📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 হযরত উমরের অভিমতের সাথে কুরআনের ঐকমত্য:

📄 হযরত উমরের অভিমতের সাথে কুরআনের ঐকমত্য:


ইবনে মারদুয়া মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উমর যে রায় দিতেন অনূরূপভাবেই কুরআন শরীফের আয়াত অবতীর্ণ হতো।

ইবনে আসাকির হযরত আলীর অভিমত নকল করে লিখেছেন, কুরআন শরীফে অধিকাংশ হযরত উমরের রায় উল্লেখ রয়েছে। হযরত ইবনে উমর কর্তৃক মারফুআন বর্ণিত, কতিপয় বিষয়ে লোকদের মতামতের সাথে হযরত উমর ভিন্ন মত পোষণ করলে হযরত উমরের অভিমতের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আয়াত অবতীর্ণ হতো।

বুখারী শরীফ এবং মুসলিম শরীফে রয়েছে, হযরত উমর (রা.) বলেন, আমার প্রতিপালক তিন বার আমার অভিমতের সাথে একমত পোষণ করেছেন। এক. ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি মাকামে ইবরাহীমকে নামাযের স্থান বানাতে চাই। 'ওয়াত্ত্যাকিযূ মিম মাক্বামি ইব্রাহীমা মুসাল্লা'।

দুই. আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার পুণ্যাত্মা বিবিগণের কাছে সব ধরনের লোক যাতায়াত করে। আপনি তাঁদের পর্দা করার নির্দেশ দিন। এরপর পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হয়। তিন. পুণ্যাত্মা বিবিগণ লজ্জা দিলে আমি বললাম- 'আসা রাব্বুহু ইন তাল্লাকাকুন্না আই ইয়ুবদিলাহু আযওয়াজান খাইরাম মিনকুন্না'। অতঃপর আমার উল্লিখিত শব্দগুলোই হুবহু অবতীর্ণ হয়।

ইমাম মুসলিম হযরত উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলা আমার সাথে তিন বিষয়ে একমত, এক. পর্দা, দুই. বদরের যুদ্ধবন্দী এবং তিন. মাকামে ইবরাহীম। এ হাদীসে উল্লিখিত দ্বিতীয় নম্বর বিষয়টির মাধ্যমে চারটি দৃষ্টান্ত জানা গেল।

ইমাম নব্বী তাহযীব গ্রন্থে চারটি বিষয়ে একমত হওয়ার কথা লিখেছেন। এক. বদর যুদ্ধবন্দী, দুই. পর্দা, তিন. মাকামে ইবরাহীম এবং চার. মদের অবৈধতা। এ হাদীসে উল্লিখিত চতুর্থ নম্বর বিষয়টির মাধ্যমে পাঁচটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা হলো।

মদের অবৈধতা সম্পর্কে সুনানা এবং মুসতাদরাকে হাকেম গ্রন্থে রয়েছে একদা হযরত উমর দু'আ করেন, হে আল্লাহ! শরাবের ব্যাপারে আমাদের জন্য কিছু অবতীর্ণ করুণ। অতঃপর শরাব হারাম হওয়ার বাণী নাযিল হয়।

ইবনে আবী হাতেম স্বরচিত তাফসীর গ্রন্থে হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, হযরত উমর (রা.) বলেন, আল্লাহ তা'আলা চারটি বিষয়ে আমার সাথে একমত হয়েছেন। যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয় - 'লাকাদ খালাকনাল ইনসানা মিন সুলালাতিম মিন ত্বীন' তখন এমনিতেই আমার মুখ থেকে বেরিয়ে যায়- 'ফাতাবারাকাল্লাহু আহসানুল খালিকীন' অতঃপর হুবহু এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এ হাদীসের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা হযরত উমরের ছয়টি অভিমতের সাথে একমত পোষণ করে ওহী অবতীর্ণ করেছেন বলে জানা গেল। এ হাদীসটি ইবনে আব্বাসের সূত্রে গ্রন্থকার তাফসীরে মুসনাদ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

মাস্নাফ আবু আব্দুল্লাহ শীবানী কর্তৃক প্রণীত কিতাবে ফাজাইলুল উম্মাহ্ গ্রন্থে রয়েছে, হযরত উমরের সাথে তাঁর প্রতিপালক একুশ জায়গায় একমত হন। এর মধ্যে ছয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। সপ্তম, আব্দুল্লাহ বিন উবাই-এর মৃত্যু হলে রাসূলুল্লাহ (সা.) লোকদের জানাযার জন্য সমবেত হতে বললে আমি হযরতের সামনে গিয়ে বললাম ইয়া রাসূলাল্লাহ! উবাই বিন কাব কঠোর শত্রু ছিল। সে অমুক দিন এই এই কথা বলেছে। আল্লাহর কসম কিছুক্ষণ পর এ আয়াত অবতীর্ণ হয়- 'ওয়ালা তুসাল্লি আলা আহাদিম মিনহুম মাতা আবাদা'

অষ্টম, এক ঘটনার প্রেক্ষিতে এ আয়াত অবতীর্ণ হয় - 'ইয়া আইয়্যাহাল্লাযীনা আমানু লা তাকরাবুস সালাতা...' নবম আরেক ঘটনায় এ আয়াত নাযিল হয়- 'ইয়াসআলুনাকা আনিল খামরি...' গ্রন্থকার বলেন, অষ্টম ও নবম নম্বর ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত আয়াতদ্বয় সপ্তম নম্বর হাদীসের সাথে যুক্ত একই ঘটনার ধারাবাহিকতা।

দশম, রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি সম্প্রদায়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলে আমি বললাম- 'সাওয়াউন আলাইহিম...' তখন হুবহু এ আয়াতটিই নাযিল হলো- 'সাওয়াউন আলাইহিম আসতাগফারতা লাহুম...' তাবারানী এ রেওয়ায়েতটি ইবনে আব্বাসের বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছেন।

একাদশ, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন সাহাবীদের নিয়ে বদর যুদ্ধে যাবার পরামর্শ করছিলেন তখন হযরত উমর যুদ্ধে গমনের পরামর্শ দিলে নাযিল হয়- 'কামা আখরাজাকা রাব্বুকা মিম বাইতিকা...' দ্বাদশ, রাসূলুল্লাহ (সা.) পরামর্শ চাইলে হযরত উমর বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনাকে আয়েশার সাথে কে বিয়ে দিয়েছেন? তিনি বললেন, আল্লাহ। হযরত উমর বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি মনে করেন, আপনার রব আপনাকে ত্রুটিযুক্ত জিনিস দিয়েছেন? অতঃপর এ আয়াত অবতীর্ণ হয়- 'সুবহানাকা হাযা বুহতানুন আজীম'

ত্রয়োদশ, ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ে রমযানের রাতে স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করা হারাম ছিল। হযরত উমর এ বিষয়ে মন্তব্য করলে এ আয়াত নাযিল হয়- 'উহিল্লা লাকুম লাইলাতাস সিয়ামির রাফাসু...' উল্লেখ করেছেন।

চতুর্দশ, এক ইহুদী হযরত উমরকে বলল, তোমাদের নবী যে জিবরাঈলের কথা বলেন তিনি আমাদের দুশমন! হযরত উমর বললেন- 'মান কানা আদুউওআল্লিল্লাহি ওয়া মালাইকাতিহি ওয়া রাসুলিহি ওয়া জিবরিলা ওয়া মিকালা ফাইন্নাল্লাহা আদুউওউল লিলকাফিরিন' অতঃপর হুবহু এ আয়াতই অবতীর্ণ হয়। এ রেওয়ায়েতটি ইবনে জারীর কয়েকটি সূত্রে এবং ইবনে আবী হাতেম আব্দুর রহমান ইবনে আবু ইয়ালা থেকে বর্ণনা করেন।

পঞ্চদশ, রাসূলুল্লাহ (সা.) দু' ব্যক্তির বিবাদ মিমাংসা করে দিলেন একজনের তা মনঃপূত না হওয়ায় সে পুনরায় হযরত উমরের নিকট বিচার প্রার্থনা করায় তিনি তাকে হত্যা করেন। এ খবর পেয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমি উমরের ব্যাপারে এমনটা ধারণা করি না যে, তিনি কোনো মুমিনকে হত্যা করতে পারেন। এ প্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন- 'ফালা ওয়া রাব্বিকা লা ইউমিনুনা...' এ রেওয়ায়েতটি ইবনে আবু হাতিম এবং ইবনে মারদুয়া আবুল আসওয়াদ থেকে বর্ণনা করেন। গ্রন্থকার বলেন, আমি তাফসীরে মুসনাদ গ্রন্থে এ রেওয়ায়েতের বিভিন্ন সূত্র বর্ণনা করছি।

ষষ্ঠদশ, একদিন হযরত উমর স্ব-গৃহে শুয়ে ছিলেন। তাঁর গোলাম অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে তিনি এ দু'আ করেন, হে আল্লাহ! বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করা হারাম করে দিন। সঙ্গে সঙ্গে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। সপ্তদশ, তিনি বলতেন, ইহুদীরা অভিশপ্ত জাতি। এ প্রেক্ষিতে আয়াত অবতীর্ণ হয়।

অষ্টদশ, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- 'সুলাতুম মিনাল আউওয়ালিন ওয়া সুলাতুম মিনাল আখিরিন' এ আয়াতের সাথে সম্পৃক্ত ঘটনাটি ইবনে আসাকির, স্বরচিত ইতিহাস গ্রন্থে জাবের বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন। এ ঘটনাটি উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট।

উনিবিংশ, 'ইযা যানিয়াশ শাইখু ওয়াশ শাইখাতু' এ আয়াতটি মানসুখ তিলাওয়াত। বিংশ, উহুদের যুদ্ধে আবু সুফিয়ান 'ফিল কাওমি ফুলানুন' বললে এর জবাবে হযরত উমর বলেন, 'আল আজাবুন' আর এ কথার সাথে রাসূলুল্লাহ (সা.) একমত পোষণ করেন। এ বর্ণনাটি আহমদ মুসনাদ গ্রন্থে উল্লেখ করেন।

উক্ত ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত যা আমরা একবিংশ দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করতে চাই। উসমান বিন সাঈদ বিন আদ-দারমী কিতাবুর রুহ আলাল জাহীমা গ্রন্থে সালেম বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, একদা কা'ব আহবার বলেন, আসমানের বাদশাহ যমীনের বাদশাহর প্রতি আফসোস করছেন। একথা শুনে হযরত উমর বলেন, যমীনের বাদশাহর উপর নয়; বরং তার উপর যে তার নফসকে কবজায় নিয়েছে। এ কথা শ্রবনে কা'ব আহবার বললেন, আল্লাহর কসম, তৌরাত গ্রন্থে হুবহু আপনার কথাগুলোই বিধৃত হয়েছে। অতঃপর হযরত উমর সেজদায় লুটিয়ে পড়েন।

এছাড়াও ইবনে আদী কর্তৃক প্রণীত কামেল গ্রন্থে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, প্রথম দিকে হযরত বিলাল আযানের মধ্যে 'আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এরপর 'হাইয়্যা আলাস সালাহ' বলতেন। হযরত উমর বললেন, 'আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এর পর 'আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ' বল। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, উমর যেভাবে বলেছে সেভাবে বলবে।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 কারামত (অলৌকিকতা):

📄 কারামত (অলৌকিকতা):


বায়হাকী, আবু নাঈম দালাইলুন নবুওয়্যত গ্রন্থে, লাকায়ী শরহুস সুন্নাহ গ্রন্থে, দারী ফাওয়ায়েদ গ্রন্থে, ইবনে আরাবী কারামতে আউলিয়া গ্রন্থে এবং খাতীব রাওয়াতু মালিক গ্রন্থে ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উমর সারিয়া নামক এক ব্যক্তিকে সেনাপতি বানিয়ে যুদ্ধে পাঠানোর পর একদিন খুতবা প্রদানের সময় হঠাৎ বলে উঠলেন- 'ইয়া সারিইয়াতুল জাবাল' (হে সারিয়া পাহাড়ের দিকে)। এভাবে তিনি তিন বার বললেন। কিছুদিন পর সেই রণাঙ্গণ থেকে দূত এলো। তিনি যুদ্ধের সংবাদ জানতে চাইলেন। দূত বলল, আমিরুল মুমিনীন! আমরা পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলাম। হঠাৎ তিন বার "হে সারিয়া পাহাড়ের দিকে" এ আওয়াজ শুনে সঙ্গে সঙ্গে সেই পাহাড়ের দিকে ছুটেছি আল্লাহ তা'আলা আমাদের দুশমনদের পরাজিত করেন। ইবনে উমর বলেন, তখন সারিয়া অনারাব দেশে ছিল, আর তিনি এখান থেকে আওয়াজ দেন। ইবনে হাজার আসকালীনী ইসাবা গ্রন্থে এর সনদগুলো সহীহ বলে অভিহিত করেছেন।

ইবনে মারদুয়া মাইমুন বিন মেহরানের সূত্রে ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেন, জুমআর দিন খুতবা প্রদানের সময় তিনি সহসা বলে উঠলেন- 'ইয়া সারিইয়াতুল জাবাল মান আসতারাআয যিমবা জুলমুন' অর্থাৎ, হে সারিয়া পাহাড়ের দিকে যাও, বাঘের রক্ষকরা অত্যাচার করছে। লোকেরা এ কথা শুনে একে অপরের দিকে তাকাতে লাগল। হযরত আলী বলেন, খুতবা শেষে লোকেরা তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, সে সময় আমার মনে হলো মুশরিকরা আমাদের মুসলমান ভাইদের পরাজিত করে পাহাড়ের পাদদেশে অতিক্রম করছিল। এ মুহূর্তে আক্রমণ করলে তারা সকলেই নিহত এবং পরাজিত হবে হেতু আমার মুখ দিয়ে এ শব্দগুলো বেরিয়ে গেছে। এক মাস পর এক ব্যক্তি বিজয়ের সুসংবাদ নিয়ে এলে সে বলল, আমরা হযরত উমরের আওয়াজ শুনে পাহাড়ের দিকে যেতেই আল্লাহ আমাদের বিজয় দেন।

আবু নাঈম দালায়েল গ্রন্থে আমর বিন হারিসের বরাত দিয়ে লিখেছেন, হযরত উমর জুমআর খুতবা দানের এক পর্যায়ে দুই অথবা তিন বার বললেন, হে সারিয়া! পাহাড়ের দিকে যাও। অতঃপর আবার খুতবা দিতে লাগলেন। উপস্থিত জনতার মধ্যে থেকে কেউ কেউ বললেন, তাকে উন্মাদনায় পেয়েছে। হযরত আব্দুর রহমান বিন আউফ হযরত উমরের সাথে বিনা সংকোচেই কথা বলতেন। তিনি বললেন, আজ আপনি এমন কাজ করলেন যার কারণে লোকেরা আপনার ব্যক্তিত্বকে ভর্ৎসনা করছে। হযরত উমর বললেন, আল্লাহর কসম! আমি সে সময় অস্থির হয়ে পড়ছিলাম যখন দেখলাম মুসলমানরা লড়াই করছে, আর শত্রুরা পাহাড়ের দিক থেকে তাদেরকে অবরুদ্ধ করে ফেলেছে, তখন আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। আপনাতেই বলে ফেললাম, পাহাড়ের দিকে যাও। এরপর রণাঙ্গন থেকে সারিয়া পত্র নিয়ে এক দূত এলো। পত্রে লেখা ছিল জুমআর দিন দুশমনের সাথে লড়াই চলছিল। এক পর্যায়ে আমরা পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে উপনীত। এমন সময় ঠিক জুমআর নামাযের সময় আমরা শুনতে পেলাম "সারিয়া পাহাড়ের দিকে যাও"। এ আওয়াজ পেয়ে আমরা পাহাড়ের দিকে গেলাম এবং বিজয় অর্জন করলাম। আমর বিন হারেছ বললেন, সেদিন যারা হযরত উমরকে উন্মাদনায় পেয়েছে বলে মন্তব্য করেছিল তারা বলল, এ সবই উদ্ভট কথা।

আবুল কাসিম বিন বুশরান ফাওয়ায়েদ গ্রন্থে ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উমর জনৈক ব্যক্তিকে নাম জিজ্ঞেস করলে সে বলল, জামরাহ (স্ফুলিঙ্গ)। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, বাবার নাম? সে বলল, শিহাব (অগ্নিশিখা) তিনি প্রশ্ন করলেন, গোত্রের নাম? সে বলল, হরকা (আগুন)। তিনি জানতে চাইলেন, কোথায় থাক? সে বলল, হিররাহ (উত্তপ্ত পাথুরে যমীন) তিনি বললেন, হিররাহ কোথায়? সে জবাব দিল, নাতী (লেলিহান অগ্নিশিখা)। তিনি বললেন, পরিবারের খোঁজ নাও, তারা পুড়ে মরেছে। সে লোক গিয়ে দেখল সত্যিই তাই। আগুন লেগে সব পুড়ে গেছে। মালিক প্রমুখ এভাবে বর্ণনা করেছেন।

আবুশ শাইখ আল-আসমাত গ্রন্থে কায়েস ইবনে হাজ্জাজ-এর বরাত দিয়ে লিখেছেন, হযরত আমর ইবনে আস কর্তৃক মিসর বিজিত হওয়ার পর মিসরবাসী তাঁর নিকট এসে বলল, আমাদের চাষাবাদ নীল নদের প্রবাহের উপর নির্ভরশীল। নীল নদ শুষ্ক হয়ে গেলে প্রাচীন নীতি অনুযায়ী নীল নদের প্রবাহ বেগমান করতে হয়। হযরত আমর বিন আস বললেন, সে প্রাচীন নীতি কি? তারা বলল, চাঁদের একাদশতম রজনীতে এক অবিবাহিত যুবতির বাবাকে রাজী করে তাকে উন্নতমানের পোশাক এবং অলংকারাদি পরিয়ে নীল নদে নিক্ষেপ করি। হযরত আমর বললেন, ইসলাম পূর্বের প্রথা রহিত করেছে। অতএব তোমরা তা করতে পারো না। কিছুদিন পর নীল নদের প্রবাহ থেমে গেলে কতিপয় মিসরবাসী হযরত আমর বিন আসের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার মনস্থির করলে হযরত আমর বিন আস বিষয়টি পত্র মারফত আমিরুল মুমিনীন হযরত উমর ফারুক (রা.)-কে অবহিত করলেন। কয়েকদিন পর আমিরুল মুমিনীন হযরত উমর (রা.) জবাবে এ পত্র লিখলেন- তুমি সুন্দর পত্র দিয়েছ, এসব প্রথা উৎখাতের জন্যই ইসলামের আবির্ভাব। এ পত্রের সাথে যুক্ত একখানা মোড়ানো কাগজের টুকরো দিলাম যা নীল নদে ফেলে দিবে। এ পত্র হযরত আমর বিন আসের হস্তগত হলে তিনি সেই মোড়ানো কাগজটি খুলেন। তাতে লিখা ছিল- আল্লাহর বান্দা আমিরুল মুমিনীন উমরের পক্ষ হতে নীল নদের অবগতির জন্য প্রশ্ন করছি, তুমি যদি নিজের শক্তিতে প্রবাহিত হও তবে তুমি আর কখনই প্রবাহিত হওয়ো না। আর যদি আল্লাহ তা'আলা প্রবাহিত করেন তাহলে সেই এক ও অদ্বিতীয় মহাশক্তিধর প্রতিপালকের নিকট আমার আবেদন, তেমাকে প্রবাহিত করুন। হযরত আমর বিন আস (রা.) কাগজের টুকরোটি শুকতারা উদয়ের কিছুক্ষণ পূর্বে নীল নদে ফেলে দেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে মিসরবাসী দেখল আল্লাহ তা'আলা এক রাতে নীল নদে ষোলো হাত পানির তরঙ্গ সৃষ্টি করেছেন। আর সেদিন থেকে আল্লাহ তা'আলা মিসরবাসীর এই প্রথা বন্ধ করে দেন।

ইবনে আসাকির তারেক বিন শিহাব থেকে বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি হযরত উমরকে সত্য মিথ্যার মিশ্রণে কিছু কথা বলছিলেন। হযরত উমর কখনো তাকে থামতে বলেন, আবার কখনো বলতে বলেন, অবশেষে সে বলল, আমি আপনাকে যা বলেছি তা সত্য। তবে যে সব কথার প্রেক্ষিতে আমাকে থামতে বলেন তা ছিল মিথ্যা। হযরত হাসান বলেন, কথার মধ্যে মিশ্রিত মিথ্যা অংশটুকু হযরত উমর চিহ্নিত করতে পারতেন।

বায়হাকী দালায়েল গ্রন্থে আবু হুদাবা হামসী থেকে বর্ণনা করেন, ইরাকবাসী তাদের গর্ভনরকে পাথর মারার সংবাদ পেয়ে হযরত উমর ক্রোধান্বিত হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন। সেদিন তাঁর নামায ভুল হওয়ায় নামায পড়ে এ দু'আ করলেন- হে আল্লাহ! তারা নাময গড়মিল করেছে, তাদের প্রতিটি কাজ গড়মিল করে দিন। তাদের প্রতি বনূ ছাকীফ গোত্রের এক ছোকড়াকে চাপিয়ে দিন, যে জাহেলিয়াতের যুগের অত্যাচারের মত তাদেরকে শাসন করবে এবং সে তাদের ভালো কাজ গ্রহণ করবে না এবং খারাপ কাজের শাস্তি ক্ষমা করবে না। গ্রন্থকার বলেন, ছোকড়া বলতে তিনি হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ছাকাফীকে বুঝিয়েছেন। ইবনে লাহী'আ বলেন, সে ছোকড়ার তখন জন্মই হয়নি।

অভ্যাস:
ইবনে সাদ আখলিফ বিন কায়েসের বরাত দিয়ে লিখেছেন, আমরা আমিরুল মুমিনীন হযরত উমরের দরজায় বসা ছিলাম। এমন সময় এক বাঁদীকে পার হতে দেখে আমরা বললাম, এ আমিরুল মুমিনীনের বাঁদী। আমিরুল মুমিনীন বললেন, এ আমিরুল মুমিনীনের বাঁদী নয়। তার জন্য বাঁদী রাখা বৈধ নয়। আমরা আরয করলাম, তাহলে কি রাখা বৈধ? তিনি বললেন, হজ্জ এবং উমরাহর জন্য শীত ও গরমের দু'টি কাপড় এবং নিজ পরিবারের খাওয়ার খরচ ছাড়া উমরের কাছে আর কিছু রাখা বৈধ নয়। এটা অতিসাধারণ এক কুরাইশের জীবন যাপনের দৃষ্টান্ত। রাবী বলেন, এরপর থেকে আমাদের অবস্থাও ছিল তাই।

হাযিমা বিন ছাবিত বলেন, তিনি এ শর্তে শাসনকর্তা নিয়োগ করে পাঠাতেন যে, তুর্কী অর্শ্বে আরোহণ করবে না, উন্নত খাবার খাবে না, পাতলা কাপড় পরবে না এবং প্রয়োজনে যারা আসবে তাদের জন্য নিজের দরজা বন্ধ রাখবে না। এমনটা করলে শাস্তিযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।

ইকরামা বিন খালিদ বলেন, হযরত হাফসা, হযরত আব্দুল্লাহ প্রমুখ হযরত উমরকে বললেন, আপনি উন্নতমানের আহার্য গ্রহণ করলে আল্লাহ তা'আলার কাজ করার ক্ষেত্রে শক্তি অর্জন করতে পারবেন। তিনি বললেন, এটাকি তোমাদের সকলের অভিমত? তাঁরা সকলে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলে তিনি বললেন, তোমাদের সুচিন্তিত মতামতে আমি ধন্য। তবে এ শাহী পথেই আমার দুই বন্ধুকে (হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)) পেয়েছি। আল্লাহ না করুন যদি এ শাহী পথ বর্জন করি তাহলে আর আমি দুই বন্ধুর মর্যাদা অর্জন করতে পারব না। কথিত আছে, এক সামান্য দুর্ভিক্ষের বছর থেকে তিনি ঘি এবং তৈল জাতীয় খাবার খাওয়া ছেড়ে দেন।

ইবনে আবী মালীকা বলেন, উকবা বিন ফিরকদ হযরত উমরকে ভালো খাবার খাওয়ার জন্য অনুরোধ জানালে তিনি বললেন, আফসোস! আমি এ অল্প দিনের জিন্দেগীর পুণ্যগুলো কি সব খেয়ে ফেলব?

হযরত হাসান বলেন, একদা হযরত উমর তাঁর ছেলে হযরত আসেমের নিকট এসে তাকে গোশত খেতে দেখে বললেন, তুমি কি খাচ্ছ? হযরত আসেম বললেন, আজ গোশত খেতে আমার মন চেয়েছিল। হযরত উমর বললেন, তোমার মন যা চাইবে তাই কি খেতে হবে? যে সবসময় নিজের মনমতো খায় পরকালে তাকে চোর হিসেবে সাব্যস্ত করা হবে।

আসলাম বলেন, একদা হযরত উমর (রা.) বললেন, আমার মন মাছ খেতে চাইছে। তার গোলাম ইরফা নামক উটে চড়ে চার মাইল দূরে মাছ আনতে যায়। ঝোলা ভর্তি সে মাছ কেনে। ফেরার পথে উট হাঁকিয়ে দ্রুত আসতে গিয়ে উট ঘর্মসিক্ত হয়ে পড়ে। তিনি বললেন, মাছ রাখ আগে উট দেখব। তিনি উটের কাছে গেলেন এবং উটের কানের নিচে বিন্দু বিন্দু জমানো ঘাম দেখে বললেন, তুমি একে গোসল করাওনি। আমার ইচ্ছার কারণে এ পশুকে অহেতুক কষ্ট দিয়েছ। আল্লাহর কসম! আমি এ মাছ স্পর্শই করব না।

হযরত কাতাদা (রা.) বলেন, হযরত উমর খলীফা থাকাকালে তিনি চামড়ার তালিযুক্ত ফাটা কাপড় পরে পথ দিয়ে বাজারে গিয়ে লোকদের শিষ্টাচার শিক্ষা দিতেন এবং তাদেরকে সাবধান করতেন। কোনো বোঝা দেখলে তিনি তা নিজ কাঁধে উঠিয়ে নিয়ে বাড়িতে পৌঁছে দিতেন। হযরত আনাস বলেন, হযরত উমরের জামার পেছনে চারটি তালি দেখেছি। আবু উসমান নাহদী বলেন, হযরত উমরের পায়জামায় চামড়ার পট্টি লাগা দেখেছি।

আব্দুল্লাহ বিন আমের বিন রবীআ বলেন, আমি হযরত উমরের সাথে হজ্জ করেছি। সফরের সময় পথিমধ্যে তিনি কোন তাঁবু গাড়তেন না; বরং গাছের ডালে কম্বল অথবা কাপড় টানিয়ে তার ছায়ায় বসতেন।

আব্দুল্লাহ বিন ঈসা বলেন, কান্নার পানি প্রবাহিত হতে হতে হযরত উমরের চেহারায় কালো দাগ পড়ে গিয়েছিল। কখনও তিনি ওযীফার আয়াত পড়তে পড়তে পড়ে যেতেন। মানুষ অসুস্থ ভেবে দেখতে আসত।

হযরত আনাস বলেন, আমি এক বাগানে গেলাম। দেয়ালের এ প্রান্ত থেকেই ওপ্রান্তে অবস্থানরত হযরত উমরের আওয়াজ শুনতে পেলাম। তিনি বলেছেন, হে উমর! কোথায় তুমি, আর কোথায় আমিরুল মুমিনীনের মর্যাদা ও সম্মান। আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করো, অন্যথায় তিনি শাস্তি দিবেন।

আব্দুল্লাহ বিন আমার বিন রবীআ বলেন, আমি হযরত উমরকে দেখলাম তিনি মাটি থেকে একটি তৃণখণ্ড উঠিয়ে বললেন, হায়! আমি যদি এ তৃণখণ্ড হতাম, তাহলে আমি মাতৃগর্ভে আসতাম না এবং আমি আর আমি হতাম না।

আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন হাফস বলেন, একদা হযরত উমর পানির মশক পিঠে নিয়ে যাচ্ছিলেন। লোকেরা তাঁর এ আচরণে বিস্মিত হলে তিনি বললেন, আমার মধ্যে গর্ব ও অহংকার এসেছে। ফলে তা খর্ব করছি।

মুহাম্মদ বিন সিরীন বলেন, হযরত উমরের শ্বশুর এসে বাইতুল মাল থেকে কিছু চাইলে তিনি ভীতি প্রদর্শন করে বললেন, আপনি কি চান যে, আমি আল্লাহর নিকট প্রতারক বাদশাহ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকি! অতঃপর তিনি নিজ তহবিল থেকে দশ হাজার দেরহাম প্রদান করেন।

নাখ'য়ী বলেন, হযরত উমর নিজ শাসনামলেও ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন। হযরত আনাস বলেন, হযরত উমর দুর্ভিক্ষের বছর থেকে ঘি খাওয়া ছেড়ে দেন। একদা তিনি মাখন এবং তৈল জাতীয় খাবার খেলে তার পেটে পীড়া দেখা দেয়। সে সময় তিন আঙুল উঁচিয়ে বললেন, দুর্ভিক্ষের বছর থেকে আমার ঘরে তেমন কিছু নেই।

সুফিয়ান ছাওরী বলেন, হযরত উমর বলেন, যে আমার ত্রুটি চিহ্নিত করে দেয় সে ব্যক্তি আমার প্রিয়। আসলাম বলেন, আমি হযরত উমরকে ঘোড়ার কান ধরে লাফ দিয়ে অশ্বারোহণ করতে দেখেছি। ইবনে উমর বলেন, আমি হযরত উমরকে রাগ করতে দেখেনি। আল্লাহর যিকির, আল্লাহর ভয় এবং কুরআন তিলাওয়াত ছাড়া তাঁর রাগ যেতো না।

হযরত বিলাল হযরত আসলামকে হযরত উমর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন, আপনি উমরকে কেমন দেখেছেন? তিনি বললেন, হযরত উমর একজন খাঁটি মানব। কিন্তু রেগে গেলে তাঁকে থামানো মুশকিল হয়ে পড়তো। হযরত বিলাল বললেন, সে সময় আপনি কেন কুরআনের আয়াত পাঠ করতেন না? তিলাওয়াত করলে তাঁর রাগ চলে যায়।

আহওয়াজ বিন হাকীম তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, একদা হযরত উমরের সামনে ঘি দিয়ে রান্না করা গোশত দেয়া হলে তিনি তা খেতে অস্বীকার করে বলেন, এ দু'টি (ঘি এবং গোশত) পৃথক পৃথক খাবার। এ দু'টিকে একত্রে রান্না করার প্রয়োজন ছিল না। এ পর্যন্ত উল্লিখিত ঘটনাগুলো ইবনে সাদ লিপিবদ্ধ করেছেন।

ইবনে সাদ হাসান থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উমর (রা.) বলেন, একজন আমীরকে অন্য আমীরের স্থানে পরিবর্তনের মাধ্যমে লোকদের সংশোধনের পথকে সহজ মনে করি।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য:

📄 প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য:


ইবনে সাদ এবং হাকেম হযরত যর থেকে বর্ণনা করেন, আমি মদীনাবাসীর সাথে ঈদগাহে যাবার সময় হযরত উমরকে পায়ে হেঁটে যেতে দেখলাম। তিনি তখন বৃদ্ধ এবং বাম হাতে বেশি কাজ করতেন। তিনি ছিলেন গোধূম বর্ণের। মাথার চুল শিরস্ত্রাণ পরার কারণে ঝরে যায়। লম্বা পদযুগল এবং সবার চেয়ে উঁচু ছিলেন। সবার মাঝে দাঁড়ালেন মনে হতো তিনি পশুর পৃষ্ঠে আরোহণ করেছেন। ওয়াকেদী বলেন, যারা হযরত উমরকে গোধূম বর্ণের বলেছেন তারা দুর্ভিক্ষের বছর থেকে দেখেছেন। তিনি তৈল জাতীয় খাবার খেয়ে পরিবর্তন হয়ে যান।

ইবনে সাদ হযরত ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেন, তিনি লাল সাদা মিশ্রিত বর্ণের অধিকারী ছিলেন। প্রলম্বিত পদযুগল, ঝরা চুল এবং বৃদ্ধতার ছাপ তাঁর মাঝে পরিলক্ষিত হতো। উবায়েদ বিন উমায়ের বলেন, সকলের চেয়ে তাঁকে উঁচু মনে হতো। আসমা বিন আকওয়া বলেন, তিনি বাম হাতে সকল কাজ করতেন। ইবনে আসাকির আবু দুজা আতা রদ্দী থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উমর লম্বা পদ যুগল এবং মোটা তাজা ছিলেন। তাঁর অনেক চুল ঝরে যায়। তিনি লালিমাযুক্ত বড় বড় গোঁফের অধিকারী ছিলেন।

ইবনে আসাকির স্বরচিত ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন, হযরত উমরের মা হলেন, হানতামা বিনতে হিশাম বিন মুগীরা। অর্থাৎ তার মা আবু জাহেলের বোন, আর আবু জাহেল তার মামা।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 খিলাফত:

📄 খিলাফত:


হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর জীবদ্দশায় হযরত উমর খিলাফতের উত্তরাধিকার মনোনীত হন ১৩ হিজরীর জামাদিউল উখরা মাসে। যহরী বলেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) যেদিন ইন্তেকাল করেন ১৩ হিজরীর জমাদিউল উখরা মাসের ২২ তারিখ মঙ্গলবার হযরত উমর খলীফা মনোনীত হন। (হাকেম)

তাঁর যুগে ইসলামের বড় বড় বিজয় অর্জিত হয়। ১৪ হিজরীতে দামশক সন্ধি ও প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে হামস ও বাআলাবাক্কা সন্ধির মাধমে, বসরা ও ইলা প্রভাব বিস্তার করে বিজয় হয়। ১৪ হিজরীতে তিনি তারাবীর নামাযের জন্য লোকদের সমবেতন করেন। (আসকারী)

১৫ হিজরীতে উরওয়ান প্রভাবের মাধ্যমে এবং তবরীয়া সন্ধির মাধ্যমে বিজিত হয়। এ বছরেই ইয়ারমুক এবং কাদেসিয়ার ঘটনা ঘটে। (ইবনে জারীর) এ বছর হযরত সাদ কুফা নগরী উন্নত ও সমৃদ্ধ করেন। এ বছর থেকে হযরত উমর ভাতা, বৃত্তি ও প্রশাসনিক কাজের জন্য দফতরের প্রবর্তন করেন।

১৬ হিজরীতে আহওয়ায এবং মাদায়েণ মুসলমানদের করতলগত হয়। হযরত সাদ কিসরার রাজ প্রসাদে জুমআর নামায পড়েন, এটা ছিল ইরাকের মাটিতে সর্বপ্রথম জুমআর নামায। এটা ১৬ হিজরীর সফর মাসের ঘটনা। এ বছর জালুলার ঘটনা ঘটে এবং ইয়াযুজরদ বিন কিসরা পরাজিত হয়ে রায়ের দিকে পালিয়ে যায়। তাকরীতও মুজাহিদদের হস্তগত হয়। হযরত উমরের আগমনে বাইতুল মুকাদ্দাসও বিজিত হয়। তিনি জাবায় তাঁর সুপ্রসিদ্ধ অভিভাষণ প্রদান করেন। এ বছরেই কানসিরীন এবং সুরুজ যুদ্ধের মাধ্যমে এবং হলব, ইনতাকীয়া, মিনজাও কারকিসা সন্ধির মাধ্যমে বিজিত হয়। ১৬ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসে হযরত আলীর পরামর্শে হযরত উমর ঐতিহাসিক হিজরতের হিসাব থেকে হিজরী বর্ষের প্রবর্তন করেন।

১৭ হিজরীতে তিনি মসজিদে নববীর সম্প্রসারণ করেন। হিজাজে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে হযরত উমর হযরত আব্বাসকে সাথে নিয়ে ইসতেসকার নামায আদায় করেন। ইবনে সাদ নিয়ারুল আসলামা থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উমর সেদিন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চাদর মোবারক পরে ইসতেসকার নামায পড়েন। হযরত ইবনে উমর বলেন, তিনি হযরত আব্বাসের হাত ধরে ঊর্ধ্বে তুলে দু'আ করেন, হে আল্লাহ! আমরা সহায়হীন বান্দা আপনার রাসূলে মাকবুল (সা.)-এর চাচাকে ওসীলা করে আরয করছি, শুষ্কতা উঠিয়ে নিন এবং রহমতের বারিধারা বর্ষণ করুন। এ দু'আ করে ফিরে না আসতেই মুষলধারে বৃষ্টি আরম্ভ হয়। এ বছর আহওয়ায সন্ধির মাধ্যমে বিজয় হয়।

১৮ হিজরীতে নিশাপুরের কিয়দংশ সন্ধির মাধ্যমে এবং হালওয়ান, বাসী, সামসাত, হারান, নাসীবীন, মৌসূল, তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল এবং জাযিরায়ে আরবের অধিকাংশ অঞ্চল লড়াই-এর মাধ্যমে ইসলামের পতাকাতলে আসে। কতিপয় ঐতিহাসিকের মতে জাযিরায়ে আরবের অধিকাংশ অঞ্চল সন্ধির মাধ্যমে বিজিত হয়।

১৯ হিজরীতে কিসারিয়া এবং ২০ হিজরীতে মিসর যুদ্ধের মাধ্যমে মুসলমানদের হাতে আসে। কারো কারো মতে ইস্কান্দারিয়া ছাড়া গোটা রাজ্য সন্ধির মাধ্যমে অর্জিত হয়। আলী বিন রাববাহ বলেন, গোটা পশ্চিমাঞ্চল যুদ্ধের মাধ্যমে বিজিত হয়। এ বছর তসতর বিজয় হয়, রোম সম্রাট পরলোকগমন করেন, হযরত উমর খায়বর এবং নাজরান থেকে ইহুদীদের বের করে দেন এবং খায়বর ও ওয়াদিউল কুরা বণ্টন করেন।

২১ হিজরীতে ইস্কান্দারিয়া এবং নিহাঅন্দ যুদ্ধ করে অর্জনের পর অনারব বিশ্বে আর কোনো অবাধ্যের দল রইল না। ২২ হিজরীতে আযার বাইজান যুদ্ধ অথবা সন্ধির মাধ্যমে, দিনুর, মাসবাদন, এবং হামদান যুদ্ধ করে জয় হয়। এ বছর আবলাসুল আরব, আসকার এবং কুমশ হস্তগত হয়।

২৩ হিজরীতে কারমানে সাজিসতান, কামরানের পাহাড়ি অঞ্চল, আসবাহান এবং এর পার্শ্ববর্তী জনপদ বিজিত হয়। এ বছরের শেষ দিকে হজ্জ থেকে ফিরে আসার পর হযরত উমর শহীদ হন।

সাঈদ বিন মুসায়্যাব বলেন, হযরত উমর মিনা থেকে মক্কায় প্রত্যাবর্তনের পর উট থেকে নেমে আসমানের দিকে হাত তুলে এ দু'আ করেন- হে আল্লাহ! আমি বৃদ্ধ হয়ে গেছি। শক্তি হ্রাস পেয়েছে। ইচ্ছাশক্তি বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছে। এরপর আমি অকর্মণ্য হয়ে পড়ব এবং আমার বিবেক লোপ পাবে। অতএব আমাকে আপনার নিকট আহবান করুন। অতঃপর যিলহজ্জ মাস শেষ না হতেই তিনি শহীদ হন। (হাকেম)

আবু সালিহুস সামান বলেন, হযরত কা'ব বিন আহবার হযরত উমরকে বলেন, আমি তৌরাতে দেখেছি আপনি শহীদ হবেন। হযরত উমর বললেন, এ কি করে হয়। আমি আরবে থাকব অথচ শহীদ হয়ে যাব?

আসলাম বলেন, হযরত উমর দু'আ করেন, হে আল্লাহ! আমাকে আপনার পথে, আপনার হাবীবের শহরে শাহাদত অর্জনের সৌভাগ্য দান করুন। (বুখারী)

মাদান বি আবী তালহা বলেন, হযরত উমর তার এক ভাষণে বলেন, আমি স্বপ্নে যা দেখলাম তার ব্যাখ্যা হচ্ছে, আমার মৃত্যু অতি নিকটবর্তী। এ পর্যায়ে উম্মতের লোকেরা আমাকে খিলাফতের উত্তরাধিকার মনোনীত করার কথা বলছে। স্মরণ রাখবে আল্লাহ তা'আলা তাঁর দ্বীণ এবং খিলাফতকে নিশ্চিহ্ন করবেন না। মৃত্যু আমার সঙ্গী হলেও দ্বীন এবং খিলাফত আমার সাথী নয়। আমার পর ছয়জন যাঁদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা.) জান্নাতে যাবার সুসংবাদ দিয়েছেন তাঁদের পরামর্শক্রমে খলীফা নির্বাচন করবে। (হাকেম)

যহরী বলেন, হযরত উমরের নীতি ছিল তিনি মদীনা শরীফে কোনো যুবককে ঢুকতে দিতেন না। একবার কুফার শাসনকর্তা হযরত মুগীরা বিন শো'বা খলীফা উমরের নিকট পত্র লিখলেন যে, আমার নিকট একজন দক্ষ কারিগর যুবক রয়েছে। সে উন্নতমানের নকশা তৈরি করতে পারে। আপনি অনুমতি দিলে আমি তাকে পাঠিয়ে দিব। হযরত উমর অনুমতি দিলেন। কুফায় হযরত মুগীরা সে যুবকের উপর মাসিক একশ দেরহাম কর নির্ধারণ করে রেখেছিল। সে মদীনায় এসে সে ব্যাপারে হযরত উমরের নিকট অভিযোগ দায়ের করলে তিনি বললেন, এ কর তো বেশি কিছু নয়। এ কথা শুনে সে যুবক ক্রোধান্বিত হয়ে দাঁতে দাঁত পিষে প্রস্থান করল। দু'তিন দিন পর হযরত উমর তাঁকে ডেকে বললেন, আমি শুনলাম তুমি নাকি বলেছ আমি চাইলে এমন এক চাক্কি তৈরি করবে যা বাতাসে উড়বে? সে বলল, আমি আপনার জন্য এমন এক চাক্কি তৈরি করব যা চিরদিন মানুষ স্মরণ রাখবে। সে চলে গেলে তিনি বললেন, এ যুবক আমাকে হত্যা করার হুমকি দিয়ে গেল। একদিন সে হীরা কাটা দু'ধারাবিশিষ্ট একটি খঞ্জর জামার নিচে লুকিয়ে মসজিদে এক কোণে এসে বসে। আর এদিকে হযরত উমর নামাযের জন্য লোকদের জাগিয়ে দিচ্ছিলেন। তার নিকটবর্তী হলে সে তাঁর শরীরে খঞ্জর দ্বারা তিনবার আঘাত করে। (ইবনে সাদ)

আমর বিন মাইমুন আনসারী বলেন, হযরত মুগীরার গোলাম আবু লুলুয়াহ-এর দু'ধারবিশিষ্ট খঞ্জরের আঘাতে হযরত উমর শহীদ এবং তাঁর সাথে ছিলেন এমন বারোজন আহত হন, যাদের মধ্যে ছয়জন মারা যান।

আবু রাফে বলেন, হযরত মুগীরার গোলাম আবু লুলুয়াহ চাক্কি তৈরি করত। তিনি তার নিকট থেকে দৈনিক চার দিরহাম রাজস্ব আদায় করতেন। সে হযরত উমরের কাছে এসে এ ব্যাপারে অভিযোগ দায়ের করে বলল, আমিরুল মুমিনীন! মুগীরা আমার প্রতি কঠোরতা আরোপ করেছেন। আপনি তাঁকে সাবধান করুন। তিনি বললেন, তুমি তোমার মনিবের সাথে ভালো আচরণ করবে। হযরত উমরের ইচ্ছে ছিল তিনি এর ব্যাপারে হযরত মুগীরার নিকট সুপারিশ করবেন। কিন্তু এ কথা তার পছন্দ না হওয়ায় সে রাগত স্বরে বলল, হে আমিরুল মুমিনীন! আমি ছাড়া সকলেই সুবিচার পেয়েছে। সে খলীফাকে হত্যা করার ইচ্ছায় বিষ মিশ্রিত খঞ্জর নিজের কাছে রাখতে লাগল। হযরত উমর ফজর নামাযের সময় যখন কাতার সোজা করার কথা বলছিলেন ঠিক তখন আবু লুলুয়াহ হযরত উমরের সামনে এসে গলা ধরে পিঠের উঁচু অংশে উপর্যুপরি দু'টি আঘাত করে। তিনি পড়ে গেলে সে অন্যদের উপর আঘাত করলে তেরোজন আহত হয়, যাদের মধ্যে ছয়জন নিহত হন। তখন সূর্যোদয়ের সময় সমাগত প্রায়। হযরত আব্দুর রহমান বিন আউফ ছোট সূরা দিয়ে নামায শেষ করলেন। হযরত উমরকে তাঁর ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। তাঁকে দুধ পান করানো হলে ক্ষতস্থান দিয়ে তা বেরিয়ে এল। লোকেরা সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, কোনো ক্ষতি নেই, আপনি চিন্তা করবেন না। তিনি বললেন, যদি হত্যার মধ্যে খারাপিও থাকে তবুও আমি নিহত হবো। লোকেরা তাঁর প্রশংসা করতে লাগলেন। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! যখন আমি দুনিয়া থেকে চলে যাব দুনিয়ার কোনো ভোগ বিলাস আমাকে প্রতারিতও করবে না, আনন্দও দিবে না তবে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাহচর্য আমাকে সঙ্গ দিবে এবং এর সওয়াব পাবো। অতঃপর হযরত ইবনে আব্বাস তাঁর প্রশংসা করলে তিনি বলেন, যদি আমার নিকট দুনিয়া ভর্তি স্বর্ণ থাকতো তাহলে কিয়ামতের ভয়াবহতার কারণে আমি তা উৎসর্গ করতাম। অতঃপর তিনি আবার বললেন, হযরত উসমান, হযরত আলী, হযরত তলহা, হযরত যুবাইর, হযরত আব্দুর রহমান বিন আউফ এবং হযরত সাদের মধ্যে থেকে যাঁর ব্যাপারে অধিকাংশ রায় হয় তাঁকে খলীফা নির্ধারণ করবে। তারপর তিনি সহীব (রা.) কে নামায পড়ানোর নির্দেশ দেন। অতঃপর সেই ছয়জন তিনজনের উপর দায়িত্ব অর্পন করেন। (হাকেম)

হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, সে যুবক ছিল অগ্নি উপাসক। আমর বিন মাইমুন বলেন, হযরত উমর বললেন, আমার মৃত্য এমন লোকের হাতে হচ্ছে, যে ইসলামের দাবী করে না। অতঃপর তিনি তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহকে বললেন আমার কর্জ হিসাব করো। হিসাব করে প্রায় ৮৬ হাজার দিরহামের কথা বলা হলে তিনি বললেন, যদি এ কর্জ উমর পরিবারের সম্পদ থেকে পরিশোধ হলে আদায় করবে। না হলে বনূ আদীর নিকট চাইবে। তবুও শোধ না হলে কুরাইশদের কাছ থেকে নিবে। হযরত আয়েশা সিদ্দীক (রা.)-এর কাছে গিয়ে তাঁকে বলবে, দুই বন্ধুর নিকট সমাহিত হওয়ার জন্য উমর অনুমতি চাইছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর তাঁর কাছে গেলে হযরত আয়েশা (রা.) বললেন, আমি এ জায়গাটি নিজের জন্য সংরক্ষণ করছিলাম। কিন্তু আজ এ মুহূর্তে আমি উমরের আবেদনকে প্রাধান্য দিচ্ছি। হযরত আব্দুল্লাহ এসে বললেন, তিনি অনুমতি দিয়েছেন। একথা শুনে হযরত উমর আল্লাহ তা'আলার শুকর আদায় করলেন। লোকেরা বললেন, হে আমিরুল মুমিনীন! আপনার কিছু বলার থাকলে ওসীয়ত করুন। আপনি কাউকে খলীফা নির্ধারণ করে যান। তিনি বললেন, ছয়জন ছাড়া আর কাউকে খিলাফতের হকদার মনে করি না। তিনি ছয়জনের নাম বললেন। আমার ছেলে আব্দুল্লাহর সাথে খিলাফতের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সাদ জীবিত থাকলে তিনিই হতেন খিলাফতের হকদার। তিনি যেহেতু নেই তোমরা যাকে ইচ্ছা নির্বাচন করবে। আমি সাদকে কোনো খেয়ানতের কারণে বঞ্চিত করিনি। অতঃপর তিনি বললেন, আমার পর যে খলীফা হবে তাঁকে ওসীয়ত করছি, তিনি আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করবেন। মুহাজির, আনসার এবং সকল জনসাধারণের সাথে ভালো আচরণ করবেন। এভাবে তিনি অনেক নসীহত করার পর মহান প্রভুর সান্নিধ্যে চলে গেলেন।

আমরা জানাযা নিয়ে গেলাম। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর হযরত আয়েশাকে সালাম দিয়ে বললেন, আপনি দাফন করার অনুমতি দিন। তিনি অনুমতি দিলে আমরা তাঁকে তাঁর দুই বন্ধুর পার্শ্বে দাফন করলাম। তাঁকে সমাহিত করার পর লোকেরা খলীফা নির্বাচনের জন্যে সমবেত হল। হযরত আব্দুর রহমান বিন আউফ বললেন, পরামর্শ করার জন্য প্রথমে তিনজনকে বেছে নেয়া যায়। সুতরাং পরামর্শ করার জন্য হযরত যুবাইর হযরত আলীকে, হযরত সাদ হযরত আব্দুর রহমান বিন আউফকে এবং হযরত তলহা হযরত উসমানকে মনোনীত করায় তারা তিনজন পৃথক হয়ে যান। সেখানে গিয়ে হযরত আব্দুর রহমান বিন আউফ বললেন, আমি খলীফা হতে চাই না। সুতরাং আপনাদের মধ্যে থেকে কারো আশা থাকলে দেখে পুনরায় তিনি বললেন, মনোনীত করার দায়িত্ব আপনারা আমার উপর ছেড়ে দিতে পারেন। আমি সর্বশ্রেষ্ঠকে মনোনীত করব। তাঁরা সম্মতি দিলে তিনি হযরত আলীকে পৃথকভাবে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন, আপনি প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয়তম ও নিকটতম। এজন্য আপনি খিলাফতের হকদার। যদি আমি আপনাকে খলীফা মনোনীত করি তাহলে আপনি তাঁর আনুগত্য করবেন। হযরত আলী সম্মতি দিলেন। তিনি হযরত উসমানকে আলাদা ডেকে তাঁরও সম্মতি নিলেন। এ ব্যাপারে উভয়ে পূর্ণ প্রতিশ্রুতি প্রদান করলে তিনি হযরত উসমানের হাতে বাইআত নিলেন। অতঃপর হযরত আলী বাইআত গ্রহণ করেন।

ইমাম আহমদ মুসনাদ গ্রন্থে লিখেছেন, হযরত উমর (রা.) বলেন, হযরত আবু উবাদা বিন জাররাহ বেঁচে থাকলে আমি তাঁকে খলীফা মনোনীত করতাম। আর এ বিষয়ে আল্লাহ তা'আলা জিজ্ঞেস করলে বলতাম, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, প্রত্যেক নবীর একজন বিশ্বস্ত লোক থাকেন। আর আমার বিশ্বস্ত লোক হলেন আবু উবাদা বিন জাররাহ। তারপর মা'আজ বিন জাবাল জীবিত থাকলে তাঁকে খলীফা নির্বাচিত করতাম। আর তাঁর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে বলতাম, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি, মা'আজ বিন জাবাল কিয়ামত দিবসে ওলামাদের সামনে বড়ই মর্যাদার সাথে আবির্ভূত হবেন।

ইমাম আহমদ মুসনাদ গ্রন্থে লিখেছেন, আবু রাফে' বলেন, মৃত্যুর সময় খিলাফতের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে হযরত উমর (রা.) বলেন, আমি আমার সাথীদের মধ্যে ব্যাপক লোভ দেখতে পাচ্ছি। সালিম মাওলা আবু হুযায়ফা অথবা আবু উবাদা বিন জাররাহ জীবিত থাকলে তাঁদের সম্পর্কে অবশ্যই তোমাদের বলে যেতাম।

হযরত উমর (রা.) যিলহজ্জ মাসের ২৬ তারিখ বুধবারে আহত হন এবং মুহাররম মাসে রবিবারে রাতে তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর বয়স নিয়ে মতের ভিন্নতা রয়েছে। ৬৩, ৬৬, ৬১, ৬০, ৫৯, ৫৪ অথবা ৫৫ বছর বেঁচে ছিলেন তিনি। ওয়াকেদীর মতে তাঁর বয়স ৬০ বছর। হযরত সহীব জানাযার নামায পড়ান। তাহযীব গ্রন্থে রয়েছে, তাঁর আংটিতে খোদাই করে লিখে ছিল- 'কাফা বিল মাওতি ওয়া ইজান' (উপদেশ দাতা হিসেবে মৃত্যুই যথেষ্ট)।

তাবারানী তারেক বিন শিহাব থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উম্মে আয়মান বলেন, হযরত উমর শহীদ হওয়ার পর থেকে ইসলাম দুর্বল হয়ে পড়ে। আব্দুর রহমান বিন ইয়াসার বলেন, হযরত উমরের মৃত্যুর দিন সূর্যগ্রহণ হয়েছিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00