📄 আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের (রা.)
আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের বিন আওয়াম বিন খুয়াইলিদ বিন আসাদ বিন আব্দুল উজ্জা বিন কুসসী আল-আসাদীর উপনাম আবু বকর এবং আবু খুবায়ের। তিনি নিজে সাহাবী এবং সাহাবীর পুত্র। তাঁর পিতা জান্নাতুর সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজনের মধ্যে অন্যতম। মা আসমা বিনতে আবু বকর সিদ্দীক (রা.) তার দাদী সুফিয়া রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ফুফু। তিনি মদীনা শরীফে হিজরতের বিশ মাস পর জন্ম গ্রহণ করেন। কেউ বলেন, হিজরতের বছর তাঁর জন্ম। হিজরতের পর মুহাজিরদের প্রথম সন্তান তিনি। তাঁর জন্মে মুসলমানগণ আনন্দিত হয়েছিলেন। কারণ ইহুদীরা প্রচার করেছিল তারা যাদু করে মুসলমানদের সন্তান হওয়া বন্দ করে দিয়েছে।
জন্মের পর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর খিদমতে তাঁকে পেশ করা হলে হুযুর (সা.) একটি খেজুর চিবিয়ে তাঁকে চাটায়ে দেন এবং হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়েরের নানা আবু বকর সিদ্দীকের নামে নাম ও উপনাম রাখলেন। তিনি বেশি বেশি রোযা রাখতেন। দীর্ঘ কেরাত দিয়ে নামায পড়তেন। তিনি ছিলেন দয়ার্দ্র, অসীম সাহসী ও যুগশ্রেষ্ঠ বীর। তিনি কোনো কোনো রাতকে নামাযের মধ্যে দাঁড়িয়েই শেষ করে দিতেন, রুকুর মধ্যেই কোনো রাত সকাল হয়ে যেত, আবার কোনো রাত তিনি সেজদায় কাটিয়ে দিতেন। তিনি ৩৩টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাঁর নিকট থেকে যাঁরা হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাঁরা হলেন, তাঁর ভাই উরওয়া, ইবনে আবী মালীকা, আব্বাস বিন সহল, সাবিত আল-বানানী, আত, উবায়দা আল-সালমানী প্রমুখ।
তিনি ইয়াযিদ বিন মুআবিয়ার বাইআত প্রত্যাখ্যান করে মক্কায় গমনকরত: নিকে কারো বাইআত গ্রহণ করেননি এবং নিজের জন্যও অন্যের নিকট থেকেও বাইআত নেননি। এজন্য ইয়াযিদ তাঁর প্রতি রুষ্ট ছিলেন। ইয়াযিদের মৃত্যুতে হিজ যেবাসী, ইয়ামানবাসী, ইরাকবাসী, খুরাসানবাসী তাঁর নিকট বাইআত গ্রহণ করে। তিনি কাবা শরীফ পুনর্নির্মাণ করেন। হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর যুগে কাবা শরীফ যেমন ছিল, তেমনিভাবে তিনি কাবা শরীফের দুটি দরজা নির্মাণ করেন। তিনি তাঁর খালা আয়েশা সিদ্দীকা (রা.)-এর রেওয়ায়েত অনুযায়ী জানাযায় যে, "রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইচ্ছা ছিল আরো ছয় গজ জায়গা কাবা শরীফরে অন্তর্ভুক্ত করা।" এজন্য তিনি তাই করেন।
মিসর এবং সিরিয়াবাসী ইয়াযিদের পর তদীয় ছেলে মুআবিয়ার বাইআত গ্রহণ করে। মুআবিয়ার পর তারা আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়েরের বাইআত গ্রহণ করে। এতে মারওয়ান বিন হাকাম বিদ্রোহ করে মিসর ও সিরিয়া গমন করে। তার মৃত্যু পর্যন্ত অর্থাৎ, ৬৫ হিজরী অবধি মিসর ও সিরিয়া তাঁর অধীনেই ছিল। তার শাসনকালে মারওয়ান তার পুত্র আঃ মালিককে উত্তরাধিকার মনোনীত করেন।
যাহাবী বলেন, মারওয়ান খলীফাদের অন্তর্ভুক্ত নন। কারণ তিনি আব্দুল্লাহ বিন যুবায়েরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। এ দিক থেকে তিনি বিদ্রোহী। তার ছেলে আব্দুল মালিককে উত্তরাধিকার মনোনীত করাও সঠিক ছিল না। তবে আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়েরকে শহীদ করার পর তার খিলাফত সহীহ হয়েছে।
সে সময় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা.) মক্কায় খিলাফতের মসনদে সমাসীন। আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান ইবনে যুবায়েরকে হত্যার জন্য চল্লিশ হাজ এর সৈন্য নিয়ে হাজ্জাজকে পাঠালেন। হাজ্জাজ এসে এক মাস মক্কা শরীফ অবরোধ করে রাখেন এবং শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মিনযানিক (কামান) স্থাপন করেন এবং তাঁকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে ফেলেন। ইবনে যুবায়েরের সহচরবৃন্দ তাকে ছেড়ে দুশমনের শিবিরে গিয়ে যোগ দেয়ায় তিনি মর্মাহত হন। কিছুদিন পর হাজ্জাজ বিজয় অর্জন করেন এবং ৭৩ হিজরীর জমাদিউল আউয়াল মাসের সতেরো তারিখ সোমবারে আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের (রা.) কে শূলে চড়ানো হয়।
মুহাম্মদ বিন যায়েদ বিন আব্দুল্লাহ বিন উমর বলেন, হাজ্জাজ মিনযানিক (কামান) স্থাপনের সময় আমি আবু কুবায়েস পাহাড় থেকে দেখলাম, আগুনের এক বিশাল লেলিহান শিখা আকাশ থেকে পড়ে মিনযানিকের নিকটবর্তী পঁচিশজন সৈন্য নিহত হয়।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা.) অভিজাত কুরাইশ বংশীয় ছিলেন এবং তাঁর অনেক ঘটনা ও জনশ্রুতি জনতার মুখে মুখে প্রসিদ্ধ।
আবু ইয়ালা 'মুসনাদ' গ্রন্থে ইবনে যুবায়ের (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে কিছু রক্ত দিলেন এবং তা মানুষের দৃষ্টির বাইরে ফেলে আসতে বললেন। আমি অন্তরালে গিয়ে তা পান করে ফেললাম। আমি ফিরে এলে নবীজী (সা.) বললেন, তুমি রক্তগুলো কি করলে? আমি বললাম, আমি সেগুলো এমন এক স্থানে গোপন করে ফেলেছি, যা কেউ দেখতে পাবে না। তিনি বললেন, মনে হয় তুমি তা পান করেছ। আমি হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলে তিনি বললেন, তোমার থেকে লোকেরা এবং লোকদের থেকে তুমি কষ্ট পাবে। কথিত আছে, ইবনে যুবায়েরের এ শক্তি সামর্থ্যই ছিল সেই রক্তের অদৃশ্য প্রতিক্রিয়া।
নাওফুল বাকালী বলেন, আসমানী কিতাবে আমি দেখেছি সেখানে লিখা রয়েছে, ইবনে যুবায়ের হলেন فارس للخلفاء তথা খলীফাদের বাহন।
আমর বিন দিনার বলেন, আমি তার মতো অত্যন্ত যত্নের সাথে নামায পড়তে আর কাউকে দেখিনি। মিনযানিক থেকে গোলা বর্ষণের মুহূর্তেও তিনি হারাম শরীফে নামায পড়ছিলেন। সে সময় তার কাপড়ে আগুন লেগে গিয়েছিল, কিন্তু সেদিকে তাঁর মোটেও ভ্রুক্ষেপ ছিল না।
মুজাহিদ বলেন, তিনি যেভাবে ইবাদত করেন, তাঁর স্থানে অন্য কেউ হলে বিরক্ত হয়ে যেতো। একবার কাবা শরীফ বন্যা প্লাবিত হয়ে পড়লে তিনি সাঁতরিয়ে তাওয়াফ করেন।
উসমান বিন তালহা বলেন, তিনটি বিষয়ে ইবনে যুবায়েরের সমকক্ষ কেউ নেই। এক. বীরত্ব ও সহসিকতা। দুই. ইবাদতবন্দেগী এবং তিন, বাগ্মিতা ও বাকপটুতা। তিনি এমন উচ্চ কণ্ঠের অধিকারী যে, খুতবা প্রদানের সময় তার কণ্ঠ পাহাড়ে ধাক্কা লাগত।
উরওয়া বলেন, নাবাগা জাআদী আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়েরের শানে যে কবিতা রচনা করেছেন তার অর্থ হলো, "তিনি শাসনকর্তা হয়ে আবু বকর (রা.), উমর (রা.) এবং উসমান (রা.)-এর মতো দুস্থের সেবা করবেন। সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিমিরের মাঝে আরো প্রদীপ জ্বালাবেন।"
হিশাম বিন উরওয়া এবং খুবায়েব বলেন, তিনিই সর্বপ্রথম কাবা শরীফকে রেশমী চাদরে আচ্ছাদন করেন। এর পূর্বে কাবা ঘর চট এবং চামড়া দ্বারা ঢাকা থাকতো।
আমর বিন কায়েস বলেন, ইবনে যুবায়েরের বিভিন্ন ভাষাভাষীর এক'শ গোলাম ছিল। তিনি তাদের ভাষাতেই গোলামদের সাথে কথা বলতেন। আমি তাঁকে পার্থিব জগতের কাজে এমনভাবে মশগুল হতে দেখে ভাবতাম মনে হয় তিনি আর আখেরাতের কাজের সাথে জড়িত হবেন না। আর যখন তাঁকে আখেরাতের কাজে সম্পৃক্ত দেখতাম, মনে হতো পার্থিব কাজে আর নিজেকে জড়াবেন না।
হিশাম বিন উরওয়া বলেন, আমার চাচা আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের (রা.) শিশুকালে সর্বপ্রথম 'তলোয়ার' শব্দ উচ্চারণ করেছেন। অতঃপর তা মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর পিতা ছেলের এ শব্দ শ্রবণে বললেন, তোমাকে তলোয়ার দ্বারা অনেক মধ্যস্থতা করতে হবে। আবু উবায়দা রেওয়ায়েত করেন, একদিন আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের আল-আসাদী ইবনে যুবায়েরের দরবারে গিয়ে বললেন, হে আমিরুল মুমেনীন! ওমুক দিক দিয়ে আমি আপনার আত্মীয়। ইবনে যুবায়ের বললেন, হ্যাঁ, সঠিক বলেছ। তবে তুমি যদি চিন্তা করে দেখ তাহলে বুঝতে পারবে যে, সকল মানুষ একই মা এবং বাবা থেকে নির্গত। আল-আসাদী বললেন, আমার অর্থকড়ি শেষ হয়ে গেছে। তিনি বললেন, আমি এর জিম্মাদার নই। তুমি বাড়ি ফিরে যাও। আসাদী বললেন, আমার উট ক্ষুধার্থ ও তৃষ্ণার্থ। তিনি বললেন, কোনো এক চারণ ভূমিতে তোমার উট ছাড়িয়ে দাও। আসাদী বললেন, আমি কিছু পাবার আশায় আপনার কাছে এসেছি, অভিমত জিজ্ঞেস করার জন্য নয়। অভিশাপ ক্ষুধার্থ সেই উটনীর প্রতি যে আমাকে আপনার কাছে এনেছে। তিনি বললেন, তার বাহনের উপরও।
আব্দুর রাজ্জাক 'মুসান্নাফ' গ্রন্থে যহরী থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে কখনোই দুশমনের কর্তিত মস্তক পেশ করা হয়নি। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর সম্মুখে জনৈক ব্যক্তির ছিন্ন মস্তক পেশ করা হলে তিনি দারুণ অসন্তুষ্ট হন। ইবনে যুবায়েরের দরবারে দুশমনের কর্তিত মস্তক পেশ করা হয়েছে।
ইবনে যুবায়েরের যুগে মুখতার কাযযাব নামে ভণ্ড নবীর আবির্ভাব হয়। সে নবুওয়াত দাবী এবং খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে ইবনে যুবায়ের ৬৭ হিজরীতে বিশাল সৈন্য বাহিনী নিয়ে তার সাথে যুদ্ধ করে তাকে পরাজিত ও হত্যা করেন। তাঁর খিলাফত কালে উসাঈদ বিন যহরি, আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস, নোমান বিন বসীর, সুলায়মান বিন সরদ, জাবের বিন সমরা, যায়েদ বিন আরকাম, আল লাইছী, যায়েদ বিন খালিদ আল জাহনী, আবুল আসওয়াদ ওয়ায়েল প্রমুখ আলেমে দ্বীন ইন্তেকাল করেন।
📄 আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান
আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান বিন হাকাম বিন আবুল আস বিন উমাইয়্যা বিন আব্দুস শামস বিন আব্দে মান্নাফ বিন কুসসী বিন কেলাব আবুল ওয়ালীদ ২৬ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। ইবনে যুবায়েরের খিলাফতকালে মারওয়ান আব্দুল মালিককে উত্তরাধিকার মনোনীত করেন। আর এজন্যই ইবনে যুবায়ের জীবিত থাকাকালীন আব্দুল মালিকের খিলাফত সঠিক ছিল না। মিসর এবং সিরিয়া নির্যাতনের মাধ্যমে প্রথম থেকেই তার অধীনে ছিল। অতঃপর ইরাক ইত্যাদি তার পদানত হয়। ৭৩ হিজরীতে ইবনে যুবায়েরের শাহাদাতের পর তার খিলাফত বিশুদ্ধ হয়। এ বছর হাজ্জাজ কাবা শরীফ বর্তমানে যে মডেলে আছে সেভাবে পুনর্নির্মাণ করেন। হাজ্জাজের ইশারায় জনৈক ব্যক্তি বিষ মিশ্রিত বর্শার আঘাতে ইবনে উমর (রা.) গুরুতর আহত হন এবং একারণে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তিনি ইন্তেকাল করেন। ৭৪ হিজরীতে হাজ্জাজ মদীনা শরীফে গিয়ে মদীনাবাসী এবং যে সকল আসহাবে রসূল (সা.) সে সময় জীবিত ছিলেন তাদের উপর অমানবিক নির্যাতন করতে আরম্ভ করেন। হযরত আনাস (রা.) হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রা.), হযরত সহল বিন সাদী (রা.) প্রমুখ সাহাবীদের গলা এবং হাতে মোহর এঁটে দেয়ার মাধ্যমে তাদের চরম অপমানিত করা হয়।
৭৫ হিজরীতে আব্দুল মালিক হজ্জ করেন এবং হাজ্জাজ ইরাকের গভর্নর নিযুক্ত হন। ৭৭ হিজরীতে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি দুর্গ বিজিত হয় এবং মিসরের ঐতিহাসিক জামে মসজিদ ভেঙে আব্দুল আযীয বিন মারওয়ান চারদিকে সম্প্রসারণের মাধ্যমে পুনর্নির্মাণ করেন। ৮২ হিজরীতে সিনানা দুর্গ হস্তগত হয় এবং আরমেনিয়া ও সানহাযার যুদ্ধ হয়। ৮৩ হিজরীতে হাজ্জাজ একটি শহরের গোড়া পত্তন করেন। ৮৪ হিজরীতে মাসীসা এবং আওদীয়ায়ে মাগরিব হাতে আসে। ৮৫ হিজরীতে আব্দুল আযীয বিন আবু হাতিম বিন তাগমান আল বাহলী নগর প্রাচীর নির্মাণ করেন। ৮৬ হিজরীতে তাওলিক এবং ইহজাম নামক দুটি দুর্গ হস্তগত হয়। প্লেগে আক্রান্ত হয়ে এ দুটি দুর্গের অধিকাংশ মহিলা মারা যায়। এজন্য দুর্গদ্বয়কে প্লেগের সমাধি নামে অভিহিত করা হয়। এ বছরের শাওয়াল মাসে আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান ইন্তেকাল করেন।
আহমদ বিন আব্দুল্লাহ আল আজলী বলেন, আব্দুল মালিকের মেধা পচনের অসুখ ছিল। ১৭ জন পুত্র সন্তান রেখে তিনি পরলোক গমন করেন। ইবনে সাদ বলেন, আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান হযরত উম্মে দারদা সাহাবীর দরবারে যাতায়াত করতেন। একদিন উম্মে দারদা বললেন, হে আমিরুল মুমেনীন, আমি শুনেছি আপনি ইবাদত করার পরও মদ পান করেন। তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি মদ পানের সাথে সাথে কাপালিকে পরিণত হয়েছি। হযরত নাফে বলেন, আমি মদীনায় আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানের চেয়ে অধিক কূটবুদ্ধিসম্পন্ন যুবক, চালাক ইবাদতকারী, আইনবিদ, কুরআন ও হাদীসের জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ ব্যক্তি আর দেখিনি।
আবুয যানাদ বলেন, মদীনার ফকীহগণ হলেন, সাঈদ বিন মুসায়্যাব, আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান, উরওয়া বিন যুবায়ের এবং ফাবিযা বিন ওযীব। ইবনে উমর (রা.) বলেন, সকলে ছেলের জন্ম দেয়। আর মারওয়ান দিয়েছেন পিতার জন্ম। উবাদা বিন লাবনী বলেন, জনৈক ব্যক্তি হযরত ইবনে উমরকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কুরাইশদের মধ্যে বয়ঃবৃদ্ধ হয়ে গেছেন। আপনার ইন্তেকালের পর আমরা মাসয়ালা মাসায়েল কাকে জিজ্ঞেস করবো? তিনি বললেন, মারওয়ানের ছেলে ফকীহ, তাকে তোমরা জিজ্ঞাসা করবে।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর গোলাম সুহায়েম বলেন, তরুণ আব্দুল মালিক হযরত আবু হুরায়রার দরবারে এলে তিনি বললেন, এ যুবক একদিন আরবের বাদশাহ হবেন। উবায়দা বিন রাব্বাহ আল গাসসানী বলেন, আব্দুল মালিক খলীফা হওয়ার পর হযরত উম্মে দারদা তাকে বললেন, আমি তোমাকে দেখেই বুঝে ছিলাম তুমি একদিন বাদশাহ হবে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কিভাবে বুঝে ছিলেন? তিনি বললেন, তোমার চেয়ে বাগ্মী এবং চিন্তাশীল আর দেখিনি। শা'বী (রহ:) বলেন, যে আমার সাহচর্য লাভ করছে সেই আমার জ্ঞান ও প্রজ্ঞার কাছে লা জওয়াব হয়েছে। আর আমি আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানের পাণ্ডিত্য ও প্রখর মেধার নিকট লা জওয়াব হয়েছি। কারণ আমি তার সামনে কোনো হাদীস পেশ করলে তিনি অবশ্যই সে হাদীসের ব্যাখ্যা করতেন। আর কোনো বিষয়ে কবিতা আবৃত্তি করলে একই বিষয়ে তিনি আরো অধিক কবিতা পাঠ করতেন।
যাহাবী বলেন, তিনি যাঁদের কাছে হাদীস শ্রবণ করেছেন তাঁরা হলেন, উসমান, আবু হুরায়রা, আবু সাঈদ, উম্মের সালমা, বুরায়দা, ইবনে উমর এবং মুআবিয়া (রা.) প্রমুখ। আর যাঁরা তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন তাঁরা হলেন, উরওয়া, খালিদ বিন মিদাদ, রাজা বিন হায়া, যহুরী, ইউনুস বিন মায়সারা, রবীআ বিন ইয়াযিদ, ইসমাঈল বিন উবায়দুল্লাহ, জারীর বিন উসমান প্রমুখ। বাকার বিন আব্দুল্লাহ মাযানী বলেন, ইউসুফ নামক এক ইহুদী মুসলমান হন। কুরআন শরীফ তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে তার মধ্যে প্রবল আগ্রহ সর্বদা বিদ্যমান থাকতো। একদিন তিনি আব্দুল মালিকের বাড়ির পাশ দিয়ে যাবার সময় উচ্চ কণ্ঠে বললেন, এ বাড়ির মালিকের কাছ থেকে উম্মতে মুহাম্মাদীয়া প্রবল অত্যাচারের শিকার হবে। এ কথা শুনে আমি বললাম, কতদিন পর্যন্ত তা চলবে? তিনি বললেন, যতক্ষণ পর্যন্ত খোরাসান থেকে কালো পতাকাধারী না আসবে। ইউনুস আব্দুল মালিকের বন্ধু ছিলেন। একদা তিনি আব্দুল মালিকের মাথায় হাত রেখে বললেন, আমি শরীয়ত বিরোধী কোন কাজ করবো না। কথিত আছে যে, ইয়াযিদ বিন মুআবিয়া মক্কা শরীফে সৈন্য পাঠালে আব্দুল মালিক মন্তব্য করেছিলেন, আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি, এ লোকটি তো পবিত্র নগরীতে সৈন্য পাঠিয়েছে। ইউসুফ বললেন, তোমার সেনারা ইয়াযিদ বাহিনীর চেয়ে নিষ্ঠুর হবে।
ইয়াহইয়া গাসসানী বলেন, মুসলিম বিন উকবা মদীনায় প্রবেশ করলে আমি মসজিদে নববীতে আব্দুল মালিকের সামনে গিয়ে বসলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি এ বাহিনির অন্তর্ভুক্ত? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, দুর্ভাগা, তুমি কি জান না তোমরা এমন এক জাতির সঙ্গে লড়াই করতে এসেছ যারা ইসলামের প্রথম সন্তান, তাঁরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবী এবং তিনি তাদেরকে অন্তর দিয়ে ভালোবাসতেন। যদি দিনে তাদের কাছে যাও তবে তারা রোযাদার, আর রাতে গেলে দেখবে তাহাজ্জুদের নামাযে মশগুল। স্মরণ রেখো, পৃথিবীর সবাই মিলে যদি তাদের হত্যা করতে চায় আল্লাহ তা'আলা তাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। আব্দুল মালিক খিলাফতের তখতে আসীন হয়ে হাজ্জাজের নেতৃত্বে তাদের প্রতি সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং ইবনে যুবায়েরকে হত্যা করা হয়।
হযরত আব্দুর রহমান বিন আবু বকর (রা.) বলেন, যখন খিলাফত আব্দুল মালিকের হাতে গিয়ে পৌছে ঠিক তখন কুরআন শরীফ তার কোলে ছিল। তিনি তা বন্ধ করে বললেন, এটাই হলো তোমার সাথে শেষ সাক্ষাত। ইমাম মালিক (রা.) বলেন, আমি ইয়াহইয়া বিন সাঈদের নিকট শুনেছি আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান যোহর এবং আসরের মধ্যবর্তী সময় থেকে আসর পর্যন্ত আরো দু'জনকে নিয়ে মসজিদে নামায আদায় করেন। সাঈদ বিন মুসায়্যাবকে কেউ জিজ্ঞেস করল, এরা তিনজন তো নামায পড়ছে, আমরাও যদি উক্ত সময়ে নামায পড়ি তবে কোনো ক্ষতি হবে না তো? তিনি বললেন, বেশি বেশি নামায পড়া আর অধিক রোযা রাখার নাম ইবাদত নয়। দ্বীন নিয়ে গবেষনা ও চিন্তাশীলতা এবং গুনাহর কাজ থেকে বেঁচে থাকার নাম ইবাদত।
মুসআব বিন আব্দুল্লাহ বলেন, ইসলামের মধ্যে সর্বপ্রথম তার নাম আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান রাখা হয়েছে। ইয়াহইয়া বিন বাকীর বলেন, আমি ইমাম মালিক (রা.) থেকে শুনেছি, তিনি বলেন, সর্বপ্রথম আব্দুল মালিক দিনারের উপর ছাপ দেন এবং কুরআনের আয়াত অঙ্কিত করেন। মুসআব বলেন, আব্দুল মালিক দিনারের উপর একদিকে قُلْ هُوَ اللَّهُ اَحَدٌ খেদাই করেন এবং অপর দিকে لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ নকশা করেন। দিনারের চতুর্দিকে চান্দীর একটি গোল বৃত্ত ছিল। এ বৃত্তের উপর ভাগে মুদ্রা প্রস্তুতকারী সরকারী কারখানা ও শহরের নাম এবং বাহিরাংশে অর্থাৎ, বৃত্তের চতুর্দিকে مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ أَرْسَلَهُ بِالْهُدَى وَদِينِ الْحَقِّ লিখা ছিল।
আসকারী কর্তৃক রচিত, “আওয়ায়েল” গ্রন্থে রয়েছে, প্রথমে মুদ্রার হস্তাক্ষরে اَللهُ اَحَدٌ قُلْ هُوَ অপর দিকে নবীজী (সা.)-এর নাম এবং তারিখ লিখা থাকত। এ প্রথা মুসলমানদের মধ্যে সর্বপ্রথম আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানই চালু করেন। তবে তার সাম্রাজ্যে কোনো মুদ্রার প্রচলন ছিল না; বরং খ্রিস্টানদের মুদ্রাই তার রাজ্যে চলত। খ্রিস্ট মুদ্রায় তাওহীদ ও রিসালাতের বাণী লিখার কারণে একদা রোম সম্রাট এ মর্মে পত্র লিখলেন যে, আপনি মুদ্রায় হস্তাক্ষরে আপনার নবীর নাম লিখার প্রথা বর্জন করুন। অন্যথায় দিনারে আমি এমন কিছু লিখব যা দ্বারা আপনারা মর্ম পীড়নে ভুগবেন। কারণ আপনাদের কাজে আমরা কষ্ট পাচ্ছি। আব্দুল মালিক খালিদ বিন ইয়াযিদ বিন মুআবিয়াকে পরামর্শের জন্য ডাকলেন। তিনি সব শুনে বললেন, আপনার সাম্রাজ্যে খ্রিস্ট মুদ্রা প্রবেশের পথ বন্ধ করে দিন। নিজে মুদ্রার প্রবর্তন করুন এবং মুদ্রায় হস্তাক্ষরের পরিবর্তে লিখাগুলো খোদাই করে দিন। তিনি এ পরামর্শ মোতাবেক ৭৫ হিজরীতে নিজস্ব দিনার তৈরি করেন।
আসকারী বলেন, খলীফাদের মধ্যে কৃপণতা করার জন্য আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানের নাম রাশহুল হুজারা এবং মুখ থেকে দুর্গন্ধ বেরুনের জন্য আবুল যবান নামে প্রসিদ্ধ। যে খলীফা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন, যে খলীফার সামনে কথা বলা নিষেধ ছিল এবং যে যুগে প্রচলিত কোনো বচন উত্থাপন করা যেতো না তিনি আব্দুল মালিক। আসকারী কালবী থেকে রেওয়ায়েত করেন, মারওয়ান বিন হাকাম নিজ সন্তান আব্দুল মালিকের পর আমর বিন সাঈদ বিন আসকে উত্তরাধিকার মনোনীত করেছিলেন। কিন্তু আব্দুল মালিক তাকে হত্যা করেন। ইসলামের মধ্যে এটাই ছিল প্রথম ওজর।
ইবনে জারীর তাঁর পিতা থেকে রেওয়ায়েত করেন, হযরত আব্দুল্লাহ বিন যুবায়েরকে শহীদ করার পর ৭৫ হিজরীতে আব্দুল মালিক মদীনায় এক বক্তৃতায় বলেন, (হামদ ও সানার পর) আমি দুর্বল খলীফা উসমান (রা.) নই, আমি শক্তিহীন খলীফা মুআবিয়া এবং ক্ষীণ মনের খলীফা ইয়াযিদও নই। আমার পূর্ববর্তী খলীফাগণ এ সম্পদ ভোগ করতেন। খবরদার এ ব্যাপারে আমার তলোয়ার খুব তীক্ষ। তোমাদের বর্শাগুলো আমার সাহায্যে উঁচিয়ে ধরো। আমরা মুহাজিরদের প্রচলিত রীতিনীতি সংরক্ষণ করব, তবে এর উপর আমল না করলে আমি তোমাদের ধ্বংস করে দিব। আমর বিন সাঈদের আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষাসহ আরো অন্যান্য গুণাবলী থাকলেও প্রশাসন এবং খিলাফত ভিন্ন বিষয়। তিনি সামান্য মাথা চাড়া দিলে তাকে শেষ করে দিব। স্মরণ রেখো, আমি তোমাদের সকল আবেদন রক্ষা করব, কিন্তু আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে আমি কিছুতেই তা মেনে নিব না। সম্মিলিত সিদ্ধান্ত এটাই যে, যে আমর বিন সাঈদের দলে গিয়ে ভিড়বে এবং যে মাথা চাড়া দিবে তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হবে। আর এরপরে যদি কেউ আমাকে আল্লাহর ভয় দেখায় তবে তার গর্দানও উড়িয়ে দিব। এ বলে তিনি মিম্বর থেকে অবতরণ করলেন।
আসকারী বলেন, আব্দুল মালিক সর্বপ্রথম সরকারী অনেক নথিপত্র ফার্সী থেকে আরবী ভাষায় স্থানান্তর করেন। তিনি সর্বপ্রথম মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে হাত উঁচু করেন। আমি (গ্রন্থকার) বলছি, আব্দুল মালিক দশটি বিষয়ের প্রবর্তক। এর মধ্যে পাঁচটি ভালো এবং পাঁচটি মন্দ। ইবনে আবী শায়বা 'মুসান্নাফ' গ্রন্থে মুহাম্মাদ বিন সিরীন (রহ.) থেকে রেওয়ায়েত করেন, মারওয়ানের সন্তানদের মধ্য থেকে আব্দুল মালিক বা অন্য কেউ ঈদুল ফিতর অথবা ঈদুল আযহার আযানের প্রথা চালু করেছিলেন। আব্দুর রাজ্জাক ইবনে জারীর থেকে রেওয়ায়েত করেন, আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান সর্বপ্রথম কাবা শরীফে রেশমী কাপড়ের গেলাফ চড়িয়ে দেন। মুফতীগণকে রেশমী কাপড় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে কাবা শরীফের জন্য রেশমী কাপড়ই সঠিক বলে অভিমত পেশ করেন।
ইউসুফ বিন মাজশু বলেন, বিচার করার সময় আব্দুল মালিকের মাথার উপর তলোয়ারের ছায়া দান করা হতো। আসমায়ী বলেন, জনৈক ব্যক্তি আব্দুল মালিককে জিজ্ঞেস করল হে আমিরুল মুমেনীন! আপনি অতি তাড়াতাড়ি বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। তিনি বললেন, কেন হব না বল, প্রতি জুমআয় নিজের মেধা যেভাবে জনতার কাছে বিলিয়ে দিচ্ছি। মুহাম্মাদ বিন হরব যিয়াদী বলেন, জনৈক ব্যক্তি আব্দুল মালিককে জিজ্ঞেস করল, কোন ব্যক্তি সর্বোত্তম? তিনি বললেন, যিনি উচ্চ মর্যাদার অধিকারী, বিনয়ী এবং সর্ব অবস্থায় ইনসাফ করে। ইবনে আয়শা বলেন, কোনো ব্যক্তি শহর, নগর অথবা গ্রাম থেকে আব্দুল মালিকের কাছে আসলে তিনি তাদের চারটি বিষয়ে সাবধান করে দিতেন। এক মিথ্যা বলবে না, কারণ মিথ্যার কোনো মূল্য নেই। দুই. আমি যে প্রশ্ন করব শুধু তারই উত্তর দিবে। তিন. আমার প্রশংসায় অহেতুক কল্পনার রং ছড়িয়ে দিবে না। চার. আমাকে আমার প্রজাবৃন্দের উপর উত্তেজিত করতে পারবে না।
মাদায়েনী বলেন, জীবনে অন্তিম মুহূর্তে আব্দুল মালিক তাঁর ছেলেকে এ উপদেশ দেন- সর্বদা আল্লাহকে ভয় করবে, মতভেদ থেকে অনেক দূরে থাকবে, যুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শন করবে, পুণ্যে দৃষ্টান্ত হবে, যুদ্ধের পূর্বে মৃত্যুকে আহ্বান করা হয় না, আর পুণ্যের পূর্ণতা এবং আলোচনা যুগ যুগ ধরে থেকে যায়। তিক্ততার মধ্যে মিষ্টি এবং প্রতাপশালীতার মাঝে নমনীয় হয়ে যাও। ইবনে আবুল আ'লা আশ শায়বানী কবিতার মাধ্যমে আব্দুল মালিকের নসীহতগুলো তুলে ধরেছেন এভাবে- "অনেকগুলো তীর একত্রিত করে ভাঙা অসম্ভব। তবে একটি তীর যে কারো পক্ষে ভেঙে ফেলা সম্ভব। হে ওয়ালীদ! খিলাফতের বিষয়ে আল্লাহকে ভয় কর। হাজ্জাজের প্রতি বেশি দৃষ্টি রাখবে, তাকে সম্মান করবে, কারণ তিনিই তোমাকে খিলাফত পর্যন্ত পৌছে দিয়েছেন। হে ওয়ালীদ! হাজ্জাজ তোমার বাহু এবং তলোয়ার। তার ব্যাপারে কারো অভিযোগ গ্রহণ করবে না। সবসময় তার প্রয়োজন হবে। আমার মৃত্যুর পর নিজের জন্য বাইআত করে নিবে। যদি বাইআত গ্রহণে কেউ অস্বীকার করে তবে তার গর্দান উড়িয়ে দিবে।"
আব্দুল মালিক যখন মৃত্যুপ্রায় সে সময় ওয়ালীদ পিতাকে দেখার জন্য এলে তিনি তৎক্ষণাত এ কবিতাটি আবৃত্তি করেন- "রোগীর শুশ্রুষাকারী আসছে। শুশ্রুষা করার জন্য নয়, বরং মরেছি কিনা তা দেখার জন্য।" এ কথা শুনে ওয়ালীদ কেঁদে উঠলে আব্দুল মালিক বললেন, মেয়েদের মত কেঁদে কি লাভ হবে। আমার মৃত্যুর পর নিজ পায়ে ভর করে দাঁড়াবে, বীরত্বকে কাজে লাগাবে, সিংহের পোশাক পরবে, নিজের তলোয়ার কাঁধে রাখবে, যে অবাধ্য হবে তার মস্তক ছিন্ন করে দেবে, আর যে নীরব থাকবে তাকে ছেড়ে দিবে।
আব্দুল মালিকের মন্দ কাজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জঘন্য কাজটি হলো হাজ্জাজকে মুসলমান এবং সাহাবীদের শাসনকর্তা নিয়োগ করা। কারণ এ হতভাগ্য লোকটি অনেক আকাবেরে আসহাবে রসূল (সা.) এবং তাবেয়ীকে শহীদ করে দিয়েছে এবং হযরত আনাসসহ প্রমুখ সাহাবীদের গলায় ও হাতে মোহর এঁটে দিয়ে নির্যাতনের চরম দৃষ্টান্ত রেখেছে। আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করবেন না। ইবনে আসাকির স্বরচিত 'ইতিহাস' গ্রন্থে ইবরাহীম বিন আদীর বরাত দিয়ে লিখেছেন, উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের হত্যাকাণ্ড, জায়েশ বিন দালজার হিজাযে নিহত হওয়া, রোম সম্রাট কর্তৃক মুসলিম বিশ্বে উত্তেজনা ছড়ানোর অপকৌশল এবং আমর বিন সাঈদের দামেশক-গমন থেকে এ চারটি বিপদ একই রাতে হলেও আব্দুল মালিকের চেহারায় কোনো বিষাদের ছাপ পড়েনি। আসমায়ী বলেন, শা'বী, আব্দুল মালিক, হাজ্জাজ এবং ইবনুল কারীয়া এ চারজন হাসি-তামাশার সময়ও সাধারণত ভুল করতেন না।
সালাফী তৌরিয়াত গ্রন্থে লিখেছেন, আব্দুল মালিক একবার বাইরে গেলে জনৈক মহিলা এসে বলল, হে আমিরুল মুমেনীন, আমার ভাই ছয় শ'দিনার রেখে ইন্তেকাল করেছে। পরিবারের লোকেরা একটি দিনার দিয়ে আমাকে বলেছে, এটা তোমার মিরাছ। এ মাসয়ালাটি আব্দুল মালিকের বুঝে না আসায় শা'বীকে ডেকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, বিষয়টি যথার্থ। মৃত্যু ব্যক্তির দুই মেয়ে দুই তৃতীয়াংশ অর্থাৎ চার শ' দিনার পাবে। মা পাবে এক শ' স্ত্রী পাবে পঁচাত্তর এবং বারোজন ভাই পাবে চব্বিশটি দিনার। এ দৃষ্টিকোণ থেকে তার ভাগে একটি দিনারই পড়বে। ইবনে আবী শায়বা মুসান্নাফ গ্রন্থে লিখেছেন, আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান বলেছেন, আনন্দ উপভোগের জন্য বারবার বাঁদী, সন্তানের জন্য ফার্সী বাঁদী এবং সেবার জন্য হলে রোমান দাসী ক্রয় করবে।
ছালাবা বলেন, আব্দুল মালিক বলতেন, আমি রমযানে জন্মগ্রহণ করেছি, রমযানে মায়ের দুধ ছেড়েছি, রমযানে কুরআন মজীদ শেষ করেছি, রমযানে বালেগ হয়েছি, রমযানে উত্তরাধিকার মনোনীত হয়েছি, রমযানে খিলাফত পেয়েছি এবং রমযানেই মৃত্যু বরণ করব। রমযান এলে তিনি খুব ভয় পেতেন এবং রমযান চলে গেলে তিনি নিশ্চিত হতেন, কিন্তু তিনি শাওয়াল মাসে ইন্তেকাল করেন।
তাঁর শাসনামলে যেসব সাহাবী ইন্তেকাল করেন তাঁরা হলেন, ইবনে উমর, আসমা বিনতে আবু বকর, আবু সাঈদ বিন মাআলা, আবু সাঈদ খুদরী, রাফে বিন খুদায়েজ, সালমা বিন আকওয়া, আরবাস বিন সারিয়া, জাবের বিন আব্দুল্লাহ, আব্দুল্লাহ বিন জাফর বিন আবু তালিব, সায়িব বিন ইয়াযিদ, উমরের গোলাম আসলাম, আবু ইদরীস আল খাওলানী, শুরাইহ্ কাযী, আবান বিন উসমান বিন আফফান, আশা শায়ের, এবং অলংকার শাস্ত্রের নক্ষত্র আউযুব বিন কারিয়া, খালিদ বিন ইয়াযিদ বিন মুআবিয়া, যাররা বিন জায়েশ, সিনান বিন সালামা বিন মুহবিক, সুয়াইদ বিন গাফলা, আবু ওয়ায়েল তারেক বিন শিহাব, মুহাম্মদ বিন হানাফীয়া, আব্দুল্লাহ বিন শাদ্দাদ বিন হাদ, আবু উবায়দা বিন আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ, আমর বিন হারীছ, আমর বিন সালামা, জরমী (রহ:)।
📄 ওয়ালীদ বিন আব্দুল মালিক
নাম ওয়ালীদ বিন আব্দুল মালিক আবুল আব্বাস। শা'বী বলেন, ওয়ালীদকে তার পিতামাতা অত্যন্ত আদর-যত্নে লালিত পালিত করার কারণে তিনি শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হন। রুহ বিন যানবাহ বলেন, আমি একদিন আব্দুল মালিকের নিকট গিয়ে তাকে অত্যন্ত চিন্তিত দেখে কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, কাকে উত্তরাধিকার মনোনীত করব এ চিন্তা আমাকে কাতর করে দিয়েছে। আমি ওয়ালীদের নাম প্রস্তাব করলে তিনি বললেন, সে তো অশিক্ষিত। আমাদের কথাগুলো শুনতে পেয়ে ওয়ালীদ বিজ্ঞ পণ্ডিতদের নিকট সেদিন থেকে লাগাতার ছয় মাস শিক্ষা অর্জন করেও কোনো জ্ঞান সঞ্চয় করতে পারেননি। আব্দুল মালিক বলতেন, এ বেচারা (ওয়ালীদ) খিলাফতের দণ্ড ধারণে অক্ষম।
আবুয যানাদ বলেন, ওয়ালীদের আরবী ভাষায় অনেক ভুল-ভ্রান্তি পরিলক্ষিত হয়। তিনি একবার মসজিদে নববীর মিম্বরে দাঁড়ায়ে মদীনাবাসীকে এভাবে সম্বোধন করেন- يَا أَهْلَ الْمَدِينَةِ আবু ইকরামা যাবী বলেন, একবার তিনি মিম্বরে দাঁড়িয়ে এভাবে আয়াত তিলাওয়াত করেন - يُاَلَيْتَهَا كَانَتِ الْقَاضِيَةُ সেদিন মিম্বারের পার্শ্বে উমর বিন আব্দুল আযীয এবং সুলায়মান বিন আব্দুল মালিকের মতো মনীষীরা বসে ছিলেন। অবশেষে সুলায়মান বললেন, দারুণ পড়েছেন।
ওয়ালীদ ছিলেন পরাক্রমশালী এবং উৎপীড়ক। আবু নায়ায়েম 'হালীয়া' গ্রন্থে ইবনে শওযবের বরাত দিয়ে লিখেছেন, উমর বিন আব্দুল আযীয বলেন, ওয়ালীদ সিরিয়ায়, হাজ্জাজ ইরাকে, উসমান বিন জাবারাহ হিজাযে এবং কুররা বিন শারীক মিসরে - আল্লাহর কসম, গোটা পৃথিবী অত্যাচারের কালো আবরণে ছেয়ে গেছে। ইবনে আবী হাতিম স্বরচিত তাফসীর গ্রন্থে ইবরাহীম যারআর বরাত দিয়ে লিখেছেন, ইবরাহীম বলেন, ওয়ালীদ আমাকে বললেন, খলীফাদের কোনো হিসাব নিকাশ হবে কি? আমি বললাম, আপনি না দাউদ (আ.)-কে বেশি মর্যাদাশীল? আল্লাহ তা'আলা দাউদ (আ.)-কে খিলাফত এবং নবুওয়াত উভয়টা দান করেছিলেন। কুরআন শরীফে ইরশাদ হচ্ছে- يَا دَاوُدُ إِنَّا جَعَلْنَكَ خَلِيفَةً এরপরও তিনি ভয় করেছেন।
ওয়ালীদ জিহাদ করেছেন। নিজ খিলাফত-কালে অনেক জটিল ফতোয়া সংকলন করায়েছেন। এতিমদের খতনা করাতেন এবং শিক্ষা দীক্ষার ব্যবস্থা করতেন। প্রতিবন্ধীদের জন্য সেবক এবং অন্ধদের জন্য পথপ্রদর্শক নিয়োগ করেছিলেন। তিনি মসজিদে নববী পুনর্নির্মাণ ও সম্প্রসারণ করেন। তিনি মুফতী এবং ভিক্ষুকদের ভাতা দিতেন। ইবনে আবী আইলা বলেন, আল্লাহ তা'আলা ওয়ালাদের প্রতি করুণা করুন। ওযালীদের শাসনামলে ভারতবর্ষ এবং স্পেন হস্তগত হয়। তিনি দামেশকের মসজিদের ভিত্তি প্রস্তুর স্থাপন করেন এবং বাইতুল মুকাদ্দাসের ভিক্ষুকদের চান্দীর পেয়ালা দান করেন।
আব্দুল মালিক ওয়ালীদকে ৮৬ হিজরীর শাওয়াল মাসে উত্তরাধিকার মনোনীত করেন। ৮৭ হিজরীতে তিনি দামেশকের জামে মসজিদের ভিত্তি প্রস্তুর স্থাপন করেন এবং মসজিদে নববী পুনর্নির্মাণ ও সম্প্রসারণের নির্দেশ দেন। এ বছর বীকন্দ, বোখারা, সরওয়ানিয়া, মাতুমুরা, কামীম এবং বাহিতুল ফুরসান প্রভৃতি শহর যুদ্ধের মাধ্যমে বিজিত হয়। একই বছর উমর বিন আব্দুল আযীয (সে সময় তিনি মদীনার শাসনকর্তা ছিলেন) হজ্জ করেন এবং কুরবানীর দিন ভুল করে আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের ফলে দারুণ মর্মাহত হন। ৮৮ হিজরীতে জরছুমা এবং তাওয়ানা, ৮৯ হিজরীতে জারীরা, মুতারাকা এবং মৌরাকা, ৯১ হিজরীতে নসফ, কাশ, শআরবান, মাদায়েন, বাহরে আযার বায়জান, ৯২ হিজরীতে গোটা স্পেন, আরমাবিল শহর, কাতারবুন, ৯৩ হিজরীতে দেবল, দাবাজা, বায়বা, খারেজম, সমরকন্দ, সাদ ৯৪ হিজরীতে কাবুল, ফারগানা, শাশ, সান্দারাহ, ৯৫ হিজরীতে মুকান, মদীনাতুল বাবা, ৯৬ হিজরীতে তাউ হস্তগত হয়। এ বছর জমাদিউল আখের মাসের মাঝামাঝিতে ওয়ালীদ ইন্তেকাল করেন।
যাহাবী বলেন, ওয়ালীদের যুগে জিহাদ অব্যাহত ছিল এবং হযরত উমর ফারুকের যুগের মতো আইনশাস্ত্রের প্রভূত উন্নতি হয়। উমর বিন আব্দুল আযীয (রহ.) বলেন, কবরে নামানোর সময় ওয়ালদিকে কাফনের মধ্য থেকে মাটিতে পা মারতে দেখেছি। ওয়ালীদ বলেন, আল্লাহ তা'আলা কুরআন শরীফে ধৃত সম্প্রদায়ের উল্লেখ না করলে অন্যায় করলে শাস্তি পেতে হয় তা আমার খেয়াল থাকতো না।
ওয়ালীদের শাসনামলে যেসব প্রসিদ্ধ ওলামা ইন্তেকাল করেছেন তাঁরা হলেন, উতবা বিন আব্দুস সালামা, মুকাদ্দাস বিন মাআদি করব, আব্দ বিন বশরুল মাযনী, আব্দুল্লাহ বিন আবী আওনী আবুল আলীয়া, জাবের বিন যায়েদ, আনাস বিন মালিক, সহল বিন সাদ, সায়েব বিন ইয়াযিদ, সায়েব ইবনে খালাত, খাবীব বিন আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের, বিলাল বিন আবী দারদা, সাইদ বিন মুসায়্যাব, আবু সালামা বিন আব্দুর রহমান, আবু বকর বিন আব্দুর রহমান, সাঈদ বিন যুবায়ের যাকে হাজ্জাজ শহীদ করেছে, ইবরাহীম নাখয়ী, মুতাররফ, ইবরাহীম বিন আব্দুর রহমান বিন আউফ, কবি উজাজ প্রমুখ।
📄 সুলায়মান বিন আব্দুল মালিক
সুলায়মান বিন আব্দুল মালিক আবু আইয়ুবকে বনু উমাইয়্যাদের মধ্যে সর্বোত্তম বাদশাহ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তার পিতা ওয়ালিদের পর তাকে উত্তরাধিকার মনোনীত করেন। তিনি ৯৬ হিজরীর জমাদিউল আখের মাসে ভ্রাতার পর মসনদে আরোহণ করেন। তিনি পিতা আব্দুল মালিক এবং আব্দুর রহমান বিন হুরায়রাহ থেকে হাদীস রেওয়ায়েত করেন এবং তার ছেলে আব্দুল ওয়াহেদ এবং যহরী হাদীস রেওয়ায়েত করেন।
তিনি সুমিষ্টভাষী, বাগ্মী, ন্যায়পরায়ণ এবং জিহাদের প্রতি অনুরাগী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ৬০ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি অনেক পুণ্যময় কাজ করেছিলেন। উমর বিন আব্দুল আযীযের মতো মহান নেতা ছিলেন তার মন্ত্রী যিনি সর্বদা তাকে সৎ উপদেশ দিতেন এবং কল্যাণকর কাজের দিকে আহবান করতেন। তিনি হাজ্জাজ কর্তৃক প্রশাসনের নিয়োগপ্রাপ্ত সকল কর্মকর্তাকে একসঙ্গে চাকরিচ্যুত করেন এবং ইরাকের জেল খানায় আটক সকলকে মুক্তি দেন। বনু উমাইয়্যার খলীফাগণ সবসময় শেষ ওয়াক্তে (বিলম্বে) নামায আদায় করতেন, উমর বিন আব্দুল আযীযের পরামর্শে তিনি আউয়াল ওয়াক্তে নামায পড়তে শুরু করেন। ইবনে সিরীন (রহ.) বলেন, পরম করুণাময় আল্লাহ তা'আলার নিকট আমি আশাবাদী তিনি সুলায়মানের প্রতি করুণা বর্ষণ করুন। তিনি তার খিলাফতকালে দুটি চমৎকার কাজ করেছেন। এক. আউয়াল ওয়াক্তে নামায পড়ার প্রবর্তন এবং দুই. উমর বিন আব্দুল আযীযকে খলীফা মনোনীত করে যাওয়া।
সুলায়মান বিন আব্দুল মালিক নাচ-গান নিষিদ্ধ করেন। তার খোরাক ছিল বেশি। কোনো এক ভোজসভায় সত্তরটি আনার, ছয় মাসের একটি ছাগল, ছয়টি মোরগ এবং চার কেজি কিশমিশ একাই খেয়ে ফেলেন। ইয়াহইয়া গাসসানী বলেন, একদা তিনি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের তারুণ্যদীপ্ত অবয়ব দর্শনে বললেন, মুহাম্মাদ (সা.) নবী ছিলেন, আবু বকর (রা.) সিদ্দীক (সত্যবাদী) ছিলেন, উমর (রা.) ফারুক (পৃথককারী) ছিলেন, উসমান (রা.) লজ্জাশীল, মুআবিয়া (রা.) বীর, ইয়াযিদ ধৈর্যশীল, আব্দুল মালিক রাজ নীতিবিধ, ওয়ালীদ অত্যাচারী এবং আমি নওজোয়ান বাদশাহ। তার এ বক্তব্যের এক মাসের মধ্যেই ৯৯ হিজরীর সফর মাসের দশ তারিখ জুমাআর দিন তিনি ইন্তেকাল করেন।
তার যুগে যুরযান, হাদীদ দুর্গ, সরদা, শাকা, তবরিসতান এবং সুফালিয়া শহর বিজিত হয়। আর যে সব ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন তারা হলেন- কায়েস বিন আবু হাযিম, মাহমুদ বিন লাবীদ, হাসান বিন হোসাইন বিন আলী, ইবনে আব্বাসের মুক্তদাস কারীব, আব্দুর রহমান বিন আসওয়াদ, নাখআ প্রমুখ।
আব্দুর রহমান বিন হাসসান কিনানী বলেন, সুলায়মান বিন আব্দুল মালিক যুদ্ধের ময়দানে ওয়াবেক নামক জনপদে পরলোক গমন করেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তিনি রাজা বিন হায়াকে জিজ্ঞেস করেন, আমার পর খিলাফতের তখতে কে আসীন হবেন? আমি কি আমার ছেলেকে উত্তরাধিকার মনোনীত করব? রাজা বললেন, আপনার ছেলে এখানে নেই। সুলায়মান বললেন, অন্য ছেলেকে করতে পারি? রাজা বললেন, তিনি বয়সে ছোট। সুলায়মান পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, তবে আপনার মতে সর্বোত্তম কে? রাজা বললেন, উমর বিন আব্দুল আযীযের চেয়ে সর্বোত্তম আর কেউ নেই। আপনি তাকেই পরবর্তী খলীফা মনোনীত করতে পারেন। সুলায়মান বললেন, আমার ভাই উমর বিন আব্দুল আযীযের খিলাফত মেনে নেবে না বলেই আমার ধারণা। রাজা বললেন, এর পদ্ধতি হল আপনি মোহর অঙ্কিত ওসীয়তনামা লিখে দিন যে, উমর বিন আব্দুল আযীযের পর ইয়াযিদ বিন আব্দুল মালিক উত্তরাধিকার মনোনীত হবেন। অতঃপর দেশবাসীকে ডেকে বলুন, এ অসীয়ত নামায় যার নাম লিপিবদ্ধ রয়েছে তার নামে বাইআত করুন। সুলায়মান এ অভিমতকে পছন্দ করে কাগজ, কলম ও কালি চেয়ে এক ওসীয়ত নামা প্রস্তুত করে রাজাকে তা দিয়ে বললেন, এ অসীয়ত নামায় যার নাম উল্লেখ রয়েছে তার ব্যাপারে এক্ষুণি বাইরে গিয়ে লোকদের নিকট বাইআত গ্রহণ করুন। রাজা বাইরে এসে লোকদের উদ্দেশ্যে বললেন, আমিরুল মুমিনীনের নির্দেশে আমি এর মধ্যে উল্লিখিত ব্যক্তির নামে আপনাদের নিকট বাইআত নিচ্ছি। লোকেরা বলল, এর মধ্যে কার নাম লিপিবদ্ধ রয়েছে? রাজা বললেন, এতে মোহর লাগানো রয়েছে। খলীফার মৃত্যুর পর তার নাম জানা যাবে। লোকেরা বলল, আমরা এভাবে বাইআত করব না। রাজা বিষয়টি খলীফার কানে দিলে খলীফা বললেন, জল্লাদ এবং পুলিশদের সাথে নিয়ে জনতাকে একত্রিত করে বাইআত নিন। যারা প্রত্যাখ্যান করবে তাদের গর্দান উড়িয়ে দিবেন। অবশেষে এভাবেই বাইআতের কাজ সম্পন্ন হয়।
রাজা বলেন, বাইআত গ্রহণের পর ফেরার পথে হটাৎ হিশামের সাথে আমার সাক্ষাত হয়। তিনি বললেন, রাজা! আমার ব্যাপারে আমিরুল মুমিনীনের সিদ্ধান্ত কি? যদি বঞ্চিত হই তবে নিজের জন্য ব্যবস্থা করবো। আমি বললাম, আমিরুল মুমিনীন বিষয়টি গোপন রেখেছেন, আমি কিভাবে বলবো। অতঃপর উমর বিন আব্দুল আযীযের সাথে দেখা হলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, রাজা! সুলায়মানের ক্ষেত্রে আমার সংশয় রয়েছে। আমার মন বলছে, তিনি যেন আমাকে খলীফা মনোনীত না করেন। আমার মধ্যে খিলাফতের দক্ষতা ও যোগ্যতা নেই। অতএব যদি আপনি এ ব্যাপারে অবগত থাকেন তাহলে বলুন আমি যে কোন পদ্ধতিতে চেষ্টার মাধ্যমে এ আপদ মাথা থেকে নামিয়ে দিব। আমি হিশামের মতো তাকেও একই জবাব দিলাম।
সুলায়মানের ইন্তেকালের পর অসীয়ত নামায় উমর বিন আব্দুল আযীযের নাম দেখে আব্দুল মালিকের সন্তানদের চেহারা বিবর্ণ ও ফ্যাকাশে হয়ে যায়। কিন্তু যখন তারা পরবর্তী খলীফা হিসেবে ইয়াযিদ বিন আব্দুল মালিকের নাম শুনলেন তখন তারা আস্বস্ত হন এবং উমর বিন আব্দুল আযীযের নিকট এসে খিলাফতের দায়িত্ব তার উপর অর্পণ করেন। আর উমর বিন আব্দুল আযীয় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে সেখানেই বসে পড়লেন। সে মুহূর্তে দাঁড়ানোর মতো কোনো শক্তি তার ছিল না। অবশেষে লোকেরা তার বাহু ধরে মিম্বরে উঠিয়ে দিলেন। তিনি সেখানেও অনেকক্ষণ নীরবে বসে রইলেন। রাজা বললেন, কেন আপনারা দাঁড়িয়ে আমিরুল মুমিনীনের বাইআত গ্রহণ করছেন না। অতঃপর তারা বাইআত করলেন এবং রাজা উমর বিন আব্দুল আযীয়ের হাত ধরে লোকদের প্রতি বাড়িয়ে দিলেন। এরপর তিনি দাঁড়িয়ে হামদ এবং সানার পর বললেন, আমি এ বিষয়ের মিমাংসাকারী নই: বরং বহনকারী। আমি কোনো বিষয়ের প্রবর্তক নই; বরং পূর্ববর্তীতের অনুগামী।
অন্যান্য জনপদের লোকেরাও যদি আপনাদের মতো আমার আনুগত্য মেনে নেয় তবেই আমি আপনাদের খলীফা হবো, অন্যথায় নয়। এ বলে তিনি মিম্বর থেকে অবতরণ করলে সামরিক আস্তাবল থেকে চমৎকার একটি ঘোড়া নিয়ে আসা হলো তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এটা কি? লোকেরা বলল, এটা খলীফার বাহন, রাজকীয় অশ্ব। তিনি বললেন, এটা আমার প্রয়োজন নেই। আমার ঘোড়াই যথেষ্ট। অবশেষে তার নিজস্ব ঘোড়া নিয়ে আসা হলো এবং এতে চড়ে তিনি বাড়ি ফিরলেন। অতঃপর তিনি কালির দোয়াত নিয়ে মুসলিম সাম্রাজ্যের সকল শাসনকর্তার নিকট স্বহস্তে একটি ফরমান লিখলেন। রাজা বলেন, আমার স্মরণ রয়েছে তিনি কোথাও নিজের দুর্বলতা ও অক্ষমতার কথা লিখেননি। তিনি যখন ফরমান লিখছিলেন তখন আমি দেখলাম তার কলমের অগ্রভাগ দিয়ে খিলাফতের শাসনকার্য পরিচালনা দক্ষতা ও বিজ্ঞাত প্রকাশ পাচ্ছে।
বর্ণিত রয়েছে, একবার মারওয়ান বিন আব্দুল মালিক এবং সুলায়মান বিন আব্দুল মালিকের মধ্যে খিলাফত নিয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে সুলায়মান তাকে গালি দিলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েন, কিন্তু উমর বিন আব্দুল আযীয তার মুখে হাত রেখে বললেন, তিনি ভালো মানুষ, খলীফা, আপনার বড় ভাই, আপনি চুপ করুন। মারওয়ান চুপ করলেন, তবে উমর বিন আব্দুল আযীযকে বললেন, আপনি আমাকে হত্যা করে ফেললেন, আমার শরীরে আগুন ধরে গেছে। সে রাতেই মারওয়ান ইন্তেকাল করেন।