📘 তারাবীহ ও ইতিকাফ > 📄 প্রথম সংস্করণের ভূমিকা

📄 প্রথম সংস্করণের ভূমিকা


إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ، نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ، وَنَعُوْذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُوْرِ أَنْفُسِنَا، وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا ، مَنْ يَهْده الله فَلا مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ.
হামদ ও ছানার পর, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে মাওকুফ হিসেবে ছহীহ সনদে বর্ণিত আছে। অবশ্য এটি হুকুমগতভাবে মারফু। তিনি (ইবনে মাসঊদ) বলেন,
كَيْفَ أَنْتُمْ إِذَا لَبِسَتْكُمْ فِتْنَةٌ يَهْرَمُ فِيهَا الْكَبِيرُ، وَيَرْبُوْ فِيْهَا الصَّغِيرُ، يَجْرِي عَلَيْهَا النَّاسُ يَتَّخِذُونَهَا سُنَّةً، إِذَا تُرِكَ مِنْهَا شَيْءٌ قِيلَ : تُرِكَتِ السُّنَّةُ؟ قَالُوا : وَمَتَى ذَاكَ؟ قَالَ : إِذَا ذَهَبَتْ عُلَمَاؤُكُمْ، وَكَثُرَتْ جُهَلاَؤُكُمْ، وَكَثُرَتْ قُرَّاؤُكُمْ، وَقَلَّتْ فُقَهَاؤُكُمْ، وَكَثُرَتْ أُمَرَاؤُكُمْ، وَقَلَّتْ أُمَنَاؤُكُمْ، وَالْتُمسَتِ الدُّنْيَا بِعَمَلِ الْآخِرَةِ، وَتُفُقَهَ لِغَيْرِ الدِّينِ.
‘তোমাদের অবস্থা তখন কেমন হবে যখন ফিতনা (বিদ'আত) তোমাদেরকে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরবে যে, এই ফিতনার মধ্যেই তোমাদের বড়রা বৃদ্ধ হবে এবং ছোটরা বড় হবে। মানুষ বিদ'আতের উপরেই চলতে থাকবে। এমতাবস্থায় তারা সেটাকেই সুন্নাত হিসেবে গ্রহণ করবে। যখন কোন বিদ'আতকে ত্যাগ করা হবে তখন বলা হবে, সুন্নাহকে পরিত্যাগ করা হয়েছে? লোকেরা বলল, এটা কখন হবে? তিনি বললেন, (ক) যখন তোমাদের আলেমগণ মৃত্যুবরণ করবেন ও মূর্খদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। (খ) যখন সাধারণ আলেমের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, কিন্তু জ্ঞানী আলেমের সংখ্যা কমে যাবে। (গ) যখন নেতার সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, কিন্তু আমানতদারের সংখ্যা কমে যাবে। (ঘ) যখন আখেরাতের কাজের মাধ্যমে দুনিয়া তালাশ করা হবে এবং দ্বীন ব্যতীত অন্য উদ্দেশ্যে জ্ঞানার্জন করা হবে'।
আমার বক্তব্য হল, এই হাদীছটি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নবুঅত ও তাঁর রিসালাতের সত্যতার নিদর্শন। কারণ বর্তমান যুগে এই হাদীছের প্রত্যেকটি অংশ সত্য প্রতিপন্ন হয়েছে। তন্মধ্যে অন্যতম হল বিদ'আতের আধিক্য এবং তার প্রতি মানুষের আকর্ষণ এমন পর্যায়ে গিয়ে উপনীত হওয়া যে, শেষাবধি তারা বিদ'আতকেই সুন্নাত হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং উহাকেই অনুসরণীয় ধর্মাচরণে পরিণত করেছে। যখন আহলুস সুন্নাহ (হাদীছের অনুসারীরা) প্রকৃত অর্থে বিদ'আত থেকে বিমুখ হয়ে রাসূল (ছাঃ)-এর ছহীহ হাদীছকে আঁকড়ে ধরে, তখন বলা হয়- সুন্নাহকে পরিত্যাগ করা হয়েছে!
আমরা আহলুস সুন্নাহগণ যখন সিরিয়ায় আমাদের সাধ্যানুযায়ী ধীর-স্থিরতা ও বিনয়-নম্রতা বজায় রেখে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে ছহীহ সূত্রে প্রমাণিত বিভিন্ন মাসনূন দু'আর মাধ্যমে এগারো রাক'আত তারাবীহ ছালাত আদায়ের সুন্নাতকে পুনর্জীবিত করেছিলাম, তখন আমাদেরকেও অনুরূপ অপবাদ সইতে হয়েছিল। বিশ রাক'আত তারাবীহ ছালাত আদায়কারী অধিকাংশ মুছল্লী যেই সুন্নাতকে (ধীর-স্থিরতা ও বিনয়-নম্রতা) বিনষ্ট করেছিল। তদুপরি আমরা যখন 'ছালাতুত তারাবীহ' বইটি বের করলাম, তখন তারা রাগে- ক্ষোভে ফেটে পড়ল। 'তাসদীদুল ইছাবাহ ইলা মান যা'আমা নুছরাতাল খুলাফা আর-রাশিদীন ওয়াছ ছাহাবা' تسديد الإصابة إلى من زعم نصرة الخلفاء الراشدين والصحابة) নামক পুস্তক। তাদের অন্তর্জালার কারণ ছিল 'ছালাতুত তারাবীহ' গ্রন্থের নিম্নোক্ত গবেষণালব্ধ কথাগুলো-
১. রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এগারো রাক'আতের বেশি তারাবীহ্ ছালাত আদায় করেননি।
২. উমার (রাঃ) উবাই বিন কা'ব ও তামীম আদ-দারীকে ছহীহ হাদীছ মোতাবেক জামা'আত সহকারে এগারো রাক'আত তারাবীহ্ ছালাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
৩. উমার (রাঃ)-এর যুগে মানুষেরা রামাযান মাসে ২০ রাক'আত তারাবীহ্র ছালাত আদায় করত- মর্মের বর্ণনাটি শায, দুর্বল এবং ঐ সকল নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীর বর্ণনার বিপরীত, যারা এগারো রাক'আতের কথা বলেছেন এবং উমার (রাঃ)-ই এই আদেশ দিয়েছিলেন বলে বর্ণনা করেছেন।
৪. যদি শায বর্ণনাটি ছহীহও হত, তবুও সংখ্যার ক্ষেত্রে সুন্নাহ্ অনুকূল হওয়ার কারণে ছহীহ বর্ণনাটিকে গ্রহণ করাই সর্বোত্তম গণ্য হত। তাছাড়া শায বর্ণনাটিতে একথার উল্লেখ নেই যে, উমার (রাঃ) বিশ রাক'আতের নির্দেশ দিয়েছিলেন। বরং মানুষেরা নিজেরা তা পড়েছিল। পক্ষান্তরে ছহীহ বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি এগারো রাক'আতের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
৫. যদি শায বর্ণনাটি ছহীহও হত, তাহলেও তার উপর আবশ্যিকভাবে আমল করা এবং ছহীহ সুন্নাহ্ অনুকূল বর্ণনার উপর আমল পরিত্যাগ করা আবশ্যক হত না। উপরন্তু ছহীহ হাদীছের প্রতি আমলকারীকে জামা'আত থেকে খারিজ হিসেবে গণ্য করা হত না। বরং তার আলোকে এতটুকু বলা যেতে পারত যে, বিশ রাক'আত জায়েয। তবে এটি অকাট্য যে, রাসূল (ছাঃ) যে আমলটি (১১ রাক'আত) নিরবচ্ছিন্নভাবে করেছিলেন তাই সর্বোত্তম।
৬. উক্ত গ্রন্থে আমরা ছাহাবায়ে কেরামের কোন একজনের পক্ষে থেকেও বিশ রাক'আত প্রমাণিত না হওয়ার বিষয়টি বর্ণনা করেছি।
৭. যারা বিশ রাক'আতের উপর ইজমা হয়েছে বলে দাবী করেন, তাদের দাবির অসারতা বর্ণনা করেছি।
৮. উক্ত গ্রন্থে আমরা ছহীহ হাদীছে প্রমাণিত রাক'আত সংখ্যাকে আঁকড়ে ধরার আবশ্যকতার দলীল এবং যে সকল আলেম এগারো রাক'আতের বেশি পড়াকে নাকচ করেছেন তাদের বক্তব্য উল্লেখ করেছি। এছাড়া আরো অনেক উপকারী বিষয় উল্লেখ করেছি, যা একত্রে কোন একটি গ্রন্থে কদাচিৎ পাওয়া যাবে।
ছহীহ হাদীছের সুস্পষ্ট দলীল ও নির্ভরযোগ্য আছার দ্বারা এগুলো বর্ণনা করার ফলে মুকাল্লিদ ওলামা-মাশায়েখের তরফ থেকে আমাদের উপর তীব্র আক্রমণ চালানো হয়েছিল। তাদের কেউ কেউ বক্তব্য ও দরসে আবার কেউ আমাদের পূর্বোল্লিখিত (ছালাতুত তারাবীহ) গ্রন্থের প্রত্যুত্তরে পুস্তকাদি রচনা করে তাতে এ আক্রমণ চালিয়েছিল। সেগুলো উপকারী জ্ঞান ও সুস্পষ্ট দলীল শূন্য। বরং হক ও হকপন্থীদের উপর বাতিলপন্থীদের ক্রোধ প্রকাশের চিরায়ত রীতি অনুযায়ী এ সকল গ্রন্থ গালি-গালাজে ভর্তি। সে কারণে তাদের প্রত্যুত্তর প্রদান ও তাদের বক্তব্যের ত্রুটি বর্ণনায় আমাদের সময় নষ্ট করার কোন কার্যকর উপকারিতা আছে বলে আমরা মনে করি না। তাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে এ কাজে সময় ব্যয় করার চেয়ে আয়ু অনেক কম। আল্লাহ তাদের সকলকে হেদায়াত দান করুন!
আমাদের পূর্বোক্ত 'ছালাতুত তারাবীহ' গ্রন্থটি পদ্ধতিগত দিক থেকে তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করেছে এবং তার প্রয়োজন পূরণ করেছে। তন্মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হল তারাবীহ্ ছালাতের ব্যাপারে ছহীহ হাদীছের দিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং ছহীহ হাদীছ বিরোধীদের জবাব প্রদান করা। অবশেষে ছহীহ হাদীছ মোতাবেক তারাবীহ্ ছালাত আদায়ের সুন্নাত সিরিয়া, জর্ডান ও অন্যান্য মুসলিম দেশের অসংখ্য মসজিদে ছড়িয়ে পড়েছে। যাবতীয় প্রশংসা সেই মহান আল্লাহ্র জন্য, যার অনুগ্রহে সৎ আমল সমূহ পূর্ণতা লাভ করে।
উক্ত গ্রন্থটি (ছালাতুত তারাবীহ) ছাপানোর বেশ কিছু দিন অতিবাহিত হওয়ার পর তা পুনঃপ্রকাশের প্রয়োজন দেখা দিলে আমি উহাকে নিখাদ ইলমী পদ্ধতিতে সংক্ষিপ্ত করার চিন্তা করি। এতে আমি কারো প্রত্যুত্তর প্রদানে প্রবৃত্ত না হয়ে ‘তুমি তোমার বক্তব্য পেশ কর, অতঃপর চলে চাও' أَلْقِ كَلِمَتَكَ وَامْشِ) এ রীতি অবলম্বন করব। 'ছালাতুত তারাবীহ' গ্রন্থে যে সকল জ্ঞানগর্ভ আলোচনা ছিল সেগুলোর সারনির্যাস এতে সন্নিবেশিত করব এবং পরিপূর্ণ ফায়েদা হাছিলের জন্য অন্যান্য উপকারী আলোচনাও এতে যুক্ত করব। পূর্ববর্তী গ্রন্থটির ন্যায় এটির দ্বারাও মানুষের উপকার করার এবং আমাকে এর প্রতিদান প্রদান করার ব্যাপারে আল্লাহই দায়িত্বশীল। তিনিই তো উত্তম অভিভাবক। (সংক্ষেপায়িত)

টিকাঃ
১. দারেমী হা/১৯০, ভূমিকা, 'যুগের পরিবর্তন ও তার মধ্যে যা ঘটবে' অনুচ্ছেদ-২২, দারেমী দু'টি সনদে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। যার একটি ছহীহ আর অন্যটি হাসান। হাকেম ৪/৫১৪-১৫, হা/৮৫৭০ 'ফিতান ও মালাহিম' অধ্যায়; ছহীহ তারগীব, হা/১১১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00