📄 রাসূলের (সা.) সাহচর্য ও যুদ্ধসমূহ
ওলামায়ে কেরাম বলেন, আবু বকর সিদ্দীক (রা.) ঈমান গ্রহণ থেকে মৃত্যু অবধি রসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাহচর্য ত্যাগ করেননি। তবে হজ্ব এবং যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনে তিনি হুযূর (সা.)-এর অনুমতিক্রমে সহাচর্য থেকে পৃথক হয়েছেন। তিনি সকল যুদ্ধে নবী (সা.)-এর সাথে উপস্থিত ছিলেন। রসূলুল্লাহ (সা.)-এর সন্তোষ প্রাপ্তির জন্য নবী (সা.)-এর সাথে হিজরত করেছেন, পরিবার পরিজন ছেড়ে গারে সত্তরে থেকেছেন। আল্লাহ তা'আলা কুরআন শরীফে এ ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন- ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعْنَا
উলামায়ে কেরাম বলেন, রণাঙ্গনে তিনি রসূলের (সা.)-কে ত্যাগ করে বিশেষত উহুদ এবং হুনায়নের যুদ্ধে যখন সকলেই রসূলুল্লাহ (সা.)-কে ত্যাগ করে পালিয়েছিলেন, এ সময়ও তিনি তাঁর সাথে ছিলেন।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, বদর যুদ্ধে ফেরেশতারা পরস্পরে বলাবলি করছিল যে, ঐ দেখ হযরত আবু বকর ছাউনির নিচে নবী (সা.)-এর সাথে দাঁড়িয়ে আছেন। (ইবনে আসাকির)
আবু ইয়ালা, হাকেম ও আহমদ (র.) হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে ও আবু বকর (রা.) কে বললেন, তোমাদের দু'জনের মধ্যে একজনের সাহায্য হযরত জিবরাঈল (আ.) আপরজনের সাহায্য হযরত মীকাঈল (আ.) করতেছেন।
ইবনে আসকির বলেন, আব্দুর রহমান বিন আবু বকর (রা.) মুশরিকদের সাথে বদর যুদ্ধে গিয়েছিল। মুসলমান হওয়ার পর আব্দুর রহমান তাঁর পিতাকে বলেন, বদর যুদ্ধে কয়েকবার আপনি আমার তীরের আওতায় পড়েছিলেন। কিন্তু আমি নিজের হাতকে গুটিয়ে নিয়েছি। হযরত আবু বকর (রা.) বললেন, যদি তুমি আমার নিশানার মধ্যে এসে যেতে তবে আমি কখনই ছাড়তাম না।
📄 বীরত্ব
হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) সকল সাহাবীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বাহাদুর ছিলেন। হযরত আলী (রা.) বলেন, হে লোক সকল! আমাকে বল কোন্ ব্যক্তি সর্বশ্রেষ্ঠ বীর? লোকেরা বলল, আপনি। তিনি বললেন, আমি সর্বদা নিজের শক্তি দিয়ে লড়াই করেছি, এটা কোনো বীরত্ব নয়। তোমরা সর্বশ্রেষ্ঠ বীরের কথা বল। লোকেরা বলল, আমাদের জানা নেই। হযরত আলী (রা.) বললেন, সর্বশ্রেষ্ঠ বীর হলেন হযরত আবু বকর (রা.) বদর যুদ্ধে আমরা রসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য ছাউনী তৈরি করেছিলাম। আমরা পরামর্শ করলাম সেখানে হুযূর (সা.)-এর নিরাপত্তার জন্য কে থাকবে। আল্লাহর কসম, আমাদের কারো সাহস হয়নি। কিন্তু হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) নাঙ্গা তলোয়ার নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং কাউকে সেখানে ভিড়তে দেননি। যদি কেউ তাঁর প্রতি আক্রমণ করতে উদ্যত হয়েছে তো তিনি তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। সুতরাং তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ বীর।
হযরত আলী (রা.) বলেন, একদা মক্কার মুশরিকরা রসূলুল্লাহ (সা.) কে টানা হেঁচড়া করছিল, আর বলছিল, তুমিই এক খোদা দাবী করেছ। আল্লাহর কসম! কারো সাহস ছিল না যে, এ অবস্থায় সে মুশরিকদের মোকাবিলা করবে। কিন্তু আবু বকর সিদ্দীক মুশরিকদের মেরে ছত্রভঙ্গ করেন এবং ধাক্কা দিয়ে ফেলে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যান এবং বলতে থাকেন। আফসোস, শত আফসোস, তোমরা এমন ব্যক্তিকে হত্যা করতে চেয়েছিলে যিনি বলেন, আমার প্রতিপালক এক ও অদ্বিতীয়। এ পর্যন্ত বলে হযরত আলী (রা.) চাদর উঠিয়ে কাঁদতে লাগলেন এবং তাঁর দাড়ি ভিজে গেল। অতঃপর তিনি বললেন, বল ফেরাউনের যুগের মুমিন শ্রেষ্ঠ না আবু বকর? লোকদের নীরব থাকতে দেখে তিনি নিজেই বললেন, তোমরা কেন উত্তর দিলে না? আল্লাহর কসম, হযরত আবু বকরের এক মুহূর্ত তাদের হাজার ঘণ্টা অপেক্ষা উত্তম। কেননা তারা নিজেদের ঈমান গোপন করে রেখেছিল, আর হযরত আবু বকর (রা.) নিজের ঈমানের কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন। (বায্যার)
হযরত উরওয়া বিন যুবাইর বলেন, আমি আব্দুল্লাহ বিন আমার বিন আসকে জিজ্ঞেস করলাম, হুযূর (সা.)-কে সবচেয়ে বেশি কষ্ট কিভাবে দেয়া হয়েছিল? তিনি বললেন, আমি দেখলাম উকবা নবী (সা.)-কে নামাযরত অবস্থায় পেছন থেকে এসে গলায় চাদর পেঁচিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলে। ইত্যবসরে আবু বকর (রা.) সেখানে এসে উকবাকে সরিয়ে দেন এবং বলেন, তোমরা এমন ব্যক্তিকে হত্যা করতে চাও, যিনি এক ও অদ্বিতীয় প্রভুর আওয়াজ তুলেছেন। বস্তুত তিনি আল্লাহর নিকট থেকে দলীলসহ প্রেরিত হয়েছেন। (বুখারী)
ইবনে তালীব বলেন, হযরত আবু বকর (রা.) বলেছেন, উহুদ যুদ্ধে সকলেই রসূলুল্লাহ (সা.)-কে ছেড়ে পালিয়ে গেলে আমি তাঁর সাথে ছিলাম। সে সংকটময় পরিস্থিতিতে যিনি হুযূর (সা.)-কে হেফাজত করার জন্য এগিয়ে আসেন, তিনি হলেন হযরত আয়েশা (রা.)। তিনি (আয়েশা) বলেন, আটত্রিশ জন লোক ইসলাম গ্রহণ করলে হযরত আবু বকর (রা.) নবীজীর নিকট আরয করলেন, আপনি ইসলামের প্রকাশ্য ঘোষণা দিন। তিনি বললেন, আমাদের দল এখন পর্যন্ত যথেষ্ট ছোট। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বারবার একই কথা বলতে থাকেন। অবশেষে নবী (সা.) সত্য ধর্মের প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন। ফলে লোকেরা মসজিদের চতুর্দিকে গোত্র গোত্র ভাবে এলোমেলো হয়ে যায়। হযরত আবু বকর (রা.) দাঁড়িয়ে খুতবা দেন এবং লোকদের ইসলামের দাওয়াত দেন। মুশরিকরা তাঁকে আক্রমণ করে বসে এবং এজন্য লোকদের অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। (ইবনে আসাকির)
ইবনে আসাকির হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, যখন হযরত আবু বকর (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন তখনই তিনি ইসলামকে প্রকাশ করে দিয়েছেন এবং লোকদের আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রসূলের প্রতি আহ্বান করেছেন।
📄 দানশীলতা
সকল সাহাবার মধ্য থেকে সবচেয়ে বেশি দানশীল হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- وَسَيُجَنَّبُهَا الْأَتْقَى الَّذِي يُؤْتِي مَالَهُ يَتَزَكَّى -
ওলামায়ে কেরাম একমত এ আয়াত তাঁর শানে নাযিল হয়েছে। (ইবনে জাওযী)
আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আবু বকরের সম্পদ আমার যতটুকু উপকার করেছে আর কারো সম্পদ ততটুকু করেনি। হযরত আবু বকর (রা.) অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আরয করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি এবং আমার সকল সম্পদ আপনার। এটি আহমদ বর্ণনা করেছেন। হযরত আয়েশার অপর হাদীসটি এমনই। তবে সে হাদীসে এতটুকু বৃদ্ধি করা হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ (সা.) নিজের সম্পদের মত নিজ সম্পদ মনে করে হযরত আবু বকরের সম্পদ খরচ করেছেন। (খতীব)
হযরত আয়েশা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, ইসলাম গ্রহণের সময় হযরত আবু বকরের নিকট চল্লিশ হাজার দেরহাম অথবা দিনার ছিল। তিনি এগুলো সম্পূর্ণ হুযূর (সা.)-এর জন্য ব্যয় করেছেন। (ইবনে আসাকির)
ইবনে উমর (রা.) বলেন, ইসলাম গ্রহণের সময় হযরত আবু বকরের নিকট চল্লিশ হাজার দেরহাম ছিল। আর হিজরতের সময় পাঁচ হাজারের বেশি ছিল না। বাকী অর্থ তিনি ইসলামের সাহায্য এবং মুসলমান গোলাম কিনে আযাদ করার পেছনে ব্যয় করেছেন। (ইবনে সাঈদ)
ইবনে আসাকির হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর এ রকম সাতজন গোলামকে কিনে আযাদ করে দিয়েছেন যাদের মালিক তাদের উপর অত্যাচার করত। ইবনে উমর বলেন, একদা আমি হযরত (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত ছিলাম। হযরত আবু বকর (রা.) জুব্বা পরে, যে জুব্বায় বোতামের পরিবর্তে কাঁটা ব্যবহার করা হয়েছিল? তিনি দরবারে এলেন। ইত্যবসরে হযরত জিবরাঈল (আ.) অবতীর্ণ হয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আবু বকর সিদ্দীক কাঁটা জড়ানো জুব্বা পরে এসেছেন, আজ এ ব্যতিক্রম কেন? হুযুর (সা.) বললেন, হে জিবরাঈল! মক্কা বিজয়ের পূর্বে আমার জন্য তার সকল সম্পদ ব্যয় করে দিয়েছেন। হযরত জিবরাঈল (আ.) বললেন, আল্লাহ তাআলা আবু বকরকে সালাম জানিয়েছেন এবং বলেছেন, হে আবু বকর, আমার জন্য যে দারিদ্রতা গ্রহণ করেছ, এতে কি তুমি সন্তুষ্ট? হযরত আবু বকর (রা.) বললেন, আমি আমার প্রতিপালকের উপর সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট। এটি ইবনে আসাকির প্রমুখ বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসের সনদ অত্যন্ত দুর্বল। এ ধরনের দুর্বল রেওয়ায়েতসমূহ অনেক রয়েছে।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে এক রেওয়ায়েতে আছে, হযরত জিবরাঈল (আ.) কাঁটাযুক্ত জুব্বা পরে নাযিল হলে রসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, হে জিবরাঈল! এটা কেমন রীতি? তিনি বললেন, আল্লাহ ফেরেশতাদের আবু বকরের অনুরূপ পোশাক পরার নির্দেশ দিয়েছেন। এ রেওয়ায়েতটিও অত্যন্ত দুর্বল, যদিও তা অনেক লোক বর্ণনা করেছেন। তবে এ ধরনের রেওয়ায়েতকে পরিহার করে চলাই উত্তম। এটি খতীব বর্ণনা করেছেন।
হযরত উমর ফারুক (রা.) বলেন, একদিন আমি রসূলকে বলতে শুনলাম, আমি কিছু মাল গ্রহণ করব। হযরত উমর (রা.) বলেন, এতদশ্রবণে আমি পূর্ণ অভিপ্রায় গ্রহণ করলাম যে, আবু বকরের চেয়ে আমি এবার বেশি সদকা করব। এ জন্য আমার ধন সম্পদের অর্ধেকাংশ নিয়ে হাযির হলাম। নবী করীম (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, তোমার পারিবারের জন্য কতটুকু রেখে এসেছ? আরয করলাম, যতটুকু এনেছি। ইত্যবসরে আবু বকর সিদ্দীক (রা.) তাঁর সমস্ত সম্পদ নিয়ে হাযির হন। রসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, নিজ পরিবারের জন্য কি রেখে এসেছ? তিনি বললেন, তাদের জন্য আল্লাহ এবং তাঁর রসূলই যথেষ্ট। তখন আমি বুঝলাম আমি তাঁর সমকক্ষ নই। আবু দাউদ এবং তিরমিযী কর্তৃক বর্ণিত।
হাসান বসরী (র.) বলেন, একবার হযরত আবু বকর (রা.) সদকার মাল নিয়ে এসে তার পরিমাণ গোপন রেখে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহা! এগুলো আমার সদকা। আল্লাহর কসম, আপনার প্রতিপালক আমার সাহায্যের জন্য যথেষ্ট। আর হযরত উমর সদকার মাল এনে তার পরিমাণ প্রকাশ করে বলতে লাগলেন, আপনার রবের সাহায্যই যথেষ্ট। নবী করীম (সা.) বললেন, তোমাদের দু'জনের সদকার মধ্যে পার্থক্য এতটুকু, যতটুকু পার্থক্য উভয়ের কথার মধ্যে। আবু নুয়াঈম এটি বর্ণনা করেন, এর সনদ সুন্দর।
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আমার উপর কারো অনুগ্রহ নেই, সকলের উপকারের প্রতিদান দিয়েছি। কিন্তু আবু বকরের দয়ার প্রতিদান এখন পর্যন্ত বাকী রয়ে গেছে। তাঁর অনুগ্রহ এতই বিশাল যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা এর প্রতিদান দিবেন। কোনো সম্পদ আমাকে ততটুকু লাভবান করতে পারেনি, যতটুকু আবু বকরের সম্পদ করেছে। (তিরমিযী)
হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বলেন, একদা আমার পিতাকে নিয়ে হযরত নবী করীম (সা.)-এর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। তিনি বললেন, তুমি বৃদ্ধকে কষ্ট দিয়ে কেন নিয়ে এলে, আমিই যেতাম। আমি বললাম, আপনাকে কষ্ট দেয়ার চেয়ে তার আগমনই শ্রেয়। তিনি বললেন, আমার প্রতি তোমার যে অনুগ্রহ তাতে তোমার পিতাকে কষ্ট দেয়া আমার জন্য সহনযোগ্য নয়। (বায্যার)
ইবনে আসাকির ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে রেওয়ায়েত করেন, রসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, আমার প্রতি আবু বকরের চেয়ে বেশি অনুগ্রহ কারো নেই। তিনি নিজের জীবন দিয়ে আমার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, সম্পদ দিয়ে সাহায্য করেছেন এবং নিজের মেয়েকে আমার সাথে বিয়ে দিয়েছেন।
📄 ইলম (জ্ঞান)
হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) সাহাবীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় আলেম (জ্ঞানী) এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। ইমাম নব্বী তাহযীব গ্রন্থে লিখেছেন, ওলামায়ে কেরাম হযরত আবু বকরের বিশাল জ্ঞান ভাণ্ডারের উপর ইমাম বুখারী (র.) এবং ইমাম মুসলিম (র.)-এর একখানা হাদীসের দ্বারা প্রমাণ পেশ করেছেন। হযরত আবু বকর (রা.) বলেন, আল্লাহর কসম, কেউ যদি নামায এবং রোযার মধ্যে সামান্যতমও তারতম্য করে তবে আমি তার সাথে লড়াই করব। তারা আমাকে দুর্বল ভেবেছে। নবী (সা.)-এর যুগে তারা যতটুকু যাকাত আদায় করেছে, যদি তারা এর চেয়ে তিল পরিমাণ কম করে আমি তাদের মোকাবিলা করব।
শায়খ আবু ইসহাক এ হাদীস দ্বারা দলিল দেন যে, হযরত আবু বকর (রা.) সর্বাধিক জ্ঞানী এবং সবচেয়ে বড় আলেম। কারণ সাহাবায়ে কেরাম যখন এ মাসয়ালা নিয়ে বিব্রত হয়েছিলেন তখন মাসয়ালাটি হযরত আবু বকর (রা.)-এর খেদমতে এ মর্মে প্রেরণ করা হয় যে, আপনার অভিমতটি বিতর্কের ঊর্ধ্বে পরিশুদ্ধ হিসেবে সাহাবাগণ গ্রহণ করবেন। ইবনে উমরকে জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেন, রসূলুল্লাহ (সা)-এর যুগে কে ফতোয়া দিতেন? তিনি বলেন, আবু বকর (রা.) এবং উমর (রা.)-এর চেয়ে বড় আলেম আর কেউ ছিলেন না। আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, একদিন নবী করীম (সা.) খুতবার মধ্যে বলেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁর এক নেককার বান্দাকে দুনিয়া অথবা আখেরাত উভয়ের যে কোন একটি গ্রহণের অধিকার দিয়েছেন। আর সেই বান্দা আখেরাতকে পছন্দ করেছেন।
এতদশ্রবণে হযরত আবু বকর (রা.) কাঁদতে লাগলেন এবং বললেন, আমার পিতা মাতা তাঁর প্রতি কুরবান হোক। আমরা তাঁর কান্নায় আশ্চর্যান্বিত হয়ে পড়লাম। কারণ নবী করীম (সা.) দৃশ্যত জনৈক ব্যক্তির কথা বলেছেন। আর সেই জনৈক ব্যক্তিটি যে তিনি স্বয়ং নবী (সা.) তা আমরা কেউ বুঝতে পারিনি। কিন্তু আবু বকরের জ্ঞান ভাণ্ডারে তা ধরা পড়েছে। এ কারণে তিনি সবচেয়ে বড় আলেম ও জ্ঞানী। (বুখারী, মুসলিম)
নবী করীম (সা.) বলেন, আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারীদের মধ্যে আবু বকরের সম্পদ এবং সাহচর্য আমার উপর সবচেয়ে বেশি অনুগ্রহ করেছে। যদি আমি আল্লাহ ছাড়া কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করি, তবে তিনি আবু বকর। ইসলামের প্রতি তাঁর সত্যিকার ভালোবাসার কথা সর্বদা আমার অন্তরে বিদ্যমান থাকবে। (নব্বী)
ইবনে কাসীর (র.) বলেন, আল্লাহর কালাম সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ছিল সবচেয়ে বেশি। কারণ নবী করীম (সা.) তাঁকে নামাযের জন্য সাহাবীদের ইমাম বানিয়েছিলেন। আর হুযুর (সা.) নিজেই বলেছেন, জাতির ইমাম সেই হবে যার জ্ঞান ভাণ্ডার কুরআনের জ্ঞানে সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধ। অধিকন্তু তিনি আরো বলেন, যে সম্প্রদায়ে আবু বকর রয়েছে সেখানে তিনি ছাড়া কেউ ইমাম হতে পারবে না। এ হাদীসটি তিরমিযী বর্ণনা করেন।
এরূপভাবে হাদীসের উপরও তাঁর বিরাট দখল ছিল। সাহাবাগণ হাদীস সম্বন্ধে অধিকাংশ বিষয়ে তাঁর মুখাপেক্ষী থাকতেন। সবসময় নবী করীম (সা.)-এর হাদীস তাঁর সামনে পেশ করা হতো। কারণ তিনি রসূলের হাদীসের ভাণ্ডার স্মরণ রাখতেন এবং জরুরী মুহূর্তে বিষয়াদি তাঁর সমীপেই উপস্থাপন করা হতো। তিনি সর্বাধিক হাদীসের হাফেজ ছিলেন। কারণ রিসালাতের ঊষালগ্ন থেকে মৃত্যু অবধি তিনি সবসময় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে থাকতেন। তাঁর মুখস্থ শক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। তিনি ছিলেন জ্ঞানবান এবং ধীশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি।
হযরত আবু বকর (রা.) থেকে অত্যন্ত কম সংখ্যক হাদীস বর্ণিত হয়েছে- এ কথাটি বেদনাদায়ক এবং তা বিস্ময়ের জন্ম দেয়। কম হাদীস বর্ণনা করার কারণ নবীজীর মৃত্যুর পর তিনি খুব সামান্য ক'দিন বেঁচেছেন। যদি লম্বা সময় পর্যন্ত জীবিত থাকতেন তবে তাঁর বর্ণনা সকল সাহাবার চেয়ে বেশি হতো এবং আবু বকরের সনদ ছাড়া কোনো হাদীস পাওয়া যেত না। হাদীস বর্ণনা করার ক্ষেত্রে আবু বকরের জন্য অন্য সাহাবীর সাহায্য নেয়া প্রয়োজন হতো না। এ জন্য যে, তিনি সর্বদা রসূলের সাথে থাকতেন এবং হাদীস শুনতেন। সুতরাং তিনি নিজেই রসূলুল্লাহ (সা.) থেকে হাদীস বর্ণনা করতেন। তবে এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, হযরত আবু বকর (রা.) অন্য সাহাবীর থেকে কিছু হাদীস রেওয়ায়েত করেছেন, এটা কেন? তিনি নিজে যা শোনেননি তা শুনে নিয়ে বর্ণনা করেছেন।
মাইমুন বিন মেহরান (র.) বলেন, হযরত আবু বকরের নিকট কোনো বিচার আসলে এ সংক্রান্ত মাসয়ালা কুরআন শরীফে অনুসন্ধান করতেন এবং কুরআন শরীফের নির্দেশিত পথে ফায়সালা করতেন। যদি কুরআন শরীফে সমাধান না পেতেন, তবে রসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীস অনুযায়ী ফায়সালা করতেন। যদি এ সংক্রান্ত কোনো হাদীস তাঁর স্মরণ না থাকত তবে বাইরে এসে লোকদের জিজ্ঞেস করতেন, আমার কাছে এ ধরনের বিচার এসেছে। তোমাদের মধ্য থেকে কেউ কি জান এ ধরনের বিচারের প্রেক্ষিতে রসূলুল্লাহ (সা.) কি সমাধান দিয়েছেন? তাঁর নিকট সকল সাহাবী একত্রিত হতেন এবং যদি কেউ এ সংক্রান্ত হাদীস বর্ণনা করতেন তবে এ অনুযায়ী তিনি ফায়সালা করতেন এবং খুশি হয়ে আল্লাহর শুকর আদায় করতেন আলহামদুলিল্লাহ! আমাদের মধ্যে এমন ব্যক্তি আছেন যিনি নবী করীম (সা.)-এর হাদীসকে স্মরণ রেখেছেন। যদি হাদীসেও সমাধান পাওয়া না যেত তবে তিনি বড় বড় সাহাবীদের একত্রিত করে পরামর্শ করতেন, অধিকাংশ অভিমতের উপর তিনি ফায়সালা দিতেন। হযরত উমর ফারুক (রা.) ও তাই করতেন।
আবু বকর (রা.) আরবের সাধারণ এবং কুরাইশদের বিশেষ বংশ পরম্পরা সম্পর্কে দারুণভাবে জানতেন। আরব এবং কুরাইশ বংশ পরম্পরা বিশেষজ্ঞ জুবায়ের বিন মুতঈম (র.) বলেন, আমি বংশ পরস্পরার জ্ঞান আবু বকরের কাছ থেকেই নিয়েছি। তিনি আরবের এক বিশিষ্ট বংশ পরস্পরা বর্ণনাকারী। তাঁর স্বপ্নের ব্যাখ্যাজ্ঞান ছিল আগাধ। নবী করীম (সা.)-এর যুগে তিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতেন। মুহাম্মদ বিন সিরীন (র.) একজন বিশিষ্ট স্বপ্নের ব্যাখ্যাকার তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সা.)-এর পর হযরত আবু বকর (রা.) সবচেয়ে বড় ব্যাখ্যাকারক। হযরত সামুরাহ (রা.) বলেন, একদা হুযুর (সা.) বলেন, আল্লাহ তা'আলা আমাকে আবু বকর সিদ্দীকের নিকট থেকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা করিয়ে নেবার নির্দেশ দিয়েছেন। (দাইলামী)
ইবনে কাসীর (র.) বলেন, হযরত আবু বকর (রা.) সবচেয়ে বেশি বাকপটু এবং বাগ্মী ছিলেন। তিনি খুব সুন্দর করে বক্তৃতা দিতে পারতেন। যুবাইর বিন বাকার বলেন আমি ওলামাদের নিকট থেকে শুনেছি সবচেয়ে বড় বাগ্মী ছিলেন আবু বকর (রা.) এবং আলী (রা.)। তিনি আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করতেন। স্বপ্নের ব্যাখ্যা, আল্লাহর ভয় এবং বাগ্মীতা পৃথক পৃথক অধ্যায়ে বর্ণনা করা হবে।
সাহাবীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় আলেম হওয়ার ক্ষেত্রে সুলেহ হুদায়বিয়ার হাদীস দ্বারা দলিল পেশ করা হয়। হুদায়বিয়ার সন্ধির ব্যাপারে হযরত উমর রসূলুল্লাহ (সা.)-কে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন, তিনি তাঁর জবাবও দেন। অতঃপর হযরত উমর হযরত আবু বকরের নিকট গিয়ে একই প্রশ্ন করেন। হযরত আবু বকর (রা.) হুবহু নবী (সা.)-এর উত্তরগুলো আবার প্রদান করেন। (বুখারী) এজন্য তাঁকে সর্বোত্তম জ্ঞানী বলা হয়।
ইবনে আস প্রমুখ বলেন, রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, হযরত জিবরাঈল আমাকে বলেছেন, আল্লাহ তা'আলার হুকুম- আমি যেন আবু বকরের সাথে পরামর্শ করি। (তামামুর রাযী)
মা'আয বিন জাবাল (রা.) বর্ণনা করেন, আমাকে ইয়ামেনে পাঠানোর সময় মজলিসে শূরা গঠন করা হয়। এতে আবু বকর, উমর, উসমান, আলী, তালহা, যুবাইর, উসাইদ বিন হাযীর উপস্থিত ছিলেন। সকলেই নিজ নিজ মতামত পেশ করেন। অতঃপর হুযূর (সা.) আমার মত জানতে চাইলে হযরত আবু বকরের অনুরূপ মত ব্যক্ত করলাম। নবী (সা.) বললেন, আবু বকর ভুল করুক। এটা আল্লাহ তা'আলা চান না। হাদীসখানা তাবারানী বর্ণনা করেছেন। ইবনে উসামার বক্তব্য এ ধরনের, আসমানে আল্লাহর অভিপ্রায় এটা নয় যে, যমীনে আবু বকর ভুল করবে। এটিও তাবারানী বর্ণনা করেছেন, এর বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
ইমাম নব্বী বলেন, হযরত আবুবকর সিদ্দীক (রা.) সাহাবীদের মধ্যে অনন্য হাফেজে কুরআন ছিলেন, হযরত আনাস (রা.) বলেন, নবী (সা.)-এর যুগে আনসারদের চার সাহাবী কুরআনকে একত্রিত করেছেন। আবু দাউদ শা'বী বলেন, হযরত আবু বকরের মৃত্যু পর্যন্ত সম্পূর্ণ কুরআন শরীফ জমা হয়নি-এ কথাটি পরিত্যাজ্য, অথবা কথাটিকে এভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে যে, হযরত উসমান (রা.) যে পদ্ধতিতে কুরআনকে সন্নিবেশিত করেছেন, সেভাবে জমা করা হয়েছিল না।