📄 ইয়াযিদ বিন মুআবিয়া
ইয়াযিদ বিন মুআবিয়া আবু খালিদ আল উমুয়ী ২৫ অথবা ২৬ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। স্থূল শরীরের অধিকারী ইয়াযিদের গোটা শরীরে পশম ছিল। তার মা মাইসুন বিনতে বহদে কালবীয়া। তিনি তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, আর তার রেওয়ায়েতগুলো তার ছেলে খালিদ এবং আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান বর্ণনা করেছেন। তিনি আগে থেকেই উত্তরাধিকার নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং লোকদের বাধ্য করে বাইআত গ্রহণ করেছেন।
হাসান বসরী (রহ:) বলেন, ইয়াযিদ আগেই উত্তরাধিকার মনোনীত হওয়ায় কিয়ামত পর্যন্ত এ প্রথা অব্যাহত থাকবে। অন্যথায় পরামর্শ সাপেক্ষে মুসলমানগণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেই থাকতেন।
ইবনে সিরীন (রহ:) বলেন, আমর বিন হাযাম মুআবিয়ার নিকট গিয়ে বললেন, আমি আপনাকে আল্লাহর ভয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। আপনি উম্মতে মুহাম্মাদীয়ার মধ্য থেকে কাকে খলীফা মনোনীত করতে চাইছেন। হযরত মুআবিয়া (রা.) বললেন, তোমার উপদেশে আমি কৃতজ্ঞ। বর্তমানে অনেকের অনেক ছেলে রয়েছে, তাদের মধ্যে আমার ছেলে বেশি হকদার। এজন্য তাকে উত্তরাধিকার বানাতে চাইছি।
আতীয়া বিন কায়েস বলেন, একদিন হযরত মুআবিয়া (রা.) খুতবার সময় বলেন, হে আল্লাহ! যদি ইয়াযিদকে তার মর্যাদার কারণে উত্তরাধিকার মনোনীত করি তবে তুমি তাকে সাহায্য ও রক্ষা করো। আর যদি দয়ার্দ্র পিতা হিসেবে করে থাকি এবং যদি সে খিলাফতের যোগ্য না হয় তাহলে সে যেন মসনদে আরোহণের পূর্বেই মৃত্যু বরণ করে।
হযরত আমীর মুআবিয়ার ইন্তেকালের পর সিরিয়াবাসী ইয়াযিদের নিকট বাইআত গ্রহণ করে। অতঃপর তিনি মদীনাবাসীর বাইআত গ্রহণের ফরমান জারি করলে হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) এবং হযরত ইবনে যুবায়ের (রা.) তা প্রত্যাখ্যান করে সে রাতেই তাঁরা মক্কা শরীফে গমন করেন। হযরত ইবনে যুবায়ের (রা.) ইয়াযদের বাইয়াত গ্রহণ করেননি এবং নিজের জন্যও বাইআত করাতে সম্মত ছিলেন না। কিন্তু হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) কে কুফাবাসী হযরত মুআবিয়ার আমল থেকেই বলে রেখেছিল এবং তারা ইমাম হোসাইন (রা.)-এর বাইআত গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিল। তবে তিনি কোনো সময় রাজী হননি। যখন ইয়াযিদ বাইআত করায়ে নিল তখন প্রথমে তিনি স্বাভাবিক অবস্থায় থাকার চেষ্টা করেন। অতঃপর কুফা যাওয়ার ইচ্ছা করেন, হযরত ইবনে যুবায়ের (রা.) তাঁকে এ পরামর্শই দেন, কিন্তু ইবনে আব্বাস (রা.) তাঁকে নিষেধ করেন। ইবনে উমর (রা.) বের হতে নিষেধ করে বললেন, আল্লাহ তা'আলা দুনিয়া এবং আখেরাত দু-এর মধ্যে যে কোনো একটি গ্রহণের জন্য রাসুলুল্লাহকে অনুমতি দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি আখেরাতকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। আপনি তো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কলিজা। আপনি আখেরাতকে কবুল করুন, দুনিয়া আপনার জন্য নয়। ইমাম হোসাইন (রা.) নিজ সিদ্ধান্তে অটল থাকায় ইবনে উমর (রা.) কেঁদে ফেলেন, গলায় জড়িয়ে ধরে অবশেষে বিদায় দেন।
হযরত ইবনে উমর (রা.) বলেন, হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) আমার নিষেধ উপেক্ষা করে যাত্রা করলেন। ফলে তাঁর পিতা এবং ভ্রাতার মতোই পরীক্ষিত কুফাবাসীর নিকট তাঁকে একই পরিণাম ভোগ করতে হয়।
জাবের বিন আব্দুল্লাহ, আবু সাঈদ এবং আবু ওয়াকেদী আল লাইছীও ইমাম হোসাইনকে নিষেধ করেন, কিন্তু তিনি নিজ সিদ্ধান্তে অটল থেকে ইরাক গমনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। যাত্রার প্রাক্কালে ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন, আমার মন বলছে, বিবি বাচ্চাদের সামনে হযরত উসমান গনী (রা.)-এর মতো আপনাকেও শহীদ করে দেবে। অতঃপর তিনি নিজেই কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, আপনি ইবনে যুবায়েরের চক্ষুযুগল শীতল করছেন। এরপর তিনি ইবনে যুবায়ের (রা.) কে বললেন, তুমি যা চাইছ তাই হতে চলেছে। ইমাম হোসাইন (রা.) যাত্রা করছেন। আর তুমিও হিজায ছেড়ে যাত্রা করছ। অতঃপর তিনি এ কবিতাটি আবৃত্তি করলেন, "হে উড়ন্ত প্রাণী! শূন্য চারণভূমির যেখানে খুশি চরবে যেখানে খুশি ডিম দিবে।"
ইরাকবাসীর দূত এবং পত্রসম্বলিত আহ্বানের প্রেক্ষিতে ইমাম হোসাইন (রা.) যিলহজ্জ মাসের দশ তারিখে পরিবার পরিজন যাঁদের মধ্যে নারী এবং শিশু ছিল মক্কা থেকে ইরাক গমন করেন। এদিকে ইয়াযিদ ইরাক শাসনকর্তা উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদকে ইমাম হোসাইনের সাথে যুদ্ধ করার লিখিত আদেশ দেন এবং আমর বিন সাদ বিন আবী ওয়াক্কাসের নেতৃত্বে ইমাম হোসাইনের গতিপথ রুদ্ধ করতে চার হাজার সৈন্য প্রেরণ করেন। কুফাবাসী নিজেদের পুরাতন অভ্যাস অনুযায়ী হযরত আলী (রা.) প্রমুখদের সাথে যেমন আচরণ করেছিল, তদ্রুপ ইমাম হোসাইন (রা.) কে একা ফেলে তারা চলে যায়। ইয়াযিদ বাহিনী বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হলে ইমাম হোসাইন (রা.) সন্ধি, প্রত্যাবর্তন অথবা ইয়াযিদের নিকট গমন এ তিনটি প্রস্তাব পেশ করেন। অথচ তারা সবগুলোই পত্যাখ্যান করে এবং ইমাম হোসাইন (রা.) কে শহীদ করে তাঁর মস্তক মোবারক এক ট্রেতে করে ইবনে যিয়াদের সামনে পেশ করা হয়। আল্লাহ তা'আলা ইমাম হোসাইন (রা.)-এর হত্যাকারী ইবনে যিয়াদ এবং ইয়াযিদের প্রতি অভিশাপ বর্ষন করুন।
ইমাম হোসাইন (রা.) ইয়াওমে আশুরায় শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর শহীদ হওয়ার ঘটনাটি অনেক দীর্ঘ এবং অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তাঁর সাথে পরিবারের ষোলোজন শহীদ হন। তিনি শহীদ হওয়ার মুহূর্তে সাতদিন পর্যন্ত দুনিয়া অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। সূর্যের রং বিকৃত হয়ে যায়। তারকারাজি ভেঙে ভেঙে নিচে পতিত হয়, সেদিন সূর্যগ্রহণ লেগেছিল এবং ছয় মাস পর্যন্ত আকাশের এক কোণে সর্বদা একটি লাল রেখা উদ্ভাসিত ছিল, যা এ মর্মান্তিক ঘটনার পূর্বে আর কোনোদিন দেখা যায়নি।
এ রেওয়ায়েতটিও বর্ণিত রয়েছে যে, সেদিন বাইতুল মুকাদ্দাসের যে পাথর উঠানো হয়েছে তার নিচ দিয়েই রক্ত প্রবাহিত হয়েছে। বিরোধী শিবিরে সেদিনের হর্ষ কেন জানি বিষাদে পরিণত হয়েছিল তাদের যবেহকৃত উটের গোশত আগুনের মতো জ্বলছিল। পাকানোর সময় তা কয়লার মতো কালো হয়ে যায় এবং এর স্বাদ আলকাম বৃক্ষের মতো তিক্ত হয়।
জনৈক ব্যক্তি হযরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শানে কটূক্তি করায় আল্লাহ তা'আলা আকাশ থেকে তারা নিক্ষেপ করে তার চক্ষুদ্বয় নষ্ট করে দেন। ছালাবী আব্দুল মালিক বিন উমায়ের আল লাইছী থেকে বর্ণনা করেন, আমি এ প্রাসাদে (কুফার প্রশাসনিক ভবনে) হযরত হোসাইন বিন আলী (রা.)-এর ছিন্ন মস্তক উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের সামনে ঢালের উপর প্রতিস্থাপিত অবস্থায় দেখেছি। এর কিছুদিন পর এ প্রসাদেই উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের কর্তিত মাথা মুখতার বিন আবু উবায়েদের সামনে দেখেছি। অতঃপর মুখতার বিন আবু উবায়েদের মাথা মুসআব বিন যুবায়েরের সামনে, আবার এর কিছুদিন পর মুসআব বিন যুবায়েরের বিচ্ছিন্ন মস্তক আব্দুল মালিকের সামনে রাখা অবস্থায় দেখেছি। আমি এ ঘটনা আব্দুল মালিকের নিকট বিবৃত করলে তিনি এ প্রাসাদকে অমঙ্গলজনক ভেবে তা বর্জন করেন।
ইমাম তিরমিযী (রা.) সালামা থেকে রেওয়ায়েত করেন, আমি হযরত উম্মে সালমা (রা.)-এর নিকট গিয়ে তাঁকে কাঁদতে দেখে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, আমি স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মস্তক এবং দাড়ি ধুলায় ধূসরিত দেখে আরয করলাম, আমি আল্লাহর রসূলের একি অবস্থায় দেখছি? তিনি বললেন, আমি এ মুহূর্তে শহীদ হোসাইনকে দেখে ফিরছি।
বায়হাকী 'দালায়েল' গ্রন্থে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে দুপুরের সময় স্বপ্নে দেখলাম, তিনি ধুলাময় অবস্থায় হেঁটে চলছেন। তাঁর হাতে এক বোতল রক্ত। আমি আরয করলাম, আমার পিতা মাতা আপনার জন্য কুরবান। ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনার হাতে এটা কি? তিলি বললেন, এগুলো হাসাইন এবং তাঁর সাথীদের রক্ত। আমি আজ সারা দিন এগুলো সঞ্চয় করেছি। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, সে দিনটি ইমাম হোসাইনের শাহাদাতের দিন ছিল।
আবু নুয়াইম 'দালায়েল' গ্রন্থে উম্মে সালমা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, আমি হোসাইনের মর্মান্তিক ঘটনার জন্য প্রাণিকুলের বিলাপ শুনেছি। ছাআলাবা স্বরচিত 'আমালী' গ্রন্থে লিখেছেন, জনাব কালবী বলেছেন, আমি কারবালার প্রান্তে আরবের এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি পশুদের বিলাপ শুনছেন? তিনি বললেন, তুমি এ ব্যাপারে যাকেই জিজ্ঞেস করবে তিনিই বলবেন, শুনেছি। আমি বললাম, আপনি স্বকর্ণে গোচর করেছেন কি? তিনি বললেন, আমি এ কবিতা শুনেছি, (অর্থ) "রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর চেহারার উপর হস্ত সঞ্চালন করেছেন। তাঁর গণ্ডদেশ দীপ্তি ছড়াত। তাঁর পিতা-মাতা কুরাইশদের অভিজাত গোত্রের সন্তান। তাঁর দাদা সকল দাদা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতম।"
ইবনে যিয়াদ হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) সহ তাঁর সাথীদের শহীদ করে তাদের ছিন্ন মস্তকগুলো ইয়াযিদের নিকট পাঠিয়ে দেয়। ইয়াযিদ প্রাথমিক অবস্থায় এ মর্মান্তি ঘটনায় আনন্দিত হন, কিন্তু মুসলমানগণ তার প্রতি অসন্তুষ্ট এবং কাজকে ঘৃণ্য বলে অভিহিত করায় তিনি অনুতপ্ত হন।
আবু ইয়ালা 'মুসনাদ' গ্রন্থে দুর্বল সূত্রে আবু উবায়দের বরাত দিয়ে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আমার উম্মত সর্বদা ইনসাফের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। কিন্তু বনূ উমাইয়্যার ইয়াযিদ নামক এক ব্যক্তি ইনসাফের পথে বাধা সৃষ্টি করবে।
রুয়ানী 'মুসনাদ' গ্রন্থে আবু দ্দারদাহ থেকে বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যে প্রথম আমার সুন্নতের মধ্যে পরিবর্তন করবে সে বন্ উমাইয়্যার ইয়াযিদ।
নওফেল বিন আবুল ফারাত বলেন, একদা আমি খলীফা উমর বিন আব্দুল আযীযের নিকট বসেছিলাম। প্রসঙ্গক্রমে ইয়াযিদের বিষয় এসে গেলে জনৈক ব্যক্তি আমিরুল মুমেনীন ইয়াযিদ বিন মুআবিয়া বলে তার নাম নিলে খলীফা উমর বিন আব্দুল আযীয (রহ.) বললেন, তুমি একে আমিরুল মুমেনীন বলছো? এ বলে তিনি এ অপরাধের জন্য তাকে বিশটি বেত্রাঘাতের আদেশ দিলেন।
৬৩ হিজরীতে মদীনাবাসীর বিদ্রোহের সংবাদ অবগত হয়ে ইয়াযিদ বিশাল সৈন্য বাহিনী পাঠালেন। রসূলের স্মৃতি বিজড়িত পবিত্র মদীনা নগরী ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত করে ইয়াযিদ মক্কা শরীফে ইবনে যুবায়েরকে অবরুদ্ধ করার জন্য সেনাবাহিনীপারি পরবর্তী নিদের্শ দেন। হযরত হাসান বসরী (রা.) ইয়াযিদ বাহিনীর বর্বরতার বিবরণ দিতে গিয়ে বলেছেন, সেদিন ইয়াযিদ বাহিনীর নির্যাতন থেকে মদীনাবাসীর একজনও পরিত্রাণ পায়নি। সহস্রাধিক সাহাবায়ে কেরাম শহীদ হন। মদীনা শরীফ লুণ্ঠিত হয়। হাজার হাজার তরুণী ধর্ষিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, যে মদীনাবাসীকে ভতিসন্ত্রস্ত করবে আল্লাহ তা'আলা তাকে প্রকম্পিত করে রাখবেন এবং আল্লাহ তা'আলা, ফেরেশতা ও লোকেরা তাকে অভিশাপ দিবে। (মুসলিম)
ইয়াযিদ পাপাচারে নিমগ্ন হয়ে পড়ায় মদীনাবাসী তার বাইআত প্রত্যাখ্যান করেছিল। ওয়াকেদী আব্দুল্লাহ বিন হানযালা আল গাসীল থেকে রেওয়ায়েত করেন, আল্লাহর কসম! যতক্ষণ পর্যন্ত আমি ইয়াযিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করব ততক্ষণ পর্যন্ত আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ হতেই থাকবে (রা.) এ আমার বিশ্বাস। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সে সময় লোকেরা (শিয়ারা-অনুবাদক) মা, মেয়ে এবং বোনদের বিবাহ করত এবং তারা প্রকাশ্যে শরাব পান করত, আর নামায ছেড়ে দিয়েছিল।
যাহাবী (রহ.) বলেন, মদীনাবাসীর সাথে এহেন আচরণ, মদ পান ইত্যাদি মন্দ কাজের সাথে জড়িত থাকার কারণে ইয়াযিদের প্রতি জনগণ ক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। এদিকে আল্লাহ তা'আলা তার জীবনকে দীর্ঘ করে দিলেন। তিনি ইবনে যুবায়ের (রা.) এবং মক্কাবাসীর সাথে যুদ্ধ করার জন্য সেনাবাহিনী পাঠালেন। পথিমধ্যে সেনাপতি মারা গেলে তদস্থলে আরেকজনকে নিয়োগ দেয়া হয়। ইয়াযিদ বাহিনীর সাথে ইবনে যুবায়েরের যুদ্ধ হয়। তারা ইবনে যুবায়েরকে অবরোধ করে এবং অবরোধ চলাকালীন সময়ে ইয়াযিদ বাহিনী মিনযানিক থেকে আগুন ও পাথর নিক্ষেপ করে। ফলে আগুনের গোলায় কাবা শরীফের দেয়াল, ছাদ এবং হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর নিকট ফিদয়া হিসেবে প্রেরিত সেই দুম্বার ঐতিহাসিক শিং যা আজ পর্যন্ত কাবার ছাদে লটকানো আছে সব ভস্মীভূত হয়ে যায়। ৬৪ হিজরীর সফর মাসে এ ঘটনা সংঘটিত হয়। লড়াইরত অবস্থায় তার মৃত্যু সংবাদ মক্কায় পৌছুলে আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের (রা.) ঘোষণা দিয়ে বললেন, হে সিরিয়াবাসী, তোমাদের পথভ্রষ্টকারী সেই লোকটির মৃত্যু হয়েছে। এ কথা শুনে সৈন্যগণ প্রস্থান করে এবং লোকেরা তাদের পশ্চাদ্বাবন করে। অতঃপর ইবনে যুবায়ের (রা.) লোকদের নিকট বাইআত গ্রহণ করেন এবং খলীফা বলে নিজেকে ঘোষণা দেন। ওদিকে সিরিয়াবাসী মুআবিয়া বিন ইয়াযিদের আসক্তি ছিল। তার অনেক কবিতার চারণ মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ইবনে আসাকির ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেন, তোমরা আবু বকর এবং উমরের নাম ঠিক রেখেছ। উসমান বিন আফফান (রা.) শহীদ হয়েছে। মুআবিয়া তার ছেলে ইয়াযিদ, সাফাহ, সালাম, মানসুর, জাবের এবং মাহদী হলেন বাদশাহ। অভিশপ্ত শাসনকর্তা সকলেই কা'ব বিন লুয়াই-এর বংশধর। যাহাবী বলেন, ইবনে উমরের এ বর্ণনাটি কয়েক পদ্ধতিতে বর্ণিত। কিন্তু কেউ একে মারফু বলেননি।
ওয়াকেদী আবু জাফর আল বাকের থেকে বর্ণনা করেন, ইয়াযিদ সর্বপ্রথম কাবা শরীফকে রেশমী গেলাফে আচ্ছাদন করেন। কারবালা এবং মদীনার হত্যাযজ্ঞ ছাড়া ইয়াযিদের আমলে যেসব ওলামা ইন্তেকাল করেছেন, তাঁরা হলেন, উন্মুল মুমেনীন উম্মে সালাম, খালিদ বিন আরফাতা, জরহদ আল আসলামী, জাবের বিন আতীক, বুরায়দা বিন হাসীব, মাসলামা বিন মুখাল্লাদ, আলকামা বিন কায়েস, মাসরুক, মাসুর বিন মুখরিমা প্রমুখ। আর মদীনার হত্যাযজ্ঞে তিন শত কুরাইশ মুহাজির এবং আনসার শাহাদাত বরণ করেন।
📄 মুআবিয়া বিন ইয়াযিদ
মুআবিয়া বিন ইয়াযিদ বিন মুআবিয়া আবু আব্দুর রহমান, আবু ইয়াযিদ আবু ইয়লালা পিতার শাসনামলে উত্তরাধিকার মনোনীত হন। ৬৪ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসের ১৬ তারিখ শনিবার রাতে খিলাফতের তখতে আরোহণ করেন। তিনি যুবক ছিলেন। এ অসুখেই তিনি ইন্তেকাল করেন। তিনি কোথাও সৈন্য বাহিনী পরিচালনা করেননি এবং কোনো শাসনকার্যও পরিচালনা করেননি এবং লোকদের নামাযও পড়াননি। তার খিলাফত চল্লিশ দিন স্থায়ী হয়েছিল। কারো মতে দু'সপ্তাহ, আবার কারো মতে তিন মাস। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল একুশ বছর। কারো মতে বিশ বছর। মৃত্যুর সময় তাকে পরবর্তী খলীফা মনোনীত করে যাওয়ার কথা বলা হলে তিনি বলেন, আমি নিজেই যখন খিলাফতের স্বাদ গ্রহণ করতে পারলাম না তখন তিক্ততা কেন ছড়াব।
📄 আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের (রা.)
আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের বিন আওয়াম বিন খুয়াইলিদ বিন আসাদ বিন আব্দুল উজ্জা বিন কুসসী আল-আসাদীর উপনাম আবু বকর এবং আবু খুবায়ের। তিনি নিজে সাহাবী এবং সাহাবীর পুত্র। তাঁর পিতা জান্নাতুর সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজনের মধ্যে অন্যতম। মা আসমা বিনতে আবু বকর সিদ্দীক (রা.) তার দাদী সুফিয়া রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ফুফু। তিনি মদীনা শরীফে হিজরতের বিশ মাস পর জন্ম গ্রহণ করেন। কেউ বলেন, হিজরতের বছর তাঁর জন্ম। হিজরতের পর মুহাজিরদের প্রথম সন্তান তিনি। তাঁর জন্মে মুসলমানগণ আনন্দিত হয়েছিলেন। কারণ ইহুদীরা প্রচার করেছিল তারা যাদু করে মুসলমানদের সন্তান হওয়া বন্দ করে দিয়েছে।
জন্মের পর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর খিদমতে তাঁকে পেশ করা হলে হুযুর (সা.) একটি খেজুর চিবিয়ে তাঁকে চাটায়ে দেন এবং হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়েরের নানা আবু বকর সিদ্দীকের নামে নাম ও উপনাম রাখলেন। তিনি বেশি বেশি রোযা রাখতেন। দীর্ঘ কেরাত দিয়ে নামায পড়তেন। তিনি ছিলেন দয়ার্দ্র, অসীম সাহসী ও যুগশ্রেষ্ঠ বীর। তিনি কোনো কোনো রাতকে নামাযের মধ্যে দাঁড়িয়েই শেষ করে দিতেন, রুকুর মধ্যেই কোনো রাত সকাল হয়ে যেত, আবার কোনো রাত তিনি সেজদায় কাটিয়ে দিতেন। তিনি ৩৩টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাঁর নিকট থেকে যাঁরা হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাঁরা হলেন, তাঁর ভাই উরওয়া, ইবনে আবী মালীকা, আব্বাস বিন সহল, সাবিত আল-বানানী, আত, উবায়দা আল-সালমানী প্রমুখ।
তিনি ইয়াযিদ বিন মুআবিয়ার বাইআত প্রত্যাখ্যান করে মক্কায় গমনকরত: নিকে কারো বাইআত গ্রহণ করেননি এবং নিজের জন্যও অন্যের নিকট থেকেও বাইআত নেননি। এজন্য ইয়াযিদ তাঁর প্রতি রুষ্ট ছিলেন। ইয়াযিদের মৃত্যুতে হিজ যেবাসী, ইয়ামানবাসী, ইরাকবাসী, খুরাসানবাসী তাঁর নিকট বাইআত গ্রহণ করে। তিনি কাবা শরীফ পুনর্নির্মাণ করেন। হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর যুগে কাবা শরীফ যেমন ছিল, তেমনিভাবে তিনি কাবা শরীফের দুটি দরজা নির্মাণ করেন। তিনি তাঁর খালা আয়েশা সিদ্দীকা (রা.)-এর রেওয়ায়েত অনুযায়ী জানাযায় যে, "রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইচ্ছা ছিল আরো ছয় গজ জায়গা কাবা শরীফরে অন্তর্ভুক্ত করা।" এজন্য তিনি তাই করেন।
মিসর এবং সিরিয়াবাসী ইয়াযিদের পর তদীয় ছেলে মুআবিয়ার বাইআত গ্রহণ করে। মুআবিয়ার পর তারা আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়েরের বাইআত গ্রহণ করে। এতে মারওয়ান বিন হাকাম বিদ্রোহ করে মিসর ও সিরিয়া গমন করে। তার মৃত্যু পর্যন্ত অর্থাৎ, ৬৫ হিজরী অবধি মিসর ও সিরিয়া তাঁর অধীনেই ছিল। তার শাসনকালে মারওয়ান তার পুত্র আঃ মালিককে উত্তরাধিকার মনোনীত করেন।
যাহাবী বলেন, মারওয়ান খলীফাদের অন্তর্ভুক্ত নন। কারণ তিনি আব্দুল্লাহ বিন যুবায়েরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। এ দিক থেকে তিনি বিদ্রোহী। তার ছেলে আব্দুল মালিককে উত্তরাধিকার মনোনীত করাও সঠিক ছিল না। তবে আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়েরকে শহীদ করার পর তার খিলাফত সহীহ হয়েছে।
সে সময় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা.) মক্কায় খিলাফতের মসনদে সমাসীন। আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান ইবনে যুবায়েরকে হত্যার জন্য চল্লিশ হাজ এর সৈন্য নিয়ে হাজ্জাজকে পাঠালেন। হাজ্জাজ এসে এক মাস মক্কা শরীফ অবরোধ করে রাখেন এবং শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মিনযানিক (কামান) স্থাপন করেন এবং তাঁকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে ফেলেন। ইবনে যুবায়েরের সহচরবৃন্দ তাকে ছেড়ে দুশমনের শিবিরে গিয়ে যোগ দেয়ায় তিনি মর্মাহত হন। কিছুদিন পর হাজ্জাজ বিজয় অর্জন করেন এবং ৭৩ হিজরীর জমাদিউল আউয়াল মাসের সতেরো তারিখ সোমবারে আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের (রা.) কে শূলে চড়ানো হয়।
মুহাম্মদ বিন যায়েদ বিন আব্দুল্লাহ বিন উমর বলেন, হাজ্জাজ মিনযানিক (কামান) স্থাপনের সময় আমি আবু কুবায়েস পাহাড় থেকে দেখলাম, আগুনের এক বিশাল লেলিহান শিখা আকাশ থেকে পড়ে মিনযানিকের নিকটবর্তী পঁচিশজন সৈন্য নিহত হয়।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা.) অভিজাত কুরাইশ বংশীয় ছিলেন এবং তাঁর অনেক ঘটনা ও জনশ্রুতি জনতার মুখে মুখে প্রসিদ্ধ।
আবু ইয়ালা 'মুসনাদ' গ্রন্থে ইবনে যুবায়ের (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে কিছু রক্ত দিলেন এবং তা মানুষের দৃষ্টির বাইরে ফেলে আসতে বললেন। আমি অন্তরালে গিয়ে তা পান করে ফেললাম। আমি ফিরে এলে নবীজী (সা.) বললেন, তুমি রক্তগুলো কি করলে? আমি বললাম, আমি সেগুলো এমন এক স্থানে গোপন করে ফেলেছি, যা কেউ দেখতে পাবে না। তিনি বললেন, মনে হয় তুমি তা পান করেছ। আমি হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলে তিনি বললেন, তোমার থেকে লোকেরা এবং লোকদের থেকে তুমি কষ্ট পাবে। কথিত আছে, ইবনে যুবায়েরের এ শক্তি সামর্থ্যই ছিল সেই রক্তের অদৃশ্য প্রতিক্রিয়া।
নাওফুল বাকালী বলেন, আসমানী কিতাবে আমি দেখেছি সেখানে লিখা রয়েছে, ইবনে যুবায়ের হলেন فارس للخلفاء তথা খলীফাদের বাহন।
আমর বিন দিনার বলেন, আমি তার মতো অত্যন্ত যত্নের সাথে নামায পড়তে আর কাউকে দেখিনি। মিনযানিক থেকে গোলা বর্ষণের মুহূর্তেও তিনি হারাম শরীফে নামায পড়ছিলেন। সে সময় তার কাপড়ে আগুন লেগে গিয়েছিল, কিন্তু সেদিকে তাঁর মোটেও ভ্রুক্ষেপ ছিল না।
মুজাহিদ বলেন, তিনি যেভাবে ইবাদত করেন, তাঁর স্থানে অন্য কেউ হলে বিরক্ত হয়ে যেতো। একবার কাবা শরীফ বন্যা প্লাবিত হয়ে পড়লে তিনি সাঁতরিয়ে তাওয়াফ করেন।
উসমান বিন তালহা বলেন, তিনটি বিষয়ে ইবনে যুবায়েরের সমকক্ষ কেউ নেই। এক. বীরত্ব ও সহসিকতা। দুই. ইবাদতবন্দেগী এবং তিন, বাগ্মিতা ও বাকপটুতা। তিনি এমন উচ্চ কণ্ঠের অধিকারী যে, খুতবা প্রদানের সময় তার কণ্ঠ পাহাড়ে ধাক্কা লাগত।
উরওয়া বলেন, নাবাগা জাআদী আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়েরের শানে যে কবিতা রচনা করেছেন তার অর্থ হলো, "তিনি শাসনকর্তা হয়ে আবু বকর (রা.), উমর (রা.) এবং উসমান (রা.)-এর মতো দুস্থের সেবা করবেন। সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিমিরের মাঝে আরো প্রদীপ জ্বালাবেন।"
হিশাম বিন উরওয়া এবং খুবায়েব বলেন, তিনিই সর্বপ্রথম কাবা শরীফকে রেশমী চাদরে আচ্ছাদন করেন। এর পূর্বে কাবা ঘর চট এবং চামড়া দ্বারা ঢাকা থাকতো।
আমর বিন কায়েস বলেন, ইবনে যুবায়েরের বিভিন্ন ভাষাভাষীর এক'শ গোলাম ছিল। তিনি তাদের ভাষাতেই গোলামদের সাথে কথা বলতেন। আমি তাঁকে পার্থিব জগতের কাজে এমনভাবে মশগুল হতে দেখে ভাবতাম মনে হয় তিনি আর আখেরাতের কাজের সাথে জড়িত হবেন না। আর যখন তাঁকে আখেরাতের কাজে সম্পৃক্ত দেখতাম, মনে হতো পার্থিব কাজে আর নিজেকে জড়াবেন না।
হিশাম বিন উরওয়া বলেন, আমার চাচা আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের (রা.) শিশুকালে সর্বপ্রথম 'তলোয়ার' শব্দ উচ্চারণ করেছেন। অতঃপর তা মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর পিতা ছেলের এ শব্দ শ্রবণে বললেন, তোমাকে তলোয়ার দ্বারা অনেক মধ্যস্থতা করতে হবে। আবু উবায়দা রেওয়ায়েত করেন, একদিন আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের আল-আসাদী ইবনে যুবায়েরের দরবারে গিয়ে বললেন, হে আমিরুল মুমেনীন! ওমুক দিক দিয়ে আমি আপনার আত্মীয়। ইবনে যুবায়ের বললেন, হ্যাঁ, সঠিক বলেছ। তবে তুমি যদি চিন্তা করে দেখ তাহলে বুঝতে পারবে যে, সকল মানুষ একই মা এবং বাবা থেকে নির্গত। আল-আসাদী বললেন, আমার অর্থকড়ি শেষ হয়ে গেছে। তিনি বললেন, আমি এর জিম্মাদার নই। তুমি বাড়ি ফিরে যাও। আসাদী বললেন, আমার উট ক্ষুধার্থ ও তৃষ্ণার্থ। তিনি বললেন, কোনো এক চারণ ভূমিতে তোমার উট ছাড়িয়ে দাও। আসাদী বললেন, আমি কিছু পাবার আশায় আপনার কাছে এসেছি, অভিমত জিজ্ঞেস করার জন্য নয়। অভিশাপ ক্ষুধার্থ সেই উটনীর প্রতি যে আমাকে আপনার কাছে এনেছে। তিনি বললেন, তার বাহনের উপরও।
আব্দুর রাজ্জাক 'মুসান্নাফ' গ্রন্থে যহরী থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে কখনোই দুশমনের কর্তিত মস্তক পেশ করা হয়নি। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর সম্মুখে জনৈক ব্যক্তির ছিন্ন মস্তক পেশ করা হলে তিনি দারুণ অসন্তুষ্ট হন। ইবনে যুবায়েরের দরবারে দুশমনের কর্তিত মস্তক পেশ করা হয়েছে।
ইবনে যুবায়েরের যুগে মুখতার কাযযাব নামে ভণ্ড নবীর আবির্ভাব হয়। সে নবুওয়াত দাবী এবং খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে ইবনে যুবায়ের ৬৭ হিজরীতে বিশাল সৈন্য বাহিনী নিয়ে তার সাথে যুদ্ধ করে তাকে পরাজিত ও হত্যা করেন। তাঁর খিলাফত কালে উসাঈদ বিন যহরি, আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস, নোমান বিন বসীর, সুলায়মান বিন সরদ, জাবের বিন সমরা, যায়েদ বিন আরকাম, আল লাইছী, যায়েদ বিন খালিদ আল জাহনী, আবুল আসওয়াদ ওয়ায়েল প্রমুখ আলেমে দ্বীন ইন্তেকাল করেন।
📄 আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান
আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান বিন হাকাম বিন আবুল আস বিন উমাইয়্যা বিন আব্দুস শামস বিন আব্দে মান্নাফ বিন কুসসী বিন কেলাব আবুল ওয়ালীদ ২৬ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। ইবনে যুবায়েরের খিলাফতকালে মারওয়ান আব্দুল মালিককে উত্তরাধিকার মনোনীত করেন। আর এজন্যই ইবনে যুবায়ের জীবিত থাকাকালীন আব্দুল মালিকের খিলাফত সঠিক ছিল না। মিসর এবং সিরিয়া নির্যাতনের মাধ্যমে প্রথম থেকেই তার অধীনে ছিল। অতঃপর ইরাক ইত্যাদি তার পদানত হয়। ৭৩ হিজরীতে ইবনে যুবায়েরের শাহাদাতের পর তার খিলাফত বিশুদ্ধ হয়। এ বছর হাজ্জাজ কাবা শরীফ বর্তমানে যে মডেলে আছে সেভাবে পুনর্নির্মাণ করেন। হাজ্জাজের ইশারায় জনৈক ব্যক্তি বিষ মিশ্রিত বর্শার আঘাতে ইবনে উমর (রা.) গুরুতর আহত হন এবং একারণে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তিনি ইন্তেকাল করেন। ৭৪ হিজরীতে হাজ্জাজ মদীনা শরীফে গিয়ে মদীনাবাসী এবং যে সকল আসহাবে রসূল (সা.) সে সময় জীবিত ছিলেন তাদের উপর অমানবিক নির্যাতন করতে আরম্ভ করেন। হযরত আনাস (রা.) হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রা.), হযরত সহল বিন সাদী (রা.) প্রমুখ সাহাবীদের গলা এবং হাতে মোহর এঁটে দেয়ার মাধ্যমে তাদের চরম অপমানিত করা হয়।
৭৫ হিজরীতে আব্দুল মালিক হজ্জ করেন এবং হাজ্জাজ ইরাকের গভর্নর নিযুক্ত হন। ৭৭ হিজরীতে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি দুর্গ বিজিত হয় এবং মিসরের ঐতিহাসিক জামে মসজিদ ভেঙে আব্দুল আযীয বিন মারওয়ান চারদিকে সম্প্রসারণের মাধ্যমে পুনর্নির্মাণ করেন। ৮২ হিজরীতে সিনানা দুর্গ হস্তগত হয় এবং আরমেনিয়া ও সানহাযার যুদ্ধ হয়। ৮৩ হিজরীতে হাজ্জাজ একটি শহরের গোড়া পত্তন করেন। ৮৪ হিজরীতে মাসীসা এবং আওদীয়ায়ে মাগরিব হাতে আসে। ৮৫ হিজরীতে আব্দুল আযীয বিন আবু হাতিম বিন তাগমান আল বাহলী নগর প্রাচীর নির্মাণ করেন। ৮৬ হিজরীতে তাওলিক এবং ইহজাম নামক দুটি দুর্গ হস্তগত হয়। প্লেগে আক্রান্ত হয়ে এ দুটি দুর্গের অধিকাংশ মহিলা মারা যায়। এজন্য দুর্গদ্বয়কে প্লেগের সমাধি নামে অভিহিত করা হয়। এ বছরের শাওয়াল মাসে আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান ইন্তেকাল করেন।
আহমদ বিন আব্দুল্লাহ আল আজলী বলেন, আব্দুল মালিকের মেধা পচনের অসুখ ছিল। ১৭ জন পুত্র সন্তান রেখে তিনি পরলোক গমন করেন। ইবনে সাদ বলেন, আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান হযরত উম্মে দারদা সাহাবীর দরবারে যাতায়াত করতেন। একদিন উম্মে দারদা বললেন, হে আমিরুল মুমেনীন, আমি শুনেছি আপনি ইবাদত করার পরও মদ পান করেন। তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি মদ পানের সাথে সাথে কাপালিকে পরিণত হয়েছি। হযরত নাফে বলেন, আমি মদীনায় আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানের চেয়ে অধিক কূটবুদ্ধিসম্পন্ন যুবক, চালাক ইবাদতকারী, আইনবিদ, কুরআন ও হাদীসের জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ ব্যক্তি আর দেখিনি।
আবুয যানাদ বলেন, মদীনার ফকীহগণ হলেন, সাঈদ বিন মুসায়্যাব, আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান, উরওয়া বিন যুবায়ের এবং ফাবিযা বিন ওযীব। ইবনে উমর (রা.) বলেন, সকলে ছেলের জন্ম দেয়। আর মারওয়ান দিয়েছেন পিতার জন্ম। উবাদা বিন লাবনী বলেন, জনৈক ব্যক্তি হযরত ইবনে উমরকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কুরাইশদের মধ্যে বয়ঃবৃদ্ধ হয়ে গেছেন। আপনার ইন্তেকালের পর আমরা মাসয়ালা মাসায়েল কাকে জিজ্ঞেস করবো? তিনি বললেন, মারওয়ানের ছেলে ফকীহ, তাকে তোমরা জিজ্ঞাসা করবে।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর গোলাম সুহায়েম বলেন, তরুণ আব্দুল মালিক হযরত আবু হুরায়রার দরবারে এলে তিনি বললেন, এ যুবক একদিন আরবের বাদশাহ হবেন। উবায়দা বিন রাব্বাহ আল গাসসানী বলেন, আব্দুল মালিক খলীফা হওয়ার পর হযরত উম্মে দারদা তাকে বললেন, আমি তোমাকে দেখেই বুঝে ছিলাম তুমি একদিন বাদশাহ হবে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কিভাবে বুঝে ছিলেন? তিনি বললেন, তোমার চেয়ে বাগ্মী এবং চিন্তাশীল আর দেখিনি। শা'বী (রহ:) বলেন, যে আমার সাহচর্য লাভ করছে সেই আমার জ্ঞান ও প্রজ্ঞার কাছে লা জওয়াব হয়েছে। আর আমি আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানের পাণ্ডিত্য ও প্রখর মেধার নিকট লা জওয়াব হয়েছি। কারণ আমি তার সামনে কোনো হাদীস পেশ করলে তিনি অবশ্যই সে হাদীসের ব্যাখ্যা করতেন। আর কোনো বিষয়ে কবিতা আবৃত্তি করলে একই বিষয়ে তিনি আরো অধিক কবিতা পাঠ করতেন।
যাহাবী বলেন, তিনি যাঁদের কাছে হাদীস শ্রবণ করেছেন তাঁরা হলেন, উসমান, আবু হুরায়রা, আবু সাঈদ, উম্মের সালমা, বুরায়দা, ইবনে উমর এবং মুআবিয়া (রা.) প্রমুখ। আর যাঁরা তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন তাঁরা হলেন, উরওয়া, খালিদ বিন মিদাদ, রাজা বিন হায়া, যহুরী, ইউনুস বিন মায়সারা, রবীআ বিন ইয়াযিদ, ইসমাঈল বিন উবায়দুল্লাহ, জারীর বিন উসমান প্রমুখ। বাকার বিন আব্দুল্লাহ মাযানী বলেন, ইউসুফ নামক এক ইহুদী মুসলমান হন। কুরআন শরীফ তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে তার মধ্যে প্রবল আগ্রহ সর্বদা বিদ্যমান থাকতো। একদিন তিনি আব্দুল মালিকের বাড়ির পাশ দিয়ে যাবার সময় উচ্চ কণ্ঠে বললেন, এ বাড়ির মালিকের কাছ থেকে উম্মতে মুহাম্মাদীয়া প্রবল অত্যাচারের শিকার হবে। এ কথা শুনে আমি বললাম, কতদিন পর্যন্ত তা চলবে? তিনি বললেন, যতক্ষণ পর্যন্ত খোরাসান থেকে কালো পতাকাধারী না আসবে। ইউনুস আব্দুল মালিকের বন্ধু ছিলেন। একদা তিনি আব্দুল মালিকের মাথায় হাত রেখে বললেন, আমি শরীয়ত বিরোধী কোন কাজ করবো না। কথিত আছে যে, ইয়াযিদ বিন মুআবিয়া মক্কা শরীফে সৈন্য পাঠালে আব্দুল মালিক মন্তব্য করেছিলেন, আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি, এ লোকটি তো পবিত্র নগরীতে সৈন্য পাঠিয়েছে। ইউসুফ বললেন, তোমার সেনারা ইয়াযিদ বাহিনীর চেয়ে নিষ্ঠুর হবে।
ইয়াহইয়া গাসসানী বলেন, মুসলিম বিন উকবা মদীনায় প্রবেশ করলে আমি মসজিদে নববীতে আব্দুল মালিকের সামনে গিয়ে বসলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি এ বাহিনির অন্তর্ভুক্ত? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, দুর্ভাগা, তুমি কি জান না তোমরা এমন এক জাতির সঙ্গে লড়াই করতে এসেছ যারা ইসলামের প্রথম সন্তান, তাঁরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবী এবং তিনি তাদেরকে অন্তর দিয়ে ভালোবাসতেন। যদি দিনে তাদের কাছে যাও তবে তারা রোযাদার, আর রাতে গেলে দেখবে তাহাজ্জুদের নামাযে মশগুল। স্মরণ রেখো, পৃথিবীর সবাই মিলে যদি তাদের হত্যা করতে চায় আল্লাহ তা'আলা তাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। আব্দুল মালিক খিলাফতের তখতে আসীন হয়ে হাজ্জাজের নেতৃত্বে তাদের প্রতি সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং ইবনে যুবায়েরকে হত্যা করা হয়।
হযরত আব্দুর রহমান বিন আবু বকর (রা.) বলেন, যখন খিলাফত আব্দুল মালিকের হাতে গিয়ে পৌছে ঠিক তখন কুরআন শরীফ তার কোলে ছিল। তিনি তা বন্ধ করে বললেন, এটাই হলো তোমার সাথে শেষ সাক্ষাত। ইমাম মালিক (রা.) বলেন, আমি ইয়াহইয়া বিন সাঈদের নিকট শুনেছি আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান যোহর এবং আসরের মধ্যবর্তী সময় থেকে আসর পর্যন্ত আরো দু'জনকে নিয়ে মসজিদে নামায আদায় করেন। সাঈদ বিন মুসায়্যাবকে কেউ জিজ্ঞেস করল, এরা তিনজন তো নামায পড়ছে, আমরাও যদি উক্ত সময়ে নামায পড়ি তবে কোনো ক্ষতি হবে না তো? তিনি বললেন, বেশি বেশি নামায পড়া আর অধিক রোযা রাখার নাম ইবাদত নয়। দ্বীন নিয়ে গবেষনা ও চিন্তাশীলতা এবং গুনাহর কাজ থেকে বেঁচে থাকার নাম ইবাদত।
মুসআব বিন আব্দুল্লাহ বলেন, ইসলামের মধ্যে সর্বপ্রথম তার নাম আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান রাখা হয়েছে। ইয়াহইয়া বিন বাকীর বলেন, আমি ইমাম মালিক (রা.) থেকে শুনেছি, তিনি বলেন, সর্বপ্রথম আব্দুল মালিক দিনারের উপর ছাপ দেন এবং কুরআনের আয়াত অঙ্কিত করেন। মুসআব বলেন, আব্দুল মালিক দিনারের উপর একদিকে قُلْ هُوَ اللَّهُ اَحَدٌ খেদাই করেন এবং অপর দিকে لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ নকশা করেন। দিনারের চতুর্দিকে চান্দীর একটি গোল বৃত্ত ছিল। এ বৃত্তের উপর ভাগে মুদ্রা প্রস্তুতকারী সরকারী কারখানা ও শহরের নাম এবং বাহিরাংশে অর্থাৎ, বৃত্তের চতুর্দিকে مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ أَرْسَلَهُ بِالْهُدَى وَদِينِ الْحَقِّ লিখা ছিল।
আসকারী কর্তৃক রচিত, “আওয়ায়েল” গ্রন্থে রয়েছে, প্রথমে মুদ্রার হস্তাক্ষরে اَللهُ اَحَدٌ قُلْ هُوَ অপর দিকে নবীজী (সা.)-এর নাম এবং তারিখ লিখা থাকত। এ প্রথা মুসলমানদের মধ্যে সর্বপ্রথম আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানই চালু করেন। তবে তার সাম্রাজ্যে কোনো মুদ্রার প্রচলন ছিল না; বরং খ্রিস্টানদের মুদ্রাই তার রাজ্যে চলত। খ্রিস্ট মুদ্রায় তাওহীদ ও রিসালাতের বাণী লিখার কারণে একদা রোম সম্রাট এ মর্মে পত্র লিখলেন যে, আপনি মুদ্রায় হস্তাক্ষরে আপনার নবীর নাম লিখার প্রথা বর্জন করুন। অন্যথায় দিনারে আমি এমন কিছু লিখব যা দ্বারা আপনারা মর্ম পীড়নে ভুগবেন। কারণ আপনাদের কাজে আমরা কষ্ট পাচ্ছি। আব্দুল মালিক খালিদ বিন ইয়াযিদ বিন মুআবিয়াকে পরামর্শের জন্য ডাকলেন। তিনি সব শুনে বললেন, আপনার সাম্রাজ্যে খ্রিস্ট মুদ্রা প্রবেশের পথ বন্ধ করে দিন। নিজে মুদ্রার প্রবর্তন করুন এবং মুদ্রায় হস্তাক্ষরের পরিবর্তে লিখাগুলো খোদাই করে দিন। তিনি এ পরামর্শ মোতাবেক ৭৫ হিজরীতে নিজস্ব দিনার তৈরি করেন।
আসকারী বলেন, খলীফাদের মধ্যে কৃপণতা করার জন্য আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানের নাম রাশহুল হুজারা এবং মুখ থেকে দুর্গন্ধ বেরুনের জন্য আবুল যবান নামে প্রসিদ্ধ। যে খলীফা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন, যে খলীফার সামনে কথা বলা নিষেধ ছিল এবং যে যুগে প্রচলিত কোনো বচন উত্থাপন করা যেতো না তিনি আব্দুল মালিক। আসকারী কালবী থেকে রেওয়ায়েত করেন, মারওয়ান বিন হাকাম নিজ সন্তান আব্দুল মালিকের পর আমর বিন সাঈদ বিন আসকে উত্তরাধিকার মনোনীত করেছিলেন। কিন্তু আব্দুল মালিক তাকে হত্যা করেন। ইসলামের মধ্যে এটাই ছিল প্রথম ওজর।
ইবনে জারীর তাঁর পিতা থেকে রেওয়ায়েত করেন, হযরত আব্দুল্লাহ বিন যুবায়েরকে শহীদ করার পর ৭৫ হিজরীতে আব্দুল মালিক মদীনায় এক বক্তৃতায় বলেন, (হামদ ও সানার পর) আমি দুর্বল খলীফা উসমান (রা.) নই, আমি শক্তিহীন খলীফা মুআবিয়া এবং ক্ষীণ মনের খলীফা ইয়াযিদও নই। আমার পূর্ববর্তী খলীফাগণ এ সম্পদ ভোগ করতেন। খবরদার এ ব্যাপারে আমার তলোয়ার খুব তীক্ষ। তোমাদের বর্শাগুলো আমার সাহায্যে উঁচিয়ে ধরো। আমরা মুহাজিরদের প্রচলিত রীতিনীতি সংরক্ষণ করব, তবে এর উপর আমল না করলে আমি তোমাদের ধ্বংস করে দিব। আমর বিন সাঈদের আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষাসহ আরো অন্যান্য গুণাবলী থাকলেও প্রশাসন এবং খিলাফত ভিন্ন বিষয়। তিনি সামান্য মাথা চাড়া দিলে তাকে শেষ করে দিব। স্মরণ রেখো, আমি তোমাদের সকল আবেদন রক্ষা করব, কিন্তু আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে আমি কিছুতেই তা মেনে নিব না। সম্মিলিত সিদ্ধান্ত এটাই যে, যে আমর বিন সাঈদের দলে গিয়ে ভিড়বে এবং যে মাথা চাড়া দিবে তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হবে। আর এরপরে যদি কেউ আমাকে আল্লাহর ভয় দেখায় তবে তার গর্দানও উড়িয়ে দিব। এ বলে তিনি মিম্বর থেকে অবতরণ করলেন।
আসকারী বলেন, আব্দুল মালিক সর্বপ্রথম সরকারী অনেক নথিপত্র ফার্সী থেকে আরবী ভাষায় স্থানান্তর করেন। তিনি সর্বপ্রথম মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে হাত উঁচু করেন। আমি (গ্রন্থকার) বলছি, আব্দুল মালিক দশটি বিষয়ের প্রবর্তক। এর মধ্যে পাঁচটি ভালো এবং পাঁচটি মন্দ। ইবনে আবী শায়বা 'মুসান্নাফ' গ্রন্থে মুহাম্মাদ বিন সিরীন (রহ.) থেকে রেওয়ায়েত করেন, মারওয়ানের সন্তানদের মধ্য থেকে আব্দুল মালিক বা অন্য কেউ ঈদুল ফিতর অথবা ঈদুল আযহার আযানের প্রথা চালু করেছিলেন। আব্দুর রাজ্জাক ইবনে জারীর থেকে রেওয়ায়েত করেন, আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান সর্বপ্রথম কাবা শরীফে রেশমী কাপড়ের গেলাফ চড়িয়ে দেন। মুফতীগণকে রেশমী কাপড় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে কাবা শরীফের জন্য রেশমী কাপড়ই সঠিক বলে অভিমত পেশ করেন।
ইউসুফ বিন মাজশু বলেন, বিচার করার সময় আব্দুল মালিকের মাথার উপর তলোয়ারের ছায়া দান করা হতো। আসমায়ী বলেন, জনৈক ব্যক্তি আব্দুল মালিককে জিজ্ঞেস করল হে আমিরুল মুমেনীন! আপনি অতি তাড়াতাড়ি বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। তিনি বললেন, কেন হব না বল, প্রতি জুমআয় নিজের মেধা যেভাবে জনতার কাছে বিলিয়ে দিচ্ছি। মুহাম্মাদ বিন হরব যিয়াদী বলেন, জনৈক ব্যক্তি আব্দুল মালিককে জিজ্ঞেস করল, কোন ব্যক্তি সর্বোত্তম? তিনি বললেন, যিনি উচ্চ মর্যাদার অধিকারী, বিনয়ী এবং সর্ব অবস্থায় ইনসাফ করে। ইবনে আয়শা বলেন, কোনো ব্যক্তি শহর, নগর অথবা গ্রাম থেকে আব্দুল মালিকের কাছে আসলে তিনি তাদের চারটি বিষয়ে সাবধান করে দিতেন। এক মিথ্যা বলবে না, কারণ মিথ্যার কোনো মূল্য নেই। দুই. আমি যে প্রশ্ন করব শুধু তারই উত্তর দিবে। তিন. আমার প্রশংসায় অহেতুক কল্পনার রং ছড়িয়ে দিবে না। চার. আমাকে আমার প্রজাবৃন্দের উপর উত্তেজিত করতে পারবে না।
মাদায়েনী বলেন, জীবনে অন্তিম মুহূর্তে আব্দুল মালিক তাঁর ছেলেকে এ উপদেশ দেন- সর্বদা আল্লাহকে ভয় করবে, মতভেদ থেকে অনেক দূরে থাকবে, যুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শন করবে, পুণ্যে দৃষ্টান্ত হবে, যুদ্ধের পূর্বে মৃত্যুকে আহ্বান করা হয় না, আর পুণ্যের পূর্ণতা এবং আলোচনা যুগ যুগ ধরে থেকে যায়। তিক্ততার মধ্যে মিষ্টি এবং প্রতাপশালীতার মাঝে নমনীয় হয়ে যাও। ইবনে আবুল আ'লা আশ শায়বানী কবিতার মাধ্যমে আব্দুল মালিকের নসীহতগুলো তুলে ধরেছেন এভাবে- "অনেকগুলো তীর একত্রিত করে ভাঙা অসম্ভব। তবে একটি তীর যে কারো পক্ষে ভেঙে ফেলা সম্ভব। হে ওয়ালীদ! খিলাফতের বিষয়ে আল্লাহকে ভয় কর। হাজ্জাজের প্রতি বেশি দৃষ্টি রাখবে, তাকে সম্মান করবে, কারণ তিনিই তোমাকে খিলাফত পর্যন্ত পৌছে দিয়েছেন। হে ওয়ালীদ! হাজ্জাজ তোমার বাহু এবং তলোয়ার। তার ব্যাপারে কারো অভিযোগ গ্রহণ করবে না। সবসময় তার প্রয়োজন হবে। আমার মৃত্যুর পর নিজের জন্য বাইআত করে নিবে। যদি বাইআত গ্রহণে কেউ অস্বীকার করে তবে তার গর্দান উড়িয়ে দিবে।"
আব্দুল মালিক যখন মৃত্যুপ্রায় সে সময় ওয়ালীদ পিতাকে দেখার জন্য এলে তিনি তৎক্ষণাত এ কবিতাটি আবৃত্তি করেন- "রোগীর শুশ্রুষাকারী আসছে। শুশ্রুষা করার জন্য নয়, বরং মরেছি কিনা তা দেখার জন্য।" এ কথা শুনে ওয়ালীদ কেঁদে উঠলে আব্দুল মালিক বললেন, মেয়েদের মত কেঁদে কি লাভ হবে। আমার মৃত্যুর পর নিজ পায়ে ভর করে দাঁড়াবে, বীরত্বকে কাজে লাগাবে, সিংহের পোশাক পরবে, নিজের তলোয়ার কাঁধে রাখবে, যে অবাধ্য হবে তার মস্তক ছিন্ন করে দেবে, আর যে নীরব থাকবে তাকে ছেড়ে দিবে।
আব্দুল মালিকের মন্দ কাজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জঘন্য কাজটি হলো হাজ্জাজকে মুসলমান এবং সাহাবীদের শাসনকর্তা নিয়োগ করা। কারণ এ হতভাগ্য লোকটি অনেক আকাবেরে আসহাবে রসূল (সা.) এবং তাবেয়ীকে শহীদ করে দিয়েছে এবং হযরত আনাসসহ প্রমুখ সাহাবীদের গলায় ও হাতে মোহর এঁটে দিয়ে নির্যাতনের চরম দৃষ্টান্ত রেখেছে। আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করবেন না। ইবনে আসাকির স্বরচিত 'ইতিহাস' গ্রন্থে ইবরাহীম বিন আদীর বরাত দিয়ে লিখেছেন, উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের হত্যাকাণ্ড, জায়েশ বিন দালজার হিজাযে নিহত হওয়া, রোম সম্রাট কর্তৃক মুসলিম বিশ্বে উত্তেজনা ছড়ানোর অপকৌশল এবং আমর বিন সাঈদের দামেশক-গমন থেকে এ চারটি বিপদ একই রাতে হলেও আব্দুল মালিকের চেহারায় কোনো বিষাদের ছাপ পড়েনি। আসমায়ী বলেন, শা'বী, আব্দুল মালিক, হাজ্জাজ এবং ইবনুল কারীয়া এ চারজন হাসি-তামাশার সময়ও সাধারণত ভুল করতেন না।
সালাফী তৌরিয়াত গ্রন্থে লিখেছেন, আব্দুল মালিক একবার বাইরে গেলে জনৈক মহিলা এসে বলল, হে আমিরুল মুমেনীন, আমার ভাই ছয় শ'দিনার রেখে ইন্তেকাল করেছে। পরিবারের লোকেরা একটি দিনার দিয়ে আমাকে বলেছে, এটা তোমার মিরাছ। এ মাসয়ালাটি আব্দুল মালিকের বুঝে না আসায় শা'বীকে ডেকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, বিষয়টি যথার্থ। মৃত্যু ব্যক্তির দুই মেয়ে দুই তৃতীয়াংশ অর্থাৎ চার শ' দিনার পাবে। মা পাবে এক শ' স্ত্রী পাবে পঁচাত্তর এবং বারোজন ভাই পাবে চব্বিশটি দিনার। এ দৃষ্টিকোণ থেকে তার ভাগে একটি দিনারই পড়বে। ইবনে আবী শায়বা মুসান্নাফ গ্রন্থে লিখেছেন, আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান বলেছেন, আনন্দ উপভোগের জন্য বারবার বাঁদী, সন্তানের জন্য ফার্সী বাঁদী এবং সেবার জন্য হলে রোমান দাসী ক্রয় করবে।
ছালাবা বলেন, আব্দুল মালিক বলতেন, আমি রমযানে জন্মগ্রহণ করেছি, রমযানে মায়ের দুধ ছেড়েছি, রমযানে কুরআন মজীদ শেষ করেছি, রমযানে বালেগ হয়েছি, রমযানে উত্তরাধিকার মনোনীত হয়েছি, রমযানে খিলাফত পেয়েছি এবং রমযানেই মৃত্যু বরণ করব। রমযান এলে তিনি খুব ভয় পেতেন এবং রমযান চলে গেলে তিনি নিশ্চিত হতেন, কিন্তু তিনি শাওয়াল মাসে ইন্তেকাল করেন।
তাঁর শাসনামলে যেসব সাহাবী ইন্তেকাল করেন তাঁরা হলেন, ইবনে উমর, আসমা বিনতে আবু বকর, আবু সাঈদ বিন মাআলা, আবু সাঈদ খুদরী, রাফে বিন খুদায়েজ, সালমা বিন আকওয়া, আরবাস বিন সারিয়া, জাবের বিন আব্দুল্লাহ, আব্দুল্লাহ বিন জাফর বিন আবু তালিব, সায়িব বিন ইয়াযিদ, উমরের গোলাম আসলাম, আবু ইদরীস আল খাওলানী, শুরাইহ্ কাযী, আবান বিন উসমান বিন আফফান, আশা শায়ের, এবং অলংকার শাস্ত্রের নক্ষত্র আউযুব বিন কারিয়া, খালিদ বিন ইয়াযিদ বিন মুআবিয়া, যাররা বিন জায়েশ, সিনান বিন সালামা বিন মুহবিক, সুয়াইদ বিন গাফলা, আবু ওয়ায়েল তারেক বিন শিহাব, মুহাম্মদ বিন হানাফীয়া, আব্দুল্লাহ বিন শাদ্দাদ বিন হাদ, আবু উবায়দা বিন আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ, আমর বিন হারীছ, আমর বিন সালামা, জরমী (রহ:)।