📄 ইলম (জ্ঞান)
হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) সাহাবীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় আলেম (জ্ঞানী) এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। ইমাম নব্বী তাহযীব গ্রন্থে লিখেছেন, ওলামায়ে কেরাম হযরত আবু বকরের বিশাল জ্ঞান ভাণ্ডারের উপর ইমাম বুখারী (র.) এবং ইমাম মুসলিম (র.)-এর একখানা হাদীসের দ্বারা প্রমাণ পেশ করেছেন। হযরত আবু বকর (রা.) বলেন, আল্লাহর কসম, কেউ যদি নামায এবং রোযার মধ্যে সামান্যতমও তারতম্য করে তবে আমি তার সাথে লড়াই করব। তারা আমাকে দুর্বল ভেবেছে। নবী (সা.)-এর যুগে তারা যতটুকু যাকাত আদায় করেছে, যদি তারা এর চেয়ে তিল পরিমাণ কম করে আমি তাদের মোকাবিলা করব।
শায়খ আবু ইসহাক এ হাদীস দ্বারা দলিল দেন যে, হযরত আবু বকর (রা.) সর্বাধিক জ্ঞানী এবং সবচেয়ে বড় আলেম। কারণ সাহাবায়ে কেরাম যখন এ মাসয়ালা নিয়ে বিব্রত হয়েছিলেন তখন মাসয়ালাটি হযরত আবু বকর (রা.)-এর খেদমতে এ মর্মে প্রেরণ করা হয় যে, আপনার অভিমতটি বিতর্কের ঊর্ধ্বে পরিশুদ্ধ হিসেবে সাহাবাগণ গ্রহণ করবেন। ইবনে উমরকে জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেন, রসূলুল্লাহ (সা)-এর যুগে কে ফতোয়া দিতেন? তিনি বলেন, আবু বকর (রা.) এবং উমর (রা.)-এর চেয়ে বড় আলেম আর কেউ ছিলেন না। আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, একদিন নবী করীম (সা.) খুতবার মধ্যে বলেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁর এক নেককার বান্দাকে দুনিয়া অথবা আখেরাত উভয়ের যে কোন একটি গ্রহণের অধিকার দিয়েছেন। আর সেই বান্দা আখেরাতকে পছন্দ করেছেন।
এতদশ্রবণে হযরত আবু বকর (রা.) কাঁদতে লাগলেন এবং বললেন, আমার পিতা মাতা তাঁর প্রতি কুরবান হোক। আমরা তাঁর কান্নায় আশ্চর্যান্বিত হয়ে পড়লাম। কারণ নবী করীম (সা.) দৃশ্যত জনৈক ব্যক্তির কথা বলেছেন। আর সেই জনৈক ব্যক্তিটি যে তিনি স্বয়ং নবী (সা.) তা আমরা কেউ বুঝতে পারিনি। কিন্তু আবু বকরের জ্ঞান ভাণ্ডারে তা ধরা পড়েছে। এ কারণে তিনি সবচেয়ে বড় আলেম ও জ্ঞানী। (বুখারী, মুসলিম)
নবী করীম (সা.) বলেন, আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারীদের মধ্যে আবু বকরের সম্পদ এবং সাহচর্য আমার উপর সবচেয়ে বেশি অনুগ্রহ করেছে। যদি আমি আল্লাহ ছাড়া কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করি, তবে তিনি আবু বকর। ইসলামের প্রতি তাঁর সত্যিকার ভালোবাসার কথা সর্বদা আমার অন্তরে বিদ্যমান থাকবে। (নব্বী)
ইবনে কাসীর (র.) বলেন, আল্লাহর কালাম সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ছিল সবচেয়ে বেশি। কারণ নবী করীম (সা.) তাঁকে নামাযের জন্য সাহাবীদের ইমাম বানিয়েছিলেন। আর হুযুর (সা.) নিজেই বলেছেন, জাতির ইমাম সেই হবে যার জ্ঞান ভাণ্ডার কুরআনের জ্ঞানে সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধ। অধিকন্তু তিনি আরো বলেন, যে সম্প্রদায়ে আবু বকর রয়েছে সেখানে তিনি ছাড়া কেউ ইমাম হতে পারবে না। এ হাদীসটি তিরমিযী বর্ণনা করেন।
এরূপভাবে হাদীসের উপরও তাঁর বিরাট দখল ছিল। সাহাবাগণ হাদীস সম্বন্ধে অধিকাংশ বিষয়ে তাঁর মুখাপেক্ষী থাকতেন। সবসময় নবী করীম (সা.)-এর হাদীস তাঁর সামনে পেশ করা হতো। কারণ তিনি রসূলের হাদীসের ভাণ্ডার স্মরণ রাখতেন এবং জরুরী মুহূর্তে বিষয়াদি তাঁর সমীপেই উপস্থাপন করা হতো। তিনি সর্বাধিক হাদীসের হাফেজ ছিলেন। কারণ রিসালাতের ঊষালগ্ন থেকে মৃত্যু অবধি তিনি সবসময় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে থাকতেন। তাঁর মুখস্থ শক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। তিনি ছিলেন জ্ঞানবান এবং ধীশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি।
হযরত আবু বকর (রা.) থেকে অত্যন্ত কম সংখ্যক হাদীস বর্ণিত হয়েছে- এ কথাটি বেদনাদায়ক এবং তা বিস্ময়ের জন্ম দেয়। কম হাদীস বর্ণনা করার কারণ নবীজীর মৃত্যুর পর তিনি খুব সামান্য ক'দিন বেঁচেছেন। যদি লম্বা সময় পর্যন্ত জীবিত থাকতেন তবে তাঁর বর্ণনা সকল সাহাবার চেয়ে বেশি হতো এবং আবু বকরের সনদ ছাড়া কোনো হাদীস পাওয়া যেত না। হাদীস বর্ণনা করার ক্ষেত্রে আবু বকরের জন্য অন্য সাহাবীর সাহায্য নেয়া প্রয়োজন হতো না। এ জন্য যে, তিনি সর্বদা রসূলের সাথে থাকতেন এবং হাদীস শুনতেন। সুতরাং তিনি নিজেই রসূলুল্লাহ (সা.) থেকে হাদীস বর্ণনা করতেন। তবে এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, হযরত আবু বকর (রা.) অন্য সাহাবীর থেকে কিছু হাদীস রেওয়ায়েত করেছেন, এটা কেন? তিনি নিজে যা শোনেননি তা শুনে নিয়ে বর্ণনা করেছেন।
মাইমুন বিন মেহরান (র.) বলেন, হযরত আবু বকরের নিকট কোনো বিচার আসলে এ সংক্রান্ত মাসয়ালা কুরআন শরীফে অনুসন্ধান করতেন এবং কুরআন শরীফের নির্দেশিত পথে ফায়সালা করতেন। যদি কুরআন শরীফে সমাধান না পেতেন, তবে রসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীস অনুযায়ী ফায়সালা করতেন। যদি এ সংক্রান্ত কোনো হাদীস তাঁর স্মরণ না থাকত তবে বাইরে এসে লোকদের জিজ্ঞেস করতেন, আমার কাছে এ ধরনের বিচার এসেছে। তোমাদের মধ্য থেকে কেউ কি জান এ ধরনের বিচারের প্রেক্ষিতে রসূলুল্লাহ (সা.) কি সমাধান দিয়েছেন? তাঁর নিকট সকল সাহাবী একত্রিত হতেন এবং যদি কেউ এ সংক্রান্ত হাদীস বর্ণনা করতেন তবে এ অনুযায়ী তিনি ফায়সালা করতেন এবং খুশি হয়ে আল্লাহর শুকর আদায় করতেন আলহামদুলিল্লাহ! আমাদের মধ্যে এমন ব্যক্তি আছেন যিনি নবী করীম (সা.)-এর হাদীসকে স্মরণ রেখেছেন। যদি হাদীসেও সমাধান পাওয়া না যেত তবে তিনি বড় বড় সাহাবীদের একত্রিত করে পরামর্শ করতেন, অধিকাংশ অভিমতের উপর তিনি ফায়সালা দিতেন। হযরত উমর ফারুক (রা.) ও তাই করতেন।
আবু বকর (রা.) আরবের সাধারণ এবং কুরাইশদের বিশেষ বংশ পরম্পরা সম্পর্কে দারুণভাবে জানতেন। আরব এবং কুরাইশ বংশ পরম্পরা বিশেষজ্ঞ জুবায়ের বিন মুতঈম (র.) বলেন, আমি বংশ পরস্পরার জ্ঞান আবু বকরের কাছ থেকেই নিয়েছি। তিনি আরবের এক বিশিষ্ট বংশ পরস্পরা বর্ণনাকারী। তাঁর স্বপ্নের ব্যাখ্যাজ্ঞান ছিল আগাধ। নবী করীম (সা.)-এর যুগে তিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতেন। মুহাম্মদ বিন সিরীন (র.) একজন বিশিষ্ট স্বপ্নের ব্যাখ্যাকার তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সা.)-এর পর হযরত আবু বকর (রা.) সবচেয়ে বড় ব্যাখ্যাকারক। হযরত সামুরাহ (রা.) বলেন, একদা হুযুর (সা.) বলেন, আল্লাহ তা'আলা আমাকে আবু বকর সিদ্দীকের নিকট থেকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা করিয়ে নেবার নির্দেশ দিয়েছেন। (দাইলামী)
ইবনে কাসীর (র.) বলেন, হযরত আবু বকর (রা.) সবচেয়ে বেশি বাকপটু এবং বাগ্মী ছিলেন। তিনি খুব সুন্দর করে বক্তৃতা দিতে পারতেন। যুবাইর বিন বাকার বলেন আমি ওলামাদের নিকট থেকে শুনেছি সবচেয়ে বড় বাগ্মী ছিলেন আবু বকর (রা.) এবং আলী (রা.)। তিনি আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করতেন। স্বপ্নের ব্যাখ্যা, আল্লাহর ভয় এবং বাগ্মীতা পৃথক পৃথক অধ্যায়ে বর্ণনা করা হবে।
সাহাবীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় আলেম হওয়ার ক্ষেত্রে সুলেহ হুদায়বিয়ার হাদীস দ্বারা দলিল পেশ করা হয়। হুদায়বিয়ার সন্ধির ব্যাপারে হযরত উমর রসূলুল্লাহ (সা.)-কে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন, তিনি তাঁর জবাবও দেন। অতঃপর হযরত উমর হযরত আবু বকরের নিকট গিয়ে একই প্রশ্ন করেন। হযরত আবু বকর (রা.) হুবহু নবী (সা.)-এর উত্তরগুলো আবার প্রদান করেন। (বুখারী) এজন্য তাঁকে সর্বোত্তম জ্ঞানী বলা হয়।
ইবনে আস প্রমুখ বলেন, রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, হযরত জিবরাঈল আমাকে বলেছেন, আল্লাহ তা'আলার হুকুম- আমি যেন আবু বকরের সাথে পরামর্শ করি। (তামামুর রাযী)
মা'আয বিন জাবাল (রা.) বর্ণনা করেন, আমাকে ইয়ামেনে পাঠানোর সময় মজলিসে শূরা গঠন করা হয়। এতে আবু বকর, উমর, উসমান, আলী, তালহা, যুবাইর, উসাইদ বিন হাযীর উপস্থিত ছিলেন। সকলেই নিজ নিজ মতামত পেশ করেন। অতঃপর হুযূর (সা.) আমার মত জানতে চাইলে হযরত আবু বকরের অনুরূপ মত ব্যক্ত করলাম। নবী (সা.) বললেন, আবু বকর ভুল করুক। এটা আল্লাহ তা'আলা চান না। হাদীসখানা তাবারানী বর্ণনা করেছেন। ইবনে উসামার বক্তব্য এ ধরনের, আসমানে আল্লাহর অভিপ্রায় এটা নয় যে, যমীনে আবু বকর ভুল করবে। এটিও তাবারানী বর্ণনা করেছেন, এর বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
ইমাম নব্বী বলেন, হযরত আবুবকর সিদ্দীক (রা.) সাহাবীদের মধ্যে অনন্য হাফেজে কুরআন ছিলেন, হযরত আনাস (রা.) বলেন, নবী (সা.)-এর যুগে আনসারদের চার সাহাবী কুরআনকে একত্রিত করেছেন। আবু দাউদ শা'বী বলেন, হযরত আবু বকরের মৃত্যু পর্যন্ত সম্পূর্ণ কুরআন শরীফ জমা হয়নি-এ কথাটি পরিত্যাজ্য, অথবা কথাটিকে এভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে যে, হযরত উসমান (রা.) যে পদ্ধতিতে কুরআনকে সন্নিবেশিত করেছেন, সেভাবে জমা করা হয়েছিল না।
📄 তিনি সকল সাহাবা থেকে উত্তম
আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের সকল ওলামায়ে কেরাম এ বিষয়ে একমত যে, রসূলুল্লাহ (সা.)-এর পর সকল উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম আবু বকর, অতঃপর হযরত উমর, অতঃপর হযরত উসমান, অতঃপর হযরত আলী, অতঃপর আশারায়ে মুবাশশারা, অতঃপর আহলে বদর, অতঃপর আহলে উহুদ অতঃপর আহলে বাইত, অতঃপর সকল সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম। আবুল মানসুর বাগদাদী একটি ইজমা বর্ণনা করেছেন। ইবনে উমর (রা.) বলেন, আমরা পরস্পরে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-কে সাহাবীদের মধ্যে সর্বোত্তম হিসেবে গণ্য করেছি, অতঃপর হযরত উমর (রা.), অতঃপর হযরত উসমান (রা.)। এ হাদীসটির শেষ দিকে তাবারানী এতটুকু বৃদ্ধি করেছেন যে, এ কথা রসূলুল্লাহ (সা.) শোনার পরও তা অপন্দ করেন নি।
ইমাম বুখারী (রহ.) ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেন, আমাদের মধ্যে রসূলুল্লাহ (সা.) থাকা অবস্থায় আমরা সাহাবীদের মধ্যে হযরত আবু বকরকে সর্বোত্তম মনে করতাম। অতঃপর উমর, অতঃপর উসমান, অতঃপর আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুম।
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আমরা অসংখ্য সাহাবী পরস্পরের মধ্যে একথা বলতাম যে, এ উম্মতের মধ্যে নবীর পর সর্বোত্তম ব্যক্তি হলেন হযরত আবু বকর, তারপর হযরত উমর, তারপর হযরত উসমান, তারপর আমরা নীরব হয়ে যেতাম। (ইবনে আসাকির)
জাবের বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, একবার হযরত উমর (রা.) হযরত আবু বকরকে “রসূলের পর লোকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি” বলে সম্বোধন করেন। হযরত আবু বকর তাঁকে বললেন, তুমি নিজেকে বাদ দিয়ে কেন? আমি নবী করীম (সা.) থেকে নিজে শুনেছি, উমর থেকে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির উপর সূর্য কখন উদিত হয় না। (তিরমিযী)
মুহাম্মদ বিন আলী বিন আবু তালিব (রা.) বলেন, আমি আমার পিতা হযরত আলীকে জিজ্ঞেস করলাম, নবীর পর কে সর্বোত্তম? তিনি বললেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)। আমি বললাম, তারপর? তিনি বললেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)। আমি বললাম, তারপর? তিনি বললেন, হযরত উমর (রা.)। অতঃপর হযরত উসমানের নাম নিতে গিয়ে তিনি ভয় করলেন। অতঃপর আরয করা হলো, তারপর কি আপনিই সর্বোত্তম? তিনি বললেন, আমি এমনকি? আমি একজন সাধারণ মুসলমান। (বুখারী)
আহমদ (র.) বলেন, হযরত আলীর কয়েকটি মুতাওয়াতের হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, এ উম্মতের মধ্যে নবীর পর হযরত আবু বকর (রা.) সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ। রাফেযীদের উপর আল্লাহর অভিশাপ অবতীর্ণ হোক। তারা নিরবচ্ছিন্ন অন্ধকারে ফেঁসে গেছে।
হযরত উমর বিন খাত্তাব (রা.) বলেন, হযরত আবু বকর আমাদের নেতা, তিনি সর্বোত্তম ব্যক্তি। তিনি আমাদের মধ্যে হুযূর (সা.)-কে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। (তিরমিযী)
একবার হযরত উমর (রা.) মিম্বরে উঠে বললেন, এ উম্মতের মধ্যে নবীর পর সর্বশ্রেষ্ঠ সাহাবী হযরত আবু বকর (রা.)। যে ব্যক্তি তাঁর বিরুদ্ধে অপবাদ দিবে, তার অপবাদকারীর গুনাহ হবে। (ইবনে আসাকির)
হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এবং উমর ফারুক (রা.) অপেক্ষা আমাকে যে প্রাধান্য দিবে আমি তাকে আশিটি চাবুকাঘাত করব। (ইবনে আসাকির)
আবু দারদা (রা.) বলেন, নবী (সা.) বলেছেন, নবী ছাড়া কোনো ব্যক্তি এমন নেই যার উপর সূর্য উদিত ও অস্ত যায় এবং তিনি হযরত আবু বকর থেকে উত্তম।
এক রেওয়ায়েতে রয়েছে, নবী এবং রসূলদের পর আবু বকরের চেয়ে উত্তম আর কেউ নেই। হযরত জাবের (রা.)-এর হাদীস, কারো উপর সূর্য উদিত হয় না যে, হযরত আবু বকর থেকে শ্রেষ্ঠ হয়। (তাবারানী) এ রেওয়ায়েতটি বিশুদ্ধ বলে বিবেচিত। ইবনে কাসীর সে দিকেই ইশারা করেছেন।
সালমা বিন আকওয়া (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আবু বকর নবীর পর লোকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। সাদ বিন যেরারাহ বলেন, রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জিবরাঈল (আ.) আমাকে এ সংবাদ জানিয়েছেন যে, আমার উম্মতের মধ্যে আপনার পর আবু বকর সর্বোত্তম ব্যক্তি। (তাবারানী) আমর বিন আস (রা.) বলেন, আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা.)! লোকদের মধ্যে আপনার প্রিয়তম ব্যক্তি কে? তিনি বললেন, আয়েশা সিদ্দীকা। আমি বললাম, পুরুষদের মধ্যে? তিনি বললেন, তাঁর পিতা আবু বকর। আমি বললাম, তারপর? তিনি বললেন, উমর। (বুখারী, মুসলিম) ইমাম তিরমিযী বলেন, এক বর্ণনায় উমরের নাম নেই।
হাকেম আব্দুল্লাহ বিন শাকীক থেকে বর্ণনা করেন, আমি হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, রসূলুল্লাহ (সা.)-এর দৃষ্টিতে সবচেয়ে প্রিয় কে? তিনি বললেন, আবু বকর সিদ্দীক (রা.)। আমি বললাম, তারপর? তিনি বললেন, আবু উবায়দা বিন জাররাহ (রা.)। হযরত আনাস (রা.) বলেন, হযরত আবু বকর (রা.) এবং হযরত উমরের শানে রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তারা দু'জনে পয়গম্বরগণ ব্যতীত জান্নাতে সকল মানবকুলের সর্দার হবেন। হযরত আলী, ইবনে আব্বাস, ইবনে উমর, আবু সাঈদ খুদরী এবং জাবের বিন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকেও অনুরূপ অসংখ্য হাদীস বর্ণিত রয়েছে।
আম্মার বিন ইয়াসার (রা.) বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি আবু বকর এবং উমরের উপর সাহাবীদের মধ্য থেকে কাউকে প্রাধান্য দেয় তাহলে সে যেন আনসার এবং মুহাজিরদের প্রতি অত্যাচার করল এবং অপবাদ দিল। (তাবারানী)
যুহরী বলেন, একদা রসূলুল্লাহ (সা.) হাসসান বিন ছাবিতকে বললেন, তুমি আবু বকরের শানে কোনো কবিতা রচনা করনি? তিনি বললেন, করেছি। হুযূর (সা.) বললেন, আবৃত্তি করে শোনও- আমি শুনব। তিনি আবৃত্তি করলেন (যার অর্থ) "আবু বকর নবী করীম (সা.)-এর গুহার সাথী। তিনি যখন পর্বত শীর্ষে আরোহণ করেছিলেন তখন শত্রুরা তাঁর চারদিকে ঘুরছিল। পৃথিবীর যত প্রেম ভালবাসা তিনি নবীর প্রতি নিবেদন করেছেন। পৃথিবীতে আর কেউ তাঁকে এতটুকু ভালোবাসেননি।" এ কবিতা শ্রবণে নবী করীম (সা.) হাসলেন এবং বললেন, হাস্ সান তুমি সত্যই বলেছ। তিনি এমনটাই। (ইবনে সাদ)
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
হযরত আনাস (রা.) বলেন, রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে বড় মেহেরবান আবু বকর, সবচেয়ে বেশি কঠোর উমর, অত্যন্ত লজ্জাশীল উসমান, সবচেয়ে বেশি হালাল-হারাম সম্পর্কে অবগত মা'আয বিন জাবাল, উত্তরাধিকার আইনবেত্তা যায়েদ বিন ছাবেত, সবচেয়ে বড় ক্কারী উবাই বিন কা'ব, সকল উম্মতে একজন বিশ্বাসী লোক থাকেন আমার উম্মতের বিশ্বাসী ব্যক্তি আবু উবায়দা বিন জাররাহ (রা.)। (আহমদ, তিরমিযী)
এ হাদীসটি ইবনে উমর এতটুকু বৃদ্ধি করেছেন, সর্বোত্তম বিচারক হযরত আলী। (আবু ইয়ালা) শাদ্দাদ বিন আউস এতটুকু বৃদ্ধি করেছেন, সর্বাধিক ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তি আবু যর (রা.)। সবচেয়ে বেশি ইবাদতকারী এবং মুত্তাকী আবু-দ্দারদা (রা.) এবং সবচেয়ে বেশি সহনশীল ও ধৈর্যশীল হলেন, মুআবিয়া (রা.)। (দাইলামী)।
📄 কুরআনের আয়াত দ্বারা আবু বকর (রা.)-এর প্রশংসা ও সত্যায়নের বিবরণ
আমি এ বিষয়ে কয়েকখানা পুস্তক রচনা করেছি এবং একখানা প্রণিধানযোগ্য গ্রন্থও লিখেছি। সেই পদ্ধতি অনুসারে এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করতে চাই। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْهُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّهُمَا مَعَنَا فَانْزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَيْهِ
মুসলিম জাতি এ বিষয়ে একমত যে, উল্লিখিত আয়াতে صَاحِبِ (সাহিব) শব্দের উদ্দেশ্য আবু বকর সিদ্দীক (রা.)। এ ব্যাপারে স্বয়ং আবু বকর (রা.)-এর বিবরণ অচিরেই আসছে।
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, হিজরতের সফরে নবী করীম (সা.) ভরসা হারাননি। সুতরাং صَاحِبِ শব্দ দ্বারা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-কে বুঝানো হয়েছে। (ইবনে আবী হাতেম)
ইবনে আবী হাতেম, ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, যখন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) উমাইয়া বিন খালফের নিকট থেকে হযরত বিলালকে একখানা চাদর এবং চার শত দেরহামের বিনিময়ে ক্রয় করে মুক্ত করে দেন তখন হযরত আবু বকরের শানে এবং উমাইয়ার ব্যাপারে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। وَاللَّيْلِ إِذَا يَغْشَى - وَالنَّهَارِ إِذَا تَجَلَّى - وَمَا خَلَقَ الذَّكَرَ وَالْأُنْثَى - إِنَّ سَعْيَكُمْ لَشَتَّى
আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের (রা.) বলেন, মক্কী জীবনে আবু বকর (রা.)-এর নীতি ছিল যখন কোনো দুর্বল ও বৃদ্ধা নারী ইসলাম গ্রহণ করতেন তখন তিনি তাদের ক্রয় করে আযাদ করে দিতেন। একদিন তাঁর পিতা বললেন, হে আমার বৎস! আমি দেখেছি তুমি দুর্বল লোকদের ক্রয় করে আযাদ করে দিচ্ছ। এর পরিবর্তে যদি শক্তিশালী এবং তরুণদের কিনে আযাদ করে দিতে তবে তারা বিপদের দিনে তোমার সাহায্য করতে পারত। তিনি বললেন, বাবা! আমার উদ্দেশ্য আল্লাহ তা'আলার স্বীকৃতি এবং সন্তুষ্টি অর্জন, দুনিয়ায় লাভবান হওয়া আমার কামনা নয়। এ ব্যাপারে এ আয়াত নাযিল হয়- فَأَمَّا مَنْ أَعْطَى وَاتَّقَى الخ (ইবনে জারীর)
হযরত উরওয়া বর্ণনা করেন, মুসলমান হওয়ার পর যে সাতজন ব্যক্তির উপর অকথ্য নির্যাতনের রোলার চালানো হয় তাদেরকে কিনে আযাদ করে দেয়ার প্রেক্ষিতে তাঁর ব্যাপারে এ আয়াত নাযিল হয়- وَسَيُجَنَّبُهَا الْاَتْقَى الَّذِي يُؤْتِي مَالَهُ يَتَزَكَّى - (SA)
আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর (রা.) বলেন- وَمَا لِاَحَدٍ عِنْدَهُ مِنْ نِعْمَةٍ -তজযী হযরত আবু বকরের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। (বাযযার)
হযরত আয়েশা বলেন, কসমের কাফফারা অবতীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত হযরত আবু বকর (রা.) কসম ভঙ্গ করেননি। (বুখারী) হযরত আলী বলেন, وَالَّذِي جَلّى بِالْحَق দ্বারা মুহাম্মদ (সা.)-কে বুঝানো হয়েছে। আর وَصَدَّقَ بِهِ দ্বারা আবু বকর (রা.) উদ্দেশ্য। ইবনে আসাকির বলেন, হযরত আলীর কেরাত وَالَّذِي جَاءَ بِالْحَق আর ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন- وَشَاوِرُهُمْ فِي الْأَمْرِ হযরত আবু বকর এবং হযরত উমর (রা.)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। (হাকেম)
ইবনে হাতেম ইবনে শাওজিব থেকে রেওয়ায়েত করেন- وَلِمَنْ خَافَ মাকাম রব্বীহি জান্নাতান এ আয়াতটি হযরত আবু বকরের শানে নাযিল হয়েছে। আমার আসবাবে নুযূল গ্রন্থে এ হাদীসের সম্পূর্ণ সনদ বর্ণনা করেছি। ইবনে উমর (রা.) এবং ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, صَالِحُ الْمُؤْمِنِينَ দ্বারা হযরত উমর ফারুক (রা.) এবং হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) উদ্দেশ্য। (তাবারানী, আওসাত)
হযরত মুজাহিদ বর্ণনা করেন, إِنَّ اللَّهَ وَمَلْئِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ । আয়াতটি নাযিল হওয়ার পর আবু বকর (রা.) আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা.)! আমাকে সম্পৃক্ত না করে আল্লাহ তা'আলা আপনার জন্য কোনো আয়াত নাযিল করেননি, শুধু এ আয়াত ছাড়া। এ প্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়- هُوَ الَّذِي يُصَلَّى عَلَيْكُمْ وَمَلَئِكَتُهُ
ইবনে আসাকির ইমাম যাইনুল আবেদীন বিন আলী বিন হোসাইন থেকে নকল করেছেন, আবু বকর (রা.), উমর (রা.) এবং আলী (রা.) শানে এ আয়াত নাযিল হয়- وَنَزَعْنَا مَا فِي صُدُورِهِمْ مِنْ غِلَّ إِخْوَانًا عَلَى سُرُرٍ مُتَقَابِلِينَ
ইবনে আসাকির হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন- وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ إِحْسَانًا ، وَعَدَ الصِّدْقِ الَّذِي كَانُوا يُوعَدُونَ পর্যন্ত হযরত আবু বকরের শানে নযিল হয়েছে। ইবনে আসাকির ইবনে উয়াইনিয়্যা থেকে বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা সকল মুসলমানের উপর রসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট অসন্তোষ প্রকাশ করেন। কিন্তু এ অসন্তোষ আবু বকরের উপর ছিল না। এ প্রেক্ষিতে এ আয়াত প্রণিধানযোগ্য- إِلَّا تَنْصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللَّهُ إِذْ اَخْرَجَهُ الَّذِينَ كَفَرُوا ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْهُمَا فِي الْغَارِ - (ইবনে আসাকির)
📄 আবু বকর (রা.) এবং উমর (রা.)-এর শানে যেসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে
ইমাম বুখারী এবং ইমাম মুসলিম (র.) হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, আমি শুনেছি হুযূর (সা.) বলেন, এক চারণভূমিতে জনৈক রাখাল বকরী চরাত। একদিন হঠাৎ বাঘ এসে বকরীর পালে আক্রমণ করে এবং একটি বকরী ধরে ফেলে। রাখাল বাঘকে তাড়া করে বকরীটি উদ্ধার করল বাঘ বলল, সেদিন কি হবে যেদিন তোমার বকরীর পালের সাথে তুমি থাকবে না, অথচ আমি থাকব। জনৈক ব্যক্তি মাল বোঝাইকৃত বলদকে নিয়ে যায়। বলদ আমাকে দেখে বলল, আমি বোঝা বহন করার জন্য জন্ম নেইনি, আমার জন্ম ক্ষেতে কাজ করার জন্য। উপস্থিত জনতা আশ্চর্যান্বিত হয়ে পড়লেন। তারা বললেন, বলদ কথা বলতে লাগল? হুযূর (সা.) বললেন, আমার সাথে একথার স্বীকৃতি দিয়েছেন আবু বকর এবং উমর। সে সময় সেখানে তাঁরা দু'জন উপস্থিত ছিলেন না। তিনি তাদের বিশ্বাসের প্রতি ভরসা রাখার ব্যাপারে তাকীদ দিলেন।
তিরমিযী আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, হুযূর (সা.) ইরশাদ করেন, এমন কোনো নবী নেই যার দু'জন মন্ত্রী আকাশে এবং দু'জন যমিনে রয়েছে। আমার আকাশের দু'মন্ত্রী জিবরাঈল এবং মিকাঈল। আর যমিনের মন্ত্রীদ্বয় আবু বকর এবং উমর।
আসহাবে সুনান প্রমুখ সাঈদ বিন যায়েদ থেকে বর্ণনা করেন, হুযূর (সা.) ইরশাদ করেছেন, আবু বকর, উমর, উসমান এবং আলী জান্নাতী, অতঃপর তিনি বাকী আশারা মুবাশশারার নাম উল্লেখ করে বলেন, এরা জান্নাতী।
তিরমিযী আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মহামনীষীগণ আকাশে উজ্জ্বল নক্ষেত্রের মতো। যেমন আবু বকর এবং উমর। এ রেওয়ায়েতটি তাবারানী জাবের বিন সামুরা এবং আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন।
ইমাম তিরমিযী হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, হুযুর (সা.) আনসার এবং মুহাজিরদের পাশ দিয়ে যাবার সময় আদবের (শিষ্টাচারের) কারণে তারা নবীজীর পানে চোখে তুলে তাকাতেন না। কিন্তু আবু বকর এবং উমর হযরত (সা.)-এর পানে তাকাতেন এবং মৃদু হাসতেন। তিনিও তাদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসতেন।
তিরমিযী এবং হাকেম হযরত ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সা.) মসজিদে নব্বীতে প্রবেশের সময় তাঁর ডানে-বামে হযরত আবু বকর এবং হযরত উমর ছিলেন। তিনি তাঁদের হাতে ধরে বললেন, আমি কিয়ামত দিবসে এভাবে উঠব। তাবারানী আওসাত গ্রন্থে আবু হুরায়রার বরাত দিয়ে এ হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিরমিযী এবং হাকেম হযরত ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামত দিবসে সর্বপ্রথম আমি উঠব, তারপর আবু বকর, তারপর উমর।
তিরমিযী এবং হাকেম আব্দুল্লাহ বিন হানযালা বর্ণনা করেন, একদা নবী আকরাম (সা.) হযরত আবু বকর এবং হযরত উমরকে দেখে বললেন, এঁরা দু'জন আমার কান এবং চোখ। এ হাদীসটি তাবারানী ইবনে উমর এবং ইবনে আমার থেকে রেওয়ায়েত করেছেন।
বায্যার এবং হাকেম আবু আরওয়া আদ্দুওসী থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবুবকর এবং হযরত উমর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে হাজির হলে তিনি বললেন, ঐ আল্লাহর শুকর যিনি তোমাদেরকে আমার সাহায্যকারী বানিয়েছেন। এ হাদীসটি মুররা ইবনে আযেব (রা.) থেকেও বর্ণিত হয়েছে। (তাবারানী)
আবু ইয়ালা আম্মার বিন ইয়াসার (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, একদা হযরত জিবরাঈল আমীন আমার কাছে আসেন। আমি উমর বিন খাত্তাবের গুণাবলী সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, নূহ (আ.)-এর মত দীর্ঘ জীবন পর্যন্ত যদি উমরের গুণাবলী বর্ণনা করি তবুও তা শেষ হবে না।
আহমদ আব্দুর রহমান বিন গানাম থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আবু বকর এবং হযরত উমরকে সম্বোধন করে বলেন, তোমরা দু'জনে যে বিষয়ে একমত হবে আমি সে বিষয়ে দ্বিমত করব না।
বারা বিন আযেব থেকে তাবারানী বর্ণনা করেন এবং ইবনে সাদ লিখেছেন, জনৈক ব্যক্তি ইবনে উমরকে জিজ্ঞেস করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে কে ফতোয়া দিতেন? তিনি বললেন, সে সময় আবু বকর এবং উমর ব্যতীত কেউ ফতোয়া দিত বলে আমার জানা নেই।
আবুল কাসিম বিন মুহাম্মদ বর্ণনা করেন, ফতোয়ার জন্য লোকেরা আবু বকর, উমর, উসমান এবং আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুম-এর নিকট গমন করতেন।
তাবারানী ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, প্রত্যেক নবী (আ.) গণের উম্মতে বিশেষ ব্যক্তি রয়েছেন। আমার উম্মতের বিশেষ ব্যক্তি হযরত আবু বকর এবং উমর।
হযরত আলী (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা আবু বকরের উপর রহম করুন। কারণ নিজ কন্যাকে আমার সাথে বিয়ে দিয়েছেন, মদীনা পর্যন্ত আরোহণ করায়ে আমাকে পৌঁছে দিয়েছেন এবং তাছাড়া বিলালকে আযাদ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা উমরের প্রতি শান্তি বর্ষণ করুন। তিনি প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও সত্য কথা বলেন, এ জন্য লোকেরা তাঁর ভয়ে দূরে থাকে এবং তাঁর বন্ধু নেই। আল্লাহ তা'আলা উসমানের প্রতিও রহম করুন, ফেরেশতাকুল তাঁকে দেখে লজ্জা করেন। আল্লাহ পাক আলীর উপরও রহম করুন। আল্লাহ তা'আলা আলীর সাথে রয়েছেন। (ইবনে আসাকির)
হযরত সুহাইল (রা.) বলেন, রসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজ্জ থেকে ফিরে এসে মিম্বরের উপর আরোহণ করে বললেন, হে জনতা! আবু বকর আমাকে কখনো কষ্ট দেননি। তোমরা তাকে স্মরণ রেখ। হে জনতা। আমি তার প্রতি সন্তুষ্ট। উপরন্তু উমর, উসমান, আলী, তালহা, যুবাইর, সাদ, আব্দুর রহমান বিন আউফ প্রাথমিক যুগের মুহাজিরদের উপরও সন্তুষ্ট। (তাবারানী)
আব্দুল্লাহ বিন আহমদ ইবনে আবি হাযেম থেকে বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি যাইনুল আবেদীন আলী বিন হোসাইন (রা.)-এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করল, রসূলের দরবারে হযরত আবু বকর ও হযরত উমরের মর্যাদা কতটুকু ছিল? তিনি বললেন, সে সময় হযরত নবী করীম (সা.)-এর নিকট তাঁর যতটুকু মর্যাদা ছিল।
ইবনে সাদ বাসতাম বিন মুসলিম থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর এবং হযরত উমরকে সম্বোধন করে নবী করীম (সা.) বলেন, আমার পর তোমাদের উপর কোনো ব্যক্তি প্রশাসক হতে পারবে না। ইবনে আসাকির হযরত আনাস (রা.) থেকে মারফুআন সূত্রে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর এবং হযরত উমরকে ভালোবাসা ঈমান। আর তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা কুফরী। ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, আবু বকর এবং উমরের প্রতি ভালোবাসা পোষণ এবং তাঁদের জ্ঞানের পথ অবলম্বন করা সুন্নত। হযরত আনাস (রা.) মারফুআন বর্ণনা করেন, নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেন, আমি আমার উম্মতের ব্যাপারে আশাবাদী যে, তারা কালেমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ থেকে যেমন পলায়ন করবে না। অর্থাৎ, উভয়ের প্রতি আমার উম্মতের অখণ্ড ভালোবাসা অটুট থাকবে।