📄 খিলাফত:
হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর জীবদ্দশায় হযরত উমর খিলাফতের উত্তরাধিকার মনোনীত হন ১৩ হিজরীর জামাদিউল উখরা মাসে। যহরী বলেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) যেদিন ইন্তেকাল করেন ১৩ হিজরীর জমাদিউল উখরা মাসের ২২ তারিখ মঙ্গলবার হযরত উমর খলীফা মনোনীত হন। (হাকেম)
তাঁর যুগে ইসলামের বড় বড় বিজয় অর্জিত হয়। ১৪ হিজরীতে দামশক সন্ধি ও প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে হামস ও বাআলাবাক্কা সন্ধির মাধমে, বসরা ও ইলা প্রভাব বিস্তার করে বিজয় হয়। ১৪ হিজরীতে তিনি তারাবীর নামাযের জন্য লোকদের সমবেতন করেন। (আসকারী)
১৫ হিজরীতে উরওয়ান প্রভাবের মাধ্যমে এবং তবরীয়া সন্ধির মাধ্যমে বিজিত হয়। এ বছরেই ইয়ারমুক এবং কাদেসিয়ার ঘটনা ঘটে। (ইবনে জারীর) এ বছর হযরত সাদ কুফা নগরী উন্নত ও সমৃদ্ধ করেন। এ বছর থেকে হযরত উমর ভাতা, বৃত্তি ও প্রশাসনিক কাজের জন্য দফতরের প্রবর্তন করেন।
১৬ হিজরীতে আহওয়ায এবং মাদায়েণ মুসলমানদের করতলগত হয়। হযরত সাদ কিসরার রাজ প্রসাদে জুমআর নামায পড়েন, এটা ছিল ইরাকের মাটিতে সর্বপ্রথম জুমআর নামায। এটা ১৬ হিজরীর সফর মাসের ঘটনা। এ বছর জালুলার ঘটনা ঘটে এবং ইয়াযুজরদ বিন কিসরা পরাজিত হয়ে রায়ের দিকে পালিয়ে যায়। তাকরীতও মুজাহিদদের হস্তগত হয়। হযরত উমরের আগমনে বাইতুল মুকাদ্দাসও বিজিত হয়। তিনি জাবায় তাঁর সুপ্রসিদ্ধ অভিভাষণ প্রদান করেন। এ বছরেই কানসিরীন এবং সুরুজ যুদ্ধের মাধ্যমে এবং হলব, ইনতাকীয়া, মিনজাও কারকিসা সন্ধির মাধ্যমে বিজিত হয়। ১৬ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসে হযরত আলীর পরামর্শে হযরত উমর ঐতিহাসিক হিজরতের হিসাব থেকে হিজরী বর্ষের প্রবর্তন করেন।
১৭ হিজরীতে তিনি মসজিদে নববীর সম্প্রসারণ করেন। হিজাজে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে হযরত উমর হযরত আব্বাসকে সাথে নিয়ে ইসতেসকার নামায আদায় করেন। ইবনে সাদ নিয়ারুল আসলামা থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উমর সেদিন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চাদর মোবারক পরে ইসতেসকার নামায পড়েন। হযরত ইবনে উমর বলেন, তিনি হযরত আব্বাসের হাত ধরে ঊর্ধ্বে তুলে দু'আ করেন, হে আল্লাহ! আমরা সহায়হীন বান্দা আপনার রাসূলে মাকবুল (সা.)-এর চাচাকে ওসীলা করে আরয করছি, শুষ্কতা উঠিয়ে নিন এবং রহমতের বারিধারা বর্ষণ করুন। এ দু'আ করে ফিরে না আসতেই মুষলধারে বৃষ্টি আরম্ভ হয়। এ বছর আহওয়ায সন্ধির মাধ্যমে বিজয় হয়।
১৮ হিজরীতে নিশাপুরের কিয়দংশ সন্ধির মাধ্যমে এবং হালওয়ান, বাসী, সামসাত, হারান, নাসীবীন, মৌসূল, তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল এবং জাযিরায়ে আরবের অধিকাংশ অঞ্চল লড়াই-এর মাধ্যমে ইসলামের পতাকাতলে আসে। কতিপয় ঐতিহাসিকের মতে জাযিরায়ে আরবের অধিকাংশ অঞ্চল সন্ধির মাধ্যমে বিজিত হয়।
১৯ হিজরীতে কিসারিয়া এবং ২০ হিজরীতে মিসর যুদ্ধের মাধ্যমে মুসলমানদের হাতে আসে। কারো কারো মতে ইস্কান্দারিয়া ছাড়া গোটা রাজ্য সন্ধির মাধ্যমে অর্জিত হয়। আলী বিন রাববাহ বলেন, গোটা পশ্চিমাঞ্চল যুদ্ধের মাধ্যমে বিজিত হয়। এ বছর তসতর বিজয় হয়, রোম সম্রাট পরলোকগমন করেন, হযরত উমর খায়বর এবং নাজরান থেকে ইহুদীদের বের করে দেন এবং খায়বর ও ওয়াদিউল কুরা বণ্টন করেন।
২১ হিজরীতে ইস্কান্দারিয়া এবং নিহাঅন্দ যুদ্ধ করে অর্জনের পর অনারব বিশ্বে আর কোনো অবাধ্যের দল রইল না। ২২ হিজরীতে আযার বাইজান যুদ্ধ অথবা সন্ধির মাধ্যমে, দিনুর, মাসবাদন, এবং হামদান যুদ্ধ করে জয় হয়। এ বছর আবলাসুল আরব, আসকার এবং কুমশ হস্তগত হয়।
২৩ হিজরীতে কারমানে সাজিসতান, কামরানের পাহাড়ি অঞ্চল, আসবাহান এবং এর পার্শ্ববর্তী জনপদ বিজিত হয়। এ বছরের শেষ দিকে হজ্জ থেকে ফিরে আসার পর হযরত উমর শহীদ হন।
সাঈদ বিন মুসায়্যাব বলেন, হযরত উমর মিনা থেকে মক্কায় প্রত্যাবর্তনের পর উট থেকে নেমে আসমানের দিকে হাত তুলে এ দু'আ করেন- হে আল্লাহ! আমি বৃদ্ধ হয়ে গেছি। শক্তি হ্রাস পেয়েছে। ইচ্ছাশক্তি বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছে। এরপর আমি অকর্মণ্য হয়ে পড়ব এবং আমার বিবেক লোপ পাবে। অতএব আমাকে আপনার নিকট আহবান করুন। অতঃপর যিলহজ্জ মাস শেষ না হতেই তিনি শহীদ হন। (হাকেম)
আবু সালিহুস সামান বলেন, হযরত কা'ব বিন আহবার হযরত উমরকে বলেন, আমি তৌরাতে দেখেছি আপনি শহীদ হবেন। হযরত উমর বললেন, এ কি করে হয়। আমি আরবে থাকব অথচ শহীদ হয়ে যাব?
আসলাম বলেন, হযরত উমর দু'আ করেন, হে আল্লাহ! আমাকে আপনার পথে, আপনার হাবীবের শহরে শাহাদত অর্জনের সৌভাগ্য দান করুন। (বুখারী)
মাদান বি আবী তালহা বলেন, হযরত উমর তার এক ভাষণে বলেন, আমি স্বপ্নে যা দেখলাম তার ব্যাখ্যা হচ্ছে, আমার মৃত্যু অতি নিকটবর্তী। এ পর্যায়ে উম্মতের লোকেরা আমাকে খিলাফতের উত্তরাধিকার মনোনীত করার কথা বলছে। স্মরণ রাখবে আল্লাহ তা'আলা তাঁর দ্বীণ এবং খিলাফতকে নিশ্চিহ্ন করবেন না। মৃত্যু আমার সঙ্গী হলেও দ্বীন এবং খিলাফত আমার সাথী নয়। আমার পর ছয়জন যাঁদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা.) জান্নাতে যাবার সুসংবাদ দিয়েছেন তাঁদের পরামর্শক্রমে খলীফা নির্বাচন করবে। (হাকেম)
যহরী বলেন, হযরত উমরের নীতি ছিল তিনি মদীনা শরীফে কোনো যুবককে ঢুকতে দিতেন না। একবার কুফার শাসনকর্তা হযরত মুগীরা বিন শো'বা খলীফা উমরের নিকট পত্র লিখলেন যে, আমার নিকট একজন দক্ষ কারিগর যুবক রয়েছে। সে উন্নতমানের নকশা তৈরি করতে পারে। আপনি অনুমতি দিলে আমি তাকে পাঠিয়ে দিব। হযরত উমর অনুমতি দিলেন। কুফায় হযরত মুগীরা সে যুবকের উপর মাসিক একশ দেরহাম কর নির্ধারণ করে রেখেছিল। সে মদীনায় এসে সে ব্যাপারে হযরত উমরের নিকট অভিযোগ দায়ের করলে তিনি বললেন, এ কর তো বেশি কিছু নয়। এ কথা শুনে সে যুবক ক্রোধান্বিত হয়ে দাঁতে দাঁত পিষে প্রস্থান করল। দু'তিন দিন পর হযরত উমর তাঁকে ডেকে বললেন, আমি শুনলাম তুমি নাকি বলেছ আমি চাইলে এমন এক চাক্কি তৈরি করবে যা বাতাসে উড়বে? সে বলল, আমি আপনার জন্য এমন এক চাক্কি তৈরি করব যা চিরদিন মানুষ স্মরণ রাখবে। সে চলে গেলে তিনি বললেন, এ যুবক আমাকে হত্যা করার হুমকি দিয়ে গেল। একদিন সে হীরা কাটা দু'ধারাবিশিষ্ট একটি খঞ্জর জামার নিচে লুকিয়ে মসজিদে এক কোণে এসে বসে। আর এদিকে হযরত উমর নামাযের জন্য লোকদের জাগিয়ে দিচ্ছিলেন। তার নিকটবর্তী হলে সে তাঁর শরীরে খঞ্জর দ্বারা তিনবার আঘাত করে। (ইবনে সাদ)
আমর বিন মাইমুন আনসারী বলেন, হযরত মুগীরার গোলাম আবু লুলুয়াহ-এর দু'ধারবিশিষ্ট খঞ্জরের আঘাতে হযরত উমর শহীদ এবং তাঁর সাথে ছিলেন এমন বারোজন আহত হন, যাদের মধ্যে ছয়জন মারা যান।
আবু রাফে বলেন, হযরত মুগীরার গোলাম আবু লুলুয়াহ চাক্কি তৈরি করত। তিনি তার নিকট থেকে দৈনিক চার দিরহাম রাজস্ব আদায় করতেন। সে হযরত উমরের কাছে এসে এ ব্যাপারে অভিযোগ দায়ের করে বলল, আমিরুল মুমিনীন! মুগীরা আমার প্রতি কঠোরতা আরোপ করেছেন। আপনি তাঁকে সাবধান করুন। তিনি বললেন, তুমি তোমার মনিবের সাথে ভালো আচরণ করবে। হযরত উমরের ইচ্ছে ছিল তিনি এর ব্যাপারে হযরত মুগীরার নিকট সুপারিশ করবেন। কিন্তু এ কথা তার পছন্দ না হওয়ায় সে রাগত স্বরে বলল, হে আমিরুল মুমিনীন! আমি ছাড়া সকলেই সুবিচার পেয়েছে। সে খলীফাকে হত্যা করার ইচ্ছায় বিষ মিশ্রিত খঞ্জর নিজের কাছে রাখতে লাগল। হযরত উমর ফজর নামাযের সময় যখন কাতার সোজা করার কথা বলছিলেন ঠিক তখন আবু লুলুয়াহ হযরত উমরের সামনে এসে গলা ধরে পিঠের উঁচু অংশে উপর্যুপরি দু'টি আঘাত করে। তিনি পড়ে গেলে সে অন্যদের উপর আঘাত করলে তেরোজন আহত হয়, যাদের মধ্যে ছয়জন নিহত হন। তখন সূর্যোদয়ের সময় সমাগত প্রায়। হযরত আব্দুর রহমান বিন আউফ ছোট সূরা দিয়ে নামায শেষ করলেন। হযরত উমরকে তাঁর ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। তাঁকে দুধ পান করানো হলে ক্ষতস্থান দিয়ে তা বেরিয়ে এল। লোকেরা সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, কোনো ক্ষতি নেই, আপনি চিন্তা করবেন না। তিনি বললেন, যদি হত্যার মধ্যে খারাপিও থাকে তবুও আমি নিহত হবো। লোকেরা তাঁর প্রশংসা করতে লাগলেন। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! যখন আমি দুনিয়া থেকে চলে যাব দুনিয়ার কোনো ভোগ বিলাস আমাকে প্রতারিতও করবে না, আনন্দও দিবে না তবে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাহচর্য আমাকে সঙ্গ দিবে এবং এর সওয়াব পাবো। অতঃপর হযরত ইবনে আব্বাস তাঁর প্রশংসা করলে তিনি বলেন, যদি আমার নিকট দুনিয়া ভর্তি স্বর্ণ থাকতো তাহলে কিয়ামতের ভয়াবহতার কারণে আমি তা উৎসর্গ করতাম। অতঃপর তিনি আবার বললেন, হযরত উসমান, হযরত আলী, হযরত তলহা, হযরত যুবাইর, হযরত আব্দুর রহমান বিন আউফ এবং হযরত সাদের মধ্যে থেকে যাঁর ব্যাপারে অধিকাংশ রায় হয় তাঁকে খলীফা নির্ধারণ করবে। তারপর তিনি সহীব (রা.) কে নামায পড়ানোর নির্দেশ দেন। অতঃপর সেই ছয়জন তিনজনের উপর দায়িত্ব অর্পন করেন। (হাকেম)
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, সে যুবক ছিল অগ্নি উপাসক। আমর বিন মাইমুন বলেন, হযরত উমর বললেন, আমার মৃত্য এমন লোকের হাতে হচ্ছে, যে ইসলামের দাবী করে না। অতঃপর তিনি তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহকে বললেন আমার কর্জ হিসাব করো। হিসাব করে প্রায় ৮৬ হাজার দিরহামের কথা বলা হলে তিনি বললেন, যদি এ কর্জ উমর পরিবারের সম্পদ থেকে পরিশোধ হলে আদায় করবে। না হলে বনূ আদীর নিকট চাইবে। তবুও শোধ না হলে কুরাইশদের কাছ থেকে নিবে। হযরত আয়েশা সিদ্দীক (রা.)-এর কাছে গিয়ে তাঁকে বলবে, দুই বন্ধুর নিকট সমাহিত হওয়ার জন্য উমর অনুমতি চাইছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর তাঁর কাছে গেলে হযরত আয়েশা (রা.) বললেন, আমি এ জায়গাটি নিজের জন্য সংরক্ষণ করছিলাম। কিন্তু আজ এ মুহূর্তে আমি উমরের আবেদনকে প্রাধান্য দিচ্ছি। হযরত আব্দুল্লাহ এসে বললেন, তিনি অনুমতি দিয়েছেন। একথা শুনে হযরত উমর আল্লাহ তা'আলার শুকর আদায় করলেন। লোকেরা বললেন, হে আমিরুল মুমিনীন! আপনার কিছু বলার থাকলে ওসীয়ত করুন। আপনি কাউকে খলীফা নির্ধারণ করে যান। তিনি বললেন, ছয়জন ছাড়া আর কাউকে খিলাফতের হকদার মনে করি না। তিনি ছয়জনের নাম বললেন। আমার ছেলে আব্দুল্লাহর সাথে খিলাফতের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সাদ জীবিত থাকলে তিনিই হতেন খিলাফতের হকদার। তিনি যেহেতু নেই তোমরা যাকে ইচ্ছা নির্বাচন করবে। আমি সাদকে কোনো খেয়ানতের কারণে বঞ্চিত করিনি। অতঃপর তিনি বললেন, আমার পর যে খলীফা হবে তাঁকে ওসীয়ত করছি, তিনি আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করবেন। মুহাজির, আনসার এবং সকল জনসাধারণের সাথে ভালো আচরণ করবেন। এভাবে তিনি অনেক নসীহত করার পর মহান প্রভুর সান্নিধ্যে চলে গেলেন।
আমরা জানাযা নিয়ে গেলাম। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর হযরত আয়েশাকে সালাম দিয়ে বললেন, আপনি দাফন করার অনুমতি দিন। তিনি অনুমতি দিলে আমরা তাঁকে তাঁর দুই বন্ধুর পার্শ্বে দাফন করলাম। তাঁকে সমাহিত করার পর লোকেরা খলীফা নির্বাচনের জন্যে সমবেত হল। হযরত আব্দুর রহমান বিন আউফ বললেন, পরামর্শ করার জন্য প্রথমে তিনজনকে বেছে নেয়া যায়। সুতরাং পরামর্শ করার জন্য হযরত যুবাইর হযরত আলীকে, হযরত সাদ হযরত আব্দুর রহমান বিন আউফকে এবং হযরত তলহা হযরত উসমানকে মনোনীত করায় তারা তিনজন পৃথক হয়ে যান। সেখানে গিয়ে হযরত আব্দুর রহমান বিন আউফ বললেন, আমি খলীফা হতে চাই না। সুতরাং আপনাদের মধ্যে থেকে কারো আশা থাকলে দেখে পুনরায় তিনি বললেন, মনোনীত করার দায়িত্ব আপনারা আমার উপর ছেড়ে দিতে পারেন। আমি সর্বশ্রেষ্ঠকে মনোনীত করব। তাঁরা সম্মতি দিলে তিনি হযরত আলীকে পৃথকভাবে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন, আপনি প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয়তম ও নিকটতম। এজন্য আপনি খিলাফতের হকদার। যদি আমি আপনাকে খলীফা মনোনীত করি তাহলে আপনি তাঁর আনুগত্য করবেন। হযরত আলী সম্মতি দিলেন। তিনি হযরত উসমানকে আলাদা ডেকে তাঁরও সম্মতি নিলেন। এ ব্যাপারে উভয়ে পূর্ণ প্রতিশ্রুতি প্রদান করলে তিনি হযরত উসমানের হাতে বাইআত নিলেন। অতঃপর হযরত আলী বাইআত গ্রহণ করেন।
ইমাম আহমদ মুসনাদ গ্রন্থে লিখেছেন, হযরত উমর (রা.) বলেন, হযরত আবু উবাদা বিন জাররাহ বেঁচে থাকলে আমি তাঁকে খলীফা মনোনীত করতাম। আর এ বিষয়ে আল্লাহ তা'আলা জিজ্ঞেস করলে বলতাম, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, প্রত্যেক নবীর একজন বিশ্বস্ত লোক থাকেন। আর আমার বিশ্বস্ত লোক হলেন আবু উবাদা বিন জাররাহ। তারপর মা'আজ বিন জাবাল জীবিত থাকলে তাঁকে খলীফা নির্বাচিত করতাম। আর তাঁর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে বলতাম, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি, মা'আজ বিন জাবাল কিয়ামত দিবসে ওলামাদের সামনে বড়ই মর্যাদার সাথে আবির্ভূত হবেন।
ইমাম আহমদ মুসনাদ গ্রন্থে লিখেছেন, আবু রাফে' বলেন, মৃত্যুর সময় খিলাফতের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে হযরত উমর (রা.) বলেন, আমি আমার সাথীদের মধ্যে ব্যাপক লোভ দেখতে পাচ্ছি। সালিম মাওলা আবু হুযায়ফা অথবা আবু উবাদা বিন জাররাহ জীবিত থাকলে তাঁদের সম্পর্কে অবশ্যই তোমাদের বলে যেতাম।
হযরত উমর (রা.) যিলহজ্জ মাসের ২৬ তারিখ বুধবারে আহত হন এবং মুহাররম মাসে রবিবারে রাতে তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর বয়স নিয়ে মতের ভিন্নতা রয়েছে। ৬৩, ৬৬, ৬১, ৬০, ৫৯, ৫৪ অথবা ৫৫ বছর বেঁচে ছিলেন তিনি। ওয়াকেদীর মতে তাঁর বয়স ৬০ বছর। হযরত সহীব জানাযার নামায পড়ান। তাহযীব গ্রন্থে রয়েছে, তাঁর আংটিতে খোদাই করে লিখে ছিল- 'কাফা বিল মাওতি ওয়া ইজান' (উপদেশ দাতা হিসেবে মৃত্যুই যথেষ্ট)।
তাবারানী তারেক বিন শিহাব থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উম্মে আয়মান বলেন, হযরত উমর শহীদ হওয়ার পর থেকে ইসলাম দুর্বল হয়ে পড়ে। আব্দুর রহমান বিন ইয়াসার বলেন, হযরত উমরের মৃত্যুর দিন সূর্যগ্রহণ হয়েছিল।
📄 প্রথম প্রবর্তিত বিষয়সমূহ:
আসকারী বলেন, সর্বপ্রথম আমিরুল মুমিনীন বলে হযরত উমরকে সম্বোধন করা হয়। তিনিই সর্বপ্রথম হিজরী বর্ষ, বাইতুল মাল, তারাবীহ, মদ পানকারীকে আশি চাবুক মারার বিধান, নিকাহে মোতা হারাম, বাঁদীর সন্তানদের ব্যবসা করা নিষিদ্ধ, জানাযার নামাযে চার তাকবীর দেওয়া, দফতর প্রতিষ্ঠা করা, অনেক বিজয় লাভ করেন, ভূমির পরিমাপ করণ, সামুদ্রিক পথে মিসর থেকে মদীনায় ফল-মূল আমদানী করেন, সদকার অর্থ ইসলামের কাজে ব্যবহার না করা, ফারায়েজ শাস্ত্রে পরিত্যক্ত সম্পত্তি অংশীদারগণের মধ্যে বণ্টন করার সময় কিছু অংশ অতিরিক্ত হয়ে গেলে তা পুনর্বণ্টন করার আইনটি সংযুক্ত করেন, ঘোড়ার যাকাত আদায় করেন এবং হযরত আলীর ব্যাপারে ঘোষণা করেন- 'দাক্কাল্লাহু বি ইযনিল্লাহি বাকাআকা' (আল্লাহ তাঁর নির্দেশে আপনার স্থায়িত্ব বৃদ্ধি করুন)। আসকারী বর্ণনা করেন, ইমাম নববী তাহযীব গ্রন্থে লিখেছেন, তিনি সর্বপ্রথম চাবুক মারার বিধান প্রবর্তন করেন। ইবনে সাদ বলেন, চাবুক মারার বিধান প্রবর্তনের পর থেকে একথা প্রসিদ্ধ হয়ে যায় যে, উমরের চাবুক তোমার তলোয়ারের চেয়েও ভয়ঙ্কর।
নব্বী (র.) বলেন, তিনি সর্বপ্রথম শহরগুলোতে বিচারক নিয়োগ এবং কুফা, বসরা, শাম, মিসরে রাজস্ব আদায় করেন। ইবনে আসাকির ইসমাঈল বিন যিয়াদ থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আলী বিন আবু তালিব রমযান মাসে এক মসিজদের পাশ দিয়ে যাবার সময় সেখানে প্রদীপ জ্বলতে দেখে বললেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত উমরের কবরকে আলোকিত করেছেন, আর তিনি আমাদের মসজিদ আলোকোজ্জ্বল করেছেন।
এগারোতম পরিচ্ছেদ
ইবনে সাদ বলেন, হযরত উমর একটি গুদাম নির্মাণ করে সেখানে আটা, ছাতু, খেজুর, শুষ্ক কিসমিস ইত্যাদি মুসাফিরদের জন্য সংরক্ষণ করতেন। তিনি এ গুদাম থেকে মক্কা মদীনার পথে যাতায়াতকারীদের সেবাদান করতেন। তিনি মসজিদে পাথরের মেঝে তৈরি করেন। হিজাজের ইহুদীদের শামে এবং নজরানের ইহুদীদের কুফায় নির্বাসন দেন। তিনিই মাকামে ইবরাহীমকে বর্তমান স্থানে স্থাপন করেন। পূর্বে তা কাবা সংলগ্ন ছিল।
📄 কতিপয় ঘটনাবলী:
আসকারী আওয়ায়েল গ্রন্থে, তাবারানী কাবীর গ্রন্থে এবং হাকেম ইবনে শিহাব থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উমর বিন আব্দুল আযীয আবু বকর বিন সুলায়মান বিন আবী হাশামাকে আমিরুল মুমিনীন শব্দদ্বয়ের উৎস, কারণ ও প্রবর্তণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আমার নিকট বন্ধক রাখা শিফায়া-এর জনৈক রমণী এ ব্যাপারে আমাকে বলেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীকের পক্ষ হতে খলীফাতুর রাসূল লিখা হতো। হযরত উমরের শাসনামলের প্রথম দিকেও তাই লিখা হতো। একদা হযরত উমর ইরাকের শাসনকর্তার নিকট দু'জন চালাক ব্যক্তিকে মদীনায় পাঠানোর সংবাদ দিলে ইরাক শাসনকর্তা খলীফার কাছে লাবীদ বিন রাবীআ এবং আদী বিন হাতেমকে পাঠালেন। তাঁরা মদীনায় এলে সর্বপ্রথম হযরত আমর বিন আসের সাথে সাক্ষাত হয়। তাঁরা তাঁকে বললেন, আমিরুল মুমিনীনের খেদমতে আমাদের পৌঁছে দিন। হযরত আমর বিন আস বললেন, আল্লাহর কসম! আপনারা চমৎকার উপাধি চয়ন করেছেন। অতঃপর তিনি হযরত উমরের দরবারে উপস্থিত হয়ে বললেন আসসালামু আলাইকুম ইয়া আমিরুল মুমিনীন! হযরত উমর বললেন, তুমি এ সম্বোধন কোথায় শিখলে? তিনি ঘটনার বিবরণ দিয়ে বললেন, সত্যিই তো আপনি আমীর, আর আমরা মুমিন। সুতরাং সেদিন থেকেই সরকারী কাগজপত্রে আমিরুল মুমিনীন সংযুক্ত হয়।
ইমাম নব্বী তাহযীব গ্রন্থে লিখেছেন, হযরত উমরের এ নামটি আদী ইবনে হাতেম এবং লাবীদ বিন রাবী'আ ইরাক থেকে আসার পর চয়ন করেন। কারো মতে মুগীরা বিন শো'বা এ উপাধি দেন। অন্য রেওয়ায়েতে রয়েছে, হযরত উমর লোকদের বলেন, তোমরা মুমিন। লোকেরা বললেন, আপনি আমাদের আমীর। সেদিন থেকে তিনি আমিরুল মুমিনীন নামে প্রসিদ্ধ হয়ে যান। ইতোপূর্বে খলীফাতু রাসূলুল্লাহ (সা.) লিখা হতো। এটা অনেক বড় উপধি হওয়ায় তা বাদ দেয়া হয়।
ইবনে আসাকির মুয়াবিয়া বিন কুরাহ থেকে রেওয়ায়েত করেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক 'খলীফাতু রাসূলুল্লাহ' লিখতেন। হযরত উমরের শাসনামলে লোকেরা 'খলীফাতু রাসূলুল্লাহ' লিখতে চাইলে হযরত উমর (রা.) বললেন, এটা অনেক বড় বোঝা। তখন লোকেরা বলল, আপনি আমাদের আমীর। তিনি বললেন, আমি তোমাদের আমীর, তোমরা মুমিন। তখন থেকে আমিরুল মুমিনীন লিখা শুরু হয়। ইমাম বুখারী স্বরচিত ইতিহাস গ্রন্থে ইবনে মাসীব থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উমর হযরত আলীর পরামর্শ ১৬ হিজরীতে ইতিহাস লিখতে আরম্ভ করেন।
সালাফী তুয়ূরিয়াত গ্রন্থে হযরত ইবনে উমর থেকে রেওয়ায়েত করেন, এক শত বিজয় গাঁথা লিখানোর ইচ্ছায় এজন্য এক মাস ইসতেখারা করেন। অতঃপর লিখানোর অভিপ্রায় পোষণের পর তিনি বললেন, পূর্ববর্তী জাতিও গ্রন্থ রচনা করে আল্লাহর কিতাব ছেড়ে সেদিকেই ঝুঁকে পড়ে।
ইবনে সাদ শাদ্দাদ থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উমর বাইআতের পর সর্বপ্রথম মিম্বরে আরোহণ করে এ দু'আ করেন, হে আল্লাহ! আমি কঠোর, আমাকে নরম করে দাও। হে আল্লাহ! আমি দুর্বল, আমাকে শক্তি দাও। আমাকে দানশীল বানিয়ে দাও।
ইবনে সাদ এবং সাঈদ বিন মানসুর হযরত উমর থেকে বর্ণনা করেন, আমি আল্লাহর সম্পদের রক্ষক। আমি হত দরিদ্র। আমার কাছে কিছু থাকলে আমি বাঁচব। আমি মুখাপেক্ষী হলে কর্জ করব। যখন সম্পদ আসবে তখন তা শোধ করব।
ইবনে সাদ ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উমরের প্রয়োজন হলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের (বাইতুল মালের) দারোগার কাছ থেকে কর্জ নিতেন। একবার দারোগা তার পাওনা চাইলেন। সে সময় হযরত উমর (রা.) ভীষণ অর্থ সংকটে থাকায় পাওনা পরিশোধ করতে পারছিলেন না। দারোগা পীড়াপীড়ি করায় তিনি কর্জ করে তা শোধ করেন।
ইবনে সাদ বারা বিন মারুর থেকে বর্ণনা করেন, একদিন লোকেরা হযরত উমরকে তাঁর জন্য বাইতুল মালে রক্ষিত মধুর কথা বললেন, তিনি বললেন, তোমরা অনুমিত দিলে আমি তা গ্রহণ করতে পারি। অন্যথায় সে মধু আমার জন্য হারাম। লোকেরা অনুমতি দিল।
সালেম বিন আব্দুল্লাহ বলেন, একদা হযরত উমর উটের পেটের নিম্নদেশে সৃষ্ট ক্ষতস্থান পরিষ্কার করতে করতে বললেন, আমার ভীষণ ভয় করছে, আল্লাহ তা'আলা যদি কিয়ামত দিবসে এর পরিচর্যার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন!
ইবনে উমর (রা.) বলেন, হযরত উমর জাতিকে কোনো কাজ নিষেধ করার পূর্বে গৃহস্থ লোকদের বলতেন, তোমরা তা করলে দ্বিগুন শান্তি পাবে।
হযরত উমর (রা.) রাতের আঁধারে মদীনার অলিগলি চষে ফিরতেন। এক রাতে তিনি এক মহিলাকে দরজা বন্ধ করে এ কবিতা আবৃত্তি করতে শোনেন- "রাত প্রলম্বিত হয়েছে। তারকারাজি বাসর সাজিয়েছে। আমাকে জাগ্রত রেখেছে-" আমার সাথে কেউ নেই যার সাথে আমি শুতে যাব" এ তীব্র বাসনা। আল্লাহর কসম! আল্লাহর শাস্তির ভয় না থাকলে পশুদের মত আচরণ ও বিচরণ করতাম। কিন্তু আমি তাঁর পর্যবেক্ষণকে ভয় পাচ্ছি, যাঁর ফেরেশতাদ্বয় কোনো সময় গাফেল নন।' পরদিন তিনি সঙ্গে সঙ্গে রণাঙ্গনগুলোর সিপাহসালারদের এ মর্মে পত্র লিখলেন যে, কোনো ব্যক্তি যুদ্ধ ক্ষেত্রে চার মাসের বেশি থাকতে পারবে না।
ইবনে সাদ সালমান থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উমর সালমানকে জিজ্ঞেস করেন, আমি বাদশাহ না খলীফা? সালমান জবাবে বলেন, আপনি যদি মুসলমানদের নিকট থেকে রাজস্ব আদায় করে অনর্থক খরচ করেন তাহলে আপনি বাদশাহ। অন্যথায় আপনি খলীফা। হযরত উমর তাঁর একথা থেকে উপদেশ গ্রহণ করেন।
সুফিয়ান বিন আবীল আরজা বলেন, একদিন হযরত উমর বলেন, আমি জানি না আমি বাদশাহ না খলীফা? যদি আমি বাদশাহ হই তবে আমি হলাম সমাজের বোঝা। উপস্থিত জনতার মধ্যে থেকে একজন বললেন, আমিরুল মুমিনীন! খলীফা এবং বাদশাহর মধ্যে অনেক বড় পার্থক্য রয়েছে। তিনি বললেন, সেটা কি? সে বলল, খলীফা তিনি যিনি অনর্থক রাজস্ব আদায় করেন না অহেতুক খরচও করেন না। আলহামদুলিল্লাহ! আপনি এমন নন। আর বাদশাহ অত্যাচারের মাধ্যমে কর আদায় করেন। এ কথা শুনে হযরত উমর নীরব হয়ে গেলেন।
ইবনে মাসউদ বলেন, একদা তিনি অশ্বে আরোহণের সময় নাজরানের ইহুদীরা তাঁর পায়ের এক দিকে কালো চিহ্ন দেখে বলল, আমাদের প্রাচীন গ্রন্থসমূহে লিপিবদ্ধ রয়েছে যে, এ ব্যক্তি আমাদেরকে আমাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করবেন।
সাদ জারী বলেন, কা'বে আহবার হযরত উমরকে বলেন, আমি পূর্ববর্তী নবীদের কিতাবগুলোতে দেখেছি, আপনি জাহান্নামের দরজায় দাঁড়িয়ে লোকদের এ পথে চলতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু আপনার ইন্তেকালের পর কিয়ামত পর্যন্ত এতে লোক পড়তেই থাকবে।
আবু মু'আশির বলেন, আমি আমার শিক্ষকের নিকট থেকে শুনেছি হযরত উমর বলেন, সংস্কার করা না পর্যন্ত এতটুকু কঠোরতা করা যাবে না যা অত্যাচারের পর্যায়ে পড়ে। আবার খুব হালকাও করা যাবে না।
ইবনে আবী শাইবা মুসান্নাফ গ্রন্থে হাকেম বিন উমাইর থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উমর অধীনস্থ প্রশাসকদের শয়তান যেন কুফরীর দলে ভিড়াতে না পারে এমনভাবে লোকদের চাবুকাঘাত করতে নিষেধ করেন।
ইবনে আবী হাতিম স্বরচিত তাফসীর গ্রন্থ শা'বী থেকে বর্ণনা করেন, একদা রোম সম্রাট হযরত উমরের নিকট এ মর্মে পত্র লিখেন যে, আমার দূত আপনার নিকট গিয়েছিল। ফিরে এসে সে আমাকে জানালো, আপনার কাছে এমন একটি বৃক্ষ রয়েছে, যার জন্ম অন্য বৃক্ষে থেকে নয়। সে বৃক্ষের আকৃতি গাধার কানের মত। এর ফল মতির সাদৃশ্য, ফাটলে জমরুদ পাথরের ন্যায় সবুজ এবং ইয়াকুত পাথরের ন্যায় লাল বর্ণ হয়ে ঝরে পড়ে। ফলটি পরিপক্ক হয়ে পাক ধরলে তা এক প্রকার জেলি হয়। আর শুষ্ক হলে বিশেষ আহার্যে পরিণত হয়। আমার দূত যদি সত্য বলে তাহলে স্বর্গীয় বৃক্ষ আমার কাছেও থাকা প্রয়োজন। হযরত উমর এর জবাবে লিখেন, আপনার দূত সত্য বলেছে সে বৃক্ষ আমার কাছে রয়েছে। সে বৃক্ষ থেকে হযরত ঈসা (আ.) জন্মগ্রহণ করেন। আল্লাহ তা'আলা হযরত মারইয়াম (আ.)-এর মাধ্যমে তাঁকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা'আলাাকে ভয় করুন। হযরত ঈসা (আ.) কে প্রভু জ্ঞান করবেন না। কারণ তিনি হযরত আদম (আ.)-এর মত মাটির তৈরি।
ইবনে সাদ ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উমর অধীনস্থ প্রশাসকের স্ব স্ব সম্পত্তির হিসাব চেয়ে পাঠালে হযরত সাদ বিন আবী ওয়াক্কাসসহ সকলেই তা প্রদান করেন। তিনি এর অর্ধেকটা রেখে বাকী অর্ধেকটা প্রশাসকদের নিকট পাঠিয়ে দেন।
শা'বী বলেন, হযরত উমর প্রশাসক নিয়োগের পূর্বে তার সম্পদের তালিকা জমা দিতেন। আবু উমামা বিন সহল বিন হানীফ লিখেছেন, তিনি কিছুদিন পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে কোনো ভাতা গ্রহণ না করায় ভীষণ অর্থ সংকটে পতিত হওয়ায় রসূলের সাহাবীদের নিয়ে পরামর্শে বলেন, আমি তো খিলাফতের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকি। নিজের রুজি রুটির ব্যবস্থা করতে পারি না। হযরত আলী বললেন, সকাল সন্ধ্যার খাবার রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে গ্রহণ করতে পারেন। হযরত উমর তাই করেন।
হযরত ইবনে উমর বলেন, হযরত উমর হজ্জ করতে গিয়ে ষোলো দিনার খরচ করে এসে আমাকে ডেকে বলেন, আব্দুল্লাহ আমি অনেক খরচ করে ফেলেছি।
আব্দুর রায্যাক মুসান্নাফ গ্রন্থ কাতাদা এবং শ'বী থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উমরের কাছে এক মহিলা এসে বলল, হে আমিরুল মুমিনীন! আমার স্বামী দিনে রোযা রাখেন এবং সাত রাত নামাযে কাটিয়ে দেন। তিনি বললেন, তোমার স্বামী প্রশংসাযোগ্য কাজ করেছেন। সেখানে কা'ব বিন সওয়ার উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, আমিরুল মুমিনীন! এ মহিলা স্বামীর প্রশংসা করছে না; বরং অভিযোগ পেশ করেছেন। হযরত উমর বললেন, কেন এ অভিযোগ? কা'ব বললেন, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কিছু অধিকার রয়েছে সে জন্য। হযরত উমর বললেন, এখন বিষয়টি বুঝতে পারলাম। নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে ইনসাফ করা দরকার। কা'ব বললেন, হে আমিরুল মুমিনীন। আল্লাহ তা'আলা পুরুষের জন্য চারজন নারী বৈধ করেছেন। এ দৃষ্টিকোণ থেকে চতুর্থ একজন নারীর প্রাপ্য।
ইবনে জারীর বলেন, আমার বিশ্বস্ত বন্ধু আমাকে বলেছেন, হযরত উমর রাতে জনৈক মহিলাকে কবিতা আবৃত্তি করতে শুনে জিজ্ঞেস করলেন তোমার কি হয়েছে? মহিলা বলল, ক'মাস পূর্বে আমার স্বামী যুদ্ধে গেছে। তার প্রেমে এ কবিতা গাঁথা আবৃত্তি করছি। তিনি বললেন, তুমি অবৈধ কাজে জড়িত নও তো? সে বলল, আল্লাহ ক্ষমা করুন। তিনি মহিলাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করো। আগামি কল্যই তোমার স্বামীকে এনে দিচ্ছি। সকালে তিনি ঐ মহিলার স্বামীকে ডেকে আনার জন্য রণাঙ্গনে দূত পাঠান। অতঃপর তিনি তাঁর মেয়ে হাফসার কাছে গিয়ে বললেন, আমি দারুণ এক মুসিবতের মধ্যে পড়েছি। আমাকে উদ্ধার করো। একজন নারীর কতদিন পর্যন্ত তার স্বামীর প্রয়োজন হয় না? হযরত হাফসা লজ্জায় মাথা নিচু করেন এবং নীরব হয়ে যান। হযরত উমর বললেন, আল্লাহর কাজে লজ্জা করতে নেই। হযরত হাফসা হাতের ইশরারায় জানিয়ে দিলেন, তিন অথবা চার মাস। অতঃপর হযরত উমর যুদ্ধরত সৈনিকদের চার মাসের বেশি রণাঙ্গনে আটকে রাখতে গর্ভনরদের নিষেধ করেন।
হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ বলেন, আমি হযরত উমরকে স্ত্রীদের ঠাট্টা বিদ্রূপ করার অভিযোগ জানালে তিনি বললেন, আমিও তো স্ত্রীদের ঠাট্টায় বিব্রত। এমনকি আমি কোথও গেলে তারা আমাকে বলে, আপনি অমুক গোত্রের যুবতীদের সাথে দেখা করার জন্য যাচ্ছেন। এছাড়া আপনার কোন কাজ নেই। সেখানে হযরত ইবনে মাসউদ বসেছিলেন। তিনি বললেন, হে আমিরুল মুমিনীন! আপনার কি জানা নেই যে, হযরত ইবরাহীম (আ.) হযরত সারার দুর্ব্যবহারের অভিযোগ স্বয়ং আল্লাহ তা'আলার নিকট দায়ের করলে তিনি এ উত্তর পান যে, নারীদের পেছনের বাম দিক থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে।
ইকরামা বিন খালিদ বলেন, একদা হযরত উমরের মেয়ে চুলে চিরুনী এবং সুন্দর পোশাক পরে তার সামনে এলে তিনি এমন জোরে চাবুকাঘাত করেন যে, সে কাঁদতে লাগল। হযরত হাফসা এসে বললেন, তাকে কোন অপরাধের কারণে মেরেছেন? তিনি বললেন, আমি তার মধ্যে অহংকার জাগ্রত হতে দেখে তা দূর করলাম মাত্র।
লাইছ বিন সালিম বর্ণনা করেন, হযরত উমর বলেন, তোমরা কারো নাম হাকীম এবং আবুল হাকীম রেখ না। কারণ তা স্বয়ং আল্লাহর নাম।
বায়হাকী শু'আবুল ইমাম গ্রন্থে যাহাক থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক বলতেন, আল্লাহর কসম! আমার নিকট এতটাই প্রিয় যে, আমি রাস্তার পার্শ্বে একটি বৃক্ষ হতাম, আর উট আমাকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলত, অতঃপর বিষ্টা হয়ে আমাকে ত্যাগ করত, তথাপি যদি মানুষ না হতাম। হযরত উমর বলতেন, যদি আমি গৃহপলিত পশু হতাম। আমাকে খাওয়ায়ে মোটাতাজা করত। লোকেরা আমাকে দেখতে আসত। অতঃপর কোন মেহমানের সম্মানার্থে আমাকে যবেহ করে আমার কিছু গোশত রান্না এবং কিছু গোশত কোপ্তা করে খেয়ে ফেলত তবুও যদি মানুষ না হতাম।
ইবনে আসাকির আবুল বোখতারী থেকে বর্ণনা করেন, একদা হযরত উমর মিম্বরে দাঁড়িয়ে অভিভাষণ প্রদানের সময় হযরত হোসাইন বিন আলী দাঁড়িয়ে বললেন, এ মিম্বর আমার বাবার, আপনার বাবার নয়। কিন্তু বল এ কথা তোমাকে কে শিখিয়ে দিয়েছেন? হযরত আলী দাঁড়িয়ে বললেন, আল্লাহর কসম! এটি আমি শিখিয়ে দেইনি। অতঃপর হযরত হোসাইনের পানে মুখ ফিরিয়ে বললেন, আমি তোমাকে কঠোর শাস্তি দিব। হযরত উমর বললেন, সত্য কথার প্রেক্ষিতে কেন আপনি তার সাথে ঝগড়া করেছেন। নিশ্চয়ই এ মিম্বর তার বাবার। (এর সূত্রগুলো বিশুদ্ধ)।
খাতীব আবু সালমা বিন আব্দুর রহমান এবং সাঈদ বিন মুসায়্যাব থেকে রেওয়ায়েত করেন, একবার হযরত উমর এবং হযরত উসমান মাসয়ালা নিয়ে ভীষণ তর্ক করেন। লোকেরা মনে করল তাদের আর বনিবনা হবে না। কিন্তু তারা সেখান থেকে যাবার পর উভয়ের মাঝে এমন সুসম্পর্ক গড়ে উঠে যে, মনে হল আর তাদের মধ্যে বিতর্ক হবে না।
ইবনে সাদ হযরত হাসান (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উমর (রা.) সর্বপ্রথম যে খুতবা পাঠ করেন তাতে হামদ ও সানার পর বলেন, জেনে রেখ আমি তোমাদের সাথে একীভূত হয়েছি, তোমরাও আমার সাথে একীভূত হয়ে যাও। আমি আমার দুই বন্ধুর পর খলীফা হয়েছি। যারা উপস্থিত রয়েছ আমি তাদের সাথে রয়েছি। আর যারা অনুপস্থিত আমরা তাদের প্রাপ্যকে তাদের জন্যই সংরক্ষণ করব। যারা সৎকাজ করবে তাদের জন্য সদাচরণ, আর যারা অসৎ কাজ করবে আমরা তাদের শান্তি দিব। আল্লাহ তা'আলা আমাদের ক্ষমা করুন।
জবের বিন হুয়াইরিছ কর্তৃক বর্ণিত, হয়রত উমর (রা.) দফতর প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলমানদের সাথে পরমার্শে বসলে হযরত আলী (রা.) বললেন, প্রতি বছর যে পরিমাণ সম্পদ জমা হবে তা আপনার কাছে না রেখে ভাগ করে দিবেন। হযরত উসমান (রা.) বললেন, সম্পদের পরিমাণ অতিরিক্ত হলে ভাগ করে দিলেও হিসাব সংরক্ষণ করা মুশকিল হবে। ওলীদ বিন হিশাম বিন মুগীরা বললেন, আমি সিরিয়ায় দেখেছি সেখানে রোম সম্রাট বিভিন্ন দফতর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সৈনিকদের সমবেত করেন। এ কথাটি তাঁর ভালো লাগল এবং তিনি তাই করলেন।
হযরত আকীল বিন আবু তালিব, মুখরিমা বিন নওফেল এবং জাবের বিন মুতইম কুরাইশদের বংশ পরম্পরা সম্পর্কে বিস্তর জ্ঞান রাখতেন। তিনি তাদেরকে এমনভাবে নসবনামা রচনার নির্দেশ দিলেন যেন নবী আকরাম (সা.)- এর নসবনামার বিবরণের সাথে সকল বংশ পরম্পরার যুক্ত হয়।
সাঈদ বিন মুসায়্যাব কর্তৃক বর্ণিত, হযরত উমর (রা.) প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে ২০ হিজরীতে বিভিন্ন দফতর প্রতিষ্ঠা করেন। হযরত হাসান (রা.) বলেন, হযরত উমর লোকদের ভাতা বাদেও দান করার জন্য হযরত হুযায়ফার নিকট পত্র পাঠালেন। তিনি প্রচুর পরিমাণে দান করার পরও বিপুল অর্থ সম্পদ বেঁচে যাওয়ার কথা খলীফাকে জানালে তিনি বললেন, আবার দান করে দাও। এ সম্পদ উমর অথবা তার সন্তানদের নয়।
হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) বলেন, হযরত উমর (রা.) উম্মত জননীদের সাথে সর্বশেষ হজ্জ করেন। আরাফাত থেকে ফেরার পথে আমি শুনলাম একজন অন্যজনকে বলছে, আমিরুল মুমিনীন কোথায়? অন্যজনকে বলতে শুনলাম, সে বলছে, তিনি এখানেই আছেন। অতঃপর লোকটি উটকে বসিয়ে এ কবিতা আবৃত্তি করছে- "হে নেতা আপনার প্রতি সালাম। হে আল্লাহ! ক্ষত বিক্ষত শরীরে বরকত দাও।" এ কবিতা পাঠান্তে সে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমরা ধারণা করলাম সে জ্বিন হবে। হজ্জ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি শহীদ হন।
আব্দুর রহমান বিন আবযা বলেন, হযরত উমর (রা.) বলেছেন, এ খিলাফতের প্রথম হকদার বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবীগণ। অতঃপর উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবীগণ। অতঃপর অন্যান্যরা। মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম গ্রহণকারীরা তৎপূর্ব মুসলমানরা জীবিত থাকা পর্যন্ত তারা খিলাফতের হকদার নন।
নাখয়ী কর্তৃক বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি হযরত উমর (রা.) কে জিজ্ঞেস করল, আপনি কি আপনার পুত্র আব্দুল্লাহকে খলীফা মনোনীত করবেন না? তিনি বললেন, আল্লাহ তোমাকে ধ্বংস করুন। আল্লাহর কসম! আমি এমন লোককে খলীফা মনোনীত করার জন্য প্রার্থনা করব না, যে এখনও সুন্দর পথে নিজের স্ত্রীকে তালাক দেবার ক্ষমতা অর্জন করেনি।
শাদ্দাদ বিন আউস হযরত কাব থেকে বর্ণনা করেন, বনী ইসরাঈলের এক বাদশাহর সাথে হযরত উমরের কার্যক্রমের অনেকটা মিল ছিল। আমরা এদের একজনের আলোচনা করলে অপরজনের স্মরণ পড়ত। বনী ইসরাঈলের সেই বাদশাহর যুগে এক নবী ছিলেন। তাঁকে ওহীর মাধ্যমে জানানো হলো আপনি বাদশাহকে জানিয়ে দিন তিনি আর মাত্র তিনদিন বেঁচে থাকবেন। সুতরাং তাঁকে রাষ্ট্রনায়ক মনোনীত করতে বলুন এবং ওসীয়ত করতে চাইলে তা করুন। তৃতীয় দিবসে বাদশাহ অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, হে আল্লাহ! আমার ছেলে যুবক হওয়া পর্যন্ত আমার হায়াতকে বৃদ্ধি করুন। আপনি জানেন আমি আপনার আদেশ কিভাবে মান্য করেছি। কিভাবে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছি, আমি কোনো সময় আপনার হুকুমের অবাধ্য হইনি। আল্লাহ তাআলা নবী (আ.) কে ওহীর মাধ্যমে বাদশাহর দু'আর বিবরণ দানে জানিয়ে ছিলেন, সে সবগুলোই সত্য বলেছে। ফলে আমি তার হায়াত পনেরো বছর বৃদ্ধি করে দিলাম, যাতে পূর্ণ যৌবন প্রাপ্ত হতে পারে। হযরত কাবে আহবার হযরত উমর বর্শাঘাতে আহত হবার সময় এ ঘটনার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, হযরত উমরও আল্লাহর নিকট এ দু'আ করলে তিনি আরো জীবিত থাকবেন, তিনি এ ঘটনা জানতে পেয়ে এ দু'আ করেন, "হে আল্লাহ! আমাকে সুস্থ না করেই উঠিয়ে নাও"।
সুলায়মান বিন ইয়াসার বলেন, তাঁর মৃত্যুতে জ্বিন জাতিও বিলাপ করেছে। হাকেম হযরত মালিক বিন দিনার (রহ.) থেকে রেওয়ায়েত করেন, তিনি শহীদ হওয়ার পর ইয়ামানের পাহাড়ের দিক থেকে এ কবিতার আওয়াজ ভেসে আসে- "যারা ইসলামের জন্য কাঁদে তারা কাঁদতে থাক, সে দিন বেশি দূরে নয় যখন মানুষ ধ্বংস হবে, অথচ নবীর যুগ গত হওয়া বেশি দিন হয়নি। পৃথিবী উল্টে গেছে, কারণ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সন্তান চলে গেছেন।"
ইবনে আবীদ দুনিয়া ইয়াহইয়া বিন আবী রাশেদ বসরী থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উমর তার ছেলেকে ওসীয়ত করেন, আমার কাফনে অনর্থক খরচ করবে না। কারণ যদি আমি আল্লাহ তাআলার কাছে ভাল হই তাহলে তিনিই প্রতিদান দিবেন। আর ভাল না হলে তিনি তা ছিনিয়ে নিবেন, তাই এ অতিরিক্তের প্রয়োজন নেই। আমার কবর লম্বা করার প্রয়োজন নেই। কারণ আমি আল্লাহ তাআলার কাছে সুপ্রশস্ত কবরের অধিকারী হলে তিনি সে ব্যবস্থা করে দিবেন, অন্যথায় তিনি আমার কবর সংকুচিত করে দিবেন, এতে আমার সকল হাড়গোড় ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। আমার জানাযার সাথে কোনো নারী যেতে পারবে না। আমি যা নই তা বলে আমাকে স্মরণ করবে না। কারণ আল্লাহ তা'আলা গায়েব জানেন। তিনি আমার সম্পর্কেও জানেন। আমাকে খুব দ্রুত সমাহিত করার ব্যবস্থা করবে।
বারোতম পরিচ্ছেদ
ইবনে আসাকির হযরত আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, আমি হযরত উমরের ইন্তেকালের এক বছর পর আল্লাহ তা'আলার কাছে তাঁকে স্বপ্নে দেখার জন্য দু'আ করলাম। এক বছর পর স্বপ্নে হযরত উমরকে কপালের ঘাম মুছতে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কেমন আছেন? তিনি বললেন, আমি হিসাব দিয়ে সবেমাত্র ছাড়া পেলাম। আল্লাহ যদি দয়াশীল না হতেন তাহলে উমর অপদস্ত হতো।
যায়েদ বিন আসলাম কর্তৃক বর্ণিত, আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস স্বপ্নে হযরত উমরকে জিজ্ঞেস করেন, আল্লাহ তা'আলা আপনার সাথে কেমন আচরণ করেছেন? তিনি প্রতিউত্তরে প্রশ্ন করেন, আমি তোমাদের থেকে কবে পৃথক হয়েছি? তিনি উত্তর দিলেন, বারো বছর পূর্বে। তিনি বললেন, আমি হিসাব দিয়ে এই মাত্র এলাম।
ইবনে সাদ সালিম বিন আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, আমি এক আনসারের কাছে শুনেছি, তিনি হযরত উমরকে স্বপ্নে দেখার দু'আ করায় দশ বছর পর স্বপ্নে তাঁকে কপালের ঘাম মুছতে দেখে জিজ্ঞেস করেন, হে আমিরুল মুমিনীন! আপনি কি করছেন? তিনি বললেন, হিসাব দিয়ে এই মাত্র এলাম। আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ আমার সাথে না থাকলে আমি ধ্বংস হয়ে যেতাম।
অনেক বিখ্যাত লোকেরা হযরত উমরের শোকগাঁথা রচনা করেছেন। ছোট পরিসরের কারণে আমরা তা সন্নিবেশিত করলাম না।
হযরত উমর ফারুক (রা.)-এর শাসনামলে নিম্নে উল্লিখিত সাহাবাগণ ইন্তেকাল করেন - উতবা বিন গাযওয়ান, আলা বিন হাযরামী, কায়েস বিন সুকন, হযরত সিদ্দীকে আকবরের সম্মানিত পিতা আবু কুহাফা, সাদ বিন উবাদা, সোহেল বিন উমর, ইবনে উম্মে মাকতুম, আয়শ বিন আবী রাবীআ, আব্দুর রহমান, যুবায়ের বিন আওয়ামের ভাই আবী সআসআ (তিনি কুরআন শরীফ একত্রিতকরণের মহান দায়িত্ব পালন করেন), নওফেল বিন হারিছ বিন আব্দুল মুত্তালিব, আবু সুফিয়ান বিন হারিছ বিন আব্দুল মুত্তালিব, রাসূলুল্লাহ (সা.)- এর পুত্র হযরত ইবরাহীম (রা.)-এর সম্মানিত জননী উম্মুল মোমিনীন হযরত মারিয়া, আবু উবাদা বিন জাররাহ, মাআয বিন জাবাল, ইয়াযিদ বিন আবু সুফিয়ান, উবাই বিন কাব, বিলাল, উসাইদ বিন হাযীর, শরাহবীল বিন হুসনা, ফজল বিন আব্বাস, আবু জন্দল বিন সোহেল, আবু মালিক আল আশআরী, সাফওয়ান বিন মোতাল, বারা বিন মালিক, হযরত আনাসের ভাই, উম্মত জননী যয়নব বিনতে জাহাশ, আয়য বিন গানাম, আবুল হাইছাম বিন তাইহান, খালিদ বিন ওলীদ, জারুদ, নোমান বিন মুকরিন, কাতাদা বিন নোমান, আকরা বিন হাবেস, সওদা বিনতে যামাআ, আওয়ীম বিন সাআদাহ, গায়লান ছাকাফী, আবু মুহজিন ছাকাফী প্রমুখ। (রাদি আল্লাহু আনহুম)