📄 বিবিধ ঘটনাবলী
হযরত উমর (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর আরবের কতিপয় লোক মুরতাদ হয়ে বলতে লাগল, আমরা নামায পড়ব, কিন্তু যাকাত দিব না। আমি হযরত আবু বকর সিদ্দীকের খেদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করলাম, হে আল্লাহর রসূলের খলীফা! আপনি মানুষের মনকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করুন এবং তাদের প্রতি নমনীয়তা প্রদর্শন করুন। তারা তো অসভ্য জাতি। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বললেন, আমি তোমার সহযোগিতা কামনা করতাম, কিন্তু তুমি আমার ভাবনার প্রাসাদ ধ্বংস করেছ। অন্ধকার যুগে তুমি বড়ই কার্যক্ষম বক্তি ছিলে। ইসলাম গ্রহণ করে তুমি অলস হয়ে গেছ। আমি তাদের মনকে কিভাবে আকৃষ্ট করব? আল্লাহ ক্ষমা করুন আমি কি তাদের জাদু করব? আফসোস, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইন্তেকাল করেছেন, ওহী বন্ধ হয়েছে। আল্লাহর কসম, যদি তারা একটি দড়ি দিতেও অস্বীকার করে, আমার হাতে তলোয়ার থাকা পর্যন্ত আমি তাদের সাথে যুদ্ধ করব, হযরত উমর (রা.) বলেন, আমি তাকে এ কাজে এত বেশি কঠোর হস্তে দেখেছি যে, তিনি এভাবেই মানুষকে সঠিক পথে এনেছেন।
আবুল কাসেম বাগবী এবং আবু বকর শাফেঈ স্বচিত ফাওয়ায়েদ গ্রন্থে এবং ইবনে আসাকির হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালে অপবিত্রতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। আরবের বৃহৎ অংশ মুরতাদ হয়ে যায়। আনসারগণ পৃথক হয়ে যান। পাহাড়ও এ সমস্যাগুলো বহন করতে পারত না। কিন্তু আমার পিতা আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বিস্ময়কর ধৈর্যের সাথে সমস্যাগুলোর মোকাবিলা করেছেন এবং মতভেদযুক্ত প্রতিটি মাসয়ালার সঠিক সমাধান দিয়েছেন। নবী করীম (সা.)-কে কোথায় সমাহিত করা হবে তা নিয়ে সর্বপ্রথম মতভেদ দেখা দেয়। সকলেই এ ব্যাপারে নীরব ছিলেন এবং কেউ কিছু জানতেন না। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বললেন, আমি নবী (সা.) কে বলতে শুনেছি, মৃত্যুর স্থানেই প্রত্যেক নবীকে সমাহিত করা হয়। দ্বিতীয়, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মিরাস নিয়ে মতভেদ দেখা দিলে আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বললেন, আমি নবী (সা.) কে বলতে শুনেছি, নবীদের কোনো উত্তরাধিকারী নেই। তাদের সকলের সম্পদ সদকা হিসেবে বিবেচতি।
উলামায়ে কেরাম বলেন, সর্বপ্রথম নবী (সা.)-এর দাফন নিয়ে মতভেদ হয়। কতিপয় সাহাবী বলেন, নবীর জন্মস্থান মক্কা শরীফে দাফন করা উচিত। কেউ বলেন, মসজিদে নব্বীতে; কেউ বলেন, জান্নাতুল বাকীতে, কেউ আবার বাইতুল মুকাদ্দাসের কথা বলেন, অবশেষে আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এ সম্বন্ধে যে অভিমত প্রকাশ করলেন, তা সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হলো।
ইবনে যানজুয়া বলেন, এটা হযরত আবু বকরের হাদীসই ছিল। কিন্তু সকলই মুহাজির ও আনসারকে তাঁর বিশাল জ্ঞানের প্রতি ঝুঁকিয়ে দেয়া প্রয়োজন ছিল।
বইহাকী এবং ইবনে আসাকির আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর কসম, আবু বকর খলীফা না হলে পৃথিবীতে কেউ ইবাদত করত না। তিনি এভাবে তিনবার বললেন। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, হে আবু হুরায়রা আপনি একথা বলছেন কেন? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) উসমা বিন যায়েদকে সাতশ' সৈন্যসহ রোমে প্রেরণ করেন। তিনি শুষ্ক সীমানা অতিক্রম না করতেই হুযূর (সা.) ইন্তেকাল করেন এবং মদীনার পার্শ্ববর্তী আরব জনগোষ্ঠী মুরতাদ হয়ে যায়। সাহাবাগণ হযরত আবু বকরের নিকট আরয করলেন, আপনি উসামা বাহিনীকে ফিরিয়ে নিন। কারণ মদীনার পার্শ্ববর্তী লোকেরা মুরতাদ হয়ে গেছে। এখন আর তার প্রয়োজন নেই। তিনি বললেন, এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর কসম, যদি আল্লাহর পয়গম্বরের বিবিদের পা নিয়ে কুকুরের দল টানা হেঁচড়া করে তবুও রাসূলুল্লাহ (সা.) যে বাহিনী প্রেরণ করেছেন তা আমি ফিরিয়ে নিবো না এবং তিনি যে পতাকা উড়িয়েছেন তা নামিয়ে নিব না। সুতরাং তিনি উসামা বাহিনীকে পুনঃপ্রেরণ করলেন। উসামা পথিমধ্যে যে গোত্রের মুখোমুখী হয়েছেন সকল গোত্রই বাধা দিয়েছে এবং পরাজিত হয়েছে। ফলে তারা পরস্পরে এ কথা বলেছে যে, যদি মুসলমানদের শক্তি না থাকত তবে এ মুহূর্তে তারা অন্য জাতির প্রতি সৈন্য প্রেরণ করত না অতএব দেখুন, রোমানদের মোকাবিলায় ফলাফল কি হয়েছিল। যখন এ বাহিনী রোম সাম্রাজ্যের সীমানায় প্রবেশ করে তখন উভয় দিক থেকে আক্রমণ হয় এবং মুসলিম বাহিনী বিজয় অর্জন করে নিরাপদে ফিরে এলে সকলেই ইসলামকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে।
হযরত উরওয়া (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) মুমূর্ষ অবস্থায় উসামা বাহিনীকে যাত্রা করার নির্দেশ দেন। হযরত উসামা জরফ নামক স্থানে পৌঁছিলে তাঁর স্ত্রী ফাতিমা বিনতে কায়েস লোক মারফত জানালেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) অন্তিম শয্যায় শায়িত, আপনি তাড়াহুড়া করবেন না। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকাল হলে হযরত উসামা হযরত আবু বকরের নিকট উপস্থিত হয়ে আরয করলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে রোম সাম্রাজ্যে গমনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন সংকটময় অবস্থা। আমার আশঙ্কা হচ্ছে আরবের লোকেরা মুরতাদ হয়ে যেতে পারে। যদি তারা মুরতাদ হয়ে যায় তবে সর্বপ্রথম আমি তাদের সাথে মুকাবিলা করতে প্রস্তুত আছি। আর যদি তারা মুরতাদ না হয় তবে আমি চলে যাব। আমার সাথে যে সব তরুণ সৈনিক এবং বড় বড় সরদারগণ ছিলেন তাদের আমি নিয়ে যাওয়ার অনুমতি চাইছি। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) লোকদের উদ্দেশ্য করে বললেন, আল্লাহর কসম, যদি আমার প্রাণ বিপন্ন হয় এবং হিংস্র পক্ষীকুল আমার শরীরের গোশত খেয়ে ফেলে তবুও আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আদেশ সামান্যতমও সংশোধন এবং পরিমার্জন করব না। এ বলে তিনি উসামা বাহিনী পুনঃপ্রেরণ করলেন। (ইবনে আসাকির)
যাহাবী বলেন, মদীনার চারিদিকে নবীজী (সা.)-এর ইন্তেকালের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে অনেক গোত্র ইসলাম ত্যাগ করে এবং যাকাত দিতে অস্বীকার করলে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) তাদের নিকট সৈন্য প্রেরণ করেন। কিন্তু হযরত উমর বাধা দেন। সিদ্দীকে আকবর (রা.) বলেন, আল্লাহর কসম, তারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট ছাগলের বাচ্চার যে যাকাত দিত তা এক বছরের জন্য দিতে অস্বীকার করলে আমি তাদের সাথে যুদ্ধ করব। উমর (রা.) বললেন, আপনি কিভাবে যুদ্ধ করবেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) যেখানে বলেছেন- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ না বলা পর্যন্ত আমি লোকদের সাথে যুদ্ধ করব এ কালেমা পাঠ করলে তার জান এবং মাল আমার জিম্মায়। কিন্তু যাকাত দিতে হবে, এর হিসাব আল্লাহর জিম্মায়। এবার বলুন কিভাবে যুদ্ধ হতে পারে? সিদ্দীকে আকবর বললেন, আল্লাহর কসম, নামায এবং যাকাতের মধ্যে পরিবর্তন করার জন্য আমি যুদ্ধ করব। কারণ যাকাত মালের হক এবং নবী করীম (সা.) বলেছেন, যাকাত আদায় করতে হবে। উমর (রা.) বলেন, আল্লাহর কসম, হযরত আবু বকরের বক্ষ খুলে দেয়া হয়েছিল। আমিও বুঝলাম তিনি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত।
হযরত উরওয়া রা. বলেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) মুহাজির এবং আনসারদের নিয়ে নজদের নিকটবর্তী হয়ে মুরতাদদের পরাজিত করলে কতিপয় মন্দ চরিত্রের লোকরা নিজেদের বিবি-বাচ্চা নিয়ে পালিয়ে যায়। ফলে লোকেরা তার নিকট আরয করল, আপনি ফিরে যান এবং সৈনিকদের মধ্যে একজনকে সেনাপতি বানিয়ে বাহিনী প্রেরণ করুন। লোকেরা এ ব্যাপারে জোরাজুরি করলে তিনি খালিদ বিন ওলীদকে সেনাপতি বানিয়ে ফিরে এলেন। আসার সময় বললেন, তারা ইসলামে ফিরে এলে এবং যাকাত দিতে সম্মত হলে তোমাদের মধ্যে যাদের ইচ্ছে মদীনায় ফিরে যেতে পারবে।
হযরত ইবনে উমর (রা.) বলেন, সিদ্দীকে আকবর ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে জিহাদে যাত্রার প্রাক্কালে হযরত আলী অশ্বের রজ্জু ধারণপূর্বক বললেন, আমি আপনাকে সে কথাই বলতে চাই যা নবী (সা.) উহুদ যুদ্ধে আপনাকে বলেছিলেন, অসি কোষবদ্ধ করুন, যাতে আকস্মিক কোনো ঘটনাই না ঘটে এবং আপনি মদীনায় ফিরে চলুন। আল্লাহর কসম, আল্লাহ না করুন যদি আপনার কিছু হয় তাহলে এখানে এমন কেউ নেই যিনি ইসলামের ব্যবস্থাপনা অক্ষুণ্ণ রাখবেন। (দারা কুতনী)
খানযালা বিন আলী লাইসী বলেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক যখন হযরত খালিদ বিন ওলীদকে বাহিনীর আমীর বানিয়ে প্রেরণ করেন তখন এ নসিহত করলেন যে, তাদেরেেক পাঁচটি আহকাম পালনের নির্দেশ দিবে। যদি একটি হুকুমও তারা অস্বীকার করে তবে তাদের সাথে এমনভাবে লড়াই করবে পাঁচটি আহকাম অস্বীকারকারীদের সাথে যেভাবে লড়াই করো। আর সেই পাঁচটি আহকাম হলো- ১. আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয় এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসূল। ২. নামায পড়তে হবে। ৩. যাকাত দিতে হবে। ৪. রোযা রাখতে হবে। ৫. বাইতুল্লাহ শরীফে এসে হজ্জ আদায় করতে হবে। হযরত খালিদ বিন ওলীদ তাঁর বাহিনী নিয়ে জমাদিউল আখের মাসে রওয়ানা করেন। বনী আসাদ এবং গাতফান গোত্রের সাথে তার যুদ্ধ হয়। অনেক মুরতাদ নিহত, অনেক বন্দী এবং বাকীরা আবার মুসলমান হয়। সাহাবীদের মধ্যে আকাশা বিন মুহসিন এবং সাবেত বিন আকরাম খালেদ বিন ওলিদ (রা.) এর সাথে ছিলেন। এ বছর রমযান মাসে নবী দুহিতা জান্নাত নেত্রী হযরত ফাতেমা (রা.) ইন্তেকাল করেন। যাহাবী বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বংশধারা হযরত ফাতেমা থেকেই সূচিত হয়।
যুবায়ের বিন বাকার বলেন হযরত ফাতেমার এক মাস পূর্বে হযরত উম্মে আয়মন ইন্তেকাল করেন এবং শাওয়াল মাসে আব্দুল্লাহ বিন আবু বকরের মৃত্যু হয়। যাহোক এ বছরের শেষ দিকে হযরত খালিদ তাঁর বাহিনী নিয়ে মুসায়লামা কাযযাবকে হত্যা করার জন্য ইয়ামামায় পৌঁছলে উভয় বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। অবশেষে কয়েকটি দুর্গ বিজিত হওয়ার পর হযরত হামযা (রা.)-এর হত্যাকারী ওয়াহশী মুসায়লামাকে হত্যা করেন। এ ঘটনায় যারা শহীদ হন তারা হলেন আবু হুযাইফা বিন উতবা, আবু হুযাইফার গোলাম সালিম, শুজা বিন ওহাব, যায়েদ বিন খাত্তাব, আব্দুল্লাহ বিন সহল, মালিক বিন আমর, তোফায়েল বিন আমর দৌসী, ইয়াযিদ বিন কায়েস, আমের বিন বাকার, আব্দুল্লাহ বিন মুহরেমা, সায়িব বিন উসমান বিন মাজউন, উবাদা বিন বশর, মাআন বিন আদী, সাবিত বিন কায়েস বিন শামাস, আবু দোজানা, সামাক বিন হরব প্রমুখ।
মুসায়ালামা কাযযাবের বয়স হয়েছিল দেড় শত বছর। নবী করীম (সা.)-এর সম্মানিত পিতা আব্দুল্লাহ চেয়েও বয়সে বড় ছিল।
দ্বাদশ হিজরীতে আবু বকর সিদ্দীক (রা.) আলা-বিন হাযরামীকে বাহরাইনে পাঠান। সেখানেও লোকেরা ধর্ম ত্যাগ করেছিল। জাওয়াছী নামক স্থানে লড়াই হয়। মুসলমানরা বিজয় অর্জন করেন। ওমানেও এ ফেতনা মাথাচাড়া দেয়ার কারণে ইকরামা বিন আবু জাহেলকে তাদের দমনের জন্য পাঠানো হয়। আবু উমাইয়াকে মুহাজিরদের দলপতি করে বাহীরে এ ফেতনা দমনের জন্য প্রেরণ করা হয়। যিয়াদ বিন লাবীদ আনসারীকে একদল ধর্মত্যাগীকে শায়েস্ত করার জন্য আরেক দিকে পাঠানো হয়। এ বছর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জামাতা আবুল আস বিন রবীআ ইন্তেকাল করেন। সআব বিন জিছামা লাইছী এবং আবু মুরছাদ গুনুভীও এ বছর পরলোকগমন করেন।
মুরতাদদের ফেতনা দমনের পর হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) হযরত খালিদ বিন ওলীদকে বসরায় প্রেরণ করেন এবং লড়াই করে আয়লা শহর বিজিত করেন। অতঃপর কিছু সন্ধি কিছু যুদ্ধ করে ইরাকের মাদায়েন শহর দখল হয়। দ্বাদশ হিজরীতে বাইতুল্লাহ যিয়ারত থেকে ফিরে এসে আমর বিন আসকে শামে প্রেরণ করেন। শামে তেরো হিজরীতে যুদ্ধ হয় এবং বিজয়ের মুকুট মুসলমানদের মাথায় প্রতিস্থাপিত হয়। কিন্তু হযরত আবু বকর (রা.)-এর নিকট যখন এ সুসংবাদ পৌঁছে তখন তিনি মৃত্যু পথযাত্রী। এ যুদ্ধে ইকরামা বিন আবু জাহেল এবং হিমাম বিন আসসহ অন্যান্য সাহাবী অংশগ্রহণ করেন। এ বছর মরজুস সফর যুদ্ধ হয় এবং এ যুদ্ধে মুশরিকরা পরাজিত হয়। এ ঘটনায় অন্যান্যদের সাথে ফজল বিন আব্বাস (রা.) শহীদ হন।
📄 কুরআন একত্রিত করার বিবরণ
সহীহ বুখারী শরীফে হযরত যায়েদ বিন সাবেত (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুসায়লামা কায্যাবের সাথে যুদ্ধের পর হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি এসে দেখলাম তাঁর নিকট হযরত উমর (রা.) নীরবে বসে আছেন। হযরত আবু বকর আমাকে বললেন, উমর আমাকে বলেছেন, ইয়ামামার যুদ্ধে অনেক মুসলমান কারী শহীদ হয়েছেন। আমার ভয় হয় যদি এভাবে মুসলিম কারীগণ শহীদ হতে থাকেন তাহলে হাফেজদের সাথে কুরআন শরীফও উঠে যাবে। অতএব আমি কুরআনকে একত্রিত করতে চাই। আমি বললাম, আমি এ কাজ কিভাবে করতে পারি যা নবী করীম (সা.) স্বয়ং করেননি। হযরত উমর (রা.) বললেন, আল্লাহর কসম, এটা পুণ্যের কাজ, এতে কোনোই ক্ষতি নেই। তিনি বারবার অনমনীয়ভাবে একথা বলেছিলেন, অবশেষে বিষয়টি ভালোভাবে আমর বুঝে আসলো।
হযরত যায়েদ (রা.) বলেন, হযরত উমর (রা.) নীরবে শুনছিলেন। হযরত আবু বকর (রা.) আবার আমাকে বললেন, তুমি তরুণ এবং বুদ্ধিমান। তোমার ব্যাপারে কোনো অভিযোগও নেই। তুমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওহী লেখক। সুতরাং অনুসন্ধান করে তুমি কুরআন জমা করো।
হযরত যায়েদ (রা.) বলেন, এ কাজটি আমার নিকট অত্যন্ত দুঃসাধ্য মনে হলো। আমাকে যদি পর্বত উত্তোলনের নির্দেশ দেয়া হতো তাহলে আমি একে তার চেয়ে হালকা মনে করতাম। আমি আরয করলাম, আপনারা দু'জন কেন এ কাজ করতে চাইছেন, যা রাসূলুল্লাহ (সা.) করেননি। হযরত আবু বকর (রা.) বললেন, এ কাজে কোনোই ক্ষতি নেই। কিন্তু আমি দ্বিধান্বিত হয়ে পড়লাম এবং আমি নিজেকে এ কাজের অনুপযোক্ত মনে করলাম। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা আমার অন্তর চক্ষু খুলে দিলেন এবং বিষয়টি অত্যন্ত সুন্দরভাবে অনুধাবন করলাম। আমি অনুসন্ধান শুরু করলাম এবং কাগজের টুকরো, উট এবং ছাগলের রানের হাড়, গাছের পাতা, হাফেজদের মুখস্থ জ্ঞান থেকে কুরআন সংগ্রহ করে জমা করলাম।
আর সূরা তওবার দু'টি আয়াত- 'লাকাদ জাআকুম রাসুলুম মিন আনফুসিকুম' হযরত খুযাইমা বিন সাবেত (রা.) ছাড়া অন্য কারো নিকট পাইনি। কুরআন জমা করে আমি তা হযরত আবু বকরের খেদমতে পেশ করলাম, যা মৃত্যু অবধি তাঁর কাছেই ছিল। অতঃপর তা হযরত উমরের হস্তগত হয়। তাঁর মৃত্যুর পর হযরত হাফসা বিনতে উমর (রা.) তা সংরক্ষণ করেন। আবু ইয়ালা হযরত আলীর বরাত দিয়ে বলেন, কুরআন শরীফ জমা করার সবচেয়ে বেশি সওয়াব হযরত আবু বকর সিদ্দীকের প্রাপ্য। কারণ তিনি সেই ব্যক্তি যিনি সর্বপ্রথম কুরআন শরীফকে গ্রন্থাকারে রূপ দেন।
📄 সর্বপ্রথম তিনি যা করেছেন
হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি সর্বপ্রথম কুরআন জমা করেছেন এবং কুরআনকে মাসহাফ নাম দিয়েছিলেন। তাঁকে সর্বপ্রথম খলীফা বলা হয়েছে।
আহমদ আবু বকর বিন আবু মালিকা থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকরকে আল্লাহর খলীফা বলা হলে তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূলের খলীফা। আমি এতেই সন্তুষ্ট এবং এই আমার অহংকার। তিনি সর্বপ্রথম খলিফা যিনি তাঁর পিতার জীবদ্দশায় খলীফা হন। তিনিই সর্বপ্রথম খলীফা যাঁর প্রজারা তাঁর জন্য ভাতা নির্ধারণ করেছিল।
বুখারী শরীফে হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, আমার সম্প্রদায় অবগত যে, আমার উপার্জন আমার পরিবারের খরচ যোগাতে সমর্থ নয়। আবার আমি খিলাফতের কাজ নিয়ে ব্যস্ত, ফলে আমার কোনো উপার্জন নেই। সুতরাং আমার পরিবারকে আমি বাইতুল মাল থেকে খাদ্য দিব।
ইবনে সাদ আতা বিন সায়েব থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর (রা.) বাইআতের দ্বিতীয় দিবসে কিছু চাদর নিয়ে বাজারে যাচ্ছিলেন। হযরত উমর (রা.) আরয করলেন, কোথায় চলেছেন? তিনি বললেন, বাজারে। হযরত উমর (রা.) বললেন, আপনি এগুলোর (ব্যবসা) ছেড়ে দিন। আপনি জনগণের খলীফা। তিনি বললেন, আমার পরিবার কি খাবে? হযরত উমর (রা.) বললেন, আপনি চলুন, আপনার জন্য আবু উবায়দা (ভাতা) নির্ধারণ করবেন। তাঁরা হযরত আবু উবায়দার নিকট গমন করে বললেন, আমরা আপনার নিকট হযরত আবু বকর (রা.) ও তাঁর পরিবার-পরিজনের জন্যে একজন মধ্যম মানের মুহাজিরের খোরাকী নির্ধারণ করে নিত্যদিনের খোরাকী এবং শীত ও গ্রীষ্মকালীন পোশাক নির্ধারণ করুন। কিন্তু যখন এগুলো পুরাতন হয়ে যাবে তখন এগুলোর পরিবর্তে নতুন কাপড় নিয়ে নিবে। তিনি হযরত আবু বকরের জন্য প্রতিদিনকার খাবার হিসেবে অর্ধেক ছাগলের গোস্ত শরীর ঢাকা উপযোগী কাপড় এবং পেট ভর্তি রুটি নির্ধারণ করলেন।
ইবনে সাদ মাইমুন থেকে রেওয়ায়েত করেন, হযরত আবু বকর খলীফা নির্বাচিত হওয়ার সময় তাঁর জন্য বার্ষিক দু'হাজার দিরহাম ভাতা নির্ধারণ করা হয়। ফলে তিনি বলেন, আমার পারিবারিক পরিসর বৃহৎ। এতে আমার চলবে না। তোমাদের প্রদত্ত খিলাফতের দায়িত্ব আমাকে ব্যবসা করতে বাধা দিচ্ছে- কিছু বাড়িয়ে দাও। ফলে পাঁচশ দিরহাম বৃদ্ধি করা হলো।
তাবারানী স্বরচিত মুসনাদ গ্রন্থে হাসান বিন আলী বিন আবু তালিব (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর মৃত্যুর সময় আয়েশা সিদ্দীকাকে বলেন, যতক্ষণ মুসলমানদের কাজ করব যে উটনীর দুধ আমি পান করি, যে পেয়ালা এবং চাদর আমি ব্যবহার করি তা আমার জন্য বৈধ। আমার মৃত্যুর পর সেগুলো উমরকে দিয়ে দিবে। কারণ সেগুলো বাইতুল মাল থেকে নেয়া হয়েছে। তার মৃত্যুর সময় সেগুলো হযরত আয়েশা (রা.) হযরত উমরের নিকট পাঠিয়ে দেন। হযরত উমর (রা.) বলেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আবু বকরের প্রতি রহম করুন। তিনি তাঁর এ সকল কষ্ট আমার কারণে সহ্য করেছেন।
ইবনে আবিদ দুনিয়ার আবু বিন হাফস থেকে বর্ণনা করেন, মৃত্যুর সময় হযরত আবু বকর (রা.) আয়েশা সিদ্দীকাকে বলেন, হে আমার কন্যা! যদিও আমি মুসলমানদের খলীফা ছিলাম, কিন্তু আমি কখনই অর্থ-সম্পদ অর্জন করিনি। খুব সাধারণভাবে খানা-পিনা করেছি। হাবশী গোলাম, উটনী এবং পুরাতন চাদর ছাড়া বাইতুল মাল থেকে আমি আর কিছু গ্রহণ করিনি। আমার মৃত্যুর পর এগুলো উমরের নিকট পাঠিয়ে দিও।
তিনি সর্বপ্রথম বাইতুল মাল প্রতিষ্ঠিত করেন। ইবনে সাদ সহল বিন আবী খাইছামা থেকে বর্ণনা করেন, সিদ্দীকে আকবরের যুগে বাইতুল মালে কোনো পাহারাদার ছিল না। লোকেরা বলল, আপনি বাইতুল মালে কেন পাহারাদার নিয়োগ করেননি? তিনি বলনে, তালা লাগিয়ে রাখার পরও পাহারাদারের প্রয়োজন কি? বস্তুত বাইতুল মালে কিছু এলেই তা মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়া হতো এবং বাইতুল মাল শূন্য হয়ে থাকত। এক বছর পর বাইতুল মাল হযরত আবু বকর তার বাড়িতে স্থানান্তরিত করে নিয়ে যান। যখনই মাল আসত তিনি তা গরীবদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন এবং কখনও উট, ঘোড়া, অস্ত্র কিনে আল্লাহর রাস্তায় দিয়ে দিতেন। একবার তিনি চাদর কিনে মদীনায় বিধবাদের মধ্যে বিতরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে সমাহিত করে হযরত উমর কয়েকজন সম্মানিত সাহাবী যাঁদের মধ্যে আব্দুর রহমান বিন আউফ এবং উসমান বিন আফফান ছিলেন। তাঁদের নিয়ে হিসাব পরীক্ষা করার জন্য বাইতুল মালে গিয়ে দেখেন আল্লাহর নাম ছাড়া সেখানে আর কিছু নেই।
গ্রন্থকার বলেন, উক্ত রেওয়ায়েত দ্বারা রাওয়েলে আসকারীদের মতামত খণ্ডিত হয়েছে। তাদের মতে বাইতুল মালের প্রতিষ্ঠাতা হযরত উমর (রা.) তাদের এ অভিমতটি আমি তাদের এক গ্রন্থে দেখেছি। তাদের আরেক রচনায় আমি এও দেখেছি যে, হযরত আবু বকরের বাইতুল মালের সর্বপ্রথম রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করেন হযরত আবু উবায়দা। হাকেম বলেন, হযরত আবু বকর ইসলামের প্রাথমিক যুগে আতীক উপাধিতে প্রসিদ্ধ ছিলেন।
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
বুখারী এবং মুসলিম শরীফে জাবের (রা.) বর্ণিত, নবী (সা.) ইরশাদ করেন, যদি বাহরাইন থেকে মালে গনীমত আসে তবে আমি তোমাকে এই এই দিব। তাঁর ইন্তেকালের পর বাহরাইন থেকে মালে গনীমত এলে সিদ্দীকে আকবর ঘোষণা দিলেন যে, এমন কেউ আছ যে নবীজীর কাছে কিছু পাবে, অথবা তিনি তোমাদের কাউকে কিছু দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন? আমি উপস্থিত হলাম। তিনি বললেন, এখান থেকে গ্রহণ করো। আমি গ্রহণ করলাম, যা গণনা করে পাঁচশত মুদ্রা হলো, কিন্তু তিনি আমাকে দেড় হাজার মুদ্রা দিলেন।
📄 দয়া ও নম্রতা
ইবনে আসাকির উনাইসা থেকে রেওয়ায়েত করেন। তিনি বলেন, হযরত আবু বকর খিলাফতের পূর্বে তিন বছর এবং খিলাফতের পর এক বছর আমার সঙ্গে ছিলেন। যখন পাড়ার মেয়েরা ছাগল নিয়ে আসতেন তখন তিনি দুধ দোহন করে দিতেন।
হযরত মাইমুনা (রা.) বলেন, হযরত আবু বকরের নিকট জনৈক ব্যক্তি এসে বলল, হে আল্লাহর রসূলের খলীফা, আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। তিনি বললেন, সকল মুসলমানের প্রতিও। (আহমদ)
ইবনে আসাকির আবু সালিম গিফারী থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উমর (রা.) জনৈক পঙ্গু ও অন্ধ বৃদ্ধার সেবা করতেন। সে মদীনার পার্শ্বে বসবাস করত। তিনি তাঁকে খাওয়াতেন। একদা তিনি তাঁর কাছে গেলে বৃদ্ধা বলল, আপনি আসার পূর্বে কে যেন এসে প্রতিদিন আমার সেবা করে যান। তিনি আশ্চর্য হন। ইত্যবসরে হযরত আবু বকর বেরিয়ে আসেন। সে সময় তিনি খলীফা। তাঁকে দেখে হযরত উমর বললেন, আল্লাহর কসম, আপনি ছাড়া সেই ব্যক্তি কেউ হতে পারেন না।
আবু নুয়াঈম প্রমুখ আব্দুর রহমান আসবাহানী থেকে বর্ণনা করেন, একদা হযরত আবু বকর মিম্বরে আরোহণ করেছিলেন। ইত্যবসরে ইমাম হাসান বিন আলী এসে পড়লেন। সে সময় তিনি কিশোর। বললেন, এ মিম্বর আমার বাবার, আপনি নেমে যান। তিনি বললেন, তুমি সত্য বলেছ, এ মিম্বর তোমার বাবার। এই বলে তিনি তাঁকে কোলে তুলে নিলেন এবং ডুকরে কেঁদে উঠলেন। হযরত আলী (রা.) বলেন, আল্লাহর কসম, আমি এ সম্বন্ধে তাকে কিছুই বলিনি। তিনি বললেন, তুমি সত্যই বলেছ, আমি তোমাকে সন্দেহ করছি না।
সপ্তম পরিচ্ছেদ
ইবনে সাদ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, ইসলামে সর্বপ্রথম যে হজ্জ অনুষ্ঠিত হয় নবী করীম (সা.) সেখানে হযরত আবু বকরকে পাঠিয়েছিলেন। এরপরের বছর নবী করীম (সা.) হজ্জ করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) খলীফা হলে তিনি সর্বপ্রথম হযরত উমরকে হজ্জ করার জন্য প্রেরণ করেন। অতঃপর তিনি হজ্জ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর হযরত উমর (রা.) খলীফা হলে তিনি সর্বপ্রথম আব্দুর রহমান বিন আউফকে হজ্জের জন্য প্রেরণ করেন। আর হযরত উমর (রা.) পরের বছর থেকে মৃত্যু অবধি প্রতিবার হজ্জ করেছেন। হযরত উসমান খলীফা হয়েও তিনি সর্বপ্রথম আব্দুর রহমান বিন আউফকেই হজ্জ করার জন্য পাঠান।