📘 তারাবীহ ও ইতিকাফ > 📄 রাতের ছালাতের সময়

📄 রাতের ছালাতের সময়


আর যখন ইমামতি করবে তখন ঐ পরিমাণ কিরাআত দীর্ঘ করবে, যা মুক্তাদীদের জন্য কষ্টকর হবে না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,
إِذَا قَامَ أَحَدُكُمْ لِلنَّاسِ فَلْيُخَفِّفَ الصَّلَاةَ، فَإِنَّ فِيهِمُ [الصَّغِيْرَ وَالْكَبِيرَ وَفِيهِمُ الضَّعِيفَ، وَالْمَرِيضَ] ، [وَذَا الْحَاجَةِ ، وَإِذَا قَامَ وَحْدَهُ فَلْيُطِلْ صَلَاتَهُ مَا شَاءَ.
'তোমাদের কেউ যখন ছালাতে ইমামতি করবে, তখন সে যেন ছালাতকে হালকা করে পড়ে। কেননা তাদের (মুছল্লীদের) মধ্যে [ছোট], বয়োবৃদ্ধ, দুর্বল, [রোগী] ও [ব্যস্ত লোক] রয়েছে। আর যখন সে একাকী ছালাত আদায় করবে, তখন সে যেন তার ইচ্ছানুযায়ী ছালাতকে দীর্ঘ করে'।
এশার ছালাতের পর থেকে ফজর পর্যন্ত রাতের ছালাতের সময়। এ মর্মে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, إِنَّ اللَّهَ زَادَكُمْ صَلَاةً، وَهِيَ الْوِثْرُ، فَصَلُّوْهَا فِيْمَا بَيْنَ صَلَاةِ الْعِشَاءِ إِلَى صَلَاةِ الْفَجْرِ 'আল্লাহ তা'আলা তোমাদের জন্য একটি ছালাতকে বৃদ্ধি করেছেন। তা হল বিতর। অতএব তোমরা এশা ও ফজর ছালাতের মধ্যবর্তী সময়ে উহা আদায় করো'।
তবে সম্ভব হলে শেষ রাতে রাত্রির ছালাত আদায় করা উত্তম। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, مَنْ خَافَ أَنْ لَا يَقُوْمَ مِنْ آخِرِ اللَّيْلِ فَلْيُؤْتِرْ أَوَّلَهُ، وَمَنْ طَمِعَ أَنْ يَقُوْمَ آخِرَهُ فَلْيُؤْتِرْ آخِرَ اللَّيْلِ، فَإِنَّ صَلَاةَ آخِرِ اللَّيْلِ مَشْهُودَةٌ، وَذَلِكَ أَفْضَلُ. 'শেষ রাতে (ঘুম থেকে) জাগতে না পারার কেউ আশংকা করলে সে যেন রাতের প্রথম অংশেই বিতর পড়ে নেয়। আর যে শেষ রাতে জাগতে আগ্রহী, সে যেন শেষ রাত্রিতেই বিতর পড়ে। কেননা শেষ রাত্রির ছালাতে ফেরেশতাগণ উপস্থিত হন। আর এটাই সর্বোত্তম'।
প্রথম রাতে জামা'আতের সাথে এবং শেষ রাতে একাকী আদায়ের মাঝখানে যখন রাতের ছালাত আবর্তিত হবে, তখন তা জামা'আতে আদায় করাই হবে সর্বোত্তম। কারণ জামা'আতে রাতের ছালাত আদায়কারীর জন্য একটি পূর্ণ রাত ছালাত আদায় করা হিসেবে গণ্য করা হয় (অর্থাৎ পুরা রাত ছালাত আদায়ের নেকী লিপিবদ্ধ করা হয়)। যেমনটি পূর্বে মারফু সূত্রে নবী (ছাঃ) থেকে উদ্ধৃত হয়েছে।
এর ওপর ভিত্তি করেই উমার (রাঃ)-এর যুগে ছাহাবীদের আমল জারী ছিল। আব্দুর রহমান বিন আব্দুল কারী বলেন,
خَرَجْتُ مَعَ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ لَيْلَةً فِي رَمَضَانَ إِلَى الْمَسْجِدِ، فَإِذَا النَّاسُ أَوْزَاعٌ مُتَفَرِّقُوْنَ، يُصَلِّي الرَّجُلُ لِنَفْسِهِ، وَيُصَلِّي الرَّجُلُ فَيُصَلِّي بِصَلَاتِهِ الرَّهْطُ، فَقَالَ عُمَرُ : وَاللَّهِ إِنِّي لَأَرَى لَوْ جَمَعْتُ هَؤُلَاءِ عَلَى قَارِئٍ واحد لَكَانَ أَمْثَلَ ثُمَّ عَزَمَ ، فَجَمَعَهُمْ عَلَى أُبَى بْن كَعْبٍ، قَالَ: ثُمَّ خَرَجْتُ مَعَهُ لَيْلَةً أُخْرَى، وَالنَّاسُ يُصَلُّوْنَ بِصَلَاةِ قَارِئِهِمْ، فَقَالَ عُمَرُ : نِعْمَتِ الْبِدْعَةُ هَذِهِ، وَالَّتِي يَنَامُوْنَ عَنْهَا أَفْضَلُ مِنَ الَّتِي يَقُوْمُوْنَ يُرِيدُ آخِرَ اللَّيْلِ وَكَانَ النَّاسُ يَقُوْمُوْنَ أَوَّلَهُ -
'আমি রামাযানের এক রাতে উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-এর সাথে মসজিদে নববীর দিকে বের হলাম। তখন লোকেরা খণ্ড খণ্ড জামা'আতে বিভক্ত ছিল। কেউ একাকী ছালাত আদায় করছিল আর কারো পিছনে একদল লোক ছালাত আদায় করছিল। উমার (রাঃ) বললেন, আল্লাহ্র কসম, ভাবছি এই লোকদেরকে আমি যদি একজন ইমামের পিছনে একত্রিত করতে পারি, তবে সেটা উত্তম হবে। অতঃপর তিনি এ ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে তাদেরকে উবাই বিন কা'ব (রাঃ)-এর পিছনে একত্রিত করলেন। বর্ণনাকারী বলেন, পরে আর এক রাত্রে আমি তাঁর (উমার) সাথে বের হলাম। তখন লোকজন তাদের ইমামের সাথে (জামা'আতে) ছালাত আদায় করছিল। (এ দৃশ্য দেখে) উমার (রাঃ) বললেন, কতই না সুন্দর এই নতুন ব্যবস্থা! তারা রাতের যে অংশে ঘুমিয়ে থাকে তা রাতের ঐ অংশ অপেক্ষা উত্তম, যে অংশে তারা ছালাত আদায় করে। এর দ্বারা তিনি শেষ রাত বুঝিয়েছেন। কেননা তখন লোকজন রাতের প্রথমভাগে (তারাবীহ) ছালাত আদায় করত'।
যায়েদ বিন ওয়াহাব বলেন, ،كَانَ عَبْدُ اللَّهِ يُصَلِّي بِنَا فِي شَهْرِ رَمَضَانَ فَيَنْصَرِفُ بَلَيْلِ 'আব্দুল্লাহ রামাযান মাসে আমাদেরকে নিয়ে জামা'আতে ছালাত আদায় করতেন, অতঃপর রাতে বাড়ি ফিরতেন'।

টিকাঃ
২৭. বুখারী, হা/৭০৩, 'আযান' অধ্যায়-১০, অনুচ্ছেদ-৬২; মুসলিম, হা/৪৬৭, 'ছালাত' অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৩৭; আবূদাঊদ, হা/৭৯৫-৯৬, 'ছালাত' অধ্যায়-২, 'ছালাত হালকা করা' অনুচ্ছেদ- ১২৮। হাদীছের শব্দ ও অতিরিক্ত অংশগুলো মুসলিমের। দ্রঃ ইরওয়াউল গালীল, হা/৫১২।
২৮. সমগ্র রাত্রির ছালাতকে বিতর বলা হয়। কারণ উহার রাক'আত সংখ্যা বেজোড়।
২৯. আহমাদ, হা/২৩৯০২, তাবারানী, হা/২১৬৭; তাহাবী, হা/৩৮৫৩, আবূ বাছরা )بصرة( থেকে। দ্রঃ সিলসিলা ছহীহা, হা/১০৮; ইরওয়াউল গালীল ২/১৫৮।
৩০. মুসলিম, হা/৭৫৫, 'মুসাফিরদের ছালাত' অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-২১; ইবনু মাজাহ, হা/১১৮৭, 'ছালাত প্রতিষ্ঠা করা' অধ্যায়-৫, অনুচ্ছেদ-১২১; সিলসিলা ছহীহা, হা/২৬১০।
৩১. বুখারী, হা/২০১০, 'তারাবীহ্ ছালাত' অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১; মুওয়াত্তা ইমাম মালেক, হা/৩৭৮, 'তারাবীহ্ বর্ণনা' অনুচ্ছেদ।
৩২. মুছান্নাফ আব্দুর রায্যাক, হা/৭৭৪১, 'ছিয়াম' অধ্যায়, 'কিয়ামে রামাযান' অনুচ্ছেদ, সনদ ছহীহ। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলকে যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল, -يُؤَخَّرُ الْقِيَامُ - يَعْنِي التَّرَاوِيحَ إِلَى آخِرِ اللَّيْلِ؟ 'তারাবীহ্ ছালাতকে কি শেষ রাত্রি পর্যন্ত বিলম্বিত করা যাবে'? তখন তিনি এটি ও তার পূর্ববর্তী আছারের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, لَا، سُنَّةُ الْمُسْلِمِينَ أَحَبُّ إِلَيَّ 'না। মুসলমানদের সুন্নাতই (প্রথম রাতে তারাবীহ পড়া) আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়' (ইমাম আবূ দাঊদ, মাসায়িল, পৃঃ ৬২)।

📘 তারাবীহ ও ইতিকাফ > 📄 রাতের ছালাত আদায়ের পদ্ধতি সমূহ

📄 রাতের ছালাত আদায়ের পদ্ধতি সমূহ


এ ব্যাপারে আমি 'ছালাতুত তারাবীহ' (পৃঃ ১০۱-১১৫) গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। পাঠকের জন্য সহজকরণার্থে ও তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য আমি এখানে উহার সার-সংক্ষেপ উল্লেখ করছি :

প্রথম পদ্ধতি : ১৩ রাক'আত। হালকাভাবে দু'রাক'আত পড়ে এর সূচনা করবে। সর্বাগ্রগণ্য মত অনুযায়ী এ দুই রাক'আত হল এশার ফরয ছালাত পরবর্তী দুই রাক'আত সুন্নাত অথবা ঐ নির্দিষ্ট দু'রাক'আত ছালাত, যার মাধ্যমে রাসূল (ছাঃ) রাতের ছালাত শুরু করতেন। যেমনটি গত হয়েছে। অতঃপর অত্যন্ত দীর্ঘ দু'রাক'আত আদায় করবে। অতঃপর এর চেয়ে কম দীর্ঘ দু'রাক'আত পড়বে। অতঃপর পূর্বের চেয়ে কম দীর্ঘ দু'রাক'আত পড়বে। অতঃপর তদপেক্ষা কম দীর্ঘ দু'রাক'আত পড়বে। অতঃপর এর চেয়ে কম দীর্ঘ দু'রাক'আত পড়বে। অতঃপর এক রাক'আত বিতর পড়বে।

দ্বিতীয় পদ্ধতি : ১৩ রাক'আত পড়বে। তন্মধ্যে দুই দুই করে আট রাক'আত পড়বে এবং প্রত্যেক দুই রাক'আত পর সালাম ফিরাবে। অতঃপর পাঁচ রাক'আত বিতর পড়বে। শুধুমাত্র পঞ্চম রাক'আতে বসবে এবং সালাম ফিরাবে।

তৃতীয় পদ্ধতি : ১১ রাক'আত। প্রত্যেক দুই রাক'আতের মাঝখানে সালাম ফিরাবে এবং এক রাক'আত বিতর পড়বে।

চতুর্থ পদ্ধতি : ১১ রাক'আত। এর মধ্যে প্রথম চার রাক'আত এক সালামে অতঃপর পরের চার রাক'আত আরেক সালামে পড়বে। অতঃপর তিন রাক'আত বিতর পড়বে।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এই চার ও তিন রাক'আতের দুই রাক'আতের মাঝখানে কি বসতেন? এ ব্যাপারে আমরা কোন সন্তোষজনক জবাব পাই না। তবে তিন রাক'আত বিতর ছালাতে দুই রাক'আত পর বসা শরী'আতসম্মত নয়।

পঞ্চম পদ্ধতি : ১১ রাক'আত পড়বে। এর মধ্যে একটানা আট রাক'আত আদায় করে ৮ম রাক'আতে বসবে এবং তাশাহ্হুদ ও নবী (ছাঃ)-এর দরূদ পড়ে সালাম না ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে যাবে। অতঃপর এক রাক'আত বিতর পড়ে সালাম ফিরাবে। এই হল নয় রাক'আত। অতঃপর বসে দুই রাক'আত আদদায় করবে।

ষষ্ঠ পদ্ধতি : ৯ রাক'আত পড়বে। তন্মধ্যে ছয় রাক'আত একটানা পড়ে ষষ্ঠ রাক'আতে বসবে অতঃপর তাশাহ্হুদ ও নবী (ছাঃ)-এর উপর দরূদ পড়ে পূর্বের মতো সালাম না ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে যাবে। অতঃপর এক রাক'আত বিতর পড়ে সালাম ফিরাবে। এই হল সাত রাক'আত। অতঃপর বসে দুই রাক'আত পড়বে।

এই পদ্ধতিগুলো রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে সুস্পষ্ট নছ বা দলীলের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। উক্ত পদ্ধতিগুলোর উপর আরো অন্যান্য প্রকার এভাবে বৃদ্ধি করা যেতে পারে যে, প্রত্যেক প্রকার থেকে ইচ্ছামতো রাক'আত সংখ্যা কমিয়ে এক রাক'আত বিতরে সীমাবদ্ধ করবে। রাসূল (ছাঃ)-এর নিম্নোক্ত বাণীর প্রতি আমল করণার্থে। তিনি বলেন, 'যে চায় সে পাঁচ রাক'আত বিতর পড়ুক, যে চায় সে তিন রাক'আত বিতর পড়ুক এবং যে চায় সে এক রাক'আত বিতর পড়ুক'।
এই পাঁচ ও তিন রাক'আত বিতর চাইলে এক বৈঠকে ও এক সালামে আদায় করবে। যেমনটি দ্বিতীয় পদ্ধতিতে বর্ণিত হয়েছে। আর চাইলে প্রত্যেক দুই রাক'আত পর সালাম ফিরাবে। যেমনটি তৃতীয় ও অন্যান্য পদ্ধতিতে বর্ণিত হয়েছে। আর এটাই সর্বোত্তম।

টিকাঃ
৩৩. তাহাবী, হা/১৬০৩; হাকেম, হা/১১২৮; দারাকুতনী, হা/১৬৬০; বায়হাকী, হা/৪৭৭৬।
৩৪. একটি গুরুত্বপূর্ণ ফায়েদা : ইবনু খুযায়মা তাঁর 'ছহীহ' গ্রন্থে (২/১৯৪, হা/১১৬৮, 'ছালাত' অধ্যায়) উল্লিখিত পদ্ধতিগুলোর কোন একটিতে আয়েশা (রাঃ) ও অন্যদের বর্ণিত হাদীছ উদ্ধৃত করার পর বলেন, فَجَائِزٌ لِلْمَرْءِ أَنْ يُصَلِّيَ أَيَّ عَدَدٍ أَحَبَّ مِنَ الصَّلَاةِ مِمَّا رُوِيَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى الله عليه وسلم أَنَّهُ صَلَّاهُنَّ، وَعَلَى الصَّفَةِ الَّتِي رُوِيَتْ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى الله عليه وسلم أَنَّهُ صَلَّاهَا، لَا حَظْرَ عَلَى أَحَدٍ فِي شَيْءٍ مِنْهَا ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হতে যত রাক'আত রাতের ছালাত আদায় করা ও যেভাবে আদায় করা বর্ণিত হয়েছে, তার মধ্যে যে সংখ্যাটা পছন্দনীয় তা মানুষের জন্য পড়া জায়েয। উহার যেকোন সংখ্যা আদায় করা কারো জন্য নিষেধ নেই'।
(আলবানী বলেন) আমার বক্তব্য হল, রাসূল (ছাঃ) থেকে যত রাক'আত আদায় করা ছহীহ প্রমাণিত হয়েছে তাকে আবশ্যকীয়ভাবে আঁকড়ে ধরা ও তার চেয়ে রাক'আত সংখ্যা বেশি না করার যে সিদ্ধান্তকে আমরা পছন্দ করেছি, তা সম্পূর্ণরূপে ইবনু খুযায়মার এ মতের অনুকূলে। তাওফীক দেয়ার জন্য মহান আল্লাহ্ যাবতীয় প্রশংসা। আমি তাঁর আরো অধিক অনুগ্রহ কামনা করছি।

📘 তারাবীহ ও ইতিকাফ > 📄 তিন রাক'আত বিতরের কিরাআত

📄 তিন রাক'আত বিতরের কিরাআত


পক্ষান্তরে পাঁচ ও তিন রাক'আত বিতর ছালাতের প্রত্যেক দুই রাক'আত অন্তর বসা ও সালাম না ফিরানোর বিষয়টি রাসূল (ছাঃ) থেকে আমরা প্রমাণিত পাইনি। তবে মূল বিষয়টি জায়েয। কিন্তু যখন নবী (ছাঃ) মাগরিবের ন্যায় তিন রাক'আত বিতর পড়তে নিষেধ করেছেন এবং এর কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, وَلَا تُشَبِّهُوْا بِصَلَاةِ الْمَغْرِبِ 'তোমরা বিতর ছালাতকে মাগরিবের সাথে সাদৃশ্য প্রদান করো না', তখন যে ব্যক্তি তিন রাক'আত বিতর পড়বে তাকে অবশ্যই এই সাদৃশ্য থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আর এটি দু'ভাবে হতে পারে :
১. জোড় ও বেজোড়ের মাঝখানে সালাম ফিরানো। এটাই অধিক শক্তিশালী ও সর্বোত্তম।
২. জোড় ও বেজোড়ের মাঝখানে না বসা । আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।

টিকাঃ
৩৫. তাহাবী, হা/১৭৩৮, 'বিতর' অনুচ্ছেদ; দারাকুতনী, হা/১৬৬৯; ছহীহ ইবনে হিব্বান, হা/২৪২৯ 'বিতর' অনুচ্ছেদ।

📘 তারাবীহ ও ইতিকাফ > 📄 দু'আ কুনূত ও তা পাঠের স্থান

📄 দু'আ কুনূত ও তা পাঠের স্থান


তিন রাক'আত বিতরের প্রথম রাক'আতে সূরা আ'লা, দ্বিতীয় রাক'আতে সূরা কাফিরূন এবং তৃতীয় রাক'আতে সূরা ইখলাছ পড়া সুন্নাত। কখনো কখনো এর সাথে সূরা ফালাক ও নাস যোগ করবে।
কিরাআত শেষ করে রুকূর পূর্বে কখনো কখনো ঐ দু'আর মাধ্যমে কুনূত পড়বে, যেটি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর নাতী হাসান বিন আলী (রাঃ)-কে শিখিয়ে দিয়েছিলেন। দু'আটি হল-
اَللَّهُمَّ اهْدِنِي فِيمَنْ هَدَيْتَ، وَعَافِنِي فِيمَنْ عَافَيْتَ، وَتَوَلَّنِي فِيمَنْ تَوَلَّيْتَ، وَبَارِكْ لِي فِيمَا أَعْطَيْتَ، وَقِنِي شَرَّ مَا قَضَيْتَ، فَإِنَّكَ تَقْضِي وَلَا يُقْضَى عَلَيْكَ، وَإِنَّهُ لَا يَذِلُّ مَنْ وَالَيْتَ، وَلَا يَعِزُّ مَنْ عَادَيْتَ، تَبَارَكْتَ رَبَّنَا وَتَعَالَيْتَ -
উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মাদিনী ফীমান হাদায়তা, ওয়া 'আ-ফিনী ফীমান 'আ- ফায়তা, ওয়া তাওয়াল্লানী ফীমান তাওয়াল্লায়তা, ওয়া বা-রিকলী ফীমা 'আ'ত্বায়তা, ওয়া ক্বিনী শারা মা ক্বাযায়তা; ফাইন্নাকা তাক্বযী ওয়া লা ইয়ুক্তযা 'আলায়কা, ওয়া ইন্নাহু লা ইয়াযিলু মাঁও ওয়া-লায়তা, ওয়া লা ইয়া‘ইষ্ণু মান ‘আ-দায়তা, তাবা-রকতা রব্বানা ওয়া তা‘আ-লায়তা।
অনুবাদ : 'হে আল্লাহ! তুমি যাদেরকে সুপথ দেখিয়েছ, আমাকে তাদের মধ্যে গণ্য করে সুপথ দেখাও। যাদেরকে তুমি ক্ষমা করেছ, আমাকে তাদের মধ্যে গণ্য করে ক্ষমা করে দাও। তুমি যাদের অভিভাবক হয়েছ, তাদের মধ্যে গণ্য করে আমার অভিভাবক হয়ে যাও। তুমি আমাকে যা দান করেছ, তাতে বরকত দাও। তুমি যে ফায়ছালা করে রেখেছ, তার অনিষ্ট হতে আমাকে বাঁচাও। কেননা তুমি সিদ্ধান্ত দিয়ে থাক, তোমার বিরুদ্ধে কেউ সিদ্ধান্ত দিতে পারে না। তুমি যার সাথে বন্ধুত্ব রাখ, সে কোনদিন অপমানিত হতে পারে না। আর তুমি যার সাথে শত্রুতা পোষণ কর, সে কোনদিন সম্মানিত হতে পারে না। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি বরকতময় ও সর্বোচ্চ'।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে ছহীহ সূত্রে বর্ণিত আছে যে, তিনি একবার বিতরের এক রাক'আতে সূরা নিসার একশ আয়াত পড়েছিলেন।
কখনো কখনো রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ করবে। যেমনটি পরে আসছে।
রুকুর পরে কুনূত পড়া এবং রামাযানের দ্বিতীয়ার্ধে কুনূতের দু'আর সাথে কাফেরদের প্রতি লা'নত (অভিসম্পাত), রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ এবং মুসলমানদের জন্য দু'আ বৃদ্ধি করাতে কোন সমস্যা নেই। উমার (রাঃ)-এর যুগে এরূপ করা ইমামগণ থেকে প্রমাণিত রয়েছে। পূর্বোল্লিখিত আব্দুর রহমান বিন আব্দুল কারী বর্ণিত হাদীছের শেষাংশে এসেছে- তারা রামাযানের দ্বিতীয়ার্ধে কাফেরদেরকে লা'নত করতো এ দু'আ বলে-
اَللَّهُمَّ قَاتل الْكَفَرَةَ الَّذِيْنَ يَصُدُّوْنَ عَنْ سَبِيْلِكَ، وَيُكَذِّبُوْنَ رُسُلَكَ، وَلَا يُؤْمِنُوْنَ بِوَعْدِكَ، وَخَالِفْ بَيْنَ كَلِمَتِهِمْ، وَأَلْقِ فِي قُلُوبِهِمُ الرُّعْبَ، وَأَلْقِ عَلَيْهِمْ رِجْزَكَ وَعَذَابَكَ، إِلَهَ الْحَقِّ.
উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা কাতিলিল কাফারাতাল্লাযীনা ইয়াছুদ্দুনা 'আন সাবীলিকা, ওয়া ইয়ুকায্যিবৃনা রুসুলাকা, ওয়ালা ইয়ুমিনূনা বিওয়া'দিকা ওয়া খা-লিফ বায়না কালিমাতিহিম, ওয়া আলকি ফী কুলুবিহিমুর রু'বা, ওয়া আলকি আলায়হিম রিজযাকা ওয়া আযাবাকা ইলাহাল হাক।
অনুবাদ : 'হে আল্লাহ! আপনি কাফেরদেরকে ধ্বংস করুন। যারা আপনার রাস্তা বন্ধ করে, আপনার প্রেরিত রাসূলগণকে অবিশ্বাস করে এবং আপনার অঙ্গীকারের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে না। আপনি তাদের দলের মধ্যে ভাঙ্গন সৃষ্টি করে দিন, তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করুন এবং হে সত্যের উপাস্য! তাদের প্রতি আপনার শাস্তিকে অবধারিত করে দিন'। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করতেন এবং সাধ্যানুযায়ী মুসলমানদের জন্য কল্যাণ প্রার্থনা করতেন। অতঃপর মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেন।
বর্ণনাকারী বলেন, কাফেরদের প্রতি লা'নত, নবী (ছাঃ)-এর প্রতি দরূদ পাঠ, মুমিন নর-নারীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা এবং নিজের জন্য চাওয়ার পর তিনি (উবাই বিন কা'ব) বলতেন,
اَللَّهُمَّ إِيَّاكَ نَعْبُدُ ، وَلكَ نُصَلِّي وَنَسْجُدُ، وَإِلَيْكَ نَسْعَى وَنَحْفِدُ، وَنَرْجُوْ رَحْمَتَكَ رَبَّنَا، وَنَخَافُ عَذَابَكَ الْجِدَّ ، إِنَّ عَذَابَكَ لِمَنْ عَادَيْتَ مُلْحَقِّ.
উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা ইয়্যা-কা না'বুদু, ওয়ালাকা নুছল্লী ওয়া নাজ্জুদু, ওয়া ইলায়কা নাস্'আ ওয়া নাহফিদু, ওয়া নারজু রহমাতাকা রব্বানা, ওয়া নাখা-ফু 'আযা-বাকাল জিদ্দা, ইন্না 'আযা-বাকা লিমান 'আদায়তা মুলহাক্ব।
অনুবাদ : 'হে আল্লাহ! আমরা একমাত্র আপনারই ইবাদত করি, আপনার জন্যই ছালাত আদায় করি ও সিজদা করি। আমরা আপনার নিকটে ফিরে যাওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করি। হে আমাদের প্রভু! আমরা আপনার রহমত কামনা করি এবং আপনার কঠিন শাস্তিকে ভয় করি। আপনার সাথে যে শত্রুতা পোষণ করেছে, আপনার আযাব তার প্রতি অর্পিত হৌক'। অতঃপর তিনি তাকবীর দিয়ে সিজদায় চলে যেতেন।

টিকাঃ
৩৬. নাসাঈ, হা/১৭২৯-৩১, 'রাত ও দিনের নফল ছালাত' অধ্যায়-২০, অনুচ্ছেদ-৪৭; হাকেম, হা/১১৪৪ 'বিতর' অধ্যায়। হাকেম হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন।
৩৭. তিরমিযী, হা/৪৬৩, 'বিতর' অধ্যায়-৩, 'বিতরের কিরাআত' অনুচ্ছেদ-৯; হাকেম, হা/১১৪৪। হাকেম হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন এবং যাহাবী তাঁকে সমর্থন করেছেন।
৩৮. নাসাঈ, হা/১৭২৮, 'রাত ও দিনের নফল ছালাত' অধ্যায়-২০, 'বিতরের কিরাআত' অনুচ্ছেদ-৪৬; আহমাদ, হা/১৯৭৭৫, সনদ ছহীহ।
৩৯. আবূ দাউদ, হা/১৪২৫, 'ছালাত' অধ্যায়-২, 'বিতরের কুনূত' অনুচ্ছেদ-৩৪০; তিরমিযী, হা/৪৬৪, 'বিতর' অধ্যায়-৩, অনুচ্ছেদ-১০; নাসাঈ, হা/১৭৪৫, 'রাত ও দিনের নফল ছালাত' অধ্যায়-২০, 'বিতরের দু'আ' অনুচ্ছেদ-৫১; ইবনু মাজাহ, হা/১১৭৮, অধ্যায়-৫, 'বিতরের কুনূত' অনুচ্ছেদ-১১৭; ছহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১০৯৫; ইরওয়াউল গালীল, হা/৪২৯, সনদ ছহীহ। দ্রঃ ছিফাতু ছালাতিন নাবী (৭ম সংস্করণ), পৃঃ ৯৫-৯৬।
৪০. ইসমাঈল বিন ইসহাক আল-কাযী, ফাযলুল ছালাত আলান নাবী, পৃঃ ৩৩, তা'লীক আলবানী; ছিফাতু ছালাতিন নাবী, পৃঃ ৪৫।
৪১. ছহীহ ইবনে খুযায়মা, ২/১৫৫-১৫৬, হা/১১০০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00