📄 সিদ্দীকে আকবর কর্তৃক যে সকল হাদীস বর্ণিত হয়েছে
ইমাম নূদী তাহযীব গ্রন্থে লিখেছেন, হযরত সিদ্দীকে আকবর রসূলে আকরাম (সা.) থেকে ১৪২ খানা হাদীস বর্ণনা করেছেন। এত কম সংখ্যক হাদীস রেওয়ায়েত করার কারণ হলো, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পর অল্প ক'দিন জীবিত ছিলেন এবং সে যুগে হাদীসের ব্যাপক চর্চা ছিল না। হাদীস শ্রবণ, সংরক্ষণ এবং হিফজ করার প্রক্রিয়া তাঁদের পরবর্তী তাবেঈ যুগে ব্যাপকভাবে শুরু হয়।
আমি (গ্রন্থকার) পূর্বেই হযরত উমরের বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছি যে, বাইআতের সময় উমর ফারুক (রা.) বলেছেন, হযরত আবু বকর আনসারদের সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং আল্লাহ তা'আলা যা বলেছেন তা সম্পূর্ণ বর্ণনা করেন। এ হাদীসটি এ বিষয়ের প্রকাশ্য দলিল যে, কুরআন এবং হাদীসের জ্ঞানে তিনিই সবচেয়ে বড় জ্ঞানী এবং পণ্ডিত।
হযরত আবু বকর থেকে যে সকল সাহাবী (২৮ জন) হাদীস বর্ণনা করেছেন, তাঁরা হলেন, উমর, উসমান, আলী, ইবনে আউফ, ইবনে মাসউদ, হুযায়ফা, ইবনে উমর, ইবনে যুবাইর, ইবনে আমর, ইবনে আব্বাস, আনাস, যায়েদ বিন সাবেত, বারা বিন আযেব, আবু হুরায়রা, উকবা বিন হারেস, আব্দুর রহমান বিন আবু বকর, যায়েদ বিন আরকাম, আব্দুল্লাহ বিন মুগাফফাল, উকবা বিন আমের জুহানী, ইমরান বিন হাসীন, আবু বারযা আসলামী, আবু সাঈদ খুদরী, আবু মুসা আশআরী, আবু তোফায়েল লাইছী, জাবের বিন আব্দুল্লাহ, বিলাল, আয়েশা সিদ্দীকা এবং আসমা বিনতে আবু বকর রাদিআল্লাহু আনহুম। আর আসলাম এবং ওয়াসেত আল বাজালীসহ তাবেঈনের একটি বিরাট জামাত তাঁর থেকেই হাদীস বর্ণনা করেছেন।
সূত্রসহ আমি হযরত আবু বকর কর্তৃক হাদীসগুলো নিম্নে তুলে ধরলাম:
১। হিজরত সংক্রান্ত হাদীস। (বুখারী, মুসলিম)
২। পানি সংক্রান্ত হাদীস অর্থাৎ, সমুদ্রের পানি পবিত্র এবং জলপ্রাণী মৃত ভক্ষণ জায়েয। (দারা কুতনী)
৩। মিসওয়াক মুখকে পরিষ্কার করে এবং তা ব্যবহার করা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে। (আহমদ)
৪। রাসূলুল্লাহ (সা.) ছাগলের ঝুটি খেয়ে নামায পড়েছেন এবং অযু করেননি। (বায্যার, আবু ইআলা)
৫। কেউ যেন হালাল খাদ্য খেয়ে অযূ না করে। (বায্যার)
৬। নবী (সা.) নামাযরত অবস্থায় আঘাত করতে নিষেধ করেছেন। (আবু ইয়ালা, বায়্যার)
৭। যিনি আমার পরে নামায পড়াবেন তিনি একই কাপড় পরিধান করবেন। (আবু ইয়ালা)
৮। যে ব্যক্তি কুরআন যেভাবে নাযিল হয়েছে সেভাবে কুরআন তিলাওয়াত করতে চায়, সে যেন আব্দুল্লাহ ইবেন মাসউদের কেরাতের অনুসরণ করে। (আহমদ)
৯। আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে বললাম, আপনি আমাকে এমন একটি দু'আ শিক্ষা দিন যা আমি নামাযে পড়ব। তিনি বললেন, পড়বে- আল্লাহুম্মা ইন্নি জালামতু নাফসি জুলমান কাসিরাও ওয়ালা ইয়াগফিরুজ জুনুবা ইল্লা আনতা ফাগফিরলি মাগফিরাতাম মিন ইনদিকা ওয়ারহামনি ইন্নাকা আনতাল গাফুরুর রাহীম। (বুখারী, মুসলিম)
১০। যিনি সকালের নামায পড়বেন আল্লাহ তা'আলা তাকে আশ্রয় দিবেন। তোমরা আল্লাহর প্রতিশ্রুতিতে অনুমান করো না। যে অনুমানের ভিত্তিতে সে নামাযীকে হত্যা করবে আল্লাহ তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। (ইবনে মাজা)
১১। উম্মতের পেছনে নামায না পড়া পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা কোনো নবীকে মৃত্যু দেন না। (বায্যার)
১২। যে ব্যক্তি গুনাহ করার পর ভালোভাবে অযু করে দু'রাকাত নামায পড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করবে আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করবেন। (আহমদ, আসহাবে সুনানে আরবাআ, ইবনে হিব্বান)
১৩। মৃত্যুর স্থানেই প্রত্যেক নবীকে সমাহিত করা হয়। (তিরমিযী)।
১৪। ইহুদী এবং খ্রিস্টানদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ। কারণ তারা নবীদের কবরগুলোকে উপাসনালয়ে পরিণত করেছে। (আবু ইয়ালা)
১৫। মৃত ব্যক্তির জন্য কান্নাকাটি করলে মৃত ব্যক্তির আযাব হয়। (আবু ইয়ালা)
১৬। খেজুরের টুকরো সমপরিমাণ দান করে হলেও জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণ নাও। কারণ সে দান বাঁকাকে সোজা, মৃত্যুকে সহজ এবং ক্ষুধাকে নিবৃত্ত করে। (আবু ইয়ালা)
১৭। ফারায়েজ এবং সদকার হাদীস। (বুখারী, মুসলিম)
১৮। একদা হযরত আবু বকর উটের উপর সওয়ার হলে চাবুক খানা পড়ে যায়। তিনি উট বসিয়ে সেখান থেকে নেমে চাবুকটি কুড়ালেন। লোকেরা বলল, আমাদের কেন নির্দেশ করলেন না? তিনি বললেন, আমার প্রিয়তম নবীজি (সা.) লোকদের নিকট চাইতে আমাকে নিষেধ করেছেন। (আহমদ)
১৯। রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, কোন হজ্জ উত্তম? তিনি বললেন, যেখানে জোরে জোরে এবং বেশি বেশি তাকবীর বলা হয় এবং অনেক কুরবানী দেয়া হয়। (তিরমিযী, ইবনে মাজা)
২০। আসমা বিনতে আমীসের গর্ভে মুহাম্মদ বিন আবু বকর ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সা.) নেফাস অবস্থায় গোসল করে হজ্জ এবং উমরার ইহরাম বাঁধার জন্য তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। (বায্যার, তাবারানী)
২১। হাজ্রে আসওয়াদকে চুমু দেবার সময় তিনি তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, যদি আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে চুমু দিতে না দেখতাম তাহলে আমি তোমাকে চুমু দিতাম না। (দারা কুতনী)
২২। রাসূলুল্লাহ (সা.) সূরা বারাআত-এর বিধান মক্কায় পাঠিয়ে নির্দেশ করেন যে, এ বছর থেকে মুশরিকরা আর হজ্জ করতে পারবে না এবং কেউ উলঙ্গ হয়েও তাওয়াফ করবেন না। (আহমদ)
২৩। আমার ঘর এবং মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থানটি জান্নাতের একটি বাগান। আর আমার মিম্বর জান্নাতের একটি অংশ। (আবু ইয়ালা)
২৪। আবুল হাইছামের বাড়ি তালাক সংকান্ত হাদীস। (আবু ইয়ালা)
২৫। চান্দী এবং স্বর্ণ এগুলো সমান সমান। যে লেনদেনে কমেবেশি করবে সে জাহান্নামী। (আবু ইয়ালা)
২৬। যে মুমিনের সাথে প্রতারণা এবং কষ্ট দিবে সে অভিশপ্ত জাহান্নামী। (তিরমিযী)
২৭। কৃপণ, উচ্চাভিলাসী এবং অধীনস্তদের নিকট গর্বকারী জালেম বাদশা জান্নাতে যাবে না। আল্লাহ স্বীয় মনিবের প্রতি আনুগত্যশীল গোলাম জান্নাতে প্রবেশ করবে। (আহমদ)
২৮। গোলামের পরিত্যক্ত সম্পদের অধিকারী সেই ব্যক্তি, যে তাকে আযাদ করেছে। (যিয়াউল মুকাদ্দাসী)
২৯। নবীদের সম্পদের কোনো উত্তরাধিকার নেই। তাঁদের সকল পরিত্যক্ত সম্পদ সদকা হিসেবে বিবেচিত। (বুখারী)
৩০। নবীদের ওয়ারেস হলেন নবীর স্থলাভিষিক্ত খলীফা। (আবু দাউদ)
৩১। বংশপরিচয় অস্বীকার করা কুফুরী। (বায্যার)
৩২। তুমি এবং তোমার সম্পদ তোমার বাবার জন্য। হযরত আবু বকর বলেন, এ থেকে উদ্দেশ্য হলো খোরপোষ দেয়া। (বায়হাকী)
৩৩। যার পা আল্লাহর রাস্তায় গিয়ে ধুলায় ধূসরিত হবে আল্লাহ তা'আলা তার জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম করে দিবেন। (বায্যার)
৩৪। আমাকে কাফেরদের সাথে লড়াই করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। (বুখারী, মুসলিম)
৩৫। খালিদ বিন ওলীদের প্রশংসায় বলেন, তিনি আল্লাহর তলোয়ার। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে কাফির এবং মুনাফিকদের উপর বিজয়ী করেছেন। (আহমদ)
৩৬। উমরের চেয়ে উত্তম ব্যক্তির উপর সূর্য উদিত হয় না। (তিরমিযী)
৩৭। মুসলিম সরকার মুসলমানদের প্রাপ্য বুঝিয়ে না দিলে তার উপর অভিশাপ। আল্লাহ তা'আলা তার কোনো নফল ও ফরয (ইবাদত) কবুল করবেন না। (আহমদ)
৩৮। মাআযকে সঙ্গসার (অপরাধের কারণে পাথর নিক্ষেপ হত্যা করা সংক্রান্ত হাদীস। (আহমদ)
৩৯। ইসতেগফার করার পর তার প্রতি জেদ করবে না। যদিও সে একই কাজ (অপরাধ) দিনে সত্তর বার করে। (তিরমিযী)
৪০। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর লড়াই-এর পরামর্শ সংক্রান্ত হাদীস। (তাবারানী)
৪১। 'ওয়ামাই ইয়ামাল সুআন ইউজ্জা বিহি' -এ আয়াত সংক্রান্ত হাদীস। (তিরমিযী, ইবনে মাজা)
৪২। তোমরা এ আয়াত তিলাওয়াত করো, 'ইয়া আইয়্যাহাল্লাযীনা আমানু আলাইকুম আনফুসাকুম'। (আহমদ, আইম্মায়ে আরবা, ইবনে হাব্বান)
৪৩। হিজরতের ঐ হাদীস যেখানে গুহায় সিদ্দীকে আকবরের ভীতি দূরীভূত করার জন্য তাদের দু'জনের সাথে আল্লাহ আছেন এবং তিনি তাদের সাহায্যকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। (বুখারী, মুসলিম)
৪৪: আল্লাহুম্মাল আন্না ওয়াত্বাউনা - সংক্রান্ত হাদীস। (আবু ইয়ালা)
৪৫। সূরা হুদ আমাকে বৃদ্ধ করে দিয়েছে। (দারা কুতনী)
৪৬। আমার উম্মতের মধ্যে পিঁপড়ার গতির চেয়েও গোপনে শিরক বিস্তার লাভ করবে। (আবু ইয়ালা)
৪৭। আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে এমন একটি জিনিস শিক্ষা দিন, যে দু'আ সকাল-সন্ধ্যা পাঠ করব। (আল-হাইছাম বিন কালীব, তিরমিযী)
৪৮। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু এবং ইসতেগফার কর। কারণ ইবলিস বলেছে, আমি গুনাহকে ধ্বংস করি, আর লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু এবং ইসতেগফার আমাকে ধ্বংস করে। (আবু ইয়ালা)
৪৯: লা তারাফাউ আসওয়াতাকুম ফাউকা সাউতিন নবী - এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি আপনার কাছে নিচু স্বরে কথা বলব। (বায্যার)
৫০। কুল্লুন মুয়্যাসারুল লিমা খুলিকা লাহু - সংক্রান্ত হাদীস। (আহমদ)
৫১। যে জ্ঞাতসারে আমাকে মন্দ বলবে এবং আমার কোনো আদেশ অমান্য করবে সে জাহান্নামে নিজের ঠিকানা বানিয়ে নিবে। (আবু ইয়ালা)
৫২: মা নাজাতু ফি হাযাল আমরি - সংক্রান্ত হাদীস। (আহমদ)
৫৩। নবী (সা.) আমাকে বলেন, তুমি বলে দাও, যে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে জান্নাত তার জন্য ওয়াজিব। আমি রওয়ানা করলাম, পথিমধ্যে উমরের সাথে দেখা...। (আবু ইয়ালা) এ হাদীসটি আবু হুরায়রার বর্ণনা দ্বারা সংরক্ষিত, আবু বকরের দ্বারা নয়।
৫৪। আমার উম্মতের মধ্যে মোর্জীয়া এবং কাদরিয়া এ দু'টি গ্রুপ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (দারে কুতনী)
৫৫। আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর। (আহমদ, নাসাঈ, ইবনে মাজা)
৫৬। রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রত্যেক কাজের সময় এ দুআ পড়তেন, হে আল্লাহ, আমার জন্য এ কাজ পছন্দনীয় এবং উত্তম করে দিও। (তিরমিযী)
৫৭। আল্লাহুম্মা ফারিজি...। (বায্যার, হাকেম)
৫৮। হারাম পন্থায় প্রতিপালিত শরীর অপেক্ষা আগুন শ্রেয়। অপর রেওয়ায়েতে রয়েছে, অবৈধ পথে লালিত শরীর জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (আবু ইয়ালা)
৫৯। শরীরের প্রত্যেক অংশ তোমাদের কর্কশ কথার প্রতিবাদ করবে। (আবু ইয়ালা)
৬০। মধ্যবর্তী শাবানের রাতে আল্লাহ তা'আলা নিচে অবতরণ করেন। সে রাতে কাফির এবং ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি ছাড়া সকলকে ক্ষমা করা হয়। (দারা কুতনী)
৬১। প্রাচ্যের খোরাসান থেকে দাজ্জালের আবির্ভাব হবে, সূচলা মুখের একদল মানুষ তার অনুগামী হবে। (তিরমিযী, ইবনে মাজা)
৬২। আমার প্রতি আল্লাহর এতটুকু মেহেরবানী যে, আমি সত্তর হাজার লোককে বিনা হিসাবে জান্নাতে নিয়ে যেতে পারব। (আহমদ)
৬৩। কিয়ামত দিবসে রাসূলের সুপারিশ সংক্রান্ত হাদীস। (আহমদ)
৬৪। লোকেরা যদি এক দিকে যায়, আর আনসারগণ অন্য দিকে, তবে আমি আনসারদের সাথে থাকব। (আহমদ)
৬৫। কুরাইশগণ এ উম্মতের নেতা। চরিত্রবানরা চরিত্রবানদের এবং মন্দ লোকেরা মন্দ কাজের অনুসারী। (আহমদ)
৬৬। ওমান সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, সেখানে এক আরব গোত্র রয়েছে। আমার দূত সেখানে গেলে ওমানবাসী তীর ছুঁড়বে। (আহমদ, আবু ইয়ালা)
৬৭। একদা নবী (সা.) হযরত আবু বকরকে নিয়ে এমন স্থানে গেলেন যেখানে হযরত ইমাম হাসান ছেলেদের সঙ্গে খেলছিলেন। তিনি তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে বললেন, এর সঙ্গে আলীর চেহারার মিল রয়েছে। (বুখারী) ইবনে কাসীর হাকেমের সূত্র ধরে বলেন, এ হাদীসটি মারফু।
৬৮। উহুদ যুদ্ধ সংক্রান্ত হাদীস। (তায়ালাসী, তাবারানী)
৬৯। পঞ্চমবারে চোরকে হত্যা করবে। (আবু ইয়ালা, দাইলামী)
৭০। রাসূলুল্লাহ (সা.) উম্মে আইমানের কবর যিয়ারত করতে যেতেন। (মুসলিম)
৭১। আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে বসেছিলাম। তিনি হাত দিয়ে কি যেন সরাচ্ছিলেন। আমরা সেখানে কিছু দেখতে না পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কি করছেন? তিনি বললেন, দুনিয়া সরাচ্ছি। (বায্যার) ইবনে কাসীর অপর হাদীসের মাধ্যমে এ রেওয়ায়েতটি পরিপূর্ণভাবে বর্ণনা করেছেন।
৭২। একজন বাকী থাকা পর্যন্ত রদবাসীকে হত্যা কর। (তাবারানী)
৭৩। কোন স্থানে বাড়ি তৈরির পূর্বে সেখানের আবাসন, প্রতিবেশি এবং রাস্তা-ঘাট দেখে নিবে।
৭৪। আমার নিকট অসংখ্যাবার দরুদ প্রেরণ করো। কারণ আল্লাহ তা'আলা আমার কবরে একজন ফেরেশতা নিয়োগ করেছেন। কোনো ব্যক্তি দরুদ পাঠালে সেই ফেরেশতা আমাকে বলে, অমুকের ছেলে অমুক আপনার প্রতি দরুদ পাঠিয়েছেন। (দাইলামী)
৭৫। এক জুমা অপর জুমার কাফফারা...! (আকীলী)
৭৬। আমার উম্মতের জন্য জাহান্নামের উষ্ণতা হবে হাম্মাম খানার উষ্ণতার মতো। (তাবারানী)
৭৭। মিথ্যাচার থেকে নিজেকে রক্ষা করো। কারণ মিথ্যাচার ঈমান ধ্বংস করে দেয়। (ইবনে লা-ল)
৭৮। বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ। (দারা কুতনী)
৭৯। দীন আল্লাহ তা'আলার এক মহান ঝাণ্ডা। এমন কোনো ব্যক্তি নেই যে তা উত্তোলন করবে। (দাইলামী)
৮০। সূরা ইয়াসিনের ফযীলত সংক্রান্ত হাদীস। (দাইলামী)
৮১। ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ পৃথিবীর জন্য আল্লাহ তা'আলার ছায়া এবং বর্শা। প্রতিদিন রাতে তিনি সত্তর সিদ্দীকের সওয়াব প্রাপ্ত হন। (আকীলী, ইবনে হিব্বান)
৮২। মূসা (আ.) আল্লাহর দরবারে আরয করলেন, অবলা নারীর সেবা করলে কি ধরনের সওয়াব পাওয়া যাবে? তিনি বললেন, আমি তাকে আমার ছায়া দান করব। (ইবনে শাহীন, দাইলামী)
৮৩। হে আল্লাহ, উমর বিন খাত্তাবের মাধ্যমে ইসলামকে শক্তিশালী করো। (তাবারানী)
৮৪। প্রাণী শিকার করবে না, বৃক্ষের প্রশাখা এবং মূল কাটবে না, কারণ তারা তাসবীহ পড়ে।
৮৫। আমি নবী হয়ে প্রেরিত না হলে উমর নবী হতেন। (দাইলামী)
৮৬। কাপড়ের ব্যবসা করবে। (আবু ইয়ালা)
৮৭। যে ব্যক্তি নেতা থাকার পরও অন্যের জন্য বিদ্রোহ করবে তার প্রতি আল্লাহর ফেরেশতা এবং মানবকূলের অভিশাপ, তাকে হত্যা করো। (দাইলামী)
৮৮। যে আমার থেকে জ্ঞান অর্জন করবে অথবা হাদীস লিখবে যতক্ষণ পর্যন্ত সে জ্ঞান ও হাদীস সংরক্ষিত থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি সওয়াব পেতেই থাকবেন। (হাকেম)
৮৯। যে নাঙ্গা পায়ে আল্লাহর পথে বের হবে, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামত দিবসে স্বীকৃত পন্থায় তাকে প্রশ্ন করবেন না। (তাবারানী)
৯০। যে ব্যক্তি জান্নাত এবং আল্লাহর (আরশের) ছায়ার আকাঙ্ক্ষা করে সে যেন মুসলমানদের উপর কঠোরতা না করে বরং রহম করে। (ইবনে লাল ইবনে, হিব্বান, আবুশ শায়েখ)
৯১। যে ব্যক্তি কেবল আল্লাহর সন্তুটির উদ্দেশ্যে কারো প্রয়োজনে মিটাবে, ঐ দিন তার থেকে কোন গুনাহ প্রকাশ পাওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তাকে এ সেদিন পূর্ণ প্রতিদিন দিবেন। (দাইলামী)
৯২। যে জাতি জিহাদ ছেড়ে দিবে সে জাতি শান্তি ভোগ করবে। (তাবারানী)
৯৩। মিথ্যা অপবাদ দানকারী জান্নাতে যাবে না। (দাইলামী)
৯৪। কোনো মুসলমানকে অবজ্ঞা করো না। একজন অতি সাধারণ মুসলমানও আল্লাহর কাছে অনেক মর্যাদাবান। (দাইলামী)
৯৫। আল্লাহ তা'আলা বলেন, তোমরা আমার রহমতের আশা করলে আমার সৃষ্টির উপর রহম করো। (আবুশ শায়েখ, ইবনে হাব্বান, দাইলামী)
৯৬। টাখনুর নীচ পর্যন্ত কাপড় পরিধান করো না। (আবু নুয়াঈম)
৯৭। আমার আবু বকর (রা.) এবং আলী ইনসাফের পাল্লা বরাবর।
৯৮। শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতে অলসতা করো না। তোমরা তাকে দেখ না, কিন্তু সে তোমাদের ব্যাপারে অমনোযোগী নয়। (দাইলামী)
৯৯। যে শুধু আল্লাহর জন্য মসজিদ তৈরি করবেন, আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে তার জন্য বাড়ি নির্মাণ করে দিবেন। (তাবারানী)
১০০। যে তরকারীর মধ্যে কাঁচা পেঁয়াজ ও রসুন খাবে সে যেন মসজিদে না আসে। (তাবারানী)
১০১। নবী (সা.) নামাযের শুরু, রুকু যাওয়ার সময় এবং রুকু থেকে উঠে রফয়ে ইয়াদাইন করতেন। (বাইহাকী)
১০২। রাসূলুল্লাহ (সা.) আবু জাহেলকে একটি উট হাদিয়াস্বরূপ দিয়েছেন। (ইসমাঈলী)
১০৩। আলীর প্রতি তাকানো ইবাদত। (ইবনে আসাকির)
১০৪। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারদের সম্পর্কে অসিয়ত করেছেন, তাদের ভালো মানুষদের গ্রহণ করো এবং মন্দদের ক্ষমা করে দাও। (বাযযার ও তাবারানী)
📄 কুরআন শরীফের তাফসীর
আবুল কাসিম বাগাবী আবু মালীকা থেকে বর্ণনা করেন, সিদ্দীকে আকবরকে কোনো আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, আমি কোন ভূখণ্ডে এবং কোন আকাশের নিচে বসবাস করব, যদি আমি কিতাবুল্লাহর বিপরীতে কোনো কিছু করি।
আবু উবাইদা ইবরাহীম তাহমী থেকে নকল করেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীককে 'ফাকিহাতাও ওয়া আব্বা' এ আয়াতের অর্থ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, কুরআনের যে অর্থ আমার জানা নেই যদি বর্ণনা করি তবে কোন্ যমীন আমাকে ধারণ করবে এবং কোন আকাশ তার নিচে আমাকে বসতে দিবে।
বাইহাকী প্রমুখ লিখেছেন, একদা আবু বকর সিদ্দীককে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, আমি এর অর্থ যা করেছি তা আমার অভিমত। যদি তা যথার্থ হয় তবে আল্লাহ তা'আলার করুণা মনে করবে। আর যদি সঠিক না হয় তবে আমার এ অভিমত শয়তানের কাজ মনে করবে। আমার মতে এর উদ্দেশ্য কালালাহ ঐ সমস্ত সন্তানাদি যাদের মাতা-পিতা নাই। হযরত উমর (রা.) খলীফা হওয়ার সময় বলেন, হযরত আবু বকর (রা.) যে বিষয়ে কথা বলেছেন, সে বিষয়ের উপর কথা বলতে আমার লজ্জা লাগে। আমি তাঁর অভিমতকে প্রাধান্য দেই।
আবু নুয়াঈম হুলীয়া গ্রন্থে আসওয়াদ বিন হিলাল (রা.) থেকে নকল করেন, একদা হযরত আবু বকর সিদ্দীক সাহাবাদের জিজ্ঞেস করলেন- (১) ইন্নাল্লাযিনা কালু রাব্বুনাল্লাহু সুম্মাস তাকাউমু (২) ওয়াল্লাযিনা আমানু ওয়ালাম ইয়ালবিসু ঈমানাহুম বিজুলমিন - এ দু'টি আয়াত সম্পর্কে তোমাদের অভিমত কি? তারা বললেন, এর অর্থ হচ্ছে, তারা দৃঢ়পদ ছিলেন, কোন গুনাহ করেননি এবং ঈমানকে গুনাহর সাথে একীভূত করেননি। তিনি বললেন, তোমরা একে অপাত্র মনে করেছ। এর অর্থ হলো, তারা আল্লাহকে নিজেদের প্রতিপালক বলেছেন। অতঃপর এর উপরই মঞ্জু ব্রত ছিলেন, অপর প্রতিপালকের প্রতি আসক্ত হননি এবং ঈমানকে শিরকের সাথে মিশ্রিত করেননি। ইবনে জারীর আমের বিন সাদ বাজালী থেকে বর্ণনা করেন, 'লিল্লাযিনা আহসানুল হুসনা ওয়া যিয়াদাতুন' এর তাফসীরে বলেন, যিয়াদাতুন থেকে উদ্দেশ্য আল্লাহ তা'আলার মুখ। ইবনে জারীর হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) থেকে নকল করেন- 'ইন্নাল্লাযিনা কালু রাব্বুনাল্লাহু সুম্মাস তাকাউমু' এ আয়াতের অর্থ সম্বন্ধে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বলেন, যে ব্যক্তি (এ কথা) বলবে এবং বিশ্বাস নিয়ে ইহধাম ত্যাগ করবে সে ঠিক বলে বিবেচিত।
📄 অভিমত বিচার, অভিভাষণ এবং প্রার্থনা
আলকায়ী সুন্নাহ গ্রন্থে ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি হযরত আবু বকরের খেদমতে উপস্থিত হয়ে বলল, ভাগ্যে আছে বলেই তো মানুষ যিনা করে নাকি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। সে বলল, আল্লাহ তা'আলা যিনা আমাদের জন্য নির্ধারণ করেছেন আবার সে কারণে শাস্তিও দিবেন। তিনি বললেন, সত্যই তো। আল্লাহর কসম, আমার নিকট এ সময় কেউ থাকলে আমি তাকে নির্দেশ করতাম, সে তোমার নাক কেটে নিত।
ইবনে আবী শায়বা তাঁর রচনায় হযরত যুবাইর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, একদা হযরত আবু বকর (রা.) তাঁর এক অভিভাষণে বলেন, উপস্থিতি! আল্লাহকে লজ্জা করো। আল্লাহর কসম, আমি যখন কোনো খোলা প্রান্তরে পায়খানা করতে যাই, তখন আল্লাহ তা'আলার থেকে লজ্জায় আমি আমার মাথা ঢেকে নেই।
আব্দুর রাজ্জাক তাঁর রচনায় উমর বিন দিনার থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর (রা.) বলেন, আল্লাহকে লজ্জা করো। আল্লাহর কসম, আমি পায়খানায় গিয়ে আল্লাহর লজ্জায় আমার কোমর পায়খানার দেয়ালের সাথে লাগিয়ে দিতাম।
আবু দাউদ সুনান গ্রন্থে আব্দুল্লাহ আল-সানাবাহী থেকে বর্ণনা করেন, একদা হযরত আবু বকরের পেছনে মাগরিবের নামায পড়লাম। তিনি প্রথম দু'রাকআতে সূরা ফাতিহার পর ছোট্ট দু'টি সূরা পড়লেন এবং তৃতীয় রাকাতে- 'রাব্বানা লা তুযিগ কুলুবানা বা’দা ইয হাদাইতানা...'।
ইবনে আবী খাইসামা এবং ইবনে আসাকির ইবনে আয়নিয়া থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক কোনো এক মৃত ব্যক্তির সমবেদনা জানাতে গিয়ে বলেন, সান্ত্বনায় কোনো ক্ষতি নেই, আর ক্রন্দন করলে কোনো লাভ হবে না। মৃত্যু পূর্বে যন্ত্রণাদায়ক এবং পরে শান্তিদায়ক। নবী করীম (সা.)-এর ইন্তেকালে (জাতির অবস্থার কথা) স্মরণ করো। (সে তুলনায়) তোমাদের বেদনা ক্ষীণ। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের অধিকহারে পুরষ্কৃত করবেন।
ইবনে আবী শায়বা এবং দারা কুতনী সালিম বিন উবায়দা সাহাবী থেকে বর্ণনা করেন, আবু বকর সিদ্দীক (রা.) আমাকে বলেছেন, আস, আজ পুনরায় আমার সাথে ইবাদত করো, যাতে ভোর হয়ে যায়।
আবু কেলায়া আবু সফর থেকে বর্ণনা করেন, আবু বকর সিদ্দীক অধিকাংশ সময় বলতেন, আমার দরজা বন্ধ করো যাতে ভোর পর্যন্ত আমি ইবাদতে লিপ্ত থাকি। বাইহাকী এবং আবু বকর বিন যিয়াদ নিশাপুরী কিতাবুয যিয়াদাত গ্রন্থে হুযায়ফা বিন উসাইদ থেকে বর্ণনা করেন, লোকেরা যেন সুন্নত মনে না করে সেজন্য হযরত আবু বকর এবং হযরত উমর চাশতের নামায পড়তেন না।
আবু দাউদ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বলেন, পানির মৃত মাছ ভক্ষণ জায়েয। ইমাম শাফেঈ (রহ.) 'আলম' গ্রন্থে বর্ণনা করেন, আবু বকর সিদ্দীক (রা.) জীবিত প্রাণীর বিনিময়ে গোশত বিক্রয় মাকরূহ মনে করতেন।
বুখারী শরীফে ইমাম শাফেঈ (রহ.) থেকে বর্ণিত, আবু বকর সিদ্দীক (রা.) দাদাকে বাবার পরিত্যক্ত সম্পদের উত্তরাধিকারী হিসেবে গণ্য করতেন।
ইবনে আবী শায়বা স্বীয় রচনায় বর্ণনা করেন, আবু বকর সিদ্দীক দাদাকে বাবার অবর্তমানে বাবা হিসেবে এবং নাতিকে ছেলের অনুপস্থিতিতে ছেলে বলে গণ্য করতেন। কাসিম (রা.) বলেন, জনৈক ব্যক্তি বাবাকে অস্বীকার করলে তিনি তার গর্দান উড়িয়ে দেবার নির্দেশ দিয়ে বলেন, তার মাথায় শয়তান ভর করে আছে।
ইবনে আবী মালেক বলেন, তিনি জানাযার নামায পড়ানোর সময় বলতেন, হে আল্লাহ! তোমার এ বান্দার পরিবার, সম্পদ এবং সম্প্রদায় তাকে তোমার নিকট সোপর্দ করেছে। তাঁর গুনাহ যদিও বেশি হয়ে থাকে কিন্তু তোমার রহমত ও অনুগ্রহ এর চেয়ে অনেক বেশি তুমি দয়াবান।
সাঈদ বিন মানসুর স্বরচিত সুনান গ্রন্থে হযরত উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, একদা আসেম বিন উমর বিন খাত্তাব তার মায়ের সাথে ঝগড়া করলে হযরত আবু বকর মিমাংসা করার পর আসেমকে সম্বোধন করে বললেন, আসেম! খুব ভালো করে জেনে নাও যে, তোমার মায়ের শরীরের ঘাম এবং গন্ধ তোমার চেয়ে হাজার গুণ উত্তম।
বাইহাকী কায়েস বিন আবু হাযেম থেকে বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি হযরত আবু বকরের খেদমতে উপস্থি হয়ে আরয করল, আমার বাবা আমার সকল সম্পদ ছিনিয়ে নিয়ে আমাকে অসহায় করে দিতে চান। হযরত আবু বকর (রা.) তার বাবাকে বললেন, যতটকু তোমার প্রয়োজন তোমার ছেলের কাছ থেকে ততটুকু নিবে। সে বলল, হে আল্লাহর রাসূলের খলীফা! রাসূলুল্লাহ (সা.) কি বলেননি যে, তোমার সম্পদ তোমার বাবার। তিনি বললেন, হ্যাঁ তিনি তাই বলেছেন। তবে এর অর্থ এটা নয়; বরং তাঁর কথার উদ্দেশ্য ছিল এ থেকে ব্যয় করা।
আমর বিন শোয়াইবের দাদা বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) ও উমর (রা.) গোলামের কেসাস হিসেবে স্বাধীন ব্যক্তিকে হত্যা করতেন না। (আহমদ)
বুখারী শরীফে ইবনে মালিকার দাদা থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তির হাতে দংশন করতে গিয়ে তার দু'টি দাঁত ভেঙে গেলে হযরত আবু বকর (রা.) এ ক্ষেত্রে দিয়ত এবং কেসাস কোনোটাই জারি করেননি।
ইবনে আবী শায়বা এবং বাইহাকী ইকরামা (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক কান কর্তনের কেসাস হিসেবে পনেরোটি উট গ্রহণ করতেন। অতঃপর বলতেন, কান কাটা ক্ষতটি চুল এবং পাগড়ির মধ্যে ঢেকে রেখ।
বাইহাকী প্রমুখ আবু ইমরান জুনী থেকে রেওয়ায়েত করেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক ইয়াযিদ বিন আবু সুফিয়ানকে সিপাহসালার করে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে সৈন্যবাহিনী প্রেরণের প্রাক্কালে বলেন, আমি তোমাদের কয়েকটি উপদেশ দিব, এর উপর অটুট থাকবে। নারী, শিশু, পঙ্গু এবং বৃদ্ধাদের হত্যা করবে না। ফলজ বৃক্ষ কাটবে না। বস্তী উচ্ছেদ করবে না। ছাগল এবং উট হত্যা করবে না, তবে খেলে কোনো ক্ষতি নেই। ফসলের ক্ষেত ধ্বংস এবং জ্বালিয়ে দিবে না। আর অপচয় ও কৃপণ থেকে বেঁচে থাকবে।
আহমদ আবু দাউদ এবং নাসাঈ আবু বারযা আসলামী থেকে নকল করে লিখেছেন, একদা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) জনৈক ব্যক্তির প্রতি ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে পড়লে আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূলের খলীফা! তাকে হত্যা করুন। তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পর এ কাজ কারো জন্যই বৈধ নয়।
সাইফ কিতাবুল ফুতুহ গ্রন্থে তার শিক্ষক থেকে বর্ণনা করেন, উমাইয়া বংশের কতিপয় মুহাজির সাহাবী ইয়ামামার গভর্নরের নিকট এমন দু'জন নারীকে ধরে নিয়ে এলেন যাদের মধ্যে একজন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শানে, আর অপরজন মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুৎসা গাইত। ইয়ামামার গভর্নর শাস্তি হিসেবে তাদের হাত কেটে দিলেন এবং দাত উপড়ে ফেললেন। হযরত আবু বকর এ মর্মে তাঁর নিকট পত্র লিখলেন, আমি সংবাদ পেয়েছি তুমি দু'জন মহিলাকেই এই এই শাস্তি দিয়েছ। তুমি যদি শাস্তি প্রদান না করতে তাহলে যে নারী রসূল আকরাম (সা.)-এর ধৃষ্টতা প্রদর্শন করেছে শাস্তি হিসেবে আমি তাকে মৃত্যুদণ্ড দিতাম। কারণ নবীগণের মর্যাদা সর্বোচ্চ। বিশেষত যদি কোনো মুসলমান এ বেয়াদবী করে তবে সে মুরতাদ। আর যদি কোনো যিম্মি করে তবে সে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে বিবেচিত হবে। যে নারী মুসলমানদের কুৎসা গায় সে মুসলমান হলে তাকে আদব এবং শরম দিতে হবে। এজন্য হাত পা কাটা উচিত নয়। আর যিম্মি হলে এ কাজ (মুসলমানদের গালমন্দ করা) শিরকের চেয়ে বেশি খারাপ নয়। শিরকের ক্ষেত্রে যেমন ধৈর্য ধারণ করো, এ ক্ষেত্রেও সবর করা আবশ্যক। নমনীয়তা প্রদর্শন করো। কেসাস ছাড়া হাত পা কাটা আমি মাকরূহ মনে করি। কারণ এ শান্তিপ্রাপ্তরা সর্বদা লজ্জা পায়।
মালিক এবং দারা কুতনী সুফিয়া বিনতে আবু উবায়দা (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, এক লোক জনৈক অবিবাহিত যুবতির সাথে যিনা করে এবং সে তা স্বীকার করলে হযরত আবু বকর সিদ্দীক তাঁকে বেত্রাঘাত করেন এবং ফিদাক অঞ্চলে নির্বাসন দেন।
আবু ইয়ালা মুহাম্মদ ইবনে আতিব থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীকের নিকট এক চোরকে বন্দী করে নিয়ে আসা হলো। চুরির অপরাধে এর হাত পা ইতঃপূর্বে একবার কেটে ফেলা হয়েছিল। তিনি তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, আমি তোমার প্রতি ঐ দণ্ড আরোপ করছি, যা নবী (সা.) আদেশ করে গেছেন। তিনিই সর্বাধিক জ্ঞানী।
মালেক (রহ.) কাসিম বিন মুহাম্মদ থেকে বর্ণনা করেন, ডান হাত এবং ডান পা কর্তিত ইয়ামেনের এক বাসিন্দা সিদ্দীকে আকবরের বাড়িতে এসে অভিযোগ করল, ইয়ামেনের প্রশাসক আমার প্রতি নির্যাতন চালিয়েছে। সে সারারাত নামায আদায় করে। সিদ্দীকে আকবর তার দীর্ঘ নামায দেখে আফসোস করে। এমতাবস্তায় জানা গেল যে, হযরত আবু বকর সিদ্দীকের সম্মানিত স্ত্রী আসমা বিনতে আমিসের অলংকার হারিয়ে গেছে। ইয়ামেন থেকে আগত লোকটি সর্বদা হযরত আবু বকর সিদ্দীক এবং অন্যান্য লোকদের সাথেই অবস্থান করছিল এবং সে তার মেজবান অর্থাৎ হযরত আবু বকর সিদ্দীকের জন্য এ বলে প্রার্থনা করল, হে আল্লাহ, এ বাড়িওয়ালার সাথে যে এ আচরণ করেছে তাকে তুমি শান্তি দাও। অনুসন্ধানে সে অলংকার এক স্বর্ণকারের নিকট পাওয়া গেল। আর ইয়ামেন থেকে আগত লোকটি তা সরবরাহ করেছে। জনৈক ব্যক্তির সাক্ষীর প্রেক্ষিতে সে তার অপরাধ স্বীকার করলে তিনি তার বাম হাত কেটে ফেলার নির্দেশ দিয়ে বললেন, আল্লাহর কসম, এ চুরি সম্বন্ধে তার দুআ আমাকে সন্দিহান করেছিল।
দারা কুতনী হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, পাঁচ দিরহাম মূল্যের ঢাল চুরির দায়ে তিনি হাত কাটার নির্দেশ দিতেন।
আবু সালিম থেকে বর্ণিত, হযরত আবু বকর সিদ্দীকের খিলাফতের যুগে ইয়ামেন থেকে কতিপয় লোক এসে কুরআন শরীফ শ্রবণে খুব কান্নাকাটি করলে তিনি বললেন, আমাদেরও এ অবস্থা ছিল, তবে পরবর্তীতে মন শক্ত হয়ে গেছে। আবু নুয়াঈম মন শক্ত হওয়ার অর্থ আল্লাহ তা'আলার মারেফাত দ্বারা মন শক্ত ও শান্ত হয়ে যাওয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
আবু উবায়দ গারীব গ্রন্থে রেওয়ায়েত করেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বলেন, যে ব্যক্তি ইসলামের প্রাথমিক যুগে মারা গেছে সে ভাগ্যবান। সে তো ঝগড়া থেকে পবিত্র ছিল।
আইম্মায়ে আরবাআ এবং মালেক (রহ.) কাবিসা থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকরের খেদমতে জনৈক মৃত ব্যক্তির দাদী তার মৃত নাতির পরিত্যক্ত সম্পদের ফারায়েজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে তার ভাগ চাইল। তিনি বললেন, তোমার অংশ প্রাপ্ত সম্পর্কে কুরআনে কিছু নেই। আর এ সম্পর্কিত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কোনো ফায়সালাও আমার জানা নেই। তুমি এসো, আমি লোকদের এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে মুগীরা বিন শো'বা বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) আমার সামনে দাদীকে ষষ্ঠাংশ প্রদান করেছেন। তিনি বললেন, তোমার মত কারো এ কথা স্মরণ আছে কি? মুহাম্মদ বিন মাসলামা দাঁড়িয়ে তাঁর কথার প্রতি সমর্থন জানালে তিনি তাকে ষষ্ঠাংশ প্রদান করেন।
মালিক এবং দারা কুতনী কাসিম থেকে বর্ণনা করেন, মৃত ব্যক্তির দাদী এবং নানী তার খেদমতে উপস্থিত হয়ে মিরাস প্রার্থনা করলে তিনি নানীকে অংশ দিলেন। বদরী সাহাবী হযরত আব্দুর রহমান বিন সহল আনসারী আবেদন করলেন, হে আল্লাহর রসূলের খলীফা! আপনি মৃত ব্যক্তির সম্পদ (দাদী এবং নানীর মধ্যে) বণ্টন করেছেন। কিন্তু তার ওয়ারেশরা যদি তাদের না চেনে? (এরপরও) তিনি তাদের অংশ দিয়েছেন।
আব্দুর রায্যাক আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, জনৈক মহিলা স্বামীর থেকে তালাক নিয়ে আব্দুর রহমান বিন যুবাইরের সাথেও তার কোনো এক গোপন বিষয়ে বনিবনা না হওয়ায় তাঁর থেকেও তালাক নিয়ে পূর্বের স্বামীকে বিয়ে করতে চাইলে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, দ্বিতীয় স্বামীর সাথে সহবাস না করলে তোমার তালাক বৈধ নয়। এ হাদীস সহীহ বুখারী শরীফেও রয়েছে। তবে আব্দুর রায্যাক এটুকু বৃদ্ধি করেছেন যে, সে মহিলা নবী করীম (সা.)-এর খেদমতে দু'বার উপস্থিত হয়ে বলল, আবদুর রহমান আমার সঙ্গে সহবাস করেছে। এরপরও তিনি (সা.) তার কথা প্রত্যাখ্যান করলেন এবং এ বলে দু'আ করলেন হে আল্লাহ! এ নারী বিচ্ছিন্ন স্বামীর মিলন প্রত্যাশায় তার কাছে ফিরে যেতে চায়। দ্বিতীয় বিয়ে তার পূর্ণ করো না। এ মহিলা হযরত আবু বকর সিদ্দীক এবং হযরত উমর ফারুকের খিলাফতও কালেও একই আবেদন নিয়ে তাদের নিকট উপস্থিত হয়। কিন্তু তাঁরা দু'জনই তার আবদেন প্রত্যাখ্যান করেন।
বাইহাকী উকবা বিন আমের থেকে বর্ণনা করেন, আমর বিন আস এবং শারজীল বিন হাসানা উকবাকে দূত বানিয়ে তাঁর হাতে সিরিয়ার (লোকের) মাথার খুলি হযরত আবু বকরের নিকট পাঠান। দূত এসে পৌঁছলে তিনি এ ধরনের কাজ করতে নিষেধ করলেন। উকবা বললেন, হে আল্লাহর রসূলের খলীফা। তারাও তো আমাদের সাথে এরূপ আচরণই করছে। তিনি বললেন, আমর বিন আস এবং শারজীল কি তাহলে পারস্য এবং রোমানদের অনুসরণ করছে? কাউকে হত্যা না করে অগ্রসর হও। অনুসরণের জন্য কোরআন এবং হাদীসই যথেষ্ট।
বুখারী শরীফে কায়েস বিন আবু হাযেম থেকে বর্ণিত, যয়নব নাম্নী জনৈক মহিলা কোনো কথা বলত না। হযরত আবু বকর তাকে কথা বলতে বললেও সে কথা বলল না। লোকেরা বলল, সে নিরবতার সাথে হজ্জ আদায় করেছে। তিনি তাকে বললেন, কথা বল, তোমার এ আচরণ জাহেলিয়াতের কাজ। ইসলামে এ ধরনের বৈরাগ্য জীবনযাপন নাজায়েয। একথা শুনে সে কথা বলতে লাগল এবং জিজ্ঞেস করল, আপনি কে? তিনি বললেন, আমি মুহাজির। মহিলা বলল, আপনি কোন মুহাজিরদের অন্তর্ভুক্ত? তিনি বললেন, তুমি তো জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলে। আমি আবু বকর। সে বলল, জাহেলিয়াতের পর আল্লাহ তা'আলা এ দ্বীন পাঠিয়েছেন। কিন্তু কোন ব্যক্তি আমাদেরকে এর উপর প্রতিষ্ঠিত করবে? তিনি বললেন, তোমাদের ইমামগণ কর্তৃক। সে বলল, ইমাম কে? তিনি বললেন, তোমার সম্প্রদায়ের কোন নেতা নেই, যে শাসনকার্য পরিচালনা করেন? সে বলল, হ্যাঁ রয়েছেন। তিনি বললেন, তিনিই ইমাম।
ইমাম বুখারী হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকরের এক গোলাম ছিল। সে শ্রমিকের কাজ করত এবং তিনি তার জন্য বেতন নির্ধারণ করেছিলেন। উভয়ে একত্রে খানা খেতেন। একদিন গোলাম কিছু জিনিস আনল আর হযরত আবু বকর তা থেকে কিছুটা খেয়ে ফেললেন। গোলাম বলল, আপনি জানেন এ জিনিস কিভাবে সংগৃহীত হয়েছে? তিনি পুরো বিষয় জানতে চাইলে সে বলল, জাহেলিয়াতের যুগে আমি ভবিষ্যদ্বাণী করতাম। আর আপনি অবগত আছেন যে, সত্য ও মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়। আমি এক ব্যক্তিকে ভবিষ্যদ্বাণী দ্বারা প্রতারিত করেছিলাম। আজ সেই বদলা হিসেবে আমাকে এ জিনিস দিয়েছে, যা আপনি আহার করেছেন। এতদশ্রবণে তিনি সঙ্গে সঙ্গে তা বমি করে ফেলে দিলেন।
আহমদ যোহদ গ্রন্থে রেওয়ায়েত করেন, ইবনে সিরীন (রহ.) বলেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক ছাড়া আমি কাউকে সন্দেহযুক্ত খাদ্য আহারের পর বমি করতে শুনেনি। অতঃপর তিনি উক্ত ঘটনাটি বর্ণনা করেন।
নাসাঈ আসলাম থেকে বর্ণনা করেন, একদিন হযরত উমর ফারুক (রা.) দেখলেন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) নিজের জিহ্বা টেনে ধরে বলছিলেন, এ আমাকে খারাপ জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে।
আবু উবায়দ গারীব গ্রন্থে লিখেছেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) আব্দুর রহমান বিন আউফকে নিজ আত্মীয়ের সাথে লড়াই করতে দেখে বললেন, আত্মীয়-পরিজনের সাথে লড়াই করো না। এ লড়াই বিবাদকে জিয়ে রাখে। ফলে লোকেরা তোমার সমালেচনা করবে।
ইবনে আসাকির মূসা বিন উকবা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) তাঁর অভিভাষণে বলেন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমি তাঁর তারীফ করছি, তাঁর কাছে প্রার্থনা করছি এবং মৃত্যুর পর তাঁর নিকট মর্যাদা কামনা করছি। আমাদের মৃত্যু নিকটবর্তী। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং কোনো কাজে তাঁর কোনোই অংশিদার নাই। আর মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর বান্দা এবং রসূল। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে সত্যসহ সুসংবাদ প্রদানকারী, ভীতি প্রদর্শনকারী এবং প্রদীপমালার উজ্জ্বল রশ্মি করে পাঠিয়েছেন, যেন তিনি জীবিত লোকদের ভীতি প্রদর্শন এবং অবিশ্বাসীদের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন। যারা আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের আনুগত্য করবে তারা সুপথ প্রাপ্ত। আর যারা বক্রতা দেখাবে তারা পথভ্রষ্ট।
হে লোকসকল, আমি তোমাদের নিকট আল্লাহকে ভয় করার ওসীয়ত করছি। আল্লাহ তা'আলা হিদায়েতের যে পথ তোমাদেরকে দেখিয়েছেন সে পথে তোমরা অটল থাকবে। কালেমায়ে ইখলাসের পর হিদায়েতের উদ্দেশ্যই হচ্ছে নেতার আনুগত্য করা। কারণ আল্লাহ তা'আলা এবং সেই নেতা যিনি সত্যের আদেশ এবং অসত্যের প্রতি বাধা প্রদান করেন তাঁর আনুগত্য করলে কল্যাণ লাভ করবে এবং তাঁর প্রতি যে হক ছিল তাও আদায় হবে। নফসের আনুগত্য করবে না। আত্মার ভোগমুক্ত ব্যক্তি কল্যাণকামিতার নাগাল পাবে। অহংকার করবে না। ভেবে দেখ অহংকারী ব্যক্তি সে তো মাটি থেকে সৃষ্ট এবং একদিন সে মাটির সাথেই মিশে যাবে। আজ যে জীবিতকাল বদদু'আ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখবে। সবসময় নিজের অন্তরকে মৃত মনে করবে। অটুট এবং দৃঢ়তা অভিপ্রায় পোষণ করবে। কারণ পোক্তা ইরাদা নেক আমল করতে উদ্বুদ্ধ করে। (মন্দ কাজ) পরহেয করবে। (মন্দ কাজ) বর্জণ করা অনেক লাভজনক। আমল করবে। কারণ আমল কবুল করা হয়। যে কাজ আল্লাহর আযাবের প্রতি ঠেলে দেয় সে কাজ বাদ দাও। আর যে কাজের মধ্যে আল্লাহ তা'আলা তার রহমতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সে কাজ সর্বদা করবে। বোঝ এবং বুঝাও। ভয় করো এবং ভয় দেখাও। কোন কাজ করলে ধ্বংস অবধারিত, আর কোন কাজ করলে পরিত্রাণ পাওয়া যায় তা আল্লাহ তা'আলা জানিয়ে দিয়েছেন। আমি তোমাদের নিজের নফস সম্পর্কে ওসীয়ত করতে কুণ্ঠিত হয়নি। আল্লাহ তা'আলাই একমাত্র সাহায্যকারী। তাঁর সাহায্য ব্যতীত ভাল কাজ করা এবং মন্দ কাজ থেকে বেঁচে থাকার শক্তি কারো নেই। নিষ্টার সাথে ইবাদত করবে, আল্লাহর আনুগত্য করবে, নিজ অংশ সংরক্ষণ করবে এবং হিংসা পরায়ণ হয়ো না। ফরয ইবাদতে কমতি থাকার কারণে নফল ইবাদত বেশি বেশি করবে।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! নিজেদের ভ্রাতা এবং বন্ধুগণ যারা গত হয়েছে তারা যা করে গেছে তাই তাদের প্রাপ্য। সৃষ্টজীব এবং তার জাতের মধ্যে আল্লাহর কোনো শরীক নেই, কোনো বংশ পরম্পরাও নেই। তিনি নিজ মেহেরবানীতে মাখলুককে ক্ষমা করেন। মাখলুক ইবাদত ও আনুগত্য থেকে সরে না যাওয়া পর্যন্ত তিন মাখলুকের উপর মসীবত চাপিয়ে দেন না। যে ভালো কাজের ফলাফল জাহান্নামে সেটি কোনো ভালো কাজ নয়। আর যে মন্দ কাজের পরিণাম জান্নাত তা কোনো মন্দ কাজ নয়। আমি এটাই বলতে চাই। আমি আল্লাহ তা'আলার কাছে তোমাদের এবং নিজের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আর নবী (সা.)-এর প্রতি সালাত ও সালাম এবং তাঁর উপর আল্লাহর রহমত ও বরকত অবতীর্ণ হোক।
হাকেম এবং বাইহাকী আব্দুল্লাহ বিন হাকীম (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, একদা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) আমাদের সামনে এক অভিভাষণ প্রদান করেন। তিনি হামদ এবং সানার পর বলেন, আমি তোমাদের ওসীয়ত করছি- আল্লাহকে ভয় করো, প্রশংসিত পরিবারের গুণকীর্তন করো এবং তোমাদের প্রবল বাসনাকে ভয়ের সাথে মিলিয়ে দাও। আল্লাহ তা'আলা হযরত যাকারিয়া (আ.)-এর বংশের প্রশংসা করেছেন এভাবে- 'ইন্নাহুম কানু ইউসারইউনা ফিল খাইরাতি ওয়া ইয়াদউওনা না রাগানান ওয়া রাহবান ওয়া কানু লানা খাশীয়িন'। অর্থাৎ, নিশ্চয় এ সকল লোক উত্তম কাজে তাড়াতাড়ি করে এবং আমাকে অত্যন্ত আগ্রহ ও ভক্তি সহকারে ডাকে এবং ভয় করে।
আল্লাহর বান্দাগণ! মনে রেখ, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের অন্তরগুলো নিজের অধিকারের বিনিময়ে বন্ধক রেখেছেন এবং এ বিষয়ে তিনি তোমাদের থেকে প্রতিশ্রুতিও নিয়েছেন। আর তিনি তোমাদের থেকে নশ্বর দুনিয়াকে অবিনশ্বর আখেরাতের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন। তোমাদের নিকট আল্লাহর যে পাক কালাম রয়েছে তার দীপ্তি কখনই নিভে যাবে না এবং এর রহস্যও কখনোই নিঃশেষ হবে না। তোমরা ঐশী কিতাবের আলোয় আলোকিত হও, এ কিতাবের নসীহত গ্রহণ করো এবং যেদিন কোনো আলো থাকবে না সেদিন এ কিতাবের আলো প্রাপ্তির জন্য প্রস্তুতি নাও। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং কিরামান কাতিবীন ফেরেশতাদ্বয়কে নিযুক্ত করেছেন। তাঁরা তোমাদের সকল কর্ম সম্পর্কে অবগত।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা প্রত্যেক মুহূর্তে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছ, এ সম্পর্কিত জ্ঞান তোমাদের অগোচরে রয়েছে। যদি তোমরা এ সম্পর্কে জানতে তবে মৃত্যুর সময় তোমরা নেক আমল করতে, আর এমনটা আল্লাহ তা'আলার রহমত ব্যতীত তোমরা পাবে না। মৃত্যুর প্রাক্কালে কিছু ভালো আমলের চেষ্টা কর, যাতে মন্দ কাজ হতে নিরাপদ থাকতে পারো। তোমাদের পূর্বে অনেক জাতি ছিল মৃত্যুর সময় এলে তারা শিরক করেছে এবং আল্লাহকে ভুলে গেছে। আমি তোমাদের হুঁশিয়ার করেছি। তোমরা তাদের মতো হয়ো না। সুতরাং তাড়াতাড়ি করো, তাড়াতাড়ি করো। ক্ষমা প্রাপ্তির চেষ্টা করো। মৃত্যু অত্যন্ত নিকটবর্তী। ভীতি ছড়ানোর জন্য মৃত্যু ধেয়ে আসছে। হে মুসলমান। ক্ষমা তোমাদের জন্যই।
ইবনে আবিদ দুনিয়া এবং আবু নুয়াঈম হুলীয়ার ইয়াইয়া বিন কাসীর থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর (রা.) এক ভাষণে বলেন, উজ্জ্বল চেহারার সেই তরুণরা কোথায়, যাদের যৌবন দর্শনে লোক পেরেশান থাকতো। রাজা-বাদশারা কোথায়, যারা শহর এবং দুর্গ নির্মাণ করেছে। যারা লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছে তারা কোথায়। তাদের প্রতাপ আজ খর্ব হয়েছে। যুগের আবর্তে তারা আজ অন্ধকার কবরে শুয়ে আছে। (সুতরাং) সর্বদা ভালো আমল করো এবং নেক কাজের প্রতি ধাবিত হও।
আহমদ যোহদে সালমান থেকে বর্ণনা করেন, একদা হযরত সালমান হযরত আবু বকরের খেদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করলেন, আমাকে নসীহত করুন। তিনি বললেন, হে মুসলমান! আল্লাহকে ভয় করো এবং নিশ্চিতভাবে জেনে রাখ যে, অচিরেই প্রত্যেক গোপন কথা প্রকাশ পেয়ে যাবে এবং লোকেরা জেনে নিবে প্রত্যেক জিনিসে তোমার অংশ কতটুকু তুমি কি খেয়েছ আর কি রেখেছ। মনে রেখ, যে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়বে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার নিরাপত্তা আল্লাহর যিম্মায়। আর যার যিম্মাদার স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা তাকে কে আঘাত করতে পারে। আর আল্লাহর সাথে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবে, তিনি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। তিন আরো বললেন, একে একে নেককার বান্দাদের উঠিয়ে নেয়া হবে। অবশেষে আটার বোঝার মতো অসমর্থ কতিপয় লোক থেমে যাবে, যাদের সাথে আল্লাহ তা'আলার কোনোই সম্পর্ক থাকবে না।
সাঈদ বিন মানসুর মুআবিআ বিন কাররাহ থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) অধিকাংশ সময় এ দুআ করতেন, হে বিশ্ব প্রতিপালক। আমার শেষ বয়সটা সুন্দর করে দাও। নেক আমলে থাকা অবস্থায় যেন আমি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করি। আপনার সাথে সাক্ষাতের দিনটা যেন সকল দিন অপেক্ষা উত্তম হয়।
আহমদ যোহদ গ্রন্থে হাসান (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, আমার নিকট এ মর্মে সংবাদ পৌঁছেছে যে, তিনি অধিকাংশ সময় এ প্রার্থনা করতেন, হে আমার রব! আমি সেই জিনিসের প্রার্থনা করছি যা আমাকে নিরাপত্তা দিবে। হে আমার রব! আমাকে তোমার সন্তুষ্টি এবং জান্নাতের বুলন্দ মর্তবা দান করো।
আরফাজ (রহ.) বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বলতেন, যে আল্লাহর ভয় নিয়ে চলাফেরা করে সে যেন খোদার ভয়ে কাঁদে। অন্যথায় সে যেন কাঁদার ভান করে।
আযরা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন জাফরান ও স্বর্ণের সংমিশ্রণে রক্তিম বর্ণ মেয়েদের ধ্বংস করে দিয়েছে।
মুসলিম বিন ইয়াসার হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, মুসলমানগণ প্রত্যেকটি কাজের প্রতিদান পাবেন। এমনকি সামান্যতম দুঃখ, জুতার ফিতা ছিড়ে যাওয়া এবং সম্পদ কম হওয়ারও।
মাইমুন বিন মিহরান কর্তৃক বর্ণিত, একটি পাখি শিকার করে হযরত আবু বকর সিদ্দীকের নিকট নিয়ে আসা হলে তিনি পাখিটিকে উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখে বললেন, আল্লাহর তাসবীহ ছেড়ে দেবার কারণে প্রাণীকে মেরে জ্বালিয়ে দেয়া হয় এবং বৃক্ষ কেটে ফেলা হয়। বুখারী আদব অধ্যায়ে এবং আব্দুল্লাহ বিন আহমদ যাওয়ায়িদুন যোহদ গ্রন্থে যানাবাহি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি হযরত আবু বকর সিদ্দীকের নিকট শুনেছেন, তিনি বলেন, আল্লাহর ওয়াস্তে এক ভাই অপর ভাইয়ের জন্য যদি দু'আ করে তবে তা অবশ্যই কবুল হবে, আব্দুল্লাহ যাওয়াযিদুয যোহদ গ্রন্থে উবাইদ বিন উমায়ের থেকে বর্ণনা করেন, লবীদ শায়ের হযরত আবু বকর সিদ্দীকের খেদমতে উপস্থিত হয়ে কবিতার এ পঙক্তিটি আবৃত্তি করল, স্মরণ রেখ, আল্লাহ ছাড়া প্রত্যেকটি বস্তু বাতেল। তিনি বললেন, তুমি সত্য বলেছ। কবি আবার দ্বিতীয় পঙক্তিটি আবৃত্তি করল, সকল নেয়ামত ধ্বংসশীল। তিনি বললেন, তুমি অসত্য বলছ। আল্লাহর নিকট এই এই নেয়ামতসমূহ রয়েছে, যা কখনোই ধ্বংস হবে না। কবি লাবীদ চলে গেলে তিনি বললেন, কবি হেকমত তথা সূক্ষ্ম জ্ঞানের কথা বলে থাকেন।
📄 হযরত আবু বকরের বাণী আল্লাহর ভয় সম্পর্কিত
আবু আহমদ হাকেম মাআয বিন জাবাল (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, একদা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এক বাগানে ঢুকে গাছের ছায়ায় একটি পাখি দেখে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললেন, হে পাখি তুমি বড়ই ভাগ্যবান। গাছের ফল খাচ্ছ, গাছের ছায়ায় থাকছ, তোমার কোনো হিসাব নেই। হায়, আবু বকর যদি তোমার মতো হতো।
ইবনে আসাকির বায়হাকী থেকে বর্ণনা করেন, প্রশংসা করার সময় তিনি বলতেন, হে আল্লাহ! আপনি আমার নফস সম্পর্কে আমার চেয়ে বেশি অবগত। আর আমি নিজের ব্যাপারে অন্যদের চেয়ে বেশি জানি। হে আল্লাহ! তারা আমার ভালো কাজ সম্পর্কে যে ধারণা করে আমাকে অনুরূপ করে দিন। আর আমার যে গুনাহ সম্পর্কে তারা অবগত নয়, তা ক্ষমা করুন।
আহমদ যোহদ গ্রন্থে লিখেছেন, হযরত আবু বকর (রা.) বলেন, আমি যদি মুমীনের একটি পশমও হতাম, তবে তা আমার কাছে অধিক প্রিয় হতো।
আহমদ যোহদ গ্রন্থে মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেন, হযরত ইবনে যুবাইর নামাযের সময় অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকতেন যেন শুকনো একটি কাঠের টুকরো। হযরত আবু বকরের অবস্থাও ছিল একই।
হাসান বলেন, হযরত আবু বকর বলতেন, আল্লাহর কসম, আমি যদি গাছ হতাম আমাকে কেটে ফেলত, আমি কেটে যেতাম-এটাই আমার জন্য প্রিয় ছিল। কাতাদা বলেন, এ বর্ণনা আমার জানা যে, হযরত আবু বকর কর্তৃক বর্ণিত, আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম। হযরত আবু বকর জনৈক মহিলার মৃত্যুর সময় বারবার তার বালিশের দিকে দেখছিলেন। মহিলার মৃত্যুর পর এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি তার বালিশের নিচে পাঁচ অথবা ছয় দিনার দেখায়ে হাতে হাত মেরে ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন-পড়ে বললেন, হে অমুক, আমি চাইনি তোমার এ অবস্থা হোক। ছাবিত বানানী বলেন, তিনি সর্বদা এ কবিতা পাঠ করতেন, তুমি মানুষের সংবাদ বহন করছ, কখন তোমার খবর তারা বহন করবে তা কি জান।
ইবনে সাদ ইবনে সিরীন থেকে বর্ণনা করেন, নবী আকরাম (সা.)-এর পর সিদ্দীকে আকবরের খিলাফত কালে লোকেরা অসঙ্গত কথা বলতে ভয় করতো না। তারপর ফারুকে আযমের সময় লোকেরা তাই করতো। বিচারের সময় কুরআন ও হাদীস থেকে রায় দিতে না পারলে তিনি রায় ঘোষণার সময় বলতেন, আমি এ রায় ঘোষণার ব্যাপারে ইজতেহাদ (বুদ্ধি বৃত্তিক গবেষণা) করেছি। যদি তা সঠিক হয় তবে মনে করবে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়েছে। আর যদি তা সঠিক না হয়, তাহলে আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি।