📄 ইসলাম গ্রহণের বিবরণ
তিরমিযী এবং ইবনে হাব্বান আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, খিলাফত সম্বন্ধে বাক বিতণ্ডার সময় হযরত আবু বকর (রা.) বলেন, খিলাফতের ব্যাপারে আমি তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার নই কি? আমি কি সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করিনি? হযরত আলী বলেন, সর্বপ্রথম আবু বকর সিদ্দীক ইসলাম গ্রহণ করেন। এটি ইবনে আসাকির কর্তৃক বর্ণিত।
যায়েদ বিন আরকাম বলেন, হযরত আবু বকর (রা.) সর্বপ্রথম রসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে নামায পড়েছেন। ইবনে সাদ বলেন, আবু বকর সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছেন। শা'বী বলেন, আমি ইবনে আব্বাসকে জিজ্ঞেস করলাম, সর্বপ্রথম কে মুসলমান হয়েছে? তিনি বললেন, আবু বকর এবং তুমি কি হাসানের কবিতা শোননি? (কবিতার অর্থ) তুমি যখন কোন ভালো মানুষের অবদান স্মরণ করবে তখন আবু বকরের অবদান স্মরণ করো। তিনি জগত বিখ্যাত পরহেযগার, ন্যায় পরায়ণ এবং সংযমী। নিজ প্রচেষ্টায় লোকদের পবিত্র করেছেন। তিনি আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীল। হেরা গুহায় স্বীয় নেতার সেবাকারী। তিনি সর্বপ্রথম রসূলুল্লাহ (সা.)-কে সত্যায়িত করেছিলেন। তাবারানী কর্তৃক বর্ণিত।
ফুরাত বিন সায়েব মাইমুন বিন মিহরানকে জিজ্ঞেস করেন, আপনার নিকট হযরত আলী না হযরত আবু বকর কে বেশি উত্তম? এ কথা শুনে মাইমুন ক্রধান্বিত হয়ে পড়লেন। কাঁপতে কাঁপতে বললেন, আমি বুঝতে পারছি না, এ মুহূর্তে জীবিত আছি কিনা। কারণ এটাতো উভয়কে পরীক্ষা করার সময়। দু'জনই মহান এবং ইসলামের জন্য নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। অতঃপর প্রশ্ন করা হলো, কে প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছেন, হযরত আবু বকর না হযরত আলী? তিনি বললেন, হযরত আবু বকর (রা.) বুহাইরা পাদ্রীর যুগে ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং হযরত খাদিজার বিয়ের ব্যাপারে চেষ্টা করেছেন, সে সময় হযরত আলীর জন্মই হয়নি। (আবু নুয়াঈম)
অনেক সাহাবা এবং তাবেঈনের অভিমত হচ্ছে, হযরত আবু বকর সকল সাহাবার পূর্বে ঈমান এনেছেন। কেউ কেউ বলেন, হযরত খাদিজা সর্বপ্রথম মুসলমান হয়েছেন। উভয় অভিমতকে এভাবে সমন্বয় করা হয়েছে যে, সর্বপ্রথম মুসলমান হয়েছেন। পুরুষদের মধ্যে আবু বকর, তরুণদের মধ্যে আলী, নারীদের মধ্যে খাদীজা সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছেন। এ সুন্দর সমন্বয়টি সাধন করেছেন ইমাম আযম আবু হানীফা (র.)।
সালেম বিন জা'দ মুহাম্মদ বিন হানাফী (রা.)-কে জিজ্ঞেস করেন, আবু বকর সর্বপ্রথম ঈমান এনেছেন? তিনি বললেন, না। প্রশ্ন করা হলো, তবে কেন তিনি এত প্রসিদ্ধতা লাভ করলেন? তিনি বললেন, ইসলাম গ্রহণ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সকল মুসলমান থেকে তিনি শ্রেষ্ঠ। এটি ইবনে আবী শাইবা (র.) কর্তৃক বর্ণিত।
মুহাম্মদ বিন সাদ তাঁর পিতাকে জিজ্ঞেস করেন, আবু বকর প্রথম ঈমান এনেছেন? তিনি বললেন, না। তবে তাঁর ঈমান আমাদের সকলের চেয়ে উত্তম ছিল। তাঁর পূর্বে পাঁচ জনেরও বেশি ইসলাম গ্রহণ করেছেন। এটি ইবনে আসাকির কর্তৃক বর্ণিত।
ইবনে কাসির (র.) বলেন, নবী করীম (সা.)-এর प्रति সর্বপ্রথম বিশ্বাস স্থাপন করেন, আহলে বাইত। অর্থাৎ, উম্মুল মোমিনীন খাদীজাতুল কুবরা, তাঁর গোলাম যায়েদ, যায়েদের স্ত্রী উম্মে আইমান, হযরত আলী এবং হযরত ওয়ারাকা।
হযরত আবু বকর (রা.) বলেন, একবার আল্লাহর ঘরের নিকটে যায়েদ বিন আমরকে নিয়ে বসেছিলাম। ইত্যবসরে উমাইয়া বিন আবী সালাতের আগমন ঘটল। কুশলদী বিনিময়ের পর বললেন, তোমরা কিছু শুনেছ? যায়েদ বললেন, না তো। তিনি কবিতা আবৃত্তি করলেন, কবিতার সারাংশ এরূপ আল্লাহর ধর্ম ব্যতীত সকল ধর্মই বিলুপ্ত হবে। অতঃপর উমাইয়া বললেন, আমরা যে নবীর অপেক্ষা করছি তিনি আমাদের মধ্য থেকে হবেন না তোমাদের মধ্য থেকে? আমি ইতোপূর্বে নবী সম্পর্কে কখনই শুনেনি। এজন্য আমি ওয়ারাকা বিন নওফেলের নিকট গমন করলাম। তিনি আসমানী গ্রন্থ সমূহের ব্যাপারে অগাধ জ্ঞান রাখতেন। তাঁর মুখ থেকে এমন জ্ঞান সুলভ কথা বের হত যা সহজে বুঝে আসত না। আমি তার কাছে বসলাম এবং সমস্ত ঘটনা খুলে বললাম। তিনি বললেন, আমি অধিকাংশ ঐশী গ্রন্থ অধ্যয়নে জেনেছি যে, সম্মানিত নবী আরবের অভিজাত বংশে জন্মগ্রহণ করবেন। তুমি তো আরবের কুলীন বংশোদ্ভূত। সুতরাং তোমাদের বংশেই তাঁর শুভাগমন ঘটবে। আমি বললাম, তিনি কি শিক্ষা দিবেন? ওয়ারকা বললেন, তিনি অত্যাচার করতে নিষেধ করবেন। অতএব যে সময় রসূলুল্লাহ (সা.)-এর আবির্ভাব হয় সঙ্গে সঙ্গে আমি তাঁকে সত্যায়ন করি। এটি ইবনে আসাকির কর্তৃক বর্ণিত।
মুহাম্মদ বিন আব্দুর রহমান বলেন, রসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আমি যখন ইসলামের দাওয়াত দিয়েছি সকলের অন্তরে কিছু না কিছু সন্দেহ এসেছে। কিন্তু আবু বকর সিদ্দীককে যখন আমি ইসলামের প্রতি আহবান করলাম তখন তিনি যে কোনো চিন্তা ছাড়াই ইসলাম গ্রহণ করেন।
বাইহাকী বলেন, আবু বকর সিদ্দীক (রা.) নবুওয়তের প্রমাণপঞ্জি ইসলামের দাওয়াত প্রদানের পূর্বেই অনুধাবন করেছিলেন এবং তা শোনামাত্র ইসলাম গ্রহণ করেন। কারণ তিনি আগেই চিন্তা-ভাবনা করেছিলেন। চিরসত্য হলো, প্রত্যেকেই হুযূর (সা.) থেকে পলায়ন করেছিলেন। কিন্তু আবু বকর সিদ্দীক জাহেলিয়াতের যুগেই সিদ্দীক ছিলেন, যেমন ইসলামের যুগে ছিলেন।
রসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আমি যাকেই মুসলমান হওয়ার জন্য বলেছি, সে-ই আমার কথাকে পুনারাবৃত্তি করেছে এবং দলীল চেয়েছে। কিন্তু কুহাফার পুত্র (আবু বকর) কে আমি ইসলাম গ্রহণ করতে বললে তিনি সঙ্গে সঙ্গে তা গ্রহণ করেন।
ইমাম বুখারী (র.) আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, তোমরা কি আমার বন্ধুকে ত্যাগ করবে? তিনি সেই ব্যক্তি যখন আমি বললাম, আমি আল্লাহর রসূল। আল্লাহ তা'আলা আমাকে তোমাদের হেদায়েতের জন্য পাঠিয়েছেন। তখন তোমরা মিথ্য প্রতিপন্ন করেছ, সে সময় আবু বকর আমাকে সত্যায়ন করেছে।
📄 রাসূলের (সা.) সাহচর্য ও যুদ্ধসমূহ
ওলামায়ে কেরাম বলেন, আবু বকর সিদ্দীক (রা.) ঈমান গ্রহণ থেকে মৃত্যু অবধি রসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাহচর্য ত্যাগ করেননি। তবে হজ্ব এবং যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনে তিনি হুযূর (সা.)-এর অনুমতিক্রমে সহাচর্য থেকে পৃথক হয়েছেন। তিনি সকল যুদ্ধে নবী (সা.)-এর সাথে উপস্থিত ছিলেন। রসূলুল্লাহ (সা.)-এর সন্তোষ প্রাপ্তির জন্য নবী (সা.)-এর সাথে হিজরত করেছেন, পরিবার পরিজন ছেড়ে গারে সত্তরে থেকেছেন। আল্লাহ তা'আলা কুরআন শরীফে এ ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন- ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعْنَا
উলামায়ে কেরাম বলেন, রণাঙ্গনে তিনি রসূলের (সা.)-কে ত্যাগ করে বিশেষত উহুদ এবং হুনায়নের যুদ্ধে যখন সকলেই রসূলুল্লাহ (সা.)-কে ত্যাগ করে পালিয়েছিলেন, এ সময়ও তিনি তাঁর সাথে ছিলেন।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, বদর যুদ্ধে ফেরেশতারা পরস্পরে বলাবলি করছিল যে, ঐ দেখ হযরত আবু বকর ছাউনির নিচে নবী (সা.)-এর সাথে দাঁড়িয়ে আছেন। (ইবনে আসাকির)
আবু ইয়ালা, হাকেম ও আহমদ (র.) হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে ও আবু বকর (রা.) কে বললেন, তোমাদের দু'জনের মধ্যে একজনের সাহায্য হযরত জিবরাঈল (আ.) আপরজনের সাহায্য হযরত মীকাঈল (আ.) করতেছেন।
ইবনে আসকির বলেন, আব্দুর রহমান বিন আবু বকর (রা.) মুশরিকদের সাথে বদর যুদ্ধে গিয়েছিল। মুসলমান হওয়ার পর আব্দুর রহমান তাঁর পিতাকে বলেন, বদর যুদ্ধে কয়েকবার আপনি আমার তীরের আওতায় পড়েছিলেন। কিন্তু আমি নিজের হাতকে গুটিয়ে নিয়েছি। হযরত আবু বকর (রা.) বললেন, যদি তুমি আমার নিশানার মধ্যে এসে যেতে তবে আমি কখনই ছাড়তাম না।
📄 বীরত্ব
হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) সকল সাহাবীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বাহাদুর ছিলেন। হযরত আলী (রা.) বলেন, হে লোক সকল! আমাকে বল কোন্ ব্যক্তি সর্বশ্রেষ্ঠ বীর? লোকেরা বলল, আপনি। তিনি বললেন, আমি সর্বদা নিজের শক্তি দিয়ে লড়াই করেছি, এটা কোনো বীরত্ব নয়। তোমরা সর্বশ্রেষ্ঠ বীরের কথা বল। লোকেরা বলল, আমাদের জানা নেই। হযরত আলী (রা.) বললেন, সর্বশ্রেষ্ঠ বীর হলেন হযরত আবু বকর (রা.) বদর যুদ্ধে আমরা রসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য ছাউনী তৈরি করেছিলাম। আমরা পরামর্শ করলাম সেখানে হুযূর (সা.)-এর নিরাপত্তার জন্য কে থাকবে। আল্লাহর কসম, আমাদের কারো সাহস হয়নি। কিন্তু হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) নাঙ্গা তলোয়ার নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং কাউকে সেখানে ভিড়তে দেননি। যদি কেউ তাঁর প্রতি আক্রমণ করতে উদ্যত হয়েছে তো তিনি তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। সুতরাং তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ বীর।
হযরত আলী (রা.) বলেন, একদা মক্কার মুশরিকরা রসূলুল্লাহ (সা.) কে টানা হেঁচড়া করছিল, আর বলছিল, তুমিই এক খোদা দাবী করেছ। আল্লাহর কসম! কারো সাহস ছিল না যে, এ অবস্থায় সে মুশরিকদের মোকাবিলা করবে। কিন্তু আবু বকর সিদ্দীক মুশরিকদের মেরে ছত্রভঙ্গ করেন এবং ধাক্কা দিয়ে ফেলে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যান এবং বলতে থাকেন। আফসোস, শত আফসোস, তোমরা এমন ব্যক্তিকে হত্যা করতে চেয়েছিলে যিনি বলেন, আমার প্রতিপালক এক ও অদ্বিতীয়। এ পর্যন্ত বলে হযরত আলী (রা.) চাদর উঠিয়ে কাঁদতে লাগলেন এবং তাঁর দাড়ি ভিজে গেল। অতঃপর তিনি বললেন, বল ফেরাউনের যুগের মুমিন শ্রেষ্ঠ না আবু বকর? লোকদের নীরব থাকতে দেখে তিনি নিজেই বললেন, তোমরা কেন উত্তর দিলে না? আল্লাহর কসম, হযরত আবু বকরের এক মুহূর্ত তাদের হাজার ঘণ্টা অপেক্ষা উত্তম। কেননা তারা নিজেদের ঈমান গোপন করে রেখেছিল, আর হযরত আবু বকর (রা.) নিজের ঈমানের কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন। (বায্যার)
হযরত উরওয়া বিন যুবাইর বলেন, আমি আব্দুল্লাহ বিন আমার বিন আসকে জিজ্ঞেস করলাম, হুযূর (সা.)-কে সবচেয়ে বেশি কষ্ট কিভাবে দেয়া হয়েছিল? তিনি বললেন, আমি দেখলাম উকবা নবী (সা.)-কে নামাযরত অবস্থায় পেছন থেকে এসে গলায় চাদর পেঁচিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলে। ইত্যবসরে আবু বকর (রা.) সেখানে এসে উকবাকে সরিয়ে দেন এবং বলেন, তোমরা এমন ব্যক্তিকে হত্যা করতে চাও, যিনি এক ও অদ্বিতীয় প্রভুর আওয়াজ তুলেছেন। বস্তুত তিনি আল্লাহর নিকট থেকে দলীলসহ প্রেরিত হয়েছেন। (বুখারী)
ইবনে তালীব বলেন, হযরত আবু বকর (রা.) বলেছেন, উহুদ যুদ্ধে সকলেই রসূলুল্লাহ (সা.)-কে ছেড়ে পালিয়ে গেলে আমি তাঁর সাথে ছিলাম। সে সংকটময় পরিস্থিতিতে যিনি হুযূর (সা.)-কে হেফাজত করার জন্য এগিয়ে আসেন, তিনি হলেন হযরত আয়েশা (রা.)। তিনি (আয়েশা) বলেন, আটত্রিশ জন লোক ইসলাম গ্রহণ করলে হযরত আবু বকর (রা.) নবীজীর নিকট আরয করলেন, আপনি ইসলামের প্রকাশ্য ঘোষণা দিন। তিনি বললেন, আমাদের দল এখন পর্যন্ত যথেষ্ট ছোট। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বারবার একই কথা বলতে থাকেন। অবশেষে নবী (সা.) সত্য ধর্মের প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন। ফলে লোকেরা মসজিদের চতুর্দিকে গোত্র গোত্র ভাবে এলোমেলো হয়ে যায়। হযরত আবু বকর (রা.) দাঁড়িয়ে খুতবা দেন এবং লোকদের ইসলামের দাওয়াত দেন। মুশরিকরা তাঁকে আক্রমণ করে বসে এবং এজন্য লোকদের অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। (ইবনে আসাকির)
ইবনে আসাকির হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, যখন হযরত আবু বকর (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন তখনই তিনি ইসলামকে প্রকাশ করে দিয়েছেন এবং লোকদের আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রসূলের প্রতি আহ্বান করেছেন।
📄 দানশীলতা
সকল সাহাবার মধ্য থেকে সবচেয়ে বেশি দানশীল হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- وَسَيُجَنَّبُهَا الْأَتْقَى الَّذِي يُؤْتِي مَالَهُ يَتَزَكَّى -
ওলামায়ে কেরাম একমত এ আয়াত তাঁর শানে নাযিল হয়েছে। (ইবনে জাওযী)
আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আবু বকরের সম্পদ আমার যতটুকু উপকার করেছে আর কারো সম্পদ ততটুকু করেনি। হযরত আবু বকর (রা.) অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আরয করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি এবং আমার সকল সম্পদ আপনার। এটি আহমদ বর্ণনা করেছেন। হযরত আয়েশার অপর হাদীসটি এমনই। তবে সে হাদীসে এতটুকু বৃদ্ধি করা হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ (সা.) নিজের সম্পদের মত নিজ সম্পদ মনে করে হযরত আবু বকরের সম্পদ খরচ করেছেন। (খতীব)
হযরত আয়েশা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, ইসলাম গ্রহণের সময় হযরত আবু বকরের নিকট চল্লিশ হাজার দেরহাম অথবা দিনার ছিল। তিনি এগুলো সম্পূর্ণ হুযূর (সা.)-এর জন্য ব্যয় করেছেন। (ইবনে আসাকির)
ইবনে উমর (রা.) বলেন, ইসলাম গ্রহণের সময় হযরত আবু বকরের নিকট চল্লিশ হাজার দেরহাম ছিল। আর হিজরতের সময় পাঁচ হাজারের বেশি ছিল না। বাকী অর্থ তিনি ইসলামের সাহায্য এবং মুসলমান গোলাম কিনে আযাদ করার পেছনে ব্যয় করেছেন। (ইবনে সাঈদ)
ইবনে আসাকির হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর এ রকম সাতজন গোলামকে কিনে আযাদ করে দিয়েছেন যাদের মালিক তাদের উপর অত্যাচার করত। ইবনে উমর বলেন, একদা আমি হযরত (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত ছিলাম। হযরত আবু বকর (রা.) জুব্বা পরে, যে জুব্বায় বোতামের পরিবর্তে কাঁটা ব্যবহার করা হয়েছিল? তিনি দরবারে এলেন। ইত্যবসরে হযরত জিবরাঈল (আ.) অবতীর্ণ হয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আবু বকর সিদ্দীক কাঁটা জড়ানো জুব্বা পরে এসেছেন, আজ এ ব্যতিক্রম কেন? হুযুর (সা.) বললেন, হে জিবরাঈল! মক্কা বিজয়ের পূর্বে আমার জন্য তার সকল সম্পদ ব্যয় করে দিয়েছেন। হযরত জিবরাঈল (আ.) বললেন, আল্লাহ তাআলা আবু বকরকে সালাম জানিয়েছেন এবং বলেছেন, হে আবু বকর, আমার জন্য যে দারিদ্রতা গ্রহণ করেছ, এতে কি তুমি সন্তুষ্ট? হযরত আবু বকর (রা.) বললেন, আমি আমার প্রতিপালকের উপর সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট। এটি ইবনে আসাকির প্রমুখ বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসের সনদ অত্যন্ত দুর্বল। এ ধরনের দুর্বল রেওয়ায়েতসমূহ অনেক রয়েছে।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে এক রেওয়ায়েতে আছে, হযরত জিবরাঈল (আ.) কাঁটাযুক্ত জুব্বা পরে নাযিল হলে রসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, হে জিবরাঈল! এটা কেমন রীতি? তিনি বললেন, আল্লাহ ফেরেশতাদের আবু বকরের অনুরূপ পোশাক পরার নির্দেশ দিয়েছেন। এ রেওয়ায়েতটিও অত্যন্ত দুর্বল, যদিও তা অনেক লোক বর্ণনা করেছেন। তবে এ ধরনের রেওয়ায়েতকে পরিহার করে চলাই উত্তম। এটি খতীব বর্ণনা করেছেন।
হযরত উমর ফারুক (রা.) বলেন, একদিন আমি রসূলকে বলতে শুনলাম, আমি কিছু মাল গ্রহণ করব। হযরত উমর (রা.) বলেন, এতদশ্রবণে আমি পূর্ণ অভিপ্রায় গ্রহণ করলাম যে, আবু বকরের চেয়ে আমি এবার বেশি সদকা করব। এ জন্য আমার ধন সম্পদের অর্ধেকাংশ নিয়ে হাযির হলাম। নবী করীম (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, তোমার পারিবারের জন্য কতটুকু রেখে এসেছ? আরয করলাম, যতটুকু এনেছি। ইত্যবসরে আবু বকর সিদ্দীক (রা.) তাঁর সমস্ত সম্পদ নিয়ে হাযির হন। রসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, নিজ পরিবারের জন্য কি রেখে এসেছ? তিনি বললেন, তাদের জন্য আল্লাহ এবং তাঁর রসূলই যথেষ্ট। তখন আমি বুঝলাম আমি তাঁর সমকক্ষ নই। আবু দাউদ এবং তিরমিযী কর্তৃক বর্ণিত।
হাসান বসরী (র.) বলেন, একবার হযরত আবু বকর (রা.) সদকার মাল নিয়ে এসে তার পরিমাণ গোপন রেখে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহা! এগুলো আমার সদকা। আল্লাহর কসম, আপনার প্রতিপালক আমার সাহায্যের জন্য যথেষ্ট। আর হযরত উমর সদকার মাল এনে তার পরিমাণ প্রকাশ করে বলতে লাগলেন, আপনার রবের সাহায্যই যথেষ্ট। নবী করীম (সা.) বললেন, তোমাদের দু'জনের সদকার মধ্যে পার্থক্য এতটুকু, যতটুকু পার্থক্য উভয়ের কথার মধ্যে। আবু নুয়াঈম এটি বর্ণনা করেন, এর সনদ সুন্দর।
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আমার উপর কারো অনুগ্রহ নেই, সকলের উপকারের প্রতিদান দিয়েছি। কিন্তু আবু বকরের দয়ার প্রতিদান এখন পর্যন্ত বাকী রয়ে গেছে। তাঁর অনুগ্রহ এতই বিশাল যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা এর প্রতিদান দিবেন। কোনো সম্পদ আমাকে ততটুকু লাভবান করতে পারেনি, যতটুকু আবু বকরের সম্পদ করেছে। (তিরমিযী)
হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বলেন, একদা আমার পিতাকে নিয়ে হযরত নবী করীম (সা.)-এর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। তিনি বললেন, তুমি বৃদ্ধকে কষ্ট দিয়ে কেন নিয়ে এলে, আমিই যেতাম। আমি বললাম, আপনাকে কষ্ট দেয়ার চেয়ে তার আগমনই শ্রেয়। তিনি বললেন, আমার প্রতি তোমার যে অনুগ্রহ তাতে তোমার পিতাকে কষ্ট দেয়া আমার জন্য সহনযোগ্য নয়। (বায্যার)
ইবনে আসাকির ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে রেওয়ায়েত করেন, রসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, আমার প্রতি আবু বকরের চেয়ে বেশি অনুগ্রহ কারো নেই। তিনি নিজের জীবন দিয়ে আমার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, সম্পদ দিয়ে সাহায্য করেছেন এবং নিজের মেয়েকে আমার সাথে বিয়ে দিয়েছেন।