সাপেক্ষে লোকদের বাইআত নিলাম। বর্ণনাকারী (বুরদা বিন সিনান) বলেন, আল্লাহর কসম, খলীফা ইয়াযিদ কাউকে উত্তরাধিকার মনোনীত করেননি。
ইবরাহীম সত্তর দিন খিলাফতের তখতে আসীন ছিলেন, অতঃপর মারওয়ান বিন মুহাম্মদের আক্রমণের ফলে ইবরাহীম পলায়ন করেন এবং মারওয়ান বিন মুহাম্মাদ লোকদের নিকট থেকে বাইআত গ্রহণ করেন। কিছুদিন পর ইবরাহীম ফিরে এসে তার বাইআত প্রত্যাহার করে রাষ্ট্রের সকল দায়িত্ব মারওয়ান বিন মুহাম্মাদের উপর অর্পণ করত তিনি নিজেও তার বাইআত গ্রহণ করেন।
ইবরাহীম এ ঘটনার পর ১৩২ হিজরী পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। উমাইয়্যা বংশের পতনের সময় সিফফাহ-এর গোলযোগে তাকে হত্যা করা হয়। তারীখে ইবনে আসাকির গ্রন্থে রয়েছে, ইবরাহীম যহরীর নিকট থেকে হাদীস শ্রবণ করেছেন, তার চাচা হিশামের কাছে তা বর্ণনা করেছেন এবং পুত্র ইয়াকুব তার নিকট থেকে রেওয়ায়েত করেছেন। জনৈক দাসী তার জননী। তিনি ১২৭ হিজরীর সফর মাসের ২৪ তারিখ সোমবারে বাইআত প্রত্যাহার করেন。
মাদায়েনী বলেন, আশ্চর্যের বিষয় হলো অনেকেই উত্তরাধিকারের মনোনয়ন নিয়ে খলীফা ভেবে ইবরাহীমকে সালাম দিতেন। অনেকই আবার উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত আমীর ভেবে তাকে শ্রদ্ধা করতো, আবার কেউ তার ব্যাপারে উভয় বিষয় প্রত্যাখ্যান করতো。
জনৈক কবি বলেন, আমরা প্রত্যেক জুমআয় ইবরাহীমের জন্য বাইআত করতাম। কিন্তু তিনি এমন এক নেতা যিনি ধ্বংস হয়েছেন। কথিত আছে, ইবরাহীমের আংটিতে খোদাই করে লিখা ছিল- يثق با الله
📄 মারওয়ানুল হিমার
মারওয়ানুল হিমার আবু আব্দুল মালিক বিন মুহাম্মাদ বিন মারওয়ান বিন হাকাম হলেন উমাইয়্যা বংশের সর্বশেষ খলীফা। তিনি জদ বিন দিরহামের সহচর হওয়ার কারণে তাকে জদী বলেও ডাকা হতো। তার হিমার বা গাধা উপাধির দু'টি কারণ রয়েছে। এক. তার ঘোড়ার পিঠে গদি লাগানোই থাকতো, দুশমনদের সাথে লড়াই করার জন্য তিনি তা কখনই খুলতেন না। যুদ্ধের জন্য তিনি অবিরাম যাত্রা করতেন। সমর গ্লানি তার সংকল্পকে স্নান করতে পারতো না। তিনি যুদ্ধের কষ্টগুলো ধৈর্যের সাথে মোকাবিলা করতেন। এ জন্য আরব বিশ্বে এ কথা প্রসিদ্ধ ছিল যে, অমুক ব্যক্তি লড়াই করার ক্ষেত্রে গাধার চেয়েও বেশি নীরবে আক্রমণ করেন- এ কারণে তিনি হিমার বা গাধা উপাধিতে ভূষিত হন। দুই. আরবের প্রথা ছিল প্রত্যেক শতাব্দীর শেষ বাদশাহকে হিমার বলা হতো। উমাইয়্যা বংশের খিলাফত এক শতাব্দীর নিকটবর্তী হওয়ার কারণে তাকে হিমার বলা হতো।
মারওয়ান বিন মুহাম্মাদ ৭২ হিজরীতে জারীরা অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা জারীরা শাসন করতেন। তার মা দাসী। তিনি খিলাফত লাভের পূর্বে বড় বড় শহর, নগর ও জনপদের শাসনকর্তা হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি ১০৫ হিজরীতে কাওনিয়া দখল করেন। তিনি শত্রু পক্ষকে আক্রমণ করার ক্ষেত্রে সাহসিকতা, কঠোরতা এবং সচেতনতা প্রদর্শনের ব্যাপারে প্রসিদ্ধ।
ওলীদ নিহত হওয়ার সময় তিনি আরমেনিয়া ছিলেন। সেখানে ওলীদের হত্যাকাণ্ডের সংবাদ পেয়ে তিনি তার প্রতি অনুগত মুসলমানদের বাইআত করান। অতঃপর ইয়াযিদের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে তিনি তার কোষাগার উন্মুক্ত করে দেন। এরপর ইবরাহীমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তাকে পরাজিত করত নিজের বাইআত করান এবং ১২৭ হিজরীর সফর মাসের মাঝামাঝিতে নিজের জন্য খিলাফতের তখত পাকাপোক্ত করেন।
খলীফা হওয়ার পর তিনি সর্বপ্রথম কবর থেকে ইয়াযিদের লাশ উত্তোলন করেন এবং ওলীদকে হত্যার অপরাধে তার লাশটি শূলে ঝুলিয়ে রাখেন। এরপর চতুর্দিক থেকে শত্রুদের আক্রমণ আসতে থাকে। ১৩২ হিজরী পর্যন্ত এ অবস্থাই বিদ্যমান ছিল। অতঃপর বনু আব্বাসীয়া গোত্র তার উপর আক্রমণ করে। আব্দুল্লাহ বিন আলী সাফফাহর চাচা আব্বাসীয়া বংশের সৈন্যদের নেতৃত্ব দেন। মৌসুলের নিকটবর্তী উভয় পক্ষের লড়াইয়ে আব্দুল্লাহ তাকে পরাজিত করেন। মারওয়ান সিরিয়ায় পালিয়ে গেলে আব্দুল্লাহ তার পশ্চাদ্ধাবন করেন। অবশেষে তিনি মিসরে পালিয়ে গেলে আব্দুল্লাহর ভাই সালেহ-এর সাথে বসীর অঞ্চলে লড়াই হয় এবং ১৩২ হিজরীর যিলহজ মাসে সালেহ তাকে হত্যা করেন। তার শাসনামলে সাদী আল-কাবীর, মালিক বিন দিনার আল-যাহাদ, আসেম বিন আবু নুজুদ আল-মকরী, ইয়াযিদী বিন আবু হাবীব, শায়বা বিন নাসাহ আল-মাকরী, মুহাম্মাদ বিন মিনকাদার, আবু জাফর, ইয়াযিদ বিন কা'কা আল-মাকরী, আল-মাদানী আবু আইয়ূব সাখতিয়ানী, আবুল যানাদ, হাম্মাম বিন মানবাহ, ওয়াসেল বিন আতা প্রমুখ ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন।
সূলী মুহাম্মাদ বিন সালেহ থেকে বর্ণনা করেন, মারওয়ানকে হত্যা করে তার ছিন্ন মস্তক আব্দুল্লাহ বিন আলীর নিকট পাঠানো হলে তিনি তা এক জায়গায় রাখতে বললেন। তার কর্তিত মাথা এক স্থানে রাখা হলে একটি বিড়াল এসে জিহ্বা টেনে বের করে তা-চাবাতে লাগল। এ দৃশ্য দেখে আব্দুল্লাহ বিন আলী বললেন, এ শিক্ষাই আমাদের জন্য যথেষ্ট।
📄 সাফফাহ: বনু আব্বাসের প্রথম খলীফা
সাফ্ফাহ: বনূ আব্বাসের প্রথম খলীফা আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন আলী বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব। উপাধি আবুল আব্বাস। সাফফাহ বনু আব্বাসের প্রথম বাদশাহ। তিনি ১০৮ হিজরী ভিন্ন মতে ১০৪ হিজরীতে বলকার উত্তপ্ত রণাঙ্গনে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই প্রতিপালিত হন। কুফায় তার বাইআত গ্রহণ অনুষ্ঠান হয়। জননীর নাম রায়েলাতুল হারেছা। তিনি স্বীয় ভ্রাতা ইবরাহীম বিন মুহাম্মাদের নিকট হাদীস শ্রবণ করেন। চাচা ঈসা বিন আলী তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বয়সে স্বীয় ভ্রাতা মানসুরের ছোট।
ইমাম আহমদ মুসনাদ গ্রন্থে হযরত আবু সাঈদ খুদরী থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, একটি বিশৃঙ্খল অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হলে আমার আহলে বাইতের মধ্য থেকে সাফফাহ নামক একজনের আবির্ভাব হবে। তিনি প্রচুর পরিমাণে সম্পদ লোকদের দান করবেন।
উবাইদুল্লাহ আয়শী বলেন, আমার বাবা বলেছেন, বনু আব্বাসের শাসনামল যখন এলো তখন আমার শিক্ষক বললেন, আল্লাহর কসম! বনু আব্বাসের পরিবার অপেক্ষা বড় কারী, ইবাদতকারী এবং দানশীল এ ভুবনে আর কেউ নেই।
ইবনে জারীর তাবারী বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বীয় চাচা হযরত আব্বাসকে "আপনার বংশে খিলাফত স্থানান্তর হবে" এ কথা বলার পর থেকে হযরত আব্বাসের বংশধররা খিলাফত প্রাপ্তির কামনা করতে থাকেন।
রাশিদীন বিন কুরায়েব কর্তৃক বর্ণিত, আবু হাশিম আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন হানীফ সিরিয়া যাবার পথে মুহাম্মাদ বিন আলী বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্বাসের সাথে সাক্ষাত হলে বলেন, হে চাচাতো ভাই! এ কথা কাউকে বলবেন না, আমার মন বলছে, অচিরেই খিলাফত আপনাদের হাতে এসে পড়বে। মুহাম্মাদ বললেন, আমারও তাই মনে হচ্ছে, এ কথা আর কাউকে জানাবেন না।
মাদায়েনী বলেন, আমি অনেক লোকের নিকট শুনেছি, ইমাম মুহাম্মাদ বিন আলী বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস তিন বার অর্থাৎ, প্রথম বার ইয়াযিদ বিন মুআবিয়ার মৃত্যুর সময় দ্বিতীয় বার এ শতাব্দীর শুরুর দিকে এবং তৃতীয় বার আফ্রিকায় বিশৃঙ্খলার সময় বলেছিলেন, আমার মনে হয় পূর্ব দিক থেকে দলে দলে লোকেরা আমাদের সাহায্য নিতে ছুটে আসবে এবং তাদের সাহায্যে বনূ আব্বাসের অশ্বগুলো পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত ছুটে যাবে। ইয়াযিদ বিন আবু মুসলিম আফ্রিকায় শহীদ হওয়ার পর বারবার জাতি বিদ্রোহ করলে হযরত ইমাম মুহাম্মাদ আবু মুসলিম খোরাসানীকে একটি পত্র দিয়ে মুহাম্মাদ (সা.)-এর পরিবারের প্রতি লোকদের আহ্বান করার জন্য পাঠান। লোকেরা প্রস্তুত ছিল। ইত্যবসরে ইমাম মুহাম্মাদ ইন্তেকাল করেন। লোকেরা তার পুত্র ইবরাহীমের নিকট বাইআত করে। এ সংবাদ পেয়ে মারওয়ান ইবরাহীমকে উঠিয়ে নিয়ে যায় এবং হত্যা করে। অতঃপর ইবরাহীমের ভাই সাফফার কাছে দলে দলে আমজনতা আসতে থাকে। অবশেষে ১৩২ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসের ৩ তারিখে কুফায় সাফফার নিকট লোকেরা বাইআত গ্রহণ করে। তিনি এসব লোকের জুমআর নামায পড়াতেন এবং খুতবার মধ্যে বলেন, সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ পাকের যিনি বিধান হিসেবে ইসলামকে মনোনীত করেছেন। অতঃপর তিনি কুরআন শরীফের আয়াত তিলাওয়াতের মাধ্যমে নিজ পরিবারের বিবরণ দানে বললেন, নবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর ইসলামের সকল কার্যাদি আসহাবে রসূল (সা.)-দের উপর বর্তায়। কিন্তু বনূ হরব এবং মারওয়ান তা কুক্ষিগত করে অত্যাচার আরম্ভ করে। তারা অনেক অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ে। আমাদের প্রাপ্য আমাদের দেয়া হলে আমরা সে যুগের হতদরিদ্রদের সেবা করতে পারতাম। যারা আমাদের বংশের সাথে কোন প্রকার সম্পর্ক রেখেছে আমাদের বংশের সাথে তাদেরকেও সরিয়ে দেয়া হয়েছে। সে সময় আমাদের এবং আহলে বাইতের কোন প্রকার ক্ষমতাই ছিল না। হে কুফাবাসী! আপনারা আমার ভালোবাসার প্রাসাদ এবং বন্ধুত্বের মারকায। আপনারা কখনই আমার ভালোবাসা থেকে দূরে সরে যাবেন না। অত্যাচারীর নির্মম অত্যাচারও আমাদের পৃথক করে রাখতে পারবে না।
ঈসা বিন আলী (বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস হাশেমী, হিজাযী, বাগদাদী) হুমায়মা থেকে কুফা আসার সময় সাফফাহর সাথে চৌদ্দজন বীর সাহসী লোককে নিতে বলেন, সংবাদ পেয়ে মারওয়ান প্রতিরোধ করতে এলে তিনি নির্মমভাবে পরাজিত হন এবং তিনি সহ বনূ উমাইয়্যার অসংখ্য মানুষ ও অগনন সৈনিক নিহত হয়। এভাবে সাফফাহ গোটা পশ্চিমাঞ্চল পদানত করেন।
যাহাবী বলেন, সাফফাহর শাসনামলে ঐক্যের মধ্যে ফাটল ধরায় তাহেরা থেকে সুদান পর্যন্ত বিস্তৃত ভূখণ্ড, গোটা স্পেন এবং কতিপয় শহর বেদখল হয়ে যায়। অতঃপর সেগুলো আর হাতে আসেনি। সাফফাহ ১৩৬ হিজরীর যিলহজ মাসে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। তিনি ভ্রাতা আবু জাফরকে খিলাফতের উত্তরাধিকার মনোনীত করে যান। তিনি ১৩৪ হিজরীতে খিলাফতের রাজধানী কুফা থেকে আনবারে স্থানান্তর করেন।
সূলী বলেন, সাফফাহ বিভিন্ন সময় এ কথাগুলো বলেছেন, কুদরত বাড়লে প্রবৃত্তি হ্রাস পায়। পরহেযগারী কমে গেলে সত্য মান হয়। অসভ্য সেই ব্যক্তি যে কৃপণতা গ্রহণ এবং ধৈর্যকে অসম্মান জ্ঞান করে। ধৈর্য ও নম্রতা ক্ষতির কারণ হলে ক্ষমা করে দিবে। ধৈর্য এক মহৎ গুণ। শরীয়তে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত বাদশাহ কোন প্রকার বিশ্রাম নিবে না, চিন্তাভাবনা করে অবিশ্রান্ত কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
সূলী বলেন, সাফফাহ অত্যন্ত দানশীল ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ওয়াদা করলে তা পূরণ না করা পর্যন্ত স্থানচ্যুত হতেন না। একবার আব্দুল্লাহ বিন হাসান তাকে বললেন, আমি কোন দিন এক লাখ দেরহাম দেখিনি। সঙ্গে সঙ্গে সাফফাহ এক লাখ দেরহাম নিয়ে এসে তার বাড়িতে পৌছে দেবার নির্দেশ দেন। তিনি অনেক কবিতা রচনা করেন। তার আংটিতে খোদাই করে লিখা ছিল- الله ثقة عبد الله به يؤ من
সাঈদ বিন মুসলিম বাহালী বলেন, একদা তিনি বনু হাশিমসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের মজলিসে বসেছিলেন। তার হাতে ছিল পবিত্র কুরআন শরীফ। ইত্যবসরে আব্দুল্লাহ বিন হাসান এসে বললেন, আল্লাহ তা'আলা কুরআন শরীফে আমাদের যে প্রাপ্যের কথা বলেছেন তা আমদের বুঝিয়ে দিন। সাফফাহ বললেন, তোমার পূর্বপুরুষ হযরত আলী (রা.) আমার চেয়ে অনেক উত্তম ও ন্যায়পরায়ণ খলীফা ছিলেন। আর তোমার পিতামহ হযরত হাসান এবং হযরত হোসেন তোমার চেয়ে অনেক উত্তম ছিলেন। অতএব আমার উপর কর্তব্য হযরত আলী (রা.) স্বীয় সন্তানদের যতটুকু দিয়েছেন আমিও তোমাকে ততটুকু দিব- এটাই ইনসাফ। এর অতিরিক্ত প্রাপ্তির যোগ্য তুমি নও। এ কথা শুনে তিনি নিরুত্তর রইলেন।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, বনু আব্বাসের শাসনামলে প্রশাসনিক দফতরগুলো থেকে আরবদের নাম বাদ পড়ে এবং তদস্থলে তুর্কীরা আসে। আস্তে আস্তে সবই তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং পরবর্তীতে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। এ সাম্রাজ্য বহু ভাগে বিভক্ত হয় এবং তারা পৃথক পৃথক গভর্নরের মাধ্যমে অত্যাচারের সাথে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্র পরিচালনা করে।
কথিত আছে, তিনি রক্ত ঝরিয়ে সকল গভর্নরের আনুগত্য অর্জন করেন। তবে তার বদান্যতা ছিল অপার। তার খিলাফতকালে যায়েদ বিন আসলাম, আব্দুল্লাহ বিন আবু বকর বিন হাজাম, মদীনা শরীফের বিচারপতি রাবীআ, আব্দুল মালিক বিন উমায়ের, ইয়াহইয়া বিন আবু ইসহাক হাযরামী, সুপ্রসিদ্ধ লেখক আব্দুল হামিদ (তিনি মারওয়ানের সাথে বুসির নামক স্থানে নিহত হন), মানসুর বিন মুতামার, হাম্মাম বিন মানবাহ প্রমুখ ওলামা ইন্তেকাল করেন।