📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 ওলীদ বিন ইয়াযিদ বিন আব্দুল মালিক

📄 ওলীদ বিন ইয়াযিদ বিন আব্দুল মালিক


ওলীদ বিন ইয়াযিদ বিন আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান বিন হাকাম আবুল আব্বাস ৯০ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন ফাসিক। ইয়াযিদ বিন আব্দুল মালিকের মৃত্যুর সময় অল্পবয়স্ক হওয়ায় হিশাম খলীফা মনোনীত হন। তবে হিশামের পর তাকে উত্তরাধিকারী নির্বাচিত করায় হিশামের ইন্তেকালের পর ১২৫ হিজরীর রবিউল আখের মাসে তিনি খিলাফতের তখতে আসীন হন。

ওলীদ বিন ইয়াযিদ অসৎ, পাপাসক্ত এবং মদ্যপ ছিলেন। পবিত্র কাবা গৃহের ছাদে বসে মদ পানের মানসে হজ্ব করার ইচ্ছা করেন। পাপাচারের জন্য জনতা তাকে অবরুদ্ধ করে এবং তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ১২৬ হিজরীর জমাদিউল আখের মাসে তাকে হত্যা করা হয়。

তাকে অবরোধের সময় তিনি জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, আমি কি তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করিনি? আমি তো তোমাদের উপর কঠোরতা করিনি। আমি কি দরিদ্রদের কল্যাণ করিনি? তবে কেন আমার প্রতি এ অত্যাচার? জনতা জবাব দিল, আপনি সবই করেছেন। কিন্তু আপনাকে হত্যা করার কারণ হলো আপনি মদ্যপায়ী এবং আল্লাহ্ তা'আলা যা হারাম করেছেন আপনি তা হালাল বলে অনুমোদন দিয়েছেন。

তাকে হত্যা করার পর তার ছিন্ন মস্তক ইয়াযিদ বিন ওলীদ বিন আব্দুল মালিকের নিকট পাঠিয়ে দেয়া হয়। ইয়াযিদ বিন ওলীদ বিন আব্দুল মালিক তার কর্তিত মাথা বর্শায় বিদ্ধ করে ঝুলিয়ে রাখেন। তা দেখে ওলীদ বিন ইয়াযিদের ভাই সুলায়মান বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এ লোকটি অত্যন্ত বেশরম, মদখোর এবং ব্যভিচারী। সে আমার সাথে সমকামিতায় লিপ্ত হতে চাইত। মাআফী জারীরী বলেন, আমি ওলীদের কিছু জীবন বৃত্তান্ত এবং তার কবিতা সংগ্রহ করেছি- যা অবিশ্বাস, পাপাচার এবং ব্যভিচারে ভরা。

যাহাবী বলেন, ওলীদের অবিশ্বাস এবং ধর্মচ্যুতির বিষয়টি বিশুদ্ধ বলে প্রমাণিত হয়নি। তবে তিনি মদ পান করতেন এবং সমকামিতায় প্রসিদ্ধ ছিলেন। এজন্য জনতা বিদ্রোহ করে এবং তাকে হত্যা করে, একদা মাহদীর সামনে জনৈক ব্যক্তি ওলীদকে ধর্মচ্যুত হিসেবে অভিহিত করলে মাহদী ধমক দিয়ে বললেন, আল্লাহ তা'আলা কোন ধর্মচ্যুত ব্যক্তিকে কোনোদিন খিলাফতের মর্যাদা দান করেন না。

মারওয়ান বিন আবু হাফয বলেন, ওলীদ ছিলেন উঁচু মাপের একজন কবি। আবুল যানাদ বলেন, যহরী সবসময় হিশামের নিকট ওলীদের দোষ-ত্রুটিগুলো তুলে ধরে ওলীদকে উত্তরাধিকার মনোনীত না করার পরামর্শ দিতেন। কিন্তু হিশাম তার উপদেশ গ্রহণ করেননি। যহরী ওলীদের খিলাফত প্রাপ্তির পূর্বেই ইন্তেকাল করেন, অন্যথায় ওলীদ খলিফা হওয়ার পর তাকে অত্যাচার করতেন。

যহাক বিন উসমান বলেন, হিশাম ওলীদের উত্তরাধিকারের মনোনয়ন প্রত্যাহার করে স্বীয় পুত্রকে উত্তরাধিকার মনোনীত করতে চাইলে ওলীদ এ কবিতাটি লিখে হিশামের নিকট পাঠালেন, "আপনি আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করেননি, যদি তা করেন তবে তার প্রতিদান পাবেন। আমি গভীরভাবে লক্ষ্য করছি আপনি আমার অভিভাবকত্বের অধিকার ছিনিয়ে নিতে চান। আপনি সচেতন হলে এমনটা করতেন না। আপনি ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে এ কাজ করছেন। আফসোস, আপনি তাদেরই একজন যারা আমার দোষ-ত্রুটির অনুসন্ধান করে ইতোপূর্বে ইন্তেকাল করেছেন।"

হাম্মাদ এক বর্ণনায় বলেন, একদিন ওলীদের দরবারে দু'জন জ্যোতির্বিজ্ঞানী এসে বলল, আমরা নক্ষত্রসূচী দেখে জেনেছি, আপনি আরো সাত বছর জীবিত থাকবেন। হাম্মাদ বলেন, আমি মনে মনে বললাম, ওলীদকে ধোঁকা দিতে পারলে ভালোই হবে। আমি বললাম, এরা দু'জন অসত্য প্রলাপ বকছে। আমি জ্যোতির বিদ্যায় তাদের চেয়ে অধিক বিজ্ঞ। আমি নক্ষত্রসূচী দেখে জেনেছি, আপনি আরো চল্লিশ বছর বেঁচে থাকবেন। এ কথা শুনে ওলীদ মাথা নীচু করলেন এবং বললেন, তাদের কথায় আমি বিমর্ষ হয়নি এবং তোমার বক্তব্যেও উদ্বেলিত হইনি। আল্লাহর কসম, আমি জীবন প্রিয় মানুষের মত সম্পদ সঞ্চয় করতে চাই। আর ব্যয় করতে চাই অন্তিম জীবনে উপনীত হয়ে যারা ব্যয় করে তাদের মত।"

মুসনাদে আহমদের এক হাদীসে রয়েছে, এ উম্মতের মধ্যে ওলীদ নামে এক জনের আবির্ভাব হবে, যিনি এ উম্মতের উপর ফিরাউনের চেয়েও অধিক কঠোরতা অবলম্বন করবেন。

মাসালিক গ্রন্থে ইবনে ফাযল্লাহ বলেন, ওলীদ বিন ইয়াযিদ হলেন, অত্যাচারী, ঔদ্ধত্য, পথভ্রষ্ট, মিথ্যা শপথকারী, তৎকালীন যুগের ফিরাউন, যুগশ্রেষ্ঠ মন্দ মানব, কিয়ামতের দিনে স্বজাতিকে জাহান্নামের পথ প্রদর্শনকারী, কুরআন শরীফ নিক্ষেপকারী, পাপী এবং দুশ্চরিত্র。

সাঈদ বিন সুলায়েম বলেন, ইবনে মুআবিয়া ওলীদকে বললেন, মুহাম্মাদ (সা.)-এর পরিবার ছাড়া কুরাইশদের এবং সম্মানিত ব্যক্তিদের ছাড়া মারওয়ান পরিবারকে মর্যাদা দিতে চেয়েছেন। এ কথা শুনে ওলীদ বললেন, তুমি মুহাম্মাদ (সা.)-এর আত্মীয়দের আমার উপর মর্যাদা দিতে চাও? তিনি বললেন, আমি এটাকেই সঠিক জ্ঞান করি। অতঃপর তিনি এ কবিতাটি আবৃত্তি করেন, "আমি দুশমনদের সামনেও সত্য কথা বলতে চাই। আমি ওলীদের অভিজাত সেনাদের দেখেছি যারা রাষ্ট্রের কাজে অত্যন্ত অলস।"

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 ইয়াযিদ বিন ওলীদ

📄 ইয়াযিদ বিন ওলীদ


ইয়াযিদ আবু খালিদ বিন ওলীদ বিন আব্দুল মালিক সৈন্যদের ভাতা হ্রাস করায় তাকে নাকেস (অঙ্গহীন বা অসম্পূর্ণ) উপাধিতে ভূষিত করা হয়। চাচাত ভাই ওলীদকে হত্যা করে তিনি খিলাফতের তখত অধিকার করেন। ইয়াযিদের মা হলেন ফরান্দ বিনতে ফিরোজ, ফিরোজের মা হলেন শিরাওয়া বিন কিসরার মেয়ে, শিরাওয়ার মা হলেন খাকান বাদশাহর মেয়ে, আর ফিরোজের নানী হলেন কায়সারের কন্যা। এ জন্য তিনি গর্ব করে এ কবিতাটি আবৃত্তি করতেন, "আমি কিসরার দৌহিত্র, মারওয়ানের পুত্র এবং আমার নানা কায়সার ও খাকান।"

ছা’লাবী বলেন, ইয়াযিদ দাদা এবং নানা উভয় দিক থেকে শাহজাদা ছিলেন। ওলীদের হত্যাকাণ্ডের পর তিনি এক অভিভাষণে বলেন, "আল্লাহর কসম, আমি গর্বিত ও উদ্ধত হয়ে আপনাদের সামনে আসিনি। দুনিয়ার মোহ এবং সাম্রাজ্যের লোভ আমার নেই। আল্লাহ তা'আলা আমার প্রতি করুণা না করলে আমি গুনাহগার হবো। আমি আপনাদের আল্লাহ তা'আলার কিতাব এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নতের প্রতি আহ্বান করছি। যখন হালালকে হারামকারীদের এবং বিদআতের রক্ষকদের আবির্ভাব হয়েছে তখন হিদায়েতের নিশান পুরাতন হয়ে পড়েছে এবং আল্লাহভীরুদের দীপ্তি নির্বাপিত হয়েছে। সমাজের এ চিত্র দর্শনে আমি আজ ভীতসন্ত্রস্ত। অন্তরের কঠোরতা এবং চরিত্রের তিমিরাচ্ছন্নতা দূর করুন। আমি আপনাদের সঠিক ও সোজা পথে ফিরিয়ে নিতে চাই। আমি এ বিষয়ে ইসতেখারা করেছি। আমি আমার আত্মীয় এবং বন্ধুদের বলবো, আল্লাহ তা'আলা পৃথিবী এবং তাঁর বান্দাদের ভ্রষ্টাচার থেকে নিরাপদ রাখবেন। আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত আর কোন শক্তি নেই। জনতা! আমি আপনাদের একটি ইট অথবা একটি পাথরও অর্থহীন হতে দিব না- এ মানসিকতা নিয়েই আমি আপনাদের নেতা হয়েছি। সংগৃহীত রাজস্ব সংশ্লিষ্ট শহর-নগরেই ব্যয় করবো, যাতে আপনারা সমানভাবে উপকৃত হতে পারেন। যদি এ শর্তে আপনারা আমার বাইআত গ্রহণ করেন তবে আমি আপনাদের এবং আপনাদের সেবা করা আমার জন্য ফরয, আর এ শর্ত থেকে সরে দাঁড়ালে আমার কোন বাইআত নেই। এ দৃষ্টিকোণ থেকে আমার চেয়ে কোন যোগ্য ও সাহসী ব্যক্তি থাকলে আপনারা তার বাইআত গ্রহণ করুন। আর আমি আপনাদের আগে তার কাছে বাইআত এবং তার আনুগত্য করবো। আমি আল্লাহর নিকট আমার এবং আপনাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি।"

উসমান বিন আবুল আতিকা বলেন, ইয়াযিদ হলেন প্রথম খলীফা যিনি অস্ত্র সজ্জিত হয়ে ঈদগাহে যান। তার খিলাফতকালে দুর্গের দরজা থেকে ঈদগাহ পর্যন্ত অস্ত্র সজ্জিত অশ্বারোহীর দল রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতো।

আবু উসমান লাইছী কর্তৃক বর্ণিত, ইয়াযিদ, বনু উমাইয়্যাদের উদ্দেশ্যে বলেন, তোমরা গান-বাজনা বর্জন কর। গান মানুষের লজ্জা হ্রাস করে, মনের কামনা বাড়িয়ে দেয়, মনুষ্যত্বকে ধ্বংস করে ফেলে, সুরা পানের প্রবল ইচ্ছা জাগ্রত হয় এবং যিনার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। কারণ গান যিনার অগ্র স্তম্ভ। পারপক্ষে নারীর কণ্ঠে গান শ্রবণ থেকে বিরত থাক。

ইবনে আব্দুল হাকিম বলেন, আমি ইমাম শাফী (রা.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, খলীফা হওয়ার পর ইয়াযিদ কাদিরীয়া বিশ্বাসের প্রতি মানুষদের আহ্বান করেন。

তিনি বেশি দিন খিলাফত পরিচালনা করেননি। খিলাফত লাভের বর্ষেই জিলহজ মাসের সাত তারিখে তিনি ইন্তেকাল করেন। তিনি ছয় মাস খিলাফত পরিচালনা করেন। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৩৫ অথবা ৪৬ বছর। কথিত আছে যে, তিনি প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে পরলোকগমন করেন।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 ইবরাহীম বিন ওলীদ বিন আব্দুল মালিক

📄 ইবরাহীম বিন ওলীদ বিন আব্দুল মালিক


ইবরাহীম বিন ওলীদ বিন আব্দুল মালিক আবু ইসহাক স্বীয় ভ্রাতা ইয়াযিদের মৃত্যুর পর খিলাফতের তখতে আরোহণ করেন। তিনি উত্তরাধিকার মনোনীত হওয়ার ক্ষেত্রে মতভেদ রয়েছে。

বুরদা বিন সিনান বলেন, মৃত্যুর প্রাক্কালে আমি ইয়াযিদের নিকট গেলাম। কিছুক্ষণ পর প্রখ্যাত আলেম কাতান এসে ইয়াযিদকে বললেন, আপনার প্রাসাদ তোরণে অনেক লোক দন্ডায়মান আমি তাদের দূত হিসেবে আপনার নিকট এসেছি। আমি আল্লাহর ওয়াস্তে আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই যে, আপনি স্বীয় ভ্রাতা ইবরাহীমকে কেন উত্তরাধিকার মনোনীত করছেন না? এ কথা শুনে ইয়াযিদ রাগান্বিত হয়ে বললেন, আমি ইবরাহীমকে উত্তরাধিকার মনোনীত করবো? হে আবুল উলামা! আপনিই বলুন আমি কাকে উত্তরাধিকার মনোনীত করতে পারি? আমি এ বিষয়ে কাউকে ইশারাও করবো না। পরবর্তীতে কাতান বলেন, অতঃপর খলীফা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লেন। আমি খলীফার ইন্তেকাল হয়েছে ভেবে তার নিকট বসে পড়লাম এবং তার বক্তব্যের বিষয়বস্তু লিপিবদ্ধ করে এর উপর সাক্ষ্যপ্রদান সাপেক্ষে লোকদের বাইআত নিলাম। বর্ণনাকারী (বুরদা বিন সিনান) বলেন, আল্লাহর কসম, খলীফা ইয়াযিদ কাউকে উত্তরাধিকার মনোনীত করেননি。

ইবরাহীম সত্তর দিন খিলাফতের তখতে আসীন ছিলেন, অতঃপর মারওয়ান বিন মুহাম্মদের আক্রমণের ফলে ইবরাহীম পলায়ন করেন এবং মারওয়ান বিন মুহাম্মাদ লোকদের নিকট থেকে বাইআত গ্রহণ করেন। কিছুদিন পর ইবরাহীম ফিরে এসে তার বাইআত প্রত্যাহার করে রাষ্ট্রের সকল দায়িত্ব মারওয়ান বিন মুহাম্মাদের উপর অর্পণ করত তিনি নিজেও তার বাইআত গ্রহণ করেন।

ইবরাহীম এ ঘটনার পর ১৩২ হিজরী পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। উমাইয়্যা বংশের পতনের সময় সিফফাহ-এর গোলযোগে তাকে হত্যা করা হয়। তারীখে ইবনে আসাকির গ্রন্থে রয়েছে, ইবরাহীম যহরীর নিকট থেকে হাদীস শ্রবণ করেছেন, তার চাচা হিশামের কাছে তা বর্ণনা করেছেন এবং পুত্র ইয়াকুব তার নিকট থেকে রেওয়ায়েত করেছেন। জনৈক দাসী তার জননী। তিনি ১২৭ হিজরীর সফর মাসের ২৪ তারিখ সোমবারে বাইআত প্রত্যাহার করেন。

মাদায়েনী বলেন, আশ্চর্যের বিষয় হলো অনেকেই উত্তরাধিকারের মনোনয়ন নিয়ে খলীফা ভেবে ইবরাহীমকে সালাম দিতেন। অনেকই আবার উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত আমীর ভেবে তাকে শ্রদ্ধা করতো, আবার কেউ তার ব্যাপারে উভয় বিষয় প্রত্যাখ্যান করতো。

জনৈক কবি বলেন, আমরা প্রত্যেক জুমআয় ইবরাহীমের জন্য বাইআত করতাম। কিন্তু তিনি এমন এক নেতা যিনি ধ্বংস হয়েছেন। কথিত আছে, ইবরাহীমের আংটিতে খোদাই করে লিখা ছিল- يثق با الله

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 মারওয়ানুল হিমার

📄 মারওয়ানুল হিমার


মারওয়ানুল হিমার আবু আব্দুল মালিক বিন মুহাম্মাদ বিন মারওয়ান বিন হাকাম হলেন উমাইয়্যা বংশের সর্বশেষ খলীফা। তিনি জদ বিন দিরহামের সহচর হওয়ার কারণে তাকে জদী বলেও ডাকা হতো। তার হিমার বা গাধা উপাধির দু'টি কারণ রয়েছে। এক. তার ঘোড়ার পিঠে গদি লাগানোই থাকতো, দুশমনদের সাথে লড়াই করার জন্য তিনি তা কখনই খুলতেন না। যুদ্ধের জন্য তিনি অবিরাম যাত্রা করতেন। সমর গ্লানি তার সংকল্পকে স্নান করতে পারতো না। তিনি যুদ্ধের কষ্টগুলো ধৈর্যের সাথে মোকাবিলা করতেন। এ জন্য আরব বিশ্বে এ কথা প্রসিদ্ধ ছিল যে, অমুক ব্যক্তি লড়াই করার ক্ষেত্রে গাধার চেয়েও বেশি নীরবে আক্রমণ করেন- এ কারণে তিনি হিমার বা গাধা উপাধিতে ভূষিত হন। দুই. আরবের প্রথা ছিল প্রত্যেক শতাব্দীর শেষ বাদশাহকে হিমার বলা হতো। উমাইয়্যা বংশের খিলাফত এক শতাব্দীর নিকটবর্তী হওয়ার কারণে তাকে হিমার বলা হতো।

মারওয়ান বিন মুহাম্মাদ ৭২ হিজরীতে জারীরা অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা জারীরা শাসন করতেন। তার মা দাসী। তিনি খিলাফত লাভের পূর্বে বড় বড় শহর, নগর ও জনপদের শাসনকর্তা হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি ১০৫ হিজরীতে কাওনিয়া দখল করেন। তিনি শত্রু পক্ষকে আক্রমণ করার ক্ষেত্রে সাহসিকতা, কঠোরতা এবং সচেতনতা প্রদর্শনের ব্যাপারে প্রসিদ্ধ।

ওলীদ নিহত হওয়ার সময় তিনি আরমেনিয়া ছিলেন। সেখানে ওলীদের হত্যাকাণ্ডের সংবাদ পেয়ে তিনি তার প্রতি অনুগত মুসলমানদের বাইআত করান। অতঃপর ইয়াযিদের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে তিনি তার কোষাগার উন্মুক্ত করে দেন। এরপর ইবরাহীমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তাকে পরাজিত করত নিজের বাইআত করান এবং ১২৭ হিজরীর সফর মাসের মাঝামাঝিতে নিজের জন্য খিলাফতের তখত পাকাপোক্ত করেন।

খলীফা হওয়ার পর তিনি সর্বপ্রথম কবর থেকে ইয়াযিদের লাশ উত্তোলন করেন এবং ওলীদকে হত্যার অপরাধে তার লাশটি শূলে ঝুলিয়ে রাখেন। এরপর চতুর্দিক থেকে শত্রুদের আক্রমণ আসতে থাকে। ১৩২ হিজরী পর্যন্ত এ অবস্থাই বিদ্যমান ছিল। অতঃপর বনু আব্বাসীয়া গোত্র তার উপর আক্রমণ করে। আব্দুল্লাহ বিন আলী সাফফাহর চাচা আব্বাসীয়া বংশের সৈন্যদের নেতৃত্ব দেন। মৌসুলের নিকটবর্তী উভয় পক্ষের লড়াইয়ে আব্দুল্লাহ তাকে পরাজিত করেন। মারওয়ান সিরিয়ায় পালিয়ে গেলে আব্দুল্লাহ তার পশ্চাদ্ধাবন করেন। অবশেষে তিনি মিসরে পালিয়ে গেলে আব্দুল্লাহর ভাই সালেহ-এর সাথে বসীর অঞ্চলে লড়াই হয় এবং ১৩২ হিজরীর যিলহজ মাসে সালেহ তাকে হত্যা করেন। তার শাসনামলে সাদী আল-কাবীর, মালিক বিন দিনার আল-যাহাদ, আসেম বিন আবু নুজুদ আল-মকরী, ইয়াযিদী বিন আবু হাবীব, শায়বা বিন নাসাহ আল-মাকরী, মুহাম্মাদ বিন মিনকাদার, আবু জাফর, ইয়াযিদ বিন কা'কা আল-মাকরী, আল-মাদানী আবু আইয়ূব সাখতিয়ানী, আবুল যানাদ, হাম্মাম বিন মানবাহ, ওয়াসেল বিন আতা প্রমুখ ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন।

সূলী মুহাম্মাদ বিন সালেহ থেকে বর্ণনা করেন, মারওয়ানকে হত্যা করে তার ছিন্ন মস্তক আব্দুল্লাহ বিন আলীর নিকট পাঠানো হলে তিনি তা এক জায়গায় রাখতে বললেন। তার কর্তিত মাথা এক স্থানে রাখা হলে একটি বিড়াল এসে জিহ্বা টেনে বের করে তা-চাবাতে লাগল। এ দৃশ্য দেখে আব্দুল্লাহ বিন আলী বললেন, এ শিক্ষাই আমাদের জন্য যথেষ্ট।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00