📄 খিলাফত কুরাইশদের জন্য
আবু দাউদ তায়ালাসী স্বীয় মুসনাদ গ্রন্থে আবু বারযাহ'র বরাদ দিয়ে বর্ণনা করেন, খিলাফত কুরাইশদের জন্য মানানসই। তাঁরা ইনসাফপূর্ণ বিচার, প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং মেহেরবান। এ রেওয়ায়েতটি তাবারানীও বর্ণনা করেছেন।
তিরমিযী আবু হুরায়রা (রা.)-এর বরাত দিয়ে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, প্রশাসন কুরাইশদের, বিচার বিভাগ আনসারদের এবং আযাদ হাবশীদের অধিকারে থাকা উচিত। এ হাদীসের সকল সনদ সহীহ।
ইমাম আহমদ (র.) স্বীয় মুসনাদে হাকেম ইবনে নাফে ও উতবা ইবনে আব্দুল্লাহ্ রেওয়ায়েত নকল করে লিখেছেন, হুজুর (সা.) ইরশাদ করেন, খিলাফত কুরাইশদের, বিচারকার্য আনসারদের এবং আহ্বানের দায়িত্ব হাবশীদের।
বায্যার হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, খলীফাগণ কুরাইশদের মধ্য থেকে হবেন। এদের মধ্যে নেককারগণ নেককারগণের আমীর, আর বদকারগণ বদকারগণের আমীর।
প্রথম পরিচ্ছেদ
ইমাম আহমদ (র.) বলেন, হযরত সাফীনাহ (রা.) বলেছেন, আমি রসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি তিনি ইরশাদ করেন, খিলাফত মাত্র ত্রিশ বছর টিকবে। তারপর বাদশাহী প্রথা এসে যাবে। আসহাবে সুনান এটি রেওয়ায়েত করেছেন। ওলামাগণ বলেন, তোমাদের দ্বীন ইসলাম প্রথমে নবুওয়ত ও রহমত দ্বারা শুরু হয়। এরপর খিলাফত এবং রহমত এসে যায় এবং তারপর বাদশাহী এবং অত্যাচারের প্রাদুর্ভাব ঘটে।
আব্দুল্লাহ বিন আহমদ বলেন, জাবের বিন সামুরা (রা.) রসূলুল্লাহ (সা.)-এর থেকে রেওয়ায়েত করেন যে, কুরাইশদের বারোজন খলীফা অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত ইসলাম সবসময় জয়যুক্ত থাকবে। এটি ইমাম বুখারী (র.) এবং ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি কয়েকভাবে বর্ণিত হয়েছে, 'ইসলামের কাজ অটুট থাকবে' 'ইসলামের কাজ অব্যাহত থাকবে' এ দু'টি পদ্ধতি ইমাম আহমদ কর্তৃক বর্ণিত।
ইমাম মুসলিম (র.) এ হাদীসটি এভাবে বর্ণনা করেছেন, বারোজন শাসক অতিবাহিত হওয়া পর্যন্ত মুসলমানদের কাজ অব্যাহত থাকবে। তিনি রেওয়ায়েতটি এভাবেও বর্ণনা করেছেন, বারোজন খলীফা না আসা পর্যন্ত সমাজে ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু কার্যকর হবে না। উপরন্তু ইসলাম শক্ত এবং সংরক্ষিত থাকবে বারোজন খলীফা পর্যন্ত। বায্যার এভাবে বর্ণনা করেছেন, (নবীজী (সা.) বলেন) আমার বারোজন খলীফা অতিবাহিত হওয়া পর্যন্ত।
এ রেওয়ায়েতটি আবু দাউদ একটু বৃদ্ধি করেছেন এভাবে, নবীজী (সা.) ঘরে এলে কুরাইশরা তাঁর কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, বারোজন খলীফার পর কি হবে? তিনি বললেন, অতঃপর হত্যাযজ্ঞ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিবে। এক রেওয়ায়েতে রয়েছে, উম্মাহ'র ইজমাকৃত বারোজন খলীফা পর্যন্ত এ দ্বীন সর্বদা অটুট থাকবে। এটি ইমাম আহমদের রেওয়ায়েত।
বায্যার হাসান সূত্রে বর্ণনা করেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হল, কতজন খলীফা এ উম্মতকে শাসন করবে? ইবনে মাসউদ (রা.) বললেন, একদা আমরাও নবী আকরাম (সা.)-কে এ ধরনের প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, বনী ইসরাঈলদের অনুরূপ বারোজন।
কাযী আয়ায বলেন, উক্ত হাদীস এবং সমার্থ হাদীসে উল্লিখিত বারোজন খলীফা থেকে সম্ভবত উদ্দেশ্য হলো, এ বারোজন খলীফা খিলাফতের অপ্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ইসলামের শৌর্য-বীর্য কালে আসবেন। আর তাঁদের ব্যাপারে উম্মতের ইজমা (ঐকমত্য) থাকবে। কারণ দুর্ভাবনার যুগ উমাইয়া বংশের ওয়ালীদ বিন ইয়াযিদের শাসনমাল থেকে শুরু হয়। আর তা আব্বাসিয়া খিলাফত পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। আব্বাসিয়াদের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বনূ উমাইয়ার মূলোচ্ছেদ হয়।
শায়খুল ইসলাম ইবনে হাজার (র.) সহীহ বুখারী শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থে কাযী আয়াযের সূত্র ধরে লিখেছেন, এ হাদীসের ব্যাপারে কাযী আয়াযের অভিমতটি অত্যন্ত চমৎকার। কারণ কতিপয় বিশুদ্ধ হাদীস এ অভিমতকে সমর্থন করে যে, সমস্ত লোক খলীফার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করে। এই ঐকমত্য বা ইজমার অর্থ হলো লোকেরা বাইআতের ব্যাপারে অনুগত এবং হযরত আবু বকর (রা.), হযরত উমর (রা.), হযরত উসমান (রা.) এবং হযরত আলী (রা.)-এর যুগের মত কেউ বাইআতের ব্যাপারে বাহানা করবে না।
সিফফিনের বিবাদের সময় দু'জন প্রশাসকের আবির্ভাব ঘটে। সেদিন মুআবিয়া (রা.) খলীফা হন এবং লোকেরা ইমাম হাসান (রা.)-এর সাথে সন্ধি করার পর আমীর মুআবিয়া (রা.)-এর ব্যাপারে ইজমা তথা ঐকমত্যে পৌঁছেন। অতঃপর ইয়াযিদের বিষয়েও ইজমা হয় এবং ইমাম হোসাইনের ব্যাপারে ঐকমত্য হয়নি; বরং তিনি পূর্বেই শহীদ হন। ইয়াযিদের মৃত্যুর পর মতানৈক্য দেখা দেয় এবং ইবনে যুবাইরের হত্যার পর আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানের ব্যাপারে ইজমা হয়। আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানের পর তাঁর চার পুত্র ওয়ালিদ, সুলাইমান, ইয়াযিদ এবং হিশামের ব্যাপারে ইজমা হয়। সুলাইমান এবং ইয়াযিদের মধ্যবর্তীতে উমর বিন আব্দুল আযীযের বিষয়েও ইজমা হয়েছিল। এ হিসাব মোতাবেক খোলাফায়ে রাশেদা ছাড়া সাতজন খলীফা হয়। আর এতে মোট খলীফার সংখ্যা দাঁড়ায় এগারো জন। বারো নম্বর খলীফা ওয়ালিদ বিন ইয়াযিদ বিন আব্দুল মালিক। তাঁর চাচা হিশামের মৃত্যুর পর তাঁর ব্যাপারে ইজমা হয়। চার বছর পর লোকেরা তাঁর প্রতি অনাস্থা পোষণ করে এবং তাকে হত্যা করে। এতে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় এবং সময় অতি দ্রুত পাল্টে যায়। অতঃপর কোন খলীফা মনোনীত করার ব্যাপারে লোকদের আর কোনো ইজমা নাই। কারণ ইয়াযিদ বিন ওয়ালিদ তাঁর চাচাত ভাই ওয়ালিদ বিন ইয়াযিদের বিরুদ্ধাচরণ করেছিলেন। তিনি (ইয়াযিদ বিন ওয়ালিদ) অল্প কিছুদিন জীবিত ছিলেন। তাঁর পিতার চাচার ছেলে মারওয়ান বিন মুহাম্মদ বিন মারওয়ান তাঁর বিরুদ্ধে জয়লাভ করেন। ইয়াযিদের পরলোক গমনের পর তাঁর ভাই ইব্রাহীম বাদশাহী হাতে নেন। কিন্তু মারওয়ান বিন মুহাম্মদ বিন মারওয়ান ইব্রাহীমকে হত্যা করেন। অতঃপর বনু আব্বাসিয়ার হাতে তাঁর পতন হয় এবং তারা তাঁকে হত্যা করে।
আব্বাসিয়া বংশের প্রথম খলীফা হলেন সাফ্ফাহ। তিনি দীর্ঘ সময় রাজদণ্ড ধারণ করেছিলেন না। তার পর তাঁর ভাই মনসুর খিলাফতের দায়িত্ব নেন। তিনি দীর্ঘ সময় রাজ ক্ষমতা আঁকড়ে থাকেন। কিন্তু বনু উমাইয়া স্পেনে সংগঠিত হওয়ার কারণে পাশ্চাত্যের ভূখণ্ড তাঁর শাসনামলে তাঁর হাতছাড়া হয়ে যায়। বনূ আব্বাসিয়া নিজেদের রাজত্বকে খিলাফত উপাধিতে ভূষিত করে। তাদের সময় অনেক ভ্রষ্টাচারের প্রবর্তণ ঘটে এবং নামেমাত্র খিলাফত থাকে। পক্ষান্তরে আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানের যুগে মুসলমানগণ পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত বিজয় অর্জন করেছিল। খলীফার নামে খুতবা পাঠ করা হতো। খলীফার নির্দেশ ছাড়া কোন শহরে কিছু হতো না। স্পেন কেন্দ্রীয় সরকার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া, সেখানে নামমাত্র খলীফাদের দুর্বল শাসন এবং তার সাথে মিসরে উবাইদীদের খিলাফতের প্রতি আহবান এ সবই বাগদাদ থেকে খিলাফতের কর্মকাণ্ড চলে যাওয়ার ফল। বিশাল মুসলিম সাম্রাজ্যের সর্বত্রই খিলাফত নিয়ে বিবাদ-সে একই কারণ পঞ্চম শতাব্দীতে স্পেনে ছয়জন খলীফা দাবী করেছেন।
রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, বারোজন খলীফার পর ফিত্না ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিবে। বস্তুত তাই হলো। অন্যায় হত্যাযজ্ঞ চলল এবং তা দীর্ঘস্থায়ী হলো। দিন দিন তা বৃদ্ধিও পেতে থাকল। তারা এও অপব্যাখ্যা করল যে, বারোজন খলীফা সম্পর্কে নবীজী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী ইসলামের আবির্ভাব কাল থেকে কিয়ামত পর্যন্ত প্রযোজ্য। অর্থাৎ, বারোজন খলীফা প্রাথমিক যুগে পরপর আসবেন এমন কোনো ইঙ্গিত নাই। তারা কেয়ামতের আগ দিয়েও আসতে পারেন। অতএব বারোজন খলীফা অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত এ উম্মতের ধ্বংস নাই। এ কথাগুলো তাঁরা নিজেদের বড় বড় মুসনাদ গ্রন্থে আবু খালিদের বরাত দিয়ে লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলেন।
বারোজন খলীফার পর বিশৃঙ্খলা ও ফিত্না দেখা দিবে-নবীজী (সা.)-এর এই ভবিষ্যদ্বাণীর ব্যাখ্যা তাঁরা এভাবে করেছে, এ ফিত্না দ্বারা কিয়ামতের পূর্বের ফিত না ও বিশৃঙ্খলা উদ্দেশ্য। তাঁরা বারোজন খলীফাকে এভাবে গণনা করে যে, খোলাফায়ে রাশেদার চারজন, ইমাম হাসান, আমীর মুআবিয়া, যুবাইর এবং উমর বিন আব্দুল আযীয এরা আটজন। নবম খলীফা মুহতাদী। কারণ বনু আব্বাসিয়ার খলীফা মুহতাদী বনূ উমাইয়ার খলীফা উমর বিন আব্দুল আযীযের মত ন্যায় বিচারক ছিলেন। এরপর মাহদী।
📄 বনু উমাইয়ার খিলাফতকে ভীতিপ্রদ বর্ণনাকারী হাদীসসমূহ
ইমাম তিরমিযী (র.) বলেন, ইউসুফ বিন সাদ কর্তৃক বর্ণিত, ইমাম হাসান (রা.) মুআবিয়া (রা.)-এর নিকট বাইআতের সময় জনৈক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে ইমাম হাসান (রা.)-কে বলল, আপনি মুসলমানদের লজ্জিত করলেন। তিনি বললেন, আল্লাহ তোমার উপর রহম করুন। আমাকে খারাপ বলো না। কারণ নবী (সা.) এক রাতে বনূ উমাইয়াকে মিম্বরের উপর দেখে বিহবলিত হয়ে পড়েছিলেন। সে সময়- إِنَّا أَعْطَيْنُكَ الْكَوْثَرَ إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةُ الْقَدْرِ অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ, আমি সম্মনিত রাতে কুরআনকে নাযিল করলাম। আর আপনি কি জানেন সম্মানিত রাত কি? সম্মানিত রাত মানে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম রজনী। আপনার মৃত্যুর পর হে মুহাম্মদ (সা.)! বনু উমাইয়া হাজার মাসের মালিক হবে। কাসেম বলেন, আমি হিসাব করেছি আমির মুআবিয়ার বাইআত থেকে হাজার মাস তাদের রাজত্ব ছিল, একটুকুও কম-বেশি হয়নি।
ইমাম তিরমিযী (র.) বলেন, এ হাদীসটি গরীব। এটি কাসেম কর্তৃক বর্ণিত। তিন যদিও নির্ভরযোগ্য, কিন্তু তার উস্তাদ মাজহুল। এ হাদীসখানা হাকেম মুসতাদরাক গ্রন্থে এবং ইবনে জারীর স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন।
হাফেজ আবুল হুজ্জাজ (র.) বলেন, হাদীসখানা মুনকার (অস্বীকারকারী)। ইবনে কাসীরও একই অভিমত পেশ করেছেন। ইবনে জারীর স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে আব্বাস বিন সহলের দাদার বরাত দিয়ে লিখেছেন, নবীজী (সা.) বনূ হাকাম বিন আসকে (বনূ উমাইয়াকে) স্বপ্নে দেখেন- বাদুড়ের মত এক মজলিসে নাচছে। নবীজীর কাছে এটা খুব খারাপ মনে হলো। এরপর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি কোন দিন মুখ খুলে হাসেননি। এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়-
وَمَا جَعَلْنَا الرُّؤْيَا الَّتِي أَرَيْنَاكَ إِلَّا فِتْنَةَ لِلنَّاسِ -
এ হাদীসের সনদগুলো দুর্বল। তবে আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা.), ইয়ালা বিন মাররা (রা.) এবং হোসাইন বিন আলী (রা.)-এর হাদীসগুলো এ হাদীসের সমর্থক। এ হাদীসটি আমি বিভিন্ন পদ্ধতিতে তাফসীর এবং মাসনাদ গ্রন্থে উল্লেখ করেছি। উপরন্তু আসবাবুন নুযূল গ্রন্থেও এ হাদীসের কিছুটা ইশারা করা হয়েছে।
📄 যেসব হাদীসে বনু আব্বাসিয়া খিলাফতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে
ইমাম বায্যার সনদসহ আবূ হুরায়রা (রা.)-এর হাদীস লিখেছেন। হুযূর (সা.) আব্বাস (রা.) কে বলেন, তোমার লোকদের মধ্যে নবুওয়ত এবং রাজত্ব উভয়টাই রয়েছে। এ হাদীসের সনদের মধ্যে আমেরী দুর্বল। কিন্তু আবু নুয়াঈম দালায়েলুন নবুওয়ত, ইবনে আদী কামেল এবং ইবনে আসাকির স্বীয় গ্রন্থে আমেরীর হাদীসখানা কয়েকভাবে বর্ণনা করেছেন।
ইমাম তিরমিযী ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে রেওয়ায়েত করেন, হুযুর (সা.) আব্বাস (রা.)-কে বললেন, সোমবার সকালে আপনার ছেলেকে আমার নিকট নিয়ে আসবেন। আমি তার জন্য দো'আ করে দিব, যাতে আল্লাহ তা'আলা আপনার এবং আপনার আওলাদদের ভালো করেন। আব্বাস (রা.) সকালে ছেলেকে কাপড় পরিয়ে হযরতের খেদমতে নিয়ে আসেন। তিনি দো'আ করলেন, হে আল্লাহ! আব্বাস এবং তার ছেলেকে প্রকাশ্য ও গোপন গোনাহর মধ্যে বেঁধ না এবং তাঁদের ক্ষমা করো। হে আল্লাহ। তাকে এবং তার আওলাদকে রক্ষা করো।
ইমাম তিরমিযী স্বীয় জামে গ্রন্থে এতটুকুই লিখেছেন। তবে রাযীন আল-উবায়দী এ হাদীসটির শেষাংশে এতটুকু বৃদ্ধি করেছেন- তার বংশে আমার খিলাফত জারি রেখ। আমার নিকট এ হাদীসখানা অত্যন্ত চমৎকার। তাবারানী ছাওবান থেকে বর্ণনা করেন। রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি বনু মারওয়ানকে বারবার মিম্বরে উঠতে দেখে খারাপ ভাবলাম। যখন বনু আব্বাসকে বার বার আসতে দেখলাম তখন আমার ভালো লাগল।
আবু নুয়াঈম আবু হুরায়রা (রা.)-এর হাদীস সনদসহ হুলীয়া গ্রন্থে লিখেছেন, একদিন হুজুর (সা.) বাইরে এলে আব্বাস (রা.)-এর সাথে সাক্ষাত হয়। তখন তিনি (সা.) বললেন, হে আবু আল-ফজল! আমি আপনাকে একটি সংবাদ দিব? তিনি বললেন, অবশ্যই নবীজী (সা.) বললেন, আল্লাহ তা'আলা যে কাজ আমার দ্বারা শুরু করিয়েছেন সে কাজ আপনার সন্তানদের মাধ্যমে সমাপ্ত করাবেন।
এর সূত্রগুলো দুর্বল। হযরত আলী (রা.) এ হাদীসটি যে সূত্রে বর্ণনা করেছেন তা আরো দুর্বল।
খতীব ইতিহাস গ্রন্থে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, নবীজী (সা.) বলেন, আপনাদের থেকেই এ কাজ আরম্ভ হয়েছে, আপনাদের দ্বারাই তা শেষ হবে। অচিরেই এ হাদীসের সনদসহ বিস্তারিত বিবরণ মুহতাদী বিল্লাহ অধ্যায়ে আলোচনা করব।
খতীব আম্মার বিন ইয়াসার (রা.)-এর আরেকখানা হাদীস সনদসহ বর্ণনা করেছেন। আবু নুয়াঈম হুলীয়া গ্রন্থে জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রা.) বর্ণনা করেন, নবী করীম (সা.) বলেন, আব্বাসের বংশোদ্ভূত বাদশাহগণ আমার উম্মতের আমীর হবে। এজন্য আল্লাহ তা'আলা তাদের দ্বীনকে জয়যুক্ত করবেন। (সনদ দুর্বল)
আবু নুয়াঈম দালায়েল গ্রন্থে লিখেছেন, ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, উম্মুল ফজল আমার নিকট এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি একদা নবী করীম (সা.)-এর খেদমতে উপস্থিত হলে তিনি বললেন, তোমার গর্ভে পুত্র সন্তান রয়েছে। ভূমিষ্ট হলে তাকে নিয়ে আমার কাছে এস। জন্মগ্রহণ করলে আমি নবজাতককে নিয়ে তাঁর পবিত্র খেদমতে হাযির হলাম। তিনি সেই পুত্রের ডান কানে আযান এবং বাম কানে ইকামত দিলেন। নিজের লালা মোবারক নবজাতককে মুখে দিলেন এবং নাম রাখলেন আব্দুল্লাহ। অতঃপর বললেন, খলীফাগণের পিতাকে নিয়ে যাও। আমি সমস্ত ঘটনা হযরত আব্বাসের নিকট বর্ণনা করলাম। তিনি নবী (সা.)-এর দরবারে এসে কারণ জিজ্ঞেস করলেন, হযরত নবী করীম (সা.) বললেন, আমি সত্যই বলেছি। সে খলীফাগণের পিতা। তার বংশ থেকে সাফফাহ এবং মাহদীর আবির্ভাব ঘটবে। হযরত ঈসা বিন মারইয়াম (আ.)- এর সাথে যিনি নামায আদায় করবেন।
দায়লিমা মুসনাদুল ফেরদৌস গ্রন্থে আয়েশা সিদ্দীকা (রা.)-এর একখানা মারফু হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, অচিরেই বনু আব্বাসিয়ার হাতে পতাকা আসবে। যতক্ষণ তারা সত্যের চর্চা করবে তাদের হাত থেকে পতাকা যাবে না। দারে কুতনী ইফরাদ গ্রন্থে ইবনে আব্বাসের বর্ণনা সনদসহ লিপিবদ্ধ করেছেন। নবী করীম (সা.) হযরত আব্বাস (রা.)-কে বললেন, যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার সম্প্রদায় ইরাকে থাকবে, কালো কাপড় পরবে এবং খোরাসানবাসী তাদের সাহায্য করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের কাছেই ক্ষমতা থাকবে। এমতাবস্থায় ঈসা (আ.)-কে তাদের প্রদান করা হবে। এ হাদীস দুর্বল। তবে ইবনে জাওযী মাওযুআতের মধ্যে তা বর্ণনা করেছেন।
তাবারানী কাবীরে উম্মে সালমা (রা.)-এর মারফু হাদীস লিপিবদ্ধ করেছেন। নবী আকরাম (সা.) বলেন, আমার চাচার ছেলে এবং আমার বাবার পিতামহদের সন্তানদের মধ্যেই খিলাফত থাকবে।
আকেলী কিতাবুয যুআফায় সনদসহ আবু বকর (রা.)-এর মারফু হাদীস বর্ণনা করেছেন। বনূ উমাইয়ার এক দিনের পরিবর্তে বনূ আব্বাস দু'দিন এবং এক মাসের পরিবর্তে দু'মাস রাজত্ব করবে।
ইবনে জাওযী মাওযুআতে এ হাদীসখানা বর্ণনা করেন। কারণ এ হাদীসের বর্ণনাকারীদের মধ্যে যে খারাপ, তাকে মুহতাম বলা হয়। বস্তুত খারাপ লোক মিথ্যা অথবা বর্ণিত হাদীসে মুহতাম নাও হতে পারে। ইবনে আদী এই বর্ণনাকারীকে দুর্বলদের মধ্যে গণ্য করেছেন। কিন্তু তিনি এও বলেছেন, এতে কোনো ক্ষতি নেই এবং হাদীসের অর্থ যুক্তিগ্রাহ্য নয়। কেননা বনু আব্বাসিয়ার যুগে শুধু স্পেন ছাড়া পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত তাদের রাজত্ব ছিল। তাদের শাসনামল ১৩০ হিজরী থেকে ২৯০ হিজরী। এরই মধ্যে মুকতাদার খিলাফতের তখতে আরোহন করেন। তাঁর প্রশাসনিক পদ্ধতিতে ভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে, পাশ্চাত্যের ভূখণ্ডগুলো হাতছাড়া হয়ে যায় এবং তারপর মুসলিম সাম্রাজ্যে দারুণ অরাজকতা, আত্মকলহ এবং মতানৈক্য দেখা দেয়, যার বিবরণ সামনে পেশ করা হবে। এ হিসাব মোতাবেক বন্ আব্বাসিয়ার শাসনামল ছিল ১৬০ বছর। আর বনু উমাইয়ার ২০ বছর। তন্মধ্যে ইবনে যুবায়েরের খিলাফতকাল নয় বছর বাদ দিলে তিরাশি বছর হলো। উমাইয়াদের যুগ, যা আব্বাসীয়দের শাসনকালের অর্ধেক সময়।
যুবায়ের বিন বাকার মুআফিকাত গ্রন্থে ইবনে আব্বাস (রা.)-এর রেওয়ায়েত নকল করেছেন। ইবনে আব্বাস (রা.) মুআবিয়া (রা.)-কে বললেন, আপনারা যদি একদিন রাষ্ট্র চালান, তবে আমরা দু'দিন, আপনারা এক মাস চালালে আমরা দু'মাস, আপনারা এক বছর চালালে আমরা দু'বছর রাষ্ট্র চালাব।
যুবায়ের মুআফিকাতে লিখেছেন, ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, কালো পতাকা আমাদের পাশ্চাত্য থেকে শুরু হবে। তারীখে দামেশক গ্রন্থে ইবনে আসাকির লিখেছেন, রসূলুল্লাহ (সা.) তিনবার হযরত আব্বাসের জন্য এ দা'আ করেছেন, হে আল্লাহ! আব্বাস এবং তাঁর সন্তানদের সাহায্য করো। অতঃপর হযরত আব্বাসকে সম্বোধন করে বলেন, চাচা! আপনি জানেন না, আপনার বংশধরদের মধ্যে মাহদী মুওয়াফ্ফাক অত্যন্ত ভালো মানুষ হবেন।
ইবনে সাদ তবকাত গ্রন্থে ইবনে আব্বাসের রেওয়ায়েত লিখেছেন, একদিন হযরত আব্বাস আব্দুল মোত্তালিবের বংশধরকে একত্রিত করেন। তিনি আলী (রা.)-কে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। এজন্য তিনি তাকে বলেন, আমি তোমার সাথে একটি পরামর্শ করতে চাই, তবে প্রথমে তোমার পরামর্শ ছাড়া চূড়ান্ত ফয়সালা নিতে চাই না। তুমি নবী আকরাম (সা.)-এর খেদমতে গিয়ে আরয করো, যদি খিলাফত আমাদের জন্য না হয়, তবে আমরা আজ থেকেই তাকে কোনো পাত্তা দিব না। হযরত আলী (রা.) বললেন, হে চাচা! নিশ্চয় খিলাফত আপনার জন্যই, কারো শক্তি নেই আপনার থেকে তা কেড়ে নিবে।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
দাইলামী মুসনাদুল ফেরদৌস গ্রন্থে লিখেছেন, রসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ তা'আলা বাদশাহীর জন্য যে জাতিকে সৃষ্টি করেছেন তিনি সে জাতির কপালে হস্ত সঞ্চালন করে দিয়েছেন। এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী মাইসারা তিনি পরিত্যক্ত। দাইলামী এই হাদীসটি তিন পদ্ধতিতে বর্ণনা করেছেন। হাকেম মুসতাদরাকে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
📄 রাসূলে আকরাম (সা.)-এর চাদর যা সর্বশেষ খলীফা পর্যন্ত হস্তান্তরিত হয়েছে
সলফী ত্বওরিয়াতে লিখেছেন, কা'ব বিন যুবাইর (রা.) স্বরচিত কবিতা রসূলুল্লাহ (সা.)-এর শানে আবৃত্তি করলে তিনি পরনের চাদরখানা কা'বের প্রতি এ মর্মে পত্র লিখেন যে, রসূলুল্লাহ (সা.)-এর চাদরটি দশ হাজার দিরহামের বিনিময়ে আমাকে দিয়ে দাও। কিন্তু তিনি তা দেননি। কা'বের মৃত্যুর পর হযরত মুআবিয়া তাঁর সন্তানদের কাছ থেকে বিশ হাজার দিরহামে চাদরটি কিনে নেন। অতঃপর সে চাদরটি বনু আব্বাসিয়ার খলীফাদের নিকট হস্তান্তরিত হয়।
সলফী ছাড়াও অন্য লোকেরা এমনই বলেছে।
যাহাবী স্বরচিত ইতিহাস গ্রন্থে এও লিখেছেন, খলীফাদের চাদরটি হযরত মুআবিয়ার খরিদকৃত চাদর নয়; বরং সেটি ঐ চাদর যা রসূলূল্লাহ (সা.) তাবুক যুদ্ধে শান্তির প্রতীকস্বরূপ নিজের পত্রসহ আয়লাবাসীর প্রতি প্রেরণ করেন। অতঃপর সাফফাহ তিন'শ দিনারে চাদরখানা কিনে নেন। আমার মতে, হযরত মুআবিয়া যে চাদর ক্রয় করেছিলেন তা আব্বাসীয় যুগে চুরি হয়ে যায়। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.) যুহৃদ গ্রন্থে লিখেছেন, রসূলুল্লাহ (সা.) যে চাদর পরে প্রতিনিধি দলের সাথে সাক্ষাত করতেন তা মোতি-মুক্তা খচিত ছিল। চার হাত লম্বা, দু'হাত প্রস্থ এ চাদরটি খলীফাদের নিকট ক্রমান্বয়ে হস্তান্তরিত হয়। চাদরটি অত্যধিক পুরাতন হওয়ায় তা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হতো। খলীফাগণ দুই ঈদে চাদরটি পরতেন। উত্তরাধিকার সূত্রে চাদরটি এক খলীফা থেকে অপর খলীফার হাতে চলে যেতো। বড় বড় অনুষ্ঠানে তাঁরা চাদরখানা বরকতের জন্য পরতেন।
কথিত আছে, যখন মুকতাদার ফিত্নায় আক্রান্ত হয়ে নিহত হন তখন এ চাদরটি তিনি পরে ছিলেন। তাঁর রক্তে চাদরটি অপবিত্র হয় এবং সেখানেই তা নষ্ট হয়ে যায়।
কতিপয় ফাওয়ায়েদ: বর্ণিত আছে যে, আব্বাসীয় বংশের খলীফাগণের মধ্যে একজন শুরু করেছেন, একজন মধ্যবর্তীতে রয়েছেন এবং একজন শেষ করেছেন। মনসুর প্রবর্তনকারী, মামুন মধ্যবর্তীতে অবস্থানকারী এবং মুতাদার সর্বকনিষ্ঠ। আব্বাসীয় বংশের খলীফাদের মধ্যে সাফ্ফাহ, মাহদী এবং আমীন ছাড়া বাকী সকলেই দাসীর গর্ভজাত সন্তান। হযরত আলী বিন আবু তালিব, হাসান বিন আলী বিন আবু তালিব এবং আমীন বিন রশীদ ছাড়া হাশেমী বংশীয় খলীফা হাশেমী মায়ের গর্ভজাত নন। এ রেওয়ায়েতটি সুলী বর্ণনা করেছেন।
যাহাবী বলেন, হযরত আলী বিন আবু তালিব এবং আলী আল মুকতাফী ছাড়া কোন খলীফার নাম আলী ছিল না। আমি বলছি, অধিকাংশ খলীফার নাম একক, নকল অনেক কম। আব্দুল্লাহ, আহমদ, মুহাম্মদ এই নামগুলো অনেকের ছিল।
বাগদাদের সর্বশেষ খলীফা মুতাসিম পর্যন্ত সকলেই পৃথক উপাধি ধারণ করেছিলেন। মিসরে খলীফাগণ পূর্বের খলীফাদের উপাধি অনুসরণ করে নিজেদের উপাধি ধারণ করেন। যেমন- মুসতানসির, মুসতাকফী, ওয়াছেক, হাকেম, মুতাদাত, মুতাওয়াক্কিল, মুসতাসিম, মুসতাইন, কায়িম, মুসতানজিদ। এর মধ্যে থেকে মুসতাকফী এবং মুসতানসির তিনজনের উপাধি ছিল। বাকীগুলো দু'জনের। বনু আব্বাসিয়ার খলীফাগণের মধ্যে কেউ বনু উবাইদীর খলীফাদের উপাধি গ্রহণ করেননি। কায়িম, হাকেম, তাহের এবং মুসতানসির ব্যতীত। মাহদী এবং মনসুর আগে থেকেই উবাইদীদের উপাধি ছিল। বনু আব্বাসিয়ার মধ্যেও সে উপাধি ছিল।
কেউ কেউ বলেন, কাহের উপাধি ধারণকৃত খলীফা বা বাদশাহ সফলকাম হতে পারেন না। আমার মতে মুসতাকফী এবং মুসতাইন উপাধি ধারণকারীর একই অবস্থা। দেখুন আব্বাসীয়দের মধ্যে দু'জন খলীফার উপাধি ছিল অনুরূপ। তাঁদের পতন হয়েছে। তবে মুতাযদ অত্যন্ত সুন্দর উপাধি।
ভাতিজার স্থানে মুকতাদা এবং মুসতানসির ছাড়া আর কেউ বসেননি। মুকতাদা রাশেদের পর এবং মুসতানসির মুতাসিমের পর খলীফা হন। (যাহাবী) একই পিতার তিন পুত্র আমীন, মামুন, মুতাসিম ছাড়া হারুন রশীদের বংশে মুসতানসির, মুতায ছাড়া, মুতাওয়াক্কিলের বংশে রাযী, মুকতাদা এবং মতী ছাড়া মুকতাদার বংশে কেউ খিলাফতের তখতে বসেনি।
আব্দুল মালিকের চার সন্তান খিলাফতের তখতে বসেছেন, যার দৃষ্টান্ত খলীফাদের মধ্যে নেই। তবে এ দৃষ্টান্ত রাজা-বাদশাহদের মধ্যে বিদ্যমান। আমি বলেছি এ দৃষ্টান্ত খলীফাদের মধ্যে নেই মুতাওয়াক্কিলের পাঁচ সন্তান ছিল। মুসতাইন, মুতাযদ, মুসতাকফী, কায়িম এবং মুসতানজিদ। পিতা জীবিত থাকা অবস্থায় হযরত আবু বকর (রা.) এবং বকর আল-তায়ী' বিন মতী' ছাড়া কেউ খলীফা হননি। আবু বকর আল-তায়ী'র পিতার প্যারালাইসিস হওয়ায় তিনি ছেলেকে খলীফা মনোনীত করেন।
ওলামায়ে কেরাম বলেন, যিনি পিতার জীবদ্দশায় খিলাফতের কর্ণধার হয়েছেন তিনি আবু বকর (রা.)। তিনি যুবরাজ নির্ধারিত করেছিলেন, সর্বপ্রথশ বাইতুলমাল গঠন করেন এবং কুরআন শরীফকে গ্রন্থকার রূপ দেন।
যিনি সর্বপ্রথম আমিরুল মোমেনিন বলেছেন, চাবুক মারার প্রথা প্রবর্তন করেছেন, হিজরী সনের সূচনা করেছেন, ইতিহাস অধ্যয়নের নির্দেশ দিয়েছেন এবং বিচারালয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি হলেন হযরত উমর ফারুক (রা.)।
হযরত উসমান গনী (রা.) সর্বপ্রথম চারণভূমি নির্ধারণ করেন, জায়গীর দেন, জুমআর প্রথম আযান এবং মুআযয্যিনদের ভাতা নির্ধারণ করেন, খুৎবায় কম্পন সৃষ্টি না করা এবং পুলিশ নিয়োগ দেন।
যিনি সর্বপ্রথশ নিজের জীবদ্দশায় স্বীয় পুত্রকে যুবরাজ হিসেবে ঘোষণা দেন এবং নিজ সেবার জন্য লোক নিয়োগ করেন হযরত মুআবিয়া (রা.)।
যাঁর দরবারে সর্বপ্রথম শত্রুর কর্তিত মস্তক এসেছিল তিনি হযরত যুবায়ের (রা.)। সর্বপ্রথম মুদ্রায় নিজের নাম অঙ্কন করেন আব্দুল মাীলক বিন মারওয়ান। সর্বপ্রথম নিজের নাম ঘোষণা করতে নিষেধ করেছিলেন ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিক। বনু আব্বাসিয়ার খলীফাগণ সর্বপ্রথম নতুন নতুন উপাধি আবিষ্কার করেন।
ইবনে ফাজলুল্লাহ বলেন, কেউ কেউ বলেছেন, বনূ আব্বাসিয়ার মত বন্ উমাইয়াও উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। আমার মতে কতিপয় ঐতিহাসিক লিখেছেন, মুআবিয়া (রা.) আন-নাসিরুদ্দীনিল্লাহ, ইয়াযিন আল-মুসতানসিরি, মুআবিয়া বিন ইয়াযিদ আর-রাজে ইলাল হাক, মারওয়ার আল-মুতামিন বিল্লাহ, আব্দুল মালিক আল-মুওয়াফিক আমরিল্লাহ, তার ছেলে ওয়ালিদ আল-মুনতাকসিম বিল্লাহ, উমর বিন আব্দুল আযীয আল-মাসুম বিল্লাহ, ইয়াযিদ বিন আব্দুল মালিক আল-কাদির বি সুনাআল্লাহ এবং ইয়াযিদ নাকেস আল শাকির বিন আন'আমিল্লাহ উপাধি গ্রহণ করেন।
যার প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিভিন্ন কথা হয়েছিল তিনি সাফফাহ। যিনি সর্বপ্রথম জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ডেকে তাদের কথা মত কাজ করতেন এবং নিজের গোলামদের বিচারক পদে অধিষ্ঠিত করেন এবং আরবদের চেয়ে তাদের প্রাধান্য দিতেন তিনি মানসুর। মাহদী সর্বপ্রথম ভিন্ন মতাবলম্বীদের মতবাদ খণ্ডনের জন্য গ্রন্থ রচনা করান।
যিনি সর্বপ্রথম লাগামের মধ্যে অসি, বল্লম প্রভৃতি নিয়ে সৈন্য পরিচালনা করেন তিনি হাদী। যিনি সর্বপ্রথম হকি খেলেছেন তিনি হারুন-অর রশীদ। যে খলীফাকে সর্বপ্রথম উপাধিসহ ডাকা হয় এবং যিনি সর্বপ্রথম উপাধিসহ নিজের নাম লিখেছেন তিনি আমীন। মুতাওয়াক্কিল সর্বপ্রথম অমুসলমান বন্দীদের পোশাক নির্দিষ্ট করেন। মুতাওয়াক্কিলকে সর্বপ্রথম তুর্কীরা শহীদ করে দেয়। এ ঘটনা নবী আকরাম (সা.)- এর একখানা হাদীসের সমর্থক, যা তাবারানী ইবনে মাসউদ থেকে নকল করে বর্ণনা করেছেন। নবী আকরাম (সা.) বলেছেন, তুর্কীরা যতক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের অবকাশ দিবে তার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তোমরা তাদরে অবকাশ দিবে। কারণ সর্বপ্রথম তারাই আমার উম্মতের বাদশাহী এবং খোদার নিয়ামত কেড়ে নিবে।
যিনি সর্বপ্রথম জরির পাড়যুক্ত পোশাক এবং ছোট টুপি ব্যবহার করেছেন তিনি মুসতাইন। মুতায সর্বপ্রথম ঘোড়াকে স্বর্ণের অলংকারাদি পরান। যার উপর সর্বপ্রথম অত্যাচার এবং প্রতিশোধ গ্রহণ করা হয় তিনি মুতামাদ। তাঁর সকল খরচ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল এবং তাঁকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়।
যিনি সর্বপ্রথম বিচলিত অবস্থায় খলীফা মনোনীত করেছিলেন, তিনি মুকতাদার।
রাযী হলেন- শেষ খলীফা যাঁকে অর্থ এবং সৈন্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। তিনি কবিতা আকারে খুৎবা দিতেন। সর্বদা নামাযের ইমামতি করেন, সভাষদের নিজের সামনে বসিয়ে পরামর্শ করেন, খোলাফায়ে রাশেদীনদের চালচলন মেনে চলতেন। মুসতানসির সর্বপ্রথম ব্যবহৃত উপাধি গ্রহণ করেন, যিনি মুসতানসিনের পর খলীফা হন।
আওয়ায়েল আসকারী গ্রন্থে রয়েছে, যিনি সর্বপ্রথম মায়ের জীবদ্দশায় খলীফা তিনি হলেন হযরত উসমান গনী (রা.)। অতঃপর হাদী, রশীদ, আমীন, মুতাওয়াক্কিল, মুসতানসির, মুসতাইন, মুতায, মুতাযদ এবং মতী'। আবু বকর (রা.) এবং আল তায়ী ব্যতীত কেউ পিতার জীবদ্দশায় খিলাফতের তখতে আরোহন করেননি।
সুলী বলেন, আব্দুল মালিকের দুই পুত্র ওয়ালিদ এবং সুলাইমানের জননী ইয়াযিদ নাকেয এবং ইব্রাহীমের জননী শাহীন এবং হাদী এবং রশীদের জননী খিযরান ব্যতীত কোন নারী দু'জন খলীফা প্রসব করেন নি। তবে আমার মতে এক্ষেত্রে আব্বাস ও হামযার জননী এবং দাউদ এবং সুলাইমানের জননীকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। দাউদ এবং সুলাইমান মুতাওয়াক্কিলের শেষ দু'সন্তান।
ফায়দা-১: বনূ উবাইদের চৌদ্দজন খলীফা উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা হলেন মাহদী, কায়িম, মনসুর, মুআয, আযীয, হাকিম, তাহের, মুসতানসির, মুসতালা, আমর, হাফিয, জাফর, কায়েম, আসেদ মিসর। তাঁদের বাদশাহীর সূচনা ২৯০ হিজরীতে এবং পতন ৫৬৭ হিজরীতে।
ফায়দা-২: যাহাবী বলেন, তাদের রাজত্ব অগ্নি উপাসক এবং ইহুদীদের রাজত্বের অনুরূপ ছিল। সুতরাং তাদের রাজত্বকে খিলাফত বলা যেতে পারে না।
ফায়দা-৩: পাশ্চাত্যে বনূ উমাইয়ার মধ্য থেকে যাঁরা খিলাফত প্রাপ্ত হয়েছিলেন তাঁরা উবাইদীদের তুলনায় শরীয়ত, সুন্নত, ইনসাফ, দয়া, জ্ঞান, জিহাদ প্রভৃতি থেকে উত্তম। তাঁরা সংখ্যায় বেশি ছিল এবং স্পেনে একই সময়ে পাঁচজন খলীফা দাবী করেন।
অনেক প্রবীণ ওলামায়ে কেরাম খলীফাদের ইতিহাস লিখেছেন। তাঁদের মধ্য থেকে লাফজুয়া নাহবী দু'খন্ডে একখানা ইতিহাস গ্রন্থ রচনা করেছেন। এতে তিনি কাহেরের যুগ পর্যন্ত লিপিবদ্ধ করেছেন। সুলী শুধু বনু আব্বাসিয়ার ইতিহাস সম্বলিত একখানা ইতিহাস প্রণয়ন করেছেন। এটি আমি দেখেছি। তিনিও কাহেরের যুগ পর্যন্ত লিখেছেন। ইবনে জাওযী শুধু আব্বাসীয়দের ইতিহাস লিখেছেন। এতে নাসিরের যুগের ঘটনাবলী স্থান পেয়েছে। এ বইটিও আমি অধ্যায়ন করেছি। আবুল ফজল আহমদ বিন আবু তাহের আল মুরুযী ২৮০ হিজ রীতে ইন্তেকাল করেন। তিনি বড় মাপের কবি এবং সুলেখক ছিলেন। তিনিও আব্বাসীয়দের ইতিহাসনির্ভর একটি গ্রন্থ লিখেছেন। এতে বনূ আব্বাসিয়ার আমীর আবূ হারুন বিন মুহাম্মদ আল আব্বাসীয়ার যুগ পর্যন্ত উল্লেখ রয়েছে।
ফায়দা-৪ঃ খতীব লিখেছেন, হযরত উসমান বিন আফফান (রা.) এবং মামুন ছাড়া কোন খলীফা কুরআনের হাফেজ ছিলেন না। আমার মতে এটি ভুল; বরং বিশুদ্ধ অভিমত হলো আবু বকর সিদ্দীক (রা.)ও কুরআনের হাফেজ ছিলেন। একদল ঐতিহাসিক এ অভিমতের সমর্থক। নববী তাহযীব গ্রন্থে লিখেছেন, আলী (রা.) নবী আকরাম (সা.)-এর মৃত্যুর পর কুরআন হিফজ করেছেন।
ফায়দা-৫: ইবনুস সায়ী বলেন, খলীফা তাহেরের বাইআত গ্রহণের সময় আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। তাহের সাদা কাপড় পরে ছাতার নীচে উপবেসন করেছিলেন। তিনি নিজের চাদর পরে ছিলেন এবং নবী (সা.)-এর চাদরখানা কাঁধের উপর রেখেছিলেন। মন্ত্রী পরিষদ মিম্বরে এবং সেনাপতিগণ সিঁড়ির উপর দাঁড়িয়ে ছিলেন। লোকদের থেকে একথা বলে তিনি বাইআত গ্রহণ করাচ্ছিলেন- আমি আপনাদের নেতা ও ইমাম, যার অনুসরণ ও আনুগত্য করা পৃথিবীর সকলের জন্য ফরয। তাঁর পবিত্র নাম শরীফ, সুন্নতে রসূল এবং আমিরুল মোমিনীনের ইজ তিহাদের জন্য বাইত করছি। তিনি ছাড়া আর কোন খলীফা নাই।