📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 হযরত আবু বকরের বাণী আল্লাহর ভয় সম্পর্কিত

📄 হযরত আবু বকরের বাণী আল্লাহর ভয় সম্পর্কিত


আবু আহমদ হাকেম মাআয বিন জাবাল (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, একদা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এক বাগানে ঢুকে গাছের ছায়ায় একটি পাখি দেখে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললেন, হে পাখি তুমি বড়ই ভাগ্যবান। গাছের ফল খাচ্ছ, গাছের ছায়ায় থাকছ, তোমার কোনো হিসাব নেই। হায়, আবু বকর যদি তোমার মতো হতো।

ইবনে আসাকির বায়হাকী থেকে বর্ণনা করেন, প্রশংসা করার সময় তিনি বলতেন, হে আল্লাহ! আপনি আমার নফস সম্পর্কে আমার চেয়ে বেশি অবগত। আর আমি নিজের ব্যাপারে অন্যদের চেয়ে বেশি জানি। হে আল্লাহ! তারা আমার ভালো কাজ সম্পর্কে যে ধারণা করে আমাকে অনুরূপ করে দিন। আর আমার যে গুনাহ সম্পর্কে তারা অবগত নয়, তা ক্ষমা করুন।

আহমদ যোহদ গ্রন্থে লিখেছেন, হযরত আবু বকর (রা.) বলেন, আমি যদি মুমীনের একটি পশমও হতাম, তবে তা আমার কাছে অধিক প্রিয় হতো।

আহমদ যোহদ গ্রন্থে মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেন, হযরত ইবনে যুবাইর নামাযের সময় অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকতেন যেন শুকনো একটি কাঠের টুকরো। হযরত আবু বকরের অবস্থাও ছিল একই।

হাসান বলেন, হযরত আবু বকর বলতেন, আল্লাহর কসম, আমি যদি গাছ হতাম আমাকে কেটে ফেলত, আমি কেটে যেতাম-এটাই আমার জন্য প্রিয় ছিল। কাতাদা বলেন, এ বর্ণনা আমার জানা যে, হযরত আবু বকর কর্তৃক বর্ণিত, আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম। হযরত আবু বকর জনৈক মহিলার মৃত্যুর সময় বারবার তার বালিশের দিকে দেখছিলেন। মহিলার মৃত্যুর পর এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি তার বালিশের নিচে পাঁচ অথবা ছয় দিনার দেখায়ে হাতে হাত মেরে ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন-পড়ে বললেন, হে অমুক, আমি চাইনি তোমার এ অবস্থা হোক। ছাবিত বানানী বলেন, তিনি সর্বদা এ কবিতা পাঠ করতেন, তুমি মানুষের সংবাদ বহন করছ, কখন তোমার খবর তারা বহন করবে তা কি জান।

ইবনে সাদ ইবনে সিরীন থেকে বর্ণনা করেন, নবী আকরাম (সা.)-এর পর সিদ্দীকে আকবরের খিলাফত কালে লোকেরা অসঙ্গত কথা বলতে ভয় করতো না। তারপর ফারুকে আযমের সময় লোকেরা তাই করতো। বিচারের সময় কুরআন ও হাদীস থেকে রায় দিতে না পারলে তিনি রায় ঘোষণার সময় বলতেন, আমি এ রায় ঘোষণার ব্যাপারে ইজতেহাদ (বুদ্ধি বৃত্তিক গবেষণা) করেছি। যদি তা সঠিক হয় তবে মনে করবে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়েছে। আর যদি তা সঠিক না হয়, তাহলে আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 স্বপ্নের শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাকার

📄 স্বপ্নের শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাকার


সাঈদ বিন মানসুর সাঈদ বিন মুসায়্যাব থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) একবার স্বপ্নে দেখেন তাঁর ঘরে তিনটি চাঁদ উদিত হয়েছে। স্বপ্নের ব্যাখ্যা নেবার জন্য হযরত আবু বকরকে একথা বললে তিনি বলেন, এ স্বপ্ন সত্য হলে তোমার ঘরে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ তিন মনীষীর দাফন হবে। নবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর তিনি বলেন, হে আয়েশা! তোমার স্বপ্নেদৃষ্ট তিন চন্দ্রের মধ্যে এটা সর্বশ্রেষ্ঠ।

সাঈদ বিন মানসুর উমর বিন শারজীল থেকে বর্ণনা করেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজের স্বপ্নের কথা বর্ণনা করেছিলেন আমি একদল কালো ছাগলের পশ্চাৎপদ অনুসরণ করছি। অতঃপর দেখলাম সাদা ছাগলের পালের পেছনে পেছনে চলছি। আর এক সময় সাদা ছাগলের দল কালো ছাগলের ভিড়ে হারিয়ে গেল। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ। সাদা ছাগল আরবের মুসলমান, আর কালো ছাগলের দল অনরাব মুসলমান। ভবিষ্যতে আরবের মুসলমানদের তুলনায় অনারব মুসলমানদের সংখ্যা অধিক বৃদ্ধি পাবে। নবী (সা.) বললেন, সত্য বলেছ। সকালে ফেরেশতা এসে আমাকে এমন ব্যাখ্যাই দিয়ে গেছেন।

ইবেন আবী লায়লা সাঈদ বিন মানসুর থেকে বর্ণনা করেন, নবী আকরাম (সা.) স্বপ্নে দেখেন যে, তিনি একটি কূপের পানি সিঞ্চন করছেন, আর তার পেছনে কৃষ্ণকায় ছাগলের পাল এসে দাঁড়ায়। আর এর পেছনে এমন একদল ছাগল আসে যাদের লালবর্ণের পশুগুলো সাদার উপর প্রাধান্য পায়। হযরত আবু বকর এ প্রেক্ষিতে উপরোল্লিখিত ব্যাখ্যা প্রদান করেন।

ইবনে সাদ মুহাম্মদ বিন সিরীন থেকে বর্ণনা করেন, এ উম্মতের মধ্যে নবী (সা.)-এর পর হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) স্বপ্নের শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাকার।

ইবনে সাদ ইবনে শিহাব থেকে বর্ণনা করেন যে, আমরা একই সোপানে আরোহণ করতে গিয়ে আমি তোমার চেয়ে দেড় সিঁড়ি এগিয়ে গেলাম। এতদশ্রবণে আবু বকর সিদ্দীক বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ তা'আলা আপনাকে স্বীয় রহমত এবং মাগফেরাতের মাধ্যমে পূর্বেই আহবান জানাবেন। আর আমি আপনার দেড় বছর পর ইন্তেকাল করব।

আব্দুর রায্যাক স্বীয় রচনায় আবু কিলাবার বরাত দিয়ে লিখেছেন, জনৈক ব্যক্তি আবু বকর সিদ্দীককে বলল, আমি স্বপ্নে নিজেকে রক্ত পেশাব করতে দেখছি। তিনি বললেন, মনে হয় তুমি হায়েয অবস্থায় স্ত্রীর সাথে মিলিত হও। আল্লাহ তা'আলার নিকট তওবা করো এবং এমনটা করো না।

ফায়দা: বাইহাকী দালায়েল গ্রন্থে আব্দুল্লাহ বিন বুরাইদা থেকে রেওয়ায়েত করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) আম্র বিন আস (রা.)-কে দলপতি বানিয়ে এক যুদ্ধে পাঠালেন। এ দলে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এবং হযরত উমর ফারুক (রা.) ছিলেন। রণাঙ্গণে পৌঁছে হযরত আম্র বিন আস আগুন জ্বালাতে নিষেধ করলে হযরত আবু বকর সিদ্দীক তাঁকে বাধা দিয়ে বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) সমর বিদ্যায় অধিক দক্ষ যুদ্ধ ভেবে তাঁকে পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব তাঁকে অনুসরণ করো। বাইহাকী অন্য বরাত দিয়ে লিখেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমি (কখনো) কোনো জাতির নেতা হেিসবে এমন এক ব্যক্তিকে নির্বাচন করে থাকি, যদিও তার চেয়েও উত্তম এবং সমর বিদ্যায় অধিকতর দক্ষ ব্যক্তি রয়েছে।

অষ্টম পরিচ্ছেদ
খলীফা বিন খাইয়্যাত, আহমদ বিন হাম্বল এবং ইবনে আসাকির ইয়াজিদ বিন আসাম থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) আবু বকর সিদ্দীক (রা.) কে জিজ্ঞেস করেন, আমি না তুমি বৃদ্ধ? তিনি বললেন, বয়সে আমি বড় হলেও আপনি বৃদ্ধ। এ রেওয়ায়েতটি মুরসাল এবং গরীব। যদি একে সহীহ মনে করা হয় তবে এতে করে হযরত আবু বকরের বুদ্ধিমত্তা এবং রসূলের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ প্রমাণিত হয়।

কথিত আছে, হযরত আব্বাস (রা.) একই প্রশ্নের ভিত্তিতে এ জবাবই দিয়েছিলেন। সাঈদ বিন ইয়াবু'-এর বরাতে তাবারানী গ্রন্থে লিপিবদ্ধ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) সাঈদ বিন ইয়াবু'কে জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের বড় কে? তিনি বললেন, আপনি বড়, যদিও পৃথিবীতে আমিই আগে এসেছি।

আবু নাঈম লিখেছেন, আবু বকর সিদ্দীককে বলা হলো, আপনি কেন বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবীদের কাজের প্রতি নির্দেশ করেন না? তিনি বললেন, আহলে বদরের মর্যাদা সম্পর্কে আমি অবগত রয়েছি, বিধায় তাদেরকে বৈষয়িক কাজে ব্যস্ত করে রাখা মাকরূহ মনে করি।

আহমদ 'যহদ' গ্রন্থে ইসমাঈল বিন মুহাম্মদ থেকে রেওয়ায়েত করেন, একদা আবু বকর সিদ্দীক (রা.) লোকদের মধ্যে সমানভাগে কিছু ভাগ করে দিচ্ছিলেন। হযরত উমর ফারুক (রা.) বললেন, আপনি আহলে বদর এবং সাধারণ জনতাকে এক সমান করে দিয়েছেন। তিনি বললেন, পৃথিবীতে এতটুকুই যথেষ্ট, যদিও তারা মর্যাদা এবং সম্মানের দিক থেকে অনেক বেশি।

নবম পরিচ্ছেদ
আবু বকর বিন হাফস থেকে বর্ণিত, আবু বকর সিদ্দীক (রা.) গরমে রোযা রাখতেন এবং শীতে ইফতার করতেন। ইবনে সাদ হাইয়্যান, সানীআ কর্তৃক বর্ণিত, আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর মোহরে 'নিমাল কাদিরুল্লাহ' লিখা ছিল।

তাবারানী মূসা বিন উকবা থেকে বর্ণনা করেন, একই বংশের চার পুরুষ নবী আকরাম (সা.) কে দেখেনি। কিন্তু আবু কুহাফা, তাঁর ছেলে আবু বকর, তাঁর ছেলে আব্দুর রহমান এবং তাঁর ছেলে আবু আতীক-এর নাম ছিল মুহাম্মদ এঁরা সকলেই নবী আকরাম (সা.) কে দেখেছেন।

ইবনে মিন্দা এবং ইবনে আসাকির হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, আবু বকরের পিতা ছাড়া কোনো মুহাজিরীনের পিতা ইসলাম গ্রহণ করেননি।

ইবনে সাদ এবং বাযযার সুন্দর সনদের মাধ্যমে আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, সাহাবীদের মধ্যে আবু বকর, সুহাইল বিন আমর এবং আমর বিন বাইযার বয়স ছিল সবচেয়ে বেশি।

বাইহাকী দালায়েল গ্রন্থে আসমা বিনতে আবু বকরের বরাত দিয়ে লিখেছেন, মক্কা বিজয়ের বছর হযরত আবু বকরের বোন বাইরে কোথাও বের হয়েছিলেন। পথিমধ্যে একদল অশ্বারোহীর সাথে সাক্ষাৎ হয়। এদের মধ্যে কেউ একজন তার গলায় চান্দীর হারখানা খুলে নেয়। নবী করীম (সা.) মসজিদে এলে হযরত আবু বকর দাঁড়িয়ে দু'বার তার বোনের হারখানা ফেরত চাইলে কেউ কোনো সাড়া দিল না। অতঃপর তিনি তাঁর বোনকে বললেন, তুমি তোমার হারের আশা ছেড়ে দাও এবং ধৈর্য্য ধারণ করো। আল্লাহর কসম! বর্তমান আমানতদারী কমে গেছে। হাফেজ যাহাবীর কোনো এক রচনায় লিপিবদ্ধ রয়েছে যে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) সে যুগের শ্রেষ্ঠ আলেম ছিলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00