📄 হিজরত
ইবনে আসাকির হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, আমরা হযরত উমর ছাড়া অন্য কারো নাম বলতে পারবো না যিনি প্রকাশ্যে হিজরত করেছেন। হিজরতের সময় তিনি গলায় তলোয়ার এবং কাঁধে কামান ঝুলিয়ে হাতে কয়েকটি তীর নিয়ে বাইতুল্লাহ শরীফে যান, সেখানে কুরাইশ নেতৃবৃন্দ বসে ছিল। তিনি সাত বার তাওয়াফ করে মাকামে ইবরাহীমে দু'রাকাত নামায পড়েন। অতঃপর কুরাইশ নেতৃবৃন্দের নিকট এসে পৃথক পৃথকভাবে বললেন, তোমাদের মুখ কালো হোক। যে মাকে ছেলে হারা, সন্তানকে এতিম, স্ত্রীকে বিধবা করতে চায় সে যেন আমার সাথে লড়াই করে, কিন্তু তার ছায়া মাড়ানোর সাহসটুকুও কারো ছিল না।
হযরত বারা বলেন, আমাদের নিকট সর্বপ্রথম মুসআব বিন উমায়ের তারপর ইবনে উম্মে মাকতুমা, অতঃপর বিশজন আরোহীর একটি কাফেলা নিয়ে হযরত উমর হিজরত করেন। আমরা তাঁকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অভিপ্রায় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হযরত পেছনে আসছেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-কে নিয়ে মদীনায় এলেন।
ইমাম নব্বী বলেন, হযরত উমর সকল যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে ছিলেন এবং উহুদ যুদ্ধেও অটল ছিলেন।
📄 হযরত উমরের ফযীলত সম্পর্কিত হাদীস
ইমাম বুখারী এবং ইমাম মুসলিম হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি স্বপ্নে জান্নাতে এক মহিলাকে প্রাসাদ চূড়ায় বসে অযু করতে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, এটা কার প্রাসাদ? ফেরেশতাগণ বললেন, উমর বিন খাত্তাবের। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, হে উমর! আমি তোমার মর্যাদার দিকে লক্ষ্য রেখে সে প্রাসাদে প্রবেশ করিনি। একথা শুনে হযরত উমর কেঁদে ফেললেন।
ইমাম বুখারী এবং ইমাম মুসলিম ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আমি স্বপ্নে দুধ পান করার সময় এর স্বাদ এবং গন্ধ আমার নাকে এলে অবশিষ্ট দুধ হযরত উমরকে দিলাম। সাহাবাগণ আরয করলেন, এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা কী? তিনি বললেন, ইলম।
ইমাম বুখারী এবং ইমাম মুসলিম হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, (তিনি বলেন) স্বপ্নে আমার সামনে কিছু লোক পেশ করা হলো- যাদের পোশাক বক্ষদেশ এবং আর কিছু লোকের পোশাক তারো বেশি পর্যন্ত প্রলম্বিত ছিল। আর উমরের পোশাক যমীন পর্যন্ত ঘেঁষে ছিল। সাহাবাগণ আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে পোশাকটি কি ছিল। নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেন, দ্বীন।
ইমাম বুখারী এবং ইমাম মুসলিম সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, হে উমর! সে সত্তার শপথ যার কুদরতী হাতে আমার প্রাণ। যে পথে তুমি চল শয়তান সে পথ ছেড়ে অন্য পথে চলে। বুখারী শরীফে হযরত আবু হুরায়রা কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমাদের পূর্ববর্তী জাতির মধ্যে মুহাদ্দিস ছিল। আর আমার উম্মতের মুহাদ্দিস হলেন উমর বিন খাত্তাব।
ইমাম তিরমিযী ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত উমরের মুখে ও অন্তরে সত্যের প্রবর্তন ঘটিয়েছেন। ইবনে উমর বলেন, লোকদের অভিমত ভিন্নতর হলে হযরত উমর যে রায় দিতেন সে মোতাবিক কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হতো।
ইমাম তিরমিযী এবং হাকেম উকবা বিন আমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আমার পর যদি কেউ নবী হতেন তবে তিনি হযরত উমর বিন খাত্তাব। এ রেওয়ায়েতটি তাবারানী আবু সাঈদ খুদরী এবং আসমা বিন মালিক থেকে এবং ইবনে আসাকির ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেন।
ইমাম তিরমিযী হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, উমরকে দেখে শয়তান পালিয়ে যেতে দেখেছি। ইবনে মাজা এবং হাকেম উবাই বিন কাব থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ তা'আলা সর্বপ্রথম হযরত উমরের সাথে মোসাফাহ করবেন, সালাম দিবেন এবং হাত ধরে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। ইবনে মাজা এবং হযরত আবু যর থেকে বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, উমরের মুখে ও অন্তরে আল্লাহ তা'আলা সত্য প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি সর্বদা সত্য বলতেন।
ইবনে মানী'আ মুসনাদ গ্রন্থে হযরত আলী (রা.) থেকে নকল করে লিখেছেন, মুহাম্মাদ (সা.)-এর সহচরদের মধ্যে কোনো সংশয় নেই যে, হযরত উমরের যবান ছিল প্রশান্তময়। বায্যার ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, হযরত উমর হলেন জান্নাতীদের জন্য উজ্জ্বল প্রদীপ।
বায্যার কাদাম বিন মাজউন এবং তিনি তাঁর চাচা উসমান বিন মাজউন থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত উমরের পানে ইশারা করে বলেন, যতক্ষণ তিনি তোমাদের মাঝে থাকবেন ততক্ষণ পর্যন্ত ফেতনার দরজা শক্তভাবে বন্ধ থাকবে।
তাবারানী আওসাত গ্রন্থে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন, একদা জিবরাঈল (আ.) নবী আকরাম (সা.)-এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে বললেন, উমরকে সালাম জানাবেন এবং তাকে এ সুসংবাদ দিবেন যে, তার ক্রোধ হলো বিজয়, আর সন্তুষ্টি হলো দর্শন।
ইবনে আসাকির হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, শয়তানরা হযরত উমরকে দেখে ভয় পেতো। ইমাম আহমদ এ হাদীসটি বুরাইদার সূত্রে এভাবে বর্ণনা করেন, তিনি (সা.) বলেন, হে উমর! শয়তান তোমাকে ভয় পায়।
ইবনে আসাকির ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আসমানের সকল ফেরেশতা উমরকে সম্মান এবং পৃথিবীর সকল শয়তান তাকে ভয় করে।
তাবারানী আওসাত গ্রন্থে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ তা'আলা আরাফাতে অবস্থানকারী (হাজীদের) নিয়ে সাধারণত এবং হযরত উমরকে নিয়ে বিশেষত গর্ব করেন। এ ধরনের আরেকটি বৃহৎ হাদীসটি হযরত আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত রয়েছে।
তাবারানী এবং দাইলামী ফজল বিন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, উমর যেখানেই থাক হক তার সাথেই থাকবে। ইমাম বুখারী এবং ইমাম মুসলিম ইবনে উমর এবং আবু হুরায়রা থেকে বর্ণনা করেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বপ্নের বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, একটি কূপে বালতি নামানো দেখে আমি কয়েক বালতি উত্তোলন করলাম। আমার পর আবু বকর বালতি নিলেন এবং এক অথবা দুই বালতি উত্তোলন করলেন, কিন্তু তার উত্তোলনে কিছুটা দুর্বলতা ছিল। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেছেন। অতঃপর উমর বালতি ধারণ করলেন এবং এমনভাবে তা উত্তলন করলেন, যা আমি একজন যুবককেও এভাবে উত্তোলন করতে দেখিনি। আর তখন চতুর্দিক থেকে তৃষ্ণার্থরা এসে পিপাসা নিবারণ করে।
ইমাম নব্বী তাহযীব গ্রন্থে লিখেছেন, ওলামাগণ উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যা এভাবে দিয়েছেন যে, এটা হযরত আবু বকর সিদ্দীক এবং হযরত উমর ফারুকের খিলাফতের প্রতি ইঙ্গিত। আর হযরত উমরের খিলাফতকালে শরীয়তের অনেক বিধি-বিধান এবং ইসলামের ব্যাপক প্রসার হবে।
তাবারানী সদীসা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, উমর ইসলাম গ্রহণের পর থেকে শয়তান তার মুখোমুখি হলে সে মুখ ফিরিয়ে উলটে পড়তো। তাবারানী উবাই বিন কাব থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, জিবরাঈল (আ.) আমাকে বলেন, উমরের ইন্তেকালে ইসলাম রোদন করবে।
তাবারানী আওসাত গ্রন্থে আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে উমরের সাথে শত্রুতা করবে সে আমার সাথে শত্রুতা করল। আর যে উমরকে ভালোবাসবে সে যেন আমাকে ভালোবাসল। আল্লাহ তা'আলা আরাফাতে অবস্থানরত (হাজীদের) নিয়ে সাধারণত এবং হযরত উমরকে নিয়ে বিশেষত গর্ব করেন। সকল নবীর উম্মতের মধ্যে একজন মুহাদ্দিস ছিলেন। আর আমার উম্মতের মুহাদ্দিস হলেন উমর। সাহাবাগণ আরয করলেন, কে মুহাদ্দিস হতে পারে? নবী করীম (সা.) বলেন, যার ভাষায় ফেরেশতাগণ কথা বলেন। এর সূত্রগুলো বিশুদ্ধ।
📄 হযরত উমর সম্পর্কে সাহাবা এবং সলফে সালেহিনদের অভিমত:
হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বলেন, আমার নিকট হযরত উমরের চেয়ে প্রিয়তম আর কেউ নেই। (ইবনে আসাকির)
হযরত আবু বকরকে মৃত্যু শয্যায় জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেন, হযরত উমরকে খলীফা নির্ধারণের জন্য আল্লাহ তা'আলা আপনাকে যদি জিজ্ঞেস করেন তাহলে কি উত্তর দিবেন? তিনি বললেন, বলব লোকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে খলীফা মনোনীত করেছি। (ইবনে সাদ)
হযরত আলী (রা.) বলেন, তোমরা সৎ লোকদের আলোচনায় হযরত উমরকে অন্তর্ভুক্ত করতে ভুল না। কারণ বেশিদিন গত হয়নি তার যবান ছিল প্রশান্তময়। (তাবারানী-আওসাত)
ইবনে উমর (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পর আমরা কাউকে হযরত উমরের চেয়ে অধিক মেধাবী এবং দানশীল আর কাউকে পাইনি। (ইবনে সাদ)
ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, হযরত উমরের জ্ঞান পাল্লার এক দিকে আর পৃথিবীর সকল জ্ঞান পাল্লার অপর দিকে তুলে দিলে হযরত উমরের জ্ঞানের পাল্লা ভারি হবে। কারণ জ্ঞানের দশমাংসের নবমাংশ হযরত উমরকে দেয়া হয়েছে। (তাবারানী, হাকেম)
হযরত হুযাইফা (রা.) বলেন, পৃথিবীর ইলম হযরত উমরের কোলে লুকিয়ে ছিল। তিনি আরো বলেন, হযরত উমর আল্লাহর পথে নিরাপত্তার কোনো পরোয়া করতেন না। হযরত মুআবিয়া বলেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীকের কাছে দুনিয়া ধরা দেয়নি, তিনি এর কামনাও করতেন না। আর হযরত উমরের নিকট দুনিয়া এলেও তিনি তা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেন, কিন্তু আমরা দুনিয়াকে পেটের মধ্যে নিয়ে ফেলেছি।
হযরত জাবের (রা.) বর্ণনা করেন, হযরত উমর ইন্তেকালের পর তাকে কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়ার পর হযরত আলী এসে বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পর এ কাপড় পরিহিত ব্যক্তির চেয়ে কারো আমল বেশি পছন্দনীয় ছিল না। (হাকেম)
হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, পুণ্যবান লোকদের আলোচনার সময় অবশ্যই হযরত উমরের নাম নিবে। কারণ তিনি আমাদের মধ্যে কুরআনের সবচেয়ে বড় আলেম এবং আল্লাহর দ্বীনের সবচেয়ে বড় ফকীহ। (তাবারানী)
জনৈক ব্যক্তি হযরত ইবনে আব্বাসকে হযরত আবু বকর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, তিনি আপাদমস্তক কল্যাণকর, অতঃপর হযরত উমর সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁর দৃষ্টান্ত অত্যন্ত সচেতন পক্ষির ন্যায়, চারণ ক্ষেত্রের প্রতিটি স্থানে যার মনে থাকত এ কথা যে, পাতান জালে পা দিলে ফেঁসে যাব। আবার হযরত আলী সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, দৃঢ়সংকল্প, সামুদ্রিক জ্ঞান, সাহসিকতা এবং বীরত্ব তাঁর মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। (তাওরিয়াত)
তাবারানী উমায়ের বিন রাবী'আ থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উমর বিন খাত্তাব হযরত কা'ব আহবারকে জিজ্ঞেস করেন, পূর্ববর্তী সহীফাগুলোতে কিভাবে আমার বিবরণ এসেছে? কাব বললেন, আপনার সম্পর্কে লিখা রয়েছে- 'করনাম মিন হাদীদ'। হযরত উমর বললেন, এর অর্থ কি? কাব বললেন, তিনি এমন এক শক্তিশালী শাসনকর্তা যিনি আল্লাহর পথে কারো নিন্দার কোন পরোয়া করেন না। হযরত উমর বললেন, আর কি লিখা রয়েছে? কা'ব বললেন, আপনার পর যিনি খলীফা হবেন গোটা সম্প্রদায় মিলে তাঁকে শহীদ করে দিবে। হযরত উমর বললেন, আর কি লেখা রয়েছে? কা'ব বললেন, অতঃপর চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে।
ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, চারটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখের মাধ্যমে হযরত উমরের মর্যাদা অনুধাবন করা যেতে পারে। এক. হযরত উমর বদর যুদ্ধ বন্দীদের হত্যা করার অভিমত পেশ করলে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়- 'লাওলা কিতাবুম মিনাল্লাহি সাবাকা'। দুই. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পুণ্যাত্মা বিবিগণের পর্দার ব্যাপারে হযরত উমর নিজের মতামত তুলে ধরলে হযরত যয়নব বললেন, হে উমর বিন খাত্তাব! আপনি আমাদের প্রতি নির্দেশ প্রদান করেছেন, অথচ আমাদের ঘরেই ওহী অবতীর্ণ হয়। অতঃপর হযরত উমরের অভিমতের সাথে সঙ্গতি রেখে পর্দার ব্যাপারে এ আয়াত অবতীর্ণ হয় - 'ফাইযা সাআলতুমুহুন্না মাতাআন'। তিন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রত্যক্ষ দু'আর বরকতে হযরত উমর ইসলাম গ্রহণ করেন। চার, তিনি হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর হাতে সর্বপ্রথম বাইয়াত গ্রহণ করেন। (আহমদ, বায্যার, তাবারানী)
হযরত মুজাহিদ (র.) বলেন, আমরা পরস্পরে এ আলোচনা করতাম হযরত উমরের খিলাফতকালে শয়তান অবরুদ্ধ ছিল। তাঁর (ইন্তেকালের পর) পর শয়তান মুক্ত হয়ে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। (ইবনে আসাকির)
দশম পরিচ্ছেদ
হযরত সুফিয়ান ছাওরী (র.) বলেন, যে ব্যক্তি হযরত আলীকে হযরত আবু বকর এবং হযরত উমরের চেয়ে বেশি খিলাফতের হকদার মনে করবে, সে হযরত আবু বকর, হযরত উমর, সকল মুহাজির এবং আনসার সাহাবীদের ত্রুটি চিহ্নিত করবে।
হযরত শারীক বলেন, যার মধ্যে বিন্দু পরিমাণ পুণ্য রয়েছে সে কখনোই এ কথা বলবে না- হযরত আবু বকর সিদ্দীক এবং হযরত উমর ফারুকের চেয়ে বেশি হযরত আলী খিলাফতের প্রাপ্য ছিলেন না।
হযরত আবু উসামা বলেন, হে লোক সকল! তোমরা কি জান হযরত আবু বকর সিদ্দীক এবং হযরত উমর ফারুক ইসলামের পিতা-মাতা।
হযরত জাফর সাদেক (র.) বলেন, যে ব্যক্তি হযরত আবু বকর এবং হযরত উমরকে ভালো মনে করে স্মরণ করবে না, আমি তার প্রতি অসন্তুষ্ট।
📄 হযরত উমরের অভিমতের সাথে কুরআনের ঐকমত্য:
ইবনে মারদুয়া মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উমর যে রায় দিতেন অনূরূপভাবেই কুরআন শরীফের আয়াত অবতীর্ণ হতো।
ইবনে আসাকির হযরত আলীর অভিমত নকল করে লিখেছেন, কুরআন শরীফে অধিকাংশ হযরত উমরের রায় উল্লেখ রয়েছে। হযরত ইবনে উমর কর্তৃক মারফুআন বর্ণিত, কতিপয় বিষয়ে লোকদের মতামতের সাথে হযরত উমর ভিন্ন মত পোষণ করলে হযরত উমরের অভিমতের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আয়াত অবতীর্ণ হতো।
বুখারী শরীফ এবং মুসলিম শরীফে রয়েছে, হযরত উমর (রা.) বলেন, আমার প্রতিপালক তিন বার আমার অভিমতের সাথে একমত পোষণ করেছেন। এক. ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি মাকামে ইবরাহীমকে নামাযের স্থান বানাতে চাই। 'ওয়াত্ত্যাকিযূ মিম মাক্বামি ইব্রাহীমা মুসাল্লা'।
দুই. আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার পুণ্যাত্মা বিবিগণের কাছে সব ধরনের লোক যাতায়াত করে। আপনি তাঁদের পর্দা করার নির্দেশ দিন। এরপর পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হয়। তিন. পুণ্যাত্মা বিবিগণ লজ্জা দিলে আমি বললাম- 'আসা রাব্বুহু ইন তাল্লাকাকুন্না আই ইয়ুবদিলাহু আযওয়াজান খাইরাম মিনকুন্না'। অতঃপর আমার উল্লিখিত শব্দগুলোই হুবহু অবতীর্ণ হয়।
ইমাম মুসলিম হযরত উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলা আমার সাথে তিন বিষয়ে একমত, এক. পর্দা, দুই. বদরের যুদ্ধবন্দী এবং তিন. মাকামে ইবরাহীম। এ হাদীসে উল্লিখিত দ্বিতীয় নম্বর বিষয়টির মাধ্যমে চারটি দৃষ্টান্ত জানা গেল।
ইমাম নব্বী তাহযীব গ্রন্থে চারটি বিষয়ে একমত হওয়ার কথা লিখেছেন। এক. বদর যুদ্ধবন্দী, দুই. পর্দা, তিন. মাকামে ইবরাহীম এবং চার. মদের অবৈধতা। এ হাদীসে উল্লিখিত চতুর্থ নম্বর বিষয়টির মাধ্যমে পাঁচটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা হলো।
মদের অবৈধতা সম্পর্কে সুনানা এবং মুসতাদরাকে হাকেম গ্রন্থে রয়েছে একদা হযরত উমর দু'আ করেন, হে আল্লাহ! শরাবের ব্যাপারে আমাদের জন্য কিছু অবতীর্ণ করুণ। অতঃপর শরাব হারাম হওয়ার বাণী নাযিল হয়।
ইবনে আবী হাতেম স্বরচিত তাফসীর গ্রন্থে হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, হযরত উমর (রা.) বলেন, আল্লাহ তা'আলা চারটি বিষয়ে আমার সাথে একমত হয়েছেন। যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয় - 'লাকাদ খালাকনাল ইনসানা মিন সুলালাতিম মিন ত্বীন' তখন এমনিতেই আমার মুখ থেকে বেরিয়ে যায়- 'ফাতাবারাকাল্লাহু আহসানুল খালিকীন' অতঃপর হুবহু এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এ হাদীসের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা হযরত উমরের ছয়টি অভিমতের সাথে একমত পোষণ করে ওহী অবতীর্ণ করেছেন বলে জানা গেল। এ হাদীসটি ইবনে আব্বাসের সূত্রে গ্রন্থকার তাফসীরে মুসনাদ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
মাস্নাফ আবু আব্দুল্লাহ শীবানী কর্তৃক প্রণীত কিতাবে ফাজাইলুল উম্মাহ্ গ্রন্থে রয়েছে, হযরত উমরের সাথে তাঁর প্রতিপালক একুশ জায়গায় একমত হন। এর মধ্যে ছয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। সপ্তম, আব্দুল্লাহ বিন উবাই-এর মৃত্যু হলে রাসূলুল্লাহ (সা.) লোকদের জানাযার জন্য সমবেত হতে বললে আমি হযরতের সামনে গিয়ে বললাম ইয়া রাসূলাল্লাহ! উবাই বিন কাব কঠোর শত্রু ছিল। সে অমুক দিন এই এই কথা বলেছে। আল্লাহর কসম কিছুক্ষণ পর এ আয়াত অবতীর্ণ হয়- 'ওয়ালা তুসাল্লি আলা আহাদিম মিনহুম মাতা আবাদা'
অষ্টম, এক ঘটনার প্রেক্ষিতে এ আয়াত অবতীর্ণ হয় - 'ইয়া আইয়্যাহাল্লাযীনা আমানু লা তাকরাবুস সালাতা...' নবম আরেক ঘটনায় এ আয়াত নাযিল হয়- 'ইয়াসআলুনাকা আনিল খামরি...' গ্রন্থকার বলেন, অষ্টম ও নবম নম্বর ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত আয়াতদ্বয় সপ্তম নম্বর হাদীসের সাথে যুক্ত একই ঘটনার ধারাবাহিকতা।
দশম, রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি সম্প্রদায়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলে আমি বললাম- 'সাওয়াউন আলাইহিম...' তখন হুবহু এ আয়াতটিই নাযিল হলো- 'সাওয়াউন আলাইহিম আসতাগফারতা লাহুম...' তাবারানী এ রেওয়ায়েতটি ইবনে আব্বাসের বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছেন।
একাদশ, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন সাহাবীদের নিয়ে বদর যুদ্ধে যাবার পরামর্শ করছিলেন তখন হযরত উমর যুদ্ধে গমনের পরামর্শ দিলে নাযিল হয়- 'কামা আখরাজাকা রাব্বুকা মিম বাইতিকা...' দ্বাদশ, রাসূলুল্লাহ (সা.) পরামর্শ চাইলে হযরত উমর বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনাকে আয়েশার সাথে কে বিয়ে দিয়েছেন? তিনি বললেন, আল্লাহ। হযরত উমর বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি মনে করেন, আপনার রব আপনাকে ত্রুটিযুক্ত জিনিস দিয়েছেন? অতঃপর এ আয়াত অবতীর্ণ হয়- 'সুবহানাকা হাযা বুহতানুন আজীম'
ত্রয়োদশ, ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ে রমযানের রাতে স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করা হারাম ছিল। হযরত উমর এ বিষয়ে মন্তব্য করলে এ আয়াত নাযিল হয়- 'উহিল্লা লাকুম লাইলাতাস সিয়ামির রাফাসু...' উল্লেখ করেছেন।
চতুর্দশ, এক ইহুদী হযরত উমরকে বলল, তোমাদের নবী যে জিবরাঈলের কথা বলেন তিনি আমাদের দুশমন! হযরত উমর বললেন- 'মান কানা আদুউওআল্লিল্লাহি ওয়া মালাইকাতিহি ওয়া রাসুলিহি ওয়া জিবরিলা ওয়া মিকালা ফাইন্নাল্লাহা আদুউওউল লিলকাফিরিন' অতঃপর হুবহু এ আয়াতই অবতীর্ণ হয়। এ রেওয়ায়েতটি ইবনে জারীর কয়েকটি সূত্রে এবং ইবনে আবী হাতেম আব্দুর রহমান ইবনে আবু ইয়ালা থেকে বর্ণনা করেন।
পঞ্চদশ, রাসূলুল্লাহ (সা.) দু' ব্যক্তির বিবাদ মিমাংসা করে দিলেন একজনের তা মনঃপূত না হওয়ায় সে পুনরায় হযরত উমরের নিকট বিচার প্রার্থনা করায় তিনি তাকে হত্যা করেন। এ খবর পেয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমি উমরের ব্যাপারে এমনটা ধারণা করি না যে, তিনি কোনো মুমিনকে হত্যা করতে পারেন। এ প্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন- 'ফালা ওয়া রাব্বিকা লা ইউমিনুনা...' এ রেওয়ায়েতটি ইবনে আবু হাতিম এবং ইবনে মারদুয়া আবুল আসওয়াদ থেকে বর্ণনা করেন। গ্রন্থকার বলেন, আমি তাফসীরে মুসনাদ গ্রন্থে এ রেওয়ায়েতের বিভিন্ন সূত্র বর্ণনা করছি।
ষষ্ঠদশ, একদিন হযরত উমর স্ব-গৃহে শুয়ে ছিলেন। তাঁর গোলাম অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে তিনি এ দু'আ করেন, হে আল্লাহ! বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করা হারাম করে দিন। সঙ্গে সঙ্গে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। সপ্তদশ, তিনি বলতেন, ইহুদীরা অভিশপ্ত জাতি। এ প্রেক্ষিতে আয়াত অবতীর্ণ হয়।
অষ্টদশ, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- 'সুলাতুম মিনাল আউওয়ালিন ওয়া সুলাতুম মিনাল আখিরিন' এ আয়াতের সাথে সম্পৃক্ত ঘটনাটি ইবনে আসাকির, স্বরচিত ইতিহাস গ্রন্থে জাবের বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন। এ ঘটনাটি উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট।
উনিবিংশ, 'ইযা যানিয়াশ শাইখু ওয়াশ শাইখাতু' এ আয়াতটি মানসুখ তিলাওয়াত। বিংশ, উহুদের যুদ্ধে আবু সুফিয়ান 'ফিল কাওমি ফুলানুন' বললে এর জবাবে হযরত উমর বলেন, 'আল আজাবুন' আর এ কথার সাথে রাসূলুল্লাহ (সা.) একমত পোষণ করেন। এ বর্ণনাটি আহমদ মুসনাদ গ্রন্থে উল্লেখ করেন।
উক্ত ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত যা আমরা একবিংশ দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করতে চাই। উসমান বিন সাঈদ বিন আদ-দারমী কিতাবুর রুহ আলাল জাহীমা গ্রন্থে সালেম বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, একদা কা'ব আহবার বলেন, আসমানের বাদশাহ যমীনের বাদশাহর প্রতি আফসোস করছেন। একথা শুনে হযরত উমর বলেন, যমীনের বাদশাহর উপর নয়; বরং তার উপর যে তার নফসকে কবজায় নিয়েছে। এ কথা শ্রবনে কা'ব আহবার বললেন, আল্লাহর কসম, তৌরাত গ্রন্থে হুবহু আপনার কথাগুলোই বিধৃত হয়েছে। অতঃপর হযরত উমর সেজদায় লুটিয়ে পড়েন।
এছাড়াও ইবনে আদী কর্তৃক প্রণীত কামেল গ্রন্থে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, প্রথম দিকে হযরত বিলাল আযানের মধ্যে 'আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এরপর 'হাইয়্যা আলাস সালাহ' বলতেন। হযরত উমর বললেন, 'আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এর পর 'আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ' বল। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, উমর যেভাবে বলেছে সেভাবে বলবে।