📄 আবু বকর (রা.)-এর শানে সাহাবা এবং সলফে সালেহীনদের অভিমত
জাবের (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, হযরত উমর ফারুক (রা.) বলেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) আমাদের সর্দার। (বুখারী শরীফ)।
বাইহাকী শোআবুল ঈমান গ্রন্থে হযরত উমরের অভিমত নকল করেছেন, যদি হযরত আবু বকরের ঈমান কে এক পাল্লায় আর পৃথিবীবাসীর ঈমান আরেক পাল্লায় তুলে দেয়া হয় তবে আবু বকরের ঈমানের পাল্লা বেশি ভারী হবে।
ইবনে আবী হাইছামা এবং আব্দুল্লাহ বিন আহমদ যাওয়াইদুয যুহদ গ্রন্থে বর্ণনা করেন, হযরত উমর (রা.) বলেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) প্রত্যেকটি অভিমতই শ্রেষ্ঠ এবং সর্বোত্তম।
হযরত উমর ফারুক (রা.) বলেন, হায়, আমি যদি হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর বুকের একটি পশম হতাম! এ হাদীসটি মিসদাদ স্বরচিত মুসনাদ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।
হযরত উমর ফারুক (রা.) বলেন, আমার একান্ত ইচ্ছা হলো, হযরত আবু বকর (রা.) এর জন্য যেরূপ জান্নাত নির্ধারিত তদ্রূপ জান্নাত যেন আমি প্রাপ্ত হই। (ইবনে আসাকির, ইবনে আবিদ দুনিয়া)।
হযরত উমর ফারুক (রা.) আরো বলেন, আবু বকর (রা.)-এর শরীর মেস্কের চেয়েও অধিক সুগন্ধ। (আবু নুয়াঈম)
ইবনে আসাকির হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, একদিন হযরত আলী হযরত আবু বকরর পার্শ্ব অতিক্রম করছিলেন। সে সময় হযরত আবু বকর (রা.) একখণ্ড কাপড় পরে বসেছিলেন। তিনি হযরত আবু বকরকে দেখে বললেন, কোনো নেক্কার ব্যক্তি আল্লাহর নিকট আমার মতে এ কাপড় পরিধানকারী ব্যক্তি চেয়ে তিনি বেশি প্রিয় নন।
ইবনে আসাকির আব্দুর রহমান বিন আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আমাকে কয়েকবার উমর বিন খাত্তাব বলেছেন, আবু বকর সিদ্দীক আমার চেয়ে প্রত্যেক কাজে অগ্রগামী।
তাবারানী আওসাত গ্রন্থে বর্ণনা করেন, হযরত আলী (রা.) বলেন, পবিত্র সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, আমি নেক কাজে অগ্রগামী হয়ে দেখেছি সে কাজে হযরত আবু বকর আমার চেয়েও অগ্রগামী।
তাবারানী আওসাত গ্রন্থে হযরত আলী (রা.)-এর অভিমত বিধৃত রয়েছে। (হযরত আলী (রা.) বলেন) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পর হযরত আবু বকর এবং হযরত উমরই আমার নিকট প্রিয়। কোনো মুমিনের অন্তরে আমার প্রতি ভালোবাসা এবং আবু বকর ও উমরের প্রতি বিদ্বেষ ভাবাপন্নতা একত্রে জমা হবে না।
আবু আমর (রা.) বলেন, কুরাইশদের মধ্যে তিনজন ব্যক্তি ছিলেন যারা দৃশ্যত এবং চরিত্রগতভাবে অসাধারণ এবং বিস্ময়কর সাদা মনের মানুষ। যদি তারা তোমাকে কিছু বলেন তবে সত্য বলবেন। আর তুমি যদি তাকে কিছু বল তবে তারা তা সত্য বলে বিশ্বাস করবেন। তারা হলেন, আবু বকর সিদ্দীক (রা.), আবু উবায়দা বিন জাররা (রা.) এবং উসমান বিন আফফান (রা.)। ইবনে সাদ ইবরাহীম নখয়ী কর্তৃক বর্ণিত, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর উপাধি তাঁর দয়ার্দ্রতার কারণে দেয়া হয়েছে।
ইবনে আসাকির রবী'আ বিন আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এমন এক পানির ফোঁটা যেখানে পড়বে সেটাই মহিমান্বিত হবে।
রবীতা বিন আনাস থেকে ইবনে আসাকির বর্ণনা করেন, আমি আবু বকর সিদ্দীকের মত পূর্ববর্তী নবীদের কোনো সাহাবীকে পাইনি।
যোহরী বলেন, আবু বকর সিদ্দীকের মর্যাদার মধ্যে এটিও একটি যে, তিনি আল্লাহ তা'আলার ব্যাপারে কোনই সন্দেহ করতেন না। (ইবনে আসাকির)
যুবায়ের বিন বাকার বলেন, আমি আলেমদের নিকট থেকে শুনেছি যে, নবী করীম (সা.)-এর খতীব আবু বকর এবং আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুমা। আবু হুসাইন বর্ণনা করেন, আদম সন্তানদের মধ্যে নবী রাসূলের পর কোনো ব্যক্তি আবু বকরের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মৃত্যুর পর মুরতাদদের প্রতি সৈন্য পাঠিয়ে হযরত আবু বকর এক নবীওয়ালা কাজ করেছেন।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
দাইনূরী স্বরচিত মাজালিসাত গ্রন্থে এবং ইবনে আসাকির শা'বী থেকে বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা আবু বকরকে এমন চারটি গুণ দান করেছিলেন যা আজ পর্যন্ত কাউকে দেয়া হয়নি। এক. তিনি সিদ্দীক। দুই. তিনি গুহায় নবীর সাথী। তিন. হিজরতের সময় নবীজীর সাথে ছিলেন এবং চার রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে ইমাম এবং বাকী সকল মুসলমানকে মুকতাদী হওয়ার নির্দেশ দেন।
মাসাহাফ গ্রন্থে ইবনে আবু দাউদ লিখেছেন, হযরত আবু জাফর বলেন, হযরত আবু বকর (রা.) রসূলুল্লাহ (সা.) এবং হযরত জিবরাঈলের কথা শুনতে পেতেন, কিন্তু জিবরাঈলকে দেখতে পেতেন না।
ইবনে মুসায়্যাব বলেন, হযরত আবু বকর নবী (সা.)-এর বিশেষ মন্ত্রী ছিলেন। নবী করীম (সা.) প্রত্যেকটি বিষয়ে তাঁর সাথে পরামর্শ করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইসলামের মধ্যে, গুহায়, বদর যুদ্দের ছাউনির নিচে, এমনকি কবরেও আবু বকর ছাড়া অন্য কাউকে প্রাধান্য দেননি।
📄 হাদীস, আয়াত এবং ইমামদের অভিমতে আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতের প্রতি ইশারা
তিরমিযী এবং হাকেম হযরত হুযাইফা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমার পর আবু বকর এবং উমরের অনুসরণ করবে। এ হাদীসটি তাবারানী আবুদ্দারদা থেকে এবং হাকেম ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন।
আবুল কাসেম বাগাবী আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি, আমার পর বারোজন খলীফা হবেন এবং আবু বকর সিদ্দীক আমার পর সামান্য জীবিত থাকবেন। এ হাদীসের প্রথমাংশের ব্যাপারে সকল মুহাদ্দিসই একমত। এটি কয়েক পদ্ধতিতে বর্ণিত হয়েছে, এ সম্বন্ধে আমি অন্য ব্যাখ্যা গ্রন্থে আলোচনা করেছি।
বুখারী এবং মুসলিম শরীফের এ হাদীস যা আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) মৃত্যুর আগে বক্তৃতায় বলেছিলেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁর এক বান্দাকে অবকাশ দিয়েছেন....! সেই বক্তৃতায় তিনি আরো বলেছিলেন, সব দরজাই বন্ধ হয়ে যাবে, কিন্তু আবু বকরের দরজা খোলা থাকবে।
এক রেওয়ায়েতে রয়েছে, আবু বকরের জানালা ছাড়া মসজিদের সকল জানালা বন্ধ থাকবে। ওলামায়ে কেরাম লিখেছেন, এর দ্বারা হযরত আবু বকরের খিলাফতের প্রতি ইশারা করা হয়েছে। কারণ তিনি এ পথেই মসজিদে নামায পড়ানোর জন্য আসতেন।
হযরত আনাস (রা.) বলেন, (রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন) আবু বকরের দরজা ছাড়া সকল দরজা বন্ধ করে দাও। এ হাদীসটি ইবনে আদী, ইমাম তিরমিযী হযরত আয়েশা সিদ্দীকা থেকে, যাওয়াইদুল মুসনাদ গ্রন্থে ইবনে আব্বাস থেকে, তাবারানী মুআবিয়া বিন আবু সুফিয়ান (রা.) থেকে এবং বায্যার আনাস (রা.) থেকে রেওয়ায়েত করেছেন। সহীহ বুখারী এবং সহীহ মুসলিম শরীফে জুবায়ের বিন মুতঈম থেকে বর্ণনা করেন, একদিন জনৈক মহিলা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমতে উপস্থিত হলো। তিনি (সা.) তাকে পুনরায় আসতে বললেন। সে আরয করল, আমি আবার এলে হযরতকে পাব না, অর্থাৎ তিনি ইন্তেকাল করবেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তবে আবু বকর সিদ্দীকের কাছে এসো।
হযরত আনাস (রা.) বলেন, আপনার পর আমরা কার কাছে সদকা দিব এ বার্তা দিয়ে বনূ মুস্তালিকের লোকেরা আমাকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে পাঠালে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, আবু বকরের নিকট। (হাকিম)
ইবনে আসাকির ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে জনৈক মহিলা এসে কিছু জানতে চাইলে তিনি তাকে পরে আসতে বললেন। সে বলল, আমি এসে যদি আপনাকে না পাই এবং আপনার মৃত্যু হয়ে যায়। নবী করীম (সা.) বললেন, তুমি এসে আমাকে না পেলে আবু বকরের নিকট গমন করবে। কারণ আমার পর তিনি খলীফা হবেন।
হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, মৃত্যুর সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, হে আয়েশা! তোমার পিতা এবং তোমার ভাইকে আমার নিকট আসতে বল। আমি তাদের দলিল লিখে দিতে চাই। কারণ আমার আশঙ্কা হয় যে, আমার পর কোনো আশান্বিত ব্যক্তি খিলাফতের জন্য দাঁড়িয়ে যেতে পারে এবং বলতে পারে আমি খিলাফতের উপযুক্ত। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা এবং মুমিনগণ আবু বকরকে ছাড়া মেনে নিবে না। (মুসিলম)
এহাদীসটি আহমদ ভিন্ন পদ্ধতিতে বর্ণনা করেছেন। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) মৃত্যুর সময় আমাকে বললেন, তোমার ভাই আব্দুর রহমানকে ডেকে আনো, আমি আবু বকরের জন্য একটি দলিল লিখে দিব, যাতে লোকেরা মতভেদ করতে না পারে। অতঃপর নিজেই বললেন, তাকে লাগবে না। আল্লাহ আবু বকরের ব্যাপারে মুসলমানদের মধ্যে মতানৈক্য রাখবেন না।
মুসলিম শরীফে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) থেকে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি হযরত আয়েশাকে জিজ্ঞেস করল, নবী (সা.) যদি খলীফা নির্ধারণ করতেন তবে কাকে বানাতেন? তিনি বললেন, আবু বকরকে। সে বলল, তাঁর পর? তিনি বললেন, উমর ফারুক। সে বলল, তাঁর পর? তিনি বললেন, আবু উবায়দা বিন জাররাহ।
সহীহ বুখারী এবং সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত আবু মূসা আশাআরী (রা.) থেকে বর্ণিত নবী করীম (সা.) মুমূর্ষ অবস্থায় বলেন, হে জনতা! তোমরা আবু বকরের কাছে যাও, তিনি তোমাদের নামায পড়াবেন। হযরত আয়েশা (রা.) আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আবু বকর অত্যন্ত নরম মনের মানুষ। তিনি আপনার স্থানে জায়নামাযে দাঁড়ালে নামায পড়াতে পারবেন না। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তাকেই নামায পড়াতে বল। হযরত আয়েশা আবার একই আবেদন করলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, আবু বকরকেই বল, তিনি যেন নামায পড়ান। তুমি তো হযরত ইউসুফ (আ.)-এর যুগের নবীর মতো। এরপর লোকেরা আবু বকরের নিকট এলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় লোকদের নামায পড়ান। এ হাদীসটি মুতাওয়াতির। এটি হযরত আয়েশা, ইবনে মাসউদ, ইবনে আব্বাস, ইবনে উমর, আব্দুল্লাহ বিন যামআ, আলী বিন আবু তালিব এবং হাফসা রাযিআল্লাহু আনহুম পৃথকভাবে রেওয়ায়েত করেছেন। এঁদের পদ্ধতিও হাদীসে মুতাওয়াতির পদ্ধতির অনুরূপ।
আরেকভাবে হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, আমি এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এ জন্যই জেদ করেছিলাম যে, আমার অন্তর সাক্ষ্য দিচ্ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর স্থলাভিষিক্তকে মানুষ ভালোবাসবে না। কারণ আমি বুঝে ছিলাম যিনি রসূলের স্থলবর্তী হবেন লোকেরা তাঁকে হতভাগা মনে করবে। এজন্য আমি চাইছিলাম যেন রাসূলুল্লাহ (সা.) আবু বকরকে ছাড়া নামায পড়ানোর নির্দেশ দেন।
ইবনে যামআ (রা.) বলেন যে সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) লোকদের নামায পড়ার নির্দেশ দিচ্ছেলেন তখনো আবু বকর (রা.) আসেননি। এজন্য হযরত উমর এগিয়ে আসেন। কিন্তু নবী করীম (সা.) বললেন, না না না (তিনবার) আবু বকরই নামায পড়াবেন।
ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে, হযরত উমর (রা.) তাকবীরে তাহরীমা বললে নবী আকরাম (সা.) রাগান্বিত হয়ে মাথা তুলে বললেন, আবু কুহাফার ছেলে কোথায়? এ হাদীসের ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামদের অভিমত হলো, এটি সুস্পষ্ট দলিল যে, আবু বকর সিদ্দীক (রা.) সকল সাহাবার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম। তিনি সবচেয়ে বেশি খিলাফতের হকদার এবং ইমামতের যোগ্য।
ইমাম আশআরী বলেন, এটা প্রকাশ্য যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) আবু বকর সিদ্দীককে লোকদের নামায পড়াতে নির্দেশ করেন। সেখানে মুহাজির এবং আনসার সাহাবীগণ উপস্থিত ছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী তিনিই ইমামতি করবেন কুরআনের জ্ঞান যার সবচেয়ে বেশি। সুতরাং এ হাদীসের আবেদন হলো, হযরত আবু বকর গোটা উম্মত থেকে কুরআনের জ্ঞান বেশি রাখতেন। স্বয়ং সাহাবায়ে কেরাম রিদওয়ানুল্লাহি তা'আলা আলাইহিম আজমাঈনও উক্ত হাদীস দ্বারা এ ফলাফল বের করেছেন যে, আবু বকর সিদ্দীকই খিলাফতের বেশি হকদার ছিলেন। (যারা ফলাফল বের করেছেন) তাঁদের মধ্যে উমর (রা.) এবং আলী (রা.) অন্যতম।
ইবনে আসাকির হযরত আলী (রা.)-এর বর্ণনা নকল করেছেন, যখন নবী (সা.) হযরত আবু বকরকে নামায পড়ানোর নির্দেশ দিচ্ছিলেন তখন আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম, অসুস্থ ছিলাম না, আমার জ্ঞান ও চৈতন্য ছিল। অতঃপর আমরা নিজেদের দুনিয়ার জন্য তাঁর প্রতি রাযী হলাম, যাঁর প্রতি নবী করীম (সা.) আমাদের দ্বীনের জন্য রাযী হয়েছিলেন।
ওলামায়ে কেরাম বলেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) নবী (করীম) (সা.)-এর যুগেই ইমামতি করেন এবং পরামর্শদাতা হন। আহমদ এবং আবু দাউদ সহল বিন সাদ থেকে বর্ণনা করেন, একবার বনূ বিন আউফ গোত্রে বিবাদ ও কলহ দেখা দিলে সংবাদ পেয়ে হুযূর (সা.) যোহরের পর মিমাংসার জন্য সেখানে যান এবং যাবার সময় বলেন, হে বিলাল! নামাযের সময় হলে এবং আমি না ফিরলে আবু বকরকে নামায পড়াতে বলবে। সুতরাং যখন আসরের সময় হলো হযরত বিলাল (রা.) ইকামত দিলেন এবং তাঁর কথায় হযরত আবু বকর (রা.) নামায পড়ান।
আবু বকর শাফেঈ গীলানিয়াত গ্রন্থে এবং ইবনে আসাকির হযরত হাফসা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি অসুস্থ থাকাবস্থায় কি আবু বকরকে ইমাম বানিয়ে ছিলেন? তিনি জবাব দিলেন, না; বরং আল্লাহই তাঁকে ইমাম বানিয়েছেন।
দারা কুতনী ইফরাদ গ্রন্থে, খতীব এবং ইবনে আসাকির হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহর দরবারে তোমার ব্যাপারে তিনবার প্রশ্ন করেছি যে, তোমাকে ইমাম বানাব। কিন্তু সেখান থেকে তা প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং আবু বকর ইমামতির নির্দেশপ্রাপ্ত হন।
হযরত হাসান (রা.) থেকে ইবনে সাদ বর্ণনা করেন, আবু বকর সিদ্দীক রা. আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি স্বপ্নে নিজেকে অধিকাংশ লোকের আবর্জনা অতিক্রম করতে দেখেছি। হুযুর (সা.) বললেন, তুমি অবশ্যই লোকদের কাজ করার সুযোগ পাবে। তিনি আরয করলেন, আমি আমার বক্ষে দু'টি চিহ্ন দেখেছি। হুযুর (সা.) বললেন, তোমার খিলাফতের সময় দু'বছর।
ইবনে আসাকির বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর (রা.) বলেন, আমি একদিন উমর ফারুকের নিকট গেলাম। সে সময় তাঁর নিকট কতিপয় লোক খানা খাচ্ছিল। আমি পেছনের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা কি পূর্ববর্তী নবীগণের কিতাবগুলো পড়েছ? সে বলল, এতে লেখা রয়েছে শেষ নবীর খলীফা হবেন সিদ্দীক।
ইবনে আসাকির কর্তৃক বর্ণিত, মুহাম্মদ বিন যুবাইয়ের বলেন, উমর বিন আব্দুল আযীয (রা.) আমাকে কতিপয় প্রশ্ন করার জন্য ইমাম হাসান বসরীর খেদমতে পাঠালেন। আমি তাঁকে বললাম, হযরত আবু বকরের খেলাফত নিয়ে লোকেরা মতভেদ করেছিল। আপনি আমাকে পূর্ণাঙ্গ জবাব দিন যে, হুযূর (সা.) তাঁকে খলীফা বানিয়ে ছিলেন? তিনি রেগে বসে পড়লেন এবং বললেন, কেন এতে কি কোনো সন্দেহ রয়েছে? আল্লাহর কসম, আল্লাহ তা'আলাই তাঁকে খলীফা বানিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা কেন খলীফা বানাবেন না, তিনি সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী এবং মুত্তাকী লোকেরা তাকে খলীফা না বানানো পর্যন্ত তিনি মৃত্যুবরণ করতেন না।
ইবনে আদী কর্তৃক বর্ণিত, আবু বকর বিন আয়াশ বলেন, হাকীম রশীদ আমাকে বললেন, লোকেরা আবু বকরকে কিভাবে খলীফা বানিয়ে নিল? আমি বললাম, ইয়া আমিরুল মুমিনীন! এ কাজে আল্লাহ, তাঁর রসূল এবং সকল মুসলমান নীরব ছিল। খলীফা হারুন রশীদ বললেন, একটু ব্যাখ্যা করে বল। আমি বললাম, হে আমিরুল মুমিনীন! নবী করীম (সা.) আটদিন অসুস্থ ছিলেন। এ সময় হযরত বিলাল (রা.) আরয করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! কে নামায পড়াবেন? তিনি বললেন, আবু বকরকে নামায পড়াতে বলো। আবু বকর সিদ্দীক (রা.) আটদিন পর্যন্ত নামায পড়ান এবং এ দিনগুলোতে নিয়মিত ওহী নাযিল হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর নীরবতার কারণে নীরব ছিলেন এবং সকল মুসলমান রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নীরবতার কারণে নীরব ছিলেন। হারুন রশীদের নিকট এ অভিমতটি অত্যন্ত পছন্দনীয় মনে হলো এবং বললেন- বারাকাল্লাহু ফীক।
ওলামায়ে কেরামের একটি দল হযরত আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতের প্রমাণ পেশ করেছেন। বাইহাকী বর্ণনা করেন, ইমাম হাসান বসরী (র.) এ আয়াত দ্বারা দলিল দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন- 'ইয়া আইয়্যাহাল্লাযীনা আমানু মাই ইয়ারতাদ্দা মিনকুম আন দিনিহি ফাসাউফা ইয়া'তিল্লাহু বি কাওমিন তুহিব্বুহুম ওয়া ইয়ুহিব্বুনাহু'। অর্থ হে ঈমানদারগণ! যারা তোমাদের ধর্ম ত্যাগ করবে তাদের ব্যাপারে কোনো আক্ষেপ নেই। অচিরেই আল্লাহ তা'আলা এমন এক জাতি পাঠাবেন যারা আল্লাহ তা'আলাকে এবং আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ভালোবাসবেন। ইমাম হাসান (র.) বলেন, আল্লাহর কসম! আরব যখন ধর্মত্যাগী হয় আবু বকর এবং তাঁর সাথীরাই মুরতাদদের সাথে জিহাদ করে তাদের ইসলামে ফিরিয়ে আনেন।
ইউনুস বিন বাকীর কাতাদা (রা.)-এর বরাত দিয়ে লিখেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মৃত্যুর পর আরবের কতিপয় লোক মুরতাদ হয়ে যায়। তখন আবু বকর (রা.) তাদের সাথে জিহাদ করেছিলেন। সে সময় আমরা পরস্পরে বলতাম, কুরআনের এই আয়াত এবং তাঁর সাথীদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে।
ইবনে আবী হাতেম কুতায়বার থেকে বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- 'কুল্লিল মুখাল্লাফীনা মিনাল আ'রাবি সাতুদআওনা ইলা কাওমিন উলি বা’সিন শাদীদিন'। এ আয়াতে উল্লিখিত কঠোর লড়াইকারী দ্বারা বনু হুলায়ফা গোত্র উদ্দেশ্য। ইবনে আবী হাতেম এবং ইবনে কুতাইবা বলেন, এ আয়াতটি হযরত আবু বকরের খিলাফতের দলিল। কারণ তিনিই লোকদের তীব্র থেকে তীব্রতরভাবে লড়াই করার আহ্বান জানান।
শায়খ আবুল হাসান আশআরী (র.) বলেন, আবু আব্বাস সুরাইহ থেকে শুনেছি, তিনি বলেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীকের খিলাফত কুরআন শরীফের উপরোল্লিখিত আয়াত দ্বারা প্রমাণিত। কারণ ওলামায়ে কেরাম এ বিষয়ে একমত যে, এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর আবু বকর সিদ্দীক (রা.) ব্যতীত যাকাত অস্বীকারকারীর বিরুদ্ধে কেউ জিহাদ করেন নি। সুতরাং এ আয়াতটি হযরত আবু বকরের খিলাফতের জন্য দাবী রাখে এবং তাঁর আনুগত্য করা মানুষের জন্য ফরয, কারণ যে তা মান্য করবে না আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই তাকে শাস্তি দিবেন।
ইবনে কাসীর (র.) বলেন, কতিপয় মুফাসসিরীন রোম, শাম এবং পারস্যের যুদ্ধ দ্বারা এ আয়াতের তাফসীর করেছেন। কিন্তু এ যুদ্ধগুলো প্রস্তুতি হযরত আবু বকরই গ্রহণ করেন, যদিও তা হযরত উমর ফারুক এবং হযরত উসমান গনীর যুগে এসে শেষ হয়েছে। তারা দু'জনই হযরত আবু বকরের অনুসারী ছিলেন।
ইবনে কাসীর (র.) বলেন, ইরশাদ হচ্ছে- 'ওয়াআদাল্লাহুল্লাযীনা আমানু মিনকুম ওয়া আমিলুস সালিহাতি লাইয়াস্তাখলিফান্নাহুম ফিল আরদি'। এ আয়াতটি হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর খিলাফতের দলিল। ইবনে আবী হাতেম স্বরচিত তাফসীর গ্রন্থে আব্দুর রহমান বিন আব্দুল হামীদ আল মাহদী থেকে বর্ণনা করেন- 'ওয়াআদাল্লাহুল্লাযীনা আমানু মিনকুম ওয়া আমিলুস সালিহাতি লাইয়াস্তাখলিফান্নাহুম ফিল আরদি'। আল্লাহ তা'আলার এ বাণী দ্বারা হযরত আবু বকর এবং হযরত উমরের খিলাফত প্রমাণিত।
খতীব আবু বকর বিন আয়াশ থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর খলীফা এবং তাঁর খিলাফত কুরআন দ্বারা প্রমাণিত। এ প্রেক্ষিতে ইরশাদ হচ্ছে, 'লিলফুকারায়েল মুহাজিরিন' থেকে 'উলাইকা হুমুস সদ্দিকুন' পর্যন্ত। উল্লিখিত আয়াতে সদ্দিকুন শব্দ দ্বারা সাহাবায়ে কেরাম উদ্দেশ্য। আর আল্লাহ তা'আলা যাকে সদ্দিক বলেছেন তিনি কখনো মিথ্যা বলতে পারেন না। আর সাহাবাগণ সর্বদা হযরত আবু বকরকে হে আল্লাহর রসূলের খলীফা বলে সম্বোর্ডন করতেন। ইবনে কাসীর (র.) বলেন, এ গবেষণাটি অত্যন্ত সুন্দর।
যা'ফারানী বলেন, আমি ইমাম শাফেঈ (র.)-এর নিকটে শুনেছি। তিনি বলেন, আবু বকরের খিলাফতের বিষয়ে ইজমা হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মৃত্যুর পর লোকদের মধ্যে দুনিয়ায় আবু বকরের চেয়ে ভালো মানুষ না থাকায় লোকেরা তার হাতে বাইআত গ্রহণ করেন। (বাইহাকী)
আসাদুস সুন্নাহ (ফায়ায়েল গ্রন্থে মুআবিআ বিন কাররাহ থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকরের খিলাফত সম্বন্ধে সাহাবায়ে কেরাম কোনো প্রকার সন্দেহ পোষণ করতেন না। তারা সবসময় হযরত আবু বকরকে আল্লাহর রসূলের খলীফা বলে সম্বোধন করতেন। আর সাহাবীদের ইজমা কখনো ভুল এবং বিভ্রান্তকর হতো না।
হাকেম ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, যে জিনিসকে সকল মুসলমান ভাল মনে করে তা আল্লাহর কাছেও ভালো। আর যা সকল মুসলমানের নিকট মন্দ তা আল্লাহর কাছেও মন্দ। সকল মুসলমান আবু বকরের খিলাফতকে ভালো মনে করত। সুতরাং তা আল্লাহ তা'আলার নিকটেও ভালো ও উত্তম।
হাকেম এবং যাহাবী লিখেছেন, হযরত আবু বকরের খিলাফতের পর একদিন আবু সুফিয়ান বিন হরব হযরত আলীর নিকট এসে এসে বললেন, লোকদের কাজ গুলো দেখুন, তারা কুরাইশদের এক নগণ্য ব্যক্তির নিকট বাইআত গ্রহণ করেছে। আপনি চাইলে অশ্বারোহী এবং পদাতিক সৈন্য দিয়ে মদীনা ভরে দিব। হযরত আলী (রা.) বললেন, হে আবু সুফিয়ান! আপনি দীর্ঘ সময় ধরে ইসলামের শত্রুতা করে এসেছেন, আপনি কলহ প্রিয়। আমার দৃষ্টিতে আবু বকরের খিলাফতের কোনো মন্দ বিষয় নেই। কারণ তিনি প্রত্যেকটি বিষয়ে দক্ষ ও হকদার।
📄 আবু বকর (রা.)-এর নিকট বাইআত
সহীহ বুখারী এবং সহীহ মুসলিম শরীফে বর্ণিত রয়েছে, হযরত উমর বিন খাত্তাব (রা.) হজ্জ থেকে ফিরে তাঁর এক ভাষণে বললেন, আমি সংবাদ পেয়েছি অমুক ব্যক্তি বলেছে, উমরের মৃত্যুর পর সে অমুক ব্যক্তির হাতে বাইআত গ্রহণ করবে। কেউ এ ধোঁকায় পড়ে না যে, আবু বকর সিদ্দীকের বাইআত কতিপয় লোকেরা মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং তা সহসাই অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আল্লাহ তা'আলা লোকদের খিলাফত সম্বন্ধে ফেতনা-ফাসাদ থেকে বাঁচিয়েছেন এবং আজ তোমাদের মধ্যে এমন কোন ব্যক্তি নেই যাকে আবু বকর ছাড়া লোকেরা নিজেদের খলীফা করতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পর আবু বকর সিদ্দীকই সর্বোত্তম। ঘটনা হলো, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর হযরত আলী, হযরত যুবাইয়ের এবং তাঁদের সাথীরা হযরত ফাতেমার গৃহে অবস্থান নেন। সকল আনসার সাহাবী আমাদের থেকে পৃথক হয়ে সাকীফা বনু সাদাহ গোত্রে সমবেত হন। আর মুহাজির সাহাবীগণ হযরত আবু বকর সিদ্দীকের নিকট আসেন। আমি হযরত আবু বকর সিদ্দীককে বললাম, আপনি আমাদের সাথে আমাদের ভাই আনসার সাহাবীদের কাছে চলুন। তিনি আমাদের সাথে যাত্রা করলেন। পথে দু'জন নেককার লোকের সাক্ষাত হয়। তাঁরা আমাদের বললেন, তোমরা আনসারদের নিকট যেয়ো না এবং মুহাজিররা পরস্পরের মধ্যে সিদ্ধান্ত স্থির করে নাও। আমি বললাম, আল্লাহর কসম, আমরা সেখানে যাবই। আমরা সাকীফা বনু সাদাহ গোত্রে গিয়ে দেখলাম তারা সকলে সেখানে সমবেত এবং তাদের মধ্যভাগে একজন চাদর পরিহিত লোক বসে আছেন। আমি বললাম, তিনি কে এবং তার কি হয়েছে? লোকেরা বলল, সাদ বিন উবাদা অসুস্থ। আমরা গিয়ে বসলে তাদের বক্তা হামদ এবং ছানার পর বলতে লাগলেন, আমরা আনসার, আল্লাহর সৈনিক। হে মুহাজিরগণ! তোমরা কতিপয় লোক এ ইচ্ছা পোষণ কর যে, তোমরা আমাদের উচ্ছেদ করবে, বের করে দিবে এবং খিলাফতের সাথে সংযুক্ত রাখবে না। তার অভিভাষণ শেষ হলে আমি কিছু বলতে চাইলাম, কারণ এ বিষয়ে পূর্বেই আমি একটি সুন্দর বক্তব্য তৈরী করেছিলাম। হযরত আবু বকর (রা.) বাধা দিলেন। মূলত আমি তাঁর অধীনস্থ ছিলাম। উপরন্তু তিনি আমার চেয়ে বেশি প্রজ্ঞাবান এবং সম্মানিত ছিলেন। এ জন্য আমি নীরব হয়ে গেলাম এবং তাঁকে অসন্তুষ্ট করতে চাইলাম না। তিনি আমার চেয়ে বেশি জ্ঞানী ছিলেন। আল্লাহর কসম, আমি যা বলার জন্য পূর্বেই বক্তব্য ঠিক করেছিলাম হযরত আবু বকর শেষ পর্যন্ত সেই বক্তব্যই শুরু করলেন; বরং তার চেয়েও উত্তমভাবে বললেন, তোমরা নিজেদের সম্বন্ধে যে প্রশংসা করলে সত্যিই তোমরা তাই। গোটা আরব বিশ্ব অবগত যে, প্রশাসন সর্বদা কুরাইশদের জন্য, কারণ কুরাইশরা (নবীজীর) আত্মীয়তার দৃষ্টিকোণ থেকে আরব জাহানের মধ্যে সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ। সুতরাং খিলাফত সুনির্দিষ্টভাবে কুরাইশদের হক। তিনি আমার এবং আবু উবাইদার হাত ধরে বললেন, আমি খুশি হব যদি এঁদের মধ্য থেকে একজনের হাতে বাইআত করে নাও। হযরত আবু বকর (রা.) যা বললেন, তা সবই আমার মনঃপূত, কিন্তু বাইআতের জন্য আমার নাম ঘোষণা করা আমার পছন্দ হয়নি। আল্লাহর কসম, আমার গর্দান উড়িয়ে দিলেও আমি অনুতপ্ত হতাম না, তবে বিব্রত বোধ করেছিলাম এজন্য যে, আমি সে জাতির শাসনকর্তা কিভাবে হতে পারি যেখানে আবু বকর (রা.) রয়েছেন। আনসারদের মধ্য থেকে একজন বললেন, আমরাও কুরাইশদের সাহায্যকারী এবং সম্মানিত লোক। ভালো হবে যদি আমাদের মধ্য থেকে একজন এবং আনসারদের মধ্য থেকে একজনকে শাসক নির্ধারণ করা হয়। এ কথার প্রেক্ষিতে হট্টগোল আরম্ভ হলো। আমার সন্দেহ হলো যেন সংঘাত সৃষ্টি না হয়। আমি হযরত আবু বকরকে বললাম, আপনি হাত দিন। তিনি হস্ত প্রসারিত করলেন এবং আমি সর্বপ্রথম বাইআত করলাম, অতঃপর মুহাজিরগণ, অতঃপর আনসারগণও বাইআত করেন। আল্লাহ, আল্লাহ কী সংকটময় এবং বিস্ময়কর মুহূর্তই না ছিল সেটি। আমার ভয় হচ্ছিল যে, মুসলমানরা যেন বিভক্ত হয়ে না পড়ে। যদি তারা আলাদা বাইআত করত তবে সে ব্যক্তির নিকট আমাদের বাইআত করতে হতো। অথবা যদি আমরা বাধা দিতাম তাহলে বিশৃঙ্খলা দেখা দিত।
নাসায়ী, হাকেম এবং আবু ইয়ালা হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মৃত্যুর পর আনসারগণ বললেন, আমাদের এবং আপনাদের মধ্য থেকে একজন করে শাসক নির্ধারণ করা হোক। হযরত উমর বিন খাত্তাব তাদরে কাছে গিয়ে বললেন, হে আনসার সম্প্রদায়, তোমরা জান না রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আবু বকর সিদ্দীককে তোমাদের নামায পড়ানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। এখন তোমরাই ইনসাফ কর যে, তোমাদের মধ্যে হযরত আবু বকরের চেয়ে কোন ব্যক্তি সবচেয়ে উত্তম! আনসারগণ বললেন, নাউযুবিল্লাহ, আমরা তাঁর চেয়ে কখনই অগ্রগামী নই।
ইবনে সাদ, হাকেম এবং বাইহাকী আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর লোকেরা সাকীফা বনু সাদাহর নিকট সমবেত হন। তাদের মধ্যে হযরত আবু বকর সিদ্দীক এবং হযরত উমর ফারুকও উপস্থিত ছিলেন। জনৈক আনসার সাহাবী দাঁড়িয়ে বললেন, হে মুহাজিরগণ, রাসূলুল্লাহ (সা.) কাউকে কোথাও পাঠালে আমাদের মধ্য থেকে একজনকে তার সাথী বানিয়ে দিতেন। সুতরাং যুক্তিসঙ্গত এটাই যে, একজন আমীর আপনাদের মধ্য থেকে এবং একজন আমাদের মধ্য থেকে হোক। এরপর কতিপয় আনসার সাহাবী একই ধরনের বক্তব্য পেশ করলেন। হযরত যায়েদ বিন সাবেত দাঁড়িয়ে বললেন, তোমরা কী একথা জান না যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) মুহাজিরদের মধ্য থেকে অন্যতম ছিলেন। সুতরাং তাঁর খলীফাও মুহাজিরদের থেকে হওয়া উচিত। আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাহায্যকারী ছিলাম, আমরা তাঁর খলীফারও সাহায্যকারী হব। অতঃপর তিনি হযরত আবু বকরের হাত ধরে বললেন, ইনি তোমাদের নেতা এবং প্রশাসক। এরপর যথাক্রমে তিনি, হযরত উমর, মুহাজিরগণ, আনসারগণ বাইআত গ্রহণ করেন। তারপর হযরত আবু বকর সিদ্দীক মিম্বরে আরোহণ করেন এবং উপস্থিত জনতার প্রতি দৃষ্টি ফেরায়ে বললেন, যুবাইরকে দেখা যাচ্ছো না, তাকে ডেকে আনো। তিনি এলে হযরত আবু বকর (রা.) বললেন, তুমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ফুফুর ছেলে মেয়ে হয়ে এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবী হয়ে মুসলমানদের দুর্বল করতে চাও, মুসলমানদের কোমর ভেঙে দিতে চাও? হযরত আলী (রা.) বললেন, চিন্তা করবেন না। অতঃপর তিনিও বাইআত করলেন।
ইবনে ইসহাক সীরাত গ্রন্থে লিখেছেন, হযরত আনাস বিন মালিক (রা.) বলেন, বনূ সাকীফার গৃহে বাইআতের পর দিন হযরত আবু বকর (রা.) মিম্বরে আরোহণ করেন। তিনি অভিভাষণ প্রদানের পূর্বে হযরত উমর ফারুক (রা.) দাঁড়িয়ে হামদ এবং সালাতের পর বললেন, উপস্থিত জনতা! আল্লাহ তা'আলা তোমাদের এমন একজনের নিকট সমবেত করেছেন যিনি সকলের মধ্যে উত্তম, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সহচর এবং গুহার সাথী। তোমরা দাঁড়াও এবং তাঁর নিকট বাইআত গ্রহণ করো। লোকরো আম বাইআত করলেন। এ বাইআতটি সাকীফার গৃহে বাইআত অনুষ্ঠিত হওয়ার পরের ঘটনা। অতঃপর হযরত আবু বকর (রা.) দাঁড়িয়ে হামদ এবং ছানার পর বললেন, তোমরা আমাকে রাষ্ট্রপ্রধান বানিয়ে দিয়েছ, অথচ আমি তার যোগ্য নই। কারণ আমি তোমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ না। আমি জনহিতকর কাজ করলে তোমরা আমাকে সাহায্য করবে, আর অমঙ্গলজনক কাজ করলে আমাকে সুধরিয়ে দিবে। সত্যবাদিতা আমানত আর মিথ্যাচার খেয়ানত সমতুল্য। তোমাদের মধ্য থেকে দুর্বল ব্যক্তি আমার নিকট ঐ পর্যন্ত শক্তিশালী যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার অধিকার বুঝিয়ে দিব। আর অন্যের হক আদায় না করা পর্যন্ত তোমাদের শক্তিশালী লোকেরা দুর্বল হয়ে থাকবে। যে জাতি জিহাদ ছেড়ে দিয়েছে সে জাতি অপদস্থ হয়েছে। যে সম্প্রদায়ে ব্যভিচার ছড়িয়ে পড়ে আল্লাহ তা'আলা সে সম্প্রদায়কে রোগাক্রান্ত করে দেন। যতক্ষণ পর্যন্ত আমি আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের আনুগত্য করব ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা আমার অনুসরণ করবে। আর আমি আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের আনুগত্য না করলে আমার অনুসরণ তোমাদের জন্য বৈধ নয়। নামায পড়, আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়া করুন।
মূসা বিন উকবা স্বরচিত মাগাযী গ্রন্থে এবং হাকেম আব্দুর রহমান বিন আউফ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক এ খুতবা প্রদান করেন যে, আল্লাহর কসম, আমি কখনো রাজত্বের আকাঙ্ক্ষা করিনি, এর প্রতি আমার মোহও ছিল না। এর জন্য প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে প্রার্থনাও করিনি। মূলত আমার ভীষণ ভয় হচ্ছিল এ জন্য যে, যদি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর আমার কোনো আরাম ছিল না। আমার প্রতি এক বিশাল কাজ অর্পণ করা হয়েছে, যা আমার গর্দানের বহনযোগ্যতার অতিরিক্ত। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার ক্ষমতার প্রতি আমার ভরসা ছিল। এতদশ্রবণে হযরত আলী এবং হযরত যুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, আমরা অনুতপ্ত হলাম, এ কারণে যে, খিলাফতের পরামর্শে কেন আমরা অংশগ্রহণ করিনি। আমরা খুব ভালো করে জানতাম যে, হযরত আবু বকর সিদ্দীকই সবচেয়ে বেশি খিলাফতের হকদার। কারণ তিনি গুহায় রাসূলুল্লাহ (সা.)- এর সাথী ছিলেন। আমরা তাঁর গুণাবলী সম্পর্কে অবগত। আমরা এও জানি যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবদ্দশায় হযরত আবু বকরকে নামাযের ইমামতির নির্দেশ দিয়েছেন।
ইবনে সাদ ইবরাহীম তামিমী থেকে বর্ণনা করেন, নবী করীম (সা.)-এর ইন্তেকালের পর হযরত উমর হযরত আবু উবাইদা বিন জাররা (রা.)-এর কাছে গিয়ে বললেন, আমি আপনার হাতে বাইআত করব। কারণ আমি নবী (সা.) আপনাকে 'আমীন' (বিশ্বস্ত) বলেছেন একথা চাক্ষুষ শুনেছি। আবু উবাইদা (রা.) বললেন, আমি আপনাকে বুদ্ধিমান মনে করি, কিন্তু আজ কেন মেধাহীনতার পরিচয় দিলেন। আপনি আমার নিকট বাইআত গ্রহণকরতে চাইছেন, অথচ আপনারদের মধ্যে সিদ্দীক, ছানীয়াছনাইনি এবং ফিল গার জীবিত।
ইবনে সাদ মুহাম্মদ থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর হযরত উমরকে বলেছিলেন, হাত দাও আমি তোমার হাতে বাইআত করতে চাই। হযরত উমর বললেন, আপনি আমার চেয়ে বেশি বুযুর্গ। হযরত আবু বকর (রা.) বললেন, তুমি আমার চেয়ে আমার বেশি শক্তিশালী। এভাবে কথাবার্তা চলতে থাকে। অবশেষে হযরত উমর বললেন, আপনি আমার চেয়ে বেশি বুযুর্গ এবং আমার প্রতাপ আপনার জন্য থাকবে। অতঃপর তিনি বাইআত করেন।
আবদুর রহমান বিন আউফ রা. বলেন, নবী (সা.)-এর মৃত্যুর সময় হযরত আবু বকর মদীনার অন্য কোথাও ছিলেন। সংবাদ পেয়ে তিনি ছুটে আসেন এবং চেহারা থেকে কাপড় সরিয়ে চুমু দিয়ে বললেন, আমার মাতা-পিতা আপনার প্রতি কুরবান হোক। জীবিত অবস্থায় তিনি যেমন সুশ্রী এবং পবিত্রতম ছিলেন, মৃত্যুর পরও অনুরূপ সুদর্শন এবং পবিত্রতম রয়েছেন। কাবার রবের কসম, মুহাম্মদ (সা.) ইন্তেকাল করেছেন। আব্দুর রহমান বিন আউফ বর্ণনা করেন, অতঃপর হযরত আবু বকর এবং হযরত উমর আনসারদের নিকট গমন করেন। হযরত আবু বকর সেখানে গিয়ে ভাষণ দেন। তিনি তাঁর ভাষণে আনসারদের সম্বন্ধে কুরআন এবং হাদীসে বিধৃত সকল প্রশংসার উল্লেখ করে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যদি সমস্ত লোক এক বনে আর আনসারগণ অন্য বনে চলে যায় তবে আমি আনসারদের সঙ্গেই যাব। হে সাদ! একদা রাসূলুল্লাহ (সা.) তোমাদের সামনে বলেছিলেন, খিলাফত কুরাইশদের জন্য ভালো লোকেরা ভালো কাজের এবং মন্দ লোকের মন্দ কাজের আনুগত্য করবে। সাদ জবাবে বললেন, আপনি সঠিক বলেছেন। আমরা মন্ত্রী, আর আপনারা বাদশাহ। (আহমদ)
ইবনে আসাকির আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, বাইআত গ্রহণের পর হযরত আবু বকর সিদ্দীক চেহারা দেখে ধারণা করলেন কিছু লোকের মাঝে অসন্তোষের ছাপ বিরাজ করছে। তাই তিনি বললেন, হে লোকসকল! কোন কাজ তোমাদের অসন্তুষ্ট করে রেখেছে। আমি কি সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করিনি?.... হয়নি?... হয়নি? তিনি নিজের কতিপয় গুণাবলী বর্ণনা করে বললেন, তোমাদের মধ্য থেকে আমি সবচেয়ে বেশি খিলাফতের হকদার।
আহমদ লিখেছেন, রাফে তাঈ বর্ণনা করেন, আমার কাছে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) নিজের খিলাফতের সকল ঘটনাবলী বলে শুনিয়েছেন। হযরত উমর এবং আনসার সাহাবীগণ যা বলেছেন তা ব্যক্ত করে তিনি (আবু বকর) বলেন, অতঃপর আমার নিকট লোকেরা বাইআত গ্রহণ করে এবং এ কারণে আমি খিলাফতের দায়িত্ব নিলাম যে, কোথাও যেন বিশৃঙ্খলা দেখা না দেয় এবং চরম অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার পর লোকরো যেন মুরতাদ না হয়ে যায়।
ইবনে ইসহাক এবং ইবনে আবেদ কিতাবুল মাগাযী রাফে থেকে বর্ণনা করেন, আমি আবু বকর সিদ্দীকের নিকট আরয করলাম, আপনি আমাকে দু'জন লোকের শাসন থেকে দূরে থাকতে বলেছেন, অথচ আপনি নিজেই শাসন-ক্ষমতা গ্রহণ করলেন কেন? তিনি বললেন, আমি তাদের নিন্দাকারী নই। উম্মতে মুহাম্মদীয়া বিভক্ত হয়ে যাবে বলে আমার আশঙ্কা ছিল।
কায়েস ইবনে আবু হাযেম বলেন, নবী করীম (সা.)-এর মৃত্যুর এক মাস পর আমি হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর খেদমতে বসেছিলাম। তিনি বাইয়াতের সকল ঘটনা বর্ণনা করছিলেন। ইত্যবসরে নামাযের ঘোষণা দেয়া হলো। সাহাবীগণ সমবেত হলেন। তিনি মিম্বরে আরোহণ করে বললেন, উপস্থিতি! আমি স্বেচ্ছায় সম্মত যে, তোমরা অন্য কাউকে খলীফা বানিয়ে নাও। কারণ যদি তোমরা আমার মধ্যে নবী (সা.)-এর হুবুহ পথ খুঁজে পেতে চাও, তবে তা আমার ক্ষমতার অতীত। কেননা, নবী করীম (সা.) শয়তান থেকে নিরাপদ ছিলেন এবং তাঁর নিকট ওহী আসত।
হাসান বসরী (র.) থেকে নকল করে ইবনে সাদ লিখেছেন, বাইআত গ্রহণের পর হযরত আবু বকর সিদ্দীক মিম্বরে আরোহণ করে হামদ ও সানার পর বললেন, 'হে আল্লাহর রসূলের সাহাবীগণ! যদিও আমি খলীফা হয়েছি, কিন্তু এতে আমি খুশি নই। আল্লাহর কসম, যদি তোমাদের মধ্যে কেউ এ কাজের দায়িত্ব নিতে চায় তবে সে নিজ হাতে তা গ্রহণ করুক। যখন তোমরা এ গুরুভার একতাবদ্ধ হয়ে আমার উপর চাপিয়েছ তখন আমি অবিকল নবী (সা.)-এর মতো করে চালাতে পারব না, তা সম্ভবও নয়। কারণ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে ওহী নাযিল হতো। আমি তোমাদের মতোই একজন মানুষ। আমি কারো চেয়ে শ্রেষ্ঠ নই। যতক্ষণ পর্যন্ত আমাকে সঠিক পথ অনুসরণ করতে দেখবে, আমার অনুসরণ করবে। আর চুল পরিমাণ বিচ্যুতি দেখলে সংশোধন করে দিবে। স্মরণ রেখো, শয়তান আমার সাথেও লেগে আছে। যখন আমি রাগান্বিত হবো তখন আমার থেকে পৃথক হয়ে যাবে। কবিতার মাধ্যমে আমার প্রশংসা গাঁথা আবৃত্তি করবে না।
ইবনে সাদ এবং খতীব মালিক এবং তিনি উরওয়া থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) খলীফা হওয়ার পর তাঁর ভাষণে হামদ ও সানা পড়ে বললেন, যদিও আমি তোমাদের নেতা, কিন্তু আমি তোমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নই। কুরআন নাযিল হয়েছে, নবী করীম (সা.) সুন্নতের পথ দেখিয়ে দিয়েছেন এবং আমরা তা খুব ভালো করে বুঝি নিয়েছি-তোমরা সে পথই অনুসরণ করবে। বুদ্ধি মান সেই যে পরহেযগার। আর পাপাসক্ত ব্যক্তি হলো সব চেয়ে বেশি বোকা। জনতার প্রাপ্য বুঝিয়ে না দেয়া পর্যন্ত আমি মিল্লাতের নিকট দুর্বল। হে উপস্থিতি! আমি সুন্নতের অনুসারী, বিদা'তী নই। ভালো কাজ করলে আমাকে সাহায্য করবে। আর মন্দ কাজ করতে দেখলে সাবধান করে দিবে। আমি এতটুকুই বলতে চাই। আল্লাহ তা'আলার নিকট নিজের এবং তোমাদের সকলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
ইমাম মালিক (র.) বলেন, উল্লিখিত শর্তাবলী ছাড়া কোন ব্যক্তি ইমাম হতে পারে না। হাকেম মুসতাদরাক গ্রন্থে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর মক্কা শরীফে চরম ব্যাকুলতা এবং বিলাপের সুর উঠে। হযরত আবু কুহাফা ক্রন্দন ধ্বনি শ্রবণে জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে? বলা হলো, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইন্তেকাল করেছেন। তিনি বললেন, আফসোস, অনেক বড় কাজ এবং গুরুদায়িত্ব এসে গেল। অতঃপর জিজ্ঞেস করা হলো, নবীজীর স্থানে কে বসবেন? বলা হলো, আপনার ছেলে? তিনি বললেন, বনূ আব্দে মানাফ এবং বনূ মুগীরা গোত্রদ্বয় কি তা মেনে নিবে? বলা হলো, হ্যাঁ। তিনি বললেন, আল্লাহ তা'আলা যাকে বড় করতে চান তাকে কেউ ছোট এবং যাকে ছোট করতে চান তাকে কেউ বড় করতে পারবে না।
ওকেদী কয়েক পদ্ধতিতে আয়েশা সিদ্দীকা, ইবনে উমর, সাঈদ বিন মুসায়্য্যাব ইস্তেকালের দিন একাদশ হিজরীর বারো রবিউল আউয়াল সোমবারে বাইআত গ্রহণ করেন।
তাবারানী আওসাত গ্রন্থে ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) কখনো মিম্বরে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর স্থানে বসেননি, এভাবেই তাঁর মৃত্যু হয়ে যায়। হযরত উমর ফারুক হযরত আবু বকর সিদ্দীকের স্থানে এবং হযরত উসমান গনী হযরত উমর ফারুকের স্থানে জীবনের শেষ প্রহর পর্যন্ত বসেননি।
📄 বিবিধ ঘটনাবলী
হযরত উমর (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর আরবের কতিপয় লোক মুরতাদ হয়ে বলতে লাগল, আমরা নামায পড়ব, কিন্তু যাকাত দিব না। আমি হযরত আবু বকর সিদ্দীকের খেদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করলাম, হে আল্লাহর রসূলের খলীফা! আপনি মানুষের মনকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করুন এবং তাদের প্রতি নমনীয়তা প্রদর্শন করুন। তারা তো অসভ্য জাতি। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বললেন, আমি তোমার সহযোগিতা কামনা করতাম, কিন্তু তুমি আমার ভাবনার প্রাসাদ ধ্বংস করেছ। অন্ধকার যুগে তুমি বড়ই কার্যক্ষম বক্তি ছিলে। ইসলাম গ্রহণ করে তুমি অলস হয়ে গেছ। আমি তাদের মনকে কিভাবে আকৃষ্ট করব? আল্লাহ ক্ষমা করুন আমি কি তাদের জাদু করব? আফসোস, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইন্তেকাল করেছেন, ওহী বন্ধ হয়েছে। আল্লাহর কসম, যদি তারা একটি দড়ি দিতেও অস্বীকার করে, আমার হাতে তলোয়ার থাকা পর্যন্ত আমি তাদের সাথে যুদ্ধ করব, হযরত উমর (রা.) বলেন, আমি তাকে এ কাজে এত বেশি কঠোর হস্তে দেখেছি যে, তিনি এভাবেই মানুষকে সঠিক পথে এনেছেন।
আবুল কাসেম বাগবী এবং আবু বকর শাফেঈ স্বচিত ফাওয়ায়েদ গ্রন্থে এবং ইবনে আসাকির হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালে অপবিত্রতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। আরবের বৃহৎ অংশ মুরতাদ হয়ে যায়। আনসারগণ পৃথক হয়ে যান। পাহাড়ও এ সমস্যাগুলো বহন করতে পারত না। কিন্তু আমার পিতা আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বিস্ময়কর ধৈর্যের সাথে সমস্যাগুলোর মোকাবিলা করেছেন এবং মতভেদযুক্ত প্রতিটি মাসয়ালার সঠিক সমাধান দিয়েছেন। নবী করীম (সা.)-কে কোথায় সমাহিত করা হবে তা নিয়ে সর্বপ্রথম মতভেদ দেখা দেয়। সকলেই এ ব্যাপারে নীরব ছিলেন এবং কেউ কিছু জানতেন না। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বললেন, আমি নবী (সা.) কে বলতে শুনেছি, মৃত্যুর স্থানেই প্রত্যেক নবীকে সমাহিত করা হয়। দ্বিতীয়, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মিরাস নিয়ে মতভেদ দেখা দিলে আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বললেন, আমি নবী (সা.) কে বলতে শুনেছি, নবীদের কোনো উত্তরাধিকারী নেই। তাদের সকলের সম্পদ সদকা হিসেবে বিবেচতি।
উলামায়ে কেরাম বলেন, সর্বপ্রথম নবী (সা.)-এর দাফন নিয়ে মতভেদ হয়। কতিপয় সাহাবী বলেন, নবীর জন্মস্থান মক্কা শরীফে দাফন করা উচিত। কেউ বলেন, মসজিদে নব্বীতে; কেউ বলেন, জান্নাতুল বাকীতে, কেউ আবার বাইতুল মুকাদ্দাসের কথা বলেন, অবশেষে আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এ সম্বন্ধে যে অভিমত প্রকাশ করলেন, তা সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হলো।
ইবনে যানজুয়া বলেন, এটা হযরত আবু বকরের হাদীসই ছিল। কিন্তু সকলই মুহাজির ও আনসারকে তাঁর বিশাল জ্ঞানের প্রতি ঝুঁকিয়ে দেয়া প্রয়োজন ছিল।
বইহাকী এবং ইবনে আসাকির আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর কসম, আবু বকর খলীফা না হলে পৃথিবীতে কেউ ইবাদত করত না। তিনি এভাবে তিনবার বললেন। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, হে আবু হুরায়রা আপনি একথা বলছেন কেন? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) উসমা বিন যায়েদকে সাতশ' সৈন্যসহ রোমে প্রেরণ করেন। তিনি শুষ্ক সীমানা অতিক্রম না করতেই হুযূর (সা.) ইন্তেকাল করেন এবং মদীনার পার্শ্ববর্তী আরব জনগোষ্ঠী মুরতাদ হয়ে যায়। সাহাবাগণ হযরত আবু বকরের নিকট আরয করলেন, আপনি উসামা বাহিনীকে ফিরিয়ে নিন। কারণ মদীনার পার্শ্ববর্তী লোকেরা মুরতাদ হয়ে গেছে। এখন আর তার প্রয়োজন নেই। তিনি বললেন, এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর কসম, যদি আল্লাহর পয়গম্বরের বিবিদের পা নিয়ে কুকুরের দল টানা হেঁচড়া করে তবুও রাসূলুল্লাহ (সা.) যে বাহিনী প্রেরণ করেছেন তা আমি ফিরিয়ে নিবো না এবং তিনি যে পতাকা উড়িয়েছেন তা নামিয়ে নিব না। সুতরাং তিনি উসামা বাহিনীকে পুনঃপ্রেরণ করলেন। উসামা পথিমধ্যে যে গোত্রের মুখোমুখী হয়েছেন সকল গোত্রই বাধা দিয়েছে এবং পরাজিত হয়েছে। ফলে তারা পরস্পরে এ কথা বলেছে যে, যদি মুসলমানদের শক্তি না থাকত তবে এ মুহূর্তে তারা অন্য জাতির প্রতি সৈন্য প্রেরণ করত না অতএব দেখুন, রোমানদের মোকাবিলায় ফলাফল কি হয়েছিল। যখন এ বাহিনী রোম সাম্রাজ্যের সীমানায় প্রবেশ করে তখন উভয় দিক থেকে আক্রমণ হয় এবং মুসলিম বাহিনী বিজয় অর্জন করে নিরাপদে ফিরে এলে সকলেই ইসলামকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে।
হযরত উরওয়া (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) মুমূর্ষ অবস্থায় উসামা বাহিনীকে যাত্রা করার নির্দেশ দেন। হযরত উসামা জরফ নামক স্থানে পৌঁছিলে তাঁর স্ত্রী ফাতিমা বিনতে কায়েস লোক মারফত জানালেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) অন্তিম শয্যায় শায়িত, আপনি তাড়াহুড়া করবেন না। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকাল হলে হযরত উসামা হযরত আবু বকরের নিকট উপস্থিত হয়ে আরয করলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে রোম সাম্রাজ্যে গমনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন সংকটময় অবস্থা। আমার আশঙ্কা হচ্ছে আরবের লোকেরা মুরতাদ হয়ে যেতে পারে। যদি তারা মুরতাদ হয়ে যায় তবে সর্বপ্রথম আমি তাদের সাথে মুকাবিলা করতে প্রস্তুত আছি। আর যদি তারা মুরতাদ না হয় তবে আমি চলে যাব। আমার সাথে যে সব তরুণ সৈনিক এবং বড় বড় সরদারগণ ছিলেন তাদের আমি নিয়ে যাওয়ার অনুমতি চাইছি। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) লোকদের উদ্দেশ্য করে বললেন, আল্লাহর কসম, যদি আমার প্রাণ বিপন্ন হয় এবং হিংস্র পক্ষীকুল আমার শরীরের গোশত খেয়ে ফেলে তবুও আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আদেশ সামান্যতমও সংশোধন এবং পরিমার্জন করব না। এ বলে তিনি উসামা বাহিনী পুনঃপ্রেরণ করলেন। (ইবনে আসাকির)
যাহাবী বলেন, মদীনার চারিদিকে নবীজী (সা.)-এর ইন্তেকালের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে অনেক গোত্র ইসলাম ত্যাগ করে এবং যাকাত দিতে অস্বীকার করলে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) তাদের নিকট সৈন্য প্রেরণ করেন। কিন্তু হযরত উমর বাধা দেন। সিদ্দীকে আকবর (রা.) বলেন, আল্লাহর কসম, তারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট ছাগলের বাচ্চার যে যাকাত দিত তা এক বছরের জন্য দিতে অস্বীকার করলে আমি তাদের সাথে যুদ্ধ করব। উমর (রা.) বললেন, আপনি কিভাবে যুদ্ধ করবেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) যেখানে বলেছেন- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ না বলা পর্যন্ত আমি লোকদের সাথে যুদ্ধ করব এ কালেমা পাঠ করলে তার জান এবং মাল আমার জিম্মায়। কিন্তু যাকাত দিতে হবে, এর হিসাব আল্লাহর জিম্মায়। এবার বলুন কিভাবে যুদ্ধ হতে পারে? সিদ্দীকে আকবর বললেন, আল্লাহর কসম, নামায এবং যাকাতের মধ্যে পরিবর্তন করার জন্য আমি যুদ্ধ করব। কারণ যাকাত মালের হক এবং নবী করীম (সা.) বলেছেন, যাকাত আদায় করতে হবে। উমর (রা.) বলেন, আল্লাহর কসম, হযরত আবু বকরের বক্ষ খুলে দেয়া হয়েছিল। আমিও বুঝলাম তিনি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত।
হযরত উরওয়া রা. বলেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) মুহাজির এবং আনসারদের নিয়ে নজদের নিকটবর্তী হয়ে মুরতাদদের পরাজিত করলে কতিপয় মন্দ চরিত্রের লোকরা নিজেদের বিবি-বাচ্চা নিয়ে পালিয়ে যায়। ফলে লোকেরা তার নিকট আরয করল, আপনি ফিরে যান এবং সৈনিকদের মধ্যে একজনকে সেনাপতি বানিয়ে বাহিনী প্রেরণ করুন। লোকেরা এ ব্যাপারে জোরাজুরি করলে তিনি খালিদ বিন ওলীদকে সেনাপতি বানিয়ে ফিরে এলেন। আসার সময় বললেন, তারা ইসলামে ফিরে এলে এবং যাকাত দিতে সম্মত হলে তোমাদের মধ্যে যাদের ইচ্ছে মদীনায় ফিরে যেতে পারবে।
হযরত ইবনে উমর (রা.) বলেন, সিদ্দীকে আকবর ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে জিহাদে যাত্রার প্রাক্কালে হযরত আলী অশ্বের রজ্জু ধারণপূর্বক বললেন, আমি আপনাকে সে কথাই বলতে চাই যা নবী (সা.) উহুদ যুদ্ধে আপনাকে বলেছিলেন, অসি কোষবদ্ধ করুন, যাতে আকস্মিক কোনো ঘটনাই না ঘটে এবং আপনি মদীনায় ফিরে চলুন। আল্লাহর কসম, আল্লাহ না করুন যদি আপনার কিছু হয় তাহলে এখানে এমন কেউ নেই যিনি ইসলামের ব্যবস্থাপনা অক্ষুণ্ণ রাখবেন। (দারা কুতনী)
খানযালা বিন আলী লাইসী বলেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক যখন হযরত খালিদ বিন ওলীদকে বাহিনীর আমীর বানিয়ে প্রেরণ করেন তখন এ নসিহত করলেন যে, তাদেরেেক পাঁচটি আহকাম পালনের নির্দেশ দিবে। যদি একটি হুকুমও তারা অস্বীকার করে তবে তাদের সাথে এমনভাবে লড়াই করবে পাঁচটি আহকাম অস্বীকারকারীদের সাথে যেভাবে লড়াই করো। আর সেই পাঁচটি আহকাম হলো- ১. আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয় এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসূল। ২. নামায পড়তে হবে। ৩. যাকাত দিতে হবে। ৪. রোযা রাখতে হবে। ৫. বাইতুল্লাহ শরীফে এসে হজ্জ আদায় করতে হবে। হযরত খালিদ বিন ওলীদ তাঁর বাহিনী নিয়ে জমাদিউল আখের মাসে রওয়ানা করেন। বনী আসাদ এবং গাতফান গোত্রের সাথে তার যুদ্ধ হয়। অনেক মুরতাদ নিহত, অনেক বন্দী এবং বাকীরা আবার মুসলমান হয়। সাহাবীদের মধ্যে আকাশা বিন মুহসিন এবং সাবেত বিন আকরাম খালেদ বিন ওলিদ (রা.) এর সাথে ছিলেন। এ বছর রমযান মাসে নবী দুহিতা জান্নাত নেত্রী হযরত ফাতেমা (রা.) ইন্তেকাল করেন। যাহাবী বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বংশধারা হযরত ফাতেমা থেকেই সূচিত হয়।
যুবায়ের বিন বাকার বলেন হযরত ফাতেমার এক মাস পূর্বে হযরত উম্মে আয়মন ইন্তেকাল করেন এবং শাওয়াল মাসে আব্দুল্লাহ বিন আবু বকরের মৃত্যু হয়। যাহোক এ বছরের শেষ দিকে হযরত খালিদ তাঁর বাহিনী নিয়ে মুসায়লামা কাযযাবকে হত্যা করার জন্য ইয়ামামায় পৌঁছলে উভয় বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। অবশেষে কয়েকটি দুর্গ বিজিত হওয়ার পর হযরত হামযা (রা.)-এর হত্যাকারী ওয়াহশী মুসায়লামাকে হত্যা করেন। এ ঘটনায় যারা শহীদ হন তারা হলেন আবু হুযাইফা বিন উতবা, আবু হুযাইফার গোলাম সালিম, শুজা বিন ওহাব, যায়েদ বিন খাত্তাব, আব্দুল্লাহ বিন সহল, মালিক বিন আমর, তোফায়েল বিন আমর দৌসী, ইয়াযিদ বিন কায়েস, আমের বিন বাকার, আব্দুল্লাহ বিন মুহরেমা, সায়িব বিন উসমান বিন মাজউন, উবাদা বিন বশর, মাআন বিন আদী, সাবিত বিন কায়েস বিন শামাস, আবু দোজানা, সামাক বিন হরব প্রমুখ।
মুসায়ালামা কাযযাবের বয়স হয়েছিল দেড় শত বছর। নবী করীম (সা.)-এর সম্মানিত পিতা আব্দুল্লাহ চেয়েও বয়সে বড় ছিল।
দ্বাদশ হিজরীতে আবু বকর সিদ্দীক (রা.) আলা-বিন হাযরামীকে বাহরাইনে পাঠান। সেখানেও লোকেরা ধর্ম ত্যাগ করেছিল। জাওয়াছী নামক স্থানে লড়াই হয়। মুসলমানরা বিজয় অর্জন করেন। ওমানেও এ ফেতনা মাথাচাড়া দেয়ার কারণে ইকরামা বিন আবু জাহেলকে তাদের দমনের জন্য পাঠানো হয়। আবু উমাইয়াকে মুহাজিরদের দলপতি করে বাহীরে এ ফেতনা দমনের জন্য প্রেরণ করা হয়। যিয়াদ বিন লাবীদ আনসারীকে একদল ধর্মত্যাগীকে শায়েস্ত করার জন্য আরেক দিকে পাঠানো হয়। এ বছর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জামাতা আবুল আস বিন রবীআ ইন্তেকাল করেন। সআব বিন জিছামা লাইছী এবং আবু মুরছাদ গুনুভীও এ বছর পরলোকগমন করেন।
মুরতাদদের ফেতনা দমনের পর হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) হযরত খালিদ বিন ওলীদকে বসরায় প্রেরণ করেন এবং লড়াই করে আয়লা শহর বিজিত করেন। অতঃপর কিছু সন্ধি কিছু যুদ্ধ করে ইরাকের মাদায়েন শহর দখল হয়। দ্বাদশ হিজরীতে বাইতুল্লাহ যিয়ারত থেকে ফিরে এসে আমর বিন আসকে শামে প্রেরণ করেন। শামে তেরো হিজরীতে যুদ্ধ হয় এবং বিজয়ের মুকুট মুসলমানদের মাথায় প্রতিস্থাপিত হয়। কিন্তু হযরত আবু বকর (রা.)-এর নিকট যখন এ সুসংবাদ পৌঁছে তখন তিনি মৃত্যু পথযাত্রী। এ যুদ্ধে ইকরামা বিন আবু জাহেল এবং হিমাম বিন আসসহ অন্যান্য সাহাবী অংশগ্রহণ করেন। এ বছর মরজুস সফর যুদ্ধ হয় এবং এ যুদ্ধে মুশরিকরা পরাজিত হয়। এ ঘটনায় অন্যান্যদের সাথে ফজল বিন আব্বাস (রা.) শহীদ হন।