📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 সুলায়মান বিন আব্দুল মালিক

📄 সুলায়মান বিন আব্দুল মালিক


সুলায়মান বিন আব্দুল মালিক আবু আইয়ুবকে বনু উমাইয়‍্যাদের মধ্যে সর্বোত্তম বাদশাহ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তার পিতা ওয়ালিদের পর তাকে উত্তরাধিকার মনোনীত করেন। তিনি ৯৬ হিজরীর জমাদিউল আখের মাসে ভ্রাতার পর মসনদে আরোহণ করেন। তিনি পিতা আব্দুল মালিক এবং আব্দুর রহমান বিন হুরায়রাহ থেকে হাদীস রেওয়ায়েত করেন এবং তার ছেলে আব্দুল ওয়াহেদ এবং যহরী হাদীস রেওয়ায়েত করেন।

তিনি সুমিষ্টভাষী, বাগ্মী, ন্যায়পরায়ণ এবং জিহাদের প্রতি অনুরাগী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ৬০ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি অনেক পুণ্যময় কাজ করেছিলেন। উমর বিন আব্দুল আযীযের মতো মহান নেতা ছিলেন তার মন্ত্রী যিনি সর্বদা তাকে সৎ উপদেশ দিতেন এবং কল্যাণকর কাজের দিকে আহবান করতেন। তিনি হাজ্জাজ কর্তৃক প্রশাসনের নিয়োগপ্রাপ্ত সকল কর্মকর্তাকে একসঙ্গে চাকরিচ্যুত করেন এবং ইরাকের জেল খানায় আটক সকলকে মুক্তি দেন। বনু উমাইয়্যার খলীফাগণ সবসময় শেষ ওয়াক্তে (বিলম্বে) নামায আদায় করতেন, উমর বিন আব্দুল আযীযের পরামর্শে তিনি আউয়াল ওয়াক্তে নামায পড়তে শুরু করেন। ইবনে সিরীন (রহ.) বলেন, পরম করুণাময় আল্লাহ তা'আলার নিকট আমি আশাবাদী তিনি সুলায়মানের প্রতি করুণা বর্ষণ করুন। তিনি তার খিলাফতকালে দুটি চমৎকার কাজ করেছেন। এক. আউয়াল ওয়াক্তে নামায পড়ার প্রবর্তন এবং দুই. উমর বিন আব্দুল আযীযকে খলীফা মনোনীত করে যাওয়া।

সুলায়মান বিন আব্দুল মালিক নাচ-গান নিষিদ্ধ করেন। তার খোরাক ছিল বেশি। কোনো এক ভোজসভায় সত্তরটি আনার, ছয় মাসের একটি ছাগল, ছয়টি মোরগ এবং চার কেজি কিশমিশ একাই খেয়ে ফেলেন। ইয়াহইয়া গাসসানী বলেন, একদা তিনি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের তারুণ্যদীপ্ত অবয়ব দর্শনে বললেন, মুহাম্মাদ (সা.) নবী ছিলেন, আবু বকর (রা.) সিদ্দীক (সত্যবাদী) ছিলেন, উমর (রা.) ফারুক (পৃথককারী) ছিলেন, উসমান (রা.) লজ্জাশীল, মুআবিয়া (রা.) বীর, ইয়াযিদ ধৈর্যশীল, আব্দুল মালিক রাজ নীতিবিধ, ওয়ালীদ অত্যাচারী এবং আমি নওজোয়ান বাদশাহ। তার এ বক্তব্যের এক মাসের মধ্যেই ৯৯ হিজরীর সফর মাসের দশ তারিখ জুমাআর দিন তিনি ইন্তেকাল করেন।

তার যুগে যুরযান, হাদীদ দুর্গ, সরদা, শাকা, তবরিসতান এবং সুফালিয়া শহর বিজিত হয়। আর যে সব ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন তারা হলেন- কায়েস বিন আবু হাযিম, মাহমুদ বিন লাবীদ, হাসান বিন হোসাইন বিন আলী, ইবনে আব্বাসের মুক্তদাস কারীব, আব্দুর রহমান বিন আসওয়াদ, নাখআ প্রমুখ।

আব্দুর রহমান বিন হাসসান কিনানী বলেন, সুলায়মান বিন আব্দুল মালিক যুদ্ধের ময়দানে ওয়াবেক নামক জনপদে পরলোক গমন করেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তিনি রাজা বিন হায়াকে জিজ্ঞেস করেন, আমার পর খিলাফতের তখতে কে আসীন হবেন? আমি কি আমার ছেলেকে উত্তরাধিকার মনোনীত করব? রাজা বললেন, আপনার ছেলে এখানে নেই। সুলায়মান বললেন, অন্য ছেলেকে করতে পারি? রাজা বললেন, তিনি বয়সে ছোট। সুলায়মান পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, তবে আপনার মতে সর্বোত্তম কে? রাজা বললেন, উমর বিন আব্দুল আযীযের চেয়ে সর্বোত্তম আর কেউ নেই। আপনি তাকেই পরবর্তী খলীফা মনোনীত করতে পারেন। সুলায়মান বললেন, আমার ভাই উমর বিন আব্দুল আযীযের খিলাফত মেনে নেবে না বলেই আমার ধারণা। রাজা বললেন, এর পদ্ধতি হল আপনি মোহর অঙ্কিত ওসীয়তনামা লিখে দিন যে, উমর বিন আব্দুল আযীযের পর ইয়াযিদ বিন আব্দুল মালিক উত্তরাধিকার মনোনীত হবেন। অতঃপর দেশবাসীকে ডেকে বলুন, এ অসীয়ত নামায় যার নাম লিপিবদ্ধ রয়েছে তার নামে বাইআত করুন। সুলায়মান এ অভিমতকে পছন্দ করে কাগজ, কলম ও কালি চেয়ে এক ওসীয়ত নামা প্রস্তুত করে রাজাকে তা দিয়ে বললেন, এ অসীয়ত নামায় যার নাম উল্লেখ রয়েছে তার ব্যাপারে এক্ষুণি বাইরে গিয়ে লোকদের নিকট বাইআত গ্রহণ করুন। রাজা বাইরে এসে লোকদের উদ্দেশ্যে বললেন, আমিরুল মুমিনীনের নির্দেশে আমি এর মধ্যে উল্লিখিত ব্যক্তির নামে আপনাদের নিকট বাইআত নিচ্ছি। লোকেরা বলল, এর মধ্যে কার নাম লিপিবদ্ধ রয়েছে? রাজা বললেন, এতে মোহর লাগানো রয়েছে। খলীফার মৃত্যুর পর তার নাম জানা যাবে। লোকেরা বলল, আমরা এভাবে বাইআত করব না। রাজা বিষয়টি খলীফার কানে দিলে খলীফা বললেন, জল্লাদ এবং পুলিশদের সাথে নিয়ে জনতাকে একত্রিত করে বাইআত নিন। যারা প্রত্যাখ্যান করবে তাদের গর্দান উড়িয়ে দিবেন। অবশেষে এভাবেই বাইআতের কাজ সম্পন্ন হয়।

রাজা বলেন, বাইআত গ্রহণের পর ফেরার পথে হটাৎ হিশামের সাথে আমার সাক্ষাত হয়। তিনি বললেন, রাজা! আমার ব্যাপারে আমিরুল মুমিনীনের সিদ্ধান্ত কি? যদি বঞ্চিত হই তবে নিজের জন্য ব্যবস্থা করবো। আমি বললাম, আমিরুল মুমিনীন বিষয়টি গোপন রেখেছেন, আমি কিভাবে বলবো। অতঃপর উমর বিন আব্দুল আযীযের সাথে দেখা হলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, রাজা! সুলায়মানের ক্ষেত্রে আমার সংশয় রয়েছে। আমার মন বলছে, তিনি যেন আমাকে খলীফা মনোনীত না করেন। আমার মধ্যে খিলাফতের দক্ষতা ও যোগ্যতা নেই। অতএব যদি আপনি এ ব্যাপারে অবগত থাকেন তাহলে বলুন আমি যে কোন পদ্ধতিতে চেষ্টার মাধ্যমে এ আপদ মাথা থেকে নামিয়ে দিব। আমি হিশামের মতো তাকেও একই জবাব দিলাম।

সুলায়মানের ইন্তেকালের পর অসীয়ত নামায় উমর বিন আব্দুল আযীযের নাম দেখে আব্দুল মালিকের সন্তানদের চেহারা বিবর্ণ ও ফ্যাকাশে হয়ে যায়। কিন্তু যখন তারা পরবর্তী খলীফা হিসেবে ইয়াযিদ বিন আব্দুল মালিকের নাম শুনলেন তখন তারা আস্বস্ত হন এবং উমর বিন আব্দুল আযীযের নিকট এসে খিলাফতের দায়িত্ব তার উপর অর্পণ করেন। আর উমর বিন আব্দুল আযীয় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে সেখানেই বসে পড়লেন। সে মুহূর্তে দাঁড়ানোর মতো কোনো শক্তি তার ছিল না। অবশেষে লোকেরা তার বাহু ধরে মিম্বরে উঠিয়ে দিলেন। তিনি সেখানেও অনেকক্ষণ নীরবে বসে রইলেন। রাজা বললেন, কেন আপনারা দাঁড়িয়ে আমিরুল মুমিনীনের বাইআত গ্রহণ করছেন না। অতঃপর তারা বাইআত করলেন এবং রাজা উমর বিন আব্দুল আযীয়ের হাত ধরে লোকদের প্রতি বাড়িয়ে দিলেন। এরপর তিনি দাঁড়িয়ে হামদ এবং সানার পর বললেন, আমি এ বিষয়ের মিমাংসাকারী নই: বরং বহনকারী। আমি কোনো বিষয়ের প্রবর্তক নই; বরং পূর্ববর্তীতের অনুগামী।

অন্যান্য জনপদের লোকেরাও যদি আপনাদের মতো আমার আনুগত্য মেনে নেয় তবেই আমি আপনাদের খলীফা হবো, অন্যথায় নয়। এ বলে তিনি মিম্বর থেকে অবতরণ করলে সামরিক আস্তাবল থেকে চমৎকার একটি ঘোড়া নিয়ে আসা হলো তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এটা কি? লোকেরা বলল, এটা খলীফার বাহন, রাজকীয় অশ্ব। তিনি বললেন, এটা আমার প্রয়োজন নেই। আমার ঘোড়াই যথেষ্ট। অবশেষে তার নিজস্ব ঘোড়া নিয়ে আসা হলো এবং এতে চড়ে তিনি বাড়ি ফিরলেন। অতঃপর তিনি কালির দোয়াত নিয়ে মুসলিম সাম্রাজ্যের সকল শাসনকর্তার নিকট স্বহস্তে একটি ফরমান লিখলেন। রাজা বলেন, আমার স্মরণ রয়েছে তিনি কোথাও নিজের দুর্বলতা ও অক্ষমতার কথা লিখেননি। তিনি যখন ফরমান লিখছিলেন তখন আমি দেখলাম তার কলমের অগ্রভাগ দিয়ে খিলাফতের শাসনকার্য পরিচালনা দক্ষতা ও বিজ্ঞাত প্রকাশ পাচ্ছে।

বর্ণিত রয়েছে, একবার মারওয়ান বিন আব্দুল মালিক এবং সুলায়মান বিন আব্দুল মালিকের মধ্যে খিলাফত নিয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে সুলায়মান তাকে গালি দিলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েন, কিন্তু উমর বিন আব্দুল আযীয তার মুখে হাত রেখে বললেন, তিনি ভালো মানুষ, খলীফা, আপনার বড় ভাই, আপনি চুপ করুন। মারওয়ান চুপ করলেন, তবে উমর বিন আব্দুল আযীযকে বললেন, আপনি আমাকে হত্যা করে ফেললেন, আমার শরীরে আগুন ধরে গেছে। সে রাতেই মারওয়ান ইন্তেকাল করেন।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 ইয়াযিদ বিন আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান

📄 ইয়াযিদ বিন আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান


ইয়াযিদ বিন আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান বিন হাকাম আবু খালিদ উমুয়ী দামেশকী ৭১ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। ভ্রাতা সুলায়মান বিন আব্দুল মালিকের ওসীয়ত অনুযায়ী উমর বিন আব্দুল আযীযের পর তিনি মসনদে আরোহণ করেন।

আব্দুর রহমান বিন যায়েদ বিন আসলাম বলেন, তিনি খলীফা হওয়ার পর উমর বিন আব্দুল আযীযের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলার ঘোষণা দেন। কিছুদিন এভাবে চলার পর চল্লিশ জন বৃদ্ধ লোক এসে সাক্ষ্য দিয়ে বলল, খলীফার যা ইচ্ছে করতে পারবেন। তাঁর প্রতি কোন শাস্তি নেই, তাকে কোন জবাবদিহিও করতে হবে না।

ইবনে মাজশুন বলেন, উমর বিন আব্দুল আযীযের মৃত্যুর সময় ইয়াযিদ বিন আব্দুল মালিক কসম করে বলেন, আল্লাহ তা'আলার প্রতি উমর বিন আব্দুল আযীযের যে মোখাপেক্ষিতা ছিল, আমার তার চেয়ে বেশি থাকবে। তিনি চল্লিশ দিন তাঁকে পূর্ণ অনুসরণ করেন, অতঃপর তাঁর পথ থেকে সরে দাঁড়ান।

১০২ হিজরীতে ইয়াযিদ বিন মোহলাব খিলাফত দখলের ষড়যন্ত্র করলে মাসলামা বিন আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান তাকে প্রতিহত ও পরাজিত করে কারবালার নিকটবর্তী আকীর অঞ্চলে হত্যা করেন।

ইয়াযিদ বিন আব্দুল মালিক ১০৫ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। তার খিলাফত কালে যেসব ওলামা মাশায়েখ মারা যান তাঁরা হলেন- যহাক বিন মাযাহিম, আদী বিন রতাত, আবুল মুতাওয়াক্কীল নাজী, আতা বিন ইয়াসার, মুজাহিদ, ইয়াহইয়া বিন ওতাব (কুফার বিখ্যাত শিক্ষক), খালিদ বিন মাআদান, শাআবী (ইরাকের প্রখ্যাত আলেম), আব্দুর রহমান বিন হাসান বিন সাবিত, আবু কালাবাতুল জারমী, আবু বারদা বিন আবু মূসা আশআরী প্রমুখ।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 হিশাম বিন আব্দুল মালিক

📄 হিশাম বিন আব্দুল মালিক


হিশাম বিন আব্দুল মালিক আবু ওয়ালীদ ৭০ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেন। ভ্রাতা ইয়াযিদ বিন আব্দুল মালিকের পর খিলাফতের তখতে আসীন হন।

মুসআব যুবায়রী বলেন, একদা আব্দুল মালিক স্বপ্নে দেখেন তিনি মসজিদের মিহরাবে চারবার পেশাব করছেন। সাঈদ বিন মুসায়্যেবকে এর ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, আপনার চার পুত্র বাদশাহ হবেন। আর হিশাম হলেন তাদের মধ্যে সর্বশেষ বাদশাহ।

তিনি অত্যন্ত সচেতন এবং জ্ঞানবান ব্যক্তি ছিলেন। সম্পদটি বৈধ পন্থায় উপার্জিত কিনা- এ বিষয়ে চল্লিশ জনের সাক্ষী ছাড়া তিনি তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে অন্তর্ভুক্ত করতেন না। আসমায়ী বলেন, আমি এক লোককে হিশামের সাথে বিতর্ক করতে দেখলাম। হিশাম তাকে বলছেন, নিজের খলীফাকে এ কথা বলার জন্য তুমি উপযুক্ত নও। একদা জনৈক ব্যক্তির প্রতি রাগান্বিত হয়ে তিনি কসম করে বলেন, তোমাকে বেত্রাঘাত করতে আমার মন চাইছে।

সাহবাল বিন মুহাম্মাদ বলেন, খলীফাদের মধ্যে হিশাম অবৈধ রক্তপাত ঘটানোকে অধিক ঘৃণা করতেন। শাফী বলেন, সম্পূর্ণ চিন্তামুক্ত অবস্থায় তিনি তার নবনির্মিত প্রাসাদে একটি দিন অতিবাহিত করার অভিপ্রায় পোষণ করলেন। দুপুরে সীমান্ত এলাকা থেকে এক ভীতিপ্রদ সংবাদ এলে "এমন একটি ধনও পেলাম না" এ মন্তব্য করে তিনি নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করলেন। উল্লেখ্য তার এ কবিতা ছাড়া দ্বিতীয় কোন উক্তি সংরক্ষিত নেই। কবিতার অর্থ, "কামনার দাসত্ব করতে না চাইলেও কামনার হুল তোমাকে বিদ্ধ করবেই।" তিনি ১২৫ হিজরীর রবিউল আখের মাসে ইন্তেকাল করেন।

তার খিলাফতের সপ্তম বর্ষে রোম, অষ্টম বর্ষে হানজারা এবং দশম বর্ষে হিরসানা হস্তগত হয়। তার শাসনামলে সালেম বিন আব্দুল্লাহ বিন উমর, তাউস, সুলায়মান বিন ইয়াসার, ইবনে আব্বাসের গোলাম ইকরামা, কাসেম বিন মুহাম্মাদ বিন আবু বকর সিদ্দীক, সামরিক কবি কাসীর, মুহাম্মাদ বিন কাব আল-কারযী, হাসান বসরী, মুহাম্মাদ বিন সিরীন, আবুল তোফায়েল, আমর বিন ওয়াছালা (তিনি সর্বশেষ সাহাবী হিসেবে সকলের পর ইন্তেকাল করেন), জারীর, ফিরজোক, মুআবিয়া বিন কিরতা, মাকহুল, আতার বিন আবু রিবাহ, আবু জাফর, ওহাব ইবনে মানবাহ, সাকীনা বিনতে হোসাইন, কাতাদা, ইবনে উমরের গোলাম নাফে, সিরিয়ার বিখ্যাত শিক্ষক ইবনে আমের, মক্কা শরীফের সম্মানিত শিক্ষক ইবনে কাছীর, ছাবেত আল-বানানী, মালিক বিন দিনার, ইবনে মুহিস, ইবনে শিহাব যহরী প্রমুখ মনীষীগণ ইন্তেকাল করেন。

ইবনে আসাকির বর্ণনা করেন, ইবরাহীম বিন আবু আয়লা বলেন, হিশাম আমাকে শহরের রাজস্ব আদায়ের প্রস্তাব দিলে আমি তা প্রত্যাখ্যান করায় তিনি ভীষণ ক্ষুব্ধ হলেন। আমার প্রতি রক্তিম চক্ষুদ্বয়ের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, তোমার যা খুশি করবে, আমি তৎক্ষণাত আর কোন উত্তর দিলাম না। ক্রোধ প্রশমিত হলে অনুমতি নিয়ে বললাম, আমিরুল মুমিনীন! আল্লাহ তা'আলা কুরআন শরীফে ইরশাদ করেছেন, আমি নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল এবং পর্বতমালাকে নেতৃত্ব দানের নির্দেশ দিলে তারা তা প্রত্যাখ্যান করে, এতে আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি রুষ্ট, অসন্তুষ্ট এবং তাদের উপর বল প্রয়োগও করেননি। আর আমি তা প্রত্যাখ্যান করায় আপনি কেন আমার প্রতি বিরক্ত ও মনঃক্ষুণ্ণ হবেন? এ কথা শুনে তিনি হেসে উঠলেন এবং আমাকে ক্ষমা করে দিলেন。

খালিদ বিন সাফওয়ান বলেন, একদিন আমি হিশামের অতিথি হলাম। তিনি আমার নিকট গল্প শুনতে চাইলেন। আমি বললাম, জনৈক বাদশাহ নগর ভ্রমণের সময় এক প্রাসাদের প্রতি আঙুল উঁচিয়ে বললেন, এটা কার? বাদশাহর সহচরগণ বললেন, সুলতানের। তিনি আবার বললেন, আমার নিকট যতটুকু সম্পদ রয়েছে পৃথিবীর কোন বাদশাহর কাছে কোন সময় কি তা ছিল? এক প্রাচীন যুগের বয়ঃবৃদ্ধ আলেমে দ্বীন বললেন, আগে আমার কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিলে আমি এর জবাব দিব। বাদশাহ বললেন, বলুন। তিনি বললেন, আপনার নিকট যে পরিমাণ সম্পদ রয়েছে তা কি আগের চেয়ে হ্রাস পায়নি? এ সম্পদ কি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত নন? আপনার স্থলাভিষিক্ত কি এ সম্পদ উত্তরাধিকার সূত্রে পাবে না? বাদশাহ বললেন, আপনার তিনটি প্রশ্নই যথার্থ। তিনি বললেন, এ সম্পদের মোহই আপনাকে অন্ধ করে দিয়েছে। যে সম্পদ ক্ষয়শীল, যে সম্পদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অন্যের হস্তগত হবে এবং যে সম্পদ ব্যয় করেছেন তার হিসাব হবে। এ কথা শুনে বাদশাহ শিহরিত হয়ে উঠলেন এবং বললেন, আমি উত্তর পেয়ে গেছি। বৃদ্ধ আলেম বললেন, বাদশাহী করতে চাইলে আল্লাহ তা'আলার অনুসরণ করুন। অন্যথায় তা বর্জন করতে হবে। বাদশাহ এ বিষয়ে সারা রাত চিন্তা-ভাবনা করে সকালে বললেন, আমি বাদশাহী ছেড়ে মরু বিয়াবানে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আপনি আমার সঙ্গে থাকলে খুশি হবো। অতঃপর তারা মৃত্যু অবধি এক পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান করেন。

এ ঘটনা শ্রবণে হিশাম এতই কাঁদলেন যে, তার চোখাশ্রু দ্বারা দাড়ি সিক্ত হয়ে উঠল। পুত্রদ্বয়কে প্রশাসনিক দায়িত্ব দিয়ে তিনি ঘরের এক কোণে বসে ইবাদত করতে লাগলেন। তিনি বাইরে যাতায়াত ছেড়ে দিলেন। খলীফার এ অবস্থা দেখে রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিবর্গ খালিদ বিন সাফওয়ানকে বললেন, আপনি আমিরুল মোমিনীনকে এমন কি করলেন যার প্রভাবে তার বিলাসিতা বিদূরিত হয়েছে। খালিদ বিন সাফওয়ান বললেন, আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট এমর্মে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে, আমি কোন বাদশাহর নিকট গেলে তাকে আল্লাহর ভয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিব।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 ওলীদ বিন ইয়াযিদ বিন আব্দুল মালিক

📄 ওলীদ বিন ইয়াযিদ বিন আব্দুল মালিক


ওলীদ বিন ইয়াযিদ বিন আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান বিন হাকাম আবুল আব্বাস ৯০ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন ফাসিক। ইয়াযিদ বিন আব্দুল মালিকের মৃত্যুর সময় অল্পবয়স্ক হওয়ায় হিশাম খলীফা মনোনীত হন। তবে হিশামের পর তাকে উত্তরাধিকারী নির্বাচিত করায় হিশামের ইন্তেকালের পর ১২৫ হিজরীর রবিউল আখের মাসে তিনি খিলাফতের তখতে আসীন হন。

ওলীদ বিন ইয়াযিদ অসৎ, পাপাসক্ত এবং মদ্যপ ছিলেন। পবিত্র কাবা গৃহের ছাদে বসে মদ পানের মানসে হজ্ব করার ইচ্ছা করেন। পাপাচারের জন্য জনতা তাকে অবরুদ্ধ করে এবং তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ১২৬ হিজরীর জমাদিউল আখের মাসে তাকে হত্যা করা হয়。

তাকে অবরোধের সময় তিনি জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, আমি কি তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করিনি? আমি তো তোমাদের উপর কঠোরতা করিনি। আমি কি দরিদ্রদের কল্যাণ করিনি? তবে কেন আমার প্রতি এ অত্যাচার? জনতা জবাব দিল, আপনি সবই করেছেন। কিন্তু আপনাকে হত্যা করার কারণ হলো আপনি মদ্যপায়ী এবং আল্লাহ্ তা'আলা যা হারাম করেছেন আপনি তা হালাল বলে অনুমোদন দিয়েছেন。

তাকে হত্যা করার পর তার ছিন্ন মস্তক ইয়াযিদ বিন ওলীদ বিন আব্দুল মালিকের নিকট পাঠিয়ে দেয়া হয়। ইয়াযিদ বিন ওলীদ বিন আব্দুল মালিক তার কর্তিত মাথা বর্শায় বিদ্ধ করে ঝুলিয়ে রাখেন। তা দেখে ওলীদ বিন ইয়াযিদের ভাই সুলায়মান বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এ লোকটি অত্যন্ত বেশরম, মদখোর এবং ব্যভিচারী। সে আমার সাথে সমকামিতায় লিপ্ত হতে চাইত। মাআফী জারীরী বলেন, আমি ওলীদের কিছু জীবন বৃত্তান্ত এবং তার কবিতা সংগ্রহ করেছি- যা অবিশ্বাস, পাপাচার এবং ব্যভিচারে ভরা。

যাহাবী বলেন, ওলীদের অবিশ্বাস এবং ধর্মচ্যুতির বিষয়টি বিশুদ্ধ বলে প্রমাণিত হয়নি। তবে তিনি মদ পান করতেন এবং সমকামিতায় প্রসিদ্ধ ছিলেন। এজন্য জনতা বিদ্রোহ করে এবং তাকে হত্যা করে, একদা মাহদীর সামনে জনৈক ব্যক্তি ওলীদকে ধর্মচ্যুত হিসেবে অভিহিত করলে মাহদী ধমক দিয়ে বললেন, আল্লাহ তা'আলা কোন ধর্মচ্যুত ব্যক্তিকে কোনোদিন খিলাফতের মর্যাদা দান করেন না。

মারওয়ান বিন আবু হাফয বলেন, ওলীদ ছিলেন উঁচু মাপের একজন কবি। আবুল যানাদ বলেন, যহরী সবসময় হিশামের নিকট ওলীদের দোষ-ত্রুটিগুলো তুলে ধরে ওলীদকে উত্তরাধিকার মনোনীত না করার পরামর্শ দিতেন। কিন্তু হিশাম তার উপদেশ গ্রহণ করেননি। যহরী ওলীদের খিলাফত প্রাপ্তির পূর্বেই ইন্তেকাল করেন, অন্যথায় ওলীদ খলিফা হওয়ার পর তাকে অত্যাচার করতেন。

যহাক বিন উসমান বলেন, হিশাম ওলীদের উত্তরাধিকারের মনোনয়ন প্রত্যাহার করে স্বীয় পুত্রকে উত্তরাধিকার মনোনীত করতে চাইলে ওলীদ এ কবিতাটি লিখে হিশামের নিকট পাঠালেন, "আপনি আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করেননি, যদি তা করেন তবে তার প্রতিদান পাবেন। আমি গভীরভাবে লক্ষ্য করছি আপনি আমার অভিভাবকত্বের অধিকার ছিনিয়ে নিতে চান। আপনি সচেতন হলে এমনটা করতেন না। আপনি ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে এ কাজ করছেন। আফসোস, আপনি তাদেরই একজন যারা আমার দোষ-ত্রুটির অনুসন্ধান করে ইতোপূর্বে ইন্তেকাল করেছেন।"

হাম্মাদ এক বর্ণনায় বলেন, একদিন ওলীদের দরবারে দু'জন জ্যোতির্বিজ্ঞানী এসে বলল, আমরা নক্ষত্রসূচী দেখে জেনেছি, আপনি আরো সাত বছর জীবিত থাকবেন। হাম্মাদ বলেন, আমি মনে মনে বললাম, ওলীদকে ধোঁকা দিতে পারলে ভালোই হবে। আমি বললাম, এরা দু'জন অসত্য প্রলাপ বকছে। আমি জ্যোতির বিদ্যায় তাদের চেয়ে অধিক বিজ্ঞ। আমি নক্ষত্রসূচী দেখে জেনেছি, আপনি আরো চল্লিশ বছর বেঁচে থাকবেন। এ কথা শুনে ওলীদ মাথা নীচু করলেন এবং বললেন, তাদের কথায় আমি বিমর্ষ হয়নি এবং তোমার বক্তব্যেও উদ্বেলিত হইনি। আল্লাহর কসম, আমি জীবন প্রিয় মানুষের মত সম্পদ সঞ্চয় করতে চাই। আর ব্যয় করতে চাই অন্তিম জীবনে উপনীত হয়ে যারা ব্যয় করে তাদের মত।"

মুসনাদে আহমদের এক হাদীসে রয়েছে, এ উম্মতের মধ্যে ওলীদ নামে এক জনের আবির্ভাব হবে, যিনি এ উম্মতের উপর ফিরাউনের চেয়েও অধিক কঠোরতা অবলম্বন করবেন。

মাসালিক গ্রন্থে ইবনে ফাযল্লাহ বলেন, ওলীদ বিন ইয়াযিদ হলেন, অত্যাচারী, ঔদ্ধত্য, পথভ্রষ্ট, মিথ্যা শপথকারী, তৎকালীন যুগের ফিরাউন, যুগশ্রেষ্ঠ মন্দ মানব, কিয়ামতের দিনে স্বজাতিকে জাহান্নামের পথ প্রদর্শনকারী, কুরআন শরীফ নিক্ষেপকারী, পাপী এবং দুশ্চরিত্র。

সাঈদ বিন সুলায়েম বলেন, ইবনে মুআবিয়া ওলীদকে বললেন, মুহাম্মাদ (সা.)-এর পরিবার ছাড়া কুরাইশদের এবং সম্মানিত ব্যক্তিদের ছাড়া মারওয়ান পরিবারকে মর্যাদা দিতে চেয়েছেন। এ কথা শুনে ওলীদ বললেন, তুমি মুহাম্মাদ (সা.)-এর আত্মীয়দের আমার উপর মর্যাদা দিতে চাও? তিনি বললেন, আমি এটাকেই সঠিক জ্ঞান করি। অতঃপর তিনি এ কবিতাটি আবৃত্তি করেন, "আমি দুশমনদের সামনেও সত্য কথা বলতে চাই। আমি ওলীদের অভিজাত সেনাদের দেখেছি যারা রাষ্ট্রের কাজে অত্যন্ত অলস।"

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00