📄 হযরত উমরের ফযীলত সম্পর্কিত হাদীস
ইমাম বুখারী এবং ইমাম মুসলিম হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি স্বপ্নে জান্নাতে এক মহিলাকে প্রাসাদ চূড়ায় বসে অযু করতে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, এটা কার প্রাসাদ? ফেরেশতাগণ বললেন, উমর বিন খাত্তাবের। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, হে উমর! আমি তোমার মর্যাদার দিকে লক্ষ্য রেখে সে প্রাসাদে প্রবেশ করিনি। একথা শুনে হযরত উমর কেঁদে ফেললেন।
ইমাম বুখারী এবং ইমাম মুসলিম ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আমি স্বপ্নে দুধ পান করার সময় এর স্বাদ এবং গন্ধ আমার নাকে এলে অবশিষ্ট দুধ হযরত উমরকে দিলাম। সাহাবাগণ আরয করলেন, এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা কী? তিনি বললেন, ইলম।
ইমাম বুখারী এবং ইমাম মুসলিম হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, (তিনি বলেন) স্বপ্নে আমার সামনে কিছু লোক পেশ করা হলো- যাদের পোশাক বক্ষদেশ এবং আর কিছু লোকের পোশাক তারো বেশি পর্যন্ত প্রলম্বিত ছিল। আর উমরের পোশাক যমীন পর্যন্ত ঘেঁষে ছিল। সাহাবাগণ আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে পোশাকটি কি ছিল। নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেন, দ্বীন।
ইমাম বুখারী এবং ইমাম মুসলিম সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, হে উমর! সে সত্তার শপথ যার কুদরতী হাতে আমার প্রাণ। যে পথে তুমি চল শয়তান সে পথ ছেড়ে অন্য পথে চলে। বুখারী শরীফে হযরত আবু হুরায়রা কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমাদের পূর্ববর্তী জাতির মধ্যে মুহাদ্দিস ছিল। আর আমার উম্মতের মুহাদ্দিস হলেন উমর বিন খাত্তাব।
ইমাম তিরমিযী ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত উমরের মুখে ও অন্তরে সত্যের প্রবর্তন ঘটিয়েছেন। ইবনে উমর বলেন, লোকদের অভিমত ভিন্নতর হলে হযরত উমর যে রায় দিতেন সে মোতাবিক কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হতো।
ইমাম তিরমিযী এবং হাকেম উকবা বিন আমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আমার পর যদি কেউ নবী হতেন তবে তিনি হযরত উমর বিন খাত্তাব। এ রেওয়ায়েতটি তাবারানী আবু সাঈদ খুদরী এবং আসমা বিন মালিক থেকে এবং ইবনে আসাকির ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেন।
ইমাম তিরমিযী হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, উমরকে দেখে শয়তান পালিয়ে যেতে দেখেছি। ইবনে মাজা এবং হাকেম উবাই বিন কাব থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ তা'আলা সর্বপ্রথম হযরত উমরের সাথে মোসাফাহ করবেন, সালাম দিবেন এবং হাত ধরে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। ইবনে মাজা এবং হযরত আবু যর থেকে বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, উমরের মুখে ও অন্তরে আল্লাহ তা'আলা সত্য প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি সর্বদা সত্য বলতেন।
ইবনে মানী'আ মুসনাদ গ্রন্থে হযরত আলী (রা.) থেকে নকল করে লিখেছেন, মুহাম্মাদ (সা.)-এর সহচরদের মধ্যে কোনো সংশয় নেই যে, হযরত উমরের যবান ছিল প্রশান্তময়। বায্যার ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, হযরত উমর হলেন জান্নাতীদের জন্য উজ্জ্বল প্রদীপ।
বায্যার কাদাম বিন মাজউন এবং তিনি তাঁর চাচা উসমান বিন মাজউন থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত উমরের পানে ইশারা করে বলেন, যতক্ষণ তিনি তোমাদের মাঝে থাকবেন ততক্ষণ পর্যন্ত ফেতনার দরজা শক্তভাবে বন্ধ থাকবে।
তাবারানী আওসাত গ্রন্থে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন, একদা জিবরাঈল (আ.) নবী আকরাম (সা.)-এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে বললেন, উমরকে সালাম জানাবেন এবং তাকে এ সুসংবাদ দিবেন যে, তার ক্রোধ হলো বিজয়, আর সন্তুষ্টি হলো দর্শন।
ইবনে আসাকির হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, শয়তানরা হযরত উমরকে দেখে ভয় পেতো। ইমাম আহমদ এ হাদীসটি বুরাইদার সূত্রে এভাবে বর্ণনা করেন, তিনি (সা.) বলেন, হে উমর! শয়তান তোমাকে ভয় পায়।
ইবনে আসাকির ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আসমানের সকল ফেরেশতা উমরকে সম্মান এবং পৃথিবীর সকল শয়তান তাকে ভয় করে।
তাবারানী আওসাত গ্রন্থে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ তা'আলা আরাফাতে অবস্থানকারী (হাজীদের) নিয়ে সাধারণত এবং হযরত উমরকে নিয়ে বিশেষত গর্ব করেন। এ ধরনের আরেকটি বৃহৎ হাদীসটি হযরত আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত রয়েছে।
তাবারানী এবং দাইলামী ফজল বিন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, উমর যেখানেই থাক হক তার সাথেই থাকবে। ইমাম বুখারী এবং ইমাম মুসলিম ইবনে উমর এবং আবু হুরায়রা থেকে বর্ণনা করেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বপ্নের বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, একটি কূপে বালতি নামানো দেখে আমি কয়েক বালতি উত্তোলন করলাম। আমার পর আবু বকর বালতি নিলেন এবং এক অথবা দুই বালতি উত্তোলন করলেন, কিন্তু তার উত্তোলনে কিছুটা দুর্বলতা ছিল। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেছেন। অতঃপর উমর বালতি ধারণ করলেন এবং এমনভাবে তা উত্তলন করলেন, যা আমি একজন যুবককেও এভাবে উত্তোলন করতে দেখিনি। আর তখন চতুর্দিক থেকে তৃষ্ণার্থরা এসে পিপাসা নিবারণ করে।
ইমাম নব্বী তাহযীব গ্রন্থে লিখেছেন, ওলামাগণ উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যা এভাবে দিয়েছেন যে, এটা হযরত আবু বকর সিদ্দীক এবং হযরত উমর ফারুকের খিলাফতের প্রতি ইঙ্গিত। আর হযরত উমরের খিলাফতকালে শরীয়তের অনেক বিধি-বিধান এবং ইসলামের ব্যাপক প্রসার হবে।
তাবারানী সদীসা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, উমর ইসলাম গ্রহণের পর থেকে শয়তান তার মুখোমুখি হলে সে মুখ ফিরিয়ে উলটে পড়তো। তাবারানী উবাই বিন কাব থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, জিবরাঈল (আ.) আমাকে বলেন, উমরের ইন্তেকালে ইসলাম রোদন করবে।
তাবারানী আওসাত গ্রন্থে আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে উমরের সাথে শত্রুতা করবে সে আমার সাথে শত্রুতা করল। আর যে উমরকে ভালোবাসবে সে যেন আমাকে ভালোবাসল। আল্লাহ তা'আলা আরাফাতে অবস্থানরত (হাজীদের) নিয়ে সাধারণত এবং হযরত উমরকে নিয়ে বিশেষত গর্ব করেন। সকল নবীর উম্মতের মধ্যে একজন মুহাদ্দিস ছিলেন। আর আমার উম্মতের মুহাদ্দিস হলেন উমর। সাহাবাগণ আরয করলেন, কে মুহাদ্দিস হতে পারে? নবী করীম (সা.) বলেন, যার ভাষায় ফেরেশতাগণ কথা বলেন। এর সূত্রগুলো বিশুদ্ধ।
📄 হযরত উমর সম্পর্কে সাহাবা এবং সলফে সালেহিনদের অভিমত:
হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বলেন, আমার নিকট হযরত উমরের চেয়ে প্রিয়তম আর কেউ নেই। (ইবনে আসাকির)
হযরত আবু বকরকে মৃত্যু শয্যায় জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেন, হযরত উমরকে খলীফা নির্ধারণের জন্য আল্লাহ তা'আলা আপনাকে যদি জিজ্ঞেস করেন তাহলে কি উত্তর দিবেন? তিনি বললেন, বলব লোকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে খলীফা মনোনীত করেছি। (ইবনে সাদ)
হযরত আলী (রা.) বলেন, তোমরা সৎ লোকদের আলোচনায় হযরত উমরকে অন্তর্ভুক্ত করতে ভুল না। কারণ বেশিদিন গত হয়নি তার যবান ছিল প্রশান্তময়। (তাবারানী-আওসাত)
ইবনে উমর (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পর আমরা কাউকে হযরত উমরের চেয়ে অধিক মেধাবী এবং দানশীল আর কাউকে পাইনি। (ইবনে সাদ)
ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, হযরত উমরের জ্ঞান পাল্লার এক দিকে আর পৃথিবীর সকল জ্ঞান পাল্লার অপর দিকে তুলে দিলে হযরত উমরের জ্ঞানের পাল্লা ভারি হবে। কারণ জ্ঞানের দশমাংসের নবমাংশ হযরত উমরকে দেয়া হয়েছে। (তাবারানী, হাকেম)
হযরত হুযাইফা (রা.) বলেন, পৃথিবীর ইলম হযরত উমরের কোলে লুকিয়ে ছিল। তিনি আরো বলেন, হযরত উমর আল্লাহর পথে নিরাপত্তার কোনো পরোয়া করতেন না। হযরত মুআবিয়া বলেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীকের কাছে দুনিয়া ধরা দেয়নি, তিনি এর কামনাও করতেন না। আর হযরত উমরের নিকট দুনিয়া এলেও তিনি তা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেন, কিন্তু আমরা দুনিয়াকে পেটের মধ্যে নিয়ে ফেলেছি।
হযরত জাবের (রা.) বর্ণনা করেন, হযরত উমর ইন্তেকালের পর তাকে কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়ার পর হযরত আলী এসে বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পর এ কাপড় পরিহিত ব্যক্তির চেয়ে কারো আমল বেশি পছন্দনীয় ছিল না। (হাকেম)
হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, পুণ্যবান লোকদের আলোচনার সময় অবশ্যই হযরত উমরের নাম নিবে। কারণ তিনি আমাদের মধ্যে কুরআনের সবচেয়ে বড় আলেম এবং আল্লাহর দ্বীনের সবচেয়ে বড় ফকীহ। (তাবারানী)
জনৈক ব্যক্তি হযরত ইবনে আব্বাসকে হযরত আবু বকর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, তিনি আপাদমস্তক কল্যাণকর, অতঃপর হযরত উমর সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁর দৃষ্টান্ত অত্যন্ত সচেতন পক্ষির ন্যায়, চারণ ক্ষেত্রের প্রতিটি স্থানে যার মনে থাকত এ কথা যে, পাতান জালে পা দিলে ফেঁসে যাব। আবার হযরত আলী সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, দৃঢ়সংকল্প, সামুদ্রিক জ্ঞান, সাহসিকতা এবং বীরত্ব তাঁর মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। (তাওরিয়াত)
তাবারানী উমায়ের বিন রাবী'আ থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উমর বিন খাত্তাব হযরত কা'ব আহবারকে জিজ্ঞেস করেন, পূর্ববর্তী সহীফাগুলোতে কিভাবে আমার বিবরণ এসেছে? কাব বললেন, আপনার সম্পর্কে লিখা রয়েছে- 'করনাম মিন হাদীদ'। হযরত উমর বললেন, এর অর্থ কি? কাব বললেন, তিনি এমন এক শক্তিশালী শাসনকর্তা যিনি আল্লাহর পথে কারো নিন্দার কোন পরোয়া করেন না। হযরত উমর বললেন, আর কি লিখা রয়েছে? কা'ব বললেন, আপনার পর যিনি খলীফা হবেন গোটা সম্প্রদায় মিলে তাঁকে শহীদ করে দিবে। হযরত উমর বললেন, আর কি লেখা রয়েছে? কা'ব বললেন, অতঃপর চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে।
ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, চারটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখের মাধ্যমে হযরত উমরের মর্যাদা অনুধাবন করা যেতে পারে। এক. হযরত উমর বদর যুদ্ধ বন্দীদের হত্যা করার অভিমত পেশ করলে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়- 'লাওলা কিতাবুম মিনাল্লাহি সাবাকা'। দুই. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পুণ্যাত্মা বিবিগণের পর্দার ব্যাপারে হযরত উমর নিজের মতামত তুলে ধরলে হযরত যয়নব বললেন, হে উমর বিন খাত্তাব! আপনি আমাদের প্রতি নির্দেশ প্রদান করেছেন, অথচ আমাদের ঘরেই ওহী অবতীর্ণ হয়। অতঃপর হযরত উমরের অভিমতের সাথে সঙ্গতি রেখে পর্দার ব্যাপারে এ আয়াত অবতীর্ণ হয় - 'ফাইযা সাআলতুমুহুন্না মাতাআন'। তিন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রত্যক্ষ দু'আর বরকতে হযরত উমর ইসলাম গ্রহণ করেন। চার, তিনি হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর হাতে সর্বপ্রথম বাইয়াত গ্রহণ করেন। (আহমদ, বায্যার, তাবারানী)
হযরত মুজাহিদ (র.) বলেন, আমরা পরস্পরে এ আলোচনা করতাম হযরত উমরের খিলাফতকালে শয়তান অবরুদ্ধ ছিল। তাঁর (ইন্তেকালের পর) পর শয়তান মুক্ত হয়ে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। (ইবনে আসাকির)
দশম পরিচ্ছেদ
হযরত সুফিয়ান ছাওরী (র.) বলেন, যে ব্যক্তি হযরত আলীকে হযরত আবু বকর এবং হযরত উমরের চেয়ে বেশি খিলাফতের হকদার মনে করবে, সে হযরত আবু বকর, হযরত উমর, সকল মুহাজির এবং আনসার সাহাবীদের ত্রুটি চিহ্নিত করবে।
হযরত শারীক বলেন, যার মধ্যে বিন্দু পরিমাণ পুণ্য রয়েছে সে কখনোই এ কথা বলবে না- হযরত আবু বকর সিদ্দীক এবং হযরত উমর ফারুকের চেয়ে বেশি হযরত আলী খিলাফতের প্রাপ্য ছিলেন না।
হযরত আবু উসামা বলেন, হে লোক সকল! তোমরা কি জান হযরত আবু বকর সিদ্দীক এবং হযরত উমর ফারুক ইসলামের পিতা-মাতা।
হযরত জাফর সাদেক (র.) বলেন, যে ব্যক্তি হযরত আবু বকর এবং হযরত উমরকে ভালো মনে করে স্মরণ করবে না, আমি তার প্রতি অসন্তুষ্ট।
📄 হযরত উমরের অভিমতের সাথে কুরআনের ঐকমত্য:
ইবনে মারদুয়া মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উমর যে রায় দিতেন অনূরূপভাবেই কুরআন শরীফের আয়াত অবতীর্ণ হতো।
ইবনে আসাকির হযরত আলীর অভিমত নকল করে লিখেছেন, কুরআন শরীফে অধিকাংশ হযরত উমরের রায় উল্লেখ রয়েছে। হযরত ইবনে উমর কর্তৃক মারফুআন বর্ণিত, কতিপয় বিষয়ে লোকদের মতামতের সাথে হযরত উমর ভিন্ন মত পোষণ করলে হযরত উমরের অভিমতের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আয়াত অবতীর্ণ হতো।
বুখারী শরীফ এবং মুসলিম শরীফে রয়েছে, হযরত উমর (রা.) বলেন, আমার প্রতিপালক তিন বার আমার অভিমতের সাথে একমত পোষণ করেছেন। এক. ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি মাকামে ইবরাহীমকে নামাযের স্থান বানাতে চাই। 'ওয়াত্ত্যাকিযূ মিম মাক্বামি ইব্রাহীমা মুসাল্লা'।
দুই. আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার পুণ্যাত্মা বিবিগণের কাছে সব ধরনের লোক যাতায়াত করে। আপনি তাঁদের পর্দা করার নির্দেশ দিন। এরপর পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হয়। তিন. পুণ্যাত্মা বিবিগণ লজ্জা দিলে আমি বললাম- 'আসা রাব্বুহু ইন তাল্লাকাকুন্না আই ইয়ুবদিলাহু আযওয়াজান খাইরাম মিনকুন্না'। অতঃপর আমার উল্লিখিত শব্দগুলোই হুবহু অবতীর্ণ হয়।
ইমাম মুসলিম হযরত উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলা আমার সাথে তিন বিষয়ে একমত, এক. পর্দা, দুই. বদরের যুদ্ধবন্দী এবং তিন. মাকামে ইবরাহীম। এ হাদীসে উল্লিখিত দ্বিতীয় নম্বর বিষয়টির মাধ্যমে চারটি দৃষ্টান্ত জানা গেল।
ইমাম নব্বী তাহযীব গ্রন্থে চারটি বিষয়ে একমত হওয়ার কথা লিখেছেন। এক. বদর যুদ্ধবন্দী, দুই. পর্দা, তিন. মাকামে ইবরাহীম এবং চার. মদের অবৈধতা। এ হাদীসে উল্লিখিত চতুর্থ নম্বর বিষয়টির মাধ্যমে পাঁচটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা হলো।
মদের অবৈধতা সম্পর্কে সুনানা এবং মুসতাদরাকে হাকেম গ্রন্থে রয়েছে একদা হযরত উমর দু'আ করেন, হে আল্লাহ! শরাবের ব্যাপারে আমাদের জন্য কিছু অবতীর্ণ করুণ। অতঃপর শরাব হারাম হওয়ার বাণী নাযিল হয়।
ইবনে আবী হাতেম স্বরচিত তাফসীর গ্রন্থে হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, হযরত উমর (রা.) বলেন, আল্লাহ তা'আলা চারটি বিষয়ে আমার সাথে একমত হয়েছেন। যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয় - 'লাকাদ খালাকনাল ইনসানা মিন সুলালাতিম মিন ত্বীন' তখন এমনিতেই আমার মুখ থেকে বেরিয়ে যায়- 'ফাতাবারাকাল্লাহু আহসানুল খালিকীন' অতঃপর হুবহু এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এ হাদীসের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা হযরত উমরের ছয়টি অভিমতের সাথে একমত পোষণ করে ওহী অবতীর্ণ করেছেন বলে জানা গেল। এ হাদীসটি ইবনে আব্বাসের সূত্রে গ্রন্থকার তাফসীরে মুসনাদ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
মাস্নাফ আবু আব্দুল্লাহ শীবানী কর্তৃক প্রণীত কিতাবে ফাজাইলুল উম্মাহ্ গ্রন্থে রয়েছে, হযরত উমরের সাথে তাঁর প্রতিপালক একুশ জায়গায় একমত হন। এর মধ্যে ছয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। সপ্তম, আব্দুল্লাহ বিন উবাই-এর মৃত্যু হলে রাসূলুল্লাহ (সা.) লোকদের জানাযার জন্য সমবেত হতে বললে আমি হযরতের সামনে গিয়ে বললাম ইয়া রাসূলাল্লাহ! উবাই বিন কাব কঠোর শত্রু ছিল। সে অমুক দিন এই এই কথা বলেছে। আল্লাহর কসম কিছুক্ষণ পর এ আয়াত অবতীর্ণ হয়- 'ওয়ালা তুসাল্লি আলা আহাদিম মিনহুম মাতা আবাদা'
অষ্টম, এক ঘটনার প্রেক্ষিতে এ আয়াত অবতীর্ণ হয় - 'ইয়া আইয়্যাহাল্লাযীনা আমানু লা তাকরাবুস সালাতা...' নবম আরেক ঘটনায় এ আয়াত নাযিল হয়- 'ইয়াসআলুনাকা আনিল খামরি...' গ্রন্থকার বলেন, অষ্টম ও নবম নম্বর ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত আয়াতদ্বয় সপ্তম নম্বর হাদীসের সাথে যুক্ত একই ঘটনার ধারাবাহিকতা।
দশম, রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি সম্প্রদায়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলে আমি বললাম- 'সাওয়াউন আলাইহিম...' তখন হুবহু এ আয়াতটিই নাযিল হলো- 'সাওয়াউন আলাইহিম আসতাগফারতা লাহুম...' তাবারানী এ রেওয়ায়েতটি ইবনে আব্বাসের বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছেন।
একাদশ, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন সাহাবীদের নিয়ে বদর যুদ্ধে যাবার পরামর্শ করছিলেন তখন হযরত উমর যুদ্ধে গমনের পরামর্শ দিলে নাযিল হয়- 'কামা আখরাজাকা রাব্বুকা মিম বাইতিকা...' দ্বাদশ, রাসূলুল্লাহ (সা.) পরামর্শ চাইলে হযরত উমর বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনাকে আয়েশার সাথে কে বিয়ে দিয়েছেন? তিনি বললেন, আল্লাহ। হযরত উমর বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি মনে করেন, আপনার রব আপনাকে ত্রুটিযুক্ত জিনিস দিয়েছেন? অতঃপর এ আয়াত অবতীর্ণ হয়- 'সুবহানাকা হাযা বুহতানুন আজীম'
ত্রয়োদশ, ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ে রমযানের রাতে স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করা হারাম ছিল। হযরত উমর এ বিষয়ে মন্তব্য করলে এ আয়াত নাযিল হয়- 'উহিল্লা লাকুম লাইলাতাস সিয়ামির রাফাসু...' উল্লেখ করেছেন।
চতুর্দশ, এক ইহুদী হযরত উমরকে বলল, তোমাদের নবী যে জিবরাঈলের কথা বলেন তিনি আমাদের দুশমন! হযরত উমর বললেন- 'মান কানা আদুউওআল্লিল্লাহি ওয়া মালাইকাতিহি ওয়া রাসুলিহি ওয়া জিবরিলা ওয়া মিকালা ফাইন্নাল্লাহা আদুউওউল লিলকাফিরিন' অতঃপর হুবহু এ আয়াতই অবতীর্ণ হয়। এ রেওয়ায়েতটি ইবনে জারীর কয়েকটি সূত্রে এবং ইবনে আবী হাতেম আব্দুর রহমান ইবনে আবু ইয়ালা থেকে বর্ণনা করেন।
পঞ্চদশ, রাসূলুল্লাহ (সা.) দু' ব্যক্তির বিবাদ মিমাংসা করে দিলেন একজনের তা মনঃপূত না হওয়ায় সে পুনরায় হযরত উমরের নিকট বিচার প্রার্থনা করায় তিনি তাকে হত্যা করেন। এ খবর পেয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমি উমরের ব্যাপারে এমনটা ধারণা করি না যে, তিনি কোনো মুমিনকে হত্যা করতে পারেন। এ প্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন- 'ফালা ওয়া রাব্বিকা লা ইউমিনুনা...' এ রেওয়ায়েতটি ইবনে আবু হাতিম এবং ইবনে মারদুয়া আবুল আসওয়াদ থেকে বর্ণনা করেন। গ্রন্থকার বলেন, আমি তাফসীরে মুসনাদ গ্রন্থে এ রেওয়ায়েতের বিভিন্ন সূত্র বর্ণনা করছি।
ষষ্ঠদশ, একদিন হযরত উমর স্ব-গৃহে শুয়ে ছিলেন। তাঁর গোলাম অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে তিনি এ দু'আ করেন, হে আল্লাহ! বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করা হারাম করে দিন। সঙ্গে সঙ্গে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। সপ্তদশ, তিনি বলতেন, ইহুদীরা অভিশপ্ত জাতি। এ প্রেক্ষিতে আয়াত অবতীর্ণ হয়।
অষ্টদশ, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- 'সুলাতুম মিনাল আউওয়ালিন ওয়া সুলাতুম মিনাল আখিরিন' এ আয়াতের সাথে সম্পৃক্ত ঘটনাটি ইবনে আসাকির, স্বরচিত ইতিহাস গ্রন্থে জাবের বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন। এ ঘটনাটি উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট।
উনিবিংশ, 'ইযা যানিয়াশ শাইখু ওয়াশ শাইখাতু' এ আয়াতটি মানসুখ তিলাওয়াত। বিংশ, উহুদের যুদ্ধে আবু সুফিয়ান 'ফিল কাওমি ফুলানুন' বললে এর জবাবে হযরত উমর বলেন, 'আল আজাবুন' আর এ কথার সাথে রাসূলুল্লাহ (সা.) একমত পোষণ করেন। এ বর্ণনাটি আহমদ মুসনাদ গ্রন্থে উল্লেখ করেন।
উক্ত ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত যা আমরা একবিংশ দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করতে চাই। উসমান বিন সাঈদ বিন আদ-দারমী কিতাবুর রুহ আলাল জাহীমা গ্রন্থে সালেম বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, একদা কা'ব আহবার বলেন, আসমানের বাদশাহ যমীনের বাদশাহর প্রতি আফসোস করছেন। একথা শুনে হযরত উমর বলেন, যমীনের বাদশাহর উপর নয়; বরং তার উপর যে তার নফসকে কবজায় নিয়েছে। এ কথা শ্রবনে কা'ব আহবার বললেন, আল্লাহর কসম, তৌরাত গ্রন্থে হুবহু আপনার কথাগুলোই বিধৃত হয়েছে। অতঃপর হযরত উমর সেজদায় লুটিয়ে পড়েন।
এছাড়াও ইবনে আদী কর্তৃক প্রণীত কামেল গ্রন্থে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, প্রথম দিকে হযরত বিলাল আযানের মধ্যে 'আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এরপর 'হাইয়্যা আলাস সালাহ' বলতেন। হযরত উমর বললেন, 'আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এর পর 'আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ' বল। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, উমর যেভাবে বলেছে সেভাবে বলবে।
📄 কারামত (অলৌকিকতা):
বায়হাকী, আবু নাঈম দালাইলুন নবুওয়্যত গ্রন্থে, লাকায়ী শরহুস সুন্নাহ গ্রন্থে, দারী ফাওয়ায়েদ গ্রন্থে, ইবনে আরাবী কারামতে আউলিয়া গ্রন্থে এবং খাতীব রাওয়াতু মালিক গ্রন্থে ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উমর সারিয়া নামক এক ব্যক্তিকে সেনাপতি বানিয়ে যুদ্ধে পাঠানোর পর একদিন খুতবা প্রদানের সময় হঠাৎ বলে উঠলেন- 'ইয়া সারিইয়াতুল জাবাল' (হে সারিয়া পাহাড়ের দিকে)। এভাবে তিনি তিন বার বললেন। কিছুদিন পর সেই রণাঙ্গণ থেকে দূত এলো। তিনি যুদ্ধের সংবাদ জানতে চাইলেন। দূত বলল, আমিরুল মুমিনীন! আমরা পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলাম। হঠাৎ তিন বার "হে সারিয়া পাহাড়ের দিকে" এ আওয়াজ শুনে সঙ্গে সঙ্গে সেই পাহাড়ের দিকে ছুটেছি আল্লাহ তা'আলা আমাদের দুশমনদের পরাজিত করেন। ইবনে উমর বলেন, তখন সারিয়া অনারাব দেশে ছিল, আর তিনি এখান থেকে আওয়াজ দেন। ইবনে হাজার আসকালীনী ইসাবা গ্রন্থে এর সনদগুলো সহীহ বলে অভিহিত করেছেন।
ইবনে মারদুয়া মাইমুন বিন মেহরানের সূত্রে ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেন, জুমআর দিন খুতবা প্রদানের সময় তিনি সহসা বলে উঠলেন- 'ইয়া সারিইয়াতুল জাবাল মান আসতারাআয যিমবা জুলমুন' অর্থাৎ, হে সারিয়া পাহাড়ের দিকে যাও, বাঘের রক্ষকরা অত্যাচার করছে। লোকেরা এ কথা শুনে একে অপরের দিকে তাকাতে লাগল। হযরত আলী বলেন, খুতবা শেষে লোকেরা তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, সে সময় আমার মনে হলো মুশরিকরা আমাদের মুসলমান ভাইদের পরাজিত করে পাহাড়ের পাদদেশে অতিক্রম করছিল। এ মুহূর্তে আক্রমণ করলে তারা সকলেই নিহত এবং পরাজিত হবে হেতু আমার মুখ দিয়ে এ শব্দগুলো বেরিয়ে গেছে। এক মাস পর এক ব্যক্তি বিজয়ের সুসংবাদ নিয়ে এলে সে বলল, আমরা হযরত উমরের আওয়াজ শুনে পাহাড়ের দিকে যেতেই আল্লাহ আমাদের বিজয় দেন।
আবু নাঈম দালায়েল গ্রন্থে আমর বিন হারিসের বরাত দিয়ে লিখেছেন, হযরত উমর জুমআর খুতবা দানের এক পর্যায়ে দুই অথবা তিন বার বললেন, হে সারিয়া! পাহাড়ের দিকে যাও। অতঃপর আবার খুতবা দিতে লাগলেন। উপস্থিত জনতার মধ্যে থেকে কেউ কেউ বললেন, তাকে উন্মাদনায় পেয়েছে। হযরত আব্দুর রহমান বিন আউফ হযরত উমরের সাথে বিনা সংকোচেই কথা বলতেন। তিনি বললেন, আজ আপনি এমন কাজ করলেন যার কারণে লোকেরা আপনার ব্যক্তিত্বকে ভর্ৎসনা করছে। হযরত উমর বললেন, আল্লাহর কসম! আমি সে সময় অস্থির হয়ে পড়ছিলাম যখন দেখলাম মুসলমানরা লড়াই করছে, আর শত্রুরা পাহাড়ের দিক থেকে তাদেরকে অবরুদ্ধ করে ফেলেছে, তখন আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। আপনাতেই বলে ফেললাম, পাহাড়ের দিকে যাও। এরপর রণাঙ্গন থেকে সারিয়া পত্র নিয়ে এক দূত এলো। পত্রে লেখা ছিল জুমআর দিন দুশমনের সাথে লড়াই চলছিল। এক পর্যায়ে আমরা পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে উপনীত। এমন সময় ঠিক জুমআর নামাযের সময় আমরা শুনতে পেলাম "সারিয়া পাহাড়ের দিকে যাও"। এ আওয়াজ পেয়ে আমরা পাহাড়ের দিকে গেলাম এবং বিজয় অর্জন করলাম। আমর বিন হারেছ বললেন, সেদিন যারা হযরত উমরকে উন্মাদনায় পেয়েছে বলে মন্তব্য করেছিল তারা বলল, এ সবই উদ্ভট কথা।
আবুল কাসিম বিন বুশরান ফাওয়ায়েদ গ্রন্থে ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উমর জনৈক ব্যক্তিকে নাম জিজ্ঞেস করলে সে বলল, জামরাহ (স্ফুলিঙ্গ)। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, বাবার নাম? সে বলল, শিহাব (অগ্নিশিখা) তিনি প্রশ্ন করলেন, গোত্রের নাম? সে বলল, হরকা (আগুন)। তিনি জানতে চাইলেন, কোথায় থাক? সে বলল, হিররাহ (উত্তপ্ত পাথুরে যমীন) তিনি বললেন, হিররাহ কোথায়? সে জবাব দিল, নাতী (লেলিহান অগ্নিশিখা)। তিনি বললেন, পরিবারের খোঁজ নাও, তারা পুড়ে মরেছে। সে লোক গিয়ে দেখল সত্যিই তাই। আগুন লেগে সব পুড়ে গেছে। মালিক প্রমুখ এভাবে বর্ণনা করেছেন।
আবুশ শাইখ আল-আসমাত গ্রন্থে কায়েস ইবনে হাজ্জাজ-এর বরাত দিয়ে লিখেছেন, হযরত আমর ইবনে আস কর্তৃক মিসর বিজিত হওয়ার পর মিসরবাসী তাঁর নিকট এসে বলল, আমাদের চাষাবাদ নীল নদের প্রবাহের উপর নির্ভরশীল। নীল নদ শুষ্ক হয়ে গেলে প্রাচীন নীতি অনুযায়ী নীল নদের প্রবাহ বেগমান করতে হয়। হযরত আমর বিন আস বললেন, সে প্রাচীন নীতি কি? তারা বলল, চাঁদের একাদশতম রজনীতে এক অবিবাহিত যুবতির বাবাকে রাজী করে তাকে উন্নতমানের পোশাক এবং অলংকারাদি পরিয়ে নীল নদে নিক্ষেপ করি। হযরত আমর বললেন, ইসলাম পূর্বের প্রথা রহিত করেছে। অতএব তোমরা তা করতে পারো না। কিছুদিন পর নীল নদের প্রবাহ থেমে গেলে কতিপয় মিসরবাসী হযরত আমর বিন আসের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার মনস্থির করলে হযরত আমর বিন আস বিষয়টি পত্র মারফত আমিরুল মুমিনীন হযরত উমর ফারুক (রা.)-কে অবহিত করলেন। কয়েকদিন পর আমিরুল মুমিনীন হযরত উমর (রা.) জবাবে এ পত্র লিখলেন- তুমি সুন্দর পত্র দিয়েছ, এসব প্রথা উৎখাতের জন্যই ইসলামের আবির্ভাব। এ পত্রের সাথে যুক্ত একখানা মোড়ানো কাগজের টুকরো দিলাম যা নীল নদে ফেলে দিবে। এ পত্র হযরত আমর বিন আসের হস্তগত হলে তিনি সেই মোড়ানো কাগজটি খুলেন। তাতে লিখা ছিল- আল্লাহর বান্দা আমিরুল মুমিনীন উমরের পক্ষ হতে নীল নদের অবগতির জন্য প্রশ্ন করছি, তুমি যদি নিজের শক্তিতে প্রবাহিত হও তবে তুমি আর কখনই প্রবাহিত হওয়ো না। আর যদি আল্লাহ তা'আলা প্রবাহিত করেন তাহলে সেই এক ও অদ্বিতীয় মহাশক্তিধর প্রতিপালকের নিকট আমার আবেদন, তেমাকে প্রবাহিত করুন। হযরত আমর বিন আস (রা.) কাগজের টুকরোটি শুকতারা উদয়ের কিছুক্ষণ পূর্বে নীল নদে ফেলে দেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে মিসরবাসী দেখল আল্লাহ তা'আলা এক রাতে নীল নদে ষোলো হাত পানির তরঙ্গ সৃষ্টি করেছেন। আর সেদিন থেকে আল্লাহ তা'আলা মিসরবাসীর এই প্রথা বন্ধ করে দেন।
ইবনে আসাকির তারেক বিন শিহাব থেকে বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি হযরত উমরকে সত্য মিথ্যার মিশ্রণে কিছু কথা বলছিলেন। হযরত উমর কখনো তাকে থামতে বলেন, আবার কখনো বলতে বলেন, অবশেষে সে বলল, আমি আপনাকে যা বলেছি তা সত্য। তবে যে সব কথার প্রেক্ষিতে আমাকে থামতে বলেন তা ছিল মিথ্যা। হযরত হাসান বলেন, কথার মধ্যে মিশ্রিত মিথ্যা অংশটুকু হযরত উমর চিহ্নিত করতে পারতেন।
বায়হাকী দালায়েল গ্রন্থে আবু হুদাবা হামসী থেকে বর্ণনা করেন, ইরাকবাসী তাদের গর্ভনরকে পাথর মারার সংবাদ পেয়ে হযরত উমর ক্রোধান্বিত হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন। সেদিন তাঁর নামায ভুল হওয়ায় নামায পড়ে এ দু'আ করলেন- হে আল্লাহ! তারা নাময গড়মিল করেছে, তাদের প্রতিটি কাজ গড়মিল করে দিন। তাদের প্রতি বনূ ছাকীফ গোত্রের এক ছোকড়াকে চাপিয়ে দিন, যে জাহেলিয়াতের যুগের অত্যাচারের মত তাদেরকে শাসন করবে এবং সে তাদের ভালো কাজ গ্রহণ করবে না এবং খারাপ কাজের শাস্তি ক্ষমা করবে না। গ্রন্থকার বলেন, ছোকড়া বলতে তিনি হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ছাকাফীকে বুঝিয়েছেন। ইবনে লাহী'আ বলেন, সে ছোকড়ার তখন জন্মই হয়নি।
অভ্যাস:
ইবনে সাদ আখলিফ বিন কায়েসের বরাত দিয়ে লিখেছেন, আমরা আমিরুল মুমিনীন হযরত উমরের দরজায় বসা ছিলাম। এমন সময় এক বাঁদীকে পার হতে দেখে আমরা বললাম, এ আমিরুল মুমিনীনের বাঁদী। আমিরুল মুমিনীন বললেন, এ আমিরুল মুমিনীনের বাঁদী নয়। তার জন্য বাঁদী রাখা বৈধ নয়। আমরা আরয করলাম, তাহলে কি রাখা বৈধ? তিনি বললেন, হজ্জ এবং উমরাহর জন্য শীত ও গরমের দু'টি কাপড় এবং নিজ পরিবারের খাওয়ার খরচ ছাড়া উমরের কাছে আর কিছু রাখা বৈধ নয়। এটা অতিসাধারণ এক কুরাইশের জীবন যাপনের দৃষ্টান্ত। রাবী বলেন, এরপর থেকে আমাদের অবস্থাও ছিল তাই।
হাযিমা বিন ছাবিত বলেন, তিনি এ শর্তে শাসনকর্তা নিয়োগ করে পাঠাতেন যে, তুর্কী অর্শ্বে আরোহণ করবে না, উন্নত খাবার খাবে না, পাতলা কাপড় পরবে না এবং প্রয়োজনে যারা আসবে তাদের জন্য নিজের দরজা বন্ধ রাখবে না। এমনটা করলে শাস্তিযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
ইকরামা বিন খালিদ বলেন, হযরত হাফসা, হযরত আব্দুল্লাহ প্রমুখ হযরত উমরকে বললেন, আপনি উন্নতমানের আহার্য গ্রহণ করলে আল্লাহ তা'আলার কাজ করার ক্ষেত্রে শক্তি অর্জন করতে পারবেন। তিনি বললেন, এটাকি তোমাদের সকলের অভিমত? তাঁরা সকলে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলে তিনি বললেন, তোমাদের সুচিন্তিত মতামতে আমি ধন্য। তবে এ শাহী পথেই আমার দুই বন্ধুকে (হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)) পেয়েছি। আল্লাহ না করুন যদি এ শাহী পথ বর্জন করি তাহলে আর আমি দুই বন্ধুর মর্যাদা অর্জন করতে পারব না। কথিত আছে, এক সামান্য দুর্ভিক্ষের বছর থেকে তিনি ঘি এবং তৈল জাতীয় খাবার খাওয়া ছেড়ে দেন।
ইবনে আবী মালীকা বলেন, উকবা বিন ফিরকদ হযরত উমরকে ভালো খাবার খাওয়ার জন্য অনুরোধ জানালে তিনি বললেন, আফসোস! আমি এ অল্প দিনের জিন্দেগীর পুণ্যগুলো কি সব খেয়ে ফেলব?
হযরত হাসান বলেন, একদা হযরত উমর তাঁর ছেলে হযরত আসেমের নিকট এসে তাকে গোশত খেতে দেখে বললেন, তুমি কি খাচ্ছ? হযরত আসেম বললেন, আজ গোশত খেতে আমার মন চেয়েছিল। হযরত উমর বললেন, তোমার মন যা চাইবে তাই কি খেতে হবে? যে সবসময় নিজের মনমতো খায় পরকালে তাকে চোর হিসেবে সাব্যস্ত করা হবে।
আসলাম বলেন, একদা হযরত উমর (রা.) বললেন, আমার মন মাছ খেতে চাইছে। তার গোলাম ইরফা নামক উটে চড়ে চার মাইল দূরে মাছ আনতে যায়। ঝোলা ভর্তি সে মাছ কেনে। ফেরার পথে উট হাঁকিয়ে দ্রুত আসতে গিয়ে উট ঘর্মসিক্ত হয়ে পড়ে। তিনি বললেন, মাছ রাখ আগে উট দেখব। তিনি উটের কাছে গেলেন এবং উটের কানের নিচে বিন্দু বিন্দু জমানো ঘাম দেখে বললেন, তুমি একে গোসল করাওনি। আমার ইচ্ছার কারণে এ পশুকে অহেতুক কষ্ট দিয়েছ। আল্লাহর কসম! আমি এ মাছ স্পর্শই করব না।
হযরত কাতাদা (রা.) বলেন, হযরত উমর খলীফা থাকাকালে তিনি চামড়ার তালিযুক্ত ফাটা কাপড় পরে পথ দিয়ে বাজারে গিয়ে লোকদের শিষ্টাচার শিক্ষা দিতেন এবং তাদেরকে সাবধান করতেন। কোনো বোঝা দেখলে তিনি তা নিজ কাঁধে উঠিয়ে নিয়ে বাড়িতে পৌঁছে দিতেন। হযরত আনাস বলেন, হযরত উমরের জামার পেছনে চারটি তালি দেখেছি। আবু উসমান নাহদী বলেন, হযরত উমরের পায়জামায় চামড়ার পট্টি লাগা দেখেছি।
আব্দুল্লাহ বিন আমের বিন রবীআ বলেন, আমি হযরত উমরের সাথে হজ্জ করেছি। সফরের সময় পথিমধ্যে তিনি কোন তাঁবু গাড়তেন না; বরং গাছের ডালে কম্বল অথবা কাপড় টানিয়ে তার ছায়ায় বসতেন।
আব্দুল্লাহ বিন ঈসা বলেন, কান্নার পানি প্রবাহিত হতে হতে হযরত উমরের চেহারায় কালো দাগ পড়ে গিয়েছিল। কখনও তিনি ওযীফার আয়াত পড়তে পড়তে পড়ে যেতেন। মানুষ অসুস্থ ভেবে দেখতে আসত।
হযরত আনাস বলেন, আমি এক বাগানে গেলাম। দেয়ালের এ প্রান্ত থেকেই ওপ্রান্তে অবস্থানরত হযরত উমরের আওয়াজ শুনতে পেলাম। তিনি বলেছেন, হে উমর! কোথায় তুমি, আর কোথায় আমিরুল মুমিনীনের মর্যাদা ও সম্মান। আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করো, অন্যথায় তিনি শাস্তি দিবেন।
আব্দুল্লাহ বিন আমার বিন রবীআ বলেন, আমি হযরত উমরকে দেখলাম তিনি মাটি থেকে একটি তৃণখণ্ড উঠিয়ে বললেন, হায়! আমি যদি এ তৃণখণ্ড হতাম, তাহলে আমি মাতৃগর্ভে আসতাম না এবং আমি আর আমি হতাম না।
আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন হাফস বলেন, একদা হযরত উমর পানির মশক পিঠে নিয়ে যাচ্ছিলেন। লোকেরা তাঁর এ আচরণে বিস্মিত হলে তিনি বললেন, আমার মধ্যে গর্ব ও অহংকার এসেছে। ফলে তা খর্ব করছি।
মুহাম্মদ বিন সিরীন বলেন, হযরত উমরের শ্বশুর এসে বাইতুল মাল থেকে কিছু চাইলে তিনি ভীতি প্রদর্শন করে বললেন, আপনি কি চান যে, আমি আল্লাহর নিকট প্রতারক বাদশাহ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকি! অতঃপর তিনি নিজ তহবিল থেকে দশ হাজার দেরহাম প্রদান করেন।
নাখ'য়ী বলেন, হযরত উমর নিজ শাসনামলেও ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন। হযরত আনাস বলেন, হযরত উমর দুর্ভিক্ষের বছর থেকে ঘি খাওয়া ছেড়ে দেন। একদা তিনি মাখন এবং তৈল জাতীয় খাবার খেলে তার পেটে পীড়া দেখা দেয়। সে সময় তিন আঙুল উঁচিয়ে বললেন, দুর্ভিক্ষের বছর থেকে আমার ঘরে তেমন কিছু নেই।
সুফিয়ান ছাওরী বলেন, হযরত উমর বলেন, যে আমার ত্রুটি চিহ্নিত করে দেয় সে ব্যক্তি আমার প্রিয়। আসলাম বলেন, আমি হযরত উমরকে ঘোড়ার কান ধরে লাফ দিয়ে অশ্বারোহণ করতে দেখেছি। ইবনে উমর বলেন, আমি হযরত উমরকে রাগ করতে দেখেনি। আল্লাহর যিকির, আল্লাহর ভয় এবং কুরআন তিলাওয়াত ছাড়া তাঁর রাগ যেতো না।
হযরত বিলাল হযরত আসলামকে হযরত উমর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন, আপনি উমরকে কেমন দেখেছেন? তিনি বললেন, হযরত উমর একজন খাঁটি মানব। কিন্তু রেগে গেলে তাঁকে থামানো মুশকিল হয়ে পড়তো। হযরত বিলাল বললেন, সে সময় আপনি কেন কুরআনের আয়াত পাঠ করতেন না? তিলাওয়াত করলে তাঁর রাগ চলে যায়।
আহওয়াজ বিন হাকীম তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, একদা হযরত উমরের সামনে ঘি দিয়ে রান্না করা গোশত দেয়া হলে তিনি তা খেতে অস্বীকার করে বলেন, এ দু'টি (ঘি এবং গোশত) পৃথক পৃথক খাবার। এ দু'টিকে একত্রে রান্না করার প্রয়োজন ছিল না। এ পর্যন্ত উল্লিখিত ঘটনাগুলো ইবনে সাদ লিপিবদ্ধ করেছেন।
ইবনে সাদ হাসান থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উমর (রা.) বলেন, একজন আমীরকে অন্য আমীরের স্থানে পরিবর্তনের মাধ্যমে লোকদের সংশোধনের পথকে সহজ মনে করি।