📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 নাম ও উপাধি

📄 নাম ও উপাধি


ইবনে কাসীর (র.) বলেন, এ ব্যাপারে সকল উলামা একমত যে, তাঁর নাম আব্দুল্লাহ বিন উসমান। তবে ইবনে সাদ ইবনে সিরীন (র.) থেকে বর্ণনা করেন, তাঁর নাম আতীক। বিশুদ্ধ অভিমত হচ্ছে, আতীক উপাধি। এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। এ উপাধি কখন এবং কেন হয়। কেউ কেউ বলেন, তাঁর সৌন্দর্য এবং সুদর্শনের কারণে তাকে এ উপাধি দেয়া হয়। লায়েছ বিন সাদ, আহমদ বিন হাম্বল প্রমুখ এ রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন।

আবু নুয়াঈম লিখেছেন, পুণ্যময় কাজে অগ্রগতি হওয়ার কারণে তাঁকে এ উপাধি দেয়া হয়। কেউ কেউ বর্ণনা করেন, তাঁর বংশের পূর্বপুরুষদের চরিত্রে কোনো অপবাদ না থাকার কারণে তাঁকে এ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। কারো মতে তাঁর নাম আতীক রাখা হয়েছিল, পরবর্তীতে আব্দুল্লাহ নাম হয়।

তাবারানী কাসিম বিন মুহাম্মাদ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি আবু বকর (রা.)-এর নাম হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, আব্দুল্লাহ। প্রশ্ন করা হলো, লোকেরা তো আতীক বলে। তিনি বললেন, আবু কুহাফার তিন পুত্র আতীক, মুকি এবং মুতাইন।

ইবনে মান্দা এবং ইবনে আসাকির মূসা বিন তালহা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, আমি আবু তালহা (রা.) কে জিজ্ঞেস করলাম-কেন আবু বকরের নাম আতীক রাখা হলে? তিনি বললেন, তাঁর পিতার কোনো সন্তান জীবিত থাকত না। তাঁর জন্মের সময় তাঁর পিতা তাঁকে নিয়ে কাবা শরীফে গিয়ে আরয করলেন, হে আল্লাহ! এ নবজাতককে মৃত্যু অবধি আতীক (মুক্ত) করে আমাকে দান করো। তাবারানী ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে রেওয়ায়েত করেন, লাবণ্যময় আকৃতির জন্য তাঁর নাম আতীক রাখা হয়। ইবনে আসাকির হয়রত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, পারিবারিকভাবে তাঁর নাম আব্দুল্লাহ রাখা হয়। তবে তিনি আতীক নামে অধিক প্রসিদ্ধ হয়ে যান। এক রেওয়ায়েতে রয়েছে, নবী (সা.) তাঁর নাম রেখেছিলেন আতীক।

আবু ইয়ালা মুসনাদ গ্রন্থে লিখেছেন, ইবনে সাদ (র.) এবং হাকেম (র.) হযরত আয়েশা (রা.)-এর রেওয়ায়েত বর্ণনা করেন, একদিন আমি নিজেরঘরে ছিলাম, হুযুর (সা.) সাহাবীদের নিয়ে ঘরের বারান্দায় ছিলেন। আমাদের মধ্যে একটি পর্দার আড়াল ছিল। ইত্যবসরে হযরত আবু বকর (রা.) সেখানে এলেন। হুযুর (সা.) বললেন, যে জাহান্নামের আগুন থেকে চিরমুক্ত ব্যক্তিকে দেখতে চায় সে যেন হযরত আবু বকরকে দেখে। পারিবারিকভাবে তাঁর নাম রাখা হয় আব্দুল্লাহ, তবে তিনি আতীক নামে প্রসিদ্ধ হন।

তিরমিযী এবং হাকেম হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, একদা হযরত আবু বকর (রা.) নবী আকরাম (সা.)-এর খেদমতে উপস্থি হলে তিনি বললেন, হে আবু বকর! আল্লাহ তা'আলা তোমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত করেছেন। সেদিন থেকেই তাঁর নাম আতীক হয়।

আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়েরের সূত্রে বায়্যার এবং তাবারানী বর্ণনা করেন, সিদ্দীকে আকবরের নাম আব্দুল্লাহ ছিল। একদা নবী করীম (সা.) বলেন, তোমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত করা হয়েছে- সে দিন থেকে তাঁর নাম হয় আতীক। আর সিদ্দীক উপাধি জাহেলিয়াতের যুগ থেকেই ছিল। কারণ সর্বদা তিনি সত্য বলতেন। এ রেওয়ায়েতটি মুসদীও লিপিবদ্ধ করেছেন। এটাও বলা হয়ে থাকে যে, তিনি নবী (সা.)-এর আনীত সংবাদকে সত্যায়িত করায় তাঁকে সিদ্দীক উপাধি দেয়া হয়। কাতাদা ও ইবনে ইসহাক বলেন, মিরাজের রজনীর পরদিন থেকে হযরত আবু বকর এ উপাধি প্রাপ্ত হন।

হাকেম মুসতাদরাক গ্রন্থে হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, মুশরেকরা হযরত আবু বকরের খেদমতে উপস্থিত হয়ে বলল, আপনি কি কিছু জানেন! আপনার বন্ধু গত রাতে বাইতুল মুকাদ্দাস পৌঁছে গিয়েছিল বলে দাবী করেছেন। তিনি বললেন, তিনি কি এভাবেই বলেছেন? মুশরেকরা বলল, হ্যাঁ! তিনি বললেন, হুযুর (সা.) সকাল-সন্ধ্যা যদি দূর আসমানের সংবাদ সরবরাহ করেন তবুও আমি তা বিশ্বাস করব। এ কারণে তাঁকে সিদ্দীক উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এ হাদীসটি আনাস (রা.) এবং আবু হুরায়রা (রা.) থেকে তাবারানী বর্ণনা করেছেন।

সাদ বিন মনসুর মুসনাদ গ্রন্থে লিখেছেন, মিরাজের রাতে ফেরার সময় নবী করীম (সা.) যী তোয়ানামক স্থানে পৌঁছে বলেন, হে জিবরাঈল! আমার সম্প্রদায় আমাকে সত্যায়িত করবে না। হযরত জিবরাঈল (আ.) বললেন, আবু বকর আপনাকে সত্যায়িত করবেন, তিনি সিদ্দীক।

তাবারানী আওতাস এবং হাকেম মুসতাদরাক গ্রন্থে লিখেছেন, ইবনে উসায়ের হযরত আলীকে বললেন, আবু বকর সেই মহান মনীষী যাঁর নাম আব্দুল্লাহ। হযরত জিব্রাঈল এবং হুযুর (সা.) তাঁর নাম রাখেন সিদ্দীক। তিনি আমাদের নামায পড়ায়েছেন এবং তিনি হলেন রসূল আকরাম (সা.)-এর খলীফা। রসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর মাধ্যমে আমাদের দ্বীনের কাজ করে নিয়েছেন। আর আমরা দুনিয়ার কাজ করে নেবার জন্য তাঁর প্রতি রাযী হয়েছি।

দারা কুতনী এবং হাকেম আবু ইয়াহইয়া থেকে বর্ণনা করেন, আমি অসংখ্যবার হযরত আলীকে মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তা'আলা হুযুর (সা.)-এর মুখ দিয়ে তাঁর নাম সিদ্দীক রেখেছেন।

তাবারানী হাকীম বিন সাদ থেকে বর্ণনা করেন, একদা হযরত আলী (রা.) কসম করে বললেন, হযরত আবু বকরের নাম আল্লাহ তা'আলা আসমান থেকে নাযিল করেছেন। হাদীসে উহুদে রয়েছে, উহুদ পাহাড় নড়ে উঠলে বলা হলো, থেমে যাও। কারণ তোমার বক্ষে সিদ্দীক এবং শহীদ রয়েছে।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 জন্মগ্রহণ ও লালন-পালন

📄 জন্মগ্রহণ ও লালন-পালন


রসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের দু'বছর কয়েক মাস পর আবু বকর (রা.) জন্মগ্রহণ করেন। তেষট্টি বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। খলীফা বিন খাইয়াত ইয়াযিদ বিন আসাম থেকে বর্ণনা করেন, নবী (সা.) আবু বকরকে জিজ্ঞেস করেন, বড় কে তুমি না আমি? আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বললেন, বড় তো আপনি। তবে আমার বয়স বেশি। এ মুরসাল হাদীসটি অত্যন্ত গরীব। বস্তুত এর উল্টাটাই অধিকতর বিশুদ্ধ। হযরত আব্বাস (রা.)-এর সমর্থক।

হযরত আবু বকর (রা.) মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ব্যবসা সংক্রান্ত প্রয়োজন ছাড়া মক্কা থেকে বের হননি। নিজ গোত্রে তাঁকে ধনাঢ্য, ভাদ্র, দয়ার্দ্র এবং সম্মানিত মনে করা হতো।

ইবনুদ দাগানা বলেন, তিনি দয়াশীল এবং সত্যবাদী। প্রতিবন্ধীদের সেবা করতেন। বিপদগ্রস্তদের সাহায্য করতেন এবং অতিথিপরায়ণ ছিলেন।

ইমাম নব্বী লিখেছেন, তিনি জাহেলিয়াতের যুগে কুরাইশ সর্দারদের অন্যতম ছিলেন। কুরাইশরা তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করত এবং অত্যন্ত শ্রদ্ধা করত। তিনিও তাদের লেনদেনের প্রতি সচেতন ছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি সর্বস্ব ইসলামের জন্য উজাড় করে দেন। যুবাইর ইবনে বাকার এবং ইবনে আসাকির লিখেছেন, কুরাইশদের এগারোজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। যাঁকে ইসলাম এবং জাহেলিয়াত উভয় যুগে সম্মান করা হতো। তিনি জাহেলিয়াতের যুগে হত্যা এবং অত্যাচারের বিচার করতেন। কারণ কুরাইশদের কোনো বাদশাহ ছিল না, সকল কাজের দণ্ড তাঁর হাতেই ছিল। তবে প্রত্যেক গোত্র প্রধানদের এক একটি দায়িত্ব ছিল। বনু হাশেম হাজীদের পানি পান এবং খানা খাওয়ানোর দায়িত্ব পালন করত। অর্থাৎ, তারা ব্যতীত হাজীদের কেউ খানাপিনা সরবরাহ করত না। যদি কেউ দিত তবে বনু হাশেমদের গুলোই সরবরাহ করত। বনু আব্দুদ্দার পতাকা বহন এবং মজলিসে শূরার দায়িত্ব পালন করত। অর্থাৎ, তাদের অনুমতি ছাড়া বাইতুল্লাহ শরীফে কেউ যেতে পারত না। যুদ্ধের ময়দানে তারা পতাকা বহন করত। মজলিসে শূরা কাবার দারুন নদওয়াতে বসত এবং কাবা তাদের অধীনে ছিল।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 জাহেলিয়াতের যুগে তাঁর সংযম

📄 জাহেলিয়াতের যুগে তাঁর সংযম


ইবনে আসাকির হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) জাহেলিয়াত এবং ইসলাম কোনো যুগেই কবিতা আবৃত্তি করেননি। তিনি এবং উসমান (রা.) জাহেলিয়াতের যুগে মদ বর্জন করেছিলেন। আবু নুয়াঈম হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি জাহেলিয়াতের যুগে মদ পান নিজের জন্য হারাম করে দিয়েছেন। ইবনে আসাকির আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি কখনও কবিতা আবৃত্তি করেন নি। ইবনে আসাকির বলেন, সাহাবীদের কে মজিলসে জনৈক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি কখনও ভুলে মদ পান করেছেন? তিনি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে বললেন, কখনও না। অতঃপর তিনি আবার বললেন, মদ পান করার কারণে মর্যাদা বিনষ্ট হয়। রসূলুল্লাহ (সা.) এ সংবাদ অবগতির পর দু'বার বললেন, আবু বকর সত্যই বলেছেন। এ হাদীসটি সনদ এবং পাঠকরণের দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গরীব।

📘 তারীখুল খুলাফা > 📄 তাঁর আকৃতি

📄 তাঁর আকৃতি


ইবনে সাদ হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তাঁর চেহারার রং উজ্জ্বল ছিল। তাঁর অবয়বে রগ দেখা যেত। দৃষ্টি সর্বদা নিচে থাকতো। কপাল বুলন্দ ছিল। আঙুলের জোড়াগুলো ফাঁকা ছিল। তিনি মেহেদী ব্যবহার করতেন। হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) মদীনায় হিজরতের সময় হযরত আবু বকর সিদ্দীক ছাড়া সাদা কালো মিশ্রিত কারো দাড়ি ছিল না। এজন্য তিনি মেহেদী এবং কাসাম (লাল বর্ণের ফুলবিশেষ) দ্বারা চুলে কলব করতেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00