📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 আবু বকর (রা.) এবং উমর (রা.)-এর শানে যেসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে

📄 আবু বকর (রা.) এবং উমর (রা.)-এর শানে যেসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে


ইমাম বুখারী এবং ইমাম মুসলিম (র.) হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, আমি শুনেছি হুযূর (সা.) বলেন, এক চারণভূমিতে জনৈক রাখাল বকরী চরাত। একদিন হঠাৎ বাঘ এসে বকরীর পালে আক্রমণ করে এবং একটি বকরী ধরে ফেলে। রাখাল বাঘকে তাড়া করে বকরীটি উদ্ধার করল বাঘ বলল, সেদিন কি হবে যেদিন তোমার বকরীর পালের সাথে তুমি থাকবে না, অথচ আমি থাকব। জনৈক ব্যক্তি মাল বোঝাইকৃত বলদকে নিয়ে যায়। বলদ আমাকে দেখে বলল, আমি বোঝা বহন করার জন্য জন্ম নেইনি, আমার জন্ম ক্ষেতে কাজ করার জন্য। উপস্থিত জনতা আশ্চর্যান্বিত হয়ে পড়লেন। তারা বললেন, বলদ কথা বলতে লাগল? হুযূর (সা.) বললেন, আমার সাথে একথার স্বীকৃতি দিয়েছেন আবু বকর এবং উমর। সে সময় সেখানে তাঁরা দু'জন উপস্থিত ছিলেন না। তিনি তাদের বিশ্বাসের প্রতি ভরসা রাখার ব্যাপারে তাকীদ দিলেন।

তিরমিযী আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, হুযূর (সা.) ইরশাদ করেন, এমন কোনো নবী নেই যার দু'জন মন্ত্রী আকাশে এবং দু'জন যমিনে রয়েছে। আমার আকাশের দু'মন্ত্রী জিবরাঈল এবং মিকাঈল। আর যমিনের মন্ত্রীদ্বয় আবু বকর এবং উমর।

আসহাবে সুনান প্রমুখ সাঈদ বিন যায়েদ থেকে বর্ণনা করেন, হুযূর (সা.) ইরশাদ করেছেন, আবু বকর, উমর, উসমান এবং আলী জান্নাতী, অতঃপর তিনি বাকী আশারা মুবাশশারার নাম উল্লেখ করে বলেন, এরা জান্নাতী।

তিরমিযী আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মহামনীষীগণ আকাশে উজ্জ্বল নক্ষেত্রের মতো। যেমন আবু বকর এবং উমর। এ রেওয়ায়েতটি তাবারানী জাবের বিন সামুরা এবং আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন।

ইমাম তিরমিযী হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, হুযুর (সা.) আনসার এবং মুহাজিরদের পাশ দিয়ে যাবার সময় আদবের (শিষ্টাচারের) কারণে তারা নবীজীর পানে চোখে তুলে তাকাতেন না। কিন্তু আবু বকর এবং উমর হযরত (সা.)-এর পানে তাকাতেন এবং মৃদু হাসতেন। তিনিও তাদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসতেন।

তিরমিযী এবং হাকেম হযরত ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সা.) মসজিদে নব্বীতে প্রবেশের সময় তাঁর ডানে-বামে হযরত আবু বকর এবং হযরত উমর ছিলেন। তিনি তাঁদের হাতে ধরে বললেন, আমি কিয়ামত দিবসে এভাবে উঠব। তাবারানী আওসাত গ্রন্থে আবু হুরায়রার বরাত দিয়ে এ হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিরমিযী এবং হাকেম হযরত ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামত দিবসে সর্বপ্রথম আমি উঠব, তারপর আবু বকর, তারপর উমর।

তিরমিযী এবং হাকেম আব্দুল্লাহ বিন হানযালা বর্ণনা করেন, একদা নবী আকরাম (সা.) হযরত আবু বকর এবং হযরত উমরকে দেখে বললেন, এঁরা দু'জন আমার কান এবং চোখ। এ হাদীসটি তাবারানী ইবনে উমর এবং ইবনে আমার থেকে রেওয়ায়েত করেছেন।

বায্যার এবং হাকেম আবু আরওয়া আদ্দুওসী থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবুবকর এবং হযরত উমর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে হাজির হলে তিনি বললেন, ঐ আল্লাহর শুকর যিনি তোমাদেরকে আমার সাহায্যকারী বানিয়েছেন। এ হাদীসটি মুররা ইবনে আযেব (রা.) থেকেও বর্ণিত হয়েছে। (তাবারানী)

আবু ইয়ালা আম্মার বিন ইয়াসার (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, একদা হযরত জিবরাঈল আমীন আমার কাছে আসেন। আমি উমর বিন খাত্তাবের গুণাবলী সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, নূহ (আ.)-এর মত দীর্ঘ জীবন পর্যন্ত যদি উমরের গুণাবলী বর্ণনা করি তবুও তা শেষ হবে না।

আহমদ আব্দুর রহমান বিন গানাম থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আবু বকর এবং হযরত উমরকে সম্বোধন করে বলেন, তোমরা দু'জনে যে বিষয়ে একমত হবে আমি সে বিষয়ে দ্বিমত করব না।

বারা বিন আযেব থেকে তাবারানী বর্ণনা করেন এবং ইবনে সাদ লিখেছেন, জনৈক ব্যক্তি ইবনে উমরকে জিজ্ঞেস করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে কে ফতোয়া দিতেন? তিনি বললেন, সে সময় আবু বকর এবং উমর ব্যতীত কেউ ফতোয়া দিত বলে আমার জানা নেই।

আবুল কাসিম বিন মুহাম্মদ বর্ণনা করেন, ফতোয়ার জন্য লোকেরা আবু বকর, উমর, উসমান এবং আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুম-এর নিকট গমন করতেন।

তাবারানী ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, প্রত্যেক নবী (আ.) গণের উম্মতে বিশেষ ব্যক্তি রয়েছেন। আমার উম্মতের বিশেষ ব্যক্তি হযরত আবু বকর এবং উমর।

হযরত আলী (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা আবু বকরের উপর রহম করুন। কারণ নিজ কন্যাকে আমার সাথে বিয়ে দিয়েছেন, মদীনা পর্যন্ত আরোহণ করায়ে আমাকে পৌঁছে দিয়েছেন এবং তাছাড়া বিলালকে আযাদ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা উমরের প্রতি শান্তি বর্ষণ করুন। তিনি প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও সত্য কথা বলেন, এ জন্য লোকেরা তাঁর ভয়ে দূরে থাকে এবং তাঁর বন্ধু নেই। আল্লাহ তা'আলা উসমানের প্রতিও রহম করুন, ফেরেশতাকুল তাঁকে দেখে লজ্জা করেন। আল্লাহ পাক আলীর উপরও রহম করুন। আল্লাহ তা'আলা আলীর সাথে রয়েছেন। (ইবনে আসাকির)

হযরত সুহাইল (রা.) বলেন, রসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজ্জ থেকে ফিরে এসে মিম্বরের উপর আরোহণ করে বললেন, হে জনতা! আবু বকর আমাকে কখনো কষ্ট দেননি। তোমরা তাকে স্মরণ রেখ। হে জনতা। আমি তার প্রতি সন্তুষ্ট। উপরন্তু উমর, উসমান, আলী, তালহা, যুবাইর, সাদ, আব্দুর রহমান বিন আউফ প্রাথমিক যুগের মুহাজিরদের উপরও সন্তুষ্ট। (তাবারানী)

আব্দুল্লাহ বিন আহমদ ইবনে আবি হাযেম থেকে বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি যাইনুল আবেদীন আলী বিন হোসাইন (রা.)-এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করল, রসূলের দরবারে হযরত আবু বকর ও হযরত উমরের মর্যাদা কতটুকু ছিল? তিনি বললেন, সে সময় হযরত নবী করীম (সা.)-এর নিকট তাঁর যতটুকু মর্যাদা ছিল।

ইবনে সাদ বাসতাম বিন মুসলিম থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর এবং হযরত উমরকে সম্বোধন করে নবী করীম (সা.) বলেন, আমার পর তোমাদের উপর কোনো ব্যক্তি প্রশাসক হতে পারবে না। ইবনে আসাকির হযরত আনাস (রা.) থেকে মারফুআন সূত্রে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর এবং হযরত উমরকে ভালোবাসা ঈমান। আর তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা কুফরী। ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, আবু বকর এবং উমরের প্রতি ভালোবাসা পোষণ এবং তাঁদের জ্ঞানের পথ অবলম্বন করা সুন্নত। হযরত আনাস (রা.) মারফুআন বর্ণনা করেন, নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেন, আমি আমার উম্মতের ব্যাপারে আশাবাদী যে, তারা কালেমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ থেকে যেমন পলায়ন করবে না। অর্থাৎ, উভয়ের প্রতি আমার উম্মতের অখণ্ড ভালোবাসা অটুট থাকবে।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 আবু বকর (রা.)-এর শানে যেসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে

📄 আবু বকর (রা.)-এর শানে যেসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে


ইমাম বুখারী (র.) এবং ইমাম মুসলিম (র.) হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি এক জোড়া কোনো জিনিস আল্লাহর পথে ব্যয় করবে জান্নাতের সকল দরজা থেকে তাকে আহ্বান করা হবে। হে আল্লাহর বান্দাগণ! এ পথে এসো। এ দরজা অত্যন্ত সুন্দর। সুতরাং যে ব্যক্তি নামাযী তাকে নামাযের দরজা থেকে, যে ব্যক্তি মুজাহিদ তাকে জিহাদের দরজা থেকে, যে সদকাকারী তাকে সদকার দরজা থেকে, রোযাদারকে রোযার দরজা থেকে তার নাম ধরে ডাকা হবে। হযরত আবু বকর (রা.) আরয করলেন, ভাগ্যবান সেই ব্যক্তি যাকে সকল দরজা থেকে আহ্বান করা হবে। ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোনো ব্যক্তিকে সকল দরজা থেকে ডাকা হবে কি? হুযূর (সা.) বললেন, হ্যাঁ, আমি মনে করি যাদের ডাকা হবে তাদের মধ্য থেকে তুমি অন্যতম।

আবু দাউদ এবং হাকেম হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি নিজের সাহচর্য এবং সম্পদ দ্বারা সবচেয়ে বেশি আমাকে অনুগ্রহ করেছেন তিনি আবু বকর। যদি আমি আল্লাহ ব্যতীত কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতাম, তবে আবু বকরকেই করতাম। কিন্তু ইসলামের ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অটুট। এ হাদীসটি ইবনে আব্বাস, ইবনে যুবায়ের, ইবনে মাসউদ, জুনদুব বিন আব্দুল্লাহ, বারা, কাব বিন মালিক, জাবের বিন আব্দুল্লাহ, আনাস, উবাই বিন কা'ব, আবি ওয়াকিদুল লাইসী, আবুল মুয়ালা, আয়েশা, আবু হুরায়রা এবং ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুম প্রমুখ থেকে বর্ণিত।

আবুদ্দারদা (রা.) থেকে ইমাম বুখারী (র.) বর্ণনা করেন, একবার আমি হযরত নবী করীম (সা.)-এর দরবারে বসেছিলাম। হযরত আবু বকর (রা.) এলেন এবং সালাম দিয়ে আরয করলেন, আমার এবং উমর বিন খাত্তাবের মধ্যে আলাপচারিতার এক পর্যায়ে মনমালিন্যতা দেখা দেয়। আমি তাঁর কাছেই বসেছিলাম। আমার মাঝে অনুতাপ এলো এবং আমি তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলাম। কিন্তু তিনি ক্ষমা করতে অস্বীকার করেন। অতঃপর আমি আপনার নিকট এসেছি। নবী করীম (সা.) তিনবার বললেন, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করবেন। এরপর হযরত উমর লজ্জিত হয়ে আবু বকরের বাড়িতে যান। কিন্তু সেখানে তাঁকেই না পেয়ে নবী করীম (সা.)-এর দরবারে আসেন। তাঁকে দেখে নবী করীম (সা.)-এর চেহারা রাগে রক্তিম হয়ে যায়। এমতাবস্থায় হযরত উমর ফারুকের প্রতি আবু বকর সিদ্দীকের দয়া হয়। ফলে তিনি আরয করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি তাঁর চেয়ে বেশি অপরাধী। নবী করীম (সা.) বললেন, আল্লাহ তা'আলা যখন আমাকে তোমাদের নিকট প্রেরণ করেন তখন তোমরা সকলে আমাকে মিথ্যবাদী বলেছিলে। কিন্তু আবু বকর আমাকে সত্যায়িত করেছে, নিজের জীবন এবং সম্পদ দিয়ে সাহায্য করেছে। আজ তোমরা সেই বন্ধুকে বর্জন করছ? (এ কথাটি তিনি দু'বার উচ্চারণ করেন) এ আচরণ কখনই গ্রহণীয় হতে পারে না।

ইবনে আদী ইবনে উমর (রা.) থেকে অনুরূপ একখানা হাদীস বর্ণনা করেছেন। তবে সে হাদীসে এতটুকু বৃদ্ধি করা হয়েছে যে, আমার বন্ধুর ব্যাপারে আমাকে কষ্ট দিয়ো না। যে সময় আল্লাহ তা'আলা আমাকে হেদায়েত এবং সত্য দ্বীন দিয়ে পাঠালেন, তখন তোমরা সকলে আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছ, আর আবু বকর আমাকে সত্যায়িত করেছেন। যদি আল্লাহ তা'আলা তাঁকে আমার জন্য সহিব (সহচর) বলে সম্বোধন না করতেন তবে আমি তাকে খলীল (বন্ধু) বলে ডাকতাম।

ইবনে আসাকির মুকতাম থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আকীল বিন আবু তালিব এবং হযরত আবু বকরের মধ্যে ঝগড়া হয়। যদিও হযরত আবু বকর তাঁর বংশ পরম্পরা সম্পর্কে অবগত ছিলেন যে, হযরত আকীলের আত্মীয়তা হুযুর (সা.)-এর সাথে সম্পৃক্ত। এজন্য তিনি নীরব হয়ে যান। হযরত আকীল নবীজীর দরবারে এ ব্যাপারে নালিশ করলে তিনি (সা.) লোকদের মাঝে দাঁড়িয়ে বললেন, আমার বন্ধুকে আমার উপর ন্যস্ত কর এবং নিজেদের অবস্থান ও তাঁর শান সম্পর্কে চিন্তা করো। আল্লাহর কসম, তোমাদের সকলের দরজা অন্ধাকারাচ্ছন্ন। কিন্তু আবু বকের দরজা আলোকময়। আল্লাহর কসম! তোমরা আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছ? আর আবু বকর আমাকে সত্যায়িত করেছেন। তোমরা আমার সাথে কৃপণতা করেছ, আর আবু বকর আমার জন্য খরচ করেছেন। তোমরা আমাকে পরিত্যাগ করেছিলে, আর আবু বকর আমার আনুগত্য করেছেন।

ইমাম বুখারী (র.) ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। নবী করীম (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি গর্ব করে নিজের পরিধেয় কাপড় মাটির সাথে ঝুলিয়ে পরবে আল্লাহ তা'আলা কিয়ামত দিবসে তার প্রতি অনুগ্রহের দৃষ্টিতে তাকাবেন না। হযরত আবু বকর (রা.) আরয করলেন, যদি আমি সবসময় সতর্ক না থাকি তবে আমার পরনের বস্ত্রের একাংশ ঝুলে যায়। নবী করীম (সা.) বললেন, তুমি এ কাজ তো গর্ব করে করো না।

মুসলিম শরীফে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আজ তোমাদের মধ্যে কে রোযাদার? হযরত আবু বকর (রা.) বললেন, আমি। হুযূর (সা.) বললেন, আজ তোমাদের মধ্যে কে জানাযার সাথে গিয়েছে? হযরত আবু বকর (রা.) বললেন, আমি নবী করীম (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, আজ তোমাদের মধ্যে কে দুস্থকে অন্ন দিয়েছে? হযরত আবু বকর (রা.) বললেন, আমি নবী করীম (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, আজ কে রোগীর সেবা করেছ? হযরত আবু বকর (রা.) বললেন, আমি। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করলেন, যে ব্যক্তির মধ্য এতগুলো বিষয় একত্রিত হয়েছে তিনি অবশ্যই জান্নাতী। হযরত আনাস এবং আব্দুর রহমান বিন আবু বকর ও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তবে তাঁদের বর্ণনায় এতটুকু বৃদ্ধি করা হয়েছে যে, নবী করীম (সা.) বলেন, তোমার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেছে।

বায্যার আব্দুর রহমান থেকে রেওয়ায়েত করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ফজরের নামায পড়ে সাহাবীদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলতে লাগলেন, আজ তোমাদের মধ্য থেকে কে রোযা মুখে সকাল পেয়েছ? হযরত উমর ফারুক (রা.) আরয করলেন, আমি আমার ব্যাপারে বলছি, আজ আমি রোযা নাই। হযরত আবু বকর বললেন, রাতেই রোযার নিয়ত করেছিলাম এবং আলহামদু লিল্লাহ, আমি রোযা রেখেছি।

নবী করীম (সা.) বললেন, তোমাদের মধ্যে থেকে আজ কে রুগ্ন ব্যক্তির শুশ্রূষা করেছে? হযরত উমর (রা.) আরয করলেন, আমি তো এখনো মসজিদ থেকেই বেরোইনি, রোগীর সেবা আবার কখন করলাম। হযরত সিদ্দীকে আকবর (রা.) বললেন, খবর পেলাম ভাই আব্দুর রহমানের (আল্লাহর বান্দা) অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর। ফলে মসজিদের আসার পথে তিনি কেমন আছেন তা দেখে এসেছি।

নবী করীম (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, আজ তোমাদের মধ্যে কেউ কি ফকীরকে কোনো খাদ্যদ্রব্য দিয়েছ? হযরত উমর (রা.) বললেন, আমি তো সবেমাত্র নামায পড়লাম, এখন পর্যন্ত কোথাও যাইনি। হযরত আবু বকর (রা.) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি মসজিদে প্রবেশের সময় হঠাৎ এক ভিক্ষুক এলো। আমি সে সময় আব্দুর রহমানের (হযরত আবু বকরের ছেলে) হাতে যবের রুটির একটি টুকরো দেখলাম এবং সেটি তার কাছ থেকে নিয়ে ভিক্ষুককে দিয়ে ছিলাম। নবী করীম (সা.) বললেন, আমি তোমাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিচ্ছি। অতঃপর নবী করীম (সা.) এও বললেন, যদ্বারা উমরও সন্তুষ্টও হন এবং হযরত উমর (রা.) বুঝ লেন, পুণ্যময় কাজে তিনি আবু বকরের সমান নন।

আবু ইয়ালা গ্রন্থে ইবনে মাসউদ (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, একদিন আমি নামায পড়ে মসজিদে দোআ করছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আবু বকর এবং হযরত উমরকে নিয়ে মসজিদে এসে (আমাকে দেখে) বললেন, যে চাইবে সে পাবে। অতঃপর তিনি বললেন, যে সুন্দর করে কেরাত তিলওয়াত করতে চায় সে যেন আব্দুল্লাহ বিন মাসউদের কেরাত অনুসরণ করে। এরপর আমি বাড়ি এলাম। কিছুক্ষণ পর হযরত আবু বকর আমাকে ধন্যবাদ জানানোর জন্যে আমার কাছে এলেন। পরক্ষণে হযরত উমরও এলেন। তিনি হযরত আবু বকরকে দেখে বললেন, আপনি প্রত্যেকটি ভাল কাজে এগিয়ে রয়েছেন।

রবী'আ আসলামী বর্ণনা করেন, আমার এবং হযরত আবু বকরের মধ্যে বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে তিনি আমাকে এমন কথা বলেন যা আমাকে দুঃখ দেয়। অতঃপর তিনি লজ্জিত হয়ে বললেন, রবীআ! তুমি কথার দ্বারা প্রতিশোধ নাও। আমি বললাম, তা হতে পারে না। তিনি বললেন, তুমি আমার প্রতিশোধ নাও, অন্যথায় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে নালিশ করব। আমি বললাম, তবুও নয়। এরপর আবু বকর চলে গেলেন। আমার কাছে বনু আসলাম গোত্রের কতিপয় লোক এসে বলল, ভালোই হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) কেন অসন্তুষ্ট হবেন, আবু বকরই তো বাড়াবাড়ি করেছেন। তিনি কেন এতটা করতে গেলেন? আমি তাদের বললাম, তোমরা কি আবু বকরের মর্যাদা সম্পর্কে অবগত নও? তিনি ছানী ইছনাইন আয়াতের প্রতিবিম্ব এবং মুসলমানদের মধ্যে বুযুর্গ এবং বড় ব্যক্তিত্ব। তোমরা নিজেদের মঙ্গল তালাশ কর। যদি তিনি দেখতে পান যে, তোমরা তার বিরুদ্ধে সাহায্য করছ তবে তিনি রাগ করবেন। তাঁর রাগ করার কারণে রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর রাগের কারণে স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা রাগ করবেন। আর এতে করে রবী'আ ধ্বংস হয়ে যাবে। সুতরাং আমি হযরত আবু বকরের পিছে পিছে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমতে গিয়ে হাযির হলাম। আবু বকর হযরতের দরবারে হুবহু সম্পূর্ণ ঘটনা বয়ান করলেন। নবী করীম (সা.) মস্তক তুলে আমাকে বললেন, রবী'আ! ঘটনা কী? আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ঘটনা তাই (যা তিনি বলেছেন)। তিনি এমন কথা বলেছেন, যা আমাকে মর্মাহত করেছে। তিনি আমাকে অনুরূপ কথা বলে তার প্রতিশোধ নিতেও বলেছিলেন। রসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, খবরদার ঐ কথা মুখে আনবে না (অর্থাৎ আবু বকরের প্রতিশোধ নিতে যেয়ো না); বরং বল, হে আবু বকর আল্লাহ তা'আলা আপনাকে ক্ষমা করুন। (আহমদ)

তিরমিযী ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, নবী করীম (সা.) আবু বকরকে বললেন, তুমি গুহায় আমার সাথী ছিলে হাউজে কাওসারেও আমার সাথী হয়ে থাকবে। আব্দুল্লাহ বিন আহমদও অনুরূপ রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন যে, আবু বকর গুহায় আমার সাথী ছিল। এ হাদীসের সনদগুলো সহীহ।

বাইহাকী হযরত হুযাইফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, বেহেশতে খোরাসানের উটের মত অনেক পাখি থাকবে। হযরত আবু বকর (রা.) আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে তো অনেক ভাল হবে। তিনি (সা.) বললেন, তাকে ভক্ষণকারী তার চেয়েও ভাল হবে? তন্মধ্যে তুমি অন্যতম।

আবু ইয়ালা হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, মিরাজের রাতে আকাশের অনেক স্থানে আমার নামের পেছনে আবু বকরের নাম দেখেছি। এ হাদীসের সনদগুলো দুর্বল। যদিও তা ইবনে আব্বাস, ইবনে উমর, আনাস, আবু সাঈদ এবং আবুদদরদা রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে পৃথক পৃথক সূত্রে বর্ণিত। ইবনে আবী হাতিম এবং আবু নুয়াঈম সাঈদ বিন জাবের (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে ইয়া আইয়্যাহাতুন্ নাসফুল মুত্বমাইন্নাহ আয়াত তেলওয়াত করলে হযরত আবু বকর বললেন, এ কতই না সুন্দর কথা! রসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করলেন, মৃত্যুর সময় ফেরেশতা তোমাকে এভাবে সম্বোধন করবে। ইবনে হাতেম আমের বিন আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের থেকে বর্ণনা করেন, 'ওয়ালাউ আন্না কাতাবনা আলাইহিম আনুকতুলু আনফুসাকুম' এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর হযরত আবু বকর (রা.) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা.)! যদি আপনি আমাকে নির্দেশ করেন তবে নিজেকে আমি বিধ্বস্ত করে ফেলব। নবী করীম (সা.) বললেন, তুমি সত্যই বলেছ।

আবুল কাসেম বাগাবী ইবনে আবী মুলাইকা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবীদের সাথে এক জলাশয়ে গিয়ে বললেন, সকলেই নিজ নিজ সাথী এবং বন্ধুর নিকট ফিরে যাও। এতদশ্রবণে সকলে তাই করলো। শুধু বাকী থাকলেন রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)। অতঃপর হযরত নবী করীম (সা.) আবু বকরের নিকট গমন করলেন তাঁর সাথে কোলাক্বীল করলেন এবং বললেন, যদি আমি স্বীয় জীবনে কোনো বন্ধু গ্রহণ করতাম তবে আবু বকরকেই গ্রহণ করতাম, কিন্তু তিনি আমার সাথী। (ইবনে আসাকির)। এ হাদীসটি মুরসাল ও গরীব সনদে বর্ণিত হয়েছে।

ইবনে আসাকির সুলায়মান বিন ইয়াসার থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ভালো অভ্যাস তিন'শ ষাটটি। আল্লাহ তা'আলা কাউকে জান্নাত দিতে চাইলে এ অভ্যাসগলোর মধ্য থেকে যে কোনো একটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে দিয়ে দেন। হযরত আবু বকর (রা.) আরয করলেন, সেগুলোর মধ্যে থেকে কোনো একটি আমার মধ্যে রয়েছে কি? তিনি (সা.) বললেন, সবগুলোই রয়েছে।

ইবনে আসাকির এ হাদীসটি দু'ভাবে বর্ণনা করেছেন। আরেক পদ্ধতিটি হলো- রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, নেক অভ্যাস তিনশ ষাটটি। হযরত আবু বকর আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এর মধ্য থেকে আমার মাঝে কি কিছু আছে? তিনি (সা.) বললেন, ধন্যবাদ, সব নেক অভ্যাস তোমার মধ্যে সঞ্চিত রয়েছে।

ইবনে আসাকির ইয়াকুব আনাসারীর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মজলিসে লোক সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে গায়ে গায়ে মিলে বসত, এ দৃশ্য দুর্গের দেয়ালের মত লাগত। কিন্তু আবু বকরের বসার জায়গা পড়েই থাকত সেখানে কেউ বসত না। তিনি যখন আসতেন তখন সেখানে বসতেন এবং নবী করীম (সা.) তাঁর দিকে চেহারা ফিরায়ে কথা শুরু করতেন এবং সকল উপস্থিত ব্যক্তিগণ মনোযোগ সহকারে কথা শুনতেন।

ইবনে আসাকির হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেন, আবু বকরের প্রতি ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমার সকল উম্মতের জন্য ওয়াজিব। সহল বিন সাদ (রা.) একটি হাদীস এভাবেই বর্ণনা করেছেন।

উপরন্তু হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) থেকে একাধারে মারফু হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, সকল লোকের হিসাব নেয়া হবে, কিন্তু আবু বকরের থেকে হিসাব নেয়া হবে না।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 আবু বকর (রা.)-এর শানে সাহাবা এবং সলফে সালেহীনদের অভিমত

📄 আবু বকর (রা.)-এর শানে সাহাবা এবং সলফে সালেহীনদের অভিমত


জাবের (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, হযরত উমর ফারুক (রা.) বলেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) আমাদের সর্দার। (বুখারী শরীফ)।

বাইহাকী শোআবুল ঈমান গ্রন্থে হযরত উমরের অভিমত নকল করেছেন, যদি হযরত আবু বকরের ঈমান কে এক পাল্লায় আর পৃথিবীবাসীর ঈমান আরেক পাল্লায় তুলে দেয়া হয় তবে আবু বকরের ঈমানের পাল্লা বেশি ভারী হবে।

ইবনে আবী হাইছামা এবং আব্দুল্লাহ বিন আহমদ যাওয়াইদুয যুহদ গ্রন্থে বর্ণনা করেন, হযরত উমর (রা.) বলেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) প্রত্যেকটি অভিমতই শ্রেষ্ঠ এবং সর্বোত্তম।

হযরত উমর ফারুক (রা.) বলেন, হায়, আমি যদি হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর বুকের একটি পশম হতাম! এ হাদীসটি মিসদাদ স্বরচিত মুসনাদ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।

হযরত উমর ফারুক (রা.) বলেন, আমার একান্ত ইচ্ছা হলো, হযরত আবু বকর (রা.) এর জন্য যেরূপ জান্নাত নির্ধারিত তদ্রূপ জান্নাত যেন আমি প্রাপ্ত হই। (ইবনে আসাকির, ইবনে আবিদ দুনিয়া)।

হযরত উমর ফারুক (রা.) আরো বলেন, আবু বকর (রা.)-এর শরীর মেস্কের চেয়েও অধিক সুগন্ধ। (আবু নুয়াঈম)

ইবনে আসাকির হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, একদিন হযরত আলী হযরত আবু বকরর পার্শ্ব অতিক্রম করছিলেন। সে সময় হযরত আবু বকর (রা.) একখণ্ড কাপড় পরে বসেছিলেন। তিনি হযরত আবু বকরকে দেখে বললেন, কোনো নেক্কার ব্যক্তি আল্লাহর নিকট আমার মতে এ কাপড় পরিধানকারী ব্যক্তি চেয়ে তিনি বেশি প্রিয় নন।

ইবনে আসাকির আব্দুর রহমান বিন আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আমাকে কয়েকবার উমর বিন খাত্তাব বলেছেন, আবু বকর সিদ্দীক আমার চেয়ে প্রত্যেক কাজে অগ্রগামী।

তাবারানী আওসাত গ্রন্থে বর্ণনা করেন, হযরত আলী (রা.) বলেন, পবিত্র সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, আমি নেক কাজে অগ্রগামী হয়ে দেখেছি সে কাজে হযরত আবু বকর আমার চেয়েও অগ্রগামী।

তাবারানী আওসাত গ্রন্থে হযরত আলী (রা.)-এর অভিমত বিধৃত রয়েছে। (হযরত আলী (রা.) বলেন) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পর হযরত আবু বকর এবং হযরত উমরই আমার নিকট প্রিয়। কোনো মুমিনের অন্তরে আমার প্রতি ভালোবাসা এবং আবু বকর ও উমরের প্রতি বিদ্বেষ ভাবাপন্নতা একত্রে জমা হবে না।

আবু আমর (রা.) বলেন, কুরাইশদের মধ্যে তিনজন ব্যক্তি ছিলেন যারা দৃশ্যত এবং চরিত্রগতভাবে অসাধারণ এবং বিস্ময়কর সাদা মনের মানুষ। যদি তারা তোমাকে কিছু বলেন তবে সত্য বলবেন। আর তুমি যদি তাকে কিছু বল তবে তারা তা সত্য বলে বিশ্বাস করবেন। তারা হলেন, আবু বকর সিদ্দীক (রা.), আবু উবায়দা বিন জাররা (রা.) এবং উসমান বিন আফফান (রা.)। ইবনে সাদ ইবরাহীম নখয়ী কর্তৃক বর্ণিত, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর উপাধি তাঁর দয়ার্দ্রতার কারণে দেয়া হয়েছে।

ইবনে আসাকির রবী'আ বিন আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এমন এক পানির ফোঁটা যেখানে পড়বে সেটাই মহিমান্বিত হবে।

রবীতা বিন আনাস থেকে ইবনে আসাকির বর্ণনা করেন, আমি আবু বকর সিদ্দীকের মত পূর্ববর্তী নবীদের কোনো সাহাবীকে পাইনি।

যোহরী বলেন, আবু বকর সিদ্দীকের মর্যাদার মধ্যে এটিও একটি যে, তিনি আল্লাহ তা'আলার ব্যাপারে কোনই সন্দেহ করতেন না। (ইবনে আসাকির)

যুবায়ের বিন বাকার বলেন, আমি আলেমদের নিকট থেকে শুনেছি যে, নবী করীম (সা.)-এর খতীব আবু বকর এবং আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুমা। আবু হুসাইন বর্ণনা করেন, আদম সন্তানদের মধ্যে নবী রাসূলের পর কোনো ব্যক্তি আবু বকরের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মৃত্যুর পর মুরতাদদের প্রতি সৈন্য পাঠিয়ে হযরত আবু বকর এক নবীওয়ালা কাজ করেছেন।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ
দাইনূরী স্বরচিত মাজালিসাত গ্রন্থে এবং ইবনে আসাকির শা'বী থেকে বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা আবু বকরকে এমন চারটি গুণ দান করেছিলেন যা আজ পর্যন্ত কাউকে দেয়া হয়নি। এক. তিনি সিদ্দীক। দুই. তিনি গুহায় নবীর সাথী। তিন. হিজরতের সময় নবীজীর সাথে ছিলেন এবং চার রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে ইমাম এবং বাকী সকল মুসলমানকে মুকতাদী হওয়ার নির্দেশ দেন।

মাসাহাফ গ্রন্থে ইবনে আবু দাউদ লিখেছেন, হযরত আবু জাফর বলেন, হযরত আবু বকর (রা.) রসূলুল্লাহ (সা.) এবং হযরত জিবরাঈলের কথা শুনতে পেতেন, কিন্তু জিবরাঈলকে দেখতে পেতেন না।

ইবনে মুসায়্যাব বলেন, হযরত আবু বকর নবী (সা.)-এর বিশেষ মন্ত্রী ছিলেন। নবী করীম (সা.) প্রত্যেকটি বিষয়ে তাঁর সাথে পরামর্শ করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইসলামের মধ্যে, গুহায়, বদর যুদ্দের ছাউনির নিচে, এমনকি কবরেও আবু বকর ছাড়া অন্য কাউকে প্রাধান্য দেননি।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 হাদীস, আয়াত এবং ইমামদের অভিমতে আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতের প্রতি ইশারা

📄 হাদীস, আয়াত এবং ইমামদের অভিমতে আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতের প্রতি ইশারা


তিরমিযী এবং হাকেম হযরত হুযাইফা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমার পর আবু বকর এবং উমরের অনুসরণ করবে। এ হাদীসটি তাবারানী আবুদ্দারদা থেকে এবং হাকেম ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন।

আবুল কাসেম বাগাবী আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি, আমার পর বারোজন খলীফা হবেন এবং আবু বকর সিদ্দীক আমার পর সামান্য জীবিত থাকবেন। এ হাদীসের প্রথমাংশের ব্যাপারে সকল মুহাদ্দিসই একমত। এটি কয়েক পদ্ধতিতে বর্ণিত হয়েছে, এ সম্বন্ধে আমি অন্য ব্যাখ্যা গ্রন্থে আলোচনা করেছি।

বুখারী এবং মুসলিম শরীফের এ হাদীস যা আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) মৃত্যুর আগে বক্তৃতায় বলেছিলেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁর এক বান্দাকে অবকাশ দিয়েছেন....! সেই বক্তৃতায় তিনি আরো বলেছিলেন, সব দরজাই বন্ধ হয়ে যাবে, কিন্তু আবু বকরের দরজা খোলা থাকবে।

এক রেওয়ায়েতে রয়েছে, আবু বকরের জানালা ছাড়া মসজিদের সকল জানালা বন্ধ থাকবে। ওলামায়ে কেরাম লিখেছেন, এর দ্বারা হযরত আবু বকরের খিলাফতের প্রতি ইশারা করা হয়েছে। কারণ তিনি এ পথেই মসজিদে নামায পড়ানোর জন্য আসতেন।

হযরত আনাস (রা.) বলেন, (রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন) আবু বকরের দরজা ছাড়া সকল দরজা বন্ধ করে দাও। এ হাদীসটি ইবনে আদী, ইমাম তিরমিযী হযরত আয়েশা সিদ্দীকা থেকে, যাওয়াইদুল মুসনাদ গ্রন্থে ইবনে আব্বাস থেকে, তাবারানী মুআবিয়া বিন আবু সুফিয়ান (রা.) থেকে এবং বায্যার আনাস (রা.) থেকে রেওয়ায়েত করেছেন। সহীহ বুখারী এবং সহীহ মুসলিম শরীফে জুবায়ের বিন মুতঈম থেকে বর্ণনা করেন, একদিন জনৈক মহিলা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমতে উপস্থিত হলো। তিনি (সা.) তাকে পুনরায় আসতে বললেন। সে আরয করল, আমি আবার এলে হযরতকে পাব না, অর্থাৎ তিনি ইন্তেকাল করবেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তবে আবু বকর সিদ্দীকের কাছে এসো।

হযরত আনাস (রা.) বলেন, আপনার পর আমরা কার কাছে সদকা দিব এ বার্তা দিয়ে বনূ মুস্তালিকের লোকেরা আমাকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে পাঠালে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, আবু বকরের নিকট। (হাকিম)

ইবনে আসাকির ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে জনৈক মহিলা এসে কিছু জানতে চাইলে তিনি তাকে পরে আসতে বললেন। সে বলল, আমি এসে যদি আপনাকে না পাই এবং আপনার মৃত্যু হয়ে যায়। নবী করীম (সা.) বললেন, তুমি এসে আমাকে না পেলে আবু বকরের নিকট গমন করবে। কারণ আমার পর তিনি খলীফা হবেন।

হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, মৃত্যুর সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, হে আয়েশা! তোমার পিতা এবং তোমার ভাইকে আমার নিকট আসতে বল। আমি তাদের দলিল লিখে দিতে চাই। কারণ আমার আশঙ্কা হয় যে, আমার পর কোনো আশান্বিত ব্যক্তি খিলাফতের জন্য দাঁড়িয়ে যেতে পারে এবং বলতে পারে আমি খিলাফতের উপযুক্ত। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা এবং মুমিনগণ আবু বকরকে ছাড়া মেনে নিবে না। (মুসিলম)

এহাদীসটি আহমদ ভিন্ন পদ্ধতিতে বর্ণনা করেছেন। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) মৃত্যুর সময় আমাকে বললেন, তোমার ভাই আব্দুর রহমানকে ডেকে আনো, আমি আবু বকরের জন্য একটি দলিল লিখে দিব, যাতে লোকেরা মতভেদ করতে না পারে। অতঃপর নিজেই বললেন, তাকে লাগবে না। আল্লাহ আবু বকরের ব্যাপারে মুসলমানদের মধ্যে মতানৈক্য রাখবেন না।

মুসলিম শরীফে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) থেকে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি হযরত আয়েশাকে জিজ্ঞেস করল, নবী (সা.) যদি খলীফা নির্ধারণ করতেন তবে কাকে বানাতেন? তিনি বললেন, আবু বকরকে। সে বলল, তাঁর পর? তিনি বললেন, উমর ফারুক। সে বলল, তাঁর পর? তিনি বললেন, আবু উবায়দা বিন জাররাহ।

সহীহ বুখারী এবং সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত আবু মূসা আশাআরী (রা.) থেকে বর্ণিত নবী করীম (সা.) মুমূর্ষ অবস্থায় বলেন, হে জনতা! তোমরা আবু বকরের কাছে যাও, তিনি তোমাদের নামায পড়াবেন। হযরত আয়েশা (রা.) আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আবু বকর অত্যন্ত নরম মনের মানুষ। তিনি আপনার স্থানে জায়নামাযে দাঁড়ালে নামায পড়াতে পারবেন না। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তাকেই নামায পড়াতে বল। হযরত আয়েশা আবার একই আবেদন করলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, আবু বকরকেই বল, তিনি যেন নামায পড়ান। তুমি তো হযরত ইউসুফ (আ.)-এর যুগের নবীর মতো। এরপর লোকেরা আবু বকরের নিকট এলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় লোকদের নামায পড়ান। এ হাদীসটি মুতাওয়াতির। এটি হযরত আয়েশা, ইবনে মাসউদ, ইবনে আব্বাস, ইবনে উমর, আব্দুল্লাহ বিন যামআ, আলী বিন আবু তালিব এবং হাফসা রাযিআল্লাহু আনহুম পৃথকভাবে রেওয়ায়েত করেছেন। এঁদের পদ্ধতিও হাদীসে মুতাওয়াতির পদ্ধতির অনুরূপ।

আরেকভাবে হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, আমি এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এ জন্যই জেদ করেছিলাম যে, আমার অন্তর সাক্ষ্য দিচ্ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর স্থলাভিষিক্তকে মানুষ ভালোবাসবে না। কারণ আমি বুঝে ছিলাম যিনি রসূলের স্থলবর্তী হবেন লোকেরা তাঁকে হতভাগা মনে করবে। এজন্য আমি চাইছিলাম যেন রাসূলুল্লাহ (সা.) আবু বকরকে ছাড়া নামায পড়ানোর নির্দেশ দেন।

ইবনে যামআ (রা.) বলেন যে সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) লোকদের নামায পড়ার নির্দেশ দিচ্ছেলেন তখনো আবু বকর (রা.) আসেননি। এজন্য হযরত উমর এগিয়ে আসেন। কিন্তু নবী করীম (সা.) বললেন, না না না (তিনবার) আবু বকরই নামায পড়াবেন।

ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে, হযরত উমর (রা.) তাকবীরে তাহরীমা বললে নবী আকরাম (সা.) রাগান্বিত হয়ে মাথা তুলে বললেন, আবু কুহাফার ছেলে কোথায়? এ হাদীসের ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামদের অভিমত হলো, এটি সুস্পষ্ট দলিল যে, আবু বকর সিদ্দীক (রা.) সকল সাহাবার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম। তিনি সবচেয়ে বেশি খিলাফতের হকদার এবং ইমামতের যোগ্য।

ইমাম আশআরী বলেন, এটা প্রকাশ্য যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) আবু বকর সিদ্দীককে লোকদের নামায পড়াতে নির্দেশ করেন। সেখানে মুহাজির এবং আনসার সাহাবীগণ উপস্থিত ছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী তিনিই ইমামতি করবেন কুরআনের জ্ঞান যার সবচেয়ে বেশি। সুতরাং এ হাদীসের আবেদন হলো, হযরত আবু বকর গোটা উম্মত থেকে কুরআনের জ্ঞান বেশি রাখতেন। স্বয়ং সাহাবায়ে কেরাম রিদওয়ানুল্লাহি তা'আলা আলাইহিম আজমাঈনও উক্ত হাদীস দ্বারা এ ফলাফল বের করেছেন যে, আবু বকর সিদ্দীকই খিলাফতের বেশি হকদার ছিলেন। (যারা ফলাফল বের করেছেন) তাঁদের মধ্যে উমর (রা.) এবং আলী (রা.) অন্যতম।

ইবনে আসাকির হযরত আলী (রা.)-এর বর্ণনা নকল করেছেন, যখন নবী (সা.) হযরত আবু বকরকে নামায পড়ানোর নির্দেশ দিচ্ছিলেন তখন আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম, অসুস্থ ছিলাম না, আমার জ্ঞান ও চৈতন্য ছিল। অতঃপর আমরা নিজেদের দুনিয়ার জন্য তাঁর প্রতি রাযী হলাম, যাঁর প্রতি নবী করীম (সা.) আমাদের দ্বীনের জন্য রাযী হয়েছিলেন।

ওলামায়ে কেরাম বলেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) নবী (করীম) (সা.)-এর যুগেই ইমামতি করেন এবং পরামর্শদাতা হন। আহমদ এবং আবু দাউদ সহল বিন সাদ থেকে বর্ণনা করেন, একবার বনূ বিন আউফ গোত্রে বিবাদ ও কলহ দেখা দিলে সংবাদ পেয়ে হুযূর (সা.) যোহরের পর মিমাংসার জন্য সেখানে যান এবং যাবার সময় বলেন, হে বিলাল! নামাযের সময় হলে এবং আমি না ফিরলে আবু বকরকে নামায পড়াতে বলবে। সুতরাং যখন আসরের সময় হলো হযরত বিলাল (রা.) ইকামত দিলেন এবং তাঁর কথায় হযরত আবু বকর (রা.) নামায পড়ান।

আবু বকর শাফেঈ গীলানিয়াত গ্রন্থে এবং ইবনে আসাকির হযরত হাফসা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি অসুস্থ থাকাবস্থায় কি আবু বকরকে ইমাম বানিয়ে ছিলেন? তিনি জবাব দিলেন, না; বরং আল্লাহই তাঁকে ইমাম বানিয়েছেন।

দারা কুতনী ইফরাদ গ্রন্থে, খতীব এবং ইবনে আসাকির হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহর দরবারে তোমার ব্যাপারে তিনবার প্রশ্ন করেছি যে, তোমাকে ইমাম বানাব। কিন্তু সেখান থেকে তা প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং আবু বকর ইমামতির নির্দেশপ্রাপ্ত হন।

হযরত হাসান (রা.) থেকে ইবনে সাদ বর্ণনা করেন, আবু বকর সিদ্দীক রা. আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি স্বপ্নে নিজেকে অধিকাংশ লোকের আবর্জনা অতিক্রম করতে দেখেছি। হুযুর (সা.) বললেন, তুমি অবশ্যই লোকদের কাজ করার সুযোগ পাবে। তিনি আরয করলেন, আমি আমার বক্ষে দু'টি চিহ্ন দেখেছি। হুযুর (সা.) বললেন, তোমার খিলাফতের সময় দু'বছর।

ইবনে আসাকির বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর (রা.) বলেন, আমি একদিন উমর ফারুকের নিকট গেলাম। সে সময় তাঁর নিকট কতিপয় লোক খানা খাচ্ছিল। আমি পেছনের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা কি পূর্ববর্তী নবীগণের কিতাবগুলো পড়েছ? সে বলল, এতে লেখা রয়েছে শেষ নবীর খলীফা হবেন সিদ্দীক।

ইবনে আসাকির কর্তৃক বর্ণিত, মুহাম্মদ বিন যুবাইয়ের বলেন, উমর বিন আব্দুল আযীয (রা.) আমাকে কতিপয় প্রশ্ন করার জন্য ইমাম হাসান বসরীর খেদমতে পাঠালেন। আমি তাঁকে বললাম, হযরত আবু বকরের খেলাফত নিয়ে লোকেরা মতভেদ করেছিল। আপনি আমাকে পূর্ণাঙ্গ জবাব দিন যে, হুযূর (সা.) তাঁকে খলীফা বানিয়ে ছিলেন? তিনি রেগে বসে পড়লেন এবং বললেন, কেন এতে কি কোনো সন্দেহ রয়েছে? আল্লাহর কসম, আল্লাহ তা'আলাই তাঁকে খলীফা বানিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা কেন খলীফা বানাবেন না, তিনি সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী এবং মুত্তাকী লোকেরা তাকে খলীফা না বানানো পর্যন্ত তিনি মৃত্যুবরণ করতেন না।

ইবনে আদী কর্তৃক বর্ণিত, আবু বকর বিন আয়াশ বলেন, হাকীম রশীদ আমাকে বললেন, লোকেরা আবু বকরকে কিভাবে খলীফা বানিয়ে নিল? আমি বললাম, ইয়া আমিরুল মুমিনীন! এ কাজে আল্লাহ, তাঁর রসূল এবং সকল মুসলমান নীরব ছিল। খলীফা হারুন রশীদ বললেন, একটু ব্যাখ্যা করে বল। আমি বললাম, হে আমিরুল মুমিনীন! নবী করীম (সা.) আটদিন অসুস্থ ছিলেন। এ সময় হযরত বিলাল (রা.) আরয করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! কে নামায পড়াবেন? তিনি বললেন, আবু বকরকে নামায পড়াতে বলো। আবু বকর সিদ্দীক (রা.) আটদিন পর্যন্ত নামায পড়ান এবং এ দিনগুলোতে নিয়মিত ওহী নাযিল হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর নীরবতার কারণে নীরব ছিলেন এবং সকল মুসলমান রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নীরবতার কারণে নীরব ছিলেন। হারুন রশীদের নিকট এ অভিমতটি অত্যন্ত পছন্দনীয় মনে হলো এবং বললেন- বারাকাল্লাহু ফীক।

ওলামায়ে কেরামের একটি দল হযরত আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতের প্রমাণ পেশ করেছেন। বাইহাকী বর্ণনা করেন, ইমাম হাসান বসরী (র.) এ আয়াত দ্বারা দলিল দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন- 'ইয়া আইয়্যাহাল্লাযীনা আমানু মাই ইয়ারতাদ্দা মিনকুম আন দিনিহি ফাসাউফা ইয়া'তিল্লাহু বি কাওমিন তুহিব্বুহুম ওয়া ইয়ুহিব্বুনাহু'। অর্থ হে ঈমানদারগণ! যারা তোমাদের ধর্ম ত্যাগ করবে তাদের ব্যাপারে কোনো আক্ষেপ নেই। অচিরেই আল্লাহ তা'আলা এমন এক জাতি পাঠাবেন যারা আল্লাহ তা'আলাকে এবং আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ভালোবাসবেন। ইমাম হাসান (র.) বলেন, আল্লাহর কসম! আরব যখন ধর্মত্যাগী হয় আবু বকর এবং তাঁর সাথীরাই মুরতাদদের সাথে জিহাদ করে তাদের ইসলামে ফিরিয়ে আনেন।

ইউনুস বিন বাকীর কাতাদা (রা.)-এর বরাত দিয়ে লিখেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মৃত্যুর পর আরবের কতিপয় লোক মুরতাদ হয়ে যায়। তখন আবু বকর (রা.) তাদের সাথে জিহাদ করেছিলেন। সে সময় আমরা পরস্পরে বলতাম, কুরআনের এই আয়াত এবং তাঁর সাথীদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে।

ইবনে আবী হাতেম কুতায়বার থেকে বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- 'কুল্লিল মুখাল্লাফীনা মিনাল আ'রাবি সাতুদআওনা ইলা কাওমিন উলি বা’সিন শাদীদিন'। এ আয়াতে উল্লিখিত কঠোর লড়াইকারী দ্বারা বনু হুলায়ফা গোত্র উদ্দেশ্য। ইবনে আবী হাতেম এবং ইবনে কুতাইবা বলেন, এ আয়াতটি হযরত আবু বকরের খিলাফতের দলিল। কারণ তিনিই লোকদের তীব্র থেকে তীব্রতরভাবে লড়াই করার আহ্বান জানান।

শায়খ আবুল হাসান আশআরী (র.) বলেন, আবু আব্বাস সুরাইহ থেকে শুনেছি, তিনি বলেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীকের খিলাফত কুরআন শরীফের উপরোল্লিখিত আয়াত দ্বারা প্রমাণিত। কারণ ওলামায়ে কেরাম এ বিষয়ে একমত যে, এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর আবু বকর সিদ্দীক (রা.) ব্যতীত যাকাত অস্বীকারকারীর বিরুদ্ধে কেউ জিহাদ করেন নি। সুতরাং এ আয়াতটি হযরত আবু বকরের খিলাফতের জন্য দাবী রাখে এবং তাঁর আনুগত্য করা মানুষের জন্য ফরয, কারণ যে তা মান্য করবে না আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই তাকে শাস্তি দিবেন।

ইবনে কাসীর (র.) বলেন, কতিপয় মুফাসসিরীন রোম, শাম এবং পারস্যের যুদ্ধ দ্বারা এ আয়াতের তাফসীর করেছেন। কিন্তু এ যুদ্ধগুলো প্রস্তুতি হযরত আবু বকরই গ্রহণ করেন, যদিও তা হযরত উমর ফারুক এবং হযরত উসমান গনীর যুগে এসে শেষ হয়েছে। তারা দু'জনই হযরত আবু বকরের অনুসারী ছিলেন।

ইবনে কাসীর (র.) বলেন, ইরশাদ হচ্ছে- 'ওয়াআদাল্লাহুল্লাযীনা আমানু মিনকুম ওয়া আমিলুস সালিহাতি লাইয়াস্তাখলিফান্নাহুম ফিল আরদি'। এ আয়াতটি হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর খিলাফতের দলিল। ইবনে আবী হাতেম স্বরচিত তাফসীর গ্রন্থে আব্দুর রহমান বিন আব্দুল হামীদ আল মাহদী থেকে বর্ণনা করেন- 'ওয়াআদাল্লাহুল্লাযীনা আমানু মিনকুম ওয়া আমিলুস সালিহাতি লাইয়াস্তাখলিফান্নাহুম ফিল আরদি'। আল্লাহ তা'আলার এ বাণী দ্বারা হযরত আবু বকর এবং হযরত উমরের খিলাফত প্রমাণিত।

খতীব আবু বকর বিন আয়াশ থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর খলীফা এবং তাঁর খিলাফত কুরআন দ্বারা প্রমাণিত। এ প্রেক্ষিতে ইরশাদ হচ্ছে, 'লিলফুকারায়েল মুহাজিরিন' থেকে 'উলাইকা হুমুস সদ্দিকুন' পর্যন্ত। উল্লিখিত আয়াতে সদ্দিকুন শব্দ দ্বারা সাহাবায়ে কেরাম উদ্দেশ্য। আর আল্লাহ তা'আলা যাকে সদ্দিক বলেছেন তিনি কখনো মিথ্যা বলতে পারেন না। আর সাহাবাগণ সর্বদা হযরত আবু বকরকে হে আল্লাহর রসূলের খলীফা বলে সম্বোর্ডন করতেন। ইবনে কাসীর (র.) বলেন, এ গবেষণাটি অত্যন্ত সুন্দর।

যা'ফারানী বলেন, আমি ইমাম শাফেঈ (র.)-এর নিকটে শুনেছি। তিনি বলেন, আবু বকরের খিলাফতের বিষয়ে ইজমা হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মৃত্যুর পর লোকদের মধ্যে দুনিয়ায় আবু বকরের চেয়ে ভালো মানুষ না থাকায় লোকেরা তার হাতে বাইআত গ্রহণ করেন। (বাইহাকী)

আসাদুস সুন্নাহ (ফায়ায়েল গ্রন্থে মুআবিআ বিন কাররাহ থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকরের খিলাফত সম্বন্ধে সাহাবায়ে কেরাম কোনো প্রকার সন্দেহ পোষণ করতেন না। তারা সবসময় হযরত আবু বকরকে আল্লাহর রসূলের খলীফা বলে সম্বোধন করতেন। আর সাহাবীদের ইজমা কখনো ভুল এবং বিভ্রান্তকর হতো না।

হাকেম ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, যে জিনিসকে সকল মুসলমান ভাল মনে করে তা আল্লাহর কাছেও ভালো। আর যা সকল মুসলমানের নিকট মন্দ তা আল্লাহর কাছেও মন্দ। সকল মুসলমান আবু বকরের খিলাফতকে ভালো মনে করত। সুতরাং তা আল্লাহ তা'আলার নিকটেও ভালো ও উত্তম।

হাকেম এবং যাহাবী লিখেছেন, হযরত আবু বকরের খিলাফতের পর একদিন আবু সুফিয়ান বিন হরব হযরত আলীর নিকট এসে এসে বললেন, লোকদের কাজ গুলো দেখুন, তারা কুরাইশদের এক নগণ্য ব্যক্তির নিকট বাইআত গ্রহণ করেছে। আপনি চাইলে অশ্বারোহী এবং পদাতিক সৈন্য দিয়ে মদীনা ভরে দিব। হযরত আলী (রা.) বললেন, হে আবু সুফিয়ান! আপনি দীর্ঘ সময় ধরে ইসলামের শত্রুতা করে এসেছেন, আপনি কলহ প্রিয়। আমার দৃষ্টিতে আবু বকরের খিলাফতের কোনো মন্দ বিষয় নেই। কারণ তিনি প্রত্যেকটি বিষয়ে দক্ষ ও হকদার।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00